পোস্ট শোকেস - সাহিত্যবাসর

কবিতা ‘অন্তর্গত ভাষা’-১ : ফজলুররহমান বাবুল

Reading time 5 minute
5
(7)

ক বি তা সি রি জ

কবিতা ‘অন্তর্গত ভাষা’-১
ফজলুররহমান বাবুল

Conceptual Artwork-I, in collaboration with Gemini; @thirdlanespace.com

১.
কবিতা কোনও কথার আধার নয়,
একটি জানালা—
যা খুললে দেখা যায়
শব্দেরা তাদের অভিধান ছেড়ে
ঘাসের মতো জন্ম নিচ্ছে।

কবিতা একটি আয়না নয়,
বরং আয়নার পেছনের অন্ধকার—
যেখানে মুখের বদলে
কেবল কোনও অনুপস্থিতি জ্বলে।

আমরা ভাবি,
আমরা লিখছি কবিতা…

কবিতা দেখে—
আমাদের অনুভবের ভিতরে
আরেকটি মানুষ
ধীরে ধীরে নিজেকেই লিখে চলে।
. . .

২.
কবিতা কোনও জলধারা নয়—
তবু তার অক্ষর-অন্তর্লীন প্রবাহপথে
নেমে আসে অসংখ্য মেঘের ভাসমান স্মৃতি।

যেখানে জমা থাকে
অকাশ-অতিক্রান্ত বৃষ্টি-অপেক্ষার দীর্ঘ নিশ্বাস,
বহু-দূরে হারিয়ে যাওয়া ঋতুর ক্ষীণ-সংকেত
এবং অদৃশ্য বিষণ্নতার জলরেখা।

সে জানে—

আকাশ যখন প্রথম কাঁদে,
তখন মৃত্তিকা কীভাবে
নিজের বুক খুলে দেয়
অপেক্ষার জন্য।

কখনও কবিতা
টিনের চালে পড়া একটি একাকী শব্দ,

কখনও
ভেজা রাস্তায়
পায়ের ছাপ মুছে যাওয়া একটি অর্ধেক গল্প।

আমরা ভাবি,
বৃষ্টি শুধু ভিজিয়ে দেয়…

কবিতা দেখে—
বৃষ্টি আসলে
মৃত্তিকার সঙ্গে আকাশের
দীর্ঘ পুনর্মিলন।

কখনও সে
ফসলের গায়ে লিখে দেয় নতুন আশ্বাস,

কখনও
পুরনো ধুলো ধুয়ে
নিয়ে আসে কোনও ভুলে যাওয়া নাম।

কবিতার কাছে
বৃষ্টি কোনও ঘটনা নয়—

সে এক অন্তর্গত ভাষা;
যেখানে প্রতিটি ফোঁটা
একটি করে ফিরে আসা।
. . .

৩.
কবিতা কোনও পুথি নয়—
ব্রহ্মার অদৃশ্য খাতা,
যেখানে আজও লেখা হচ্ছে
অসমাপ্ত পৃথিবীর প্রথম পঙক্তি।

তার শিরায় বয়ে যায়
স্বর্গীয় গঙ্গা-যমুনা,
তার নিশ্বাসে জেগে ওঠে
শঙ্খ, চক্র, ত্রিশূলের পুরনো ধ্বনি;
আর দেবতারা
ভুলে যাওয়া উপমার মতো
বসে থাকে শব্দের প্রান্তে।

কবিতা কখনও
ইন্দ্রের সভা থেকে চুরি করে আনে মেঘ,
কখনও যমের অন্ধকার ভান্ডার থেকে
একমুঠো নীরবতা।

আর, আমরা তাকে পড়ি…

কবিতা দেখে—
আমাদের কপালে জ্বলছে
কোনও-এক বিস্মৃত ঋষির অনুচ্চারিত মন্ত্র।
. . .

৪.
না, কবিতা কোনও দলিল নয়—
তবু তার পাতার ভিতরে
ঘুমিয়ে থাকে বহু সাম্রাজ্যের ধুলো।

সে দেখেছে—
অশ্বের খুরে উড়ে যাওয়া রাজপথ,
পুড়ে যাওয়া গ্রন্থাগারের ধোঁয়া,
এবং বিজয়ীর তলোয়ারে পরাজিতের মুখ।

কখনও কবিতা
পিরামিডের ছায়া থেকে কুড়িয়ে আনে শব্দ,
কখনও মহেঞ্জোদারোর ইট ছুঁয়ে
শুনে নেয় হারানো জলের ভাষা।

আমরা রাজাদের নাম স্মরণ করে ইতিহাস পড়ি…

কবিতা দেখে—
কোনও নামহীন শ্রমিক
এখনও তার কাঁধে বহন করে চলেছে
একটি সভ্যতার শেষ পাথর।

কবিতা জানে—
যা লেখা আছে শিলালিপিতে,
তার চেয়েও দীর্ঘ মানুষের নীরবতা।
. . .

৫.
কবিতা কোনও শোকগাথা নয়—
তবু তার অন্ধকার ভাঁজে ঘুমায়
অগণিত বিদায়ের ছায়া।

সে জানে—

কোনও-একটি নাম
শেষবারের মতো কীভাবে কেঁপে ওঠে ঠোঁটে
আর একটি নিভে যাওয়া চোখ
কত দূর অবধি মনে রাখে আলো।

কখনও কবিতা
শ্মশানের ধোঁয়া হয়ে উড়ে যায় আকাশে
কখনও-বা কবরের স্যাঁতসেঁতে মাটিতে
ঘুমন্ত বীজের মতো নীরব থাকে।

কবিতা জানে,
মৃত্যুই শেষ নয়।

কেবল একটি দীর্ঘ বিরামচিহ্ন;
যার পর
অন্য কোনও ভাষায়
আবার মানুষেরই উচ্চারণ।
. . .

Conceptual Artwork-II, in collaboration with Gemini; @thirdlanespace.com

৬.
কবিতা কোনও নিদ্রা নয়—
তবু তার বালিশের নিচে লুকিয়ে থাকে
অগণন অসমাপ্ত রাত।

কবিতা
অস্তিত্বের প্রান্তে বাঁধা এক অনির্বচনীয় আলোকসেতু;
যাতে স্মৃতি ও স্বপ্নের যাতায়াত চলে অবিরাম।

সে জানে—

চোখ বন্ধ হওয়ার পর
কীভাবে একটি দরজা
আরেকটি দরজার ভিতরে খুলে যায়।

কখনও কবিতা
একটি সিঁড়ি—
যা উঠে গেছে কোনও অদেখা চাঁদের দিকে।

কখনও একটি ভাঙা তরি—
কুয়াশার নদীতে যে নিজেরই ছায়া বহন করে।

আমরা ভাবি,
স্বপ্ন দেখছি আমরা…

কবিতা দেখে—
আমাদের ঘুমের ভিতরে
আরেকজন জেগে আছে,
নক্ষত্রের ধুলোয় যে
লিখে যায় হারিয়ে যাওয়া দিন।

কখনও কবিতা
পাখির ডানায় বেঁধে দেয় পাহাড়,
কখনও সমুদ্রকে ভাঁজ করে
রেখে দেয় একটি শিশুর মুঠোয়।

তার কাছে
অসম্ভব বলে কিছু নেই।

কবিতা জানে—
স্বপ্ন কোনও আশ্রয় নয়,
কোনও পলায়নও নয়।

স্বপ্ন হল বাস্তবতার অদৃশ্য যমজ;
যে সারারাত
আমাদের মুখ ধার করে
অন্য-এক পৃথিবীর কথা বলে।
. . .

৭.
কবিতা কোনও নদী নয়—
তবু তার শরীরজুড়ে বয়ে যায় স্রোত।

সে জানে—

একটি উৎস
কীভাবে পাহাড়ের নিঃশব্দ পাথর ছেড়ে
যাত্রা শুরু করে সমুদ্রের অজানার দিকে।

কখনও কবিতা
কোনও কচুরিপানার ফাঁকে
আটকে থাকা একটি বিকেলের আলো।

কখনও-বা বর্ষার উন্মত্ত জলে
ভেঙে যাওয়া ঘাটের স্মৃতি।

আমরা ভাবি,
আমরাই তাকে পেরোচ্ছি…

কবিতা দেখে—
আমাদের জীবনই
তার জলে ভেসে থাকা ক্ষণিকের নৌকা।

কখনও সে পাড় ভাঙে
কখনও-বা জাগায় নতুন চর।

এক হাতে কেড়ে নেয়,
অন্য হাতে ফিরিয়ে দেয় নতুন ভূচিত্র।

কবিতা জানে—
নদী কোনও জলরেখা নয়।

সে হল চলারই আরেক নাম;
যেখানে প্রতিটি বাঁক একটি প্রশ্ন,
আর প্রতিটি মোহনা কোনও অসমাপ্ত উত্তর।
. . .

৮.
কবিতা কোনও ঠিকানা নয়—
তবু তার ভিতরে
হারিয়ে যায় অসংখ্য ঘরের পথ।

সে জানে—

নিজের উঠোন ছেড়ে
প্রথম যে-মানুষটি বেরিয়ে গিয়েছিল,
তার বুকের মধ্যে
কতখানি ধুলো জমেছিল।

কখনও কবিতা
বন্ধ হয়ে যাওয়া জানালায়
শেষ বিকেলের আলো।

কখনও
সীমান্তের কাঁটাতারে আটকে থাকা একটু বাতাস।

আমরা ভাবি,
নির্বাসন মানে
এক দেশ থেকে আরেকটি দেশে যাওয়া…

কবিতা দেখে—
মানুষ কখনও-সখনও
নিজের ভাষা থেকেও নির্বাসিত হয়,
নিজের মুখ থেকে
এবং
নিজের ছায়া থেকেও।

কখনও সে
পকেটে ভরে রাখে এক মুঠো জন্মভূমি—
কিছু ধুলো, কিছু গন্ধ
কিংবা
ভুলতে না-পারা কোনও স্মৃতির আলো;

আর বহু-বছর পরে
অচেনা কোনও শহরের বৃষ্টিতে
হঠাৎ শুনতে পায়
শৈশবের দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ

কবিতা জানে—
নির্বাসন কোনও দূরত্ব নয়।

এ এক দীর্ঘ প্রতিধ্বনি;
যেখানে মানুষ ফিরে যেতে যেতে
আরও গভীরভাবে বুঝতে শেখে
কোথায় ছিল তার ঘর।
. . .

৯.
কবিতা কোনও দেয়ালঘড়ি নয়—
তবু তার শরীরজুড়ে ঘুরে বেড়ায়
অসংখ্য যুগের অদৃশ্য কাঁটা;
যেন মহাকালের পরিত্যক্ত কর্মশালা থেকে
সময় নিজেই এসে রেখে গেছে
তার ভাঙা যন্ত্রপাতির গোপন স্মৃতি।

সে জানে—

একটি মুহূর্ত কীভাবে শতাব্দীর চেয়েও দীর্ঘ হয়
আর
কখনও একটি জীবন
এক ফোঁটা শিশিরের মতো
সকালের রোদে মিলিয়ে যায়।

কখনও কবিতা
প্রাচীন ধ্বংসাবশেষের গায়ে লেগে থাকা শ্যাওলা।

কখনও
অনাগত শিশুর চোখে জেগে ওঠা প্রথম বিস্ময়।

আমরা ভাবি,
আমরা সময়ের ভিতর দিয়েই চলছি…

কবিতা দেখে—
সময়ই নীরবে
আমাদের ভিতর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে
নদীর মতো, বাতাসের মতো
কিংবা কোনও অদৃশ্য ক্ষয়ের মতো।

সে কুড়িয়ে রাখে
ফেলে আসা বিকেল,
ভুলে যাওয়া নাম,
না-বলা বিদায়
আর
অসমাপ্ত গল্পের ভাঁজে
আটকে থাকা দীর্ঘশ্বাস।

কবিতা জানে—
সময় কোনও পথ নয়।

সে এক মহান ভাস্কর;
যে প্রতিদিন
আমাদের মুখ থেকে
একটু একটু করে মুছে দেয় বর্তমান
আর গড়ে তোলে স্মৃতি।
. . .

১০.
কবিতা কোনও শিখা নয়—
তবু তার অক্ষরের ভিতর জ্বলতে থাকে
আদিম আগুনের বীজ;
যেন সেই আগুন আজও বহন করে
পাথরের নিদ্রা,
নক্ষত্রের জন্ম,
এবং
পৃথিবীর প্রথম কৌতূহলের স্মৃতি।

সে জানে—
প্রথম যে-মানুষটি
অন্ধকারের বিরুদ্ধে আগুন তুলে ধরেছিল,
তার চোখে কতখানি বিস্ময় ছিল।

কখনও কবিতা
শীতরাত্রির উনুন—
যার চারপাশে বসে
মানুষ ভাগ করে নেয়
গল্প, রুটি, স্বপ্ন।

কখনও
সে দাবানল,
একটি শুকনো যুগের বুকজুড়ে
ছড়িয়ে দেয় প্রশ্নের লেলিহান জিহ্বা।

আমরা ভাবি,
আগুন শুধু পোড়ায়…

কবিতা দেখে—
পোড়ার মধ্যেই
কিছু বস্তুর দ্বিতীয় জন্ম ঘটে।

মাটির পাত্র,
ধাতুর তলোয়ার,
মানুষের বিশ্বাস
এমনকি হৃদয়ও
আগুনের কাছে এসে
অন্য রূপ ধারণ করে।

কখনও কবিতা
একটি প্রদীপের ক্ষুদ্র আলো,

কখনও
সূর্যের অনিদ্রা।

কবিতা জানে—
আগুন কোনও ধ্বংস নয়।

সে এক কঠিন ভাষা;
যেখানে ছাই হল বিরামচিহ্ন
আর
শিখা পুনর্লিখনেরই আরেক নাম।
. . .

লেখক পরিচয় : ফজলুররহমান বাবুল : উপরের ছবি অথবা এখানে চাপুন

অবদায়ক ফজলুররহমান বাবুল : থার্ড লেন স্পেস

ফজলুররহমান বাবুল-এর অন্যান্য রচনা ও প্রাসঙ্গিক পাঠের জন্য এখানে চাপুন

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 7

No votes so far! Be the first to rate this post.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *