নিজের সাক্ষাৎকার নিজে নেওয়ার ঘটনা বিরল! উপমহাদেশে আলোকচিত্র সাংবাদিকতায় পথিকৃৎ রঘু রাই ছাড়া আর কেউ কাণ্ডটি ঘটিয়েছেন বলে আমার জানা নেই! সেই রঘু রাই স্বয়ং ফটোগ্রাফ হয়ে বিদায় নিলেন অজানায়। পেছনে পড়ে থাকল তাঁর তোলা ছবিরা, যারা এখন থেকে তাঁর হয়ে কথা বলবে জীবিতদের সঙ্গে।
রক্তমাংসের একটা মানুষ চলে গেলে ‘অস্থানে বেদনা ঝরা’র অনুভব হয় বৈকি। বিশেষত রঘু রাইয়ের মতো মানুষ আক্রার বাজারে এখন দুর্লভ। জীবনকে দেখার তৃতীয় এক নয়ন ছিল তাঁর। সেই চোখ দিয়ে সাবজেক্টের ওপর ক্যামেরা ফোকাস করতেন। তৃতীয় নয়ন দিয়ে গাছ, পাখি, পরিবেশ ও মানুষ দেখতেন। কথা কইতেন পাখির সঙ্গে, নদীর সঙ্গে, গাছের সঙ্গে। চেনা মানুষের ভিড়ে অচেনা আর ব্যতিক্রম এক মানুষ ছিলেন বটে!
এমন একটা মানুষ চলে গেলে বিনয় মজুমদারের ফিরে এসো চাকা-র পঙক্তিচরণ মনে ভেসে ওঠে আগে। রঘু রাই ক্যামেরায় ধরছেন বৃক্ষ ও পাখি। তারা এখন আর ‘প্রকৃত প্রস্তাবে স্বচ্ছ জলে’ নয়, বরং বাস্পীভূত বুদবুদের মতো উবে যাচ্ছে চোখের সামনে। উবে যাওয়ার দৃশ্য ধরতে মন মানছে না তাঁর। তিনি বরং ধরতে চাইছেন এমন এক দেশের ছবি, যেখানে বিনয় মজুমদারের মতো যেন কখনো বলতে না হয় :
সকল প্রকার জ্বরে মাথা ধোয়া আমাদের ভালো লাগে ব’লে।
তবুও কেন যে আজো, হায় হাসি, হায় দেবদারু।
মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়!
যারা তাঁর নিজেকে নেওয়া নিজের সাক্ষাৎকারটি শুনেছেন, তারা হয়তো জানবেন, রঘু রাই কী-কী কারণবশত প্রকৃত সারসের উড়াল আটকাতে মরিয়া থেকেছেন! কতটা পেরেছেন তার বিচার অনাগত সময় করবে কোনোদিন। তবে এ-কথা সত্য,—স্বেচ্ছা-মর্জির এক জীবন তিনি করেছিলেন যাপন। ক’জনের ভাগ্যে জোটে এই যাপন!

. . .
‘উদ্বাস্তু’দের নিয়ে তোলা আলোকচিত্রের কল্যাণে রঘু রাই আমাদের জন্য বিশেষ ঘটনা ছিলেন। ১৯৭১-এ স্বাধীনতা যুদ্ধে কোটি খানেক মানুষ শরাণার্থী হলেন ভারতে। বিশ্বের নামকরা আলোকচিত্র সাংবাদিকরা শরণার্থী শিবিরের খবর পৌঁছাতে ক্যামেরায় শাটার টিপছেন অবিরাম। ছবিগুলো বিশ্ব দেখছিল সংবাদপত্রের পাতায়। মানবিক বিপর্যয়ে অনেকে শিউরেও উঠেছেন। জানিয়েছেন প্রতিবাদ। অনেকে আবার সুতীব্র মানবিক সংক্ষোভ থেকে বাড়িয়েছেন সাহায্যের হাত। কবি, গায়ক, চিত্রী কেউ বাদ ছিলেন না তালিকায়। একাত্তরের ওই সময়টার মতো বিশ্ব আর কখনো বাংলাদেশকে চিনেনি।
সুদূর মার্কিন দেশ থেকে ভারতে চলে আসা অ্যালেন গিন্সবার্গের সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড শিরোনামের বিখ্যাত কবিতা উদ্বাস্তু শিবির দেখার সাক্ষাৎ অভিজ্ঞতা থেকে নিয়েছিল জন্ম। রবিশঙ্কর আর বিটলস ব্যান্ডের জর্জ হ্যারিসন মিলে কন্সার্ট ফর বাংলাদেশ করলেন অর্থসাহায্য তুলতে। ‘জয় বাংলা’ নামে একটি গানের অ্যালবাম বেরোয় তখন রবিশঙ্করের উদ্যোগে। জর্জ হ্যারিসন নিয়েছিলেন প্রযোজনার গুরুভার। এরকম অতিচর্চিত ও জানা-অজানা গল্পে বোঝাই হয়ে আছে ১৯৭১। একটি মানচিত্র বুঝে পাওয়ার দুর্বার বেদনা ঘিরে তৈরি হচ্ছিল অজস্র কাহিনি! রঘু রাইয়ের ক্যামেরায় ধরা ‘শরণার্থী’ সিরিজের আলোকচিত্ররা এর অন্যতম। তাঁর তোলা সাদাকালো ছবিগুলো দেশের মুদ্রণমাধ্যমে দেখেছি আমরা। অনলাইনের যুগেও দেখছি। একাত্তরের শরণার্থী কথাটি মনে এলে রঘু রাইয়ের আলোকচিত্ররা মিছিল দিয়ে হাজির হয় চোখের সামনে আজো!
ছবিগুলো নিছক স্থিরচিত্র নয়। আলোকচিত্রকে যদিও জমাট সংগীত বলা যেতেই পারে। সময় সেখানে সাদাকালো বা রঙিন রিলে স্থির হয়ে আছে। স্থির, তবে তাকানো মাত্র মনে হয়,—তারা এখনই কথা বলে উঠবে! অতীত সময় লহমায় জীবন্ত হয়ে মগজে ডানা ঝাপটায়। বাঙালি জীবনে ১৯৭১ কী ছিল তা অনুভব করতে রঘু রাইয়ের ছবিরা যথেষ্ট হয়ে ওঠে।
শুধু এটুকুন? না, একদম এটুকুন নয়। তাঁর তোলা ছবি শরণার্থীরা ওইসব গল্প আমাদের স্মরণ করতে বলে, যেগুলো পুরোনো হওয়ার নয়। একাত্তরে পাকি সেনারা হামলা শুরু করলে মানবিক বিপর্যয় অনিবার্য হয়ে ওঠে। সাতচল্লিশে মানিচত্র ভাগাভাগির সময় যেমন হয়েছিল। অবর্ণনীয় এক মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছিল তখনো। অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তকে দিয়ে তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ কবিতাটি লিখিয়ে নিয়েছিল এই দেশভাগ। ওটাও আলোকচিত্র। কবিতায় বোনা মর্মন্তুদ আলোকচিত্র, যার পরিশেষ ঠেকেছিল মহাভারতের বাণপ্রস্থে :

Credit: raghuraifoundation

… যেখানে যাচ্ছি সেখানে আছে কী?
সব আছে। অনেক আছে, অঢেল আছে
কত আশা কত বাসা কত হাসি কত গান
কত জন কত জায়গা কত জেল্লা কত জমক।
সেখানকার নদী কি এমনি মধুমতী?
মাটি কি এমনি মমতা মাখানো?
ধান কি এমনি বৈকুণ্ঠ বিলাস?
সোনার মতো ধান আর রুপোর মতো চাল?
বাতাস কি এমনি হিজলফুলের গন্ধভরা
বুনো-বুনো মৃদু মৃদু?
মানুষ কি সেখানে কম নিষ্ঠুর কম ফন্দিবাজ কম সুবিধাখোর?
দেশভাগ অনেকের কাছে ছিল আশা। অচিরে যদিও তা মোড় নিয়েছিল নিরাশা ও দুর্ভোগে। জ্যোতিরিন্দ্র নন্দীর বারো ঘর এক উঠোন আর অতিন বন্দ্যোপাধ্যায়ের নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে-র বিবরণে যা ছবি হয়ে আছে। কালো-কালো পিঁপড়েসারি বলছে উদ্বাস্তু হওয়ার গভীর অসুখ ও মরণ যাতনার সব গল্প। রঘু রাই ক্যামেরায় একই গল্প বলেছিলেন আজ থেকে পঞ্চান্ন বছর আগে।
একই ঘটনা পৃথিবীর আরো কত-না দেশে কতবার ঘটে গিয়েছে! হিসাব মালুম করতে বসলে মাথা ঘুরবে যে-কারো। উদ্বাস্তু হওয়ার ইতিহাস চির পুরাতন হয়েও চির নতুন। অভিশপ্ত প্রেতেরে মতো দেশে-দেশে হানা দেয় কিছুদিন অন্তর। এমন এক গল্প, যা শ্বাসরোধী। শুনতে ইচ্ছে করে না। কানে হাত চাপা দিতে ইচ্ছে করে। চোখ বুজে থাকাটা স্বস্তি মনে হয়। তবু, শুনতে হয়।
বসনিয়া-হার্জেগোভিনার নো ম্যানস ল্যান্ড-র মাইনের ওপর শুয়ে থাকা সৈনিকটির মতোন এইসব গল্প! মাইনের ওপর শুয়ে থাকা ছাড়া তার আর কোনো জীবন নেই এখন। উঠলেই জীবন টিকিট কাটবে পরপারের! শরণার্থী/ উদ্বাস্তু/ রিফুজি… ঈশ্বরের পৃথিবীতে সবচেয়ে নিরস ও একঘেয়ে দুর্ভোগে ঠাসা গল্প। রঘু রাইয়ের ছবিরাও ‘তাই’ ছিল। এখনো ‘তাই’ হয়ে সংবাদপত্র, বইয়ের পাতা, আর অনলাইনে তারা ঘুরছে। ইচ্ছে হয় না তাকানোর। তবু তারা জীবনানন্দের কবিতা-চরণের মতো নাছোড়াবান্দা হয়ে ঘুরে ‘চোখের চারিপাশে’ :


উপেক্ষা করিতে চাই তারে;
মড়ার খুলির মতো ধ’রে
আছাড় মারিতে চাই, জীবন্ত মাথার মতো ঘোরে
তবু সে মাথার চারিপাশে,
তবু সে চোখের চারিপাশে,
তবু সে বুকের চারিপাশে;
আমি চলি, সাথে-সাথে সেও চ’লে আসে।
উদ্বাস্তু/শরণার্থীরা হলো সেরকম এক ‘বোধি’, যারা একঘেয়ে স্বরে মাছির মতো ভনভন করে যায় কানের পাশে হাজার বছর!
রঘু রাইয়ের তোলা ছবিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিতি যেটি, এর শিরোনাম তিনি দিয়েছিলেন ‘Empty stomach frail and barely clothed, 1971’। শিরোনামটি পুরাতন গল্প আবার বলছিল নতুন করে। এই গল্প লোকে সাতচল্লিশে শুনেছে। ধরায় অগুন্তি দেশ রয়েছে, সময়রেখার কোনো না কোনো ধূসর প্রান্তে দাঁড়িয়ে একই গল্প শুনতে বাধ্য করেছে অন্যদের। এখন যেমন গাজার উদ্বাস্তুরা একঘেয়ে গল্পটি শোনচ্ছে পুনরায়! মুক্তি নেই ঈশ্বর! রেহাই নেই! শুনতেই হবে এই-যে, মানবিক বিপর্যয়ে শরণার্থী শিবিরে ধুঁকছে মানুষরতন।
আরেকটি ছবির শিরোনাম তিনি দিয়েছিলেন ‘Uncertanity and grief’। আরেকটির ‘The refugees were walked shoulder to shoulder’। আরো একটি শিরোনাম জানায় ‘Young or middle-age, rape was a common occurance’। এবং আরো একটি ‘Lucky to has escaped, but lost her husband’। সাদামাটা এই ক্যাপশনগুলোর সঙ্গে তোলা ছবি আর কতকাল সইবে মানুষ!

কতটা পথ পেরোলে তবে পথিক বলা যায়?
কতটা পথ পেরোলে পাখি জিরোবে তার ডানা?
কতটা অপচয়ের পর মানুষ চেনা যায়?
উদ্বাস্তু হচ্ছে সেইসব দগদগে গল্পের মিছিল, যেগুলো দেখলে ও শুনলে মানুষের ওপর বিশ্বাস উবে যায় চিরতরে। তারা ফেরত আনে দুর্ভোগ ও মরণের ওইসব কাহিনি, যেগুলোর মধ্যে আসলে জীবন নেই, আছে দীর্ঘশ্বাসে ভরা অপরিসীম শূন্যতা। তারপর! যাবো কোথায়? নাকি প্রশ্ন করব নিজেকে নিজে, কবীর হুমায়ূনর মতো :
ঘর ছাড়া হই ঘরের খোঁজেতে, পথে পথে দিন-রাত
শুকনো খাবার, মাপা তোলা-জল, কোন অভিসম্পাত?
কাঁটাতারের বেড়া কারাগার যেন, অসহ্যকর জীবন!
উদ্বাস্তুতা সারা পৃথিবীতে, বলো, কোন দর্শন?
রঘু রাইয়ের তোলা ছবিরা এর কোনো উত্তর দেয় না। তারা কেবল একই গল্প অভিশাপের মতো আওরায়। মনে করিয়ে দেয় ‘ঘর’ হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে অনির্ভরযোগ্য শব্দ। কার ঘর কার বাড়ি কার সাকিন… মানুষগুলো পোটলা-পুটলি কাঁধে কেবল ছুটছে জান বাঁচানোর টানে। বাঁচা কি যায় সত্যি? নাকি গিন্সবার্গের নিজের চোখে দেখা সাক্ষ্য আর রঘু রাইয়ের ছবিরা মিলে একটাই গল্প বলে সেখানে : এরা, এইসব মানুষ মরে ভূত হয়ে বেঁচে আছে উদ্বাস্তু শিবিরে!

How many children are we who are lost
Whose are these daughters we see turn to ghost?
What are our souls that we have lost care?
Ring out ye musics and weep if you dare–
উদ্বাস্তুর গল্প তাই মরা মানুষ হাঁটার গল্প। স্টোরি অব দ্য ডেড ম্যান ওয়াকিং ইন নোহোয়্যার-র গল্প। কবর থেকে উঠে আসা জম্বিদের গল্প! তারা অবিরত ফেরত আসে… আসতেই থাকে। ভাঙা রেকর্ডের মতো কানে বাজতে থাকে তারস্বরে। গভীর অস্বস্তিতে আমরা কেউ হয়তো চায়ের কাপে চুমুক দিতে ভুলে যাই। চোখ জলে ভরে ওঠে কারো। কেউ রাগে ফেটে পড়ে গিন্সবার্গের মতো। কারো ঘুম পায় এ-কথা ভেবে,—আর কতকাল দেখতে হবে খাণ্ডবদাহন! কারো আবার অনুভূতি হয় না কোনো! কামুর মার্সেলোর মতো ভাবে,—এই লোকগুলোর ব্যাপারে আমার ঠিক কী করা উচিত! আমি কি ক্ষুব্ধ হবো? কাঁদব? নাকি পকেটে পিস্তল নিয়ে নির্বিকার খুন করতে বেরিয়ে পড়ব কাউকে?
রঘু রাইয়ের মনে ছবিগুলো তোলার সময় কী চলছিল তা ঈশ্বর জানেন। একজন পেশাদার আলোকচিত্রীর জন্য জরুরি ছিল বিশ্বকে জানানো, এখানে মানুষ সমানে মারা যাচ্ছে ও ঘরবাড়ি ছেড়ে অজানায় পাড়ি দিতে বাধ্য হচ্ছে। তা তিনি জানাতে পেরেছিলেন। অতঃপর, এই ছবিগুলো প্রেত হয়ে বেঁচে আছে! এমনকি তিনি চলে যাওয়ার পরেও তারা ঘুরছে প্রেতের মতো চারধারে! স্রষ্টাকে খুন করে ছবি বেঁচে আছে! রঘু রাইকে চলে যেতে দিয়ে তাঁর উদ্বাস্তুরা আজো অস্বস্তিকরভাবে বেঁচে আমাদের চোখের সাামনে!
দেখে মনে হয়, তারা অপেক্ষা করছে রঘু রাইয়ের ক্যাপশনে দেওয়া গল্পটি সত্য হওয়ার আশায় : উদ্বাস্তুরাও একদিন ফিরবে ঘরে। সর হারানো সব ডুবে যাওয়া চোখ নিয়ে তাদের তাকানোটা বড়ো নির্মম। মনে হয়, মানুষ নয়, পাথরচাপা ক্রোধ নিয়ে তাকিয়ে আছে মৃত মানুষ। অভিশাপ দিচ্ছে মৃত মানুষ। কাকে? তার মতো অবিকল দেখতে এখনো বেঁচেবর্তে থাকা মানুষগুলোকে!
. . .
. . .
…প্রাসঙ্গিক আরো পড়ুন…
. . .



