কবিতা সিরিজ : জীবনানন্দ, তোমাকে ভেবে : পর্ব-৪
(নিরীক্ষা ও বিনির্মাণে জীবনানন্দ দাশের অন্ধকার)
রচনা : হেলাল চৌধুরী

তোমার অজস্র শেয়ালেরা আজও
আমি তো চেয়েছিলাম, এ-জীবন
তোমার ঘাসফড়িঙের শিহরিত ডানার মতো উচ্ছল
গোধূলিসন্ধির নৃত্যে বেলোয়ারি রৌদ্রের নিচে
অথচ তোমার অজস্র শেয়ালেরা আজও
নেমে আসে দুপুরে নাগরিক কোলাহলে স্নায়ুর সন্ধ্যায়…
এইখানে পথ চেয়ে, তোমার
যুবকের সাথে পাখিরাও যেতে চায় সূর্যের বিধানে
সবিতার দাপটে দুপুরে আলোর আড়ম্বরে
অথচ তোমার অজস্র শেয়ালেরা আজও
নেমে আসে দুপুরে নাগরিক কোলাহলে স্নায়ুর সন্ধ্যায়…
এইখানে অ-যূথচারী এক নারীর পায়ে
মায়া-অন্ধকারে তোমার হংকঙের তৃণ
রেখে যেতে চায় সে সাগরিক প্রগাঢ় চুম্বন
অথচ তোমার অজস্র শেয়ালেরা আজও
নেমে আসে দুপুরে নাগরিক কোলাহলে স্নায়ুর সন্ধ্যায়।
. . .
তোমার রূপসীর আজ করুণ মাঠ
জীবনানন্দ, তোমার রূপসীর আজ করুণ মাঠে
এখনও শৃগাল গৃধিনীরা হাঁটে — দাপটে
তারা বারেবারে খামচে ধরে সবুজ বনানীর হলুদ মাঠ
তোমার কাকেরা যখন ডানায় ঘেরাটোপে চুপ
আমাদের গাঙশালিকের ঠোঁটে শুনি তখন—
নামুক নামুক
আজ হিচককের কাকেরা আবারও নেমে আসুক…
এখনও পৃথিবী তোমার কবেবার নিশীথিনী সিংহল
বিদর্ভ নগর অশোকের ধূসর জগৎ
চারিদিকে তার আজও কবেকার ধূ-ধূ অন্ধকার
তোমার শঙ্খচিলের ডানা যখন জরাগ্রস্ত
আমাদের গাঙশালিকের ঠোঁটে শুনি তখন—
নামুক নামুক
আজ হিচককের কাকেরা আবারও নেমে আসুক…
আজ তোমার সবিতার আলো
হংকঙের কবেকার ঘন-ঘোর অন্ধকার
তোমার পৃথিবী বুঝি আবারও বিম্বিসারের নগর
সবুজ ঘাসে কার্তিকের কাক যখন চুপ
আমাদের গাঙশালিকের ঠোঁটে শুনি তখন—
নামুক নামুক
আজ হিচককের কাকেরা আবারও নেমে আসুক।
. . .
কতদূর তোমার কারুকার্য শ্রাবস্তীর
আমি রোদ্দুর, তুমি কদ্দূর
আমি জীবনানন্দ, তুমি বনলতা সেন
আমাদের পথহাঁটা বলো আর কতদূর
বলো আর কতদূর…
আমি রোদ্দুর, তুমি কদ্দূর…
কতদূর বলো কারুকার্য — তোমার শ্রাবস্তীর!
আমি সিসিফাস — যতবার ওঠি পাহাড়ে
ততবার নামি গিরিখাতে নিয়তির প্রহারে
বিপ্লব তবু নিয়তির সাথে পাথর পিঠে
পাহাড় পিঠে, দেখি সমুদ্দুর
আমি রোদ্দুর, তুমি কদ্দূর…
কতদূর বলো কারুকার্য — তোমার শ্রাবস্তীর!
আমি জীবনানন্দ, তুমি তাঁর সুচেতনা বোধ
আমার উঠোনে চাই তোমার ছড়ানো বোধরোদ
দারুচিনি দ্বীপ সুচেতনা সবিতা বনলতা সেন
বলো আর কতদূর…
আমি রোদ্দুর, তুমি কদ্দূর
কতদূর বলো কারুকার্য — তোমার শ্রাবস্তীর!
. . .

তোমার প্রতীতির দেয়াল
এখনও তোমার কামাতুর ব্যক্তিরা চারিদিকে
বাতাবীলেবুর পাতারা উড়ে যায় অন্ধকারে
ফুরায় না তবু বাতাসে রৌদ্রের ঋতু
মানুষেরই পিঠে এখনও তোমার ভয়াবহ পৃথিবী ঘোরে…
কোথাও নবীন আশা শুয়ে নেই ভূয়ে
এখনও পৃথিবীতে তনুবাত শিখরের প্রশান্তি নামে
এখনও ডোরিয়ান গ্রিস চীনের দেয়াল প্যাপিরাসে ঝরে
মানুষেরই পিঠে এখনও তোমার ভয়াবহ পৃথিবী ঘোরে…
এখনও তোমার বিষণ্ণ মহৎ
পড়ে আছে মানুষের শরীরে সূর্যালোকে
আজও তোমার নীলিমার সীমাহীন ভ্রান্তিবিলাস দেখি
মানুষেরই পিঠে এখনও তোমার ভয়াবহ পৃথিবী ঘোরে।
. . .
তোমার সৃষ্টির তীরে
তোমার হরিণেরা ছিঁড়ে খেয়েছে
আমাদের আমিষাশী হৃদয়
শিকারি সম্রাটের ইশারায়
পৃথিবীতে বিকেলের আলো নিস্তেজ হয়ে গেছে
তাই প্রেমিকেরা সারাদিন কাটিয়েছে গণিকার ঘরে;
হিটলার মানুষের হাতে আজ নাজেহাল
মানুষেরা হারিয়েছে যে তার জনপরিজন
রুটি খেয়ে আজও তারা ব্রেডবাস্কেট খেলে
ভালোবেসে দালাল আর গণিকা
তাই প্রেমিকেরা সারাদিন কাটিয়েছে গণিকার ঘরে;
এখনও নির্জন সড়কে কুকুরের ক্যানারি কান্না
তাজা ন্যাকড়ায় অরেঞ্জপিকোর ঘ্রাণ
নানারূপ জ্যামিতির টান
আর প্রতিদিন বৃশ্চিক সিংহের প্রাতঃকাল
তাই প্রেমিকেরা সারাদিন কাটিয়েছে গণিকার ঘরে।
. . .
পৃথিবীর মাঠে তোমার প্রক্ষিপ্ত রাত্রি হাঁটে
আমাদের পরিজন আজ নিজেদের চিনে না
তোমার হেমন্তের সেই বেলাবেলি দিন
নির্দোষ আমোদে সাঙ্গ হয় না চায়ের ক্যান্টিন
তোমার সংকল্পের চায়ের ভেতর
এখনও তাই স্পর্শকাতর তোমার কন্যাদের মন;
আজ রাজার কাজে এখনও উৎসাহিত নাগর
এখনও বারগৃহ ধরে যেতে চায় তারা ঘরে
নিতে চায় অবিরাম হতমান রোদের সোনা
ফসলের দেশে অস্তমিত আজ তোমার হিরণ্ময় সূর্য
এখনও তাই স্পর্শকাতর তোমার কন্যাদের মন;
মিডলম্যানদের কাছে পর হয়ে আছে
তোমার ঘিঞ্জি ভাঁড়ার ডাক্তারের মুখ
রাজপথ পড়ে আছে মূঢ় নিস্তব্ধতা নিয়ে
আজ পৃথিবীর মাঠে প্রক্ষিপ্ত রাত্রি হাঁটে;
এখনও তাই স্পর্শকাতর তোমার কন্যাদের মন।
. . .
তোমার হাওয়ার রাত
একদা আমারও নির্জন আকাশ ছুঁয়ে
তোমার হাওয়ার রাত এসে ঢুকেছিল
মশারির পেটে নীল মনীষাসুন্দরী নক্ষত্র হয়ে
রাতে, তোমার নির্জন মৌসুমী সমুদ্রের ঢেউয়ে, তবে
হেলে পড়ে কাঁধে আমার মনীষা পাড়ার নলুয়াসুন্দরী…
এখনও তোমার হাওয়াসুন্দরী
তার বিস্তীর্ণ ডানায় বুকে টানে ইশারায়
আমার অজস্র ঘুমের ভেতর মশারির অন্ধকারে
রাতে, তোমার নির্জন মৌসুমী সমুদ্রের ঢেউয়ে, তবে
হেলে পড়ে কাঁধে আমার মনীষা পাড়ার নলুয়াসুন্দরী…
আজও তোমার সাদা বক
নলুয়ার হাওর চষে উড়ে উড়ে কাঁদে দুপুরের রাতে
তখন বিমূর্ত নক্ষত্র তার শুয়ে জলে — মশারির পেটে
রাতে, তোমার নির্জন মৌসুমী সমুদ্রের ঢেউয়ে, তবে
হেলে পড়ে কাঁধে আমার মনীষা পাড়ার নলুয়াসুন্দরী…
. . .

. . .
কবিতা সিরিজ : জীবননানন্দ, তোমাকে ভেবে : পর্ব সমূহের লিংক
জীবনানন্দ, তোমাকে ভেবে-৩ : হেলাল চৌধুরী
জীবনানন্দ, তোমাকে ভেবে-২ : হেলাল চৌধুরী
জীবনানন্দ, তোমাকে ভেবে-১ : হেলাল চৌধুরী

লেখক পরিচয় : ওপরের ছবি অথবা এখানে চাপুন
. . .


