দেখা-শোনা-পাঠ - পোস্ট শোকেস

নূর-ই পাক ‘আনাহিতা’ ও নির্মল জল ‘সরস্বতী’

Reading time 4 minute
5
(13)

মোল্লার তখনো ইরানে জাঁকিয়ে বসেনি। বিংশ শতাব্দীর পঞ্চাশ থেকে সত্তর দশক বিশ্বজুড়ে অভাবনীয় বটে। উপনিবেশ থেকে মুক্তি, সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব, গণ আন্দোলনে মুখর থেকেছে মানব-পৃথিবী। ভিয়েতনাম যুদ্ধের চাপ পরিবেশকে তপ্ত রেখেছিল। মার্কিন দেশে হিপি ও রক কালচারের অকল্পনীয় উত্থান দেখছিল বিশ্ব। আরো ছিল সামরকি জান্তাদের গদি দখল ও দেশে-দেশে দুর্ভিক্ষের হিড়িক। ফ্রান্সের পারি শহরে ছাত্র আন্দোলন দুর্বার হয় ওই সময়টায়;—যার আভাস গদার তাঁর লা শিনোয়াজ-এ দিয়েছিলেন আগেভাগে। ওপার বাংলায় চারু মজমুদারের নকশাল ততদিনে ছড়িয়ে পড়েছে লেলিহান। মহাশ্বেতা দেবীর হাজার চুরাশির মা লেখার মঞ্চ এভাবে প্রস্তুত হচ্ছিল।

দীর্ঘ দিনের প্রবঞ্চনার চড়া মাশুল দিয়ে অবশেষে আমাদের দেশটাও এই ফাঁকে জন্ম নিলো! উত্তাল কালপর্বে ইরান ছিল মুক্ত। ইরানিরা মুক্ত পাখি। রাজনীতি নিয়ে চাপা অসন্তোষ, শাহ রেজিমের বিরুদ্ধে সত্য-মিথ্যায় বোনা ক্ষোভ-বিক্ষোভ চলছিল যদিও। আর ছিল নিজের চেহারা লুকিয়ে রাখতে ‘পাকা অতিশয়’ মোল্লাদের প্রতি মানুষের আলগা সহানুভূতি! মানুষকে তারা তখন এই আশ্বাস দিচ্ছে,—ইরানকে ইরানের মতো থাকতে দেওয়া হবে; কিন্তু দুর্নীতি, বিরোধী মত দমন, আর মার্কিনীদের তারা দেশছাড়া করেই ছাড়বে। হায় বিধি! মুক্তপাখি ইরানিরা কি আর জানত, তারা প্রতারিত হতে চলেছে! খাল কেটে কুমরি ডেকে আনার সর্বনাশ ঘটতে যাচ্ছে অচিরে!

সে যাকগে, যে-সময়ের কথা বলব বলে বসেছি, তা ওই ইরানে মোল্লাতন্ত্র চালু হওয়ার সাত-আট বছর আগেকার ঘটনা। রক কালচারের স্রোত ইরানে বইছে প্রবল। পারস্য সংস্কৃতির মধ্যে মিশছে আটলান্টিকের ওপার থেকে আছড়ে পড়া রক বিস্ফোরণ। সংস্কৃতি বিনিময়ী হচ্ছিলেন মনের সুখে। একটি রেকর্ড বেরোয় তখন। গ্রামোফোন রেকর্ডের গোল চাকতির জোয়ার ততদিনে স্তিমিত হতে চলেছে। ফিতায় বাঁধা ক্যাসেট বাজারে এসে গিয়েছিল। সেই বছর বা ১৯৭২ সনের দিকে TDK ক্যাসেটে মোড়ানো একটি অ্যালবাম পারস্য ও ভারতবর্ষকে এক মোহনায় স্মরণ করাতে বাজারে আসে। প্রাচীনা ফার্সি ও সংস্কৃতর মধ্যকার মিসিং লিংক যেন নতুন করে ধরা দিলো আবার!

যতীন্দ্রমোহন চট্টোপাধ্যায়ের অতি সুখপাঠ্য ভূমিকা সমৃদ্ধ জেন্দাবেস্তার বাংলা তরজমা যারা পাঠ করেছেন, তারা নিশ্চয় জানবেন,—প্রাচীন ভারত ও পারস্যের সংযোগ কোন পর্যায়ের নিবিড় ছিল অতীতে। বৈদিক ভারতের পুরাণগাঁথায় মনোরম দেবাসুরের সঙ্গে কীভাবে মোহনা রচনা করেছিল ধরায় প্রথম একলা ঈশ্বরের বন্দনায় মুখর জরথুস্ত্র গাঁথা। গানের অ্যালবাম এই সংযোগকে মনে করায় সুতীব্রভাবে! রবি ঠাকুর যে-বছর পারস্যে গেলেন, সংবর্ধিত হলেন ও বক্তিমা রাখলেন, সেখানে নবি জরথ্রুস্তকে করেছিলেন স্মরণ। দ্য ভিডাইন সং অব জরথ্রুস্ত শিরোনামের ইংরেজি অভিভাষণ কোনো একদিন বাংলায় ভাষান্তর করেছিলাম আপন খেয়ালে। তার এক জায়গায় ঠাকুর বলছেন :

জরথুস্ত্র ছিলেন প্রথম অবতার, ধর্মকে যিনি গোত্রভুক্ত ঈশ্বরের একচ্ছত্র সংকীর্ণতা হইতে মুক্তি দিয়াছেন, নির্বাচিত মানুষের ঈশ্বর হইতে মুক্তি দিয়াছেন, এবং সর্বজনীন মানুষের জন্য তাঁহাকে প্রস্তাব করিয়াছেন। ধর্মের ইতিহাসে ইহা একটি বিরাট ঘটনা।

তিনি (জরথুস্ত্র) রাতের প্রহরী ছিলেন। পুবের দিকে মুখ করিয়া নিঃসঙ্গ পাহাড়চূড়ার উপর অবস্থান করিতেন, আর ঘুমন্ত পৃথিবীর প্রতি আলোর কাব্যগাথায় নিঃস্ব হইতেন;—যখন দিগন্তের প্রান্তভাগে ভোরের আভা দেখা দিতো। তিনি ঘোষণা করিলেন,—সত্যের সূর্য সকলের জন্য, যেন ইহার আলো দূর ও নিকটকে কাছে টানে। এরূপ বার্তা সর্বদা সেইসব লোকের বিরোধিতা উদ্রেক করায়, যাহাদের অভ্যাসগুলা নিশাচারী হইয়া পড়িয়াছে, আর তাহাদের কায়েমি স্বার্থ কেবল অন্ধকারের মধ্যেই নিবদ্ধ থাকে।

জেন্দাবেস্তার অনুবাদক যতীন্দ্রমোহন জানিয়েছিলেন বটে,—সংস্কৃত ‘স’ জরথুস্ত্রে এসে রূপ নিয়েছে ‘হ’-এ। জেন্দ-আবেস্তায় ‘হফত-হিন্দ’ কালের ধারায় রূপ নেয় ‘হিন্দ’-এ। আর ‘হিন্দ’ থেকে উদয় ‘হিন্দু’ শব্দটির। অনুরূপ,—জমদগ্নি প্রবল তেজস্বী তাপস ছিলেন আমরা জানি। তো এই জমদগ্নি মানে হলো যিনি অগ্নিকে ভক্ষণ করেন। জরথুস্ত্রও অনুরূপ অর্থে দ্যুতিমান। জরথ-উষ্ট্র,—যিনি আগুনকে জীর্ণ করেন।

আজকের ইরান প্রাচীন সময়ে ইলাবৃত নামে বিদিত ছিল। বেদের সূত্র বলছে, দেশটি তিনটি অঞ্চলে তখন বিভক্ত : পার্থব (Parthia), পর্শু (Persia) ও মাধ্য (Media)। তার মধ্যে পর্শু ছিল প্রধান। এই নামে একটি জাতির উদয় ঘটে সেখানে। ক্ষত্রিয় ধর্মে গরিয়ান ছিল সেই জাতি। আর পর্শু সংযোগ রাখছেন মহাভারত-এ বর্ণিলভাবে চিত্রিত পরশুরামের সঙ্গে। জরথুস্ত্র হলেন সেই নবি, যিনি বৈদিক ভারতে কালক্রমে প্রচলিত চারিবর্ণ প্রথাকে পারস্য থেকে করেছিলেন উৎপাটিত। কেবল ক্ষত্রিয়, এবং তারাই ইশ্বর আহুর মাজদার উত্তরসূরি। আর কোনো বর্ণে ভাগাভাগি হওয়ার নাহি প্রয়োজন।

সেই নবি জরথুস্ত্রের প্রচারিত বাণীর নির্যাস জেন্দাবেস্তা। একগুচ্ছ গাঁথার সমষ্টিতে বাঁধাই হয়ে আছে অসুর ওরফে ঈশ্বর আহুর মাজদার প্রতি তাঁর সমর্পণ, আর অশুভের সঙ্গে সংগ্রামের দৃঢ়তা। জরথুস্ত্র ধর্মে অগ্নি বড়ো পবিত্র, কারণ তা জীবনকে শুদ্ধ করে দহনে। পবিত্র,—এই প্রকৃতিবক্ষে ছড়ানো সকল প্রাণ। যেমন পবিত্র জল, যা হলো প্রাণের উৎসার। জরথুস্ত্রে জলদেবী হলেন আনাহিতা। ওদিকে, প্রাচীন ভারতে সরস্বতী নদীর মাহাত্ম্য আমরা জানি। দেবী সরস্বতীর মিথরঞ্জিত চরিত্রের সঙ্গে ইতিহাসের সংরাগ বলতে এই নদী সরস্বতী। নদীটির সঙ্গে পারস্যের ছিল নিবিড় সংযোগ।

গানের অ্যালবামে একটি গান জলদেবী আনাহিতা ও দেবী সরস্বতীকে একত্রে গেঁথে বন্দনা করেছেন শিল্পী। জরথুস্ত্র গাঁথার সঙ্গে মিশেছে সংস্কৃত মন্ত্র। প্রাচীন ফার্সিতে ‘নূর-ই পাক’ নামে বন্দিত হচ্ছেন জলদেবী আনাহিতা। সংস্কৃতে নির্মল জল নামে বন্দনা চলছে সরস্বতীর। ‘আবে হায়াত’ হলেন এই জলদেবী আনাহিতা, বৈদিক ভারতে তিনিই অমৃত জল সরস্বতী। বড়ো অপূর্ব বড়ো মনোহর এই পরিবেশনা। যা স্মরণ করিয়ে যায় আবারো,—দূর পারস্য একদা বিচ্ছিন্ন থাকেনি ভারতবর্ষ থেকে, না ভারতবর্ষ কখনো থেকেছে সুদূর পারস্য থেকে।
. . .

Ancient Iran Link to India: The Forbidden Chant of Anahita; Source: Beyond Conscious YTC

গানটির ইংরেজি ভাষান্তর Beyond Conscious-এর ইউটিউব চ্যানেল থেকে এখানে সংযুক্ত করছি।

Yazamaide … Aredvi Sura Anahita
(We worship … the pure, mighty Anahita)

Aum Aim Maha Saraswatyai Namah
(Om, salutations to the great Goddess Saraswati)

Yazamaide … Aredvi Sura Anahita-ye Paak
(We worship … the pure, mighty, and holy Anahita)

Aum Aim Maha Saraswatyai Namah
(Aum, salutations to the great Goddess Saraswati)

Raaz-e kohan… dar aab-haa
(The ancient secret… in the waters)

Iran o Hend… yek jaan-e maa
(Iran and India… our one soul)

Az kooh-e Qaaf… taa rood-e Sind
(From Mount Qaf… to the Indus River)

In ghesseh raa… beshno ze baad
(Hear this tale… from the wind)

Do naam-e zibaa, yek rood-e ravaan
(Two beautiful names, one flowing river)

Yek noor-e vahed, dar omgh-e zamaan…
(One unified light, in the depths of time…)

Anahita … Aum Saraswati!

Aab-e hayaat … Amrit Jal!
(Water of life … Nectar of immortality!)

Anahita … Aum Saraswati!

Noor-e paak … Nirmal Jal!
(Pure light … Pure water!)

Aredvi Sura … Maha Saraswati!

Maadar to-ee… cheshmeh to-ee
(You are the mother… you are the spring)

Dar taariki… sholeh to-ee
(In the darkness… you are the flame)

Aab-e ravaan… paakizeh jaan
(Flowing water… pure soul)

Naam-e to maand… dar in jahaan
(Your name remains… in this world)

Do naam-e zibaa, yek rood-e ravaan
(Two beautiful names, one flowing river)

Yek noor-e vahed, dar omgh-e zamaan…
(One unified light, in the depths of time…)

Anahita … Aum Saraswati!

Aab-e hayaat … Amrit Jal!
(Water of life … Nectar of immortality!)

Anahita … Aum Saraswati!

Noor-e paak … Nirmal Jal!
(Pure light … Pure water!)

Aredvi Sura … Maha Saraswati!

Anahita … Saraswati

Aab-e hayaat … Amrit Jal
(Water of life … Nectar of immortality)
. . .

… থার্ড লেন স্পেস-এ প্রাসঙ্গিক পাঠের জন্য নিচের লিংক চাপুন …

টাওয়ারস অব সাইলেন্স : ‘নীরবতায়’ সংগোপন যে-উত্তর

. . .

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 13

No votes so far! Be the first to rate this post.

thirdlanespace.com কর্তৃক স্বত্ব সংরক্ষিত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *