পোস্ট শোকেস - হাওরপুরাণ

নাইওর : কামাল রাহমান

Reading time 7 minute
5
(6)
Uki by Patua Quamrul Hassan; Painting Source: Collected; Google Image

হেমন্তে শনির হাওরের পানি শুকিয়ে খটখটে মাটি দেখা দেয়। অথচ হাওরকন্যা কুলসীর চোখের কফোঁটা জল আর শুকোয় না। ভাটিদেশের অজস্রধারাবর্ষী বাদলদিনের করুণ আষাঢ়ের তৃতীয় হপ্তায় যখন বাড়ির কুকুরটাও দাওয়া ছেড়ে উঠোনে নামে না তখন ঘর ছাড়তে হয় সারাক্ষণ কাঁদতে থাকা ঐ মেয়েটাকে। আকাশের কাজল কালো মেঘ হাওরের ধূসর পানির সঙ্গে মিশে দৃষ্টিকে সামান্য কয়েক গজ শূন্যতার ভেতর সীমিত করে রাখে।

ছোট্ট একটা কোশা নৌকো বাড়ির ভিটিতে ভিড়া মাত্র মেয়েটা গোঁ ধরে, ‘আমি যাইতাম নায়, মাইয়ো।’

‘হারা রাইত তরে কিতা বুজাইরাম। যাইতায় নায় তো খাইবায় কিতা। পেডে কুনু খানি আছেনি?’

খাবারের কথা ওঠায় মেয়েটার কান্না আরো বেড়ে যায়। বৃষ্টির সঙ্গে বাতাসের বল্গাহীন ঝাপটায় ব্যাকুল ঢেউগুলো নৌকোটাকে পিটিয়ে চলে ধুমধাম। অনবরত ছেঁচেও খোল থেকে বৃষ্টির পানি কমানো যায় না। দুজন মাল্লা পালা করে দাঁড় টানে আর হাল ধরে। বেলাবেলি যেয়ে পৌঁছাতে হবে জেলা শহর সুনামগঞ্জে। প্রতিবার দাঁড় টানার সময় দাঁড়ের বাঁশ নৌকোর কাঠে ঘঁষা খেয়ে অদ্ভূত এক কিচকিচে শব্দ ওঠায়। জলের ছলাৎ ছলাৎ ধ্বনির সঙ্গে মিশে অদ্ভুত ঐ শব্দ বাতাসে ধাক্কা খেয়ে এক করুণ ছন্দের সৃষ্টি করে :

যাইতাম নায়, যাইতাম নায়…

নৌকোর আরো একজন আরোহী, কুলসীর দূর-সম্পর্কের নানি, শহরের বাসায় ওকে পৌঁছে দিয়ে এই নৌকোতেই ফিরে আসবে আবার। সম্পর্কে নানি হলেও মধ্যবয়সী এই মহিলা শহুরে জীবন-যাপন করলে অনায়াসে যৌবন ধরে রাখতে পারত। গাট্টাগোট্টা শরীরের বাঁধুনি বেশ মজবুত। হেঁওতা মাসে ধান সামলানোর জন্য গাঁয়ের সম্পন্ন বাড়িগুলো থেকে ওর ডাক পড়ে ঘন ঘন। বর্ষার মওসুমে অভাবের তাড়নায় পেটে যখন সবারই ভাতের টান তখনও সে পানসুপারির বিলাসিতা ছাড়তে পারে না। লালপাড় ঘন বেগুনি রং শাড়িতে নৌকোর ভেতর ওকে মনে ধরে কমবয়েসী মাঝিটার। সম্পর্কে ওর নাতি ঐ ছোঁড়া। কতক্ষণ পরপর ভেজা শরীরে নৌকোর ছইয়ের ভেতরে ঢুকে নানিকে বলে ‘বিড়িডা দরাইয়া দেও গো নানি’।

Haorpuran-1: Conceptaul Paintings on Watery Lowland, Bangladesh; Original Photography Credit: BD News 24

বিড়ি ধরিয়ে হাতে দিলে লম্বা একটা টান মেরে ধোঁয়া উগড়ে দেয় ওর চোখে মুখে। নানি হাঁক দেয় ‘দূর যা খবিশ, খবিশর গরর খবিশ, কমিনর পুয়া।’ বিভিন্ন অনুভূতির মেলানো-মেশানো অদ্ভূত এক হাসি ছড়িয়ে ছেলেটা আবার ফিরে যায় দাঁড়ে নয়তো হালে। অন্য মাঝিটাও বেশ মজার। বিড়ি টানতে এসে ঐ মহিলাকে কিছু বলে না সে। কুলসীকে খেপানোর জন্য বারবার ওকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়, ‘আমারে বিয়া করতায়নি গো মাইয়া? তুমারে নয়া গর বাইন্দা দিমুনে। পরর বাড়িত যাইতায় কেনে?’ গামছা নিংড়ে শরীরের পানি মুছে বেশ কায়দা করে বিড়ি ধরিয়ে খুক খুক করে কাশে আর মেয়েটাকে উত্যক্ত করে আনন্দ পায় ঐ বুড়ো। নৌকো ছাড়ার আগে পেট পুরে ভাত খেয়ে এসেছে সে। শরীর ও মন বেশ চাঙ্গা ওর। কান্নার দমকে কিছু খেতে পারেনি মেয়েটা। এত সকালে কোনো কিছু খাওয়ার অভ্যাস নেই ওর নানিরও। যাত্রাপথের জন্য বয়ে আনা খাবার দুপুরের আগেই খেতে শুরু করে দুজনে। শরীরের চাহিদার কাছে মনের বাঁধা আর কতক্ষণই-বা টিকে থাকে!

বয়স তেরো হলেও আট-নয় বছরের চেয়ে বেশি বড়ো মনে হয় না কুলসীকে। কৈশোরের কোনো চিহ্নও নেই ওর শরীরে। মুখের ক্ষয়ে যাওয়া ভাবে প্রকটভাবে ফুটে রয়েছে অপুষ্টি। ওর সাত বছর বয়সে বিধবা হয়েছিল ওর মা। মায়ের কোলে আর একটা ভাই ছিল তখন। সাপের ছোঁবলে ঐ ছেলেটা মারা যায় গত বছর। কুলসীকে নিয়ে ওর মা এখন নানির সঙ্গে ধান কুটে-ঝেড়ে জীবন কাটায়। কিন্তু ঐ গোত্রের অন্যদের মতো ওদেরও অভাবের দিন আর ফুরোয় না। অনেক কষ্ট করে আগের কয়েকটা বর্ষা পার করেছিল ওরা। এবার আর পারে না। দূর-সম্পর্কের এক আত্মীয়ের বাসায় কাজ করার জন্য ওকে পাঠায় ওর মা। যদিও কুলসী জানে না-যে, কোথায় ও কার কাছে যাবে সে অথবা ওখানে ওকে করতেই-বা হবে কী?

ঝড়ো বাতাসের দাপটে মাঝে মাঝে কর্কশভাবে দুলে ওঠে নৌকোটা। পাশের বাতায় ধরে টাল সামলায় ওরা। দমকা বাতাস ছইয়ের ভেতরে ঢুকে ওর গায়ের কাপড়টাকে বেলুনের মতো ফুলিয়ে দেয়। শীতে কাঁটা দেয় ওর শরীর। ছইয়ের ভেতরে থেকেও কাপড় আধভেজা হয়ে যায়। বাতাসের বেশিরভাগই জলকণা। সবকিছু এত খারাপ লাগে কুলসীর-যে হাউ মাউ করে কাঁদতে ইচ্ছে হয়। গত কয়েকটা দিন এত কেঁদেছে সে, কান্নার আর কোনো অর্থ হয় না। মনের ভেতরটা ওর ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গলে মিশে যায় হাওরের অশান্ত ঘোলাজলের সঙ্গে।

বর্ষায় শনির হাওর একটা সমুদ্রের রূপ নেয়। ছোটো নৌকোর মাঝিরা সাধারণত আড়াআড়ি হাওর পাড়ি দিতে সাহস পায় না। বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো জেগে থাকা গ্রামগুলোর কিনারা ঘেঁষে ঘুরে ঘুরে গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যায় ওরা। দুটো গ্রামের মধ্য দিয়ে একটা খাঁড়ি পেরিয়ে যাওয়ার সময় ঝকঝকে একটা মাজার চোখে পড়ে ওর। ওটার গম্বুজে বাঁধা খুঁটিতে লেপ্টে আছে লাল একটা পতাকা। পেছনে একটা ঝাঁকড়া বটগাছ। এতটাই বড় ওটা-যে, ছোটখাটো একটা পাড়া বলে মনে হয়। মাজারের পাশে সারিবাঁধা কয়েকটা দোকানের ভেতর থেকে হালকা ধোঁয়া বেরিয়ে আসে। প্রায় সবকটা দোকানে চা বানানোর চুলো রয়েছে। হাতে কোনো কাজ না থাকায় অকর্মা মানুষগুলো দোকানের ঝাঁপির নিচে বসে চা খায় ও মেতে থাকে দুনিয়ার যত সব গাঁজাখুরি গল্পে।

Haorpuran-2: Conceptaul Paintings on Watery Lowland, Bangladesh; Original Photography Credit: BD News 24

চায়ের কথা মনে পড়ায় চোখ ছলছলিয়ে ওঠে মেয়েটার। কদিন আগে মায়ের সঙ্গে শিকদার বাড়িতে গেছিল সে। বাসি রুটির সঙ্গে ওরা এক পেয়ালা চা দিয়েছিল ওদের। গরম ঐ পানীয়ের স্বাদ এখনো মুখে লেগে আছে ওর। মাজারের সামনে একটা কৃষ্ণচূড়া গাছ। ওটাতে যখন ফুল ফোটে তখন দূর থেকে মনে হয় গ্রামে আগুন লেগেছে। বাবার কথাও মনে পড়ে ওর। কয়েক বছর আগে ওরোসের সময় একদিন বাবার সঙ্গে মাজারে এসেছিল সে। ওরোসের ঐ তুষাসিন্নি ও খাবারের কথা মনে হলে জিভে জল আসে। ঐদিন কৃষ্ণচূড়া গাছটাও ছিল ফুলে ফুলে ছাওয়া। গাছের নিচে ভিড়ের মানুষদের গায়েও টুপটাপ ঝরে পড়ত ফুলের পাপড়িগুলো। উৎসবের মতো কোনো দিনের আনন্দ ওর জীবনে বুঝি ঐ একটাই। ওরোসের কয়েক দিন পর ওর বাবা মারা যায়। মৃত্যু তখনও এত বেদনাময় হয়ে ওঠেনি ওর কাছে। বাবাকে মনে হয়েছিল সে ঘুমিয়ে রয়েছে। কিছুদিন আগে যেমন দাদিকে দেখেছিল ঘুমিয়ে থাকতে। বাবাও তখন ঘুমিয়ে ছিল। আর এখন ঘুমিয়ে আছে তো আছেই।

মাজারের পাশের ঐ কবরস্থানটার শীতলতা দূর থেকেও অনুভব করা যায়। দক্ষিণ দিকে একসারি তারাফুলের গাছ প্রায় সারা বছর ফুলে ফুলে সাদা হয়ে থাকে। ঘন সবুজের উপর তারার মতো অসংখ্য সাদা ফুল এক ধরনের শূন্যতার জন্ম দেয়। মনে হয় এসবকিছু অনেক দূরের। মাটিতে সবুজ দূর্বা ঘাসে ঝরে পড়া সাদা ফুলের সমারোহ মনের ভেতর এক অজানা শুচিতা এনে দেয়। মৃত্যুর হিম ছোঁয়া দিয়ে যায়। এত সাদা! মাজারের পর আর কোনো ঘরবাড়ি নেই। গ্রামের কিনারা ঘেঁষে দাঁড়ানো সারি সারি গাছের পায়ে আছড়ে পড়ে উথাল-পাথাল ঢেউ। মাটি ধুয়ে যাওয়ায় জালের মতো ফাঁকা জায়গা গড়ে উঠেছে শেকড়ের নিচের দিকটায়। হাওরের উত্তাল জল কল কল শব্দে কান্নার প্রতিধ্বনি জাগিয়ে রাখে ওখানে। ওটার কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে মেয়েটা।

‘শুরু অইলনি আরবার! কারে ইয়াদ অইছে? যাওয়ার লাগি তুমারে জুরাজুরি করছেনি কেউ? বাড়িত থাকলে পেটোর কামড়ানি থামাইতা পারবায়নি?’ খেঁকিয়ে ওঠে ওর নানি।

বয়স্ক মাঝিটা কাছে এসে বলে ‘চলইন, ফিরত যাইগি।’

দাঁড়ে বসা ছেলেটাকে চোখ টিপে বলে ‘এই, নাউ গুরাইলা, কইন্না নাইওর যাইবা।’ মেয়েটার কান্না তবু থামে না।

অবশেষে সুনামগঞ্জ শহরে পৌঁছায় ওরা। কিছুটা হেঁটে ওর নতুন ‘বাসাবাড়ি’ পেয়ে যায় ওরা। পাশের কামরায় যেতে ওদের ইশারা জানায় গৃহকর্ত্রী। ওকে দেখে এক অজানা ভয়ে বুক কেঁপে ওঠে কুলসীর। ঘরের এক কোনে চকচকে কালো রঙের একটা সেলাইকল। মেয়েটার অবাক চোখজোড়া বিস্মিত হয় ওখানে একটা সেলাইকল দেখে। এরকম সেলাইকল বাজারের দর্জির দোকানে দেখেছে সে। বারান্দায় ঝোলানো বাঁশের খাঁচায় একটা টিয়া পাখি। শান্তভাবে ঘাড় ঘুরিয়ে এদিক সেদিক দেখে আর ছোটাছুটি করে। দেয়ালে টানানো কালো রংয়ের চারকোণা একটা বিশাল ঘরের বাঁধাই করা ছবি। ওটার চারদিকে মানুষের ছোটো ছোটো প্রতিকৃতি। সেলাইকলের পেছনে টুলে বসা ছোট্ট একটা মেয়ে। ফ্যাকাসে মুখ। ফোলা ফোলা গাল। যেন বোলতায় কামড়েছে। পরনের ফ্রকটা ওর অসম্ভব সুন্দর। অপলক চোখে মেয়েটাকে সে দেখে। মেয়েটাও যাঁচাই করে ওকে।

Village Girl in Patua Quamrul Hassan Paintings; Untitled Painting Source: Collected; Google Image

একসময় জিজ্ঞেস করে, ‘এই ফুরি তোর নাম কিতা?’

শক্ত হয়ে চেপে থাকা ঠোঁট দুটো এমনভাবে নড়ে ওঠে যেন কেঁদে ফেলে কুলসী। একটু দম নিয়ে নরম গলায় মিনমিনিয়ে বলে, ‘কুলসী।’

‘কুলসুম?’

‘না, কুলসী।’

‘তোরে আমি ঘটি-কলসী ডাকতাম ফারতাম নায়। কুলসুম ডাকমু।’

চুপ করে থাকে মেয়েটা। নানি ওকে বুঝিয়ে বলে, ‘তাইনরে আফা ডাকবায়। ফুট-ফরমাইশ যা দেইন টিকটাক মতো করবায়। ইখানো তুমার কুনো অসুবিদা অইত নায়। ভালা খাইবায় ফরবায়। হাসিখুশি থাকবায়। আল্লায় দিলে সুখে থাকবায়।’

ওকে বুঝিয়ে-সুজিয়ে ঐ পরিবারের কাছ থেকে মেয়েটার মজুরির আগাম কিছু টাকা নিয়ে ফিরতি নৌকোয় ওঠে সে। ফেরার পথে নৌকোর ভেতরের গুমোট পরিবেশটা আর নেই। আবহাওয়া অনুকূলে। আরো কম সময়ে গ্রামে ফিরে আসে ওরা। কটা টাকা হাতে পেয়ে কিছুদিনের জন্য মেয়ের দুঃখ ভুলে থাকে ওর মা।

প্রথমেই নাম বদলে ফেলা থেকে কুলসীর জীবনে পরিবর্তনের পালা শুরু হয়। মনিব মেয়েটা ভালোভাবেই গ্রহণ করে ওকে। ভালো খাবার ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ পেয়ে থেমে থাকা শরীরটা তরতরিয়ে বেড়ে ওঠে ওর। কিন্তু ওটাই ওর জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। পরিবারের বড়ো ছেলেটার পাল্লায় পড়ে সে। স্বাভাবিকভাবে যা ঘটে, প্রথমে ফুসলানো তারপর বল-প্রয়োগ ও পরিণতিতে অন্তঃস্বত্ত্বা হয়ে পড়লে চরম বিপর্যয় নেমে আসে ওর জীবনে। মনিব গিন্নির নির্যাতন একসময় এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যা সওয়া ওর ছোট্ট শরীরের ধারণ ক্ষমতার বাইরে চলে যায়। শারিরীক ও মানসিক নির্যাতনের সকল চিহ্ন নিয়ে মেয়েটা এক দুর্যোগের রাতে বিদেয় নেয়। মৃতদেহ গুম করে ফেলা আজকাল কঠিন কিছু না। হাওরের গভীর ও শীতল কালো জলে পায়ে কলসী বেঁধে অনন্তকালের জন্য নিভৃতে শুয়ে থাকে মেয়েটা।

Village Life in Patua Patua Quamrul Hassan Paintings; Composition with Figure; Untitled Painting Source: mutualart.com

পরের বর্ষায় বছর চুক্তির টাকা নিতে এলে প্রথমে ওরা বলে-যে মেয়েটা তো অনেকদিন আগে ভেগে গেছে। নানিও ছাড়ার পাত্রী না। সবকিছু বুঝতে পেরে বেশ বড় টাকার অঙ্কে বিষয়টা মিটিয়ে ফেলে সে। মেয়েকে তো আর ফিরে পাওয়া যাবে না। মামলা মোকদ্দমাও চালাতে পারবে না ওরা। তাতে লাভও বা কি? পুলিশে বললে বরং ওদের পাওনা অংশটাও ভাগাভাগি হয়ে যাবে। তার চেয়ে টাকাটা নিয়ে ঘরে ফেরাই বুদ্ধিমানের কাজ। অন্তত মেয়ের মা বাকি জীবনটা খেয়ে পরে বাঁচতে পারবে। মোটা টাকা সঙ্গে নিয়ে অন্য নৌকোয় গ্রামে ফেরার যাত্রা করে ঐ মহিলা। এবারের বর্ষা এখনো ততটা জাঁকালো হয়ে ওঠেনি। নৌকোর তলায় পানির কল কল শব্দ বুকের ভেতরটা কাঁপিয়ে দেয় ওর। ওর মনে হয় যে হাওরের সবটুকু জল ঢেউ তুলে কুলসীর প্রতিবাদী গলায় বলে চলেছে :

যাইতাম নায়, যাইতাম নায়…

আগামী শীতে শুকিয়ে যাবে প্রায় পুরো হাওর। মাঝখানে বিশাল বিলের মতো টিকে থাকবে কিছু কালো পানি। উত্তরের সুদূর সাইবেরিয়া থেকে আসবে শীতের পাখিরা। হয়তো কুলসীর ছড়ানো-ছিটানো হাড়ের ফাঁকে ঠোঁট গুঁজে কোনও সরালি অথবা লেঞ্জা খুঁজবে ছোট্ট বেতরাঙ্গি বা রানি মাছের বাসা কিংবা করোটির ভেতর খুঁজে পাবে বঁইচা মাছের একটা ঝাঁক।

ধীরে ধীরে নৌকো পৌঁছে যায় গ্রামের কাছাকাছি। এসব ভাবনা ছাপিয়ে নানির মস্তিষ্কে তখন জটিল অঙ্কের খেলা চলেছে। কত টাকা কুলসীর মায়ের হাতে দিয়ে নিজের জন্য কত বাঁচানো যায়? জীবন মানেই তো অর্থের হিসেব মিলানো : যত দরিদ্রই হোক না সে!
. . .

শুরু অইলনি আরবার! কারে ইয়াদ অইছে? যাওয়ার লাগি তুমারে জুরাজুরি করছেনি কেউ? বাড়িত থাকলে পেটোর কামড়ানি থামাইতা পারবায়নি?’ খেঁকিয়ে ওঠে ওর নানি।
বয়স্ক মাঝিটা কাছে এসে বলে ‘চলইন, ফিরত যাইগি।’
দাঁড়ে বসা ছেলেটাকে চোখ টিপে বলে ‘এই, নাউ গুরাইলা, কইন্না নাইওর যাইবা।’ মেয়েটার কান্না তবু থামে না।

. . .

লেখক পরিচয় : কামাল রাহমান : এখানে অথবা ওপরের ছবিতে চাপুন

. . .

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 6

No votes so far! Be the first to rate this post.

thirdlanespace.com কর্তৃক স্বত্ব সংরক্ষিত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *