ফিলিস্তিনি পরীক্ষাগার

ইসরায়েলি হামলার শুরুর সপ্তাহগুলোয় সংবাদকর্মী শরিফ আব্দেল কুদ্দুস দ্য গার্ডিয়ান-এ লিখেছিলেন, ‘গাজায় এমনকি রংও মুছে ফেলা হয়েছে।’ নগর-বধের চলমান প্রক্রিয়াকে ঘিরে রচিত নিবন্ধে আরি আমায়া-আক্কারমান্স লিখেছেন, ‘উত্তর গাজার পুরোটা প্রায় সম্পূর্ণ মাটিতে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে।’
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে পরিচালিত এই দ্রুত নিধনযজ্ঞ গাজাকে মানুষ মারার কারখানায় রূপান্তরিত করেছে; যেখানে নগর-অবকাঠামোকে গাণিতিক ছকে খণ্ড-বিখণ্ড ও বিচূর্ণ করার ঘটনায় অপারেশন আয়রন সোর্ড কয়েক দশক ধরে চলমান গণহত্যা মিশনে এক অনন্য অধ্যায় বটে!
গাজায় ‘সত্তাহীন অস্তিত্বদের’ জীবন ও বাসস্থান ধ্বংসের চক্রাকার শুদ্ধি অভিযানকে মূলত পণ্যে রূপায়িত করা হয়;—যেন বাজারে ছাড়ার আগে এই প্রযুক্তির দক্ষতা যাচাই করে নেওয়া হচ্ছে।
অ্যান্টনি লোয়েনস্টাইন তাঁর প্যালেস্টাইন পরীক্ষাগার (The Palestine Laboratory) বইয়ে লিখেছেন, ‘ফিলিস্তিন হলো ইসরায়েলের পরীক্ষাগার, যেখানে তাদের দোরগোড়ায় অবস্থিত একটি দখলকৃত জাতি নিজের লক্ষ-লক্ষ নিপীড়িত মানুষকে আধিপত্য কায়েমের সবচেয়ে নিখুঁত ও সফল পন্থাগুলো বাজিয়ে দেখার পরীক্ষাগারে সরবরাহ করছে।’
বিয়ং-চুল হান যে-‘ডিজিটাল প্যানোপটিকন’-র কথা বলে থাকেন, এটিকে তারা এই নিপীড়নে সংযুক্ত করেছে। ফিলিস্তিনিদের জীবন, যারা বেঁচে থেকেও নির্বাসিত, এবং তিলে-তিলে নিধনের জন্য তৈরি ক্যাম্পগুলোয় সমাধিস্থ, তারা কেবল কংক্রিট ও কাঁটাতারের বেড়ায় আবদ্ধ তা নয়,—স্মার্টফোনেও তাদের গতিবিধি অনুসরণ করা হয়।
তথাপি, ‘আইনের বাইরে’ গড়ে ওঠা বর্ণবাদী ইসরায়েলের এই সন্ত্রাস, হানের ‘ডিজিটাল প্যানোপটিকন’-র ধারণা যার ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে, এটি এখানে জর্জ অরওয়েল রাষ্ট্রের যে-নজরদারির কথা বলে গেছেন, তাকেও ছাড়িয়ে যায়। নজরদারির কাঠামো সেখানে অবরোধের একটি স্তর মাত্র;—ইন্টারনেট ও ‘সমাজমাধ্যম’-এ পাতা তার এই ফাঁদে ফিলিস্তিনিরা পা দিয়ে বসে আছে।
হান তাঁর মনোরাজনীতি (Psychopolitics) বইয়ে লিখেছেন, ‘ডিজিটাল প্যানোপটিকন’ সীমাহীন স্বাধীনতা উপভোগ করা ও মানুষের স্বেচ্ছায় নিজেকে অবমুক্ত করার প্রবণতায় ভর দিয়ে টিকে থাকে। ফিলিস্তিনিদের ব্যক্তিগত জীবনকে ফাঁদে ফেলতে ইসরায়েলি গুপ্তচররা অপেক্ষায় কান খাড়া রাখে, যাতে করে পরবর্তীতে যাকে মন চাইবে তাকে উত্যক্ত ও নিয়ন্ত্রণ করতে পারে;—অন্তত তারা তেমনটাই আশা করে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্সির সমতুল ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর ‘ইউনিট ৮২০০’-র প্রাক্তন সদস্যরা তাদের অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তিক দক্ষতা নিয়ে অতঃপর বেরিয়ে আসে। এরপর তারা যোগ দেয় বেসরকারি সংস্থায়, যেমন এনএসও গ্রুপ বা সংযুক্ত আরব আমিরাতের ডার্কম্যাটার কোম্পানিতে। সেখানে তারা ‘মোটা অঙ্কের টাকা’ পকেটে পুরে।
এদুয়ার্দো গালিয়ানো ঠিকই বলেছিলেন :—ধনী জাতিরাষ্ট্রগুলো মানুষকে সবকিছু ভুলে যেতে শেখায়। তাঁর ভাষায় : ‘অন্যের দারিদ্র্য থেকে কোনো সম্পদই নিষ্পাপ নয়।’

স্থানিক ন্যাক্রোশক্তি (Spatialised Necropower)
ইসরায়েলের আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণ ফুকোর শৃঙ্খলা (discipline) ও নিরাপত্তার (security) সংজ্ঞায় বিদ্যমান মধ্যবর্তী সীমারেখাকে অস্পষ্ট করে তোলে। আচিল এমবেম্বে লিখেছেন, ‘ফিলিস্তিনি বাস্তবতা প্রমাণ করে আধুনিক ঔপনিবেশিক দখল আসলে বহুমাত্রিক ক্ষমতার এক সংযুক্তি;—শৃঙ্খলাবদ্ধ, জীবরাজনৈতিক ও ন্যাক্রোরাজনৈতিক।’
‘ন্যাক্রোপলিটিক্স বা মৃত্যুর রাজনীতি’ ধারণাটি ব্যবহার করে এমবেম্বে দমন-পীড়নের এমন এক বিকৃত অস্তিত্বকে বোঝান, যেখানে মানুষকে ‘জীবন্মৃত’ দশায় নামিয়ে আনা হয়। তাদেরকে ঠেলে দেওয়া হয় মরণের জগতে; যেখানে বেঁচে থাকা মানে আর জীবন নয়, বরং দীর্ঘ সময় ধরে মৃত্যুকে যাপন করতে থাকা।
এয়াল ওয়াইজম্যানকে অনুসরণ করে এমবেম্বে দেখান, ন্যাক্রোপাওয়ারের প্রয়োগ মানে হচ্ছে বসতি সিলগালা ও সম্প্রসারণের মাধ্যমে ভূখণ্ডকে খণ্ড-বিখণ্ড ও দখলে নেওয়ার নির্দয় কৌশল। অবৈধ বসতিগুলো পাহাড়ের চূড়ায় এমনভাবে গড়ে তোলা হয়েছে, যেন সেগুলো অদম্য দুর্গ বা সার্বক্ষণিক পাহারার জন্য তৈরি প্যানোপটিকন। এখানে ‘উল্লম্ব সার্বভৌমত্ব’ নামক শাসনব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছে, যেটি সমতল ভূখণ্ডের সরল ভাগাভাগিকে ভয়ঙ্কর এক ত্রিমাত্রিক বিভাজনে বদলে দিয়েছে। ইসরায়েলি যানবাহন ছুটে চলে কেবল তাদের জন্য তৈরি বাইপাস সড়ক ধরে; আর যেখানে এই রাস্তা ফিলিস্তিনিদের রাস্তাকে অতিক্রম করার সময় দুজনকে পৃথক করা হয় অস্থায়ী অথচ কঠোর বিভাজনরেখা বসিয়ে।
‘অবরুদ্ধ গ্রাম ও শহরগুলোকে’ সিলাগালার মতো করে বিশ্ব থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন রাখা হয়। প্রতিদিনের জীবন সামরিকীকরণের অধীনস্থ। স্থানীয় সামরিক কমান্ডারদের হাতে থাকে ইচ্ছেমাফিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা-যে,—কাকে কখন তারা গুলি করবে; আর কাকে আপাতত ছাড় দেবে। ভূখণ্ডের এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে যেতে হলেও আনুষ্ঠানিক অনুমতির প্রয়োজন হয়!’
ওপরের আকাশ দখলে রাখা হয়েছে। আর যাদেরকে খেদিয়ে নিচে পাঠানো হয়, সেখানে কেবল জীবিতরা নয়, মৃতরাও থাকে। কবরের অধিকার পর্যন্ত কেড়ে নেওয়া হয়েছে। অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া পেছানো হতে থাকে দিনের পর দিন। মৃত্যু-পরবর্তী সহিংসতা ফিলিস্তিনিদের ধরে রাখে এক মধ্যবর্তী অবস্থায়। হত্যার মুহূর্ত থেকে শুরু করে বিলম্বিত, অস্বীকৃত দাফনের মধ্যে শোকার্ত মায়েদের সঙ্গে তারা ঝুলে থাকে অন্তহীন প্রতীক্ষায়।

অতিভৌগোলিক অন্তরাল (Extraterritorial Limbo)
গাজার মানুষগুলোকে অমানবিক করে তোলা ও তাদেরকে শ্রেণিতে ফেলা যায় না এরকম ভিনগ্রহী জীব করে রাখা বর্তমান বিশ্বে একটি বিশেষ ঘটনা। তবে, তাদের ভূমিকে পরীক্ষাগারে রূপান্তরের ক্রিয়া-পদ্ধতির সঙ্গে দূরবর্তী অন্যান্য যুদ্ধক্ষেত্রের সাদৃশ্য রয়েছে।
ওয়াশিংটনের রয়েছে রক্তের দাগে রঞ্জিত এক ইতিহাস, যেখানে তারা দক্ষিণে বসবাসরত পড়শিকে ব্যবহার করেছিল পালটা বিদ্রোহ দমন (counterinsurgency warfare) ও নব্য-উদারনৈতিক বিকৃতির (neoliberal disfiguration) পরীক্ষাগার রূপে।
গ্রেগ গ্র্যান্ডিন তাঁর সাম্রাজ্যের কর্মশালা (Empire’s Workshop) বইয়ে দেখিয়েছেন : ‘উনিশ শতকের মাঝামাঝি থেকে বিংশ শতকের প্রথম দিকটায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী লাতিন আমেরিকার সঙ্গে অবিরাম সংঘর্ষে নিজের যুদ্ধ করার দক্ষতাকে শানিত ও আধুনিক সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তুলেছিল।’
হাভানা থেকে সান্তিয়াগো পর্যন্ত বেল্টওয়ে অর্থাৎ ওয়াশিংটনে কেন্দ্রীভূত প্রশাসন ভূমির দখল নিয়েছে, মানুষকে বশীভূত করেছে, স্বৈরশাসকদের মদদ দিয়েছে, ডেথ স্কোয়াডের পরিচর্যা আর অর্থনীতি পুনর্গঠিত করেছে এমনভাবে,—যার বোঝা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সইতে হয়েছিল,—যেটি তাদের দেহে সাম্রাজ্যের প্রতীকী সীলমোহর গেঁথে দিয়েছে। যে-সমস্ত দমনকৌশল এখানে পরীক্ষিত হলো, পরে সেগুলো অন্যখানে রপ্তানি করা হয়েছে।
গ্র্যান্ডিন লিখেছেন : ‘এটি ছিল একধরনের নমনীয় অতিভৌগোলিক প্রশাসন ব্যবস্থা (extraterritorial administration) ব্যবস্থা’;—যুক্তরাষ্ট্রকে এটি আনুষ্ঠানিক পন্থায় ঔপনিবেশিক শাসনের বোঝা বহন করার দায় না নিয়েই সমাজতন্ত্রকে দমন আর উন্নয়নের জিগির তুলে অন্যদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের পুনর্গঠনে নাক গলানো ও তাকে নিয়ন্ত্রণে রাখার সুযোগ করে দিয়েছিল।
বহির্ভূত প্রশাসনের সেরা উদাহরণ হলো গুয়ানতানামো। ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’-র দিকে নজর ফিরালে দেখা যায়, যুদ্ধের প্রারম্ভিক দিনগুলোয় মাজার-ই-শরিফে উত্তরের মিত্র জোটের হাতে ধরা পড়া প্রথম ৩০০ তালেবান যোদ্ধাকে এমন এক নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন দেখা দেয়, যেখানে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা সহজে প্রবেশ করতে পারবেন।
কারেন গ্রিনবার্গ তাঁর The Least Worst Place: Guantanamo’s First 100 Days বইয়ে জানাচ্ছেন : সেন্টকমের কমান্ডার জেনারেল টমি ফ্রাঙ্কস টার্গেটে পরিণত হওয়া ও সম্পদহানির আশঙ্কায় বন্দিদের সরিয়ে নিতে চেয়েছিলেন।
ওয়াশিংটন ডিসি, পোল্যান্ড, গুয়াম, এমনকি ম্যানহাটনকে পর্যন্ত সম্ভাব্য গন্তব্য হিসেবে তালিকায় রাখা হয়েছিল। তবে নীতিনির্ধারকদের দরকার ছিল এমন এক স্থান, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের আইন বা অন্য কোনো দেশের বিধিবিধান প্রযোজ্য নয়। নির্বাহী শাখার কিছু সদস্য এমনকি আন্তর্জাতিক আইনকে মার্কিন স্বার্থের পরিপন্থী ভাবছিলেন তখন।
তাঁদের দরকার ছিল ‘একটি আইনি শূন্যাঞ্চল’, ডোনাল্ড রামসফেল্ড যেটিকে ‘মহাশূন্যে প্রযোজ্য আইনের সমতুল কিছু’ (outer space) বলে আশা করেছিলেন। সমাধান অবশেষে পাওয়া গেলো গুয়ানতানামো উপসাগরে, যেখানে ৯৯ বছরের জন্য লিজ নেওয়া জমিতে যুক্তরাষ্ট্র একটি সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করে;—একেই বলে নিখুঁত সমাধান, যা ‘যে-কোনো বেসামরিক কিংবা বহিরাগত শাসনব্যবস্থার আওতা থেকে মুক্ত।’

ধ্বংসাবশেষ (Ruination)
এই আলোকে গাজাকে ব্যতিক্রমী পরিসর গণ্য করা উচিত;—একটি গহ্বর, যেখানে ইসরায়েল ‘যৌক্তিকতার’ নাম করে যা ইচ্ছা তাই ছুড়তে পারে। কেননা, এটি অন্যান্য অতিভৌগোলিক পরিসরের মতো নয়, এই গহ্বরের তলদেশে রয়েছে অ-সত্তা বা অস্তিত্বহীন জনসমষ্টি, যাদের আর্তনাদ শোনা যায় না, আর তাদেরকে মেরে ফেলাটা স্বাভাবিক করে তোলা হয়েছে।
‘গাজায়’, আমায়া-আকারম্যান্স লিখেছেন, ‘ধ্বংসাবশেষ অবশ্যই দৃশ্যমান থাকতে হবে, কেবল যুদ্ধাপরাধের প্রমাণ হিসেবে নয়,—চূর্ণ-বিচূর্ণ জীবনের জীবন্ত সাক্ষ্য রূপেও।’
‘গাজা’র ‘আগেকার ও পরবর্তী’ ছবি, যেখানে সকল রং ও স্থাপত্য পরে মুছে ফেলা হয়েছে, এ-নিয়ে মন্তব্য করতে যেয়ে আজুলায় পাঠকদের সতর্ক করে বলেছিলেন,—তারা যেন আগেকার ছবি দেখে বিভ্রান্ত না হয়। তিনি জোর দিয়েই বলেছেন,—এইটা সেখানে আছে;—গণহত্যায় সংঘটিত প্রতিহিংসা খোদাই করা আছে সেখানে।
অ্যান লরা স্টোলার হয়তো এ-কারণে আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন,—এইসব ‘সুরক্ষিত সাম্রাজ্যবাদী ধ্বংস-প্রক্রিয়া মানবজমিনে কখনো প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে দ্রবীভূত রূপে টিকে থাকে।’
এটি হলো মানুষের নিয়তি;—সহিংসতার প্রথম ধাক্কা পরবর্তী জীবনে বয়ে বেড়ানো; অবরুদ্ধ জনগোষ্ঠীর জীবন ও মনকে যা ক্রমাগত ক্ষতবিক্ষত করে যায়;—যেদিকটায় স্টোলার (স্থানীয়রা বাসিন্দারাও) আমাদের মনোযোগী হতে বলছেন।
ফিলিস্তিনে, আজুলায় লিখেছেন, যে-ধ্বংসযজ্ঞের ওপর ভর দিয়ে আইন লঙ্ঘনকারী রাষ্ট্রটি দাঁড়িয়ে আছে, তা কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং শাসনব্যবস্থার এক স্থায়ী বৈশিষ্ট্য। শাসক ঘরবাড়ি ভেঙে ফেলে, একে প্রদর্শনীতে রূপ দেয়, আর ফিলিস্তিনিদের নতুন করে ঘর তোলার অনুমতিও তারা দেয় না।
ফিলিস্তিনিদের নিষ্ক্রিয় প্রজা করে রাখতে হলে, আজুলায়ের মতে, এমন দমন প্রক্রিয়া চালু রাখতে হচ্ছে, যেটি সর্বত্র ও সবসময় সক্রিয় থাকবে। এর মানে হলো, নিত্য-নৈমিত্তিক অপমান, চেকপয়েন্টে হেঁয়ালিভরা পন্থায় বাধা প্রদান ও অত্যাচার;—ফিলিস্তিনির দেহ সেখানে জীবিত হোক অথবা মৃত, সে হয়তো এই বাধা পার হতে পারবে অথবা পারবে না।
গাজায়, সারা রয় লিখেছেন, সহিংসতা মানে কেবল বোমা ও গুলি নয়,—এটি প্রাত্যহিক কাজকর্মের ভেতরেও লুকিয়ে থাকে;—পানি আর বিদ্যুতের জন্য লড়াই, সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার চেষ্টা, কাজ খুঁজে নেওয়া, নিরাপদে স্কুলে যাওয়া, হাসপাতালে পৌঁছানো, এমনকি কোনো প্রিয়জনকে দাফন করতে গিয়েও সংগ্রাম করতে হয়। কাফকাসুলভ এই সহিংসতা, রয় তাঁর বই The Gaza Strip: The Political Economy of De-Development-এ লিখেছেন,—‘সাধারণত্ব, গদ্যময়তা আর অদৃশ্যতা এর বিশেষত্বকে পৃথক করে তুলেছে।’
তিনি তাঁর সাম্প্রতিক New York Review of Books-এ প্রকাশিত প্রবন্ধে লিখেছেন, ১৯৬৭ সাল থেকে ইসরায়েল গাজা ও পশ্চিম তীর দুটোকেই এর দারিদ্র্য কবলিত সমাজসহ ‘কার্যকর অর্থনীতি থেকে আকার্যকর অর্থনীতিতে’ রূপান্তরিত করেছে।
গাজার এই উন্নয়ন-সংকোচনের (De-development) মানে হলো : ‘অধিগ্রহণ ও বঞ্চনা; একীকরণ ও বহিষ্কার; এবং শিল্পায়নে লাগাম টেনে ধরা।’ প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে শুরু করে প্রতিষ্ঠানিক সক্ষমতার সবকিছু এভাবে কেড়ে নিয়ে অচল করে দেওয়া হয়েছে, যেন ফিলিস্তিনি-জীবন চিরকাল টিকে থাকার অযোগ্য হয়ে পড়ে।
জীবিত ও মৃতদের মধ্যে সূক্ষ্ম সেতু যখন ভেঙে পড়ে, তখন এই দমবন্ধ বাস্তবতাকে নিছক ‘স্বাভাবিক’ বলে মনে হতে থাকে;—মাঝেমধ্যে কেবল টেলিভিশনের পর্দায় দেখানো কিছু করুণ দৃশ্যের কারণে তা বিঘ্নিত হয়। অক্টোবরের সাত তারিখে হামাস যদি হামলা না করত, তাহলে সবাই সুখে-শান্তিতে বেঁচেবর্তে থাকত;—এরকম এক ভ্রান্ত বয়ান যেখানে তৈরি করা হয়েছে।
ইসরায়েল যখন বারুখ কিমারলিং-এ বর্ণিত কম-চমকপ্রদ নৃশংসতার মিশ্রণ বা পলিটিসাইড চালাতে থাকে,— ফিলিস্তিনি জনগণকে কৃত্রিম পন্থায় হুমকিস্বরূপ ‘অন্য’ বলে দাগানোর ইসরায়েলি অবস্থানকে এটি বজায় রাখে; যেখানে এর বিরুদ্ধে ওপরে বর্ণিত সকল ব্যবস্থাকে কাজেই স্বাভাবিক ও ন্যায্য ধরা হয়।
লাঞ্ছিত জীবনছবি যখন মানুষের সামনে আসে, একে সেখানে ‘স্বাভাবিক’ গণ্য করা হয়। পশ্চিমাদের চোখে ফিলিস্তিনি মানে হলো বিকৃত এক ছবি,—ক্যামেরার ফ্রেমে তারা হয় শরণার্থী, না-হয় সন্ত্রাসী অথবা অতিরিক্ত, অপ্রয়োজনীয় ‘অস্তিত্বহীনতা।’
ফিলিস্তিনি-সত্তা মানে হলো অঙ্গ হারিয়েছে এরকম কোনো প্রতিবন্ধী, যে-কখনো সম্পূর্ণ হওয়ার অনুমতি পেতে পারে না। প্রতিবন্ধী মানে হীনও বটে, তাকে কদাপি সমান ভাবা যায় না। তাদের ‘সহিংসতা’, লন্ডন রিভিউ অব বুকস-র জনৈক কলমচি যেমন লিখেছেন, ‘আড়ম্বরপ্রিয় ছদ্মবামরা সেখানে দোলনায় বসে কলম চালায়।’, এবং তা ‘রোগগ্রস্ত’।
ঠিক যেরকম, বোমা ফেলে ইরাককে প্রাক-শিল্পযুগে ফেরত নেওয়ার আগে নব্য-শিক্ষিত সংবাদপত্রগুলো ইরাকি সেনাদের ‘কুটিল’ বলে অভিহিত করেছিল;—হামাসের ‘সুড়ঙ্গে গড়ে তোলা আধিপত্য’ যেমন আমাদেরই লেখক আমায়া-আক্কারম্যানসের ভাষায় হচ্ছে ‘কাপুরুষের কাজ’।
প্রকৃতপক্ষে, ফিলিস্তিনিরা সবসময় এমন এক নিরাময়-অযোগ্য অসুখে আক্রান্ত বলে ধরে নেওয়া হয়, অনাহূতভাবে যার চিকিৎসা করতে আসে কখনো তথাকথিত ‘মিত্ররা’, কখনো আবার সরাসরি ‘শত্রুরা’।
. . .

পূর্ববতী পর্ব : “অতিরিক্ত অস্তিত্ব”-এ নাবিল সালিহ-র ফিলিস্তিন
“অতিরিক্ত অস্তিত্ব”-এ নাবিল সালিহ-র ফিলিস্তিন-১ : মোস্তাফিজুর রহমান জাভেদ
. . .
লেখক পরিচয়

. . .



