
নদীর নির্বাসন
যে-নদী একদিন তোমাকে জানত, আজ তার জলে শুধু শ্যাওলাধরা চাঁদ ভাসে। তীরে উল্টে পড়ে থাকে ভাঙা তরি আর ঘুমিয়ে-যাওয়া জলের দীর্ঘ নীলশ্বাস।
. . .
সন্ধ্যার পাখি
তোমার চুলের অন্ধকারে একদিন যে-পাখি বাসা বেঁধেছিল, তার ডানায় এখন গোধূলির ধুলো, দূর-শীতের গন্ধ। প্রতিদিন সূর্য ডোবার আগে সে আমার জানালায় এসে বসে; ফিরে যায় না কভু।
. . .
অনুপস্থিতির প্রদীপ
রাত-গভীরে নক্ষত্রনিমগ্ন নীরবতায় একটি প্রদীপ জ্বলে। তার ক্ষীণ আলোয় তোমারই না-থাকার দীর্ঘ ছায়াপথ জেগে থাকে।
. . .
বন্ধ দরজার ওপারে
যে-দরজাটি তুমি এক বর্ষণভেজা বিকেলের শেষে বন্ধ করে গিয়েছিলে, তার ওপারে এখনও কুয়াশামাখা বসন্ত, অন্ধ বৃষ্টি, আর তোমার জন্য অপেক্ষমাণ এক অসমাপ্ত দুপুর।
. . .
অদৃশ্য নদী
গতরাতে দেখলাম, নদীর ওপারে দাঁড়িয়ে আছ। মাঝখানে জল নয়, বহু-বছরের নীরবতা। তোমার ঠোঁটে ফুটে উঠল দূর-নক্ষত্রের মতো বিষণ্ণ হাসি। তারপর নদী তার সমস্ত কালো জল নিয়ে অন্ধকারে হারিয়ে গেল।
. . .
সাদা পালক
জলহীন আকাশ থেকে ঝরে-পড়া কোনও পাখির শেষ স্মৃতির মতো, ভোরে জানালায় পড়ে ছিল একটি সাদা পালক। সারাদিন সেটি হাতে নিয়ে বসে রইলাম। কোনও শব্দ শোনা গেল না।
. . .
অদৃশ্য পথ
এখন নদী নেই, নৌকা নেই, পাখিও নেই। শুধু রক্তের গভীরতম অন্ধকারে কোনও-এক হারানো গান—যেন তোমার দিকে যেতে-থাকা একটি পথ, প্রতিরাতে আরও দূরে সরে যায়।
. . .
কুয়াশার জানালা
রাতের শেষ-প্রহরে জানালার কাচে জেগে ওঠে তোমার অস্পষ্ট মুখ। হাত বাড়ালেই কুয়াশা সরে যায়। শুধু থেকে যায় স্পর্শহীন এক শীতল আকাশ।
. . .
হারানো ঋতু
যে-ঋতুতে তুমি এসেছিলে, তার সব গাছ আজও ফুলের অপেক্ষায়। অথচ তাদের শাখায় শাখায় জমে আছে বহু-বছরের অনাবৃষ্টির ধুলো, অন্ধকারের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বাসা।

পরিত্যক্ত বন্দর
আমার বুকের ভিতর একটি বন্দর ছিল। তোমার জন্য নোঙর করা বহু-বর্ষের নীল জাহাজ, অচেনা বাতিঘরের আলো, লবণাক্ত রাত। তুমি এলে না; একদিন তাই সমুদ্র তার সমস্ত দরজা বন্ধ করে দিলো।
. . .
চাঁদের ক্ষত
পূর্ণিমার রাতে চাঁদের গায়ে যে-কালো দাগ দেখি, মনে হয় সেটি তোমার চলে যাওয়ার ছায়া। এত দূর থেকেও তার শীতলতা এসে আমার ঘুমের ভিতর ভাঙা কাচের মতো বিঁধে থাকে।
. . .
অসমাপ্ত চিঠি
তোমাকে লেখা শেষ চিঠিটি আজও টেবিলের ড্রয়ারে। কাগজের ভাঁজে শুকিয়ে আছে এক বর্ষার গন্ধ আর বাক্যের শেষে থেমে থাকা তিনটি ক্ষুদ্র বিন্দু।
. . .
পাথরের বৃষ্টি
তুমি চলে যাওয়ার পর আকাশ থেকে আর বৃষ্টি নামল না; নামল পাথর। জানালার কাচ ভাঙল না, শুধু আমার ভিতরের সব আলো একে-একে নিভে গেল।
. . .
ঘুমন্ত বাতিঘর
সমুদ্রের শেষপ্রান্তে একটি বাতিঘর আজও জেগে আছে। তার আলো প্রতিরাতে ভুল সমুদ্রের দিকে ঘুরে যায়; যেমন আমার সমস্ত অপেক্ষা আজও ভুল ঠিকানায় তোমাকে খুঁজে ফেরে।
. . .
যদি তুমি …
যদি হালকা হালকা বৃষ্টির স্বচ্ছ ফোঁটার মতো ঝরে পড়ত আমার শরীরে, তবে নীল নীল কোনও বিকেলের মতো জড়িয়ে রাখতাম। তোমার নরম নরম চুলে বৃষ্টিভেজা বাতাসের বাতাস পেতাম, আর দূর-নক্ষত্রের আলোয় শুনতাম তোমার নিশ্বাসের নিঃশব্দ গান।
. . .
তোমার উষ্ণতায়
যদি এসে দাঁড়াতে আমার একলা একলা জানালার পাশে, অন্ধকারের ভিতর থেকে জেগে উঠত কত অচেনা অচেনা ফুল। তারপর রাত-গভীরে বৃষ্টি-বৃষ্টি থেমে যেত; আর তোমার উষ্ণতায় আমার শীত-শীত জীবন ধীরে ধীরে গলে যেত।
. . .
তবে, হয়তো
ভোর হলে—যদি চলে না-যেতে; যদি একটি রজনিগন্ধার মতো জানালার কাচে, বৃষ্টির জলে, আমার ঘুম-জাগা চোখে থেকে যেতে, তবে হয়তো জানালা খুললেই ঘরে ঢুকত তোমার সুবাস। সেই ভোরে পৃথিবী আর কিছুই চাইত না।
. . .
যে-সকাল এল না
একটি পাখি প্রতিদিন আমার জানালায় এসে বসত। তোমার কথা বলত না, তোমার গন্ধও আনত না। শুধু একবার আকাশের দিকে তাকিয়ে উড়ে যেত। এক সকালে সে আর এল না। বুঝলাম, অপেক্ষারও মৃত্যু হয়।
. . .
লেখক পরিচয় : ফজলুররহমান বাবুল : উপরের ছবি অথবা এখানে চাপুন
. . .
… থার্ড লেন স্পেস-এ প্রাসঙ্গিক আরো দেখুন …
নদীর মৃত্যু, জীবনের ক্ষত : ফজলুররহমান বাবুল
বাংলার খেত, কৃষি : ফজলুররহমান বাবুল
. . .

অবদায়ক ফজলুররহমান বাবুল : থার্ড লেন স্পেস.কম
ফজলুররহমান বাবুল-এর অন্যান্য রচনা ও প্রাসঙ্গিক পাঠের জন্য এখানে চাপুন



