নেটালাপ - পোস্ট শোকেস

“প্রসঙ্গ ইরান” : তাৎক্ষণিক নেটালাপ

Reading time 12 minute
5
(22)
@thirdlanespace.com

. . .

জাভেদভাই, ইরানসম্পর্কে আপনার প্রথম আলোচনার সূত্রে বলি : আপনি ইরান প্রসঙ্গকে ঘিরে প্রচলিত আবেগঘন অবস্থানগুলোর বাইরে থেকে একটি জটিল ও প্রয়োজনীয় প্রশ্ন উত্থাপন করার চেষ্টা করেছেন!

সাধারণত এই ইস্যুতে মতামত দুটি চরম মেরুতে বিভক্ত হয়ে পড়ে। তার একদিকে সাম্রাজ্যবাদবিরোধিতার তীব্র আবেগ, অন্যদিকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের সমালোচনা। আপনার লেখাটি এই দুই মেরুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে দ্বিধার জায়গাটিকে স্বীকার করেছে, যা তাৎপর্যপূর্ণ দিক। আপনি শুরুতেই স্বীকার করেছেন যে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের ওপর আগ্রাসন কিংবা বোমাবর্ষণের ঘটনা মানবাধিকারের প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসে এবং সেই কারণে মানুষের আবেগপ্রবণ প্রতিক্রিয়া স্বাভাবিক। আপনি ভিন্নমতকে অস্বীকার করেননি, বরং তার বৈধতা মেনে নিয়েই বলেছেন।

তবে আপনার নিজস্ব অবস্থানটি ভিন্ন চোখে দেখার অবকাশ দেয়। আপনি দেখাতে চান যে ইরানের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে কেবল সাম্রাজ্যবাদবিরোধিতার আবেগে অবস্থান নেওয়া সমস্যাজনক। প্রায় পাঁচ দশক ধরে প্রতিষ্ঠিত ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ফলে নাগরিক স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের অধিকার এবং রাজনৈতিক বহুত্ববাদ যে সীমিত হয়ে পড়েছে, আপনি সেই বিষয়টি ধারাবাহিক ঐতিহাসিক উদাহরণের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। ১৯৭৯ সালের বিপ্লব-পরবর্তী ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন, আশির দশকের রাজনৈতিক দমন, ১৯৮৮ সালের কারাগার হত্যাযজ্ঞ, নব্বইয়ের দশকের ‘চেইন মার্ডার’, ১৯৯৯ সালের ছাত্র আন্দোলন, ২০০৯ সালের গ্রিন মুভমেন্ট থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক ‘Woman, Life, Freedom’ আন্দোলন—এই ধারাবাহিক ঘটনাপ্রবাহের উল্লেখ লেখাটিকে কেবল মতামতনির্ভর না রেখে একটি প্রামাণ্য রাজনৈতিক আলোচনার দিকে নিয়ে গেছেন।

রাষ্ট্রীয় দমননীতির শিকার হয়েছেন শুধু রাজনৈতিক কর্মীরা নন; লেখক, চলচ্চিত্রকার, সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক কর্মীরাও দীর্ঘদিন ধরে হয়রানি, কারাবাস বা নির্বাসনের মুখোমুখি হয়েছেন। এই উদাহরণগুলো লেখাটির যুক্তিকে মানবিক মাত্রা দেয় এবং বোঝায় যে বিষয়টি কেবল ভূরাজনীতি বা ক্ষমতার দ্বন্দ্ব নয়, বরং নাগরিক জীবনের প্রতিদিনের স্বাধীনতার সঙ্গেও সম্পর্কিত। তবে লেখাটি শেষপর্যন্ত কোনও সহজ সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে চায় না। বরং এটি একটি দ্বিমুখী প্রশ্ন উত্থাপন করে—সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের নিন্দা করা যেমন জরুরি, তেমনই সেই নিন্দার আড়ালে একটি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিপীড়নকে উপেক্ষা করা কতটা নৈতিক। এই প্রশ্নটিই মূলত লেখাটির কেন্দ্রবিন্দু।

Skeches of Iran; Image Source: Collected; Credit: iranhumanrights.org

অনেক সময় দেখা যায়, আন্তর্জাতিক রাজনীতির মেরুকরণের কারণে একটি রাষ্ট্রের মানবাধিকার সংকটকে উপেক্ষা করা হয় শুধুমাত্র এই যুক্তিতে যে সেটি বহিরাগত শক্তির বিরোধিতায় অবস্থান করছে। আপনি এই প্রবণতাকে চ্যালেঞ্জ করেছেন এবং মনে করিয়ে দিয়েছেন যে মানবাধিকার প্রশ্নে নীরবতা—যে কারণেই হোক—শেষপর্যন্ত নিপীড়নের কাঠামোকেই দীর্ঘায়িত করে। আপনার মন্তব্যটি গুরুত্বপূর্ণ বৌদ্ধিক অবস্থানকে সামনে আনে। এটি পাঠককে কোনও নির্দিষ্ট মত গ্রহণে বাধ্য করে না!

‘ইরানে ধর্মনিরপেক্ষতা’ পর্বের আলোচনার পর যে-প্রশ্নটি সবচেয়ে তীব্রভাবে সামনে আসে, তা হলো—রাষ্ট্র, ধর্ম এবং নাগরিক স্বাধীনতার সম্পর্ক আসলে কোথায় গিয়ে স্থির হয়? ইরানের সাম্প্রতিক আন্দোলন সেই প্রশ্নটিকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’ স্লোগানটি কেবল একটি রাজনৈতিক প্রতিবাদের ভাষা নয়; এটি এমন-এক সামাজিক মানসিকতার ইঙ্গিত, যেখানে মানুষ রাষ্ট্রের আরোপিত ধর্মীয় কর্তৃত্বের সীমা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে। এই প্রশ্নটি শুধু ইরানের নয়; আধুনিক বিশ্বের বহু সমাজেই এটি বিভিন্ন রূপে উপস্থিত।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বন্দ্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একদিকে আছে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী অবস্থান—যা বৈশ্বিক রাজনীতিতে পশ্চিমা শক্তির আধিপত্যের সমালোচনা করে। অন্যদিকে আছে নাগরিক স্বাধীনতার প্রশ্ন—যা একটি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কাঠামোকে বিচার করতে চায় মানবাধিকারের আলোকে। অনেক সময় এই দুই অবস্থানকে একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড় করানো হয়। ফলে এমন-এক পরিস্থিতি তৈরি হয় যেখানে কোনও রাষ্ট্র যদি পশ্চিমা শক্তির বিরোধিতা করে, তাহলে তার অভ্যন্তরীণ দমননীতির সমালোচনা অনেকের কাছে অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে। আবার উল্টোদিকেও একই সমস্যা দেখা যায়—মানবাধিকারের ভাষা কখনও কখনও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ক্ষমতার কৌশল হিশেবেও ব্যবহৃত হয়।

এইসব দ্বন্দ্বের ভিতরেই ইরানের বর্তমান বাস্তবতাকে বুঝতে হয়। ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা-যে নাগরিক জীবনের ওপর একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় ব্যাখ্যা চাপিয়ে দেয়, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু একইসঙ্গে এটাও সত্য-যে ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণা সব সমাজে একইভাবে গড়ে ওঠেনি; এর ইতিহাস ও প্রয়োগ ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে ভিন্ন রূপ নিয়েছে। ফলে প্রশ্নটি শুধু ‘ধর্ম বনাম ধর্মনিরপেক্ষতা’ নয়; বরং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কীভাবে নাগরিকদের বহুত্ববাদকে স্বীকৃতি দেয় বা দমন করে, এই বৃহত্তর প্রশ্ন। ইরানের ক্ষেত্রে এই প্রশ্ন আরও জটিল হয়ে ওঠে, কারণ দেশটির সমাজ একদিকে গভীর ধর্মীয় ঐতিহ্যের ধারক, অন্যদিকে সেখানে শক্তিশালী বৌদ্ধিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যও রয়েছে—দর্শন, কবিতা, বিজ্ঞান ও শিল্পের দীর্ঘ ইতিহাস যার সাক্ষ্য বহন করে।

Who Watches and Who Devours: Anger, grief, and refusal to look away.; Image Source: Collected; Credit: Book and Paper Arts 

বর্তমান আন্দোলন অনেকাংশে এই দ্বৈত ঐতিহ্যের সংঘর্ষকেই সামনে নিয়ে আসে। তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ মনে করছে-যে রাষ্ট্রীয় ধর্মতন্ত্র তাদের জীবনযাত্রা, সংস্কৃতি ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে সংকুচিত করছে। অন্যদিকে রাষ্ট্র এই প্রশ্নকে প্রায়ই রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র বা বহিরাগত প্রভাবের ভাষায় ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করে। এই পরিস্থিতি আমাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ভাবতে বাধ্য করে : নাগরিক স্বাধীনতার প্রশ্ন কি কেবল রাষ্ট্রের ভিতর থেকে সমাধানযোগ্য, নাকি আন্তর্জাতিক রাজনীতির শক্তির ভারসাম্যও এখানে প্রভাব ফেলে? বাস্তবতা হলো, বাহ্যিক চাপ অনেক সময় অভ্যন্তরীণ সংস্কারের পথকে জটিল করে তোলে। কারণ তখন রাষ্ট্র সহজেই বিরোধিতাকে বিদেশি ষড়যন্ত্র হিশেবে চিহ্নিত করতে পারে। আবার সম্পূর্ণ অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনের অপেক্ষায় থাকলেও অনেক সময় দমননীতির দীর্ঘস্থায়িত্ব বাড়ে। এই দ্বিধা আধুনিক বিশ্বরাজনীতির একটি স্থায়ী সমস্যা।

সুতরাং ইরানের প্রশ্নটি শেষপর্যন্ত কেবল একটি দেশের রাজনৈতিক সংকট নয়; এটি আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি গভীর তাত্ত্বিক প্রশ্নও উত্থাপন করে। রাষ্ট্র কি নাগরিকদের ধর্মীয় পরিচয়কে রাজনৈতিক কাঠামোর ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করবে, নাকি নাগরিক বহুত্ববাদকে স্বীকৃতি দিয়ে নিজেকে তুলনামূলকভাবে নিরপেক্ষ রাখবে? এবং সেই নিরপেক্ষতার সীমা কোথায়? এই প্রশ্নগুলোর সহজ উত্তর নেই। কিন্তু ইরানের সাম্প্রতিক আন্দোলন অন্তত এটুকু স্পষ্ট করেছে : রাষ্ট্র ও ধর্মের সম্পর্ক নিয়ে যে-বিতর্কটি বহুদিন ধরে তাত্ত্বিক পরিসরে ছিল, তা এখন বাস্তব সমাজের ভিতরেই নতুন করে আলোচনায় উঠছে।
. . .

বাবুল ভাই, কৃতজ্ঞতা জানবেন। আমি কেবল আমার ব্যক্তিগত অভিমতটাই জানিয়েছি। বিষয়টি খুবই স্পর্শকাতর, কারণ যুদ্ধ মানে মানুষের প্রাণহানি, সভ্যতার বিপর্যয়। এখানে সাধারণ মানুষজন মারা যাচ্ছে। ভূরাজনীতির বলি কিংবা সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন বলি—শেষপর্যন্ত সাধারণ মানুষই প্রধান ভুক্তভোগী হয়ে দাঁড়ায়। এখানে একটা বিষয় পরিষ্কার করা দরকার, যদি আমি আমার অবস্থান ব্যাখ্যা করতে ব্যর্থ হই, একপাক্ষিক জায়গা থেকে অবস্থান নেই তাহলে সাধারণ মানুষ হত্যার নৈতিক দায় থেকে কি মুক্ত থাকতে পারব?

আমেরিকা ও ইসরায়েল তাদের স্বার্থগত জায়গা থেকে ইরানের ওপর হামলা করছে। কিন্তু যুদ্ধের বাস্তবতা কেবল সামরিক স্থাপনা বা রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের মধ্যে এখন আর সীমাবদ্ধ নেই। যুদ্ধের আঘাত খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষের জীবনে। এখানেই দ্বিধার জন্ম। যদি অন্য অনেক দেশের মতো এই আগ্রাসন হতো, নির্দ্বিধায় সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা করা নৈতিক দায় হতো। যেমন, ভেনিজুয়েলার ক্ষেত্রে দেখা গেছে, সেখানে দেশের মানুষ মাদুরোর পক্ষেই দাঁড়িয়েছে। কিন্তু ইরানের বাস্তবতা ভিন্ন। দেশের একটি বড়ো অংশ এই শাসনকাঠামোর মধ্যে থাকতে নারাজ, এবং শুরু থেকেই প্রতিরোধ চলমান। সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে এক ধরনের আরোপিত রাজনৈতিক কাঠামো এখানে সক্রিয়।

শুধু তাই নয়, ইরানের আঞ্চলিক শক্তি হয়ে ওঠার একটি উচ্চাকাঙ্ক্ষাও রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে ইরানের মদদপুষ্ট সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো সক্রিয়। তাই পুরো প্রেক্ষাপটে প্রশ্নটা দাঁড়ায় : এই যুদ্ধের দায় কি কেবল আমেরিকা ও ইসরায়েলের, নাকি ইরান সরকারেরও? আমার কাছে মনে হয়, ইরান সরকারেরও এখানে একটি বড়ো দায় রয়েছে। প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে যে-ধর্মতাত্ত্বিক রাষ্ট্রকাঠামো সেখানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তা পুরো সমাজের ওপর পাথরের মতো চেপে বসে আছে। এই কাঠামো রাষ্ট্রকে এমন এক কঠোর আদর্শিক অবস্থানে নিয়ে গেছে, যেখানে রাজনৈতিক বাস্তবতা ও মানবিক বিবেচনার জায়গা ক্রমে সংকুচিত হয়েছে।

এ-কারণেই আমি মনে করি, একপাক্ষিক বিচার খুব সহজ হলেও তা ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ তাতে বাস্তবতার একটি বড়ো অংশ অদৃশ্য হয়ে যায়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি সম্ভবত এখানেই—ইরানের জনগণ কি এই যুদ্ধ চেয়েছে? আমার কাছে বরং মনে হয়, দুই পক্ষের সংঘাতের মাঝখানে তাদের ওপরই যুদ্ধটি চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।

The Regime; Image Source: Collected; Google Image

আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। ইরানের ধর্মতাত্ত্বিক শাসনব্যবস্থা এতটাই গভীরে প্রোথিত-যে, চাইলেই সেটিকে সহজে উপড়ে ফেলা সম্ভব নয়। এটি কেবল একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা নয়; এটি একটি বদ্ধ আদর্শিক কাঠামো, যা দীর্ঘ সময় ধরে রাষ্ট্র, সমাজ এবং প্রতিষ্ঠানের ভেতরে শিকড় গেড়ে বসেছে। এই কাঠামো এতটাই কঠোর-যে অনেক সময় মনে হয়, এবং বর্তমান ইরানি রাষ্ট্রকাঠামোর মনোভাবও যেন সেরকম—রাষ্ট্র ধ্বংস হয়ে গেলেও আদর্শিক অবস্থান অটুট রাখার প্রবণতা সেখানে প্রবলই থাকবে । যেহেতু, সাধারণ নাগরিকের মতামত গুরুত্বপূর্ণ নয় তাই দীর্ঘদিন যুদ্ধ, প্রাণহানি এসব অস্বাভাবিকও নয়। এই কঠোর বাস্তবতাকে অস্বীকার করে কি আমরা সমস্যাটির গভীরে পৌঁছাতে পারব?
. . .

প্যাট্রিক হাসান ও হুসেইন দাববাগের যৌথ রচনাটির ভাষান্তর, এবং এর পাশাপাশি ইরানের সামগ্রিক পরিস্থিতির ওপর জাভেদের ব্যাখ্যা মিলে পাঠসমৃদ্ধ আলোচনা আমরা পেয়েছি। আপনি যথার্থই বলেছেন বাবুল ভাই :

সুতরাং ইরানের প্রশ্নটি শেষপর্যন্ত কেবল একটি দেশের রাজনৈতিক সংকট নয়; এটি আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি গভীর তাত্ত্বিক প্রশ্নও উত্থাপন করে। রাষ্ট্র কি নাগরিকদের ধর্মীয় পরিচয়কে রাজনৈতিক কাঠামোর ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করবে, নাকি নাগরিক বহুত্ববাদকে স্বীকৃতি দিয়ে নিজেকে তুলনামূলকভাবে নিরপেক্ষ রাখবে?

প্রসঙ্গটিকে তিনজন আলোচক মিলে ভালো কাভার করেছেন তাতে সন্দেহ নেই। তবে পাঠসমৃদ্ধ এই আলাপে তথাপি কিছু দুর্বলতা চোখে পড়ে। সংক্ষেপে এর একটি দিক আপাতত তুলে ধরছি। বাকিগুলো এ-বিষয়ে আলাপ যদি আগায় সামনে, তাহলে তোলা যাবে না-হয় :

ধর্মকে স্পর্শকাতর বাস্তবতা হিসেবে বিবেচনা করার কারণে তিনজন আলোচকের কেউই একদম সরাসরি এই বক্তব্য রাখতে পারেননি,—ধর্ম কোনোভাবে রাষ্ট্র পরিচালনার মানদণ্ড হতে পারে না। অতীতে যেমন পারেনি বা তা করতে গিয়ে শেষপর্যন্ত ঘটেছে বিপর্যয়,—বাস্তবতা এখনো তাই বটে, উলটো এসব করতে যেয়ে বিড়ম্বনা বাড়ছে প্রতিপদে।

ধর্মের মূল লক্ষ্য আসলে কী? মানুষ ধর্ম বলতে কী বুঝবে? প্রশ্নগুলো তিনজন আলোচকের ব্যাখ্যায় সরব নয়। কথার কথা, ধর্মকে যদি আমরা সমাজবদ্ধ মানব প্রজাতির জন্য আধ্যাত্মিক প্রশান্তি ও পরজাগতিক উৎকর্ষ অর্জনের মানদণ্ড বিবেচনা করি, যেখানে ধর্মীয় বিধি-বিধান ও আচার-অনুষ্ঠানের সবটুকু মূলত স্রষ্টার জন্য নিবেদিত হওয়ার কথা,—সেক্ষেত্রে রাষ্ট্রের মাধ্যমে সমাজ পরিচালনায় এর প্রয়োজন কোনোভাবে বৈধ হতে পারে না। রাষ্ট্র একটি ইহজাগতিক ঘটনা, এবং সেখানে জাগতিক সমস্যা মোকাবিলায় ধর্মকে টেনে আনা এর পরিশুদ্ধ রূপকে বিনষ্ট করে। ফিতনা-ফ্যাসাদ ও সংঘাতের বিষে ধর্ম হয় কলুষিত। সুতরাং ধর্মকে রাজনীতির উপকরণ করা ঐতিহাসিকভাবে বারবার ক্ষতিকর প্রমাণিত হয়েছে। এতে করে ধর্ম স্বয়ং তার আদি চরিত্র ও মৌলিকত্ব হারিয়ে কখনো রাজতন্ত্র কখনো সামন্ততন্ত্র অথবা অধুনা পুঁজিবাদের ক্রীড়নক হয়েছে।

ধর্মকে এহেন দূষণ থেকে বাঁচাতে রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ অবস্থান গ্রহণ কাজেই অনিবার্য। ব্যক্তি/গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের ধর্মনিরপেক্ষ হওয়ার প্রয়োজন নেই, কিন্তু তাদের ইহজাগতিক সমস্যার সমাধান ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে ধর্মকে ব্যবহারের অধিকার রাষ্ট্র রাখে কি? যেটি, পৃথিবীতে এখনো তীব্রতা ভেদে বহু রাষ্ট্র মেনে চলতে ব্যর্থ। ধর্মনিরপেক্ষতাকে সুতরাং সেই ‘রাজনীতি’ হয়ে ওঠা জরুরি, যেটি রাষ্ট্রের কাঠামো থেকে ধর্মের সক্রিয় হওয়ার বাতিককে সবার আগে ছাটাই করবে।

ইরানে পাহলবি শাসনামলে জনপরিসরে ‘কাশফ’ বা হিজাব পরিধানের ওপর যে-নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছিল, প্যাট্রিক হাসান ও হুসেইন দাববাগ একে ধর্মনিরপেক্ষতার সীমা অতিক্রমের সমস্যা হিসেবে দেখিয়েছেন। আমার বিবেচনায় সেকুলার পাহলবি শাসনামলে প্রণীত বিধানটি যৌক্তিক ছিল।

Iranian Women: Before and After; Image Source: Collected; Credit: The Print

‘হিজাব’ নিয়ে খোদ ইসলামি পরিসরে তর্ক-বিতর্ক রয়েছে। এর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে রয়েছে নানা প্রশ্ন ও ভিন্নমত। উপরন্তু সমাজের একটি লিঙ্গকে এভাবে পোশাকবন্দি করা নিয়ে তীব্র মতবিরোধ নতুন ঘটনা নয়। ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র এখন এটিকে কীভাবে এলাউ করবে? এতে ঝামেলা বাড়ছে বৈ কমছে না সেখানে। এই পোশাকবন্দি নারী, বাকি যারা হিজাব মানছেন না বা মানতে বাধ্য নন (তারা হয়তো মুসলমান নন বা অবিশ্বাসী/অজ্ঞেয় ইত্যাদি),—তাদের জন্য অস্বস্তির নামান্তর। অদ্ভুতুড়ে এই মানুষটিকে সংযোগ করা তাদের জন্য সমস্যার।

অন্যদিকে, হিজাবকে স্বয়ং নারী যখন স্বেচ্ছায় বরণ করে নেয় ও এর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ করে ভারতের মুসকান নামক মেয়েটির মতো, তখন এটি রাষ্ট্রের সেকুলার যুক্তিকে বিপন্ন করে। মুসকানকে যে-উত্যক্ত হতে হলো, এর জন্য আসলে কে দায়ী? ইসলাম? উগ্র রামবাদী হিন্দুরা? নাকি সেকুলার সংবিধানে জারি থাকতে ব্যর্থ ভারত রাষ্ট্র স্বয়ং? যেখানে, রাষ্ট্র সেকুলার নীতি ভঙ্গ করে ধর্মকে রাজনীতির হাতিয়ার করে আসছে যুগ-যুগ ধরে? এটি কি ধর্মনিরপেক্ষতার সীমা অতিক্রমের সমস্যা? নাকি, ধর্মনিরপেক্ষতাকে সঠিকভাবে মানুষের কাছে তুলে ধরতে ও সেরকম ন্যারেটিভ তৈরি করতে না পারার সমস্যা? উপমহাদেশে বা ইরানে কেন ধর্মনিরপেক্ষতা মার খেলো, এই বিষয়ে অবশ্য পশ্চিমা দুনিয়ার প্রসঙ্গ টেনে প্যাট্রিক হাসান ও হুসেইন দাববাগ আলোকপাত করেছেন যথেষ্ট।

হিজাবের মতো ড্রেসকোড নির্দিষ্ট পরিসরে চলতে পারে, সর্বত্র একে এলাউ করার বিড়ম্বনা আমরা প্রতিনিয়ত দেখছি। একটি বিশেষ ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ড্রেসকোডকে কী-কারণে ধর্মনিরপেক্ষ থাকতে অটল রাষ্ট্র বাকি সবার মতামত উপেক্ষা করে বৈধ করবে? এটা তো মামাবাড়ির আবদার হবে সেখানে! সমস্যা কাজেই ধর্মনিরপেক্ষতার সীমা অতিক্রমে নয়, সমস্যা হলো তার মৌল চরিত্রকে ডিফাইন করছে যে-রাজনীতি… সেখানটায়।

ড্রেস সেন্স যে-কোনো সভ্য সমাজে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। রাষ্ট্রের জন্যও তা গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক সংস্কৃতিতে ধর্মীয় পোশাক হচ্ছে একটি ড্রেসকোড। পুলিশ কিংবা এরকম বহু প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ড্রেসকোড সমাজে প্রচলিত। একইভাবে সামাজিক ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে আমরা পৃথক ড্রেসকোড ব্যবহার করছি। সমুদ্র সৈকতে রৌদ্রস্নান ও সাঁতার কিংবা পার্টিতে যে-পোশাক পরিধান করছি, সেটি হয়তো ঘরে পরি না। সুতরাং হিজাব যদি ইসলাম ধর্ম অনুযায়ী ড্রেসকোড হয়ে থাকে, ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের নীতি অনুসারে জনপরিসর বা রাস্তাঘাঁট ও কর্মস্থলে একে এলাউ করা উচিত নয়। বাকিরা কেউ এরকম ধর্মীয় ড্রেসকোড মেনে চলে না বা একে প্রয়োজনীয় ভাবে না। সুতরাং, হিজাবকে অত্র পরিসরে এলাউ করা মানে ব্যক্তিস্বাধীনতার যথেচ্ছাচার। হিজাবির ব্যক্তি-স্বাধীনতাকে এলাউ করতে গিয়ে বাকিদের ব্যক্তি-স্বাধীনতাকে রাষ্ট্র আহত করবে কোন যুক্তিতে?

হিজাব এমন একটি ড্রেসকোড যেটি নিজের বৈধতা স্বয়ং রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় চাপিয়ে দিতে মরিয়া থাকছে। বিদ্যালয়ে শিক্ষক এক ভূতুড়ে মানুষে সঙ্গে সংযোগ করছেন, যেখানে আই কন্ট্যাক্টের মতো যোগাযোগ বিজ্ঞানের অতিব গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ তিনি প্রয়োগ করতে পারছেন না। না পড়তে পারছেন হিজাবে ঢাকা নারীমুখের অভিব্যক্তি। আজব! প্যাট্রিক ও দাববাগের একে সীমা লঙ্ঘন দাগানো ও ধর্মনিরপেক্ষতার সমস্যা দেখানোটা আমার কাছে কাজেই অত্যন্ত বাজে যুক্তি মনে হয়েছে। উদাহরণটি যুতসই হয়নি।

Freedom and Revolution; Image Source: Collected; Google Image

ধর্মনিরপেক্ষতা অবশ্যই ধর্মকে অস্বীকার বা বাতিল করে না। এ-কথা জাভেদসহ বাকি দুজন খুব ভালোভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। সে-আলোচনা রিপিট করার প্রয়োজন দেখছি না। তবে, ধর্মনিরপেক্ষতা হচ্ছে পরিষ্কারভাবে ইহজাগতিক সমাজে নানা মত ও বিশ্বাসের মধ্যে যৌক্তিক সহাবস্থান নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয় টুল। যেখানে, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও অধিকার মানে এই নয়, কোনো একজন মানুষ বা গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের সকল দাবি রাষ্ট্র মেনে নিতে বাধ্য। এখানে তাকে প্রতিটি দাবির পারস্পরিক অভিঘাত বিবেচনায় নিতেই হবে। রাষ্ট্র তা করতে ব্যর্থ হলে, আজকের ইউরোপে যুক্তরাজ্য, ইতালি, জার্মানির মতো দেশগুলো মাল্টি কালচারকে ছাড়পত্র দেওয়ার দিন থেকে মুসলমানদের নিয়ে যেসব আইনি জটিলতা ও ঝামেলায় পড়ছে নিত্য, একে এড়ানো সম্ভব হবে না।

তিনজন আলোচক ধর্মনিরপেক্ষতার প্রয়োজনকে যৌক্তিকভাবে তুলে ধরেছেন, তবে সেখানে এর সীমানা নিয়ে তাঁদের দ্বিধাজড়তা বা যেসব উদাহরণ তাঁরা পেশ করেছেন, সেগুলো ধর্মনিরপেক্ষতার জরুরতকে উলটো দুর্বল করে দিয়েছে। আর, ইরানের মতো দেশে ধর্মীয় আরোপণের মামলা মূলত ইসলাম ধর্মের আগমন ঘটার পর থেকে শুরু হয়। যেটি এই সমৃদ্ধ ভূখণ্ডে হাজার-হাজার বছর ধরে বিবর্তিত জরথ্রুস্ত্র-সহ জনসংস্কৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলা জাতি-বৈচিত্র্যকে ধ্বংস করতে মর্মান্তিক ভূমিকা রেখেছিল। পুরোটা পারেনি, এর পেছনে ইরানের শক্ত সাংস্কৃতিক বনেদ রেখেছে বিরাট অবদান।

আলোচকরা ইরানে বিকশিত প্রাক-ইসলাম কালপর্বের অতুল ধর্মীয় ঐতিহ্য ও পরবর্তী সংঘাতকে আলোচনায় ফ্রেমিং করতে পারেননি অতটা। জরথ্রুস্ত্র কেবল একটি ধর্ম ছিল না সেখানে, এটি ছিল বৈদিক ভারতের সমসাময়িক। প্রাচীনত্ব ও ভারতবর্ষে এর প্রবল প্রভাব ও সংযোগ বিনষ্ট হয় ইসলাম ও পরবর্তী ইংরেজ শাসনের সময়। এর আগে পর্যন্ত ধর্মে জারি থেকেও ভারতের রাষ্ট্র পরিচালনার ভিত্তি ধর্ম ছিল না। ইরানেও তাই।

ইসলাম অজান্তে জরথ্রুস্ত্রকে নিয়েছে ইহুদি ও খ্রিস্টান সূত্রে। একে বৈধতা ও এর আধ্যাত্মিক ব্যঞ্জনা ঋণ করেছে অকাতরে। নিয়েছে ইহজগৎ ও পরজগৎ থেকে আরম্ভ করে ভালো-মন্দ, শুভ-অশুভ, নফস ও রুহ বিষয়ক ধারণার সারাংশ। পরে ইসলামের ক্রমাগত রাজনৈতিক চরিত্র ধারণ স্বয়ং কোরানের মধ্যে মর্মরিত পারস্য-প্রভাবকে দুর্বল ও বাতিল করেছিল। এটি হয়ে উঠতে থাকে আগ্রাসী ও আরোপিত এক সংবিধান। যার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে যদি লড়তেই হয়, ধর্মনিরপেক্ষতা ছাড়া তা সম্ভব নয়। অন্যথায় এটি নিজের ও অন্যদের জন্যও এমন এক টাবু হয়ে থাকবে, যার কাছে একটি মেয়ের গায়ক হওয়ার ইচ্ছা থেকে শুরু করে হিজাব না পরেও শালীন থাকার চেষ্টাকে রাষ্ট্র কখনো বৈধতা দিতে পারবে না। কখনো না…! কথা লাউড অ্যান্ড ক্লিয়ার।

Main Kaun Hoon: Secret Superstar Movie Song; Source: Zee Music Company YTC

. . .

জি, ভাভেদভাই! যুদ্ধ মানেই মানবসমাজে নানারকম বিপর্যয়। কোনও রাষ্ট্রযন্ত্র থেকে সাধারণ মানুষ— যুদ্ধের ক্ষতি থেকে মুক্তির উপায় নেই। সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন, ভূরাজনীতি বা কৌশলগত প্রয়োজন—সব কথার শেষে যে-মৃত্যু, ক্ষয়ক্ষতি এবং জীবনের অস্থিরতা দাঁড়ায়, তার ভারই বহন করতে হয় সাধারণ মানুষকে।

ইরানের সাম্প্রতিক সংঘাত এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হস্তক্ষেপকেন্দ্রিক কার্যক্রম এই দৃষ্টান্তকে স্পষ্ট করে। সরকার বা সামরিক বাহিনী যে-লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করছে, তা আর সীমাবদ্ধ নেই কেবল কৌশলগত স্থাপনা বা শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে। আঘাত দ্রুত ছড়িয়েছে সাধারণ মানুষজনের ঘরবাড়ি, জীবিকা এবং সামাজিক কাঠামোর মধ্যে। এই বাস্তবতা দেশে দেশে মানুষের মধ্যে দ্বিধা সৃষ্টি করে। যদি আমরা একপাক্ষিক অবস্থান গ্রহণ করি—কেবল সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা করি বা একমাত্র আগ্রাসীর দোষ দেখি, তাহলে সাধারণ মানুষের ওপর চাপানো ক্ষতির নৈতিক দায় থেকে আমরা মুক্ত থাকতে পারব না।

একইভাবে, ইরান সরকারের দায়ও অস্বীকারযোগ্য নয়। প্রায় পাঁচ দশক ধরে ধর্মতাত্ত্বিক রাষ্ট্রকাঠামো প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় রাজনৈতিক বাস্তবতা ও মানবিক বিবেচনার জায়গা ক্রমে সংকুচিত হয়েছে। এই কাঠামো নাগরিকদের ওপর একটি দৃঢ় আদর্শ চাপিয়ে দেয়, যা সমালোচনা, প্রতিরোধ এবং রাজনৈতিক বিকল্পের পথকে সংকুচিত করে। ফলে দেশের সাধারণ মানুষ প্রায়শই রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের মধ্যে জিম্মি হয়ে পড়ে। ধর্মতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার গভীর শিকড় এবং রাজনৈতিক শক্তির ঘনিষ্ঠ বন্ধন যে-কোনও অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনকে দীর্ঘায়িত এবং জটিল করে তোলে।

ইরানের জনগণ এই যুদ্ধ কতটুকু চেয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। বাহ্যিক আগ্রাসনের মধ্য দিয়ে এবং অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে সংঘাত তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলস্বরূপ, দায় দ্বৈত—একদিকে বাহ্যিক শক্তির আগ্রাসন, অন্য দিকে অভ্যন্তরীণ আদর্শিক ও রাজনৈতিক কাঠামো। যুদ্ধের দায় একপক্ষের নয়; এটি একটি জটিল যৌথ দায়ের ফল। বাস্তবতার গভীরতা বোঝার জন্য বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ সকল প্রভাবকে বিবেচনা করা অপরিহার্য। আপনার ও মিনহাজ ভাইয়ের নতুন মন্তব্যের জন্য কৃতজ্ঞতা।
. . .

মিনহাজভাই, “হিজাব’ ও প্রাসঙ্গিক বিষয়ে আপনার মন্তব্য ভালো লাগলো। ঠিকই বলেছেন :

হিজাব নিয়ে খোদ ইসলামি পরিসরে তর্ক-বিতর্ক রয়েছে। এটির গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে রয়েছে নানা প্রশ্ন ও ভিন্নমত। উপরন্তু সমাজের একটি লিঙ্গকে এভাবে পোশাকবন্দি করা নিয়ে তীব্র মতবিরোধ নতুন ঘটনা নয়। ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র এখন এটিকে কীভাবে এলাউ করবে? এতে ঝামেলা বাড়ছে বই কমছে না। এই পোশাকবন্দি নারী, বাকি যারা হিজাব মানছেন না বা মানতে বাধ্য নন (তারা হয়তো মুসলমান নন বা অবিশ্বাসী/অজ্ঞেয় ইত্যাদি),—তাদের জন্য অস্বস্তির নামান্তর।অদ্ভুতুড়ে এই মানুষটিকে সংযোগ করা তাদের জন্য সমস্যার।

আপনার মন্তব্যসূত্রে যোগ করি : ধর্মীয় ড্রেসকোড হিশেবে হিজাবের অস্তিত্ব আছে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় নীতিতে তা তখনই প্রয়োগযোগ্য যখন এটি সকল নাগরিকের স্বাধীনতা/সমানাধিকার রক্ষায় বাধা সৃষ্টি করে না। রাষ্ট্রের দায়িত্ব জনপরিসর ও কর্মক্ষেত্রে নাগরিকদের অধিকার ও ব্যক্তিস্বাধীনতার মধ্যে সমন্বয় করা। ব্যক্তিগত বা ধর্মীয় পোশাকের নির্বাচনকে বাধ্যতামূলক করলে অন্যদের স্বাধীনতা সীমিত হতে পারে, এবং সেটি সমাজে অসামঞ্জস্যও সৃষ্টি করতে পারে।

শিক্ষা ও যোগাযোগের ক্ষেত্রেও এটি প্রাসঙ্গিক বটে। বিদ্যালয়ে বা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের শিক্ষামূলক আলোচনায় মুখের অভিব্যক্তি, চোখের যোগাযোগ এবং অন্যান্য সামাজিক সংকেত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিশেবে বিবেচনা করা হয়। হিজাবের মাধ্যমে এই প্রক্রিয়া সীমিত হলে শিক্ষার মান, শেখার অভিজ্ঞতা এবং সামাজিক অন্তর্দৃষ্টি প্রভাবিত হয়। এটি ব্যক্তি-স্বাধীনতার সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক সহযোগিতা ও সংযোগের ওপরও প্রভাব ফেলে।

ধর্মনিরপেক্ষতা এই প্রেক্ষাপটে একটি কার্যকর নীতি। বিষয়টি সমাজে বিভিন্ন ধর্ম, বিশ্বাস ও জীবনধারার মধ্যে যৌক্তিক সহাবস্থান নিশ্চিত করে। কোনও এক সম্প্রদায়ের দাবি বা রীতির কারণে অন্যদের অধিকার হরণ করা যাবে না—এটাই ধর্মনিরপেক্ষতার মূল শিক্ষা। রাষ্ট্র যদি এই নীতিকে স্পষ্টভাবে মান্য করে, তবে সমাজে শান্তি, সমতা এবং সকলের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।

Azadi (Freedom) tower with Matisse’s dancers and the ‘women, life, freedom’ protest slogan by Jalz; Image Source: Collected; Credit: The Gurdian

ইরানের দীর্ঘ ইতিহাস ও প্রাচীন সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যও এই প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ। ইসলাম আগমনের আগেই এখানে বিভিন্ন ধর্ম, দর্শন এবং সামাজিক প্রথা সমৃদ্ধভাবে বিকশিত হয়েছিল। ধর্মনিরপেক্ষ নীতি সেই সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও নাগরিক স্বাধীনতাকে রক্ষা করার জন্য অপরিহার্য। এটি নিশ্চিত করে-যে, ব্যক্তি তার বিশ্বাস বা ধর্ম নির্বিশেষে সমাজে স্বাচ্ছন্দ্যে জীবনযাপন করতে পারে এবং রাষ্ট্র কোনও আদর্শিক চাপ সৃষ্টি করে না।

সুতরাং হিজাব বা অন্য কোনও ধর্মীয় পোশাক শুধু ব্যক্তিগত বা ধর্মীয় বিষয় নয়; এটি সামাজিক নীতি, রাষ্ট্রীয় কাঠামো এবং নাগরিক স্বাধীনতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। ধর্মনিরপেক্ষতা এখানে একটি কার্যকর টুল, যা সমান অধিকার, স্বাধীনতা এবং সামাজিক সামঞ্জস্য রক্ষায় সহায়ক। এটি নিশ্চিত করে-যে, কোনও ধর্ম বা সম্প্রদায়ের বিশেষ দাবির কারণে অন্যদের স্বাধীনতা হরণ হবে না। অনেক দিন আগে বোরকার কারণে একটি ভারতীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মুসকান নামের শিক্ষার্থীর সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনা শিক্ষার্থী ও সামাজিক অধিকার, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং শিক্ষাক্ষেত্রে সমান সুযোগের জটিল দিকগুলো স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে।

মূল বিষয় হলো—একটি ব্যক্তিগত বা ধর্মীয় পোশাক নির্বাচন, যেমন বোরকা বা হিজাব, যদি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার সুযোগ, নিরাপত্তা বা সামাজিক অন্তর্ভুক্তির সঙ্গে সাংঘর্ষিক না-হয়, তাহলে সেটিকে বাধ্যতামূলকভাবে নিষিদ্ধ বা সীমাবদ্ধ করার চেষ্টা শিক্ষার্থীর ব্যক্তিস্বাধীনতা ও অধিকারকে আঘাত করে। একইসঙ্গে, এটি একটি বৃহত্তর নৈতিক ও শিক্ষানীতিগত প্রশ্নও তোলে : শিক্ষার্থীরা শিক্ষাক্ষেত্রে সমানভাবে অংশ নিতে পারছে কি না, এবং কোনও আদর্শিক বা ধর্মীয় ভিন্নতার কারণে তাদের অবহেলা বা বৈষম্যের শিকার হতে হচ্ছে কি না।

ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের নীতিতে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব হলো নাগরিকদের সকল ধর্ম, বিশ্বাস এবং সাংস্কৃতিক পটভূমির মধ্যে সমান সুযোগ নিশ্চিত করা। ব্যক্তিগত পোশাক নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কোনও শিক্ষার্থীকে হেনস্থা করা, বাধা দেওয়া বা অপ্রীতিকর পরিস্থিতিতে ফেলা সেই নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। অন্যদিকে, ওই ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়-যে সমাজে শিক্ষা, ধর্ম ও ব্যক্তিস্বাধীনতার মধ্যে সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখা কতটা জরুরি। শুধু মাত্র আইন বা নীতি নয়, সামাজিক সচেতনতা, সমঝোতা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক মনোভাবও প্রয়োজন, যাতে কোনও শিক্ষার্থী তার ধর্মীয় পরিচয় বজায় রেখেও শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত না-হয়।
. . .

Veiled Threat by by Francesco Bongiorni; Image Source: Collected; Credit: The New Yorker

. . .

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 22

No votes so far! Be the first to rate this post.

Contributor@thirdlanespace.com কর্তৃক স্বত্ব সংরক্ষিত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *