
শঙ্খ ঘোষ প্রতিবাদের কবি। অনিয়মের বিরুদ্ধে সতত প্রতিবাদী সত্তা শঙ্খ ঘোষ। বিভিন্ন সময়কেন্দ্রিক ঘটনাকে কটাক্ষ করতে তিনি কখনোই পিছু হটেন নি। কবিতায় ও জীবনে অন্যায়ের সঙ্গে আপোস করেন নি। তাঁর প্রতিবাদ অধিক আলোচিত এবং সর্বজনজ্ঞাত :
যেদিন নদীর জলে ভেসেছিল দু-হাজার শব
যেদিন পাড়ার সব দুয়ারে কুলুপ আঁটা ছিল
যেদিন শহরজোড়া গাছে গাছে ঝোলা কাটা হাত…
যেদিন পৃথিবী তার সম্বিৎ হারিয়ে ছিল চুপ…
মুখেরা ফসিল আর যেদিন ফসিলই হলো মুখ
সেদিনও কি জানতে চাও তাহলে কবির ধর্ম কী?
—যেদিন
সুতরাং প্রতিবাদ তাঁর কবিতার বীজ। এসবের বহু নমুনা আমর হামেশাই শঙ্খ ঘোষে পাই। এদিকটা নিয়েই বেশি কথা বলি। তাঁর প্রতিবাদের মতো প্রতিরোধের কথাগুলি আরও উদ্দীপক। ওই প্রতিরোধ কবিতাকে হাতিয়ার করে তোলে। স্লোগান বা ইস্তাহার না হয়েও রক্তের চঞ্চলতা বৃদ্ধি করে। যখন ‘শহিদশিখর’ থেকে তিনি বলেন :
এই শতাব্দীর শেষ ভূমিহারাদের কথা বলি
বলি যে জাতক বীজে মাটির কেশর মেখে মেখে
এক মরণের থেকে আরেক মরণে যেতে যেতে
আমার আমির থেকে জেগে ওঠে আরো আরো আমি
—শহিদশিখর
ওই ‘জাতক বীজ’ থেকে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে ‘আরো আরো আমি’। জীবনের চূড়ান্ত অবমাননা দেখেও ওই প্রতিরোধে কবি আশাবাদী। আশাবাদ এটাই ওই ভূমিহারা, ওই ঘরহারা, মেয়েহারা মানুষ বা মায়েরা কখনোই থেমে থাকবে না। জীবনের দাবী নিয়ে, খেতখামারে রাস্তাঘাটে চলতে থাকবে বাঁচার লড়াই :
ওইখানে ওই প্রকাণ্ড রৌরবে
ডাক দিয়েছে আমার মেয়ের হাড়…
এবার থেকে মানছি না আর হার
যাক পুড়ে যাক হলকা লেগে ছাই
যাদের উপর পড়ছে এ নিশ্বাস
স্পষ্ট তারা চক্ষু খুলে রাখ…
এই চলা আর কোথাও থামার না…
—একটি গাথা
এই উদ্ধত আওয়াজের একটাই কারণ, সময়ের নৃশংস কারবার। সমাজের চতুর্দিকে মানুষত্যর চূড়ান্ত অধঃপতন। শব্দের স্বরকম্পনে সেখানে সৃষ্টি হয় গতিময়তা। গতিময়তা রচনা করে ঘূর্ণিঝড়। ঘূর্ণিঝড়ে কবির কথা হয়ে ওঠে বিরোধবাণী। যেখানে প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন, প্রবঞ্চনার বিপরীতে একটি কবিতা মানুষের মেরুদণ্ড সোজা করতে পারে। সমাজের অনিয়মকে শঙ্খ ঘোষ সমগ্র জীবনময় প্রশ্ন করে গিয়েছেন। কবিতায় বা কাজে কখনোই সমঝোতা করেন নি। সমাজকে বারবার ধিক্কার জানিয়েছেন। তাই প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ হয়েছে কবিতার অবলম্বন।
কবি শঙ্খ ঘোষকে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তাঁর কবিতার কিছু সাধারণ লক্ষণ, যা প্রায়শই কবিতাকে সচল-সজীব করে তোলে। যেমন সংলাপ, যেখানে কথার আদলে কিছু কিছু কবিতা সংলাপধর্মী হয়ে উঠেছে। অন্ধবিলাপ কবিতাটি সম্পূর্ণ সংলাপে ধৃত। সে-সংলাপ শুধু ধৃতরাষ্ট্রের। সঞ্জয়কে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে মাত্র। আরুণি উদ্দালক-এ ধৌম্য ও আরুণির কথকতার ছলে বিপদ বা ধ্বংসের যে-বর্তমান জলস্রোত, তাকে আটকানোর কথা বলা হলো। সংলাপের ছলে সেখানে থাকল পুরাণ অবলম্বিত বর্তমানের ছবি—‘চেতাবনি’।
সংলাপের ঠমকে কথাকে কবিতা বা কবিতায় মতের আদান-প্রদানে আত্মগোপন করেছেন কবি। আরুণি কথা বলেছে, কিন্তু কবি নিজে আরুণির অন্তরে অন্বিষ্ট হয়ে আছেন। যেখানে সংলাপ মতবিনিময়ের একটা পন্থা মাত্র। জাবালা সত্যকাম কবিতায় সত্যকামের আন্তরিক কথা সংলাপের মতো উঠে এসেছে। সংলাপধর্মী বাক্যে পিতৃপরিচয়হীন সত্যকামের কাহিনি বহু বহু অনাথ শিশুদের দিকে আঙুল তুলেছে। উপনিষদের সে-গল্পকে সংলাপের মাধ্যমে পরিবেশন না করলে, কাহিনির মূল্য ও অভীষ্ট লক্ষ্য বিঘ্নিত হতো। যে-মর্মবেদনা সত্যকামের জীবনসত্য, সেখানে সংলাপ না দিলে আত্মপরিচয়ের আকাঙ্ক্ষা এত হাহাকার করে উঠত না। ‘কী আমার পরিচয় মা’!—এই আত্মপ্রশ্নটি ঘুরে ঘুরে কাতরতা সৃষ্টি করতে পারত না। ফলত সত্যকামের সে-সংলাপ শত শত পরিচয়হীনদের বাস্তব সত্য হয়ে উঠেছে :
ওরা হাসাহাসি করে, মুখে থুতু দেয়, ঢিল ছুঁড়ে মারে, আমি
পরিচয়হীন জলস্থল সর্বতল আমার বিলাপে কাঁপে পরিচয়হীন।
—তুমি তো তেমন গৌরী নও
সত্যকে আজ ঘুরিয়ে নিলেই এক লহমায় মিথ্যে, আর
মিথ্যেকেই বানিয়ে নিই সত্য
পাতায় পাতায় খুঁজে বেড়াই কে আমাদের শত্রু, যেন
কারোই কোনো বন্ধু নেই কোথাও
—শঙ্খ ঘোষ

শঙ্খ ঘোষ কবিসুলভ মুন্সিয়ানায় সংলাপ সৃজন করে, কবিতাকে আরও ভাবগম্ভীর, আরও সমসাময়িক করে তুললেন। অজস্র অনাথের কথা হয়ে উঠল ওটা। ‘আমাদের এই তীর্থে আজ উৎসব’ কবিতায় যদুবংশ ধ্বংসের কথা বলা হলো। বিষয় মহাভারতের মৌষলপর্ব থেকে নেওয়া। বৈশম্পায়ন মহাভারতের সেই বিনাশের গল্প এই কবিতার মূল ধমনী। আমাদের সময়ের চারিদিকে ঘোরতর তমসার রূপক এই কবিতা। সে-গল্পে সংলাপধর্মীতা এলো যাদবদের আত্মবর্ণনায় :
যাদব, আমরা বৃষ্ণি কিংবা অন্ধক
সাত্যকি বা কৃতবর্মার দল
মদ আমদের আত্মঘাতের ভবিতব্য, বারণ ছিল
এ উৎসবে সবাই আজ মাতাল
—আমাদের এই তীর্থে আজ উৎসব
এই সংলাপ শুধু সেদিনের নয়, আজকেরও চালচিত্র। এই সংলাপ জেনেবুঝে নিজেদের ধ্বংসের ইতিকথা। শঙ্খ ঘোষ যে-কবিতায় পুরাণকে আশ্রয় করেছেন সেখানেই এই সংলাপরীতি লক্ষিত হয়। কথার পর কথা সাজিয়ে কথা বলে যায় কবিতার চরিত্ররা, যাঁরা মিশে যায় আমাদের সঙ্গে। তাহলে এরূপ সংলাপ সৃজনের পিছনে কবির স্বপ্রণোদিত মনোভাব স্পষ্ট। কথার ছলে অতীত বর্তমানকে এক করে দেয় ওসব কথামালা। আবার ওসব কথামালাতে লেগে থাকে নাটকীয়তা। বিশেষত পুরাণ কেন্দ্রিক কবিতাগুলিতে নাট্যগভীরতা আছে, আছে স্থান থেকে কালের চলমানতা। প্রেক্ষাপটে মহাকালের বিস্তীর্ণ বিষক্রিয়া, জীবন অন্বেষণের আকুলতা। বিভিন্ন চরিত্র, বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে নাটকের মেজাজ সেখানে সহজলভ্য। আবার শুধু পুরাণ কাহিনি অবলম্বন নয়, আধুনিক সময়ের নানা কথাকাহিনি তুলে ধরতে শঙ্খ ঘোষ আশ্রয় নিলেন সংলাপধর্মী বাক্যের। বাবুমশাই কবিতার প্রথমেই যে-বললেন :
আশা করি সকলেই বুঝবেন যে এই ধরণের
রচনা পড়বার বিশেষ একটা সুর আছে।
—বাবুমশাই
—সেটা অনেকটাই সংলাপমুখী। ‘ভাই’, ‘বাবুমশায়’, ‘সাহেব’ সম্বোধনে কলকাত্তাই কথার অবতারণা অনেকটা কথকতার তালে উঠে এলো। একটু মশকরার যে-কথা উঠে এলো, সেখানে দুজন কথা বলছে। একজন কথক, অন্যজন বাবুমশাই বা বাবুমশায়ের বক্তব্যকে উদ্ধারচিহ্ন দিয়ে কথক পরিবেশন করেছেন। এই সংলাপে কলকাতার হালহকিকত যে-সুরে উঠেছে, সেখানে দ্রুত কথার লয় হয়েছে শ্রুতিমধুর ও বিবেকবিধুর। ‘ভিখারি বানাও কিন্তু তুমি তো তেমন গৌরী নও’ কবিতায় কেউ একজন ‘সুন্দরী’কে কতগুলি প্রশ্ন রাখলেন : ‘আমাকে কি নিতে চাও?’ ‘আমাকে কি নেবে তুমি?’ সঙ্গে কিছু অভিমত রাখলেন :
চাও শুধু সমর্পণ, একে একে সব নাও খুলে
মেদ মজ্জা হৃদয় মগজ
তারও পরে চাও আমি খোলাপথে হাঁটু ভেঙে বসে
হাতে নেব এনামেল বাটি।
—ভিখারি বানাও কিন্তু তুমি তো তেমন গৌরী নও
এই জিজ্ঞাসা ও অভিমতে সংলাপের চরিত্র লুকানো থাকে না। যার একপ্রান্তে ‘ভিখারি’-স্বরূপ কথক যে-কথাগুলো বলেছে, সেখানে আছে ‘সমর্পণ’ সর্বস্বতা। যাকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে সেই গৌরী অন্নপূর্ণা কিন্তু প্রতিসংলাপে আসেন নি। সুতরাং একক কথাব্যয়ে কবিতা যে- সংলাপের মধ্যমে তার মূল বক্তব্য তুলতে সক্ষম সেটাও শঙ্খ ঘোষ দেখিয়েছেন।
আমরা জানি সংলাপ, নাটক গল্প উপন্যাসে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু কবিতায় যখন ব্যবহৃত হয়, তার পিছনে কোনো উদ্দেশ্য লুকিয়ে থাকে। কর্ণ কুন্তি সংবাদের আদলটি আমাদের মনে আসতে পারে। তাতে কবিতার মাঝে রেখে দেওয়া যায় জীবনের মূল্যাঙ্কন, গভীরতা। কবিতা হয়ে উঠতে পারে বৃহৎ কথার ক্ষুদ্র সারাৎসার। সংলাপের মাধ্যমে আত্মকথনের ভঙ্গিমা ছুঁয়ে যায় আমাদের সকলকে। তুলে ধরে সময়ের পরিপ্রেক্ষিত। আবার এই সংলাপ তখন শুধু কবির কথা থাকে না, হয়ে ওঠে সময়ের দলিল। সংলাপ যেমন শ্রুতিগ্রাহ্যতা অর্জন করে, কবিতায় ঘন ঘন নাট্যমুহূর্ত রচনা করতে পারে, তেমনি মহাকাব্যের ক্ষুদ্র সংস্করণ হয়ে, হয়ে উঠতে পারে কবিতা।
সংলাপ ‘বাবুমশাই’ কবিতাকে কলকাতার চলচ্চিত্র করতে পারে। সংলাপ ‘অন্ধবিলাপ’ কবিতাকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ মানুষের বাস্তব গল্পে পরিণত করে। কবিতায় তড়িৎ ঝলসাতে পারে সংলাপ, কান্না সজল আর্তদের নাম না জানা চরিত্রে পরিণত করতে পারে। তখন সাধারণ মানুষগুলিকে আমরা চিনতে শিখি। জাবালা সত্যকামকে আমরা রাস্তাঘাটে চিনতে পারি। তাদের মুখের কথা না শুনলে কবিতা হয়তো অতটা বাস্তবমুখী হতো না, কাব্যিকতা আর বাস্তবতার মধ্যে কিছুটা দূরত্ব থেকেই যেত। সংলাপ সেই দূরত্ব মোচন করতে সক্ষম। সংলাপ ভেঙে দিতে পারে প্রচলিত ধ্যানধারণাকে। কথার ব্রহ্মশক্তিকে এভাবেই শঙ্খ ঘোষ সংলাপে সংলাপে তুলে ধরেছেন। প্রচলিত কবিতা নিয়মের বেড়িকে কিছুটা খণ্ডন করতে সংলাপের আশ্রয় নিয়েছেন :
লোকে বলল পাগল, লোকে বুঝেও নিল মাতাল
তা বলে…ভরদুপুর…?
দুপুরবেলাই? বাঁধো ওকে! মাথায় ঢালো জল
হাতে পরাও বেড়ি!
‘বেড়ি? না কি রুপোর মালা?’ ব’লে যুবক সবার
ঠিক করে দেয় টেরি।
ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল সবাই ‘এইরকমই হবে,
আকাল, মশাই, আকাল।’
গোরুর পিঠে দাঁড়িয়ে যুবা বলে ‘এবার আমিই
এই শহরের রাখাল।’
—এই শহরের রাখাল

পঞ্চাশের বাতাবরণে শঙ্খ ঘোষের যে-কাব্যচর্চা সেখানে কটাক্ষের উদগীরণ আসাটা স্বাভাবিক। কটাক্ষ, সুবিধাবাদী সুযোগসন্ধানীদের মুখোশ খুলতে চেয়েছে। সমাজ চলাচলে নিষ্পেষণের নানা নগ্নতায় রুষ্ঠ কবি কটাক্ষ করতে ভীত হন নি। কেনই বা হবেন, সমাজনীতি যেখানে ভ্রষ্ট, যেখানে পুলিশ বলে ‘ন্যায়-অন্যায় জানিনে’, সেখানে কটাক্ষের কষাঘাত আসাটাই স্বাভাবিক। ওই কটাক্ষ তাঁর কবিতাকে আরও স্পেসিফিক করে তোলে। বিষয়কে লহমায় সময়সিদ্ধ করে :
সোনার ছেলেরা ছারখার
অল্প দু-চারজন বাকি থাকে যারা
তেল দেয় নিজের চরকায়
মাঝে মাঝে খড়খড়ি তুলে দেখে নেয়
বিপ্লব এসেছে কতদূর
—ক্রমাগত
এখানে ‘অল্প দু-চারজন’ বলে কবি যাদের কটাক্ষ করলেন, তারা অল্প নয়, সমাজের বেশিরভাগ জনগণ তারা। আপন মতলবে যারা মগ্ন। খড়খড়ির আড়ালে যারা লুকিয়ে থাকে, সুযোগ বুঝে বেরিয়ে আসে। আর ছারখার হয় সোনার ছেলেরা। ‘সমাজসেবক’ কবিতায় শঙ্খ ঘোষের কলম আরও শাণিত :
সমাজ পালটাও! সমাজ পালটাও!
সমাজ ছাড়া কোন কথা নেই।
(কী বাবা! এইখানে? এমন মানীগুণী
আমার ঠাঁই হলো বাগানে?)
সমাজ পালটাও। ওকে যে কুরে খায়
মধ্যবিত্তের ভাঁওতা
যা-কিছু ক্ষীরননী দু’হাতে নিয়ে যায়
নিজের নিজের আওতায়।…
(হে বাবা। ততদিনে গোপন মসলিনে
আমার হয়ে যাক প্রমোশন।)
—সমাজসেবক
এসব কবিতা মানুষের চরিত্র খুলে দেয়। কবিতায় এসব কটাক্ষের অনুপাত কম হলেও, যেখানে যেখানে তা এসেছে, সেখানে কবিতা, রস অপেক্ষা ছলচাতুরির রসায়ন হয়ে উঠেছে। বাবুমশাই কবিতায় বাবুদের অভিনয়, ভিতরের মুখটি কবি কটাক্ষের স্পর্শে তুলে ধরলেন। যারা নিজেদের ‘বিশয়-আশয়’ বাড়াতে ব্যস্ত, মুখের স্তোকবাক্যে যারা ভেকধারী। কটাক্ষের ভিতরে যেমন চাপা ক্রোধ থাকে, স্বরূপ উদ্ঘাটনের প্রয়াস থাকে, তেমনি কটাক্ষ হয়ে ওঠে বাস্তবতা প্রদর্শন। বাজার চলতি ভাঁওতাবাজির খেলা :
মিত্র বাবুমশয় বিষয়-আশয় বাড়িয়ে যান তাই
মাঝেমধ্যে ভাবেন তাদের নুন আনতে পান্তাই
নিত্য ফুরোয় যাদের
… … …
সে কি যেমনতেমন লোক
সব অমাত্য
তাই সব অমাত্য পাত্রমিত্র এই বিলাপে খুশি
‘শুঁড়িখানাই কেবল সত্য, আর তো সবই ভুষি
ছি ছি হায় বেচারা!
—ওই ‘হায় বেচারা’ ওদের কুমিরের কান্না।
—বাবুমশাই
শঙ্খ ঘোষের কটাক্ষ শুধু সমাজপতিদের খোঁচা দেয় না, পাঠককে শুধু সচেতন করে না, উপরন্তু চাপা ক্ষোভ উগরে দেয়। কটাক্ষের হাত ধরে কবিতা হয়ে উঠতে চায় প্রতিরোধকামী, সংস্কারমূলক। শঙ্খ ঘোষ কটাক্ষের কাঁটায় যাদের বিঁধতে চেয়েছেন, তারা সমাজের মাথা, ক্ষমতাধর তারা। কটাক্ষের সুরে যাদের জাগাতে চেয়েছেন তারা সাধারণ মানুষ। মানুষের ন্যূনতম অধিকারের জন্য আওয়াজ তুলেছে ওসব কবিতা। নগর কলকাতায় এরকম মানুষদের নানারকম ভোলবাজি চলতেই থাকে। কবি দিনরাত তা প্রত্যক্ষ করেন। কখনো সরাসরি প্রতিবাদে কখনো আত্মতাপে শ্লেষাঘাত করতে বাধ্য হন। সেখানে বক্রোক্তিমূলক হয়ে ওঠে বিবরণ :
আমারে কেউ পুছত না
কইলকাত্তার পথে ঘাটে অন্য সবাই দুষ্ট বটে
নিজে তো কেউ দুষ্ট না।
—কলকাতা
দুষ্টদের সমাজ-দূষণ এখানের কটাক্ষের মূল অভিসন্ধি। এসব কথা বাঁকা হতে পারে, কিন্তু তার উত্তাপ অনেকটাই বেশী। হতে পারে এসব কথা সমালোচনামূলক, যেখানে কবির আত্মদহন ফেটে পড়ে। কিন্তু কবিতার বা কবির ‘দায়’-যে অনেক। কেননা কবিতার শিল্পকর্ম শুধু নান্দনিকতার উপর দাঁড়িয়ে থাকে না, তার সামাজিক, মানবিক দায় থাকে। থাকে ব্যক্তিকবির দায়িত্ববোধ। কবিও সমাজসংস্কারক, একথাকে আমরা কথা দিয়ে চেপে যেতে পারি না। কার্টুন শিল্পীদের কাছে কটাক্ষ যেমন ছবির মূলাক্ষ, তেমনি শব্দশিল্পী কবির কাছে কটাক্ষ তাপ পরিবহনের মাধ্যম। সুতরাং কবিতায় কটাক্ষ আসে সেই ‘দায়’-এ পড়ে। আবার এই দায়-এর সমাজে চালু কারবার দেখাতে গিয়ে, উল্টোপিঠে কবি তাদের দেখতে পান, যাদের দায় কটাক্ষের নামান্তর :
সে অবশ্য এখন একটু ব্যস্ত, তার অনেকরকম দায়।
পৃথিবীটা একটুখানি ঠিকঠাক করে দেবার দায়
তোমার বসতবাড়িতে ঘুঘু চরাবার দায়
তোমার সবটুকু নিশ্বাস শুষে নেবার দায়…
—দায়

কবিতার মাঝে কবি সজ্ঞানে বা অবচেতনে কিছু বৈশিষ্ট্য রেখে দেন। আমরা পাঠের পর পাঠে সে কাব্যাঙ্গিক কিছুটা বুঝতে পারি। এই বিষয়টি কমবেশি সব কবির মধ্যে দেখা যায়। যে-বৈশিষ্ট্য প্রতিটি কবিকে স্বতন্ত্র করে তোলে। শঙ্খ ঘোষের কবিতার সেরকম একটা ধরন হল পুনরুক্তি। পুনঃপুন একই কথার ঢেউ সেখানে লেগে থাকে। একই কথা ঘুরেফিরে কবি বলেই চলেন। এর পিছনে কবির মনস্তত্ত্ব কী সেটা আমাদের ভাবিয়ে তোলে। যে-কথা বা বাক্য একবার ব্যবহার করলেই হয়, সে-বাক্য বারবার ব্যবহার করার যথার্থতা কোথায়? তাঁর ‘রাস্তা’, ‘ঘর : ২’, ‘সময়’, ‘চাবি’, ‘পুতুলনাচ’, ‘দল’, ‘নিগ্রো বন্ধুকে চিঠি’, ‘খরা’, ‘দেশ আমাদের আজও কোনো’, ‘স্লোগান’ প্রভৃতি কবিতায় একই কথার ঘোরাফেরা আছে।
পুনঃপুন একইকথা শ্রুতিদ্রুতি তৈরি করতে পারে, কবিতায় নাটকীয়তা রচনা করতে পারে, একই শব্দ বিশেষ তাৎপর্যে পৌঁছে যেতে পারে। আমরা যদি ‘আমাদের এই তীর্থে আজ উৎসব’ কবিতাটি দেখি তাহলে দেখব নামকরণের সঙ্গে নামকরণ বাক্যটি (আমাদের এই তীর্থে আজ উৎসব) কবি ছ’বার উচ্চারণ করলেন। প্রায় একই বাক্য রাখলেন আরও ছয়টি :
‘আামাদের এই তীর্থে ঘোর উৎসব’ (দু’বার)
‘আমাদের এই তীর্থে আজ ভেঙে পড়ার উৎসব’
‘আমাদের এই তীর্থে শেষ উৎসব’ (তিনবার)
এসবে ‘আজ’ শব্দটিকে প্রতিনিধিত্ব করল ‘ঘোর’ বা ‘শেষ’ শব্দদুটি। সঙ্গে থাকল ‘ভেঙে পড়ার’। একদিকে ‘আজ’ আর অন্যপ্রান্তে ‘শেষ’ শব্দদুটি যেন দুই মেরুশব্দ। ‘আজ’ মানে বর্তমান আর ‘শেষ’ মানে আগামীর সূত্রপাত। যেখানে ‘আজ’ ‘ঘোর’ দুর্নীতিতে ভেঙে পড়েছে। শুরু হয়েছে শেষের আয়োজন। শুরু শেষের মাঝে যে-উৎসব, সে-উৎসব জীবনের :
আমাদের এই তীর্থে শেষ উৎসব
ধ্বংস আর বিশ্বাসের, বিনষ্টি আর সৃষ্টিমুখ।
—আমাদের এই তীর্থে আজ উৎসব
বিনাশ আর সৃষ্টির সেই চিরন্তন উৎসবকে তুলে ধরা কবির অভীষ্ট। যদিও যদুবংশ ধ্বংসের কাহিনিতে এই কবিতা ধৃত, তবুও তা অতীত থেকে বর্তমানে ধৃত। জীবনতত্ত্বের রূপক ওই উৎসব। ‘বিনাশ আর আনন্দের উৎসারের’ প্রতীক ওই উৎসব। পৃথিবী তীর্থে সে বিনাশ-সৃষ্টির উৎসব আজকের প্রেক্ষাপটে শঙ্খ ঘোষ তুলে ধরেছেন। ফলত ওই ঘূর্ণায়মান বাক্যটি বিশেষ তাৎপর্য যেমন রাখে, তেমনি তা জীবনের নাট্যমঞ্চকে তুলে ধরে। বাক্যে ঘোরাফেরা করে হয়ে ওঠে শ্রবণগ্রাহ্য। পুনরুক্তিকে তখন আমাদের কাব্যত্রুটি মনে হয় না, তা হয়ে ওঠে ইঙ্গিতবাহী। পুনরুক্তি কবিতাকে শক্তি প্রদান করতে পারে। কথার ধার বাড়িয়ে তুলতে পারে। ‘শব্দের সংসার’-এ ঝংকার তুলে হয়ে উঠতে পারে ‘স্লোগান’ :
এমনিভাবে থাকতে গেলে শেষ নেই শঙ্কার
মারের জবাব মার
বুকের ভিতর অন্ধকারে চমকে ওঠে হাড়
মারের জবাব মার
… … …
কিন্তু তারও ভিতরে দাও ছন্দের ঝংকার
মারের জবাব মার
কথা কেবল মার খায় না কথার বড়ো ধার।
—স্লোগান
কবির রোষ এখানে চরমে প্রকাশিত। মারের জবাব মার;—এরকম সোজা বাক্য, কথাকে চাবুক করে তুলেছে। কথার কষাঘাতে তীব্র আক্রোশ পুনঃপুনঃ প্রকাশিত। বাক্যের পুনরুক্তি হয়ে উঠেছে স্লোগানের মতো। কেন কবির এত উত্তাপ, কেন এত মারমূর্তি বাক্য! তার উত্তরটি লুকানো আছে ‘দেশ আমাদের আজও কোনো’ কবিতায় :
জঙ্গলের মাঝখানে কাটা হাত আর্তনাদ করে
গারো পাহাড়ের পায়ে কাটা হাত আর্তনাদ করে
সিন্ধুর স্রোতের দিকে কাটা হাত আর্তনাদ করে…
সমুদ্রে গিয়েছে তার ঢেউয়ের মাথার থেকে হাজার হাজার ভাঙা হাড়
আলের ভিতর থেকে হাজার হাজার ভাঙা হাড়
চূড়া বা গম্বুজ থেকে হাজার হাজার ভাঙা হাড়…।
—দেশ আমাদের আজও কোনো
শঙ্খ ঘোষের সময়কাল সৌন্দর্য সম্ভোগের ছিল না। কাব্যশৈলীতে নান্দনিকতা অপেক্ষা জীবন-জিজ্ঞাসা ছিল অনেকবেশি। অনাবিল প্রকৃতিপ্রেম বা মানবীপ্রেমের অবস্থান তাঁর কবিতায় নাই বললেই চলে। যৌনতা বা ব্যক্তি শঙ্খ ঘোষের চাওয়া-পাওয়াও সেখানে নেই। তাঁর কবিতায় মানুষের বেঁচে থাকার আয়োজন আছে। আছে মানুষকে বাঁচিয়ে তোলার তাগিদ। তাঁর পূর্বাপর কাব্যে যে-চেতনা তা সম্পূর্ণ মানবতাবাদে নিমজ্জিত। মানুষের হাত থেকে মানুষকে রক্ষা করা, তাঁর জীবনধর্ম যেন।
এই-যে সমাজকে বা মানুষকে সুস্থ রাখার অভিপ্রায়, সে অভিপ্রায়ে তাঁর কণ্ঠে চলে আসে কিছু নির্দেশমূলক বাক্য। এ-নির্দেশ কোন শিক্ষক মহাশয়ের নির্দেশ নয়, একজন মানুষ হয়ে অন্যজনের প্রতি সহানুভূতি-সমবেদনা আর আত্মরক্ষার বীজ ওগুলি বা অনুরোধ। আত্মবলিষ্ঠতায় আত্মজাগরণ ও শুভবাদের কথা ওগুলি। নির্দেশগুলিকে আদেশ ভাবলে আমরা ভুল করব। কেননা ওখানে মিশে আছে কবির আকুতি ও সহমর্মিতা। পথ বাতলে দিতে গিয়েই সেসব বাক্য নির্দেশমূলক হয়ে উঠেছে।

শতাব্দীর বুরিনামা গাছের নিবিড়ে ওই
ব্যবহারহীন জল থেকে,
একজন দেখে- দূরে- কখনো দেখেনি আগে
এমন আনন্দমুগ্ধ দেশ
এমন আপনমুগ্ধ ঢল নামে, তার পাশে
এমন শরীরসঙ্গহারা
হয়তো-বা একজন ধর্মহীন বর্মহীন
নির্বাসনে যায়, মনে রেখো
।
কবি যদি সমাজের চালচিত্র পরিবেশক হন, তাহলে পথ দেখিয়ে দেওয়াটাও তাঁর আরেকটা কাজ। কোন পথে মানুষের পরিত্রাণ ঘটবে! কোন দিকে মানুষ যাবে! সময়ের জাঁতাকলে বেঁচে থাকার উপায় কী? এসব জিজ্ঞাসা নিশ্চয় কবিকে ভাবিত করে। সেই তাড়নায় কবিতা নির্দেশের চেহারা নিতেই পারে। প্রায় সব কবিই নির্দেশ দিয়ে থাকেন, কেউ প্রত্যক্ষ কেউ ইশারায়। শঙ্খের দিকদিশা সেক্ষেত্রে অনেকটাই সোজাসাপটা :
রাস্তা কেউ দেবে না, রাস্তা করে নিন
মশায় দেখছি ভীষণ শৌখিন—
… … …
রাস্তা কেউ দেবে না, রাস্তা করে নিন।
(রাস্তা)—নির্দেশ কখনও আকুতিভরা আহ্বান :
যে চায় তাকে আনিস
যে চায় তাকে আনিস…
ঘরের কাছে আছে অনেক মানুষ।…
ঘরের কাছে আছে ঘরের মানুষ!
—ঘর : ২
এ-কবিতার ঘর আর যে-অর্থ তুলে ধরুক না কেন, এখানে মানুষে মানুষে এক হওয়ার আহ্বান আছে, আছে একত্রিত হবার নির্দেশনামা। কখনো বাবুমশায়দের বলছেন :
হেঁটে দেখতে শিখুন ঝরছে কী খুন দিনের রাতের মাথায়
আরেকটা কলকাতায় সাহেব আরেকটা কলকাতায়।
—বাবুমশাই
কখনো বাক্য হয়ে উঠছে সতর্কতামূলক :
খুবই দেখেশুনে বৈঠা বাইতে হবে
ওত পেতে আছে ঘাটে ঘাটে ঘড়িয়াল—
—অপমান
এই নির্দেশ থেকে থেকে হয়ে যায় সচেতনামূলক, উদ্দীপক :
আমি কি তোমার দৃষ্টি চেয়েছি?
চেয়েছি কি কোনো জীবনছবি?
তোমার কাছে যা চেয়েছি সে শুধু
হও স্লোগানের জোগানদাতা।
তা যদি না হও আমিও নাচার
কোন পথ নেই তোমার বাঁচার—
তাকে আজ আর কীভাবে নামাব
ঘাড়ে চেপে আছে যে-মান্ধাতা।
—কবি
শঙ্খ ঘোষের কবিতা এরকম নানা বৈশিষ্ট্য নিয়ে গড়ে উঠেছে। একই প্রসঙ্গের অবতারণা তার মধ্যে একটি। যেমন ঘর বা বাড়ির প্রসঙ্গ, ভিখারির প্রসঙ্গ। কবি এমন এক বাড়ি বা ঘর চাইছেন যার চত্বর মন থেকে বাহির ভুবনে। যে-‘ঘরে উদ্যত বন্ধুতা।’ কবি ঘর থেকে পথে গেলেও ‘ঘর থেকে ঘর আর হাজার দুয়ার যায় খুলে।’ (পাঁজরে দাঁড়ের শব্দ : ৩০) সে-ঘর দেওয়ালের প্রাচীর ছেড়ে সীমান্তে সীমান্তে বিস্তৃত। আবার ভিখারিরা তাঁর কবিতায় মাঝেমাঝে উপস্থিত হয়েছে। কখনো বুড়ি হয়ে, কখনো এনামেলের বাটি হাতে, পথে বসা উলঙ্গ ভিখারিনি হয়ে। যাদের কবি পথেঘাটে প্রত্যক্ষ করেছেন। কবিতায় কখনো ফিরে আসছে ‘হাড়’-এর প্রসঙ্গ। একাধিক কবিতায় সে-হাড় হয়ে উঠছে মানুষের যন্ত্রণার রূপক :
হাড় হয়ে আছে ঘাস
একা পেলে তারা পায়ে বিঁধে বলে :
কিছু কি শুনতে পাস?
—দশক
তাঁর বহু কবিতায় এ-প্রসঙ্গ ধরা দিয়েছে। সে কবিতা হোক ‘জন্মদিন’, ‘যেদিন’, দেশ আমাদের আজও কোনো, ‘একটি গাথা’ বা ‘বাজার’। কবি দেখেছেন হাজার হাজার হাড়—‘মাটি থেকে উঠেছিল শুধু কচি হাড়’। যেখানে ভিখারির অবস্থান কবির সহমর্মিতা দেখিয়ে যায়, পক্ষান্তরে হাড় হয়ে ওঠে প্রতীক :
আমার হাড়ে পাহাড় করো জমা—
মাটি আকাশ বাতাস যখন তুলবে দুহাত, আমার হাড়ে
অস্ত্র গোড়ো, আমায় কোরো ক্ষমা।
—কবর
প্রসঙ্গ হয়ে ফিরে আসে পাঁজর, চোখ, মুখ। থাকে অন্ধত্ব। থাকে জল :
জল কি তোমার কোনো ব্যথা বোঝে?…
জল কি তোমার বুকে ব্যাথা দেয়?
—জল
কিংবা :
যদি জল সামনে থাকে
অতলে বাঁধবে তাকে…
জলে কি মন ছিল না?
—মেয়েদের পাড়ায় পাড়ায়
তাঁর ‘অলস জল’, ‘জল’, ‘এই নদী একা’, ‘বৃষ্টিধারা’, ‘খরা’ প্রভৃতি কবিতায় জল হয়েছে প্রসঙ্গ। কখনো ফিরে ফিরে এসেছে ভাষা’র প্রসঙ্গ। যে-ভাষা হবে কবিতার অবলম্বন :
তোমার ভাষা হোক প্রথম আবির্ভাবের মতো শুচি, কুমারী—শষ্পের মতো গহন গম্ভীর।
ভাষা কখনো এসেছে এভাবে :
সহজের ভাষা তুমি ভুলে গেছ।…
জলের ভিতরে কত মুক্তিপথ আছে ভেবে দেখো।…
তবে কি তোমার কোনো নিজস্ব গরিমাভাষা নেই?
—কথার ভিতরে কথা
এভাবে ‘ভাষা’, ‘এমনি ভাষা’, ‘কথার ভিতরে কথা’, ‘ছন্দের ভিতরে এত অন্ধকার’, ‘শেকল বাঁধার গান’ প্রভৃতি কবিতায় ভাষাপ্রসঙ্গ এসেছে ঘুরেফিরে।
. . .
. . .
… থার্ড লেন স্পেস-এ প্রাসঙ্গিক আরো দেখুন …
কবি ও ঈশ্বর : অলোকরঞ্জন ও আরোনোফস্কি
হেটামারানি জীবন ও তারাপদ রায়ের কবিতা
. . .

লেখক পরিচয় : শিবশঙ্কর পাল
পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার সাদাশিবপুরের সন্তান ড. শিবশঙ্কর পাল গবেষণা সূত্রে লেখালেখিতে জড়িয়ে পড়েন। গত শতকে আশির দশকের গোঁড়ায় তাঁর জন্ম। লোকসংস্কৃতির খনি বীরভূমে বেড়ে ওঠার সুবাদে আধুনিক সাহিত্যের সঙ্গে লোকায়ত জীবন-সংস্কৃতির বিচিত্র অনুষঙ্গকে গবেষণার আধার করে নিয়েছেন।
দুই বাংলার সাহিত্যপত্রিকা, জার্নাল ও ছোটকাগজে সাহিত্য ও লোকসংস্কৃতি বিষয়ে লিখছেন নিয়মিত। প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে ‘আধ্যাত্মিকতা ও বিজ্ঞান’; ‘কলিযুগ’, ‘শঙ্খ ঘোষের মন ও মনন’ এবং লোকসংস্কৃতি বিষয়ে গবেষণাগ্রন্থ ‘বঙ্গের লুপ্তপ্রায় লোকশ্লোক সংগ্রহ ও বিন্যাস’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। লোকায়ত সমাজে একসময় প্রচলিত প্রবাদ-প্রবচন-শ্লোকের তালাশ, শ্রেণিকরণ ও ভাবার্থ ব্যবচ্ছেদ তাঁর বইকে জরুরিপাঠ্য করেছে। বইয়ের নাম-ভূমিকায় শিবশঙ্কর লিখছেন :

“প্রবাদ-প্রবচন-শ্লোক আমাদের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। যা এককালে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অঙ্গ ছিল। মা, মেয়েদের কথায় কথায় শোনা যেত। বর্তমানে শ্লোক বা প্রবাদের ব্যবহার দিন দিন কমছে। কাজের নিরিখে, বিষয়ের নিরিখে মুখে মুখে ফিরত শ্লোক-পাঁচালি। একালে এসে যা পরিণত হয়েছে সংরক্ষণের বিষয়ে। কিছু শ্লোক-প্রবাদ একেবারে অবলুপ্ত। কিছু খুবই কম শোনা যায়। যা মৃতপ্রায়। লুপ্তপ্রায়। সে-সব লুপ্তপ্রায় বা মরতে বসা কিছু গ্রাম্য শ্লোক এখানে রাখা হল। যা এখনও গ্রাম-গঞ্জ-নগরে কদাচিৎ শোনা যায়। তা যথেষ্ট অর্থবহ। তাৎপর্যপূর্ণ। ততোধিক কালের জীবনযাত্রা, অভিজ্ঞতার সারাংশ। এখানে পূর্ববঙ্গ, পশ্চিমবঙ্গ, উত্তরবঙ্গ, দক্ষিণ বঙ্গের সে-রকম কিছু শ্লোক তুলে ধরা হল। শুধু অঞ্চল নয়, এখানে নানা জনজাতিরও কিছু কিছু লোকশ্লোক তুলে ধরা হয়েছে। যেমন মেচ, রাভা, টোটো, রাখাইন, লিম্বু, ডুকপা, সাদরি প্রভৃতি। যা স্বল্পশ্রুত। স্বল্পব্যবহৃত। প্রায় অবলুপ্ত।”
সাহিত্য বিষয়ক প্রবন্ধ-নিবন্ধ ও গবেষণাধর্মী রচনা ছাড়াও গল্পও লিখে থাকেন। ‘স্খলনকালের গল্প’ শিরোনামে গল্প সংকলন বেরিয়েছে ইতোমধ্যে। ‘রৌদ্রের পালক’ ও ‘সাহিত্যের দিগদর্শন’ নামে দুটো বই যন্ত্রস্থ রয়েছে।
কবিতার পাঠ-ব্যবচ্ছেদ শিবশঙ্করকে টানে প্রবল। শঙ্খ ঘোষ ও জীবনানন্দ দাশের কবিতা নিয়ে দুটো বই মূলত সেই টানে লেখা। জীবনানন্দ দাশের কবিতায় মর্মরিত প্রকৃতি, জীবজন্তু ও কীটপতঙ্গ নিয়ে তাঁর অবলোকনধর্মী আলোচনা পাঠককে ঋদ্ধ করে।
. . .

অবদায়ক : শিবশঙ্কর পাল : থার্ড লেন স্পেস.কম


