পোস্ট শোকেস - হাওরপুরাণ

কৈবর্তপুরাণ : সজল কান্তি সরকার

Reading time 9 minute
5
(18)

কৈবর্তপুরাণ

Fisherman-tales by Sajal Kanti Sarker; Sketch-I; Image Source: Colledted; @thirdlanespace.com

এলং মাছের তেলংতেলং দাড়কিনা দৌড়ানি
কৈ’য়া বেডায় ডাকতাছে খলা’ত যাইবায়নি\

শোনো শোনো দেশের লোক কৈবর্তপুরাণ
মাছ ধরিয়া যোগায় অন্ন জ্বিলে গায় গান\

জালে-জলে জীবন চলে কৈবর্ত জ্ঞাতি
হাওর-বিলে মাছ ধরে প্রথমও বসতি\

গাঙের পাড়ে বানায় খলা পুবদুয়ারি ঘর
খলায় খলায় বসত করে গড়ে না নগর\

খলার ভিতর জালের ঘর মাছেরও উঠান
খলাবেডি রউয়ের পেডি রান্দে গো বিরান\

বিরানের সম্বাসে কৈ’য়া জিব্বা লকলকায়
কত জাতের মাছ খায় ভাজা আর রসায়\

নিজের হাতে জাল বুনিয়া জালে বান্ধে বর
হিজল ডালের কাটা দিয়া বানায় মাছের ঘর\

গাঙ পাতালে গহিন জলে মাছেরও ডোয়ার
কৈবর্তরা মাছ ধরে জাল ফেলে উথার\

মাছের আশে গৈবীদোষে কত প্রাণ-যে যায়
তাবিজ-কবজ দিয়া তারা গৈবীদোষ কাটায়\

গৈবীদোষে প্রাণনাশে তিলক বৈদ্যর ছেলে
মনাই গাঙে বসত করে কুমিরেরও ছলে\

পোষে-মাঘে উঠে জেগে খাবারও খাইতে
যারে পায় তারে খায় মাঘ মাস্যিয়া শীতে\

মাঘ মাসে শীত আসে ডাইয়া বাতাস লৈয়া
কৈবর্তরা মাছ ধরে পানিতে ডুবাইয়া\

নিয়ম মেনে ধরে মাছ বংশ হয় না নাশ
গঙাচরণ পূজিয়া খায় মাছেরও গরাস\

মাছ ধরিয়া খায় সুখে নাতি-পুতি লৈয়া
খলাবেডি বরত করে গাঙের পাড়ে বৈয়া\

জাল যার জলা তার কৈবর্ত জামানা
অরানরাজ্য ছিল হাওর ছিল না খাজনা\

বিলাত থেকে আইল যখন জমিদার শাসন
মাছ ধরিতে খাজনা লাগে তেভাগা হয় পণ\

মাছ ধরিয়া খাইবে সুখে তারতো উপায় নাই
খাজনা লইয়া বিবাদ হইছে মরিছে বলাই\

প্রতিশোধের আগুন জ্বলে তুষের মতো গৈয়া
বলাইর শোকে মাছ ধরে না ভাটির যতো কৈ’য়া\

জমিদারের তলব জানায় উজির নাজিরগণ
মাছ ধরিতে দেখা দিল ভাসান আন্দোলন\

দিন যায় বছর যায় হয় না তাহার শেষ
জমিদারে জারি করে নতুন এক আদেশ\

সমাজ ডেকে বিধান দিল কর্মেতে দোষ নাই
শেখে দাশে মাছ ধরে জাতের বিচার নাই\

ইজারাদার প্রথা আইল মৎস্য আইন লৈয়া
কৈবর্তগণ বেগার খাটে জলদাস হৈয়া\

শেখে-দাশে ইজারা নেয় মাছেরও ময়াল
ভাত বেগারে মরে তাই কৈবর্ত ছাওয়াল\

কেহ কেহ ময়াল ছাড়ে দাসখত না মানিয়া
পেশার মায়ায় রইল কেহ নাতিপুতি লৈয়া\

Biro the Fisherman by Sanvi Sarker; Sketch; Image Source: Collected; @thirdlanespace.com

এক ছিল বীরোজাল্যুয়া কৈবর্তেরও নাতি
চৌদ্দপুরুষ সুখে কাটছে মাছে দিয়া মতি\

ভাটি গাঙে ছিল তাদের কৈবর্ত-ময়াল
আকালে-নিদানে মইল বংশের ছাওয়াল\

পিতা মইল ভাটি গাঙের দখল রাখতে গিয়া
মাতা মইল কলেরায় ঔষধ নাহি পাইয়া\

বীরোজাল্যুয়া একা হৈয়া কান্দে ঝারে-ঝারে
সকলে ছাড়িয়া গেলেও গাঙ ছাড়ে না তারে\

গাঙ ছাড়া বীরোজাল্যুয়ার স্বগণ নাই-যে কেউ
উথালি-পাথালি করে বুকভরা তার ঢেউ\

গাঙে পাগল করিল তাই বীরোজাল্যুয়ার মন
গাঙের জলেই মিশিল তার সাধেরও যইবন\

গাঙের পাড়ে বসত করে কৈন্যা এক সুন্দরী
জলের ঘাটে দেখা দিল রূপেরও মাধুরী\

গাঙের জলে ভাটির কৈন্যা করে-যে সিনান
আঁচলে ঝাড়িয়া চুল খোঁপা দেয় গো বান\

কী আচানক লাগে খোঁপা নাম জানে না কেউ
খোঁপার মাঝে বান্দা আছে টাঙ্গুয়া হাওরের ঢেউ\

কৃষ্ণবরণ নিরাই জলে হিজল-করচ হিয়া
এলং মাছের তেলং-তেলং কানাবগির বিয়া\

চিল উড়ে মাছ ধরে কউরা করে রাউ
বীরোজাল্যুয়া বড়শি বায় পানি উঠে নাউ\

বারে বারে পানি সেঁচে ঘাটে ভিড়ায় না
টোপ খাইয়া যায় চেলামাছে এলং ধরে না\

শাইত করে কানাবগি করচডালে বৈয়া
বীরোজাল্যুয়ার লাগে কু’শাইত আনমনা হৈয়া\

সুর্য ডুবে সন্ধ্যা হয় আঁধার নামে জলে
বীরোজাল্যুয়া মাছের আশায় থাকে গো নিরলে\

এক তাওয়ালে বড়শি বায় ঘাটের পানে চাইয়া
মনাইর মা জল ভরে যায় মনাই ঘরে থৈয়া\

কত ঢেউ-যে আসে-যায় গাঙের মধ্যি দিয়া
বীরোজাল্যুয়া ডুবে-ভাসে যইবন বিকাইয়া\

মাছের খাদে পইড়া জাল্যুয়া কত গালা খায়
গালার বিষে দেহ-যে তার নীল হৈয়া যায়\

দেহ তাহার বিষে যখন নীলকণ্ঠ রূপ ধরে
গাঙের পানি ফণা তুল্যিয়া উথাল-পাথাল করে\

যইবত নারীর কাঙ্খের কলসি গাঙে যখন ভাসে
এই-না কালে বীরোজাল্যুয়া থাকে মাছের আশে\

পানিখাউড়ি মাছ খাইয়া যায় গাঙের সীমা দিয়া
বীরোজাল্যুয়া পায় না গো ঠার মধ্যিগাঙ বৈয়া\

চান্দের ঠারে তারা গুইনা রাইতের হিসাব করে
পুন্নিচান আসমানে থইয়া পায় না খুঁজ্জিয়া তারে\

মনাই যদি হইত ঝিনাই গাঙেরও মাঝার
খুঁজ্যিয়া নিত মুক্তার খনি লক্ষ্মীরও ভাণ্ডার\

দিন যায় বছর যায় আশায়ও আশায়
মনাইর সাথে কইতে কথা অন্তরে পুড়ায়\

অন্তরেরও অন্তরযামী কিনা কাম করিল
গানের আসরে তাদের দেখা হৈয়া গেল\

Vatir Konna by Sajal Kanti Sarker; Image Source: Collected; @thirdlanespace.com

মনাইরে দেখিয়া জাল্যুয়ার আহা কী-যে সুখ
গানে গানে জুড়ায় তার অন্তরের অসুখ\

রাই বিরহের গান জাল্যুয়া মারে টান
গান শুনিয়া মনাইর মনে করে গো আনচান\

নয়নে নয়ন রাখি বাণ বরিষনে
অধরে অধরে আলাপ করিল গোপনে\

মনের কথা রইল গোপন বলতে নাহি পায়
বিনা দোষে পাড়া-পড়শি কলঙ্ক রটায়\

মনাইর প্রেম হৈল প্রকাশ ভাটিরও ময়াল
মনাইর বাপে জামাই আনে গিরস্ত ছাওয়াল\

দিনক্ষণ দেখিয়া বাপে ঠিক করিলো বিয়া
গীত গায় কৈন্যার জেডি গুয়া মুখে লৈয়া\

বিধির লিখা যায় না দেখা থাকে না বড়াই
গৈবীদোষে মরল পতি বিধবা মনাই\

পতিহারা কপালপুড়া মনাইর কেহ নাই
কলঙ্কিনী হৈল মনাই সমাজে নাই ঠাঁই \

ঘরবাড়ি ছাড়িয়া মনাই বেউদ্দিশে যায়
কারো ঘরে দাসীবান্দি হৈতে নাহি চায়\

কান্দে মায়ে কান্দে বাপে মনাইরে খুঁজিয়া
যারে পায় তারে জিগায় মনাইর কথা কৈয়া\

এই শুনিয়া বীরোজাল্যুয়া মনে ভাবে অতি
কী কারণে কলারতলে মইল মনাইর পতি\

পতি নাই গতি নাই সমাজের বিধান
এই ভাবিয়া বীরোজাল্যুয়ার মন করে আনচান\

কত সুরুজ ওঠে গাঙে কত সুরুজ ডুবে
বীরোজাল্যুয়ার দিন ফুরায় না কপালপোড়া ভবে\

বীরোজাল্যুয়া ছাড়ে পেশা করে না তো কাজ
পেশা-হারা জিতে মরা কৈবর্ত সমাজ\

আদি পেশা বেহাত দশা মাছেরও আকাল
মনাইর খুঁজে বীরোজাল্যুয়া ছাড়িল ময়াল\

পন্থে হাটে কণ্ঠে গায় কৈবর্তপুরাণ
যে-গাঙে ডুবিয়া মনাই করিত সিনান\

বীরোজাল্যুয়া প্রেমের মরা গাঙের বড়াই নাই
কৈবর্তরে গালা দিছে প্রেমেরও মনাই\

বীরোজাল্যুয়া বিষে কাতর সবারে যাই কৈয়া
মনাই নামের ভাটিগাঙে সর্বস্ব হারাইয়া\

মনাই এখন মনাই নাই পানিতে নাই মাছ
দীনবন্ধু গাঙ ছাড়ে না গাঙেই করে বাস\

দিশা :
এলং মাছের তেলংতেলং দাড়কিনা দৌড়ানি
কৈ’য়া বেডায় ডাকতাছে খলা’ত যাইবায়নি\

. . .

সংযুক্তি : একনজরে কৈবর্ত-কাহন

Fisherman-Tales by Sajal Kanti Sarker; Sketch-2; Image Source: Colledted; @thirdlanespace.com

ক. শাব্দিক বুৎপত্তি ও ব্যাখ্যা

তথ্যসূত্র-১ : হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রণীত ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ

কৈবর্ত্ত : দাশ, ধীবর, কেওট, জেলে। শূদ্রার গর্ভে ক্ষত্রিয়-জাত সঙ্কর জাতিবিশেষ ( ব্রহ্মবৈবর্ত্তপুরাণ )। আয়োগবীর গর্ভে ব্রাহ্মণ-জাত নৌকৰ্ম্মজীবী ‘দাশ’ নামক জাতি; আর্য্যাবর্তে ইহাদের নাম ‘কৈবৰ্ত্ত’ (মন্টু ১০.৩৪ )। কৃষিজীবী বা ব্যবসায়ী জাতিবিশেষ, হেলে কৈবর্ত্ত। কেওট কৈবর্ত্ত। উভয় জাতির মূল নাম এক হইলেও, বৃত্তি-অনুসারে মৎস্যজীবী কৈবর্ত্ত ‘কেওট, বা জেলে কৈবর্ত্ত’ এবং কৃষিজীবী কৈবর্ত্ত ‘হেলে কৈবর্ত্ত’।

তথ্যসূত্র-২ : কলিম খান ও রবি চক্রবর্তী প্রণীত ‘বঙ্গীয় শব্দার্থকোষ

১. কেবৰ্ত্ত + অ। (ব.শ)।

২. কে (=দিশাগ্রস্ত গতিশীল কারক) বৃত্তি যাহার, তজ্জাত।

৩. দাশ, ধীবর, কেওট, জেলে। [দ্রষ্টব্য : হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রণীত বঙ্গীয় শব্দকোষ। ]

৪. জাতির উল্লেখ করতে গ্রামবাংলায় শব্দটি আজও ব্যবহৃত হয়।

৫.যে হাল বা লাঙ্গল চালায়, চাষ করে, তাকে হেলে কৈবর্ত্ত এবং যে মাছ ধরে বিক্রি করে, তাকে জেলে কৈবর্ত্ত বলে। কিন্তু মানুষ তো আর হুট করে ‘চলরে ভাই, আজ থেকে আমরা চাষ করতে যাই, মাছ ধরতে যাই’—এভাবে কিছুই ঘটেনি, ঘটতেও পারে না। একটি বিশেষ পেশায় যাওয়ার জন্য, তদনুসার জীবনযাত্রা নির্বাহের জন্য মানুষকে কী পরিমাণ ঐতিহাসিক উত্তরাধিকারের বন্ধন এবং মানসিক ও সামাজিক বাধা ও বিধিনিষেধ পেরিয়ে যেতে হয়, তা একালের অ্যাকাডেমির পক্ষে অকল্পনীয়। সতীনাথ ভাদুড়ীর ঢোঁড়াই চরিত মানস গ্রন্থে রামায়ণের যুগের ‘তাঁতি’দের জীবনের যে-ধ্বংসাবশেষ দেখানো হয়েছে, সেখানে তার কিঞ্চিৎ বর্ণনা আছে।

কৈবর্ত্তদেরও সেইরকম সুদীর্ঘ কষ্টকর উত্তরাধিকার রয়েছে। তিতাস একটি নদীর নাম গ্রন্থে তার ছায়ার ধ্বংসাবশেষ দেখা যায়। জনসাধারণকে যখন ‘জল’ বলা হত, তাদের মধ্যে যে-দু-চারজনের সামান্য ব্যক্তিগত সম্পদ জমেছে এবং তাদের ‘মৎস্য’ বলার সূত্রপাত সদ্য সদ্য হয়েছে, যখন টাকার কুমির ও রাঘব বোয়ালেরা সমাজের মঞ্চে আবির্ভূত হয়েছে, সেই সময় ‘যে-মৎস্য (ব্যক্তিমালিক) অন্য মৎস্যদের (ব্যক্তিমালিকদের) হিংসা করে’ তাদের বলা হত দাশ।

তারও আগে এই দাস ছিল আদি সদাশয় অসুর বা দেবতাদের যৌথ নাম। তারপরে তারা কে-বৃত্তি গ্রহণ করে কেকয় হয়ে যায়। একসময় তাঁরাই ছিলেন বরণীয় ধীসম্পন্ন ধ্যানসাধনকারী ধীবর। মহাভারতের সূচনাতে এই ধীবরের কন্যার ভূমিকা অপরিসীম। স্বয়ং ব্যাসদেব এই ধীবরকন্যার পুত্র। ধীবরকে বাদ দিয়ে মহাভারতের কল্পনাও অসম্ভব। এই অগ্রণী জাতি বহু বিপর্যয় পেরিয়ে, মৌলবাদী বৈদিক সভ্যতার বহু বিধিনিষেধ পেরোনোর দায়ে শাস্তি পেয়ে পেয়ে আজ তার বর্তমান অবস্থানে পৌঁছেছে। এদের একটি বড় অংশ পরবর্তীকালে বৈষ্ণব ও মুসলমান হয়ে যায়।
. . .

Fishing Net in Haor Region by Sajal Kanti Sarker; Image Source: Collected; @thirdlanespace.com

খ. ঐতিহাসিকতা

তথ্যসূত্র : কৈবর্ত বিদ্রোহ : বাংলার ইতিহাসে প্রথম নিম্নবর্গের সক্রিয় প্রতিবাদী অভ্যুত্থান : গোপাল চন্দ্র সিনহা; অভিক্ষেপ

‘কৈবর্ত’ শব্দটির প্রাচীনত্ব সম্পর্কে সংক্ষেপে উল্লেখ করা বাঞ্ছনীয় হবে। মৌর্যোত্তর যুগের রচনা ‘মনুস্মৃতি’-তে ‘কৈবর্ত’ নামটির উল্লেখ আছে এবং মনু বলেছেন যে কৈবর্তরা ছিল নৌকার মাঝি। বিষ্ণুপুরাণে কৈবর্তদের বলা হয়েছে ‘অব্রহ্মণ্য’ (ব্রাহ্মণ্য সমাজ-সংস্কৃতি থেকে বহির্ভূত)। নীহাররঞ্জন রায় মন্তব্য করেছেন-যে, এই দুটি প্রাচীন সাক্ষ্য থেকেই বোঝা যাচ্ছে কৈবর্তরা কোনো আর্যপূর্ব কৌম বা গোষ্ঠী ছিলেন এবং তাঁরা ক্রমে আর্য সমাজের নিম্নস্তরে স্থান লাভ করেছিলেন। আবার কয়েকটি বৌদ্ধ জাতকের গল্পে মৎস্যজীবীদের উল্লেখ করা হয়েছে ‘কেবত্ত’ (কৈবর্ত) হিসেবে। গুপ্তযুগের প্রায় সমকালীন লেখক অমরসিংহ তাঁর ‘অমরকোষ’-এ ধীবরদের কৈবর্ত হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এর অনেক পরবর্তীকালে কৈবর্তদের সঙ্গে মাহিষ্যদের সংযোগের বিষয়টি লক্ষ করা যায়। বর্তমানে কৈবর্তরা বাংলাদেশের শান্তিপ্রিয় ভাগচাষী ও কৃষি শ্রমিক।
. . .

Dhibar (Dibbok) Victory Monument; Naogaon District, Bangladesh; Image Source: Wikipedia

গ. ঐতিহাসিক বিদ্রোহ ও গণসংগ্রামে সম্পৃক্তি

বরেন্দ্র বিদ্রোহ/ কৈবর্ত বিদ্রাহ : সময়কাল খৃস্টাব্দ ১০৭৫। বরেন্দ্র, দিনাজপুর ও বঙ্গ (বর্তমান বাংলাদেশ)-জুড়ে বিস্তৃত পাল রাজবংশের শাসনামল চলাকালীন সময়ে বিদ্রাহটি সংঘটিত হয়। কৈবর্ত সামন্ত রাজা দিব্যক ওরফে দিব্য-র নেতৃত্বে পাল রাজবংশের উত্তরপুরুষ রাজা দ্বিতীয় মহীপালের বিরুদ্ধে অসন্তোষ দানা বাঁধে। রাজ্যজুড়ে অরাজকতা/ মাৎস্যন্যায়ের অনুমান করেন অনেক ঐতিহাসিক।

সাড়ে চারশো বছর স্থিত পাল রাজবংশে সাম্রাজ্যের আদিপুরুষ গোপাল ও তাঁর উত্তরসূরি নৃপতিগণের মধ্যে ধর্মপাল, দেবপাল ও প্রথম মহীপালের শাসনামলে পাল সাম্রাজ্য সংহত ও সম্প্রসারিত হওয়ার পাশাপাশি উৎকর্ষের শিখরে ওঠে। রাজা দ্বিতীয় মহীপালের সময়ে এসে ছন্দটি বিঘ্নিত হয়। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী আবিষ্কৃত রামচরিত অনুসারে বঙ্গীয় অঞ্চলে ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলা কৈবর্ত সম্প্রদায় নাকি বৈষম্য ও নির্যাতনের শিকার হয়েছিল তখন। রামচরিত-এর মতো সাহিত্যিক কল্পকাহিনি বিষয়ে ইতিহাসবিদগণের মধ্যে অবশ্য মতভিন্নতা রয়েছে :

রমেশচন্দ্র মজুমদাররাম শরণ শর্মার মতো প্রখ্যাত ইতিহাসবিদগণ রাজা দ্বিতীয় মহীপালের সময় কৈবর্ত বিদ্রোহ সংঘটিত হওয়ার পেছনে কেন্দ্রীয় শাসনের দুর্বলতা ও রাজবংশে ক্ষমতা নিয়ে আভ্যন্তরীণ কোন্দলের ভূমিকাকে বড়ো করে দেখেছেন। এর জের ধরে রাজ্যের ওপর অখণ্ড নিয়ন্ত্রণ বিঘ্নিত হচ্ছিল। বিভিন্ন অঞ্চলসীমায় কেন্দ্রীয় শাসনের অনুগত রাজন্যরা তখন বিদ্রোহের চেষ্টা করেছেন। পাল শাসনামলে এরকম বিদ্রোহের ঘটনাকে সাম্রাজ্য সম্প্রসারণ ও এর অখণ্ডতা বজায় রাখার প্রেক্ষাপট থেকে স্বাভাবিক ঘটনা বলে তাঁরা ব্যাখ্যা করেছেন। কৈবর্ত বিদ্রোহ এরই ধারাবাহিকতায় ঘটেছিল বলে অনেকে মত দিয়েছেন। রমেশচন্দ্র একে সামন্ত বিদ্রোহ ও রোমিলা থাপার কৃষক বিদ্রোহ রূপে ব্যাখ্যা করেছেন। অন্য ঐতিহাসিকরা সামন্তপ্রথায় রাজস্ব আরোহন নীতির দুর্বলতা ও ব্রাহ্মণদের অযাচিত পৃৃষ্ঠপোষকতাকে বিদ্রোহ দানা বাঁধার পেছনে কারণ বলে গণ্য করে থাকেন।

নেপথ্য কারণ যাই থাকুক, কৈবর্ত সমাজের মুখপত্র রূপে রাজা দ্বিতীয় মহীপালকে হত্যা করে বরেন্দ্র তথা একালের রাজশাহীর পরিসীমাভুক্ত অঞ্চলগুলোয় রাজত্ব কায়েম করেন দিব্য। তিন পুরুষ পরম্পরায় বরেন্দ্র অঞ্চলজুড়ে কৈবর্ত শাসন অর্ধ শতাব্দী পেরিয়ে আরো কিছুকাল অব্যাহত থাকে। তৃতীয় কৈবর্ত শাসক ভীমের সময় তা পূর্ণতা লাভ করেছিল। ভীমের জনপ্রিয়তা ও উত্থানভয়ে ভীত পাল রাজবংশের কেন্দ্রীয় শাসক রামপাল তাকে উৎখাত করলে কৈবর্ত শাসনের ইতি ঘটে।

মোটামুটি অর্ধ শতাব্দী ধরে বরেন্দ্র অঞ্চলে শাসন কায়েম রাখা ব্যতিক্রম এই শাসনকে নিম্নবর্গ বা সাব-অল্টার্নদের সফল উত্থান রূপে অনেক ঐতিহাসিক বিবেচনা করে থাকেন। মহাশ্বেতা দেবী হয়তো সে-কারণে তাঁর কৈবর্ত খণ্ড উপন্যাসের ভূমিকাসূত্রে একে দেশজ সংস্কৃতি ও ক্ষমতাকাঠামোর অনন্য নজির হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, শাসকাল লম্বা সময় ধরে স্থায়ী হলে নগর সভ্যতায় নিম্নবর্গীয় সংস্কৃতির বিবর্তন ও রূপরেখার পরিষ্কার ছবি ও কাঠামো আমরা পেতাম, যেটি ভীমের পতনের মধ্য দিয়ে পরে আর মাথা তুলতে পারেনি।

কৈবর্ত বিদ্রোহ ছাড়াও ইংরেজ শাসনামলে তেভাগা ও ভাসান আন্দোলনে কৈবর্ত সম্প্রদায়ের সম্পৃক্তি বা অংশগ্রহণ ছিল যুগান্তকারী। বাংলায় অন্যতম বৃহৎ বিদ্রোহ হিসেবে গণ্য তেভাগায় কৃষক সমাজের সঙ্গে হেলে কৈবর্ত সম্প্রদায় যোগ দিয়েছিলেন। একইভাবে হাওর অঞ্চলে ভাসান আন্দোলনেও কৈবর্তদের সম্পৃক্তি চোখে পড়ার মতো ঘটনা ছিল।
. . .

Angling by Safiuddin Ahmed (1983); Painting Source: Collected; Credit: wikiart.org

ঘ. আলোচিত ও গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যিক উৎসে কৈবর্ত-জীবন

তথ্যসূত্র : ইন্টারনেট ও বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে কৈবর্ত-জীবনসংগ্রাম : হরিশংকর জলদাস

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় : পদ্মানদীর মাঝি (১৯৩৬)
অমরেন্দ্র ঘোষ : চরকাশেম (১৯৪৯)
অদ্বৈত মল্লবর্মণ : তিতাস একটি নদীর নাম (১৯৫৩)
সমরেশ বসু : গঙ্গা (১৯৫৭)
সত্যেন সেন : বিদ্রোহী কৈবর্ত (১৯৬৯)
সাধন চট্টোপাধ্যায় : গহিন গাঙ (১৯৮০)
শামসুদ্দীন আবুল কালাম : সমুদ্র বাসর (১৯৮৬)
মহাশ্বেতা দেবী : কৈবর্ত খণ্ড (১৯৯৪)
ঘনশ্যাম চৌধুরী : অবগাহন (২০০০)
শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় : গঙ্গা একটি নদীর নাম (২০০২)
জলপুত্র : হরিশংকর জলদাস (২০১২)
জল ও জালের তরঙ্গ : প্রশান্ত মৃধা (২০১৪)
মহি মুহাম্মদ : ময়নাদ্বীপ (২০১৪)
. . .

Nonajoler Kabbo Movie Trailer by Rezwan Shahriar Sumit; Source: mypixelstory YTC

ঙ. কৈবর্ত/ জেলে জীবনধারাকে উপজীব্য করে নির্মিত দর্শক নন্দিত/ আলোচিত চলচ্চিত্র

তথ্যসূত্র : ইন্টারনেট

নদী ও নারী : সাদেক খান (১৯৬৫)
(হুমায়ুন কবীরের উপন্যাস ও মুর্তজা বশীরের চিত্রনাট্য অবলম্বনে নির্মিত)
তিতাস একটি নদীর নাম : ঋত্বিক কুমার ঘটক (১৯৭৩)
(অদ্বৈত মল্ল বর্মণের বহুপঠিত উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত)
পদ্মা নদীর মাঝি : গৌতম ঘোষ (১৯৯৩)
(মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালজয়ী উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত)
রূপসা নদীর বাঁকে : তানভীর মোকাম্মেল (২০২০)
(নির্মাতা তানভীর মোকাম্মেলের কাহিনি ও চিত্রনাট্য অবলম্বনে নির্মিত)
নোনাজলের কাব্য : রেজওয়ান শাহরিয়ার সুমিত (২০২১)
(নির্মাতা রেজওয়ান শাহরিয়ার সুমিতের চিত্রনাট্য অবলম্বনে বাংলা ও ফরাসি ভাষায় নির্মিত যৌথ প্রযোজনা)
হাওয়া : মেজবাউর রহমান সুমন (২০২২)
(মেজবাউর রহমান সুমন, সুকর্ণ শাহেদ ধিমান ও জাহিন ফারুক আমিনের চিত্রনাট্য অবলম্বনে নির্মিত)
. . .

Boat Motif by Sajal Kanti Sarker; Image Source: Collected; @thirdlanespace.com

… ‘হাওরপুরাণ’ বিভাগে ‘পুরাণ’ বিষয়ক অন্যান্য রচনা পড়তে দেখুন …

বন্দনা গানে হাওরপুরাণ : সজল কান্তি সরকার

ভাটপুরাণ : সজল কান্তি সরকার

বান্দিপুরাণ : সজল কান্তি সরকার

. . .

লেখক পরিচয় : সজল কান্তি সরকার : ছবি অথবা এই লিংক চাপুন

. . .

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 18

No votes so far! Be the first to rate this post.

thirdlanespace.com কর্তৃক স্বত্ব সংরক্ষিত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *