আসুন ভাবি - পোস্ট শোকেস

সময়ের সুগন্ধ : মোস্তাফিজুর রহমান জাভেদ

Reading time 14 minute
0
(0)
Byung-chul Han; Image Source: Collected; Google Image

আমাদের সময়ের অগ্রগণ্য ভাবুক বিয়ং-চুল হান’কে নিয়ে থার্ড লেন স্পেস-এ আগে লিখেছি । ‘দগ্ধসমাজে বিয়ং-চুল হান’ শিরোনামে চার পর্বে প্রকাশিত রচনায় তাঁর ভাবুকসত্তার মধ্যবর্তী যাত্রাপথ অনুসরণ ও বুঝে ওঠার চেষ্টা ছিল যথাসাধ্য। আগ্রহী পাঠক পর্বগুলোয় চোখ বোলালে যাত্রার তাৎপর্য ও গভীরতা আশা করি ধরতে পারবেন।

মধ্যবর্তী এই যাত্রাপথ বিয়ং-চুল হানকে বিশ্বে পরিচিতি ও মান্যতা এনে দিলেও স্মরণ রাখা প্রয়োজন,—সময়ের গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যতিক্রম ভাবুক রূপে তাঁর পথচলা এখনো অব্যাহত। সেইসঙ্গে মনে রাখা ভালো,—দেশ-কাল ও পরিপার্শ্বকে অনুধ্যানের ঘটনায় বিয়ং-চুল হান বিশেষ কোনো দার্শনিক তত্ত্ব বা প্রস্তাবনার প্রবর্তক নন। মানব-সমাজে দেখা দেওয়া যুগলক্ষণগুলো তিনি ব্যাখ্যা করছেন কেবল। মানব-সমাজের ক্রমাগতভাবে বাহারি সব কেন্দ্রে স্বেচ্ছায় আটকে পড়ার কার্যকারণ ও পরিণামটি তুলে ধরছেন সযত্নে, যেখানে সক্রিয় থাকছে এই বার্তাটি-যে,—আমরা যদি সজাগ-সচতেন না হই এখনো, তাহলে ধ্বংস ঠেকানোর উপায় হাতে অবশিষ্ট থাকবে না কিছু।

বিয়ং-চুল হানের দার্শনিকতা সুতরাং প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের হাজার বছর ধরে চর্চিত ভাবুকতার সংশ্লেষ হওয়া সত্ত্বেও কোনো একটি পরিধিতে স্থির নয় এখনো। দার্শনিক অনুধ্যান ও প্রস্তাবনার কেন্দ্র গড়ে নেওয়া ও সেখানে অনড় হওয়ার পরিবর্তে তিনি বেছে নিয়েছেন বন্ধুর পথ। এই পথে প্রশ্ন ও অনুসন্ধিৎসা, অতীত ও বর্তমানের সঙ্গে বোঝাপড়া, পূর্বমত খণ্ডন একমাত্র সারবস্তু নয়। দুইহাজার ছাব্বিশ সনের পৃথিবীতে পা দিয়ে এখনো অব্যাহত যাত্রাটি ক্রমশ গাঢ় হচ্ছে ব্যক্তিসত্তার আত্মমুক্তি ও নিরাময়ের অনুধ্যানে।

জেন-বুদ্ধ ভাবুকতাকে শুরুতে ধ্যানমগ্নতায় আত্মস্থ করেছিলেন বিয়ং-চুল হান। এর ওপর আলাদা করে আলোকপাত আশা করি সামনে করতে পারব। অন্যদিকে, পাশ্চাত্যে চর্চিত চিন্তাকাঠামোর চুলচেরা পাঠ ও এর সঙ্গে বোঝাপড়া তিনি অব্যাহত রেখেছেন। দুই গোলার্ধকে নিজের ভিতরে আত্মস্থ করার ধারায় বিয়ং-চুল হান অবশেষে এমন এক বিন্দু অভিমুখে চলেছেন, যেখানে দার্শনিকতা মানে সহজ সমাধান নয়;—তা যেন-বা ধ্যানমগ্ন এক আত্ম-উপলব্ধির দিকে তাঁকে টানছে! যেখানে তিনি এই বার্তা আমাদের দিতে থাকেন,—নিজের দিকে ফিরে তাকানোর শান্ত নীরব চেষ্টাই কেবল পারে মানব-সমাজে বিদ্যমান সংকট ও এর থেকে উত্তরণের পথ দেখাতে।

সমাজ ও সভ্যতার মুক্তি নির্দিষ্ট কোনো ভাবাদর্শ বা প্রস্তাবনা, চর্চিত ও সংশোধিত চিন্তাকাঠামো, এবং বিকল্প কোনো রাজনৈতিক পদ্ধতির বিষয় নয়;—মুক্তি নিহিত আমরা প্রত্যেকে নিজেকে কীভাবে দেখছি, কীভাবে ব্যাখ্যা করে উঠছি, এবং দিনের শেষে কোন বিন্দু অভিমুখে ছুটছি… তার ওপর! নো দাইসেল্ফ বা নিজেকে জানো-র কথা বিয়ং-চুল হান বলছেন না আদৌ। তিনি বলছেন বহতা সময়রেখার কথা; যেসব কেন্দ্র আমাদের বন্দি করে রেখেছে,—সেগুলোর কথা; এবং এভাবে একটি যাত্রার কাহিনিও বলছেন একের-পর-এক বইয়ে;—যেখানে বইগুলোর পাঠ হয়তো আমাদেরকে সুস্থির পথের নিশান দেখাতেও পারে।

বিয়ং-চুল হানের দার্শনিক অনুধ্যান দর্শনকে শিল্প করে তুললেও তা নিছক একরাশ বাক্যের কচকচানি নয়। মানুষ সহজে বুঝতে ও উপলব্ধি করতে পারে… এরকম এক ভাষায় তিনি লেখেন। জীবনের তন্তুগুলোকে স্পর্শ করেন সজাগ মন নিয়ে। এক-একটি নকশাকে উপলব্ধি করতে নেমে এগুলোর স্থিতিস্থাপকতা যাচাই করেন প্রখর বীক্ষণে। প্রথাগত দার্শনিক বকুনি ভেবে তাঁকে পাঠের অভ্যাসকে তিনি এভাবে ছেটে দিয়েছেন। আমরা বরং এক জেনমগ্ন ব্যক্তিকে চোখের সামনে বিচরণ করতে দেখছি। দেখতে তিনি অবিকল আমাদের মতো সাধারণ ও দৈনন্দিন; কিন্তু মানুষটির ভিতরে বয়ে চলেছে পরিমিতি ধীরতা নিয়ে দাঁড়ানোর অবকাশ।

বিয়ং-চুল হানের এই যাত্রা ও অদ্য যেখানে দাঁড়িয়ে চারপাশকে তিনি দেখে চলেছেন, এখন এর বিশেষত্ব উপলব্ধির খাতিরে দ্য সেন্ট অব টাইম (The Scent of Time: A Philosophical Essay on the Art of Lingering) শিরোনামে প্রকাশিত বইটি আজ অনুসরণের চেষ্টা করব। আগ্রহীজন আশা করি সঙ্গে থাকবেন।
. . .

Book Cover: The Scent of Time by Byung-chul Han; Image Source: Collected; Google Image

দ্য সেন্ট অব টাইম-র বয়ানবিশ্বে স্থান সবিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ক্লান্তি, স্বচ্ছতা, একাকীত্ব কিংবা ইরোসের সংকট নিয়ে বিয়ং-চুল হানের ভাবনার গভীরতা ও মুক্তির পথ-অন্বেষণের তাড়না বইটিকে বিশিষ্ট করে তুলেছে। এখানে তিনি দেখাচ্ছেন,—সময় খণ্ডিত হলে জীবন তার অভিজ্ঞতা হারিয়ে তথ্যের ধারায় নেমে আসে। বইটিকে তাঁর সমগ্র দর্শনের সংযোগবিন্দু বলাটা হয়তো ভুল নয়, যেখানে বিচ্ছিন্ন সমালোচনাগুলো গভীর ঐক্যে এসে মিলিত হয়েছে।

বইটি কি নিছক সমালোচনাগ্রন্থ? সোজা কথায় এর উত্তর হচ্ছে ‘না’। দ্য সেন্ট অব টাইমকে আমরা বরং ধ্যানে নিবিষ্ট রচনা ভাবতে পারি। ইতিহাস, ধর্ম, শিল্প ও দর্শনের ভিতরে যাত্রার মধ্য দিয়ে হান জানাচ্ছেন :— মানুষের নিরাময় ও স্বাধীনতা দ্রুততায় নয়, বরং সময়কে অনুভব করার ক্ষমতায় নিহিত থাকে। চলতে-চলতে একটু দাঁড়িয়ে পড়া তাই পশ্চাৎপদতা নয়। দাঁড়ানোটা বরং মনোযোগ, গভীরতা ও অর্থের পুনর্জন্ম সম্ভব করে। নীরব উপস্থিতির ভেতরে সময় তার গন্ধ ফিরে পায়। এ-কারণে তিনি বলেছেন,—আমাদের সংকট শুধু গতি বৃদ্ধি পাওয়ার মধ্যে নেই, সময়ের ছন্দ ভেঙে যাওয়া হচ্ছে সেখানে আসল কারণ। সময় ক্ষুদ্র, বিচ্ছিন্ন মুহূর্তে ভেঙে গেলে মানুষের স্থায়িত্ব, পরিচয় ও বিশ্ববোধ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। তারা তখন সংকুচিত হয়ে নিজের ভঙ্গুর দেহের যত্নে মন দেয়। স্বাস্থ্য যেন-বা বিশ্ব ও ঈশ্বরের বিকল্প হয়ে ওঠে; আর মৃত্যু হয়ে ওঠে দুর্বোধ্য ঘটনা!

বইটি এই বিচ্ছিন্নতার ঐতিহাসিক ও প্রণালীগত কারণ অনুসন্ধানের পাশাপাশি পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনাকে খুঁজে চলে। হানের লক্ষ্য সেখানে শুধু ব্যতিক্রমী সময়-মুহূর্তকে ধরা নয়, বরং দৈনন্দিন জীবনকে এমন রূপে আবিষ্কার করা, যেন সময় পুনরায় অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতায় ফেরত আসতে পারে। সময়ের শূন্যতাকে বইয়ে অনিবার্য ধরা হয়নি, উলটো এমন এক জীবন্ত সময়-সম্ভাবনাকে উন্মুক্ত করা হয়েছে যার নিজস্ব সুঘ্রাণ রয়েছে।

বিয়ং-চুল হান সময়কে আর ‘সময়’ হিসেবে দেখতে আগ্রহী নন! তিনি বুঝতে আগ্রহী,—সময় কীভাবে ধীরে ধীরে আমাদের হাতছাড়া হয়ে এমন এক অবস্থায় পৌঁছায়… যেখানে দিন কেটে যায়; জীবন এগিয়ে চলে; তথাপি কোনো সমাপ্তি জন্ম নেয় না;—না জন্ম নেয় পূর্ণতা! সত্যিকারের কোনো ‘ইতি’ বা ‘পরিশেষ’ যেন সেখানে নেই। হোল্ডার্লিনের আকুতিভরা উচ্চারণকে স্মরণ করেন হান, যেখানে কবি বলেছিলেন : ‘… যেন সেই দোদুল্যমান মুহূর্তে অন্তত এমন কিছু থাকে,/যা স্থায়ী হয়।’ বাক্যটি এক গোপন সুর! স্থায়িত্ব হারালে সময় অর্থ হারায়, আর সময় অর্থ হারালে জীবন চলতে থাকে ঠিকই, কিন্তু বাঁচা ও হয়ে ওঠার মতো ঘটনা ‘একরকম’ থাকে না।

বিয়ং-চুল হান দেখাচ্ছেন : আমাদের বর্তমান সংকট সময় কমে আসার সংকট নয়। সময় তার নিজস্ব রূপ, দিক ও সমাপ্তিতে পৌঁছানোর ক্ষমতাটি হারিয়ে ফেলেছে;—সংকট সেখানে নিহিত। দিন কেটে যায়। কাজ এগোয়। জীবন সামনে ছুটতে থাকে, অথচ কোনোকিছু সম্পূর্ণ হয় না ও পূর্ণতা পায় না। জীবন যে-কারণে ‘অভিজ্ঞতা’য় পরিণত হওয়ার শক্তি হারায় দ্রুত। এই জীবন কেবল পথ চলতে থাকার সুদীর্ঘ ক্লান্তি ছাড়া কিছু নয়। অবস্থাটি বোঝাতে তিনি নিটশের ‘চূড়ান্ত মানুষ’-র ধারণা সামনে এনেছেন। এমন এক মানুষ, যে-স্বাস্থ্য, আরাম ও ছোট-ছোট সুখের ভেতরে নিজেকে আটকে রেখেছে। তার জীবনে বড়ো কোনো অর্থ নেই। গভীর লক্ষ্য নেই। শেষের অনুভব নিখোঁজ। তার বেঁচে থাকার আয়ু দীর্ঘ হলেও তা শেষপর্যন্ত অসহনীয় হয়ে ওঠে। প্রকৃত অর্থে এই লোকটি মৃত্যুবরণ করে না, বরং সমাপ্তিহীন সময়হীনতায় (Non-Time) বিলীন হয়। এখানেই বিয়ং-চুল হানের গভীর ইঙ্গিত আছে : মৃত্যু অর্থ পায়, যখন জীবন সম্পূর্ণ রূপ ধারণ করে। জীবন পূর্ণতায় পৌঁছাতে না পারলে মৃত্যু আর সমাপ্তি থাকে না, তা কেবল আকস্মিক নিভে যাওয়ায় পরিণত হয়।

সময় অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন কোনো গল্প, ধারাবাহিকতা, লক্ষ্য বা স্থায়িত্ব আসে সেখানে। আমাদের বর্তমান যুগে সময় ধীরে-ধীরে এই অর্থ ধারণের ক্ষমতা হারাচ্ছে! সময় যে-কারণে এখন ঘ্রাণহীন। এটি চলমান আছে, কিন্তু ভেতরে গভীরতা নেই। পৌরাণিক যুগে সময় স্থির অর্থের ধারক ছিল। দেবতারা ঘটনাগুলোকে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত করত বলে পৃথিবীকে পাঠযোগ্য ছবি মনে হতো; যেখানে সবকিছুর নির্দিষ্ট স্থান ও তাৎপর্য রয়েছে।সময় মানে ছিল শৃঙ্খলা ও পুনরাবৃত্তি; পরিবর্তন মুখ্য নয়, বরং স্থায়িত্ব ছিল প্রধান। তাড়াহুড়ো বা গতি-সংকটের প্রশ্ন তখন ওঠেনি।

OPALKA 1965/1-∞; Acrylic on canvas; 196×135 cm. by OPALKA Roman; Image Source: Collected; artmajeur.com

ইতিহাসের আবির্ভাবের সঙ্গে সময়ের চরিত্র বদলোতে শুরু করে। পৃথিবী আর স্থির ছবি থাকেনি, বরং সামনে এগিয়ে চলা রেখায় পরিণত হয়। সময় এখানে অর্থ পায় ভবিষ্যতের মাধ্যমে;—অগ্রগতি বা পরিবর্তনের দিকনির্দেশনা তাকে অর্থবহ করে তোলে। এ-কারণে একসময় গতিবৃদ্ধিও অর্থপূর্ণ ছিল, কারণ তা ভবিষ্যতের দিকে অগ্রসর হওয়ার ইঙ্গিত বহন করেছে। কিন্তু ঈশ্বর, যিনি এই সময়কে স্থির নোঙর দিতেন, ধীরে-ধীরে দৃশ্যপট থেকে মুছে যাওয়ার কারণে সময় অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। মানুষ স্বাধীন হয়, ভবিষ্যৎ উন্মুক্ত হয়, বিপ্লব সম্ভব হয়, কিন্তু সময় তার স্থিতি হারিয়ে ফেলে।

জীবনের গতি বেড়ে যাওয়া এর একমাত্র কারণ নয়; প্রকৃত সমস্যা হলো সময়কে অর্থপূর্ণ পথে ধরে রাখার শক্তি হারিয়ে ফেলা। জীবনের ভিতরকার অর্থ ও সংযোগ যখন ভেঙে যায়, সবকিছু তখন দ্রুততার সঙ্গে দিশাহীন ছুটতে থাকে; আবার কখনো স্থবিরতায় ভারী ও নিস্তরঙ্গ মনে হয় তাকে। অতিরিক্ত ব্যস্ততা আর গভীর স্থবিরতা উভয়ে একই ভাঙনের ভিন্নতর রূপ। হান যে-কারণে বলার চেষ্টা করেছেন,—সংকট আসে ‘শেষ করতে না পারা’ থেকে।

সম্ভাবনা এত বেশি-যে, অল্পই সম্পূর্ণ হয়। জীবন এর ফলে অসমাপ্ত অবস্থায় ঝুলে থাকে। গল্পের মতো করে তাকে গুছিয়ে তোলা কঠিন হয়। কেননা, গল্পের জন্য দরকার বাছাই, ছন্দ ও সমাপ্তি। এগুলো না থাকলে ঘটনার তালিকা শুধু লম্বা হতে থাকে, কিন্তু সেখানে কোনো গল্প জমাট বাঁধে না। এ-কারণে সময়-সংকট শেষপর্যন্ত পরিচয়-সংকটে মোড় নেয়। মানুষ নিজের জীবনকে পূর্ণ গল্প রূপে অনুভব করতে পারে না; সবকিছু হঠাৎ থেমে যায়;—দিকহীন শূন্যতার ভেতরে!

বইয়ের From the Age of Marching to the Age of Whizzing অধ্যায়ে হান দেখাচ্ছেন, মানুষের জীবন একদা লক্ষ্যভিত্তিক পদযাত্রার মতো থেকেছে। তার সামনে থাকত বিরাট কোনো দিগন্ত;—ভবিষ্যৎ, উন্নতি, মুক্তি ইত্যাদি; আর সেই দিগন্ত অভিমুখে অগ্রসর হওয়া সময়কে অর্থ দিয়েছে তখন। এই যুগে, হান বলছেন,—মানুষ যেন ‘মার্চ’ করে এগিয়েছে। পরিকল্পনা, শৃঙ্খলা, পরিশ্রম, উৎপাদনের ভেতরে ছিল গন্তব্যে পৌঁছানোর টান। ধর্মীয় বিশ্বাসকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা গল্পের জগৎ দুর্বল হলেও তার জায়গ নিয়েছে আরেক ধরনের কাহিনি,—অগ্রগতি ও বিকাশের কাহিনি। প্রযুক্তি কেবল সুবিধা ছিল না, প্রায় প্রতিজ্ঞার মতো রেলপথের উচ্ছ্বাসে যেমন দেখা যায় : বাষ্পের চাকা যেন মানবতার ভাগ্যকে দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাবে। গতিকে স্বাভাবিক মনে হয়েছে তখন, কারণ তা ছিল দিকনির্দেশিত;—কোথায় যাচ্ছি, কেন যাচ্ছি এই প্রশ্নগুলোর উত্তর সেখানে পাওয়া যেত।

দিগন্তটি ধীরে ধীরে ঝাপসা হলে হাঁটার ধরন বদলে যায়। বড়ো লক্ষ্য না থাকলে মার্চ পাস্টে ছন্দ থাকে না। মানুষ আর এগোয় না, সে ছুটে বেড়ায়। হান এই নতুন দশাকে ‘হুইজিং’ নামে ডেকেছেন। এক পর্দা থেকে আরেক পর্দায়, এক বিকল্প থেকে আরেক বিকল্পে, এক ঘটনার পর আরেক ঘটনা… দ্রুত পরিবর্তন, দ্রুত বাছাই ও দ্রুত প্রতিক্রিয়ার অন্তহীন তাড়া হচ্ছে ‘হুইজিং’! বাইরে থেকে মনে হয় জীবনের গতি বেড়েছে, কিন্তু ভেতরে আসলে বেড়ে চলে দিশেহারা তাড়না। যাত্রা আছে অথচ গন্তব্য নেই; চলা আছে, কিন্তু কোনো গল্প নেই; যে-গল্প সময়কে ধরে রাখার পাশাপাশি জীবনকে অর্থ দান করে।

বিয়ং-চুল হান এখানে এসে স্বাধীনতার অর্থ ও তাৎপর্য সূক্ষ্মভাবে বোঝার চেষ্টা করেছেন। আমরা সাধারণত মনে করি, বন্ধন কমলে মানুষ মুক্ত হয়। হান দেখান, কেবল আলগা হয়ে যাওয়া স্বাধীনতা নয়; অনেকসময় এতে ভয় আর অস্থিরতা বাড়ে। মানুষ সত্যিকার স্বস্তি পায় সম্পর্কের ভেতর, যেখানে সে নিরাপদ বোধ করে, যেখানে ভরসা করার মতো কিছু থাকে তার জন্য।

বইয়ের এই অধ্যায়ের পরিশেষ টানতে বসে হান সহজ কোনো সান্ত্বনা উপহার দেন না, উলটো খোলা প্রশ্ন রেখে যান সেখানে : লক্ষ্যভিত্তিক এগোনোর যুগ শেষ; তীর্থযাত্রার মতো অর্থপূর্ণ পথচলাও পেরিয়ে গেছে; মানুষ কি তাহলে আবারো জেনকবি বাশোর মতো ধীরে ও সচেতনভাবে হাঁটার ভঙ্গি ফিরে পাবে? নাকি, সকল ভার ঝেড়ে ফেলে হালকা কিন্তু শূন্য ভেসে থাকার জীবনে অভ্যস্ত করবে নিজেকে, যেখানে অবসর আছে, কিন্তু গভীরতা নেই?

বিয়ং-চুল হান এর কোনো সুনিশ্চিত উত্তর দেননি। তিনি শুধু ইঙ্গিত করেন : আজকের এই ছুটে চলা প্রকৃত স্বাধীনতার চিহ্ন নয়; এটি ভরসা হারানোর ফল, গল্প হারানোর ফল, সম্পর্ক দুর্বল হয়ে যাওয়ার ফল। আর, সময়ের গভীরতা ফিরে পেতে হলে আমাদের জীবনযাপনের ভঙ্গি বদলাতে হবে;—অস্থির দৌড় নয়, বরং শান্ত গতি; বিচ্ছিন্নতা নয়, বরং সম্পর্কের উষ্ণতা; দিশাহীন চলা নয়, বরং এমন এক ছন্দ যেখানে জীবন নিজেকে টিকিয়ে রাখতে পারে।

An Autumn Wind – Matsuo Basho and Allen Ginsberg; Source: Cultures of Resistance Films YTC

হানের বার্তাটি গভীর : বর্তমান একদিকে সংকুচিত, তার স্থায়িত্ব নেই; অন্যদিকে সবকিছু একইসঙ্গে বর্তমানের ভেতরে ঢুকে পড়তে চায়। ফলে ছবি, তথ্য, ঘটনার ভিড় তৈরি হয়; যা ধ্যান, স্থিরতা, মনোযোগের সবটাই অসম্ভব করে তোলে। মানুষ তখন জগতের ভেতর দিয়ে হাঁটে না, বরং এক মুহূর্ত থেকে অন্য মুহূর্তে লাফিয়ে বেড়ায়। সময়ের সংকট সুতরাং দ্রুততার সংকট নয়, বরং গভীরতার সংকট। সময়ের স্বল্পতার জন্য আমরা সময়কে হারিয়েছি তা নয়; আমরা হারিয়েছি সময়ের মধ্যবর্তী বা মাঝখানের পরিসরকে। সোনালি এই মধ্যবিন্দু হারিয়ে ফেলায় জীবন থেকে সুবাস হারিয়ে গেছে!

Fragrant Crystal of Time-এ নামাঙ্কিত অধ্যায়ে পৌঁছে মার্সেল প্রুস্তের দিকে ফিরে তাকান বিয়ং-চুল হান। রেলের যুগকে প্রুস্ত দেখেছিলেন দ্রুত চলার যুগ রূপে। মানুষের ধ্যান কেড়ে নেয় এই দ্রুততা। চলমান ছবির মতো জীবন ছোট-ছোট দৃশ্যে ভেঙে যেতে থাকে। তাঁর লক্ষ্য যে-কারণে উলটো ছিল সেখানে : সময়কে ধীর করা, মুহূর্তকে থমকে দাঁড়িয়ে পড়তে বলা, একটু জিরান নেওয়া,—যেন এর ভেতরে লুকিয়ে থাকা গভীরতার দুয়ার খুলে যায়। হানও একই কথা বলছেন : দেখা দ্রুত বদলায়, কিন্তু সুবাস ধীরে আসে। তাই যে-যুগ শুধু দৃশ্যকে গুরুত্ব দেয়, সেই যুগ সুবাসহীন। স্মৃতি সেখানে জমে না; অভিজ্ঞতা স্থায়ী হতে পারে না;—কিন্তু স্বাদ ও গন্ধ আমাদের ভেতরে সময়কে জাগিয়ে রাখে; যেন ক্ষুদ্র এক বিন্দুর মধ্যে বিস্তৃত জীবনের ছায়া থেকে যায় সেখানে।

‘তাৎক্ষণিক ভোগ’ সৌন্দর্যকে ধারণ করার ক্ষমতা রাখে না। অন্যকিছুর আলোকে, স্মৃতির তাৎপর্যে, আর ধ্যানের সামগ্রিক দৃষ্টিতে কেবল সৌন্দর্য অনেকসময় ‘পরে’ প্রকাশ পায়। এটি মুহূর্তের কোনো ঝলক নয়। সৌন্দর্য হচ্ছে স্তরীভূত সময়ের আলোদীপ্তি। তাড়াহুড়োয় তোলা সিনেমাটোগ্রাফির মতো বাক্সবন্দি জিনিস সৌন্দর্য ও সত্যের কাছে আমাদের পৌঁছে দিতে পারে না। এরকম বাক্সবন্দি সৌন্দর্যের কোনো সময়বোধ নেই। ধীর স্থিতি ও সংযত মনোযোগের মধ্য দিয়ে কেবল এক-একটি ঘটনা কিংবা সামগ্রী তার ঘ্রাণ, সত্তা ও বাস্তবতাকে উন্মোচন করে। প্রুস্ত যেমন দেখিয়েছেন : সময়কে বাঁচাতে ও আত্মাকে ভাঙনের হাত থেকে সুরক্ষিত করতে ‘সংযোগ’ ভীষণ দরকারি। সংযোগ তৈরি হয় ধীরতা, স্মৃতি, রূপক ও সম্পর্কের বিশ্বস্ততায় গমনের মধ্য দিয়ে। তাড়াহুড়ো সময়কে খণ্ডিত করে রাখে; আর সুবাস তাকে করে তোলে স্ফটিক।

বিয়ং-চুল হান এখানে এসে পোস্টমডার্ন চিন্তকদের দিকে ফিরে তাকান; বিশেষ করে লিওতার্দ আর দেরিদার দিকে। দুজনের কেউ উল্লাস করে বলেননি ‘গল্প মরে যাচ্ছে, বাহ!’ তাঁরা বুঝেছিলেন : গল্পের মৃত্যু মানে হচ্ছে সময়ের নতুন বিপদ। ভাঙা সময়ে কীভাবে বেঁচে থাকা যায় তা তাঁরা খুঁজতে নেমেছিলেন। খোঁজের কেন্দ্রে লিওতার্দের একটি সরল কিন্তু তীব্র প্রস্তাব হলো, যখন বড়ো-বড়ো অর্থ-কাঠামো ভেঙে পড়ে, আমরা তখন ঘটনার ‘কী’ নিয়ে কম ভাবি, বরং অধিক টের পাই অদ্ভুত এই সত্য,—‘কিছু একটা ঘটছে!’ অর্থের আলো নিভে গেলে অস্তিত্বের নগ্ন জ্যোতি দেখা যায়। ব্যাখ্যা নয়, বার্তা নয়, তবু এটি একধরনের উপস্থিতি। অন্ধকার ঘরে হঠাৎ যেন পর্দা কেঁপে ওঠে, কেউ কিছু বলে না, তবু বোঝা যায় ভেতরে জীবন দপদপ করছে।

“Train Dreams” by Nick Cave & Bryce Dessner; Source: Still Watching Netflix YTC

এখানে এসে বিয়ং-চুল হান নীরবে একটি দরজা খোলা রাখেন। তিনি বলেন না : ফিরে যাও; পুরোনো মহাকাব্যের যুগে ঢুকে পড়ো। আবার তিনি এও বলেন না : ক্ষণে-ক্ষণে উত্তেজনার রসদ তৈরি করা হলো নতুন ভাগ্য। তৃতীয় সম্ভাবনায় তিনি বরং নজর দিতে বলেন। এমন এক সময়ের দিকে তাকানোর প্রয়োজনকে তুলে ধরেন, যেটি আখ্যানের কঠিন শাসন ছাড়াও ধারাবাহিক রাখবে নিজেকে। মুহূর্তকে মুছে না ফেলে তাকে বাসযোগ্য করে তোলার ক্ষমতা তার রয়েছে। সেখানে উপস্থিতি আছে, তবে সেই উপস্থিতি কেবল আঘাত নয়, এটি বরং ধীরে-ধীরে জীবন হয়ে ওঠার অবকাশ তৈরি করতে থাকে আমাদের জন্য। এই অধ্যায়ের গল্পটা এখানেই,—আমরা যে-সময়ে বসবাস করছি তা ভেঙে পড়েছে; এখন এই ভাঙা সময়ের ভেতরে মানুষ এমন এক সময়কে খুঁজে নিতে পারে, যেটি কেবল ঘটে চলেছে এমন নয়,—মানুষকে আশ্রয় দিতে জানে।

বইয়ের Fragrant Clock অধ্যায়ে হান কাজেই সময়কে বোঝার ভিন্ন এক পরিসর উন্মোচন করেন। সময় এখানে ঘড়ির কাঁটার মতো এগিয়ে চলা পরিমাপ নয়, এটি বরং ধীরে ছড়িয়ে পড়া সুবাস;—প্রবাহিত হওয়ার বদলে তা স্থির হয়ে থাকে। সুবাসিত সময়ের ভেতর মুহূর্তগুলো কোনো ধারাবাহিক গল্পে বাঁধা নয়। প্রতিটি বিকেল, প্রতিটি রাত, প্রতিটি ঋতু নিজের স্বতন্ত্র গন্ধে স্বয়ংসম্পূর্ণ। সময় সামনে এগোয় না, বরং গভীরে নামে।যে-মন আকাঙ্ক্ষার তাড়না থেকে মুক্ত, যে-মন থামতে জানে, কেবল সেই মনে এই ভালো সময়টি ধরা দেয়। ভবিষ্যতের দিকে ছুটতে থাকার অস্থিরতা থেমে গিয়ে বর্তমানের নীরব উপস্থিতি সেখানে খুলে যায়। সময় তখন আর ক্ষণস্থায়ী প্রবাহ নয়, সে হয়ে ওঠে স্থির, উষ্ণ, প্রশান্ত সুবাস। এর মধ্যে জীবন ধীরে-ধীরে নিজের গভীরতা অনুভব করতে শেখে।

চীনা কবিতার ধীরলয়ের সুর অভিজ্ঞতাটিকে আরও স্পষ্ট করে। সময় চলে যাওয়া ও ফুরিয়ে যাওয়ার জন্য সেখানে কোনো শোক নেই, কারণ প্রতিটি মুহূর্তই পূর্ণ। ধূপের ধোঁয়া, পাইন-দেবদারুর গন্ধ, ছাইয়ের নীরব উষ্ণতা… সবটা মিলে সময় স্থিরচিত্র হয়ে ওঠে। আকাঙ্ক্ষাই সময়কে ক্ষণস্থায়ী করে, আর আকাঙ্ক্ষাহীন শান্ত মন তাকে গভীর করে তোলে। মন সামনে ছুটে যায় না, বরং নিজের ভেতর বিশ্রাম নেয়, তখন একটি ক্ষণ সমগ্র অস্তিত্বে সংযুক্ত হয়।

দ্রুততার যুগ সময়কে শূন্য করে দেয়, তাকে কেবল পরিমাপে পরিণত করে। সুবাসিত সময় শেখায় ধীরতার ভেতরে কী-করে অর্থ জন্ম নেয়। স্থিরতার ভেতরে কেমন করে জীবন ঘন হয়ে আসে। সত্যিকার সময় হচ্ছে যেখানে আমরা কেবল এগিয়ে চলি না, আমরা একে যাপন করি;—যেখানে সময় কেবল প্রবাহিত ঘটনা নয়; এটি বরং আমাদের চারপাশে নীরবে জমা হতে থাকে। নীরব সঞ্চয়ে লুকিয়ে থাকে প্রশান্তি, গভীরতা ও অনন্ত উপস্থিতির অনুভব;—যেখানে জীবন অবশেষে নিজেকে চিনতে শুরু করে।

প্রুস্ত ও হাইডেগারকে পাশাপাশি রেখে বিয়ং-চুল হান দেখিয়েছেন দুজনে একই ভয়ে ভীত ছিলেন,—মানুষের জীবন ভেঙে যাচ্ছে বিচ্ছিন্ন বর্তমানের ছোট-ছোট খণ্ডে; যেখানে কিছু আর জমাট বাঁধছে না বা ধারাবাহিক নেই। সময় কেবল পেরিয়ে যাচ্ছে, অথচ জীবনের গভীরতা তৈরি হচ্ছে না। হাইডেগার ভেবেছিলেন, তিনি মানুষের চিরন্তন সত্য লিখছেন, কিন্তু হান মনে করিয়ে দেন,—এই চিন্তাও সময়ের সন্তান। দ্রুত যোগাযোগ, দূরত্ব মুছে যাওয়ার উন্মাদনা, নতুন মাধ্যমের ঝড়… সবই সেখানে সক্রিয়। মানুষ জিনিসকে কাছে আনতে চায়, কিন্তু এই কাছে আনাটা ক্রমশ এমন জায়গায় পৌঁছায়, যেখানে স্থান স্বয়ং হারিয়ে যেতে বসে। পথ আর পথ থাকে না। অপেক্ষা থাকে না অপেক্ষায়। তাৎক্ষণিক উপস্থিতি সব ছাপিয়ে বড়ো হতে থাকে। এর ফলে পৃথিবী ভরে যায় ‘এখন’র ভিড়ে; কিন্তু ‘এখন’র উপস্থিতি যে-গভীরতা তৈরি করার কথা, তা হ্রাস পায়।

আগে কিছু স্থান ছিল দূরে, আর সেই দূরত্ব তাদের অর্থ দিয়েছে। ধীর দৃষ্টি জিনিসকে গিলে খায়নি। তাকে নিজের মতো থাকতে দিয়েছে। সময়ের ভাঙন শুরু হয়, যখন এই দূরত্ব হারিয়ে যায়, এবং মানুষ এক উপস্থিতি থেকে আরেক উপস্থিতিতে কেবল লাফ দিতে থাকে। জন্ম নেয় পরিচিত অনুভূতি : ‘সময় নেই।’ হান জানাচ্ছেন : এটি আসলে সময়ের অভাব নয়, বরং নিজের কাছ থেকে সরে যাওয়ার লক্ষণ।

Melting Men by Néle Azevedo; Image Source: Collected; artmajeur.com

বিয়ং-চুল হানের কাছে সময় হলো অদৃশ্য গন্ধের মতো! ওক কাঠের ধীর, গভীর সুবাস হয়ে এটি তাঁর কাছে ধরা দেয়। সুবাস হঠাৎ করে আসে না। তাড়াহুড়োয় ধরা যায় না তাকে। সুবাস অনুভব করতে হলে মানুষকে থামতে হয় ও দীর্ঘক্ষণ পাশে থাকতে হয়। এ-কারণে তিনি বলতে পেরেছেন : আমরা যত দ্রুত ছুটোছুটি করি, সত্য ঠিক ততটাই দূরে সরে যায়। কারণ, কিছু জিনিস কেবল ধীরে নিজেকে উন্মোচন করে। অপেক্ষার ভেতর নিজেকে জানায়। একে অনুভব করতে হলে কেবল গতি কমিয়ে আনার কৌশল যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন এমন এক সম্পর্ক, যেখানে জগৎকে দান হিসেবে দেখা যায়, যা পুরোপুরি আমাদের হাতে নয়।

মাটির কাছাকাছি থাকা, দীর্ঘ স্মৃতি, ধীর প্রজ্ঞা… এসবের ভেতর সময় আবার ঘন হয়। এখানে ধীরতা দুর্বলতা নয়, বরং গ্রহণ করার শক্তি। নিজেকে প্রভাবিত হতে দেওয়া, নীরবে শোনা… এই ভঙ্গি গ্রহণ করার মধ্য দিয়ে জীবন গভীর হয়। শেষপর্যন্ত মুক্তি আসে, যখন সক্রিয় জীবনের ভেতর পুনরায় জেগে ওঠে ধ্যানের নীরবতা। সেখানে সময় আর তাড়াহুড়োর উপমা নয়। এটি প্রসারিত হয়, গভীর ও পূর্ণ হয়ে ওঠে। মানুষ তখন কেবল কাজ করা এক সত্তায় স্থির নেই। সে হয়ে ওঠে উপস্থিত, সচেতন ও সত্যিকার অর্থে জীবিত।

প্রাচীন গ্রিক ভাবনায় মানুষের সত্যিকার জীবন ছিল অবসরের জীবন;—এটি এক মুক্ত অবস্থা; যেখানে কোনো জবরদস্তি নেই, কেবল চিন্তার শান্ত বিস্তার টের পায় মানুষ। কাজ সেখানে প্রয়োজন মেটানোর উপায়, কিন্তু জীবনের লক্ষ্য নয়। সত্য, সৌন্দর্য ও ধ্যান মানুষকে নিজের গভীরে নিয়ে যায় ও তাকে দেবতার নিকটবর্তী করে। মধ্যযুগেও এই ধ্যানমগ্ন জীবনের মর্যাদা টিকে থেকেছে। কাজ তখন অর্থ পেত প্রার্থনা ও নীরব চিন্তার ভেতর দিয়ে। সময় মানে শুধুই এগিয়ে যাওয়া নয়, বরং উৎসব, বিরতি ও প্রত্যাবর্তনের ছন্দে তা অর্থপূর্ণ হয়ে উঠেছে সেখানে।

আধুনিক যুগে কাজ ধীরে ধীরে জীবনের কেন্দ্র দখল করে নিয়েছে। ধর্মীয় শৃঙ্খলা, পুঁজিবাদের উত্থান ও শিল্পযুগের যান্ত্রিক সময় মিলিয়ে মানুষকে এমন এক কর্মজীবনে ঠেলে দিয়েছে, যেখানে অবসর আর স্বাধীনতায় রঙিন নয়; এক বরং অপরাধ বলে ভাবে মানুষ। সময় যেন সঞ্চয়ের বস্তু! শ্রম কেবল মুক্তির প্রতিশ্রুতি! আর জীবন অবিরাম কাজ করে চলার প্রবাহ! এই প্রবাহ মানুষকে ধ্যান থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। বস্তু টিকে থাকে না। অভিজ্ঞতা স্থির হয় না। সময়ের গভীরতা কাজেই তৈরি হয় না। অবসর এখন আর সত্যিকারের অবসর নয়; এটি শুধু কাজের মাঝে সাময়িক বিশ্রাম, যেন পুনরায় কাজে ফেরত যাওয়া যায়।

এখানেই ধ্যানমগ্ন জীবনের প্রয়োজন আবারও সামনে চলে আসে। ধীর হওয়া, অপেক্ষা করা, থেমে থাকা… এসব কোনো অলসতা নয়, বরং স্থায়িত্বের পথ। ধ্যান এমন এক সময়ের দরজা খুলে দেয়,যেটি ব্যবহারের জন্য নয়, বরং বসবাসের জন্য। অতএব মূল কথা একটিই সেখানে : মানুষ কেবল কাজ করার জন্য জন্ম নেয়নি, সে সত্যিকারের মানুষ হয়ে ওঠে, যখন সময়ের ভেতর নীরবে স্থির হতে শেখে।

হানা আরেন্ট ধ্যানকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন যেন সেখানে সকল গতি থেমে যায়। শরীর ও আত্মা থেমে পড়ে সেখানে। হানের মতে আরেন্টের ধারণা ‘অসম্পূর্ণ’। ধ্যান কোনো জড়তা নয়। ধ্যান হলো নিজের ভেতরে শান্ত সক্রিয়তার স্মারক। চিন্তার নীরব গতি ও উপলব্ধির প্রসার। গভীর মনোযোগের ধীর জাগরণে কেন্দ্রীভূত। এই নীরবতা বাইরের ব্যস্ততার বিপরীত হওয়ার কারণে এটি এখানে একজন মানুষের ভেতরের জীবিত ও প্রাণবন্ত রূপ তোলে ধরে। আরেন্ট কর্মকে প্রায় বীরত্বের মর্যাদা দিয়ে গেছেন। তাঁর কাছে কাজ করা মানে নতুন সূচনা, সময়কে নতুনভাবে শুরু করা, এমনকি বিপ্লবী অলৌকিকতার জন্ম দেওয়া। জন্ম নিজেই যেন আশার উৎস;—এক নতুন সূচনার সক্ষমতা।

Modern Times (1936) Factory Scene; by Charlie Chaplin; Source: Charlie Chaplin YTC

বীরত্বের ধারণাকে সীমিত বলে ভাবেন বিয়ং-চুল হান। ইতিহাসের অনেক বড়ো রূপান্তর সচেতন সিদ্ধান্তের ফসল নয়। অবসর ও খেলাচ্ছলে চাপহীন কল্পনা আর মুক্তচিন্তার মধ্য দিয়ে বহু সৃষ্টি জন্ম নিয়েছে। অর্থাৎ, পৃথিবী নিছক কর্মরত নায়কের দ্বারা গঠিত নয়। অনেকসময় তা গড়ে ওঠে সেই নীরব মুহূর্তগুলোয়, যখন কেউ জোর করে কিছু ঘটাতে চায় না। এখানেই animal laborans বা শ্রমে আবদ্ধ মানুষের সমস্যা সামনে হাজির হয়। আরেন্ট তাকে অতিক্রম করতে চাইলেও, ‘আরও সক্রিয় হও’র আহবান আধুনিক ব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খায়, কারণ এই ব্যবস্থাও মানুষকে ক্রমাগত ব্যস্ত রাখতে চায়। এর ফলে সক্রিয়তার আদর্শ অনেক সময় শ্রমের ভিন্ন এক রূপে মোড় নেয়।

এসব কারণে সক্রিয় মানুষের ‘অন্তর্গত দারিদ্র্যের’ কথা নিটশে বলে গেছেন। তারা নানা ভূমিকায় ব্যস্ত থাকে : কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী, পণ্ডিত… অথচ এককব্যক্তি হিসেবে গভীরতা হারিয়ে বসে। যান্ত্রিক নিয়মে চলতে চলতে নিজের সারবস্তু থেকে দূরে সরে যায়। অভিজ্ঞতা তখন আর গভীর হতে পারে না। অভিজ্ঞতার জন্য থামা দরকার; ভিন্ন কিছুর মুখোমুখি হওয়া ও নিজেকে স্পর্শযোগ্য হতে দেওয়া প্রয়োজন। অতিরিক্ত সক্রিয়তা অভিজ্ঞতাকে সংকুচিত করে আনে। সত্যিকার রূপান্তর আসে, যখন মানুষ নিজেকে এমন কিছুর কাছে উন্মুক্ত করে যা তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে।

কর্মের ভেতরেও সুতরাং থামার মুহূর্ত খুঁজে নেওয়া প্রয়োজন। প্রয়োজন দ্বিধা ও পেছনে ফিরে দেখা। দরকারি হলো শ্বাস নেওয়া। এগুলো মোটেও দুর্বলতা নয়। কর্মকে অন্ধশ্রম থেকে তারা পৃথক করে। যে-দ্বিধা করতে জানে না, সে সহজে শ্রমযন্ত্রে পরিণত হয়। আশ্চর্যের বিষয়, আরেন্ট নিজেও শেষদিকে চিন্তার গুরুত্ব স্বীকার করেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন সবচেয়ে গভীর সক্রিয়তা চিন্তার মধ্যে নিহিত। চিন্তা নিজে মননশীল জীবনের প্রকাশ, vita contemplativa-র একটি রূপ। অ্যারিস্টোটল ও সিসেরোর ধারণা স্মরণ করিয়ে দেয়, মানুষ কখনও এতটা সক্রিয় নয়, যতখানি বাহ্যিক কাজকর্মে ক্ষণিক যতি টানার জের ধরে নিজের ভেতরে সক্রিয় জগতে জেগে উঠার পর সে হয়ে থাকে। কখনও এত একা নয়, যতটা একা সে হয়ে ওঠে নিজের সঙ্গে যাপন করতে থাকলে। এই একাকীত্ব শূন্যতা নয়, বরং গভীর উপস্থিতির পরিচায়ক।

মানুষ আজ এত ব্যস্ত, এত দ্রুত, এত নতুনের পেছনে ছুটছে… নিজের সঙ্গে সে থাকতে পারে না;—নিটশের এই কথাটি যেন প্রতিফলনমূলক জীবনের দরজা খুলে দেয়। বাইরে যত গতি বাড়ে, ভেতরের চিন্তা তত ক্ষীণ হয়ে যায়। হানা আরেন্ট মনুষ্য জীবনের দুটি ভিন্ন ভঙ্গির কথা বলেছিলেন : সক্রিয় জীবন ও ধ্যানী জীবন। তাঁর মতে, চিন্তা সবসময়ই স্বল্পসংখ্যক মানুেষর কাজ, তাই তার বিরল হওয়াটা স্বাভাবিক। এখানে প্রশ্ন ওঠে : আজ কি সেই বিরলতা আরও বেড়ে যায়নি? কারণ, বর্তমান সময়ের অস্থিরতা, সময়চাপ ও দ্রুততার সংস্কৃতি চিন্তাকে গভীরে যেতে দেয় না। ফলে চিন্তা নতুন কিছু আবিষ্কার না করে বারবার একই জিনিস পুনরাবৃত্তি করে। নিটশে আগেই সতর্ক করেছিলেন : অতিরিক্ত কাজ ও ব্যস্ততা অনেক সময় জীবনীশক্তি নয়, বরং নিজের কাছ থেকে পালিয়ে থাকার উপায় হয়ে দাঁড়ায়। মানুষের কাছে চিন্তার জন্য যখন সময় থাকে না, তখন ভিন্নমতও অসহ্য হয়ে ওঠে।

চিন্তাশীল মানুষের অভাব কেবল সংখ্যার দিক থেকে নয়, সময়-প্রকৃতির কারণে প্রকট হয়েছে। অস্থির সময় চিন্তাকে গভীরে যেতে দেয় না, তাকে বারবার একই জায়গায় ফিরিয়ে আনে। ফলে চিন্তা স্থায়ী সত্যের সঙ্গে সংলাপে গমনের ক্ষমতা হারায় ও ক্ষণস্থায়ী হয়ে পড়ে। সত্যিকার চিন্তা কখনো তাড়াহুড়োর পথে হাঁটে না। তার নিজস্ব সময় ও ছন্দ রয়েছে। সে ঘুরে যায়; থামে;—আবার ফেরত আসে। এই ধীরপথ তাকে গণনা থেকে আলাদা করে। গণনা সোজা পথে চলে, দ্রুত ফলাফল চায়;—চিন্তা পথের সৌন্দর্যকে দেখতে ও তাকে নিজের মধ্যে স্থান দিতে ত্রুটি করে না। জীবন কেবল কাজের গতিতে বন্দি হলে ঘুরপথগুলো মুছে যায়। ভাষা কঠোর হয়। ভদ্রতা বিপন্ন হয়। সুর নিঃশেষ হতে থাকে। পৃথিবী তখন রূপ হারিয়ে কেবল কার্যকারিতায় সংকুচিত হয়।

কেবল কাজ মানুষকে পূর্ণ করে না। থামতে না পারা ও থামতে না-জানা মানুষ ভিন্নকিছুর মুখোমুখি হওয়ার শক্তি হারিয়ে ফতুর হতে থাকে। অভিজ্ঞতা জন্ম নেয়, যখন মানুষ নিজেকে স্পর্শযোগ্য হতে দেয়;—একে সে তখন আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না বা করাটাকে প্রয়োজনীয় গণ্য করে না। এ-কারণে ধ্যান দরকারি। এটি সময়ের অপচয় নয়, বরং সময়কে তা বিস্তৃত করে। জীবনকে গভীর, দীর্ঘ ও স্থিরতার স্বাদ এনে দেয়। ধ্যানহীন সক্রিয়তা শেষ পর্যন্ত ধ্বংসের দিকে মানুষকে নিয়ে যায়। এটি উৎপাদন করে ও ভেঙে ফেলে। সময়কে ব্যবহার, এমনকি হত্যাও করে। ধ্যান সেখানে বিপরীত ফলাফল নিয়ে হাজির হয়। সময়কে সে দান করে। সেই সময়, সেখানে কোমলতা আছে, অপেক্ষা আছে, বন্ধুত্বের মৃদু স্পর্শ রয়েছে।

এই স্থিরতার মধ্যে জীবন শ্বাস নেয়, আর আত্মা হয় বিস্তৃত। মানুষের মুক্তি সুতরাং অধিক পরিমাণে ব্যস্ত হওয়ার মধ্যে নিহিত নয়, বরং সঠিক সময়ে থামতে জানার মধ্যে আসে মুক্তি। বিশ্রামহীন সভ্যতা ধীরে ধীরে বর্বরতায় মোড় নিয়ে থাকে। ধ্যানী শক্তির পুনর্জাগরণ যে-কারণে জরুরি। সময়ের ভেতরে যন্ত্রের মতো কাজ করে চলার চেয়ে পুনরায় সময়ের সঙ্গে বসবাস করতে শেখার মধ্যে প্রকৃত মুক্তি আসে মানুষের।
. . .

What a Wonderful World – Louis Amstrong; Source: Mister Kad YTC

. . .

Read The Scent of Time by Byung-Chul Han

. . .

লেখক পরিচয়

এখানে অথবা ওপরের ছবিতে চাপুন

. . .

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 0 / 5. Vote count: 0

No votes so far! Be the first to rate this post.

Contributor@thirdlanespace.com কর্তৃক স্বত্ব সংরক্ষিত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *