সফলতার প্রায় কাছাকাছি পৌঁছে ভয়াবহ এক দুঃসময়ের ভেতর হারিয়ে যেতে বসে কাদের মোল্লা। নামের শেষের এই মোল্লা পদবীটা ওর পৈতৃক সূত্রে পাওয়া না। আমাদের হাইস্কুলের ভূগোল স্যার ছিলেন ওর বাবা মিনহাজ সরকার। আমরা ডাকতাম ডায়াগ্রাম স্যার। তাঁর হাতে সব সময় থাকত একটা পাকা জালি বেত। পালোয়ানদের গোঁফের মতো চকচকে ও মাথার দিকটা সামান্য বাঁকা। ওটার ব্যবহার কখনো দেখেছি বলে এখন আর মনে করতে পারি না। যেমন পালোয়ানদের গোঁফের ব্যবহার কেউ দেখেছে বলেও জানি না। পৃথিবীর উত্তর অক্ষাংশের বায়ুস্রোত কিংবা দক্ষিণ অক্ষাংশের নিরক্ষীয় স্রোতের চিত্র আঁকায় অথবা বিষুবীয় রেখা কিছুটা ডানে বা বামে সরে যাওয়ায়, আরো অথবা মৌসুমি জলবায়ুর গতিপথের তীর চিহ্নগুলো ঠিক ঠিক জায়গায় না বসালে… এরকম অনেক ভৌগোলিক ত্রুটিবিচ্যুতি যা কোনো অবস্থায়ই আমাদেরকে দিয়ে ঠিকঠিকভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব ছিল না, সেসবের কোনো একটা আমাদের হোমটাস্কের খাতায় খুঁজে পেলেই তেড়েফুঁড়ে আসতেন ওই বেত নিয়ে। বেঞ্চের ওপর খাতাটা ধপ্পাস করে রেখে বলতেন, ‘দাঁড়া কান ধরে।’ সঙ্গে সঙ্গে দাঁড়িয়ে যেতাম আমরা। নিজের কান ধরায় তো কোনো ব্যথা নেই। আর লজ্জা জিনিসটা সেকালেও ছিল না আমাদের, এখনও নেই। মাঝে মাঝে মজাও করতাম। কারণ ওই বেতের ভয়টা ছিল না আমাদের ডায়াগ্রাম স্যারের ক্লাশে।
‘এক কান, না দু’কান স্যার?‘ মেঘের গর্জনের মতো ছিল তাঁর গলার স্বর। চোখ রাঙিয়ে বলতেন, ‘দু’কান ধরে’, বেতটা শূন্যে ঘুরিয়ে আবার বলতেন, ‘বেঞ্চের উপর।’
‘আগে তো বেঞ্চের উপর বলেননি স্যার।’
‘এখন বললাম। কারণ বেশি পাঁজি তুই।’
পাশেরজন একটু ফিক করে উঠলেই বলতেন, ‘এই তুইও দাঁড়া।’
কাঁচুমাঁচু করে যদিও সে বলত, ‘আমি তো অয়ন বায়ুপ্রবাহ ঠিকভাবে এঁকেছি স্যার।’
ও যেন ক্ষমা না পায় সেজন্য দ্রুত কান ধরে দাঁড়িয়ে যেতাম বেঞ্চের উপর। এক হাত দিয়ে ওকেও টেনে তুলতাম। যদিও ওর একদু’টা কনুয়ের গুঁতো ছিল তখন উপরি শাস্তি।
এই কাদের মোল্লা ছিল আমাদের সহপাঠী। কিন্তু ডায়াগ্রাম স্যারের পিরিয়ডে কখনোই না। তখনকার নাম ছিল ওর মোহাম্মাদ আব্দুল কাদের। মাঝে মাঝে আমরা বলতাম ওকে, ‘স্যারে তোর নামের শেষে জিলানি লাগিয়ে দিলে তো আমরা পির মানতে পারতাম তোরে।’
‘তা পারতি। এখনও পারোস।’
‘কেমনে?’
‘আমার গ্রামের নাম তো মোল্লাহাটি। মোল্লাহাটির পির কাদের মোল্লা বইলা সিজদা দে।’
সিজদার কথা শুনে আমাদের মন বিদ্রোহ করে ওঠে। যারে জানি তারে কেমনে সিজদা দেই! তার থাইকা বিদেশি কুত্তাও ভালো। ওর পাছায় আলতো একটা লাথি দিয়ে বলতাম, ‘এই নে সিজদা দিলাম।’

’আমাদের হাসিঠাট্টার ওই কাদের মোল্লা অথবা মোহাম্মাাদ আবদুল কাদের-যে একদিন সত্যি সত্যি কাদের মোল্লা হয়ে উঠবে তা কি সেসব দিনে কল্পনায় ছিল আমাদের! কত অয়ন বায়ু ও নিরক্ষীয় বায়ু বয়ে গেল ছোট্ট এই গোলকটার শরীর বেয়ে। আমাদের ডায়াগ্রাম স্যার গত হয়েছেন অনেকদিন আগে। অথচ ওইসব বায়ুপ্রবাহ এখনো আমদের অন্তর দিয়ে ধীরে ধীরে বয়ে যায়। ডাকসাঁইটে এক রাজনৈতিক দলের সামান্য চামচা থেকে এখন প্রতিষ্ঠিত মাস্তান সর্দার কাদের মোল্লা। যে-কোনো কাজের জন্য আগাম অর্থ পরিশোধ করতে হয় ওকে। ক’দিন আগে ওর বস অন্য আরেক বসের সঙ্গে বচসায় যেয়ে হাওয়া হয়ে যায়। পরে ওর খোঁজ পাওয়া যায় মিটফোর্ড হাসপাতালের মর্গে। স্বজনেরা লাশ নিতে না আসায় আঞ্জুমানের হাতে ওর নরকবাস নিশ্চিত হয়।
বসের জানাজা না পড়তে পারায় মনে কষ্ট থেকে যায় কাদের মোল্লার। দলটাকে টিকিয়ে রাখার জন্য বসের দায়িত্ব নিতে হয় ওকে। একটা নতুন আখড়া ঠিক করে সে। অনেকদিন আগে গড়ে ওঠা এক চরবসতি থেকে গেল বছর কয়েকটা জেলে পরিবারকে উৎখাত করেছিল ওই এলাকার চেয়ারম্যান। ওটার বখরা সেও পেয়েছিল। ওই বাড়িগুলো এখনো পরিত্যক্ত। আগামী বছর থেকে নাকি চাষাবাদ হবে ওখানে। নদীতে তেমন পানি নেই। মাছ ধরে জেলেদের জীবন চলে না। নদীসিকস্তি পরিবারগুলোর জোয়ান-বুড়োরাই হয়তো মুনিষ খাটবে চেয়ারম্যনের অধীনে। তারপর নিজেদের ভিটেবাড়ি ভেঙে চাষ দেবে। ধানের গোলা ভরবে চেয়ারম্যানের। ওই ধান ভেনে চাল ওঠাবে ওদের বৌঝিরা। মুনিষখাটা পয়সায় চাল কিনে পেট পুরে অথবা আধপেটে ভাত খাবে ওইসব সদা খুশি ও চির দুঃখী মানুষেরা। রাতের বেলা ফুর্তি করে আগামী দিনের মুনিষের জন্ম দেবে ভগমানের ওই চক্রটা বজায় রাখার জন্য। ঘটা করে পুজো দেবে যেন ঘরভর্তি সন্তানসন্তুতি আসে, থালা ভরা ভাত পায়, শরীর ভরা স্বাস্থ্য পায়… ভগমানের এ-পিরথিমিতে পিদিমটা ওদের জ্বালিয়ে রাখতে হয় কিনা!
হেমন্ত ঋতুর খটখটে আকাশে কখন এক টুকরো কালো মেঘ এসে চারদিকটা প্রায় অন্ধকার করে দেয় হঠাৎ বোঝা যায় না। আকাশের দিকে তাকিয়ে এক মধ্যবয়সী হালুড়ে ছড়া কাটে : ‘যা যা কালা মেঘ, ভাইস্যা যা, ষাতবল্লা আছে যত, সঙ্গে লইয়া যা’-কে অনুসরণ করে ওর সঙ্গী বলে, ‘যাইবো গা কাহা, বাতাস আছে।’ আকাশের দিকে আরো ভালো করে তাকায় চাষীটি। তারপর বলে, ‘জানস নি ছফুর, যদি জরে আগোনে, রাজা যায় মাগোনে।’ ‘জানি কাহা।’ ওদের এসব গ্রামীণ কথাবার্তা শুনে কাদের মোল্লাও তাকায় আকাশের দিকে। সামান্য সময়ের জন্য ঘোর লাগে ওর। এটা শুক্লা না কৃষ্ণপক্ষ! সন্ধ্যা না হতেই এত অন্ধকার কেন? সূর্যের চারদিকটা কাজলকালো মেঘে ঢাকা। আকাশের উপর দিকটা যদিও স্বচ্ছ এখনো। একটু পরে আবার আলোর রেখা ফুটে ওঠে দিগন্ত জুড়ে। কালো মেঘটাকে ঠেলে উপরে উঠিয়ে দেয় শেষ বিকেলের নরম আলোর স্রোত।
এরকম কিছু বিপ্রতীপ অনুভূতি নিয়ে অমাপক্ষের ঘোরলাগা বিকেলটা কেটে যায় কাদের মোল্লার। তারপর ধীর পায়ে এগিয়ে যায় সে ওদের পুরোনো বৈরাগ নদীটার দিকে। ঝোপ-জঙ্গলঘেঁষা একটা অস্থায়ী আবাসের উঠোনে এসে দাঁড়ায় সে। শেষ বিকেলের সামান্য আলোয় উঠোন ছাড়িয়ে যায় ওর ছায়া। আধফোঁটা ওই ছায়ার সামনে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ক্লান্ত হয়ে ওঠে সে। দীর্ঘ হতে হতে একসময় মিলিয়ে যায় ওই ছায়াটা। তলপেটে চাপ অনুভব করে সে। ঘুরে দাঁড়িয়ে বাড়িটার পেছনে যায়। জিপার খোলার পর ওর মনে পড়ে একটু আগেই সূর্য ডুবেছে এদিকটায়। মন পরিবর্তন করে বাড়িটার অন্য দিকে যেয়ে হালকা করে নিজেকে। আঙিনায় ফিরে একটা গাছের গুড়ি দেখে বসে ওখানে। বাতাসে এখনো রয়ে গেছে পুরোনো জেলেবসতির আঁষ্টে গন্ধ। একটু আগে পাওয়া অনুভূতিটাকে নিয়ে ভাবে সে। সামান্য এই জলবিয়োগের বিষয়টা কেন একটা সংশয় সৃষ্টি করেছে ওর ভেতর। গত অনেক বছর এসবের কোনো বালাই ছিল না। নিজেকে জিজ্ঞেস করে সে, ভয় পেলাম নাকি? মৃত্যুভয়!
মনের এ-অবস্থাটা আশ্চর্য এক অস্বস্তির ভেতর ঠেলে দেয় ওকে। যত অপকর্ম করেছে এতদিন সেসবের জন্য কখনো অনুশোচনা করেনি সে। তাহলে! তারপর নিজেই এটার উত্তর পায়। জীবন শুরুর সময়ে অধিবিদ্যার যে- সংক্রমণ ওর ভেতর ঢোকানো হয়েছিল, সেসবের প্রভাব মনের এ-অবস্থার জন্য দায়ী। এটার ক্ষমতা-যে কত গভীর ও তীব্র এখন বুঝতে পারে কাদের মোল্লা। কিছুক্ষণ পর একটা কাজের আগাম নিয়ে আসবে এক পার্টি। কথা বলতে হবে ওদের সঙ্গে, অথচ মন চাইছে অন্য কিছু। বাড়িটা থেকে বেরিয়ে নদীর নতুন জেগে ওঠা ছোট্ট এক চরের চিকচিকে বালুর দিকে এগিয়ে যায় সে। অন্ধকারের অনিশ্চিত পরিবেশ ভুলে শুয়ে পড়ে শুকনো বালুর উপর। মনের ভেতর থেকে অস্বস্তিটাকে ঝেড়ে ফেলতে পারছে না কোনোভাবে। মেঘহীন রাতের তীব্র নীল আকাশ ফিকে হয়ে ওঠে একটু পর। ক্বক ক্বক শব্দ তুলে নদী পেরিয়ে উত্তরের লোকালয়ের দিকে ধেয়ে যায় কয়েক ঝাঁক বাদুড়। বৃষ্টিবাদলার দিন শেষ হলো বলে মনে হয়। চরের শুকনো বালুতে একা একা দিব্যি শুয়ে থাকতে পারে সে। বাতাসে জলকণা কম থাকায় শরীর ঘামে না। অনুমান করা যায়-যে, এদেশের সীমান্ত অতিক্রম করেছে এবারের শীত ঋতু। বৌঝিদের এখন আর ঘরের আঙিনা বড়ো করার প্রয়োজন নেই।
অনেকটা আকস্মিকভাবে মনের এই পরিবর্তনটাকে গভীরভাবে বোঝার চেষ্টা করে সে। তারপর সিদ্ধান্ত নেয়, এ-লাইনটা একেবারে ছেড়ে দেয়ার। কাজটা-যে খুব কঠিন তা সে জানে। পিঠে গুলি নিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়তে অথবা ঘরে ফিরতে চায় না সে। বেঁচে থাকার ইচ্ছাটা এখনো পুরোপুরি রয়েছে ওর। জীবনকে এখনো বুঝেই উঠতে পারেনি কাদের মোল্লা। বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার মতো প্রচুর অর্থ ও বিদ্যে ওর নেই। ভেবে ঠিক করে-যে ক’টা বছর জেলখানার ভেতর কাটিয়ে দেয়ার একটা ফিকির করতে হবে যে-কোনোভাবে। দু’দিক দিয়েই এটা ভালো হতে পারে। প্রথমত দলছুট হয়ে যাবে সে। দ্বিতীয়ত দীর্ঘ সময়ের অনুপস্থিতি হয়তো দলই ছেড়ে দেবে ওকে। এমনকি দলটাই হয়তো বিলুপ্ত হয়ে যাবে। সাধারণত খুব বেশিদিনের হয় না এসব দলের আয়ু।

এগিয়ে আসা শীত মৌসুমের জন্য প্রস্তুতি নেয় সে। অঢেল টাকাকড়ি ও বল্গাহীন বেহিসেবী জীবন আর চায় না সে। স্কুল মাস্টার বাবার টানাটানির সংসারে থেকে ও বন্ধু পরিবারগুলোর ধাপে ধাপে উপরে উঠে যাওয়া দেখে একসময় বিদ্রোহী হয়ে ওঠেছিল ওর মন। ওই সুযোগটা নিয়েছিল এলাকার ধুরন্ধর রাজনীতিজীবি আধাজন্তুটি। ধীরে ধীরে আমাদের মোহাম্মাদ আব্দুল কাদের অথবা কাদের মোল্লা হয়ে ওঠেছিল গোলা কাদের। এখন ওর মনে হয় একটা অতি সাধারণ জীবনই হয়তো কিছুটা সুখ ও স্বাধীনতা নিয়ে আসতে পারত ওর জন্য। বঙ্গোপসাগরে প্রমোদ বিহারে যাওয়া কিংবা বার্মা সীমান্তের গভীরে বুঁদ হয়ে থাকার কল্পনা আর করে না সে। বরং দক্ষিণের সমুদ্রতীরের কোনো দুর্গম গ্রামাঞ্চলে সারাদিনের মাছ-ধরা খাঁটুনির পর শীতের নিদ্রালু আকাশের নিচে একটুকরো মুক্ত জীবন চায় সে। পুলিশ ও পার্টির ঝামেলা ও কেঁচো-কেন্নোর মতো মৃত্তিকালগ্ন জীবনের নির্মমতা নেই যেখানে। গত ক’টা বছর অন্ধকার-বিহারী এসব মানুষের সঙ্গে থেকে এক নরকের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে সে। উত্তেজনা-ভরা বাহারি জীবনের প্রতি আর কোনো মোহ নেই ওর। নির্ঝঞ্ঝাট ও সরল এক জীবনের আকর্ষণ তাড়িত করে ওকে।
জেলের ভেতরে থাকার কয়েকটা অভিজ্ঞতা রয়েছে গোলা কাদেরের। এ পেশায় থাকা মানুষদের জন্য ওটাকে বরং অবসর কাটানোর জায়গা বলে মনে হয়। খুব বেশি দিন থাকার সুযোগ যদিও ঘটেনি ওর। প্রতিবারই খুব তাড়াতাড়ি ওকে ছাড়িয়ে নিয়ে এসেছে ওর বসেরা। কিন্তু এবারের পরিকল্পনাটা ওর নিজের। কেউ যাতে ওকে ছাড়িয়ে আনার চেষ্টা না করে তা ভেবে এগোতে চায় সে। তাছাড়া সুযোগটাও এখন একটু বেশি। ওর বস মারা গেছে মাত্র ক’দিন আগে। অন্য কোনো ভাবনা মাথায় আসা কিংবা নতুন কোনো ঝামেলায় জড়ানোর আগেই কাজে নেমে পড়ে গোলা কাদের।
মোটামুটি কঠিন একটা আইন হয়েছে সম্প্রতি। ওটাতে ধরা দিতে চায় সে। কিন্তু সমস্যা দেখা দেয় ছোটখাটো ওসব কাজ করা নিয়ে। এ-লাইনে আসার জন্য ওর হাতেখড়ি ছিল ওসব। এ-পেশার শুরুর দিকে রপ্ত করেছিল ওগুলো। নিতান্ত অনিচছায় ওরকম একটা কাজের জন্য শহরের অন্ধকার ও প্রায় নির্জন এক রাস্তার মোড়ে যেয়ে দাঁড়ায় সে। ক’মিনিট যেতেই পেয়ে যায় দু’জন রিকশাযাত্রী। ওর অভিজ্ঞতা বলে-যে কাছেই ওঁত পেতে রয়েছেন ওনারা। ওর হাতের চকচকে ছুরিটা দেখেই গলার চেইন খুলে দেয় মহিলা যাত্রীটা। ওটা নিয়ে সটকে পড়ার যথেষ্ট সুযোগ পেয়েও রিকশাটাকে আগে চলে যেতে দেয় সে। কিছুটা অবাক হয় গোলা কাদের। কোনো চেঁচামেচি করে না ওরা। লোক জড়ো হওয়ার মতো কোনো অবস্থাও তৈরি হয় না। ওর সন্দেহ হয়-যে চেইনটা হয়তো নকল সোনার। ওটা ছুঁড়ে ফেলে দেবে কিনা ভাবে সে। অন্ধকার থেকে হঠাৎ এক দল উর্দি-পরা লোক জাপটে ধরে গাড়িতে উঠিয়ে নেয় ওকে। মুখের উপর টর্চের আলো ফেলে অবাক হয় ওরা। জিজ্ঞেস করে, ‘আরে কাদের সা’ব, আপনার হাতে এটা যে!’ চেইনটা খাঁটি মনে হওয়ায় কর্তাব্যক্তিটা দুটো পাঁচশ টাকার নোট ওর পকেটে গুঁজে দেয়। জিজ্ঞেস করে ‘কোথায় নামবেন?’
ভেবে পায় না এটার কি জবাব দেবে গোলা কাদের। নিজের অজান্তেই বলে, ‘যেখানে খুশি আপনাদের’। প্রথম চেষ্টাটা ব্যর্থ হওয়ায় মন খারাপ হয় ওর। কিন্তু ওখানেই শেষ হয় না বিষয়টা। বেশ ক’টা ছোটখাটো উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়ায় ধৈর্য হারিয়ে ফেলে সে। বর্তমান জীবনের প্রতি ঘৃণা এবং অতীতের সামান্য সুকৃতি নতুনভাবে শুভ-ভাবনার দিকে ঠেলে দেয় ওকে। ঝুঁকিপূর্ণ একটা সিদ্ধান্ত নেয় সে। বিপক্ষ কোনো দলের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে ওদেরকে ফাঁদে ফেলার চেষ্টা করবে সে। নিজেদের ধরা পড়ার সুযোগও রাখবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা-বাহিনীর জন্য।
পরিকল্পনাটা বাস্তবায়ন করে সে এক হরতালের দিন। ধরা পড়ে প্রতিপক্ষ দল। যথেষ্ট সুযোগ থাকা সত্বেও কেন ওদের ধরা হয় না বুঝে উঠতে পারে না গোলা কাদের। পরে জানতে পারে, অদৃশ্য কোনো প্রভুপিতার দৃষ্টির ভেতর রয়েছে ওরা। পালাতে চাইলেও পথ নেই। ওই হাতের ছড়ানো থাবায় একদিন ধরা দিতেই হবে ওকে। এ-পেশায় হাতেখড়ি নেয়ার দিনগুলোয় ওর এক সুহৃদ বলেছিল, এখানে শুধু আসা যায়, ফেরা যায় না আব্দুল কাদের! এখন বুঝতে পারে সে, কথাটা কত বেশি সত্য।

অবশেষে মরিয়া হয়ে সিদ্ধান্ত নেয় নিজেরাই একটা বড়ো দল তৈরি করবে। কোনো প্রভুপিতার অধীনে কাজ করবে না আর। একটা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঘাঁটি আক্রমণ করবে অস্ত্র সংগ্রহের জন্য। আশা করে হয় সে জয়ী হবে এতে নয়তো ধরা পড়বে দলবলসহ। ওরা ভাবতে পারেনি, এত সহজে ফাঁড়িটার দখল নিতে পারবে! সামান্য ক’টা গুলি খরচ করে ফাঁড়িটা দখল করে ওরা। উর্দিপরা মানুষগুলো যেন পালানোর অপেক্ষায় ছিল; অথচ পরদিন পত্রিকায় দেখে ভয়ানক বন্দুকযুদ্ধের পর কাদের-বাহিনী লুট করে নিয়ে গেছে তেরোটা অস্ত্র। এতগুলো অস্ত্র নিয়ে ফাঁপড়ে পড়ে ওর দল। বিশ্বস্ত সঙ্গী পাওয়ার আগে কোথায় রাখবে এগুলো। পাহাড় ও জঙ্গলঘেরা জায়গাটাতে ওর স্যাঙাতদের নিয়ে যখন আলোচনা করছিল তখন স্থানীয় প্রভুপিতার লোক আসে গোপন সংবাদ নিয়ে। ওদের পুরো দলটাকে বাঁচিয়ে দেবে যদি ওই প্রভুপিতার হয়ে কাজ করে ওরা। দলের সবাই সায় দেয়ায় গোলা কাদেরও বাধ্য হয়ে প্রস্তাবটা মেনে নেয়।
মনের দিক থেকে দুর্বল হয়ে পড়ে গোলা কাদের। সবক’টা প্রচেষ্টা একে একে ব্যর্থ হওয়ায় সে ধরে নেয়-যে সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছে এটা। রক্তে মেশা অধিবিদ্যার অনুপরমাণুগুলো আবার চঞ্চল হয়ে ওঠে। অতঃপর ওই ভয়াবহ সিদ্ধান্তটা নিয়ে ফেলে সে। যেভাবেই হোক পালিয়ে যাবে। সুযোগ পেয়ে কোনো একদিন এক কঠিন সংঘর্ষের ভেতর দলকে ঠেলে দিয়ে পালিয়ে যেতে সমর্থ হয় সে। গোলাগুলি থামার পর গোলা কাদেরের হদিস পায় না কেউ। ওরা ধরে নেয়, প্রতিপক্ষের লোকেরা হাপিস করে দিয়েছে ওকে।
খোলা আকাশের নিচে শুয়ে এখন ওর মনে হয় সামনের দিনগুলোর ঝুঁকিপূর্ণ ও কষ্টকর জীবনের বিপরীতে চলার সময় কাছে এসে গেছে। প্রতিপক্ষের ব্রাশফায়ার এড়িয়ে গত হপ্তায় যেভাবে বেঁচে ফিরেছে তাতে এক অলৌকিক ঘটনা মনে হয় ওটাকে। অনেক ভেবে পরবর্তী সিদ্ধান্তটা নেয় সে। মরতেই হবে যখন একটা ভালো জীবনে ফিরে যেয়ে মরাই ভালো। তওবা পড়ার জন্য নিজ গ্রাম মোল্লাহাটি যাবে সে। হেমন্তের ফসল কাটার পর গ্রামগঞ্জের মানুষের মনে কিছুটা ফুর্তি ও আলস্যের আমেজ দেখা দেয়। এখানে ওখানে বাৎসরিক মেলা বসে। ছেলে বুড়ো সবাই জমায়েত হয় সেখানে। কাদের মোল্লার পাশের গ্রাম দড়াটানা। ওখানে মেলা বসলে ছেলেমেয়েরা ছড়া কাটে : মেলা আইছে দড়াটানা, গান করে তিন কানা/ মেলায় বেচে গোকুলদানা, পয়সা দেনা মা দুই আনা।
নৌকো থেকে নেমে ছেলেমেয়েদের এসব ছড়াগান শুনে প্রাণ জুড়ায় কাদের মোল্লার। আহা, এতসব ছেড়ে গেছিল সে! জীবন কেন মানুষকে শেকড়ছেঁড়া করে, হায়! আঘাতে ও প্রত্যাঘাতে কঠিন হয়ে ওঠা ওর হৃদয়টা তরল হতে শুরু করে গ্রামের স্পর্শ পেয়ে। শত্রুপক্ষের কেউ ওখানে না থাকলেও ওর কাজকর্মের খবর জানে সবাই। ক’টা দিন চুপচাপ কাটিয়ে দেয় সে। তারপর তওবা পড়ার জন্য মওলানার খোঁজ করে। ভাগ্য অথবা বাস্তব অবস্থা সহায়তা দেয় না ওকে। ওর কথা শুনে গ্রামের মওলানা-আক্রামেরা প্রাণের ভয়ে নিরাপদ পাক-পতাকাতলে লুকিয়ে থাকে কিছুদিনের জন্য। আরো ক’দিন গা-ঢাকা দিয়ে থাকে সে। তারপর নৌকার মাঝি হয়ে যমুনা নদীটা পেরিয়ে যায়। আরো এগিয়ে যশোহর-কুষ্টিয়া সীমান্তে ভারতের কাছাকাছি ছোট্ট এক শহরে এসে পৌঁছায়।
জায়গাটা ওর জন্য বিদেশ বিভুঁই। সঙ্গে থাকা অস্ত্র ও পুরোনো কাপড়চোপড় সব নদীতে বিসর্জন দেয় গোলা কাদের। লুঙ্গি ও পাঞ্জাবি পরে মাথায় একটি টুপি চড়ায়। চোয়ালে দাড়ি গজিয়েছে বেশ খানিকটা। হোটেলে থাকা নিরাপদ মনে না হওয়ায় রিকশা নিয়ে শহরের সীমানা পেরিয়ে যায় সে। রাত কাটানোর জন্য যুতসই একটা মসজিদ খুঁজে বের করে। ওখানের ইমামের সঙ্গে কথা বলে সে। ভাগ্যবিড়ম্বিত এক মানুষ বলে নিজের পরিচয় দেয়। কাজের সন্ধানে বেরিয়েছে সে। হাতের টাকাকড়িও শেষ হয়ে এসেছে। রাত কাটানোর মতো কোনো জায়গা নেই। অভিনয়টাতে বেশ ভালোভাবে উতরে যায় মোহাম্মাদ আব্দুল কাদের। ভাগ্যও এবার ভালো বলতে হয়। ঠাণ্ডা লেগে ওই ইমামের গলা বসে আছে ক’দিন থেকে। আজান দিতে পারে কিনা জানতে চায় সে। মাথা দোলায় মোহাম্মাদ আব্দুল কাদের। অজু করে আসতে বলে ওকে ইমাম সাহেব। এবার একটু ভাবনায় পড়ে সে। এসবের সঙ্গে সম্পর্ক নেই আজ অনেকদিন। মনে মনে আল্লাহু আকবর আওরায় সে। জীবন মানেই তো অবিরত পরীক্ষা দিয়ে চলা। ওতরাতে না পারলেই শেষ।
আজান পুরোটা মনে করতে পারায় মনে মনে খুশি হয় সে। নামাজের সময় হলে বুকভরা ভয় নিয়ে কানে আঙুল দিয়ে দাঁড়ায় সে। আজান শেষ করার পর খুশি হয়ে ওর পিঠ চাপড়ে দেয় ইমাম সাহেব। রাতের খাবার খেতে দেয়। শোয়ার জায়গা করে দেয় মসজিদের এক কোণায়। ওখানে শুয়ে রাতের শুরুতে দম আটকে আসে ওর। পেটের ভেতরে জমা বাতাসও আটকে রাখতে হয়। রাত নিঝুম হলে মসজিদের দেয়াল ঘড়ির টিক টিক শব্দ মনে হয় একেকটা বুলেট। দেয়াল থেকে নামিয়ে মাদুর দিয়ে জড়িয়ে রাখে ওটা। মধ্যরাত পেরোনোর পর ক’বার ঘন্টা বেজেছে মনে করতে পারে না। মনে হয় অসংখ্যবার। জানালা দিয়ে দেখা যায় রাতের কুহেলিমাখা নিভৃত গ্রামের কালচে আকাশ। ছেঁড়াফাটা মেঘের আনাগোনা চাঁদের আলোয় এক অধিভৌতিক পরিবেশ সৃষ্টি করেছে সেখানে। কখনো মনে হয় উত্তর দিকে এগিয়ে চলেছে মেঘগুলো। পরে আবার মনে হয়, না, আকাশে ঘাঁটি গেড়ে আছে ওরা। মসজিদটাই দক্ষিণে উড়ে চলেছে ওকে নিয়ে। আকাশের কোথাও কালচে লাল আলোর ঝলক দেখা দেয়। ওটার প্রতিফলন গাছপালা ঘিরে থাকা কুয়াশার ভেতর ফুটে ওঠে।

ভোর হতে চলেছে, নাকি ওর মাথার ভেতরই ঘটে চলেছে এসব অদ্ভুত বিষয়-আশয়! রুদ্ধশ্বাস বাতাসে বুক চেপে ধরা স্তব্ধতা। অথচ কান পেতে মনে হয় ঝিঁঝিঁ ডাকছে দূরে কোথাও। গাছের পাতা নড়ে না। একটা রাতজাগা শিশু কাঁদছে এক নাগাড়ে। মাঝে মাঝে ওই চিঁ চিঁ শব্দ ছাড়িয়ে দূরের নদীতীর থেকে ভেসে আসে এক দঙ্গল শেয়ালের কান্নার মতো শোকার্ত সুর। বুঝতে পারে না মোহাম্মাদ আব্দুল কাদের-যে, ওসব কিছুই না। ওর বুকের ভেতর জমে থাকা এতদিনের হাহাকার যা শোনার মতো সুযোগ বা অবসর হয়নি এর আগে।
টের পায়নি সে কখন ঘুমিয়ে পড়েছে এসবের ভেতর। ইমামের ডাকে ঘুম ভাঙে ওর। হাতমুখ ধুয়ে অজু করে আজানের জন্য দাঁড়ায় সে। ইমামের গলা ভালো হতে আরো ক’দিন লেগে যায়। এরিমধ্যে মোটামুটি পাকাপোক্ত একটা সম্পর্ক গড়ে ওঠে ওদের ভেতর। ইমামের জন্য বাজার-সদাই ও রান্নাবান্না করে দেয় সে। বিনিময়ে থাকা ও খাওয়ার নিশ্চয়তা পেয়ে একটা আপাত স্বস্তি খুঁজে পায় মোহাম্মাদ আব্দুল কাদের। বছরখানেকের মধ্যে ওর দাড়ি বুক ছাড়িয়ে পেট ছোঁয়ার জন্য এগিয়ে যায়। পাকানো গোঁফজোড়া ছেঁটে ফেলেছে সে অনেক আগেই। মসজিদ কমিটির সঙ্গে কথা বলে ওর জন্য মোয়াজ্জিনের চাকরিটা পাকা করে দেয় ইমাম সাহেব। এখন পেটে বাতাস জমিয়ে রেখে মসজিদের ভেতর ঘুমাতে হয় না আর। ইমামের ঘরের সঙ্গে আরেকটা একচালা বেঁধে দেয় ওর জন্য। মসজিদের কাজকর্ম ও ইমামের সঙ্গে মিলাদ ও অন্যান্য ধর্মীয় এটাওটা করে কিছু টাকা রোজগার হয় ওর। পাড়ার বাচ্চাদের কায়দা-সিপারা পড়িয়েও কিছু আসে মাসের শেষে।
বছর পাঁচেকের মধ্যে এক ভিন্ন মানুষে পরিবর্তিত হয় গোলা কাদের। পাড়ার এক মেয়ের সঙ্গে ওর বিয়ের প্রস্তাব দেয় ইমাম সাহেব। বিষয়টা ভাবার জন্য কিছুদিন সময় নেয় সে। তারপর জানায়-যে আগে হজ করে আসবে সে। এরপর শুরু করবে নতুন জীবন। ইমাম সাহেবও খুশি হয়ে সায় দেয় ওতে। গ্রামটাতে ঢোকার পর এ-ক’বছর অন্য কোথাও বেরোয়নি কাদের মোল্লা। হজের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও ব্যাংকের ঝামেলা প্রভৃতি সারতে শহরে আসে। মনে পড়ে ওর আখড়া থেকে পালিয়ে মফস্বলের এ-শহরটায় এসে থেমেছিল সে। হোটেলে থাকার ঝুঁকি না নিয়ে গ্রামের ওই মসজিদটা খুঁজে বের করেছিল, যা পালটে দিয়েছিল ওর জীবন। এখন দেখেশুনে ভালো একটা হোটেলে ওঠে সে। আশপাশটা এত দ্রুত বদলে গেছে-যে চেনা যায় না। দালানকোঠা যা উঠেছে তার চেয়ে বেশি হয়েছে নোংরা ও ময়লা আবর্জনা। ভিক্ষুকের সংখ্যা বেড়েছে অনেক। রাস্তায় হাঁটা যায় না। যে গাইতে জানে না সেও ধরা গলায় গান গায় : দেন গো বাবা দেন গো মা, এক পয়সায় সত্তর পয়সা,/ আল্লার গরে রইবো জমা, আখেরে সব মিলবো গো মা,/ দেন গো বাই দেন গো বইন, লুলা ফকির আত পাতছইন।
এসব এড়িয়ে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব শহরের সব কাজ শেষ করার চেষ্টা করে সে। অতিরিক্ত একটু সময়ও এখানে কাটাতে চায় না। অথচ মনে করতে পারে ওদের কৈশোরে ওর বয়সের ছেলেরা বায়না ধরত শহরে আসার জন্য। হজের আবেদনের জন্য ছবি ওঠানোর পর ওটা দেখে চমকে ওঠে সে। মনে হয় না আর কারো পক্ষে ওকে চেনা সম্ভব। পূণ্যযাত্রার প্রয়োজনীয় সব কাজ শেষ করে হাজি দলের সঙ্গে বিমান বন্দরে উপস্থিত হয় সে। কাউন্টারের আনুষ্ঠানিকতা সব ভালোভাবেই এগোতে থাকে। উর্দিপরা এক কর্মকর্তার চোখে হঠাৎ চোখ পড়তেই চমকে ওঠে সে নিমেষমাত্র। তারপর কি হয় কে জানে। ওকে আর কোথাও দেখতে পায় না সে।
বিমান বন্দরের লাউঞ্জ অতিক্রম করার সময় সে দেখে একদল পুলিশ ঘিরে ফেলেছে ওকে। ক’মুহূর্ত নেয় সে সিদ্ধান্ত নিতে। তারপর এতদিনের মোহাম্মাদ আব্দুল কাদের অথবা কাদের মোল্লা আবার সেই পুরোনো গোলা কাদের হয়ে ওঠে। পুলিশ কিছু বুঝে ওঠার আগেই বিদ্যুতের মতো ওদের ঘেরাও ভেঙ্গে কাউন্টারের বাইরে ছুটে আসে সে। বিমান বন্দরের দরজা প্রায় ভেঙে বাইরে আসতেই দেখে যাত্রী নামাচ্ছে একটা স্কুটার। ওর ধাক্কায় ছিটকে পড়ে ড্রাইভার। স্কুটার নিয়ে ঢাকা শহরের যানজটের ভেতর সেঁধিয়ে যায় পলকের ভেতর। পেছন থেকে একটা পুলিশ ভ্যান এগিয়ে আসতে দেখে। ওটাকে অনেকটা পিছনে ফেলে এগিয়ে যেতে সক্ষম হয় সে। রাস্তার পাশের এক যাত্রীর ইশারা পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে থেমে পড়ে গোলা কাদের পেছনের পুলিশ ভ্যানের ওরা ভাবতে পারেনি-যে পালাতে থাকা কেউ রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ভাড়া ঠিক করবে। লোকটার সঙ্গে দরদাম না করেই পেছনে বসায়। যাত্রীসহ একটা স্কুটারকে সন্দেহ করে না পুলিশগুলো। ঢাকা শহরের ক’জন পুলিশই বা চেনে ওকে!
গোলা কাদের আবার ফিরে আসে ওর ভয়ঙ্কর আস্তানায়। হাতে থাকা টাকাগুলো দিয়ে প্রথমেই কেনে একটা কাটা রাইফেল। পুরোনো স্যাঙাতদের কয়েকজনকে খুঁজে আরেকটা দল গড়ার চেষ্টা করে সে। কিছুদিনের মধ্যে আবার ফিরে পায় ওর গোলা কাদের নামটা। কিন্তু এবার কোনোকিছুই আর ভালোভাবে এগোয় না। ফেলে আসা অথবা হারিয়ে ফেলা সময়টাকে ফিরে পাওয়া সম্ভব না। অনাগত দিনগুলোর জন্য চরম এক হতাশা নেমে আসে ওর ভেতর। আর কি করতে পারে সে? বুঝতে পারে না প্রশ্নটা কার উদ্দেশ্যে করা। নিজের, না সমাজের? সংশোধনের কোনো পথ এখানে নেই। অকরুণ এক অসহায়তায় ডুবে অতঃপর সে অপেক্ষা করতে থাকে একটা অপঘাতের জন্য। মৃত্যুভয়টা এখন আর নেই ওর। গোলা কাদেরের জীবন থেকে দূরে সরে গেছে সেসব। দাড়ি চেঁছে ফেলেছিল আগেই। দশাসই একজোড়া গোঁফ গজিয়ে ওঠার জন্য আরো কিছুদিন অপেক্ষা করে সে।
. . .

. . .

লেখক পরিচয় : কামাল রাহমান : এখানে অথবা ওপরের ছবিতে চাপুন
. . .


