
ভিন্ন ভিন্ন সময়ে বাংলাদেশ ও অন্যান্য দেশে রাজনৈতিক কিংবা সামাজিক বাস্তবতায় নৈরাজ্য/বিশৃঙ্খলা আমাদের চোখে প্রথমে ধরা দেয় আগুন হয়ে। নৈরাজ্য/বিশৃঙ্খলা হয় জ্বালাও-পোড়াওয়ের লেলিহান শিখায়; ভাঙচুরের দৃশ্যে, আতঙ্কের দৌড়ঝাঁপে, রক্তের গাঢ় দাগে। হ্যাঁ, এইসব দৃশ্য চোখে পড়ে, ক্যামেরায় ধরা পড়ে, সংবাদের শিরোনাম হয়ে ওঠে। কিন্তু আগুন জ্বলার আগে বাতাসে একটি অদৃশ্য জ্বর ছড়িয়ে পড়ে, যা গভীরভাবে সংক্রামক। সেটি হল ভাষা।
বস্তুত নৈরাজ্য/বিশৃঙ্খলার মতো পরিস্থিতি শুরু হয় জনতার হাতে লাঠি ওঠার আগে, শব্দে নামকরণের মুহূর্তে; ভাষা যখন আর ঘটনার নিরপেক্ষ বাহক না-থেকে হয়ে ওঠে রাষ্ট্র, রাজনীতি ও গণমাধ্যমের যৌথ নির্মাণ-যন্ত্র। কোন সহিংসতাকে কীভাবে আখ্যায়িত করা হয়, তার ওপর নির্ভর করে সমাজ সেটিকে অপরাধ হিশেবে চিহ্নিত করে, নাকি ‘পরিস্থিতির স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া’ বলে মেনে নেয়। ঠিক সেই ফাঁক দিয়েই ‘বিক্ষুব্ধ জনতা’, ‘তৌহিদি জনতা’ ‘ছাত্র-জনতা’ প্রভৃতি শব্দবন্ধ ঢুকে পড়ে, আর সংগঠিত নৈরাজ্যও অনেক ক্ষেত্রে পরতে থাকে নৈতিকতার মুখোশ।
‘জনতা’ শব্দটির ভিতরে একটি আপাত নির্দোষতা আছে। এরকম শব্দের লেবেলে মনে হয়, কিছু সাধারণ মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে, আবেগের বশে রাস্তায় নেমেছে। কিন্তু বাস্তবে আমরা বার বার দেখি হামলা বা বিশৃঙ্খলার ধরন প্রায় অভিন্ন, সময় নির্বাচন কৌশলগত, লক্ষ্যবস্তু নির্দিষ্ট, আর অংশগ্রহণকারীদের পরিচয় প্রায় একইরকম। অর্থাৎ সেখানে আবেগের বিস্ফোরণ নয়, বরং সংগঠিত তৎপরতা কাজ করে। তবু ভাষা সেই সংগঠিত চরিত্রটিকে আড়াল করে দেয়। এই আড়াল করাটাই নৈরাজ্যের প্রথম সাফল্য। কারণ, ভাষা যখন কোনও ঘটনার রাজনৈতিক ও অপরাধমূলক দিকটি মুছে দিয়ে সেটিকে সামাজিক আবেগে রূপান্তর করে, তখন দায় আর স্পষ্ট থাকে না। প্রশ্ন ওঠে না—কারা পরিকল্পনা করল, কারা লাভবান হল, কারা ব্যর্থ হলো তা ঠেকাতে। দায় ছড়িয়ে পড়ে এক বিমূর্ত ‘জনতা’র ওপর, যাকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যায় না।
এইসব ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুত সংবাদ পরিবেশন, নিরাপদ শব্দচয়ন কিংবা ক্ষমতার সঙ্গে সংঘাতে না যাওয়ার প্রবণতা—সব মিলিয়ে ভাষা হয়ে ওঠে এক ধরনের আপসের জায়গা। কিন্তু এই আপস নিরপেক্ষ থাকে না। এটি সহিংসতাকে নরম করে, অপরাধকে অস্পষ্ট করে এবং ভবিষ্যতের অরাজকতার জন্য একটি গ্রহণযোগ্য পরিবেশ তৈরি করে।
যদি সহিংসতা, নৈরাজ্য কেবলই ‘জনতার ক্ষোভ’ হয়, তবে তা দমনের প্রশ্নে রাষ্ট্র কেবল মধ্যস্থতাকারী; দায়ীপক্ষ নয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যর্থতাও তখন আর ব্যর্থতা থাকে না। তা হয়ে ওঠে ‘পরিস্থিতির জটিলতা’। এভাবে ভাষা রাষ্ট্রযন্ত্রকে প্রশ্নের বাইরে সরিয়ে দেয়, আর নাগরিককে ঠেলে দেওয়া হয় এক ধরনের নিয়তির হাতে।
নৈরাজ্য/বিশৃঙ্খলতা কি কেবল আগুনে, রক্তে ও ভাঙচুরে সীমাবদ্ধ, নাকি তার প্রথম অনুশীলন ঘটে শব্দের ভিতরে? যদি ভাষাই বাস্তবতার উপলব্ধি নির্ধারণ করে, তবে ভুল বা সুবিধাবাদী ভাষা কি নিজেই সহিংসতার সহযোদ্ধা হয়ে ওঠে না? ভাষাগত নৈরাজ্যের সবচেয়ে গভীর প্রভাব পড়ে সমাজের স্মৃতিতে। একটি সমাজ কীভাবে কোনও ঘটনাকে মনে রাখে, ভবিষ্যতে কীভাবে তা ব্যাখ্যা করে—সেই স্মৃতি নির্মাণে ভাষার ভূমিকা নির্ধারক। যখন বার বার সংগঠিত সহিংসতা ‘বিক্ষুব্ধ জনতা’, ‘তৌহিদি জনতা’ এইরকম নামে চিহ্নিত হয়, তখন ধীরে ধীরে সহিংসতা স্বাভাবিক হয়ে ওঠে, আর ন্যায়বিচার হয়ে পড়ে ব্যতিক্রমী প্রত্যাশা।
এই প্রক্রিয়ায় ইতিহাস বিকৃত হয় না সরাসরি; বরং ইতিহাসের ধারালো প্রান্তগুলো ভোঁতা করে দেওয়া হয়। আগুন জ্বললেও আগুনের উৎস অদৃশ্য হয়ে যায়। ভাঙচুর থাকে, কিন্তু ভাঙচুরের পরিকল্পনাকারীরা শনাক্তের বাইরে থেকে যায়। ভাষা সেখানে উৎস বা স্মৃতির ওপর এক ধরনের পর্দা টেনে দেয়; যেখানে ঘটনা দেখা গেলেও তার অর্থ স্পষ্ট হয় না; ফলে পরের ধাপে রাষ্ট্রীয় দায়বোধ ধীরে ধীরে ক্ষয়ের মুখে পড়ে। যদি সহিংসতা, নৈরাজ্য কেবলই ‘জনতার ক্ষোভ’ হয়, তবে তা দমনের প্রশ্নে রাষ্ট্র কেবল মধ্যস্থতাকারী; দায়ীপক্ষ নয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যর্থতাও তখন আর ব্যর্থতা থাকে না। তা হয়ে ওঠে ‘পরিস্থিতির জটিলতা’। এভাবে ভাষা রাষ্ট্রযন্ত্রকে প্রশ্নের বাইরে সরিয়ে দেয়, আর নাগরিককে ঠেলে দেওয়া হয় এক ধরনের নিয়তির হাতে।

এই ভাষাগত কাঠামো নাগরিক প্রতিরোধকেও দুর্বল করে। প্রতিরোধের জন্য তো প্রথম প্রয়োজন সঠিক নামকরণ। আসলে যে-সহিংসতাকে ‘বিক্ষোভ’ বলা হয়, তার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো কঠিন; যে-আক্রমণকে ‘ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ’ বলা হয়, তাকে অপরাধ হিশেবে চিহ্নিত করাই যেন অমানবিক মনে হয়। ফলে নাগরিক প্রতিবাদ বিভ্রান্ত হয়। কাকে প্রতিহত করা হবে, কীসের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে, সেই প্রশ্নেই বিষয়টি থমকে যায়।
এখানে ভাষার রাজনৈতিক ব্যবহার তার প্রকৃত উদ্দেশ্য প্রকাশ করে। ভাষা কেবল বর্তমানকে ব্যাখ্যা করে না, ভবিষ্যতের পথও প্রস্তুত করে। আজ যে-সহিংসতা ভাষার আড়ালে বৈধতা পায়, আগামীকাল সেটি আরও সংগঠিত ও আরও নির্ভীক হয়ে ফিরে আসে। কারণ সে জানে, ভাষা তার পক্ষে থাকবে।
অথচ, ভাষা চাইলে উলটো ভূমিকাও নিতে পারত। সঠিক শব্দচয়ন, দায় নির্ধারণ, অপরাধের উৎস/নাম স্পষ্ট করে বলা—এই কাজগুলোই নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধ। সেই প্রতিরোধ তখনই সম্ভব, যখন ভাষা ক্ষমতার সুবিধাভোগী না-হয়ে সত্যের অনুগত হবে। ভাষা কখনও নিজে থেকে সহিংস হয় না; মানুষই ভাষাকে ব্যবহার করে সহিংসতাকে আড়াল করতে, বৈধতা দিতে বা স্বাভাবিক করে তুলতে। সুতরাং ভাষাকে পুনরুদ্ধার করা মানে কেবল শব্দ বদলানো নয়, দায়বদ্ধতার সংস্কৃতিও ফিরিয়ে আনা।
এই জায়গায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বটি পড়ে গণমাধ্যমের ওপর। সংবাদমাধ্যম যদি সহিংসতাকে তার প্রকৃত নামে আখ্যায়িত করতে না পারে, তবে সে নিজেই অঘোষিত অংশীদার হয়ে ওঠে। ‘বিক্ষুব্ধ জনতা’ বলার বদলে যখন বলা হয়—সংগঠিত হামলা, পরিকল্পিত ভাঙচুর, মতাদর্শিক সহিংসতা, তখন বাস্তবতা স্পষ্ট হয়। ভাষার এই স্পষ্টতা ক্ষমতার জন্য অস্বস্তিকর হতে পারে, কিন্তু সমাজের জন্য তা অপরিহার্য। অবশ্য গণমাধ্যম একা এই দায়িত্ব নিতে পারে না। নাগরিক ভাষাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, ব্যক্তিগত কথোপকথনে, লেখালেখিতে আমরা নিজেরাই অনেক সময় অসচেতনভাবে তেমন ভাষাই ব্যবহার করি, যা সহিংসতাকে নরম করে দেয়। ‘এমন তো হতেই পারে’, ‘মানুষ/জনতা রেগে গিয়েছিল’—এই ধরনের বাক্য সহিংসতার সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করে। ভাষার এই আপসই নৈরাজ্যের দীর্ঘস্থায়িত্ব নিশ্চিত করে।
রাষ্ট্রীয় ভাষার ভূমিকা এখানে আরও গভীর। যখন সরকারি বিবৃতি অস্পষ্ট হয়, যখন দায় নির্ধারণ এড়িয়ে যাওয়া হয়, তখন সেটি কেবল প্রশাসনিক দুর্বলতা নয়, তা একটি রাজনৈতিক বার্তা। সেই বার্তা হল এরকম : কিছু সহিংসতা সহনীয়, কিছু অপরাধ আলোচনার বাইরে। এইরকম ভাষা-ব্যবহার নিশ্চয় নাগরিককে ন্যায়বিচার থেকে দূরে সরিয়ে দেয় এবং অপরাধীকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে।

ভাষার বিরুদ্ধে ভাষাই শেষপর্যন্ত সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ। সত্যনিষ্ঠ, নির্ভীক এবং দায়িত্বশীল শব্দচয়ন নৈরাজ্যের প্রথম বাধা। কারণ যে-সমাজ সহিংসতার সঠিক নাম দিতে শেখে, সে সমাজ আর সহজে তাকে মেনে নেয় না। ভাষা তখন আর ঢাল না-থেকে হয়ে ওঠে আয়না।
ভাষাগত নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ কখন স্থায়ী রূপ পায়? যখন তা ব্যক্তিগত সচেতনতা ছাড়িয়ে সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতিতে রূপ নেয়। নৈরাজ্য-অবস্থা কি একদিনে তৈরি হয়? না। ভাষার বিকৃত ব্যবহারের অভ্যাসও হঠাৎ জন্মায় না। বছরের পর বছর ধরে ক্ষমতা, ভয়ের রাজনীতি ও সুবিধাবাদী নীরবতা মিলেই ভাষাকে ধীরে ধীরে নৈরাজ্যের সহযোদ্ধা বানিয়ে তোলে।
ভাষাকে ন্যায়বোধের হাতিয়ার করতে হলে দায় নির্ধারণকে এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। কারা সহিংসতা ঘটাল, কী উদ্দেশ্যে ঘটাল, এবং রাষ্ট্র কেন তা ঠেকাতে ব্যর্থ হল—এইসব প্রশ্নকে ভাষার কেন্দ্রে আনতেই হবে। অস্পষ্টতা এখানে নিরপেক্ষতা নয়; বরং পক্ষ নেওয়ারই আরেক রূপ। এই সত্য মেনে নেওয়াই ভাষাগত প্রতিরোধের অন্যতম শর্ত। এক্ষেত্রে বুদ্ধিজীবী, লেখক ও সংস্কৃতি-কর্মীদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের ভাষা-ব্যবহার ব্যক্তিক ও সামাজিক মূল্যবোধের মানচিত্র আঁকে। যদি তাঁরাও নৈতিকতাকে অবজ্ঞা করে ক্ষমতার সুবিধাজনক শব্দচয়ন গ্রহণ করেন, তবে নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে বৌদ্ধিক প্রতিরোধ কঠিন হয়ে পড়ে।
ভাষা নিজেই আমাদের সামনে যে-আয়না ধরে, আমরা যদি সেই আয়নায় দেখি অস্পষ্টতা, ভয় ও আপস, তবে তো বুঝতে হবে নৈরাজ্য ইতোমধ্যেই আমাদের আশেপাশে, আমাদের মেরুদণ্ডে জড়িয়ে বসেছে। শব্দগুলো তখন কেবল শব্দ নয়, তারা হয়ে যায় ঢাল, মুখোশ, আড়াল, যা সহিংসতাকে নরম করে, অপরাধকে অনুমোদিত মনে করায়। যদি সেই আয়নায় দেখি স্পষ্টতা, দায়বোধ ও নৈতিক দৃঢ়তা, তখন শব্দগুলো আবার শক্তি পায়, তারা হয়ে ওঠে হাতিয়ার, প্রহরী—যা নৈরাজ্যের আগুনকে ঠেকাতে পারে। ভাষা তখন আর ঢাল নয়; তা হয়ে ওঠে প্রতিরোধের প্রথম রেখা, ন্যায়ের প্রথম স্তম্ভ। শব্দ/ভাষা আমাদেরকে প্রশ্ন করতে শেখায়, সাহসী হতে শেখায়। আমরা বুঝি যে, নৈরাজ্য চোখে দেখা যায়, তার মূল জন্ম ঘটে শব্দে, ধারণায়, এবং সঠিক নামে চিহ্নিত না-হওয়ায়। ভাষা যদি ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াতে পারে, সততার পক্ষে শক্তি জোগাতে পারে, তবে নৈরাজ্যের অদৃশ্য বীজেও ক্ষয় ধরে নিশ্চয়।
. . .

সংযুক্তি : পাঠমন্তব্য ও আলাপ
[থার্ড লেন হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ থেকে সংকলিত]

বাবুল ভাই, আপনার লেখাটি গভীর মুগ্ধতা নিয়ে পড়লাম। কী অসাধারণ দক্ষতায় আপনি সময়কে আমাদের সামনে উপস্থিত করলেন! একইসঙ্গে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন কোথায়, কীভাবে এবং ঠিক কোন জায়গাগুলোতে আমাদের ভয়াবহ ভুলগুলো জমে উঠেছে। এই হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ গঠনের শুরু থেকে মিনহাজ ভাই তাঁর একের-পর-এক লেখায়, আপনি নিজে ও গ্রুপের আরও অনেকে যে-অশুভ ভবিষ্যতের কথা বলে আসছিলেন,—আজ সেটি যেন পূর্ণাঙ্গ রূপ নিয়ে আমাদের সামনে হাজির হয়েছে।
আমরা এখন প্রত্যক্ষ করছি সেই অশুভ শক্তি কীভাবে রাষ্ট্রক্ষমতাকে নির্মমভাবে ব্যবহার করে একের-পর-এক ঘটনা ঘটিয়ে যাচ্ছে, নতুন-নতুন ন্যারেটিভ নির্মাণ করছে এবং পরিকল্পিতভাবে নৈরাজ্যকে বৈধতা দিয়ে চলেছে। সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো,—লেখক ও বুদ্ধিজীবীদের একটি বড় অংশ শেষ পর্যন্ত এই নৈরাজ্যের মদদদাতা হিসেবেই রয়ে গেলেন। মূলধারার গণমাধ্যমও নিপুণভাবে এই সহিংস বাস্তবতাকে স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে;—এই সত্য আমরা অস্বীকার করি কীভাবে?
প্রথম আলো বা ডেইলি স্টার আক্রান্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত এই নৈরাজ্যের পৃষ্ঠপোষকতায় তাদের ভূমিকা ছিল;—একথা বলা কি ভুল হবে? এমন কোনো স্পষ্ট অবস্থান কি তারা নিয়েছিল, যেখানে নৈরাজ্যকে নৈরাজ্য হিসেবে চিহ্নিত করা যায়? একজন আপাদমস্তক জঙ্গি মানসিকতার হাদীকে জাতীয় বীর হিসেবে নির্মাণ করার পেছনে জামায়াত অথবা উন্মত্ত মৌলবাদী গোষ্ঠীর বাইরে কি এই তথাকথিত গণমাধ্যমগুলোর কোনো দায় নেই? তথাকথিত বুদ্ধিজীবী কিংবা কবি–লেখকদের মধ্য থেকে আমরা কি একজনকেও পেয়েছি, যিনি নির্ভয়ে বলতে পেরেছেন যে, এই ধর্মান্ধ শক্তিগুলো দেশকে ধীরে ধীরে অরাজকতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে? যতক্ষণ-না কেউ ব্যক্তিগতভাবে আক্রান্ত বা বিপন্ন হয়েছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত নীরবতাকে তারা বহন করে গেছেন।
আপনার ‘ভাষা যখন নৈরাজ্যের অস্ত্র’ লেখাটি পড়তে পড়তে আমার বারবার মনে হয়েছে : আপনি আসলে নৈরাজ্য নিয়ে লিখছেন না; আপনি লিখছেন আমাদের ব্যর্থ ভাষা নিয়ে, আমাদের নীরবতা নিয়ে, আর সেই নীরবতার ভেতর কীভাবে রক্তপিপাসু বাস্তবতা ধীরে-ধীরে স্বাভাবিক হয়ে ওঠে,—তা নিয়েই। আপনি অসাধারণভাবে তুলে ধরেছেন, আগুন জ্বলার আগেই সমাজে এক ধরনের অদৃশ্য জ্বর ছড়িয়ে পড়ে, আর সেই জ্বরের নাম ভাষা। আপনি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন, সহিংসতা শুরু হয় লাঠিতে নয়; শুরু হয় ভাষার আবরণে ও নামকরণে। যতক্ষণ-না এই ভাষাগত স্তরে আঘাত করা হয়, ততক্ষণ বিভ্রান্তি কাটে না।

আপনি যথার্থভাবেই উল্লেখ করেছেন : ‘বিক্ষুব্ধ জনতা’, ‘তৌহিদি জনতা’, ‘ছাত্র-জনতা’—এই শব্দগুলো সহিংসতাকে নির্দোষ বানিয়ে ফেলার এক সুপরিকল্পিত কৌশল, যা এখন পর্যন্ত প্রায় কোনো প্রতিরোধ ছাড়া সফলভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে। ‘জনতা’ শব্দের আড়ালে আমরা দায় লুকাই,, অপরাধকে ছড়িয়ে দিই এক বিমূর্ত ভিড়ের মধ্যে,—যাকে শনাক্ত করা যায় না, বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যায় না, প্রশ্ন তোলা যায় না। ফলে রক্তপাত ঘটে, কিন্তু রক্তের উৎস অদৃশ্য থেকে যায়।
আমার কাছে এই লেখার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আপনি পুরো রাষ্ট্রকাঠামোকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন, এবং তা করেছেন ভাষার মধ্য দিয়েই। আপনি দেখান, রাষ্ট্র যখন অস্পষ্ট ভাষায় কথা বলে, যখন দায় এড়িয়ে যায়, তখন সেটি নিছক প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়; বরং একটি সচেতন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। অর্থাৎ রাষ্ট্র নিজেই এখানে এই নৈরাজ্যকে ভাষা দিচ্ছে;—নিজস্ব স্বার্থসিদ্ধির কারণে। সে হয় একটি উদ্দেশ্যমুখী সহিংসতাকে লালন করছে, নয়তো তাকে বাড়ার সুযোগ করে দিচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে সংগঠিত সব অপরাধের দায় শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের কাঁধেই এসে পড়ে।
আপনি গভীরভাবে তুলে এনেছেন গণমাধ্যম ও নাগরিক,—এই দুই পক্ষকেই;; এবং পরিস্থিতির দায় থেকে কাউকেই অব্যাহতি দেননি। ‘সংবাদমাধ্যমের তথাকথিত ‘নিরাপদ শব্দচয়ন’ আর আমাদের দৈনন্দিন কথাবার্তার আপস,—এই দুই মিলেই সহিংসতাকে সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য করে তোলে। ’ এমন তো হতেই পারে, ‘মানুষ রেগে গিয়েছিল’—এই ধরনের বাক্য-যে কীভাবে ন্যায়বোধকে ক্ষয় করে দেয়, সেটি আপনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ধরেছেন।
পুরো লেখাটি দার্শনিক দিক থেকে সত্যিকার অর্থেই প্রশংসনীয়, কারণ এটি আমাদের দেখায়,—নৈরাজ্য চোখে দেখা যায় ঠিকই, কিন্তু তার শিকড় গড়ে ওঠে শব্দে, নীরবতায় এবং ভুল নামকরণে। জুডিথ বাটলার প্রশ্ন তুলেছিলেন—Which lives are grievable? রাষ্ট্র ও সমাজই ঠিক করে দেয় কার রক্ত গুরুত্বপূর্ণ, আর কার রক্ত ‘পরিস্থিতির অংশ।’ সহিংসতা ঘটলেও ভুক্তভোগীরা থেকে যায় প্রায় অদৃশ্য। ভাষা সেখানে অপরাধীর নয়, বরং ঘটনাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। বাটলারের মতে, এই ভাষাগত কাঠামোই সহিংসতাকে দীর্ঘস্থায়ী করে, কারণ যাদের ওপর সহিংসতা ঘটে, তাদের জীবন সামাজিকভাবে ‘সম্পূর্ণ মানবিক’ হিসেবে স্বীকৃত হয় না। তাই হাজারো রকমের জঙ্গিপনা সত্ত্বেও হাদীরা পেয়ে যায় রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও জাতীয় বীরের সম্মান, আর দীপু চন্দ্র দাসকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয় কেবল সংখ্যালঘু, হিন্দু হওয়ার কারণে।
. . .

সমাজ ও রাষ্ট্রের ইতিহাসে শব্দ কখনো সত্যের বাহক, কখনো ক্ষমতার অস্ত্র। শব্দের মারপ্যাঁচের রাজনীতি বলতে বোঝায় এমন এক কৌশল, যেখানে ভাষাকে ব্যবহার করা হয় বাস্তবতা আড়াল করতে, বিভ্রান্তি ছড়াতে ও জনমত নিয়ন্ত্রণ করতে। এখানে বক্তব্যের চেয়ে বাকচাতুর্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সত্যকে খণ্ডিত করে, আবেগকে উসকে দিয়ে, কিংবা ভয়ের ভাষা তৈরি করে মানুষকে প্রভাবিত করা হয়। এর ফলে শব্দ আর যোগাযোগের মাধ্যম থাকে না; তা হয়ে ওঠে প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার।
এই পরিস্থিতিতে অশুভ শক্তির উপদ্রব আরও প্রবল হয়। অশুভ শক্তি মানে কেবল দৃশ্যমান সহিংসতা নয়, বরং মিথ্যা, বিদ্বেষ, গুজব ও অসহিষ্ণুতার বিস্তার। শব্দের অপব্যবহার এই অশুভ শক্তিকে শক্তিশালী করে তোলে। ভুল তথ্য ও উগ্র ভাষা সমাজে অবিশ্বাসের দেয়াল তোলে, ভাঙে সহমর্মিতা, দুর্বল করে নৈতিকতা। মানুষ যুক্তির বদলে স্লোগানে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে।
. . .

বাবুল ভাই এমন একটি দিক তুলে এনেছেন তার লেখায়, যেটি নিয়ে গভীরে গিয়ে আলাপ আমার তেমন একটা চোখে পড়েনি। গ্রুপে আমরা গণমাধ্যম কীভাবে ভাষাকে ম্যানিপুলেট করে মিথ্যা তৈরি করে ইত্যাদি নিয়ে আলাপ করেছি, বিশেষ করে চব্বিশের পটপরিবর্তনের পরে, কিন্তু বাবুল ভাইয়ের এইটা আরো গভীরে গিয়ে ভাবার বিষয়।
একটি দায়িত্বশীল গণমাধ্যম আর নিজের ভাবনায় স্বচ্ছ ও কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন শিক্ষিতসমাজ ভাষাকে যেভাবে ব্যবহার করতে পারতেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা এর থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণে ভাষা হয়ে দাঁড়িয়েছে বিরতিহীন মিথ্যাচার ও প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর অস্ত্র।
আমাদের এখানে ভাষা এখন একে-47-এর চেয়েও মারাত্মক। যার আশু ভয়াবহ পরিণাম অনেকে এখনো বুঝতে পারছি না। যাইহোক, বাবুল ভাইয়ের লেখাসহ এই সংক্ষিপ্ত পাঠ-প্রতিক্রিয়া ভাবছি সাইটে তুলে রাখব। বিশেষ করে বাবুল ভাইয়ের তোলা প্রসঙ্গ নিয়ে আলাপ আরো বিস্তারিত হওয়া প্রয়োজন।
. . .
. . .




