আসুন ভাবি - পোস্ট শোকেস

জ্ঞান বনাম ক্ষমতা : ফুকো-চমস্কি বিতর্ক

Reading time 5 minute
5
(36)
Classic Debate: Chomsky vs Foucault – On Human Nature (English Dubbed); Source – Thoughts on Things and Stuff YTC

. . .

Click here or the image above to read Nirzhar Noishabdya’s views about the Foucault-Chomsky Debate.

বিখ্যাত বিতর্ক। বিতর্কে মিশেল ফুকোর তুলনায় নোম চমস্কিকে ম্লান লাগতে পারে দেখে। চমস্কি যদিও ইতিবাচক মানুষ। সামাজিক পরিবর্তনের পটভূমিকায় তাঁর এই অবস্থানের প্রয়োজনীয়তা আছে বটে! পক্ষান্তরে ফুকো ইতি-নেতির বাইরে গিয়ে জ্ঞান ও সত্যের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। সমাজদেহে সক্রিয় ব্যবস্থা ও প্রাতিষ্ঠানিকতা কেমন করে সবকিছুর নিয়ামক হয়ে দাঁড়ায়, এর নজির ফুকো তাঁর জীবনব্যাপী কাজে রেখে গেছেন। চমস্কির সঙ্গে বিতর্কে বিবেচনা যারপরনাই ফুকোর দিকে সামান্য হলেও ঝুঁকে থাকে। কারণগুলো সংক্ষেপে বলার চেষ্টা করা যেতে পারে। বলাবাহুল্য, সবটাই এখানে স্ব-বিবেচনা প্রসূত;—ফুকো ও চমস্কির পারস্পরিক আর্গুমেন্টের সঙ্গে যার মিল-বেমিল দুটোই হয়তো থাকছে।

প্রথমত, জ্ঞান ও সত্যের সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড নেই। কোথায় ও কীভাবে তারা কার্যকর হচ্ছে, এর ওপর তাদের ভালোমন্দ অনেকখানি নির্ভর করছে। জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠিত হওয়া মানে এই নয়,—সমাজে নোম চমিস্কর সংজ্ঞা অনুসারে বৈধ ‘সত্য’ কার্যকর ও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যদি হতো, তাহলে ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে আমরা এতদিনে আদর্শ মেনে নিতাম।

বিগত চার-পাঁচশো বছর ধরে অত্র অঞ্চলগুলোয় জ্ঞান তৈরি হয়ে চলেছে, কিন্তু তার ফলাফল সুখকর হয়েছে কি? প্রশ্নটি নিয়ে ক্যাচাল রয়েছে বিস্তর! জ্ঞানকে বরং বিশ্বের ওপর একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম ও এভাবে বিশ্বকে নিজ নিয়ন্ত্রণে রাখার হাতিয়ার রূপে প্রথমে ইউরোপ ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এস্তেমাল করে যাচ্ছে। উপকারভোগীর মাত্রায় কাজেই সমতা আসেনি। চমস্কি স্বয়ং যে-কারণে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে হামেশা তির্যক হয়ে ওঠেন।

মানে দাঁড়াল,—নজরদারি, নিয়ন্ত্রণ, আরোপণ, বৈষম্য থেকে শুরু করে যতকিছু মানুষকে ছোট-বড়ো ভাগে বিভাজিত করে কিংবা চাপানো ব্যবস্থাকে মেনে নিতে ও এর সঙ্গে আপসরফায় গমনে মজবুর করে কাউকে,—পৃথিবীজুড়ে জ্ঞান এরকম এক ভূমিকায় দীর্ঘদিন ধরেই মঞ্চায়িত হয়ে চলেছে। সুতরাং, জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়েও আখেরে লাভের লাভ কিছু দাঁড়াচ্ছে না। ফুকো যে-কারণে আলোকায়ন বা রেনেসাঁসের অপরিসীম তাৎপর্য স্বীকার করলেও, সেখানে এর সামগ্রিক উদ্দেশ্য ও পরিণাম নিয়ে গোড়ায় প্রশ্ন তুলেছিলেন। দেখিয়েছিলেন,—আলোকায়নের নিচে অন্ধকার কতটা জমাট এখনো!

প্লেটোর রিপাবলিক-এ সক্রেটিস ওই-যে দার্শনিক রাজাকে রাষ্ট্রের চূড়ায় দেখার পক্ষে ওকালতি করলেন, তা মূলত এ-কারণফেরে অযৌক্তিক ও দুর্বল আর্গুমেন্ট ছিল। এথেন্সের গণতন্ত্র স্বৈরতান্ত্রিক বিশৃঙ্খলার নামান্তর হয়ে উঠেছিল। এর থেকে বেরিয়ে আসার উপায় খুঁজতে বসে সক্রেটিস প্রজ্ঞাবান রাজার ভাবনায় অনড় হলেন। প্রয়োজন, যোগ্যতা ও দক্ষতা অনুসারে সুবিন্যস্ত ভাগে বিভক্ত সমাজ-চূড়ায় বসে যে-রাজা তার প্রজ্ঞার সাহায্যে রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন।

The Death of Socrates, by Jacques-Louis David; Image Source – Collected; Google Image

সক্রেটিসের রাজা ধরায় জন্মলাভের পর থেকে বালেগ হওয়ার সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া মেনে অভিজ্ঞ, বাস্তববাদী ও দূরদর্শী হতে বাধ্য। সংগতকারণে তার প্রজ্ঞাকে পরীক্ষিত ধরে নিয়ে রিপাবলিক-এ আর্গুমেন্ট সাজিয়েছেন তিনি। রাজার জ্ঞান ও প্রজ্ঞা কী-করে পরীক্ষিত ও অভ্রান্ত থাকছে তা-নিয়ে যুক্তি তুলে ধরতে কৃপণতা করেননি। সবটা শুনতে মনোরম। ‘রিপাবলিক’ উপভোগ্য কিতাব। বাস্তবে জ্ঞান-প্রজ্ঞা সমাজ-গঠনে নিয়ামক ভূমিকা পালন করলেও, এর দ্বারা সত্যসমাজ প্রতিষ্ঠার খোয়াব সত্য প্রমাণের নজির মানুষের অজানা! আজো এরকম সমাজ পৃথিবীতে অধরাই থেকে গেছে, এবং ভবিষ্যতে তাই থাকবে।

মূল কারণটি চমস্কির বক্তব্য খণ্ডন ও নিজের জীবনব্যাপী কাজে ফুকো ব্যাখ্যা করে গেছেন; আর সেটি হলো ‘ক্ষমতা’। জ্ঞান ও সত্য মূলত ভালো-মন্দের অনুরূপ মনুষ্য উদ্ভাবিত সংজ্ঞা মাত্র। একটি নৈতিক অবস্থান। সমাজে বসবাস করতে গেলে মানুষের যেটি কমবেশি কাজে লাগছে। যে-প্রকৃতি মায়ের কোলে তার জন্ম, সেখানে নৈতিকতার বালাই নেই। প্রকৃতি নৈতিক নয়। ন্যায়-অন্যায়, ভালো-মন্দ, সত্য-মিথ্যা ইত্যাদি তার বিবর্তনকে সেখানে প্রভাবিত করে না। ডারউইন বর্ণিত বিবর্তন ও অভিযোজনের ছক বরং প্রকৃতির ভূমিকা বুঝতে মানুষকে অধিক সাহায্য করে। টিকে থাকার অস্তিত্বিক সংগ্রাম যার সারকথা। তামাম প্রাণী-জাহানের সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্ককে এটি প্রভাবিত ও নির্ধারণ করে যায়।

এমতাবস্থায় মানুষ হলো একমাত্র প্রাণী, যে-কিনা প্রকৃতিবক্ষে খাপ খাওয়ানোর লড়াইয়ে নেমে এর ওপর অধিকার ও নিয়ন্ত্রণ কয়েম করে। তার মগজাস্ত্র এই পরিমাণ বিকশিত হলো, যেটি প্রকৃতির সঙ্গে মানিয়ে চলার পরিবর্তে উলটো এর ওপর স্বকৃত ধারণা ও সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার ক্ষমতায় ধনী বা সমৃদ্ধ। প্রকৃতি থেকে নিজেকে সে পৃথক করে নিয়েছিল। এই-যে জ্ঞান, এটি তাকে এডওয়ার্ড সাঈদ ব্যবহৃত বিখ্যাত পরিভাষা ‘We’ এবং ‘Other’-এ নিয়ে গেলো। মানুষ সেখানে ‘We’; আর বাদবাকি যা-থাকছে ভবে,—তারা একলহমায় ‘Other’-এ বদলে গেলো! সময়টানে মানুষ খোদ নিজের ওপর এই বিভাজনকে আরোপ করেছিল। সাঈদ যেমন তাঁর প্রাচ্যবাদ-এর বয়ানে দেখিয়েছেন, ইউরোপীয় ও মার্কিন বয়ানে কেমন করে তারা হয়ে পড়ে ‘We’, আর বাকিরা ‘Other’।

তাহলে কী দাঁড়াচ্ছে শেষমেষ? আমরা দেখছি,—মানুষের জ্ঞান স্বয়ং বিভাজনের নিয়ামক ও ক্ষমতার প্রতীক। জ্ঞান থেকে জন্ম নিয়েছে ক্ষমতা, এবং ক্ষমতা পরবর্তীতে জ্ঞানকে নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবহার করেছে নির্মমভাবে। পৃথিবীর ইতিহাস মোটের ওপর তাই জানাচ্ছে আমাদের। জ্ঞান যেখানে রক্তকরবীর ‘রাজা’র মতো বন্দি ও একা। সত্য-মিথ্যা ইত্যাদি সেই ছক মেনে নির্ধারিত বটে!

মানুষ এই-যে সমস্যার জন্ম দিলো, এর থেকে বেরিয়ে আসার উপায় অগত্যা ভাবতে বসল নিজে। জন্ম নিলো এমন এক নৈতিক মানদণ্ড,—জ্ঞান যেখানে কলুষিত নয়, বরং তার লক্ষ্য সর্বজনীন কল্যাণ। একে আমরা সত্য ভাবতে পারি অথবা দুটোকে একত্রে জুড়ে বলতে পারি ‘সত্যজ্ঞান’। চমৎকার, তাতে সন্দেহ নেই। ফুকো এখানে এসে ফের বাগাড়া দিচ্ছেন। তিনি দেখাচ্ছেন,—সত্যজ্ঞান ততক্ষণ সত্যজ্ঞান হয়ে থাকে, যতক্ষণ ক্ষমতা-কাঠামোয় উৎপাদিত প্রাতিষ্ঠানিকতার বাইরে সে সক্রিয় থাকছে। প্রাতিষ্ঠানিক বলয়ের ভিতরে গমনের আগে পর্যন্ত তাকে আমরা নিষ্কলুষ ও সত্যভাষীর ভূমিকায় মনোরম দেখতে পাই। কোনো একভাবে ওই কাঠামোয় যদি তার প্রবেশ ঘটে যায়,—একই সত্যজ্ঞান তাৎক্ষণিক দূষিত বর্জ্য হয়ে ওঠে।

Michel Foucault and Noam Chomsky; Image Source – Collected; Google Image

এর কারণ হচ্ছে, মানুষ এখন আর বনজঙ্গলে বা আমাজনের গহিন কোটরে ক্ষুদ্র একক রূপে বসবাস করে না। সে বাস করে এমন এক পৃথিবীতে, যাকে নিজের মেহনত খাটিয়ে সে গড়ে নিয়েছে; এবং সেখানে ব্যক্তি-স্বাধীনতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার জটিল সংঘাত রয়েছে। যেখানে, ক্ষমতা-কাঠমোর পেটের ভিতরে বসে জ্ঞানকে অবিরত ভূমিষ্ট হতে হয়। সুতরাং, সমাজে জ্ঞানের কার্যকারিতা স্বনির্ভর নয়, ওটা এখন পরনির্ভর বা কাঠামোর অনুগত।

সমাজে একজন জ্ঞানী ততক্ষণ মুক্ত, যতক্ষণ-না তিনি কাঠামোয় ঢুকছেন। তার কাজ হচ্ছে জ্ঞান ও এর উদ্দেশ্যকে প্রশ্ন করা। তদন্ত করা। ফ্যাক্টগুলো তুলে ধরা। এভাবে আঘাত হানতে বাধা নেই। কিন্তু, একে যদি কাঠামোয় ফেলে কেউ কাজে লাগাতে যায়,—অচিরেই তা দূষিত হয়ে পড়ে। এর ভালোমন্দের সবটাই বিতর্ক, নিয়ন্ত্রণ, নির্ধারণ, আর আরোপণের দায়ে অভিযুক্ত হয় তখন। বড়ো উদাহরণ, সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব। এরকম আরো আছে।

বিপ্লব সৃষ্টিশীল ও মুক্ত, যতক্ষণ সে প্রশ্ন ও অনুসন্ধানকে হাতিয়ার বানিয়ে সমাজকে বিব্রত করে বা আঘাত হানতে থাকে। নিজে যবে থেকে সমাজ বদলানোর কাজে নামে,—দূষিত হওয়া তার জন্য অনিবার্য হয় সেখানে। বিপ্লবীর কাজ তা নয়। সিস্টেমকে নিয়ন্ত্রণ করে যে-ক্ষমতা, তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সে অবশ্যই গড়ে তুলবে, কিন্তু একে পালটানোর কাজ তার নয়। সে কেবল বাইরে থেকে সজাগ পাহারায় থাকবে সজাগ। এটি দেখতে-যে,—এর প্রভাবে ক্ষমতা কতখানি নমনীয় ও সহনীয় থাকছে সবার জন্য।

এটি হলো প্রকৃত বুদ্ধিজীবীতা। চিন্তার প্রাসঙ্গিকতা মানে সমাজকে স্বয়ং বদলানো নয়, বরং সমাজকে ভিতর থেকে বদলে যেতে বাইরে বসে অবিরত চাপ দিতে থাকা। এছাড়া ক্ষমতার সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ থেকে বেঁচে ফেরত আসা তার পক্ষে সম্ভব নয়।
. . .

Michel Foucault: A song by Shazed ul hoq khan Aabir; Source – Shazed ul hoq khan Aabir YTC

সংযুক্তি

শেষ পরিচ্ছদে যা বললাম, তার সঙ্গে মিলিয়ে নিতে পারি, দুইহাজার চব্বিশের পটপরিবর্তনের পর ফরহাদ মজহার-পিনাকী গংরা কেন ব্যর্থ হাত কামড়াচ্ছেন, সেই হিসাব। তবে আরো ভালো সাজেদুল হক খান আবির নামের অনামা-অখ্যাত তরুণের গান দুখানা শোনা। জেন-জি প্রজন্মের তরুণ। ফুকো কেন সমকামী ছিলেন তা ভাবতে যেয়ে তার মনে হয়েছে,—বেচারা সঠিক মেয়ে খুঁজে পায়নি জীবনে।😇 না পাওয়ার পেছনে বড়ো কারণ নিজের মতো করে ভাবছে ‘ভাষা সন্ত্রাস’ নামে বাঁধাই দ্বিতীয় গানের কলিতে;—যেটি প্রকারান্তরে তার নিজেরও বেদনা :

আমি একদিন খুঁজে পাবো সে ভাষা
যে ভাষায় কথা বললে বুঝবে তুমি
আমি একদিন খুঁজে পাবো সে আশা
যে পথের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে তুমি…

চমস্কি এই ভাষার কথা ডিবেটে তুলে আনতে উন্মুখ থেকেছেন। প্রেরণার জন্য এটুকু স্বপ্ন দেখা যেতে পারে, এই আফসোস নিয়ে-যে,—‘সে-ভাষা’ বাস্তবের পৃথিবীতে খুঁজে পাওয়ার নয়।
. . .

Bhashar Shontrash by Shazed ul hoq khan Aabir; Source – Shazed ul hoq khan Aabir YTC

. . .

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 36

No votes so far! Be the first to rate this post.

Contributor@thirdlanespace.com কর্তৃক স্বত্ব সংরক্ষিত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *