পোস্ট শোকেস - সাহিত্যবাসর

সংবাদ সরাসরি : নাহার মনিকা

Reading time 5 minute
5
(13)
Conceptual Artwork-I, in colloboration with Gemini; @thirdlanespace.com

ইনবক্সে প্রতিদিনই কিছু না কিছু পাঠায় বীথি। সামিউল কোনোটাতে ক্লিক করে, কোনোটা দেখতে ভুলে গেলে বাসায় ফিরে চা খেতে খেতে হাসির কিছু হলে হাসিমুখের, দুঃখের কিছু হলে মন খারাপ করা ইমোজি পাঠায়। এ নিয়ে টুকটাক আলাপও চলে। স্বামী টেলিভিশন দেখে না বলে বীথির আফসোস আছে। তাই দু–চার মিনিটের এসব ছবি, রিলস নিয়ে কথা হলে বউয়ের তৃপ্ত মুখ দেখতে ভালোই লাগে সামিউলের।

আজকেরটা প্রথম কয়েক সেকেন্ড বুঝতে পারেনি কীসের ভিডিও। অফিসে কাজের চাপ প্রচণ্ড। আগামীকালের মধ্যে এইচআরের ফাইনাল রিপোর্ট রেডি করতে হবে। কানাডাতে ইমিগ্রেশন নিয়ে আসার সাড়ে চার বছর হলো। এতদিন চেষ্টার পর এই প্রথম পছন্দের চাকরি সামিউলের। নিজের চেয়ে কমবয়সী বসের চোখে যেন কোনো অসংগতি ধরা না পড়ে, সেজন্য সতর্ক থাকে।

দুপুরে খাবার সময় নার্ভ শিথিল করতে কিছুটা অন্যমনস্ক হয়ে ইউটিউব লিংকটা আবার ক্লিক করে সামিউল বুঝল, এটা একটা টেলিভিশন সংবাদের অংশ। কুয়াশার ভেতর মধ্যম গতিতে ক্যামেরা ঘুরে ঘুরে দোকানপাট দেখাচ্ছে। মানুষের চলাচল, পেছনে সাংবাদিকের ধারাভাষ্য।

এমন শীতকাল ভালো করে চেনে সামিউল। কুয়াশায় কয়েক হাত সামনেও ভালো দেখা না যাওয়ার ক্ষণস্থায়ী রহস্যময়তায় ক্যামেরাটা যেন পথ দেখানো টর্চলাইট, ফোকাস ঠিক রেখেও আলো দোল খায়, ওঠে-নামে। হঠাৎ বুকের ভেতরটা ছ্যাৎ করে ওঠে সামিউলের।

দেশজুড়ে দেখতে ম্রিয়মাণ এমন এলাকার অভাব নেই। কিন্তু এই ধোঁয়াটে গলির শুরুতে দোতলা বাড়ি, বাইরে থেকে ওপরে যাওয়ার সিঁড়ি—এসব দেখেই সে চিনল। তাদের পাড়ায় ঢোকার মুখের বড়ো রাস্তায় টিভি ক্যামেরা ঘুরে বেড়াচ্ছে! কী আশ্চর্য!

তামাটে ত্বক, চোখ কোটরে যাওয়া দুজন বয়সী লোক, গায়ে চাদর, মাথায় উলের টুপি। তারা পৌর বাজারের জমি অবৈধ জবরদখলকারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাচ্ছে। কথার সময় একজন বাঁ হাত মুখের কাছে তুলে আনছে, যেন মুখ থেকে বেরোনো ভাপে হাত সেঁকে নিতে চায়। এরা কারা? সামিউল কি এদের সঙ্গে কখনো স্কুলে গেছে!

ক্যামেরা প্যান-শটে ঘুরে একটা বাড়ির দিকে গেল, বাইরে থেকে দোতলায় ওঠার সিঁড়ি। সুপারিগাছের মাথা ছাদের দিকে নুয়ে আছে। এ-বাড়ি কারা অবৈধ দখল করে রেখেছে ইত্যাদি নিষ্ঠ তথ্য থেকে কয়েক সেকেন্ডের জন্য সামিউলের চোখ তীক্ষ্ণ হয়ে তার মনোযোগ কোথায়-যে উড়িয়ে নিয়ে গেল!

এবার সরকারি প্রশাসনের লোকজন ক্যামেরার সামনে কথা বলছেন। জিন্স, টি-শার্ট পরা চশমা চোখে যুবকটি এ-শহরের মেয়র। শান্তভাবে বলছে, ‘আমরা অবৈধ দখলদারকে প্রথমে নোটিশ দেব, তা মানা না হলে উচ্ছেদ প্রক্রিয়া চলবে।’ কাঠের কারুকাজে লাল মখমলের গদি আঁটা তার চেয়ারে সিংহাসনের আদল।

ক্যামেরা আবার মুখ ঘুরিয়ে বড়ো রাস্তায় লং শট নিচ্ছে। ঝুপ করে শুরু হয়ে যাওয়া দুপাশের দোকানপাটের মধ্য দিয়ে থান শাড়ির মতো লম্বা রাস্তা, গরমকালে সেখানে খইয়ের মতো ছিটকে ছিটকে ধুলা উড়ত। এ-রাস্তা দিয়ে স্কুলে গেছে সামিউল। ক্লাস এইট, আকাশনীল শার্ট।

স্কুলের পথে রন্টুদের দোতলার নিচতলায় হার্ডওয়্যারের দোকানের সামনে এসে সামিউল দেখত বুকের কাছে বই চেপে ধরে সকালের রোদের মতো তেরছা হয়ে তাদের সেকেন্ড বয় মুকুল দাঁড়িয়ে আছে। ফার্স্ট বয় রন্টু তখনো নেমে আসেনি। দোকান ছেড়ে বেরিয়ে এসে সুরেন কাকা চিৎকার করত, ‘মুকুল আর সামিউল আইসা পড়ছে রন্টু…!’ নিরাভরণ সকালে সুরেন কাকার আওয়াজ প্রথমে একটু থমকে যেত, তারপর সুড়ুৎ করে উপরে উঠে যেত।

সামিউল আর মুকুল অপেক্ষা করতে করতে হাসত, জানত-যে, এখন কাকিমা লাল ঠান্ডা মেঝের ওপর দাঁড়িয়ে রন্টুর থুতনি ধরে চুল আঁচড়ে দিচ্ছে, আর সে মোচড় দিয়ে ছুট দিতে চাইছে। একটু পরেই উপর থেকে তরতর করে নেমে আসবে রন্টু। তারপর তিনজন একসঙ্গে পাড়ার গলিটাকে পেছনে রেখে বড়ো রাস্তা ধরে স্কুলের দিকে হাঁটবে।

তাদের গলিটায় সকাল অনেকক্ষণ থমকে থাকে। রেডিওতে বিবিসির বিশ্ব সংবাদ হয়, ফুটন্ত পানিতে চায়ের পাতা গলে ফিকে লাল রং চারপাশ গাঢ় করে দেয়। কোনো বাড়িতে গরুর ভারী বিনীত ওলানের কাছে বালতিভর্তি ফেনিল ঘন দুধ অ্যালুমিনিয়ামের ঢাকনাযুক্ত পাত্রে। সে দুধের ক্রেতা থাকে পাড়ারই কেউ কেউ। সামিউল, রন্টুরাও।

Memory: Macgyver TV Series; Image Source & Credit: Collected; Google Image

রন্টুদের দোতলার জানালায় সাদা পর্দা ওড়ে। ঘরের কোণায় কাঠের টিভি স্ট্যান্ডেও ধবধবে ঢাকনা পরানো। সন্ধেবেলা সেটি সরিয়ে টেলিভিশন চালু হয়। সামিউল-মুকুলরা লাল মেঝেতে বসে ম্যাকগাইভার দেখে। ম্যাকগাইভারের সুপারসনিক গাড়িটা ওই লাল সিল্কের মতো মেঝেতেই চলে বেড়ায় যেন!

পাড়ার পেছন দিকে ফিতের মতো একচিলতে নদী ভরা বর্ষায় পানি উপচে পাড়ার একদম কাছে চলে আসে। ছেলেমেয়েরা নতুন স্রোতে ঝাঁপ দিয়ে খলবলানো মাছের মতো সাঁতার কাটে। নদীর ওপরে বাঁশের সাঁকো তখন ডুবতে ডুবতে জেগে থাকে। নদী কি এখনো ভরা বর্ষায় সবাইকে ভাসিয়ে নেয়? কী দশা ওই খেকো নদীটার!

ক্যামেরাটা আবার অ্যাঙ্গেলে এসে ঘুরে গেল, গলিতে ঢুকছে না। সামিউল অহেতুক ফোনের স্ক্রিন ঘোরায়, যেন গুগল ম্যাপ,—ক্লিক করে, ডানে–বাঁয়ে আরো চেপে ধরলে অনেকটা দেখে ফেলা যাবে।

নদীটা দেখতে পাওয়া দরকার।

এক শ্রাবণ মাসে এই নদীতে সে ডুবে গিয়েছিল। খাবি খেতে খেতে তলদেশের দুধসাদা বালু আঁচড়ে দিয়েছিল। আঁতকা খরখরে এক স্রোতের ধাক্কায় কী করে নদীর গভীরে চলে গেল, সামিউল জানে না।

বর্ষাকালে মেঘ সরে গিয়ে রোদ উঠলে সে রোদের তীব্রতা কি বেশি হয়? কাদা গোলা সাদাটে পানির ভেতরেও নদীর তলদেশ পরিষ্কার। সামিউল টের পাচ্ছে তার নিজের চোখ মৃত মাছের মতো ভাবলেশহীন হয়ে উঠছে। কিন্তু মাথা গোঁয়ার বাইসনের মতো কেবল নিচের দিকে ঠুসছে।

সে ডুবে যাচ্ছিল। ডুবে তো যেতই, যদি না কেউ একজন হ্যাঁচকা টান দিয়ে তাকে নিজের দিকে ফিরিয়ে নিয়ে উপরে স্রোতের দিকে ধাক্কা দিত। পলকের কম সময়ের জন্য সামিউল দেখল,— রন্টু;—দেখল, সে তার পা ধরে টানছে। সামিউল ভাবল, ধাক্কা দেওয়ার খেলা খেলছে। রন্টুর মাথায় পা দিয়ে সজোরে নিজেকে ঠেলে ভুস করে ওপরে উঠে এলো সে। বুক ভরে শ্বাস নিয়ে সব শক্তি দিয়ে নিজেকে আরও জোরে ঠেলে দিলো নদীর ঘাটের দিকে। দুপায়ের তোড়ে দিগ্বিদিকে ঢেউ ছড়িয়ে গেলে দেখল, বাঁশের সাঁকোটা বেশি দূরে না। সেখানে থেকে মুকুল ঝাঁপ দিয়ে ডিগবাজি খাচ্ছে। রন্টুকেও কি দেখল একঝলক? তার তলিয়ে যাওয়া কোথাও কোনো চিড় ধরায়নি।

নদীর উপর তিরতির করা রাগী রোদ পোষ মানিয়ে আকাশ কালো হচ্ছে। ছেলেদের কেউ কি এক কায়দায় লুঙ্গির ভেতর বাতাস ভরে পানিতে ভাসছে। একদল লোক কলার ভেলা ভাসিয়ে ঝাঁকি জাল দিয়ে মাছ ধরছে। খুব শোরগোল তুলে জাল ফেলছে। ডুবে যাওয়ার ভয়ে সাদা হয়ে যাওয়া সামিউলের চোখমুখ কেউ দেখল না। হঠাৎ ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামল। পিছল রাস্তায় পা টিপেটিপে বাড়ি ফিরে এলো সামিউল।

Conceptual Artwork-II, in colloboration with Gemini; @thirdlanespace.com

সেদিন সে কি বই নিয়ে পড়তে বসেছিল? রন্টুদের বাসায় টিভি দেখতে যাওয়ার কথা ভেবেছিল কি!

সন্ধের দিকে পাড়ার গলিতে সমবেত গুঞ্জন শোনা গেল, আওয়াজটা বিনবিন করে শুরু হয়ে বেড়ে চলছে। রন্টু সারা দিন বাড়ি ফেরেনি। সুরেন কাকারা সারা তল্লাট খুঁজে বেড়িয়েছে,— পায়নি। একটু আগে খোঁজ মিলেছে। নদীর ঘাট থেকে অনেক দূরে একটা বালিয়াড়ির কাছে আটকে ছিল। রন্টুর নীল হাফ প্যান্টের পকেট বোঝাই বালু। চোখ আর গায়ের চামড়া ফ্যাশা মাছের মতো।

রন্টুদের দোতলার লাল মেঝেতে কাকিমা কাঁদতে কাঁদতে মূর্ছা যায়, চোখেমুখে পানি দিয়ে জ্ঞান ফেরালে আবার বুক চাপড়ে কাঁদে। বিলাপ করে আবারও অজ্ঞান হয়ে পড়ে। পাড়ার লোকের ভিড়ের সঙ্গে দাঁড়িয়ে সামিউল দেখে একেকবারের আহাজারির সঙ্গে কাকিমা আকারে-আয়তনে বড়ো হয়ে যাচ্ছে। নাকের পাটা ফুলে, চোখ ঠেলে বেরিয়ে আসছে, খোলা চুল কোনো অনুপস্থিত বাতাসে বেদিশা হয়ে উড়ছে। দেখতে দেখতে বাতাস বোঝাই বিশালাকার বেলুনের মতো কাকিমার বিলাপরত শরীরটা পুরো ঘর বোঝাই হয়ে গেল। সামিউলের খুব ইচ্ছা হলো এক দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরে বলে,—রন্টু শেষবার তার সঙ্গে ডুবানি খেলা খেলেছিল। ঘরের কোণায় পানিভর্তি ড্রামের মতো কোণঠাসা থেকে মনে মনে শতবার দৌড়ে কাকিমার কাছে যায় সে।

সেদিনের পর থেকে রন্টুদের বাসায় সন্ধ্যাবেলা আর টেলিভিশন চলে না।

অবসরে হাঁটুতে চিবুক ঠেকিয়ে বারান্দার রেলিংয়ে বসে থাকে সামিউল। তার কোঁচড়ে রন্টুর কাছ থেকে ধার নেওয়া কুয়াশা সিরিজের বই।

টিভি ক্যামেরা এখন হাজির হয়ে গেছে জেলা প্রশাসকের অধিদপ্তরে। বিরাট টেবিলের ওপার থেকে ডিসি সাহেব সমর্থন দিচ্ছেন,—অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে সর্বাত্মক সহযোগিতা দেবেন। ক্লোজআপে তাঁর মুখ ধরে রাখতে ক্যামেরা সমীহ করে।

রিপোর্টিং শেষপর্যায়ে, ক্যামেরা আবার দোতলা বাড়িটাকে দেখায়।

বাড়িটা রন্টুদের।

বাইরে থেকে খাড়া সিঁড়ি বেয়ে বহুদিন সামিউল উঠে গেছে। মাসুদ রানা আর কুয়াশা সিরিজের বইগুলো রন্টু ওদের চিলেকোঠায় লুকিয়ে রাখত।

সাংবাদিক কী কী যেন বলে সংবাদ শেষ করল। ভিডিও লিংকে ক্যামেরা ক্লোজ শট দিলো। হঠাৎ সামিউলের খটকা লাগে, এটা কি সত্যি সত্যি তাদের পাড়া? রন্টুদের বাড়ি! কারা জবরদখল করেছে? সুরেন কাকারা তো সামিউল শুনেছে অনেক আগেই দেশ ছেড়ে চলে গেছে!
. . .

লেখক পরিচয় : নাহার মনিকা : ওপরের ছবি অথবা এখানে চাপুন

. . .

অবদায়ক : নাহার মনিকা : থার্ড লেন স্পেস.কম

নাহার মনিকার অন্যান রচনা পাঠের জন্য এখানে চাপুন

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 13

No votes so far! Be the first to rate this post.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *