পোস্ট শোকেস - সাহিত্যবাসর

নভশ্চিল লাইলাক-১ : হেলাল চৌধুরী

Reading time 4 minute
5
(10)

কবিতা সিরিজ : নভশ্চিল লাইলাক : পর্ব-১
রচনা : হেলাল চৌধুরী

Sunita Williams; Image Source: Collected; Google Image

নভশ্চিল

একদিন মানুষ — বুঝি
নক্ষত্র ছোঁবে, মঙ্গলে যাবে, চাঁদে ঘর বানাবে
ধান যব পাটের চাষ করবে, হবে লেটুস গাজরের খেত
আকাশে ফোটাবে তারা সবুজ আর ফলসের মাঠ…

যেমন ফোটালেন সুনিতাবুচ প্রিয় ফুল জিনিয়া
আট দিনের সফর সিঙাড়া সসে তাদের
কেটে গেল গবেষণা ঘোরে দুইশত সত্তর দিন
সময়ের অনাপচয় শূন্যমাধ্যাকর্ষণ শক্তির মহাশূন্য পাঠ…

ঋজু আর কঠিন দাঁড়চুল ফিরলেন সুনিতা
বুচের হাতে হাত মিলিয়ে শুঁকলেন ভূখণ্ডে মাটির ঘ্রাণ
অবশেষে বুকউঁচিয়ে বললেন
উদ্ভাবন করে এলেন তারা মহাশূন্যে ভেজি;
ক্যাপসুল ভেসে ওঠে ডলফিন ঠোঁটে
একদা হারিয়ে যাওয়া
স্টারলাইনের দুই নভশ্চিল ভূখণ্ড ছুঁয়ে আজ বিশ্বে
ডানা ঝাড়লেন বুচ উইলমাের সুনিতা উইলিয়ামস।
. . .

তোমার একফালি আপেল চেয়ে

ঘাড়ে ব্যাথা
পিঠে ব্যাথা
ব্যাথা গিঁটে গিঁটে এবং হাড়ে ও হাড়ে
ব্যাথা পামাথাতক আজ তোমার অসুস্থ শরীরে…

দুপুরে জড়িয়ে আছে এখনও কবেকার সন্ধ্যা
আকাশে নক্ষত্রদের নিদারুন মন্দা
পৃথিবী আবারও যুদ্ধে জুজুর নগর
ঝাপটে ধরেছে অজস্র খচ্চর, নর্দমার শুয়োর…

তোমার ভূখণ্ড বিদ্ঘুটে মাঠ
পাকা জলপাই রঙে মাখা তিতকুটে আকাশ;
আজ বিধ্বস্ত
নগরের শিশুদের
বিছানায় রক্তাক্ত অজস্র নিষ্পলক চোখ
তারা
তোমার
একফালি আপেল চায় মেঘেদের পেয়ালায়।
. . .

লাইলাক

সূর্য কি চেয়েছে
তোমার জরায়ুর বন্ধ্যাত্ব
কৃষকের আঙুলে লাঙলের ফলা
মেঘেদের বুকে জলাবদ্ধ বৃষ্টি জমিনের নিদারুণ খরা…

কবিতা কি চেয়েছে
ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্তবক
সুখপাঠ কাব্য
পাঠকের পাঠানুভূতি সূর্যের রোদ্দুরে ভেজা রোদ ভরা…

বোশেখ জানি
সবচে নিষ্ঠুর মাস
মরা জলাশয়ে ফোটায় যদিও জারমনি
বাতাসে ওড়ায় জমিরুনের জারুল কনকচূড়া
বানে ভাসায় জমিরুদ্দির লাঙল খড়ের গোলা
তবুও কবির নির্জলা পুকুর
শরীরে মাংসের বুদবুদে
কবিতার জরায়ুজ ঘ্রাণে আকাশে ওড়ায় লাইলাক।
. . .

Sudhindranath Dutta; Image Source: Collected; Wikipedia

উড়ায়েছি আমি আকাশে সুধীন্দ্রনাথ

এই পথে আমি কাল-কাল হেঁটে গেছি
বয়সের ভোরে সন্ধ্যায় জীবন খাসিয়ার আসামি ধাচের
রাঙা ঘর ছুঁয়ে; হেঁটে গেছি সোনালি ফসলের ফাঁকে
সবুজ ঘাসের আল ধরে হেমন্তের শেষে নাড়ার আগুনের শিষে…

বর্ষায় যেখানে দেখেছি
জলঢোঁড়ার গলিত ক্লেদাক্ত শরীর
ধূসর ইঁদুরের স্থবির আকাশ…
মানুষের নদীও থেমে গেছে তখন জলঢোঁড়া আর ইঁদুরের দেহে…

আমরা কি তবে ভুলে যাব গল্প
নদী আর আকাশের সংসার
গলিত ক্লেদাক্ত মাঠ স্থবিরতার
আগুনের শিষে নাড়ার শরীর
সোনালি ফসলের সম্ভার;
ভুলে যাব কি তবে গড়ের ঘাটের নিষিদ্ধ টিলা…
তবু আজ উড়ায়েছি আমি আকাশে সুধীন্দ্রনাথ; বারবার
এই পথে আমি হেঁটে যাব সংস্কার বুকে নিয়ে সুধীনের কবিতার।
. . .

জোছনা ও আলোয় অবসর

তোমার দেহের জোছনায় আমি
চাঁদের যৌবন যাই ভুলে
তোমার আবিরে মাখা শরীরের হলুদ ফুলে
অন্ধকার কাটে ঘোর আমার চাঁদের জোছনা কালে…

আমাদের সেই ছেলেবেলার ডাক বাংলোয়
বিকেলবেলার বন্ধু কাঠগোলাপের গাছ
জোছনায় স্নান সারে নগ্নতায়
আজও তোমার শরীরিণী কুয়াশার শিশিরের জলে…

আমরা হারিয়েছি সন্ধ্যা হারিয়েছি ভোর
হারিয়েছি তোমার কার্তিকের ভোরের কাক
চড়ূইদের গৃহস্থালি উল্লাস, আমাদের নয়াগাঙ ধানসিঁড়ির যৌবন
প্যাঁচার নরম ধূসর পালক, রূপালি মাঠে জোছনা
হেমন্তে পাকা আমনে নবান্নের ঘ্রাণ, তোমার
রূপসী বাংলার সবুজ নদীর ঢেউ, সরিষা ফুলে হলুদ মাঠ
হারিয়েছি নাড়ার আগুনে মখমল শীতকাল, বালকবেলার
জোছনা ও আলোয় অবসর, সূর্য ও চাঁদের মখমল উত্তাপ।
. . .

বৃষ্টি ও তুমি

কতদিন হয়
বৃষ্টি ছুঁই না আমি
বৃষ্টি
তুমি বুঝি রূপকথার কোনও নারী…

কতদিন হয়
দেখি না তোমাকে আমি
তুমি
বুঝি আকাশে যক্ষের জমাট বারি…

বৃষ্টি ও তুমি
হাঁটো না কতদিন হয়
এ-পাড়ায় জরায় খরার উঠোনে,
আসো না একবার
বৃষ্টি ও তুমি
মরার উঠোন ভিজে নিতে জলে;
আহা! কতদিন হয় — আমার
দেখা নাই বৃষ্টি কিবা তোমার।
. . .

ফিরে এসো তুমি ভোর

ফিরে এসো তুমি ভোর নির্জন ধূসর বক
সন্ধ্যায় বাঁশের ডগায়
জোনাকির আলোয়, নিবিড়
অন্ধকারে আমাদের গোয়াল ঘরের দাওয়ায়…

ফিরে এসো তুমি গোটানো গ্রীবায়
গোধূলি মায়ায় করুণ আলোয় বিষণ্ণ ছায়ায়
হলুদ ঠোঁটে, এসো মিতিনের পথ চেয়ে এই সন্ধ্যায়
ফেরারি সূর্যের আলোয় ভোরের জানলায়…

সন্ধ্যা জাগুক
সকাল বেলার রোদ মেখে
দুপুরের আবির মাখুক কচি পেয়ারার শরীর
মিতিনেরা উড়ুক ধূসর বকের ডানায়
হলুদ জোছনা মাখুক রাতের অন্ধকার
আমরা তো চাই
ফিরে এসো তুমি ভোর, আবারও
ধূসর ডানায় নির্জন বক হলুদ রোদে এই সন্ধ্যায়।
. . .

অশোক বোধোদয়

নদীর বুকে একদিন ভেসে ওঠে বালির লাশ
নদী শেষ করে তার গল্পের আয়োজন
মানুষ ও নদী
চরাচরে কতকাল ধরে একাকারে করে সুখ…

আমাদের চোখে শরীরে ও হাড়ে
বৃষ্টিতে চারপাশ সবুজ রঙে বাড়ে
আমাদের আকাশ হরিতাভ, হরিরাভ আকাশের মেঘ
মৃত্তিকা বৃষ্টি জলে তৃণমূলে তবে উন্মুখ…

সরিষার খেতে
চাঁদের রূপে
রাতেও রোদ্দুর ফোঁটে
আমরা তখন নদী ও নারী রোদফুলে বুকভরা ঝিনুক;
আমাদের ডানায়
ফড়িঙের আস্ফালন
নলিমাছি বিতাড়ন
আমাদের নদী ও মানুষ তখন বোধোদয়ে অশোক।
. . .

তুমি আমার কষ্টচাঁদ

তুমি আমার রক্তে আঁকা কষ্টচাঁদ
হারিয়ে যাওয়া — বউয়ের নাকের নোলক
অন্ধকারের আকাশে জং ধরা — ঘোড়ার বাঁকা নাল
ফাঁকা ডিশে একফালি আপেলে বিমর্ষ ভরা নষ্ট আকাশ…

তুমি আমার রক্তে আঁকা কষ্টচাঁদ
শূন্য হাঁড়িতে আগুনের খরায় মরা উন্দাল; ঘনঘোর
অন্ধকারে জোনাকির আলোয় জরা; নষ্টমানুষদের
গানপাউডারে আবালবৃদ্ধবনিতা ও শিশুদের দগ্ধ শরীর…

তুমি আমার রক্তে আঁকা কষ্টচাঁদ
ব্যর্থ পিতার দরিদ্র মানিব্যাগ
অন্ধকারের উঠোনে
আকাশে চেয়ে
ভিখিরির মতো দাঁড়ানো অযোগ্য পুরুষ
তার করুণ আকাশ বারুদে ভরা
শূন্য পকেটে নিদারুণ হা-হুতাশ গতরে ছেঁড়া পাঞ্জাবি!
. . .

চলো যৌবনে আবারও

অবন্তিকা, তুমি কি আজও রাত জাগো
এখনও কি দুপুরে একাকী রোদফুল বনে হাঁটো
প্রজাপতির ডানায় সূর্যের ঠোঁটে মধু চেয়ে
পাখনায়, আবিরের রাঙা পরাগ পাতায় পাতায় রাখো…

অবন্তিকা, তুমি কি আজও রাত জাগো
শরৎ-এর বইয়ে, চোখে প্রজাপতির ডানা আঁকো
উড়ে উড়ে হারিয়ে যাও চেরাপুঞ্জির মেঘে হয়ে
বৃষ্টির জলে হাড়ে পাহাড়ের সাদা সাদা কাশফুল মাখো…

এই বেলা সন্ধ্যায় — এখনও মনের দুপুরে
এসো ফেরারি স্নান সারি উজ্জয়িনী পুকুরে..
এসো আমরা দুজনে আজ হয়ে যাই ডুবুরে
দেখে নিই হাঁসঠোঁট জলের মুকুরে
পড়ে নিই, শুয়ে থাকা আমাদের গল্প অজস্র যৌবন
বইয়ের স্তূপ!
অবন্তিকা
আমরা কি পারি না ফিরে যেতে, যৌবনে আবারও!
. . .

Sudhin Dutta recited his poem Orchestra, Part1; Source: Rajib Chakraborty YTC

. . .

লেখক পরিচয় : এখানে অথবা ওপরের ছবিতে চাপ দিন

. . .

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 10

No votes so far! Be the first to rate this post.

Contributor@thirdlanespace.com কর্তৃক স্বত্ব সংরক্ষিত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *