
কমলকুমার মজুমদার স্মরণে
কমলকুমার মজুমদারের জন্মদিন স্মরণে তাঁকে শ্রদ্ধা জানিয়ে ‘আদম’ সম্পাদক গৌতম মণ্ডল গত বছর নিজের ফেসবুক পোস্টে লিখেছিলেন : ‘পাঠকের মনোরঞ্জনের জন্য একটি অক্ষরও কমলকুমার মজুমদার লেখেননি। আসলে তিনি নিছকই একজন লেখক ছিলেন না, ছিলেন লেখকদের লেখক। আজ ১১১তম জন্মদিনে তাঁকে জানাই আন্তরিক শ্রদ্ধা। প্রণাম।’ আদম থেকে প্রকাশিত কমলকুমার মজুমদারের বইয়ের একটি তালিকাও পোস্টে ধরিয়ে দিয়েছিলেন গৌতম। বাংলা সাহিত্যে কমলকুমারের স্বাতন্ত্র্য ও বিশিষ্টতার কথা যদি ভাবি, সেখানে তাঁর এই সাদাসিধে শ্রদ্ধাঞ্জলিকে যথার্থ মানতেই হচ্ছে।
‘লেখকদের লেখক’ অভিধাটি অতি-ব্যবহারে এখন ক্লিশে শোনায়; তথাপি অন্তর্জলী যাত্রা-র স্রষ্টা কমলকুমারের গভীরতা অনুভবে তা আবার সাহায্যও করে। মার্কেজ হয়তো এ-কারণে বোর্হেসকে সকল লেখকের জন্য জরুরিপাঠ্য মানতেন। জাদুবাস্তবতায় নিবিড় লাতিন লেখকের লম্বা তালিকায় বোর্হেস অনেকের কাছে অবশ্যপাঠ্যই থেকেছেন তখন। বাংলাভাষী লেখকসমাজে কমলকুমারের মর্যাদা সেরকম। লেখকের জন্য তাঁকে অবশ্যপাঠ্য ভাবা অসংগত নয় বা তা ছিল না কখনো। সত্যজিৎ রায় যেমন কথাচ্ছলে বলেছিলেন : ‘কমলবাবু এমন এক মানুষ,—শিল্পের সবটা উনি জানেন। হি নোজ অল দ্য আর্টস।’ বাংলা সিনেমায় শিল্প-নির্দেশনার প্রয়োজন মিটানো ও বইয়ের অলঙ্করণে সঠিক মর্ম ফোটাতে যারপরনাই কমলকুমারের শরণাপন্ন হয়েছেন সেইসময়।
বেঁচে থাকতে কমলকুমার প্রচুর লিখেছেন এমন নয়, তবে যেটুকু লিখছেন সেগুলো লেখকদের জন্য উপাদেয়। ভাষা ও লিখনশৈলী নিয়ে নিরীক্ষায় গমনের রাস্তাঘাট চিনতে তাঁর রচনাসম্ভার কাজে লাগে। লেখার প্রতি পরতে ছড়ানো সূক্ষ্ম জীবনবেদের কারণেও তাঁকে পাঠ করা অনেকক্ষেত্রে অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায়। গল্প-আখ্যানের কমলকুমার, লোকশিল্পের মাত্রা ও তাৎপর্য বিষয়ে আলাপরত কমলকুমার, রামকৃষ্ণ পরমহংসের ভক্ত কমলকুমার, খালাসিটোলায় মদের ডেরায় কথার ফুলকিবাণে সুনীল গাঙ্গুলীদের আলোকিত করতে থাকা কমলকুমার, ছবি আঁকিয়ে ও নকশাবিদ কমলকুমার, ফরাসিসহ একাধিক ভাষায় পারদর্শী কমলকুমার… বিচিত্র গুণ অবলীলায় ধারণ করেছেন নিজমধ্যে!—এরকম একটা লোকের পক্ষে গৎবাঁধা ফ্রেমে গল্প-আখ্যান ও হরকিসিমের গদ্য লেখাটাই অবান্তর ছিল। কমলকুমার কাজেই স্বেচ্ছায় স্বজ্ঞানে লেখার ভাষা, বিষয় ও শৈলীতে নিজেকে নিরীক্ষাধীন করেছেন। চিন্তা ও জানাশোনার স্তরগুলো যদি আমলে নেই, তাহলে বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়,— নিজেকে এভাবে নিরক্ষাধীন করে লেখাটা তাঁর জন্য অনিবার্য ছিল। অন্যভাবে লিখলে নিজ-গুণের প্রতি তিনি সম্ভবত অবিচারই করতেন!
অন্তর্জলী যাত্রা-র ভাষা ও বয়ান থেকে গোলাপসুন্দরী যে-কারণে নিজেকে পৃথক করে সেখানে। সুহাসিনীর পমেটম আবার অন্তর্জলী বা গোলাপসুন্দরীর বয়ান-কৌশলে সুস্থির থাকেনি। গল্পের বুনোটেও সূক্ষ্ম প্রভেদ অকাট্য করেছেন। গদ্যে আবার ভাষার গতি অন্যরকম লাগে পাঠে। সুতরাং, গৌতম মণ্ডল এই-যে তাঁকে লেখকদের লেখক গণ্য করে অঞ্জলি দিলেন,—কমলকুমার তা ডিজার্ভ করেন। গৌতমের প্রথম বাক্যটিতে কেবল আপত্তি ওঠে মনে, যেখানে তিনি লিখেছেন : ‘পাঠকের মনোরঞ্জনের জন্য একটি অক্ষরও কমলকুমার মজুমদার লেখেননি।’ প্রশ্ন জাগে বটে এখানে,—পাঠক-মনোরঞ্জন কথাটিকে কী দিয়ে বুঝব বা পরিমাপ করব আমরা? সাহিত্যপাঠের অভ্যস্ত প্রবণতার কথা ভেবে হয়তো ব্যতিক্রম বোঝাতে গৌতম বাক্যটি লিখেছেন! এর বেশি অনুমান নয় সম্ভব।
তাঁর বাক্যটি আমাদেরকে বর্গীকরণে ঠেলে দেয়। একভাগে বিরাট সংখ্যক পাঠক রয়েছেন, কমলকুমারকে যারা ভুলেও পাঠ যাওয়ার কথা ভাবে না। সেই ঠেকা তারা বোধ করে না আদতে। তাদের কাছে তিনি দুর্বোধ্য বলেই গণ্য হয়তো! অন্যভাগে সংখ্যালঘু পাঠকের দেখা পাচ্ছি, যারা সুহাসিনীর পমেটম-এ দাঁত বসাতে হিমশিম খেলেও অন্তর্জলী যাত্রা, গোলাপসুন্দরী বা নিম অন্নপূর্ণা-র মতো গল্পে নিজেকে ভালোই মানিয়ে নিতে পারেন। উক্ত পাঠকদলে সংখ্যালঘু লোকজন রয়েছেন;—তাদেরকে আমরা এখানে লেখক হিসেবে কল্পনায় নিতে পারি। কমলকুমারের সকল রচনা যাঁরা পাঠ যাওয়ার তাগিদ বোধ করেন। পাঠক-মনোরঞ্জনের মামলায় গৌতম মণ্ডল কি তাহলে এই পাঠকদলে কমলকুমারকে বর্গীকরণ করছেন?

প্রশ্ন দাঁড়ায় এখানে,—কমলকুমারকে এভাবে একটি গণ্ডিতে ফেলে পরিমাপ কতটা সঠিক? এহেন পরিমাপ কি প্রকারান্তরে তাঁকে অবশিষ্ট পাঠকসমাজ থেকে পৃথক করার শামিল নয়? খেয়াল করলে দেখতে পাচ্ছি, নিজেকে উচ্চাঙ্গ সাহিত্যের ভোক্তা বলে ভাবেন ও দাবি করেন যেসব পাঠক, তাঁদের মনে ‘মনোরঞ্জন’ নিয়ে প্রবল শুচিবায় কাজ করে। এর প্রভাবে লোকপ্রিয় তথা পপুলার লিটারেচারকে তাঁরা হাতের তুড়িতে খারিজ করে বসেন! পরিহাস করেন হরহামেশা। অথচ ‘মনোরঞ্জন’ এক বিরাট ব্যাপার! লক্ষ-লক্ষ পাঠককে আকৃষ্ট করা মোটেও সহজ কিছু নয়। লেখায় এমন কিছু নিশ্চিত থাকে, যারা এই গণ-আবেশ তৈরিতে ভূমিকা রাখে সেখানে। অন্যদিকে, সংখ্যালঘু পাঠকশ্রেণির প্রিয় পাঠ্যবস্তু কি তবে ‘মনোরঞ্জন’ বহির্ভূত কিছু? সেগুলো কি ওই পাঠক-শ্রেণির জন্য সেখানে ‘মনোরঞ্জন’ সরবরাহ করে না? গৌতমের সাদাসিধে বাক্য থেকে প্রশ্নটির জবাব টেনে বের করা কঠিন।
কমলকুমার যখন লেখেন, নিজের লেভেলে বসে লেখেন। সেখান থেকে হুমায়ূন আহমেদ বা সুনীল-শীর্ষেন্দু-সমরেশ, আরেকধাপ নিচে শঙ্কর-নিমাই বা আরো নিচে কাসেম বিন আবু বকরের স্তরে নিজেকে নামিয়ে কিছু লেখা তাঁর পক্ষে সম্ভবই না। পার্থক্য সুতরাং ‘মনোরঞ্জনের’ নয়;—বোধির। অন্তর্জলী যাত্রা-র কথাই ধরি আমরা। সতীদাহ ও জাতপাতের সবটাই শ্মশানে এসে জীবন-মৃত্যুর নাটকীয়তায় বিধুর ও সংক্ষুব্ধ মোড় আখ্যানে। অদ্য একে উপজীব্য করে সুনীল-সমরেশরা যদি লিখতেন, তাঁরা নিশ্চয় কমলকুমারের ধাঁচে লেখার কথা ভুলেও ভাবতেন না। কমলকুমারের ভাষাটানে জীবন-নাটিকায় যবনিকা টানার সাধ পুরা করাটা তাঁদের জন্য অবান্তর হতে বাধ্য। ইচ্ছে থাকলেও তা মিটানো সম্ভব নয়। রামকৃষ্ণ পরমহংসের পরমভক্ত কমলকুমারের জীবনবেদ আর সুনীল-সমরেশের জীবনবেদ এক নয়; ভাষা-শৈলী ইত্যাদি কাজেই সেই অনুসারে পৃথক মোড় নিতো। তাঁরা তাঁদের পরিমাপে লিখতেন নির্ঘাত।
সুনীল-সমরেশের পাঠক পরিমণ্ডল বড়ো হওয়ার কারণ হলো ভাষা ও বয়ানের সহজতা। সহজতাকে নিছক পাঠক মনোরঞ্জক বলে ছাপ্পা বসানোর অধিকার আমরা রাখি কি-না তা এই প্রশ্নটি সেখানে উঠবে। কমলকুমার সচতেনভাবে ভাষার এরকম সহজতায় গমন করতে আগ্রহী ছিলেন না। ভাষাকে আক্রমণ করার মতলবে তিনি লিখেছেন। ভাষাদেহে নৈরাজ্য ঘটানোর মধ্য দিয়ে একে নতুন রূপে গড়েপিটে নেওয়ার ভাবনা যেখানে তাঁকে অবিরত তাড়া করেছে। ফলাফল কিছু খারাপ হয়েছে তা বলা যাচ্ছে না। গল্প-আখ্যান ও গদ্য লেখার নতুন ভাষারীতি তাঁর কাছ থেকে আমরা পেয়েছি বৈকি। অন্তর্জলী যাত্রা তাও সংযোগপ্রবণ ভাষায় রচিত। গোলাপাসুন্দরী নিটোল কবিতায় গুঞ্জরিত ভাষা-ব্যাকরণে পড়তে মনোরম। কিন্তু সুহাসিনীর পমেটম-এ পা-দিলে ছবি বদলায় নিমিষে। ভাষার চলন এখানে যথেষ্ট কৌণিক ও বন্ধুর। সহজপাচ্য রাখার জায়গা ছেটে দিয়ে লিখেছেন কমলকুমার।
ভাষাকে সংযোগের অভ্যস্ত তরিকাগুলো সুহাসিনীর পমেটম-এ এসে স্বেচ্ছায় ভেঙেছেন এই লেখক। জেমস জয়েসের মতো যেন-বা বিরামচিহ্ন বসিয়ে বাক্যকে পৃথক না-করে টানা শব্দে বুনে গেছেন। অপরিচিতিকরণে মোড় নিতে দিয়েছেন ভাষাকে। ভাষার অপিরিচিতিকরণকে যেখানে ‘মনোরঞ্জক’ বলে সাব্যস্ত করেছেন কমলকুমার। পাঠক তা ধরতে পারবে অথবা পারবে না;—এসব ভাবনা ও উদ্বেগ তাঁকে বিচলিত করেনি। জেমস জয়েসের ইউলিসিস-র মতো তিনিও এখানে চেতনার অতল থেকে উঠে আসা শব্দরাজির অবিন্যস্ত কিন্তু সুঠাম বিন্যাসের হিসাব মাথায় নিয়ে লিখেছেন সুহাসিনীর পমেটম। জয়েসের ভাষায় মর্মরিত ধ্বনিগুঞ্জনের মতোই যেটি সাংগীতিক। সবটাই এখানে লেখক কীভাবে ‘মনোরঞ্জন’কে দেখছেন, এর ওপর নির্ভরশীল। যেখানে, কমলকুমার আর সুনীলে ভাগাভাগির কিছু নেই। ভাষায় ভাংচুর ঘটিয়ে কারো আনন্দ তুরীয় হয়ে ওঠে। ভাংচুরে না-গিয়ে অন্য কোনো ফ্রেমে বসে যিনি লিখছেন, তিনি হয়তো সেই ফ্রেমে খুঁজে পাচ্ছেন ‘মনোরঞ্জন’।

কমলকুমারের ক্ষেত্রে ঘটনা এই দাঁড়াচ্ছে অবশেষে,—তিনি জানতেন, তাঁর লেখা গণপাঠকের পাতে তুলে দেওয়া মুশকিল। খেয়াল করলে দেখছি,—সুনীল গাঙ্গুলী আনন্দ পাবলিশার্সের ব্যানারে গল্পসমগ্র প্রকাশ করার আগে পর্যন্ত কমলকুমারের ছোটকাগজে লিখেছেন মূলত। একটি ছোট কিন্তু নিরীক্ষপ্রবণ রচনায় আগ্রহী পাঠ-পরিসরে বিচরণ করেছেন মর্জিমাফিক। পাঠ-পরিসরকে নিজের জন্য ‘মনোরঞ্জক’ ভেবে নিয়েছেন তিনি। সুনীলরা আবার গমন করেছেন বড়ো পাঠ-পরিসরে। আমাদের সংজ্ঞায় অ-প্রাতিষ্ঠানিক ও স্বাধীন ‘ছোটকাগজ’-এ লেখার মোহ জয় করে প্রাতিষ্ঠানিক বা বাজারি পরিসরকে ধারণ করে যেসব প্রকাশমাধ্যম, সেগুলোয় কলম চালিয়েছেন দুর্বার। খালাসিটোলায় মদের ঠেকে কমলবাবুর সঙ্গে গুলতানি এক্ষেত্রে সুনীলমনে প্রভাববিস্তারী হতে পারেনি। সুনীল তাঁর মতো করে সুনীল হওয়ার সিদ্ধান্তেই অটল ছিলেন। কমলকুমার হওয়ার সাধ পুরা করতে নেমে জানমান খোয়ানো তাঁর পোষায়নি। কমলকুমার থেকে তিনি রস ছেকে নিয়েছেন, গিলেছেন দেদার, কিন্তু নেশাতুর খোঁয়ারিতে মজে কমলকুমারের নকলি হওয়া-যে আত্মহত্যার নামান্তর, এই হিসাব টনটনে থেকেছে সেখানে।
এখন, এই-যে সুনীল-হুমায়ূনরা বৃহৎ পাঠক ধরতে প্রচুর লিখলেন, সেটি কি কেবল পাঠক-চাহিদা মেনে লিখলেন? নাকি তাঁদের মনে মজ্জাগত ছিল এই প্রবণতা,—পাঠকের কোনো বলয় আমি মানব না! কমলকুমারের সঙ্গে যতই ওঠবস করুন-না-কেন, বৃহৎ পরিসরে লেখার লোভ সুনীলকে তাতিয়ে তুলেছিল। বড়ো পরিসরে গমনের কারণে তাঁর ওপর চাপ পাহাড়সমান হতে দেখেছি আমরা। সুনীল বা হুমায়ূনের ক্ষেত্রে চাপটা এবার কল্পনা করা যাক ক্ষণিক। প্রকাশক নভেলের বায়না নিয়ে বসে আছে। পুজো বা ঈদ সংখ্যায় চার-পাঁচটা লেখা নামাতে হবে ঝটপট। চাপ সামলাতে সুনীলকে আমরা গড়ে আটারো ঘণ্টাও লিখতে দেখছি। একটি প্লট থেকে অন্য প্লটে তিনি যাচ্ছেন অনেকটা বেহেড মাতালের মতো। ভাবনা, কল্পনা, ভাষা ও বয়ানে থিতু হওয়ার সুযোগ নেই একরতি। ‘মনোরঞ্জন’ এখানে তাঁর ঘাড়ে চড়ে তাণ্ডবনাচ নাচছে। একে এখন সামলানো চাট্টিখানি কথা নয়! কমলকুমার এদিকটা আগে ভেবেছেন বলে বুঝেশুনে ছোট পরিসরে ‘মনোরঞ্জন’-র ঠিকা নিয়েছিলেন।
সুনীল-শীর্ষেন্দু-সমরেশরা যদি পরপর পাঁচটা লেখেন, তার চারটা দায় পূরণের খাতিরে তাঁদেরকে লিখতে হয়েছে, একটা-যে এর মধ্য দিয়েও বেরিয়ে আসেনি তা কিন্তু নয়। কমলকুমারের সঙ্গে পার্থক্য,—তিনি এই চাপ বুঝেশুনেই ঘাড়ে নেননি। মর্জিমতো লিখছেন। ছাপানো দরকার মনে হলে ছোটকাগজে ছেড়ে দিয়েছেন। লেখনক্রিয়াকে এভাবে উপভোগ করছেন কমলকুমার। সুনীলরা ওই কাজটা বড়ো পাঠকবৃত্তের খোরাক মিটাতে লাগাতার লেখা সরবরাহ করার মধ্য দিয়া সারছিলেন। প্রেক্ষাপট সুতরাং ভিন্ন। বৃত্ত ভিন্ন। এবং, এ-কারণে পাঠকের ‘মনোরঞ্জনের’ জন্য একটি অক্ষর কমলকুমার মজুমদার লেখেননি টাইপের কথাবার্তা এক্সপাঞ্জ করা উচিত।
কমলকুমার যখন লিখছেন, আমরা নিশ্চিত বলতে পারি,—কল্পনায় সক্রিয় পাঠককে বাদ দিয়ে লেখেননি। অন্যথায় লেখার কোনো অর্থ দাঁড়ায় না। নিজেকে নিজে তৃপ্ত করতে লিখি, কথাটি বলা যায় বটে, আদতে অধিকদিন এভাবে আত্মতৃপ্তির দোহাই দিয়ে লেখা যায় না। একটা-না-একটা পাঠকবৃত্ত কমলকুমারের মনে কাল্পনিক হলেও সক্রিয় ছিল নিশ্চয়, যাকে ভেবে লেখার প্রেরণা পেয়েছেন।
সুনীলদের জন্য অন্যদিকে চাপটা বাস্তবিক। পাঠক সত্যিকারভাবে সেখানে আছে, এবং তাদেরকে মনোরঞ্জন করতে না পারলে মামলা ফিনিশ। এখন এই চাপ বাজে লেখা যেমন অজস্র পয়দা করায়, সেখান থেকে আবার ভালো লেখা বের হয়। বাজের পরিমাণ বেশি হওয়ার কারণে ভালোগুলা চাপা পড়ে। পপুলার লেখকদের জীবনে এই ঘটনাটি মর্মান্তিক। হুমায়ূনের খাদক, জলিল সাহেবের পিটিশন নামক গল্প অথবা মধ্যাহ্ন-র আখ্যান নির্ভর বয়ানকে এভাবে আমরা বেমালুম ভুলে বসে থাকি।
কমলকুমার এদিক থেকে ভাগ্যবান। তাঁকে যারা পড়ছেন ও ‘মনোরঞ্জন’ বোধ করছেন, তারা এর কিছু বিস্মৃত হয় না। সংখ্যায় অল্প হতে পারে, কিন্তু তাঁর পাঠক সলিড। পপুলিস্ট লেখকের পাঠক এদিক থেকে অনির্দিষ্ট, অচিহ্নিত ও অনিশ্চয়। এখানে এসে ব্যবধান মূলত অকাট্য মনে হতে থাকে। মনোরঞ্জনের সঙ্গে যার কোনো সম্পর্ক নেই।
লেখা মাত্রই ‘মনোরঞ্জন’। ‘মনোরঞ্জন’-এ নিবেদিত লেখার পাঠক বৈশিষ্ট্য বিচারে কমবেশি হতে পারে। ‘মনোরঞ্জন’ যদি না থাকে তাহলে লেখার সমস্তটা বাজে মাল। সুতরাং, ‘মনোরঞ্জন’কে আপেক্ষিক ভাবা সংগত, এবং অবশ্যই ইতিবাচক অর্থে একে পাঠ যাওয়ার সময় হয়েছে।
. . .

. . .



