
জীবনানন্দ—কাছে থেকে দূরের। জীবনানন্দ—দূরে থেকে কাছের। খণ্ড থেকে অখণ্ডের। আলো-অন্ধকারের জীবনানন্দ শূন্যের। মহাশূন্যের। মাঠ ঘাট নদী সমুদ্র নক্ষত্রের। গ্রহ হতে মহাবিশ্বের। বিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞান, ভূগোলের জগৎ হয়ে ইতিহাসের। একাকীত্ব, নির্জনতার। জীবনানন্দের কবিতায় তার ঝলক, উল্লেখ আছে। আছে কবির লেখা প্রবন্ধে। জীবনানন্দের কবিতায় আছে মহাশূন্যের মহাবিস্তৃতি। আবার ক্ষণেকে ফিরে আসা আছে বাস্তবে। জীবনে। জীবন ও জগৎতত্ত্বকে জীবনানন্দ এক করে গেঁথেছেন। ইঙ্গিতে ইশারায় রেখেছেন জ্যোতিপুঞ্জের চালচলন। মানুষের মনের সঙ্গে তারা, নক্ষত্রের সঙ্গে হৃদয়ের আবেগ অনুভূতি গিয়েছে মিশে। পরপারের অন্ধকার গহিনে চলতে থাকা ক্রিয়াকলাপের চেতনা ধরা দিয়েছে কবিতার আত্মায়। গ্রহ তারা আকাশগঙ্গার নিত্য প্রবহমানতা, তার সঙ্গে জীবন-মৃত্যু-অন্ধকারের সমীকরণ কষেছেন জীবনানন্দ। সেখানে ধরা দিয়েছে আপেক্ষিকতাবাদ। সৃষ্টিকে শেষ সত্য বলে এ-জন্যই তিনি মনে করেননি। কেননা ব্রহ্মাণ্ডের আলোকবর্তিকায় চলাফেরা আছে জীবনানন্দে। মহাজাগতিক কালগতির সঙ্গে মিশে গিয়েছে জীবনচক্রের এপার-ওপার। জন্ম-মৃত্যু। আলো-অন্ধকার। আর এর মাঝেই আছে মহাকাশতত্ত্বের টুকরো কথা :
তোমার আকাশে তুমি উষ্ণ হয়ে আছো, তবু
বাহিরের আকাশের শীতে
নক্ষত্রের হইতেছে ক্ষয়, নক্ষত্রের মতন হৃদয়
পড়িতেছে ঝরে—
—নির্জন স্বাক্ষর
নক্ষত্রের ক্ষয় হয় নাকি! নক্ষত্রের হয় লয়! মহাবিশ্বের গহ্বরে নক্ষত্রের জন্ম হয়। বার্ধক্য আসে। ঘটে মৃত্যু। ঠিক যেন আমাদের জীবনের মতো। তবে নক্ষত্রের আয়ুরেখা লক্ষ কোটি গুণ বেশি হলেও জীবনানন্দ তাকেই জীবনের সঙ্গে তুলনায় এনেছেন। আকাশের শীতে, নক্ষত্রের ঝরে পড়ায় মিলিয়েছেন জীবনের অপ্রাপ্ত দিকগুলি। আশাহত হয়ে ঝরে পড়ে, খসে পড়ে তারা। তারই চিত্রকল্পে গড়ে উঠেছে কবিতা। আকাশের ওপারের জগতের সঙ্গে তুলনায় এসেছে মাটির জগৎ। মানুষের মনের ওঠা-নামা। মনের ভাবনা। মনের গতিকে ধরা হয়েছে মহাশূন্যের আধারে।
‘বাহিরের আকাশের শীতে/নক্ষত্রের হইতেছে ক্ষয়’—আমরা জানি নক্ষত্রের হাইড্রোজেন গ্যাস আস্তে আস্তে পুড়তে থাকলে শক্তি উৎপাদনও হ্রাস পায়। এর ফলে নক্ষত্রের ভিতরের তাপমাত্রা ও ঘনত্ব বাড়তে থাকে। অন্যাদিকে নক্ষত্রের জ্বালানি পুড়ে শেষ হলে বাইরের তাপমাত্রা কমে গিয়ে আগের থেকে প্রায় অর্ধেক হয়ে যায়। কবি কি এ-কথায় বললেন—‘তোমার আকাশে তুমি উষ্ণ হয়ে আছো, বাইরের আকাশের শীতে।’ আর তারপরেই নক্ষত্রের খসে পড়া, ক্ষয় হওয়া। কেননা বাইরের তাপ কমতে থাকলে, নক্ষত্রের আয়ুকাল শেষের দিকে চলে আসে। বর্ণ হয় লাল। যা নক্ষত্রের শেষের শুরু। হৃদয়েরও কি এরূপ হয়! ভিতরে উষ্ণতা থাকলেও বাইরের অপ্রাপ্তি, হতাশার শীত কি হৃদয়ের মৃত্যু রচনা করে! এভাবেই কি কবি মহাবিশ্ব ও মনের বেদন-তত্ত্বকে এক করে দেন!
শিয়রে আকাশ দূর দিকে
উজ্জ্বল ও নিরুজ্জ্বল নক্ষত্র গ্রহের আলোড়নে
অঘ্রাণের রাত্রি হয়;
—একটি নক্ষত্র আসে
কবিতাটিতে একটি নক্ষত্র আসে। অন্ধকারে কবির দুয়ার খুলে দেয়। সন্ধ্যা মেয়েটির হাতের আঘাতে, ঘুম পাড়িয়ে রাত্রি হতে পারে। আর তারপরেই কবির ওই উক্তি। তখন মাথার উপরে আকাশের দিকে কবি মনোনিবেশ করেছেন। উজ্জ্বল ও নিরুজ্জ্বল নক্ষত্র গ্রহের মধ্যে চলছে আলোড়ন। এভাবে অঘ্রানের রাত হয়। অঘ্রানে হয় শীতের শুরু। অর্থাৎ কবি শীতের জগতে। উপরে তারা গ্রহের আলোড়নে উষ্ণতার প্রকাশ। ঠাণ্ডা-গরমের কনট্রাস্টে নক্ষত্রের আগমন। কবি ফিরলেন মহাবিশ্বের চলমানতায়। গ্রহ তারার আলোড়নে যে-অস্থিরতা, চঞ্চলতা সেই উষ্ণ ব্যাকুলতা হয়তো কবির বুকেও।
শীতের রাত মানেই কেউ ঠাণ্ডায় ঘুমিয়ে পড়বে এমনটা নয়৷ তার মনেও চলতে পারে আলোড়ন। সেই আলোড়নকে সঙ্গে করেই অঘ্রানের রাত কাটাতে পারে কেউ। অর্থাৎ শীতরাতের মনের আগুন, আলোড়ন, চঞ্চলতাকে কবি বুঝিয়ে দিলেন। উদাহরণে আনলেন মহাবিশ্বের দূরের আকাশ। তারা গ্রহকে। জ্যোতির্বিজ্ঞান বলছে, কোনও তারার ভিতরের তাপের কারণে তারাপৃষ্ঠে ঠেলে দেওয়া শক্তি যখন মহাকর্ষ বলের সঙ্গে ভারসাম্য হারায়, তখন নক্ষত্রের উপরপৃষ্ঠ সংকুচিত ও প্রসারিত হতে থাকে। ফলে সৃষ্টি হয় আলোড়ন। একজন মানুষ-কবির বুকের তাপ যখন বাইরের দিকে প্রাণশক্তি প্রেরণ করে তখন কি বুক কেঁপে ওঠে না! বুকের ভিতর উথাল-পাতাল করে না! মনে কি সৃষ্টি হয় না আলোড়ন! ওই মানসিক অবস্থা কি নক্ষত্রের আলোড়নে প্রকাশ করা হলো! যদি তাই হয়, তাহলে বলতে হয় মহাশূন্যের চলমানতাকে জীবনানন্দ মানুষের ভাবপ্রকাশের উপকরণ হিসাবে প্রয়োগ করেছেন। আর সেখানেই লুকিয়ে আছে মহাশূন্যতত্ত্ব। যা জীবনানন্দ খুব গুছিয়ে, স্বল্প শব্দে বলে গেছেন।
উজ্জ্বল ও নিরুজ্জ্বল শব্দের মাঝেও আছে বিশালতা। অসীমের অসীমতা। উজ্জ্বল নক্ষত্র অর্থাৎ যা কাছের নক্ষত্র। দেখা যায় চোখে। অনুজ্জ্বল নক্ষত্র সেগুলো যারা আরও আরও দূরে। চোখের বাইরে। হয়তো গ্যালাক্সির শেষ প্রান্তের কোনও নক্ষত্র। গ্যালাক্সি ছড়িয়ে অন্য জগতের। সেখানেও হয়তো একই আলোড়ন। এভাবে অসীমের পরপারে চলে যায় অনুজ্জ্বল শব্দটি। আবার গ্রহ তারার মধ্যেও চলে এই আলোড়ন, কম্পন কোনও তারার কাছে কোনও গ্রহ থাকলে, সেই গ্রহের মহাকর্ষ-টানের কারণে কম্পন সৃষ্টি হয় নক্ষত্রের গায়ে। নক্ষত্রপৃষ্ঠে। তাহলে ওই একটি ‘আলোড়ন’ শব্দেই বোঝানো হলো তারার নিজস্ব আলোড়ন। গ্রহ ও তারার আলোড়ন। পৃথিবীপৃষ্ঠে (হয়তো ওই গ্রহ পৃথিবীই) বসে থাকা কোনও কবির মনের আলোড়ন।
নীলিমা, জ্যোতিষ্কশিখা, নক্ষত্রবীথি, মহাবিশ্ব জীবনানন্দের কবিতায় এসেছে সহজ হয়ে। জগৎ ও জীবনের মেলবন্ধন বা সমচলমানতা প্রদর্শন করতে। কখনও অনুভূতি প্রকাশ করতে। কখনও মহাকাশের আধারে জীবনতত্ত্ব মিলিয়ে দেখতে। নীলিমার মতো সুবিশাল মনের প্রান্তরকে মেলে ধরতে। সেসব কবিতা-কথায় জীবনানন্দ তাঁর মহাবিশ্ব ভাবনার প্রকাশ করেছেন। মহাবিশ্বে, ব্রহ্মাণ্ডে নক্ষত্র জ্বলে উঠলেও সেখানে আছে ঘন আঁধার। যে-আঁধারের ভিতরে চলে নানা খেলা। আবার সেই মহাজাগতিক খেলা বা চলাচলে বিঘ্ন ঘটলে আসতে পারে আঁধার;—তমসা। সে তমসা কেন ঘটবে, কীভাবে ঘটবে, কবে ঘটতে পারে সেসব জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের গবেষণার বিষয়। কিন্তু একজন কবি হয়ে যখন সেসবের ইঙ্গিত দেওয়া হয়, তখন বলতে হয় কবি ভাবলোকে চলে যেতে পারেন অনন্তের ওপারে। আবর্তন, ঘূর্ণন, বিবর্তন, ঘর্ষণ, একই অঙ্কে নক্ষত্র গ্রহাণুপুঞ্জের কাছাকাছি চলে আসা নিয়ে যে-ঝঞ্ঝার উৎপত্তি, তাও একজন কবি তুলে ধরতে পারেন মাত্র কয়েকটি শব্দে। মাঘসংক্রান্তির রাতে কবিতায় তারই উল্লেখ করা হলো যেন :
আঁধার অরব রাতে আপন জ্যোতিষ্কশিখায়;
মহাবিশ্ব একদিন তমিস্রার মতো হ’য়ে গেলে
মুখে যা বলনি, নারি, মনে যা ভেবেছো তার প্রতি
লক্ষ্য রেখে অন্ধকার শক্তি আর সুবর্ণের মতো
দেহ হবে মন হবে — তুমি হবে সে-সবের জ্যোতি।
—মাঘসংক্রান্তির রাতে

অর্থাৎ মহাবিশ্ব যদি একদিন তমিস্রার মতো হয়ে যায় তখন কী হবে? আমাদের গ্যালাক্সিরও লয় হতে পারে একদিন। কথায় যেন তারই ইঙ্গিত। আমাদের সূর্যও একদিন লয় হতে পারে। তখন কী হবে? তখন আবার অন্ধকার। সেই অন্ধকার থেকে আবার শক্তির সংগঠন। তারপর অগ্নি সুবর্ণের উদয়। আর সেই উদয়কে কবি কাব্যিক ভাষায় বললেন : ‘তুমি হবে সে-সবের জ্যোতি।’ ধ্বংসের পরে পুনর্জন্ম। ধ্বংসের আগে ঝড়-ঝঞ্ঝা। তারও ইঙ্গিত :
পথ চিনে এ-ধুলোয় নিজের জন্মের চিহ্ন চেনাতে এলাম;
কাকে তবু?
পৃথিবীকে? আকাশকে? আকাশে যে-সূর্য জ্বলে তাকে?
ধুলোর কণিকা অণুপরমাণু ছায়া বৃষ্টি জলকণিকাকে?
যেই কুজ্ঝটিকা ছিলো জন্মসৃষ্টির আগে, আর
—যাত্রী
কতো অল্প কথায় জীবনানন্দ বুঝিয়ে দিলেন মহাবিশ্বের সৃষ্টিতত্ত্ব। লয়-ক্ষয় তত্ত্ব। যে-ধুলোয় আমাদের জন্ম, যে-পৃথিবীতে, আকাশে আমরা থাকি তারও জন্মচিহ্ন, জন্মকাল আছে। তারও বিলোপের কাল আসবে। কিন্তু সে সৃষ্টির আগে আসবে কুজ্ঝটিকা। জন্মসৃষ্টির আগে থাকবে অনু-পরমাণুর খেলা। যে-অনু-পরমাণু, ইলেকট্রন নিউট্রন ভূমিকা রাখে মহাবিশ্বের অন্তরীক্ষে। কবি তাই বলছেন :
ইলেকট্রনেরা নিজ দোষগুণে বলয়িত হ’য়ে রবে;
কোনো অন্তিম ক্ষালিত আকাশে এর উত্তর হবে?
—লোকেন বোসের জার্নাল
কোনো অন্তিম ক্ষালিত আকাশে এর উত্তর হবে? কথাটা স্পষ্ট করে বলে দেয়-যে ইলেকট্রন প্রোটন নিউট্রনের খেলায় নতুন গঠন আসতে পারে। নতুন গ্রহ তৈরি হতে পারে। তৈরি হতে পারে নতুন আকাশ। নতুন গ্যালাক্সি। নতুন নক্ষত্র থাকতে পারে তার মাঝে। যা হতে পারে আমাদের থেকে লক্ষ কোটি কিলোমিটার দূরে। কবি যেন তারই সারাংশ বললেন। এভাবে ব্ৰহ্মাণ্ড-বিজ্ঞানকে কবিতায় আনলেন মাত্র কয়েকটি শব্দে। মানুষের চলাচলের তুলনায়। আমাদের জন্ম স্থিতি লয় মাত্র কয়েক বছরের। মহাবিশ্বের উপকরণের জন্ম স্থিতি লয় লক্ষ কোটি বছরের। সময়ের ব্যবধান থাকলেও জন্ম পরে যাত্রা যেন এক। সেই অকল্পনীয় চিন্তাচেতনায় কলম চালিয়েছেন জীবনানন্দ। সময়ের থেকে বহু বহু এগিয়ে থাকা নির্জনতম বলে আখ্যায়িত এক কবি।
জীবনানন্দ দাশের কবিতায় ছড়িয়ে আছে শূন্য, শূন্যতা। অনন্ত অন্ধকার। আকাশের ওপারে আকাশ। নীলিমা। আছে পৃথিবীর মাঠ, ঘাট, সমুদ্র। দিন রাত। তার উপরে সীমাহীন অদৃশ্যমান শূন্যতার খোলা প্রান্তর। এই শূন্যতার সঙ্গে তুলনায় এসেছে নিঃসঙ্গতা। অন্ধকার প্রান্তরের সীমা নিয়ে নেমে এসেছে নৈঃশব্দ। চুপকথা আছে হিজলে অশ্বত্থে কলমিদামে। ধ্রুবতারা কালপুরুষে। সূর্য জ্যোতিষ্কের নানা প্রকার রূপে, রূপান্তরে।
জীবনানন্দ যেভাবে মানবমনের অন্তরের গোপনসত্তার প্রকাশ করেছেন, যেভাবে তাতে মিশেছে এই প্রকৃতির লীলা, তার সঙ্গে মিশে গেছে মহাজগতের নানা অনুষঙ্গ। সে অনুষঙ্গ জীবনের প্রসঙ্গকে আরও প্রাসঙ্গিক করে। ওদিক এদিকের চলাচলে যেন বেজে ওঠে মহাসময়ের সুর। মহাকলের গতি। মহাসৃষ্টির অপার অসীমতা। সীমাহীন সীমানাকে কল্পলোকের আলোকে আলোকিত করেছেন কবি। ব্রহ্মাণ্ডের অলিখিত সূত্র ধরা দিয়েছে জীবনানন্দের চেতনায়, দর্শনে। সেসব সূত্রের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা হয়তো অতি জটিল। যার শেষ হবে না কখনও। কিন্তু যখন কোনও কবি সেসবের কাব্যিক পঙক্তি রচনা করেন, তা বিজ্ঞানীদেরও ভাবিয়ে তুলতে পারে। মহাগহ্বরের অতল তলের রূপ কল্পনা করেন এক কবি। এই পৃথিবীর তলে;—বসে, শুয়ে, ঘুমিয়ে। চেতনার ব্যাপ্তি ছুঁয়ে যায় দেখা অদেখা গ্রহাণুর গা ছুঁয়ে।
…নক্ষত্রপথের
অন্তঃশূন্যে অন্ধ হিম আছে জেনে নিরে
তবুও তো ব্রহ্মান্ডের অপরূপ অগ্নিশিল্প জাগে;
আমাদেরো গেছিলো জাগিয়ে
পৃথিবীতে;
—মৃত্যু স্বপ্ন সংকল্প
ব্রহ্মাণ্ডের গতিবিধিকে খুব গুছিয়ে, স্বল্প বাক্যে বুনেছেন জীবনানন্দ। তার সঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন নিজের চেতনা। নক্ষত্রপুঞ্জের ছবি যেমন এঁকেছেন, তেমনই দেখিয়েছেন মহাকাশের ছবি। মহাকাশের চলমানতা। যা মহাকাশতত্ত্বের কবিজনোচিত উপস্থাপন। নক্ষত্র থাকলেও মহাকাশে যে-বিশাল শূন্যতা, সেই শূন্যতার মাঝে যে-অন্ধকার তাকেও উল্লেখ করেছেন। সেই অসীম অন্ধকারের অজানা রহস্য, যে-নিয়ম-অনিয়মের খেলা সেখানে চলে তাকেই বোঝাতে চেয়েছেন জীবনানন্দ। মহাশূন্যের এই শিল্পকলা কবিকে আকৃষ্ট করে। এই রহস্যলীলা কবির কাছে ‘মহাবিশ্বকারুকার্য’।
জীবনানন্দের জীবনকালে ব্ল্যাক হোল তত্ত্ব, ঈশ্বরকণার আলোচনা সেভাবে আলোকিত হয়নি। সেসব বিষয় তখনও অজানা ছিল আমাদের কাছে, অথচ তারই উল্লেখ যেন পঙক্তিজালে। কৃষ্ণগহ্বরের ভিতরে প্রবেশ করলে যে-স্থিরতা সৃষ্টি হয়, সেটাই যেন কবির বাক্যে এসে পড়েছে—‘অন্তঃশূন্যে অন্ধ হিম’ শব্দের মধ্যে সেই কালো জগতে প্রবেশ করলে সবকিছু স্থির হয়ে যায়, সময় হারায় গতি, সেটা জীবনানন্দের জানার কথা নয়। কিন্তু কবির দর্শন, চেতনা, বোধ কে বুঝতে পারে! বিজ্ঞান যা নিয়মের সূত্রে বলে, তাকেই একজন কবি বলেন কবিতার লাইনে। অস্পষ্ট করে, অন্ধকার মিশিয়ে, হিমায়িত করে। মহাকাশের ভিতরে শূন্যস্থান, আলোকবর্ষ, গ্রহ, নীহারিকা, আকাশগঙ্গা নিয়ে ব্রহ্মাণ্ডের অপরূপ ‘অগ্নিশিল্প জাগে’। আঁধারে হিমের রাতে আকাশের তলে বসেন কবি। আকাশে জ্যোতিষ্ক নেই। তখন ‘গভীর পবিত্র অন্ধকার’। এসব দেখে-ভেবে-কল্পলোকে ‘মৃত্যু স্বপ্ন সংকল্প’ কবিতায় জীবনানন্দ বলছেন :
হে আকাশ, হে কালশিল্পী, তুমি আর
সূর্য জাগিয়ো না;
মহাবিশ্বকারুকার্য, শক্তি, উৎস, সাধঃ
মহনীয় আগুনের কি উচ্ছ্রিত সোনা?
—মৃত্যু স্বপ্ন সংকল্প
মহাশূন্যের অন্ধকার মহাবিশ্ব, ব্রহ্মাণ্ডের যে-নিয়ম-নীতি-চলাচল তাকেই কবি যেন মহাবিশ্বকারুকার্য বললেন। সেখানে অন্ধকার যেমন আছে, তেমনি আছে নানা নক্ষত্রকে নিয়ে গড়ে ওঠা অজানা জগৎ। আছে মহাকাশের পরপারে ভাঙাগড়ার খেলা। যা আজও অজানা। যার আঁচ আমরা এতদিনে পেতে শুরু করেছি। কিন্তু কবি যেন বহু আগেই তার ইঙ্গিত দিয়ে গেছেন :
তারপর অন্য গ্রহ নক্ষত্রেরা আমাদের ঘড়ির ভিতরে
যা হয়েছে, যা হতেছে, অথবা যা হবে সব এক সাথে প্রচারিত করে।
—আবহমান

গ্রহ নক্ষত্র পৃথিবী ঘড়ি—সব মিলিয়ে স্পেসটাইমের (spacetime) ইঙ্গিত আছে এখানে। আছে অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ (হয়েছে, হতেছে, হবে)। আমরা জানি পৃথিবী, গ্রহ বা নক্ষত্রে সময়ের পার্থক্য আছে। সেখানে চলে আসে আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতাবাদ। তারই নানারকম কবিকথা যেন জীবনানন্দের কবিতা। কখনও তা ধোঁয়াশার মতো। কখনও তা অস্পষ্ট, অধরা। কখনও গভীর পর্যালোচনার বিষয়। কেননা কবি যেতে পারেন বহু বহু অজানা জগতে। দূরে আরও দূরে—বহুদূরে। তাদের সবকে যেন এক করে, কবির চোখে ধরা আছে। সেখানে আছে ‘অপরূপ অগ্নিশিখা’। সেখানে আছে শক্তির উৎস। যেমন আছে আমাদের পৃথিবীতে। জীবনানন্দের কবিতায় মহাবিশ্ব-কল্পনা শুধু নক্ষত্রেই সীমাবদ্ধ নয়। তা আঁধারের অসীমতা। দেখার বাইরে না দেখার জগৎ। অনন্ত শূন্যের নানাবিধ আকাশ ‘অন্তঃশূন্যে’ পাড়ি দেন কবি। ইঙ্গিতে বলে দেন মহাজাগতিক ঝঞ্ঝার কথা :
নীলিমাকে যত দূর শান্ত নির্মল মনে হয়
হয়তো-বা সে-রকম নেই তার মহানুভবতা।
—পরিচায়ক
জীবনানন্দের কবিতার আকাশে এসেছে নক্ষত্র। গভীরভাবে তাদের লক্ষ করেছেন কবি। তাদের নিরিখে তুলে ধরেছেন জীবনের নানা দিক। ভাবনার নানা কথা। বিষয়ের নানা বাজনা। সমাজ সময়ের ছাপ পড়েছে সেসব নক্ষত্র পরিদর্শনে
হে কালপুরুষ,
ধ্রুব, স্বাতী, শতভিষা,
উচ্ছৃঙ্খল প্রবাহের মতো যারা তাহাদের দিশা
স্থির করে কর্ণধার?
—পরিচায়ক
কালপুরুষ ধ্রুবতারা জ্যোতির্বিজ্ঞানের বিষয়। আবার স্বাতী শতভিষা হলো জ্যোতিষশাস্ত্রের নক্ষত্র। যারা রাহু গ্রহের দ্বারা প্রভাবিত। রাহু গ্রহরাশিও আমাদের জীবনের সঙ্গে জড়িত। জ্যোতিষশাস্ত্রের এসব নক্ষত্র অবদান রাখে বর্তমান ভবিষ্যৎ পরিদর্শনে। এসবের মাঝেই আছে সমাজ। সময়। জগতের চলমানতা। সঙ্গে মহাজাগতিক যোগ। ‘উচ্ছৃঙ্খল প্রবাহ’ হয়তো অন্তরীক্ষের মহাকর্ষবল বা ঘূর্ণন বা অন্যকিছু। যা সাধারণ নিয়মকে অমান্য করে। ‘তাহাদের দিশা’ হয়তো তাহাদের গতিপথ, অক্ষ বা অক্ষের বাইরে বেরিয়া যাওয়ার অভিপ্রায়। ‘কর্ণধার’ হয়তো গ্রহ নক্ষত্রের মূল পরিচালিকা শক্তি বা নিয়ন্ত্রক। আবার এসব শব্দ আমাদের সমাজেরও কথা। সমানুপাতে মহাজগতের চলাচলের রূপক যেন :
মহা-মহা রজনীর ব্রহ্মাণ্ডকে ধরে
সৃষ্টির গভীর-গভীর হংসী প্রেম
নেমেছে — এসেছে আজ রক্তের ভিতরে।
‘এখানে পৃথিবী আর নেই—’
—অনেক নদীর জল
সারাৎসার কবিতায় এসেছে নক্ষত্র। পল অনুপল সময়ের ভগ্নাংশ। অন্তহীন নিপলের চকমকি। তারাদের পরিভাষা। কবি যেন মানমন্দিরে বসে নক্ষত্রের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছেন। বলছেন কসমোপলি, অ্যাস্ট্রোনমির নানা কথা। অন্তঃশূন্য মহাশূন্যের মহাবলয়ে গ্রহ তারা গ্যালাক্সির গহিনে ডুব দিচ্ছেন কবি। সেখানের চলাচলের সঙ্গে মেলাতে চাইছেন মানবমনের কথা। মানুষ-মানুষীর হৃদয়ের কথা। যার পরিভাষা নক্ষত্রের উজ্জ্বলতা, ‘পল অনুপল দিয়ে অন্তহীন’। যা ওপারের সঙ্গে এপারের মেলবন্ধন করে। মহাকাশের আধারে উঠে আসে সময় :
নক্ষত্রেরা মানুষের আগে এসে কথা কয় ভাবি;
পল অনুপল দিয়ে অন্তহীন নিপলের চকমকি ঠুকে
ঐ সব তারার পরিভাষার উজ্জ্বলতা;
আমার লক্ষ্য ছিল মানুষের সাধারণ হৃদয়ের কথা
সহজ সঙ্গের মতো জেগে নক্ষত্রকে
কী ক’রে মানুষও মনুষীর মতো ক’রে রাখে।…
অনুভব করে আমি অনুভব করেছি সময়।
—সারাৎসার
কবি বললেন, নক্ষত্র কীভাবে জেগে থেকে তার চলাচলকে মানুষ-মানুষীর মতো করে রাখে। তাহলে নক্ষত্রের পল অনুপল অন্তহীন জ্বলে থাকা, নক্ষত্রের পরিভাষায় কি মানুষ-মানুষীর হৃদয়কে জীবনানন্দ খুঁজেছেন? চেয়েছেন সেসবকে মহাবিশ্বের চলাচলের আঁধারে আমাদের জীবনের দ্যোতক করে তুলতে! হয়তো তাই। হয়তো মহাবিশ্বতত্ত্বের মহাকথার আঙ্গিকে এঁকেছেন জীবন। স্বভাব কবিতায় যেন তারই ইঙ্গিত :
সূর্যের সমস্ত গোল সোনার ভিতরে
মানুষের শরীরের স্থিরতর মর্যাদার মতো
তার সেই মূর্তি এসে পড়ে।
সূর্যের সম্পূর্ণ বড় বিভোর পরিধি
যেন তার নিজের জিনিস।
—স্বভাব
মানুষের শরীর, মর্যাদা অন্যদিকে ‘সূর্যের বড় বিভোর পরিধি’—যেন মানুষ ও সূর্যকে এক করে দেখা। সূর্যকে মানুষের প্রতীক ভাবা। মানুষকে সূর্যের পরিধিতে প্রতিফলিত করা। তাই তিনি বলতে পেরেছেন—‘যেন তার নিজের জিনিস।’
জ্যোতির্বিজ্ঞান, জ্যোতিষবিজ্ঞান নিয়ে যে-মহাসমন্বয় জীবনানন্দ ঘটিয়েছেন তা যেন ব্রহ্মাণ্ডতত্ত্বের কাব্যিক কথা। যেখানে গ্রহ নক্ষত্রের পাশাপাশি এসেছে বৃষ মেষ বৃশ্চিক রাশি। অ্যাস্ট্রোনমি অ্যাস্ট্রোলজির হাত ধরে জীবনানন্দের শূন্য-সাধনায়, অন্ধকার আরাধনায় এসেছে মানুষ। যা স্থান-কাল নিয়ে, এপার-ওপার ঘুরে শেষ-অবধি বলেছে মানুষের কথা :
স্বাতীতারা শুকতারা সূর্যের ইস্কুল খুলে
সে মানুষ নরক বা মর্ত্যে বহাল
হতে গিয়ে বৃষ মেষ বৃশ্চিক সিংহের প্রাতঃকাল
ভালোবেসে নিয়ে যায় কন্যা মীন মিথুনের কূলে।
—সৃষ্টির তীরে
. . .

… থার্ড লেন স্পেস-এ প্রাসঙ্গিক আরো দেখুন …
কবিতা সিরিজ : জীবনানন্দ, তোমাকে ভেবে-৪ : হেলাল চৌধুরী
কবিতা সিরিজ : জীবনানন্দ, তোমাকে ভেবে-৩ : হেলাল চৌধুরী
কবিতা সিরিজ : জীবনানন্দ, তোমাকে ভেবে-২ : হেলাল চৌধুরী
কবিতা সিরিজ : জীবনানন্দ, তোমাকে ভেবে-১ : হেলাল চৌধুরী
নেটালাপ : নিরীক্ষা ও বিনির্মাণে জীবনানন্দ দাশের অন্ধকার-৩
নেটালাপ : নিরীক্ষা ও বিনির্মাণে জীবনানন্দ দাশের অন্ধকার-২
নেটালাপ : নিরীক্ষা ও বিনির্মাণে জীবনানন্দ দাশের অন্ধকার-১
. . .
লেখক পরিচয় : ড. শিবশঙ্কর পাল: ওপরের ছবি অথবা লিংক চাপুন
. . .



