
১.
আয়না আজও যেন গোপন জলের উপকূল,
তার বুকে ডুবে থাকে ভাঙা নক্ষত্রের সেই হাড়।
মানুষের মুখ এসে রেখে যায় ধূলি-বালি-ফুল,
তবু পরিধান করে জীবনে অনন্ত অন্ধকার।
একটি পাখি প্রতিদিন কাচের ভেতর জন্মায়,
ডানায় জড়িয়ে রাখে নিঃসঙ্গ বিকেলেরই ধোঁয়া।
বাতাসের মৃত ভাষা যেন তার ঠোঁটে ঘুমে যায়,
সময়ের কূপে পড়ে থাকে জল ছেঁড়া জলেরই ছোঁয়া
যে মুখ হারিয়ে গেছে বহু বহু শতাব্দীর আগে,
আয়না এখনো যেন তাকে ডাকে গোপনে সে নামে।
জোছনার ভাঙা সিঁড়ি নেমে আসে তীব্র অনুরাগে,
মরুভূমি ফুটে ওঠে যেন শিশিরের অভিরামে।
আমি যতই তাকাই দেখি না নিজেকে কোনোদিন,
আয়নায় পড়ে আছে অন্য কোনো জীবনের ঋণ।
. . .
২.
আয়নার শরীরেই যেন বৃষ্টির নীল শেকড়,
মেঘ যেন বসিয়েছে সেখানে শামুকের সংসার,
মেঘে মেঘে ভেসে যায় চোখের গোপন সেই ঘর,
তার আঁশে জ্বলে ওঠে হারানো দিনেরই অঙ্গার।
দরজাবিহীন ঘুম এসে বসে থাকে নয়নের কোণে,
নীরবতার গায়ে ফোটে কুয়াশার অগণিত ফুল,
চেনা নদী বয়ে যায় অচেনা রুপালি ক্ষণে ক্ষণে,
ডুবে যায় মানুষের ছায়া, জেগে থাকে কিছু ভুল।
যে শিশুটি একদিন কাচে কাচে এঁকেছিল সূর্য,
এখন নক্ষত্র হয়ে ভেসে বেড়ায় দূরে-সুদূরে
আয়না আঙুলে তার বেঁধে রাখে গোপন বিস্ময়,
যেন সময়ের পাখি গান গায় বহুরূপী সুরে।
প্রতিটি প্রতিবিম্বই যেন অসমাপ্ত মহাকাব্য গান,
আয়না তার পাতায় লেখে নিঃসঙ্গের অভিধান।
. . .
৩.
আয়নার দেশে কোনো সীমান্তরেখাও যেন নেই,
সব মুখ একদিন হয়ে যায় বাতাসের নাগরিক।
গাছেরা সেখানে পরে মানুষের চোখ বাতাসেই,
নদী শেখে কেমন করে হতে হয় প্রাগৈতিহাসিক।
যেন ঘোড়াও দৌড়ায় কাচের ভেতর সারাক্ষণ,
তার ক্ষুরে ক্ষুরে জেগে ওঠে ঘুমন্ত কোন সে গ্রহ
সূর্যের পুরোনো সেই মানচিত্র ছিঁড়ছে জীবন,
চাঁদ এসে বসে থাকে নির্বাসিত জটিল সন্দেহ।
সেখানে মৃত্যুও এক উল্টোরথে গোপন জানালা,
যেখানে প্রত্যহ আলো যেন ঢোকে অন্ধকার ঘরে।
অতীতের কঙ্কালেও লেগে থাকে গুল্মলতাপাতা,
বেহালার সুর ভাসে ডুবে যাওয়া শহরের পরে।
যখন আয়না ভাঙি, ভাঙে না তার মননে মনন—
অগণিত টুকরোয় জেগে ওঠে নতুন প্রতিফলন।
. . .
৪.
আয়না আসলে যেন পরাবাস্তব মনোজ বৃক্ষ,
যার পাতায় পাতায় ঝুলে থাকে মানুষের কাল
প্রতিটি শিরায় বয়ে যায় অদৃশ্য আলোকরেখা,
স্বপ্নেরা সেখানে রাখে তাদের প্রথম প্রেমজাল।
কাচের গর্ভেই যেন ঘুমায় বহু যুগের বৃষ্টি,
অনাগত মুখে মুখে গুনে যায় যেন নীল সংখ্যা
একটি জোনাকি লিখে যায় মহাশূন্যেরই দৃষ্টি,
ধূলিকণার ভেতর জাগে আদি সম্ভাবনার চাকা।
আয়নাও জানে — মানুষ কেবল প্রতিধ্বনি,
সময়ের করিডোরে যেন ভেসে থাকা ভিন্নমাত্রা।
তবু সে সযত্নে রাখে প্রতিটি মুখের সেই ধ্বনি,
যেন মহাকাশে জ্বলে সেই স্মৃতির গোপন যাত্রা।
এই কারণেই কাচে তাকালে বিস্ময় শুধু জাগে—
আয়নার জীবনই আমাদের কাছে আসে আগে।
. . .

৫.
পারদের নদী বেয়ে নেমে আসে আদিম আঁধার,
যেখানে স্মৃতির পাতা কঙ্কালেরা পরে ছদ্মবেশ
আয়না উগরে দেয় শতাব্দী প্রাচীন অবশেষ,
সময়ের ভগ্নাংশে জমে আছে মাংসের খামার।
তুমি যাকে ভাবো রূপ, সে তো এক পশমি অসুখ,
কাচের ওপাশে বসে যেন একা জ্যামিতিক চিল — ঠোকরায় অহংকারে মেদ, নীল বিষাক্ত নিখিল
ভেঙে পড়ে অনুভূতি খাঁচার ভেতর চেনা মুখ।
আধুনিক এই ঘরবাড়ি, যেন নিঃসঙ্গ প্রোটন,
ভেতরে অবাধ্য শ্বাস, বাইরে যে-পরাবাস্তব নদী। আয়নার ফুসফুসে জমে আছে মিথ্যার পতন,
যদি কোনোদিন এই রুপালি তরল চিরে যদি—
বের হয় আসল মানুষ, ছিন্ন হয় তার নিউরন,
তখন দেখবে শূন্যতা কতখানি শব্দহীন বীণ।
. . .
৬.
বিপরীত গোলার্ধের ছায়া যেন কাচের দেয়াল শোষকের মতো শুষে নেয়, কিছু ভুল কিছু ভ্রান্তি
সকালের কড়া রোদ, বিকেলের বিষণ্ণতা ক্লান্তি
ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে যেন তার মায়াবী সে জাল কোনো শান্তি নেই যেন কেবলই কৃত্রিম ইশারা প্রতীকী খেলায় অনেকেই যেন অন্ধ ক্রীড়নক,
আয়না সমান্তরাল মহাবিশ্বে রয়েছে সে ধারা
সে চেনে দেহের দাগ, দেখে নেয় পুরনো চাবুক,
সেখানে গলিত রূপ, প্রতিবিম্বে রূপের পাহাড়
ডানাহীন পাখি ওড়ে, স্তব্ধ সময়-ক্ষত অক্ষত।
ডিজিটাল এই যুগে রূপান্তর ঘটে অবিরত,
আয়নার ভেতরেই করে আয়নাও হাহাকার।
যেদিন ভাঙবে কাচ, মুছে যাবে সব ব্যবধান — সেদিন কি ফিরে পাবে এই জড় প্রতিবিম্ব প্রাণ?
. . .
৭.
শূন্যতার বিনির্মাণ আয়না হাসে না, রাখে ক্ষয়,
আধুনিক জাদুঘরে, যেন সেই নিঃশব্দ গ্যালারি
মানুষের মুখোশের সাথে যেন চলে আড়াআড়ি—
যেখানে সত্যও যেন বিভ্রমের নিত্য বিনিময়
পরাবাস্তব সে রাতে জোনাকিও আলো জ্বেলে দেখে,
কাচের ওপিঠে কোনো মানুষই নেই, যেন শুধু ছায়া।
নেচে চলে একা একা, ছিঁড়ে পৃথিবীর মায়া,
ইতিহাসের সব পৃষ্ঠা শূন্যতার কালিতেই ঢেকে।
আমরা কি তবে শুধু কেবল কাচের পাশে ভ্রম? নাকি এই আয়নাটা পৃথিবীর গোপন কঙ্কাল? যেখানে থমকে আছে মহাকালে আদিম বিক্রম,
যেখানে অতীত আর ভবিষ্যৎ বুনে মায়াজাল। আয়নার আশ্চর্য জীবন যেন অনন্তের ধাঁধা ভেতরে আমরা সত্যি মুণ্ডুহীন নিয়তিতে বাঁধা।
. . .
৮.
আয়নার বুকে জাগে দেহের গোপন ভাষা,
চামড়ার নিচে নদী, রক্তে নক্ষত্রের ঢেউ;
স্পর্শের অরণ্যে জ্বলে যত আদিম প্রত্যাশা,
চোখের ভেতর ডাকে চেনা ও অচেনা কেউ।
ঠোঁটের কিনারে যেন সেই সন্ধ্যার লালিমা,
শ্বাসে শ্বাসে জন্ম নেয় বৃষ্টিভেজা কিছু গান;
দেহ যেন জ্যোৎস্নাক্ষেত্র, প্রেম তারই মহিমা,
মাংসের গভীর তলে জেগে ওঠে তপ্ত প্রাণ।
আয়নায় ভাসে শুধু দৃশ্যমান অবয়ব,
তবু সে রুপালি চোখ জানে ক্ষয় ও অক্ষয়
প্রেম লিখে যায় যেন শরীরের অভিপ্রায়,
সময় মুছে ফেলেও রাখে না সে ছন্দ-লয়।
আয়নার আশ্চর্য জীবন — এই তার কাজ,
দেহে খুঁজে আত্মা আলো, প্রেমেরই আওয়াজ
. . .
লেখক পরিচয় মেকদাদ মেঘ : এখানে অথবা ওপরে ছবিতে চাপুন
. . .

অবদায়ক : মেকদাদ মেঘ : থার্ড লেন স্পেস.কম



