কবিতা সিরিজ : মেকদাদ মেঘ
“মনদরজার খিল”
পাতালের লৌকিক সাঁতার-২

অগ্নিদণ্ড দাও নরম মুঠোতে
শিল্পময় মুঠোর উৎসবে
পাখির মতোন উষ্ণস্তন
ব্যাঘ্রজিভ তপ্ত অনুভবে,
আসছে বৈশাখী তীব্র ঝড়
ফুলের বোঁটায় নোনা জল
আশ্বিনের দমকা হাওয়া
গহিন পাতালে যাই চলো
তালে তালে চলছে জাহাজ
দেহের নদীর বাঁকে বাঁকে
ভেঙে যাচ্ছে গলে যাচ্ছে যেন
আলিঙ্গনে উষ্ণ ঘূর্ণিপাকে
শঙ্খ ধুলো কাঠামো ত্রিশূল
অগ্নিদণ্ডে কাঁপে পাতালের ফুল।
. . .
১২
একদিন তুমি হবে নিঃশ্বাসের শ্বাস
তীব্র আলিঙ্গনে যাবে বারোমাস
দুজনার দেহ নদী বহে সমান্তরাল
রচনা করবে ঠিক প্রেম মগ্নকাল,
একদিন তুমি হবে যমুনার জল
সেখানে ভাসাবো নাও ভেজাবো আঁচল
তুমি হবে নীলগিরি নীল হিমাচল
কামেমগ্ন দেহ পাবে বৈদ্যুতিক কল।
সেই দিন খুব কাছে মদিরা মাতাল
সেই দিন একদিন বসন্ত রঙিন
সেই দিন অমাবস্যা পূর্ণিমার জাল
প্রতি অঙ্গ চায় সত্যি কেবল সঙ্গিনী
সেই দিন একদিন অগণিত কাল
দেহের বনানী কেঁপে কেঁপে ওঠে পাল।
. . .
১৩
লাগাতেই পারো মন-দরজার সকল কপাটে তালা
কড়া নাড়ে যদি হৃদয়ে হৃদয়ে পরাণে লাগবে টান
পিরিতি রতন পিরিতি যতন পিরিতে রয়েছে ফান
ক্রমে ক্রমে আসে ভালোবেসে হেসে কপাট খোলার পালা
লাগাতেই পারো মানুষে মানুষে অগণিত কিছু দ্বন্দ্ব
লোভ হিংসা ঘৃণা, কাম ক্রোধ নিয়ে জমাইতে পারো খেলা
বেদিশার বেশে ইন্দ্রিয়ের দেশে ছয় রিপুদের চ্যালা
জেনে রেখো তবু ছড়াবে মানুষ মানুষ ফুলের গন্ধ।
লাগাতেই পারো মনের দরজা থামাবে কি করে ঢেউ
মনদরিয়ায় উতালপাতাল চিরায়ত সুর শুনি
মননে মগজে বেজে ওঠে তার মুখরিত প্রতিধ্বনি
মন দিয়ে মন জেনে নিতে হয় প্রেম ছাড়া জানেনাতো কেউ,
লাগাতেই পারো ছলাকলা প্রেমে অপ্রেমের চারাগাছ
প্রেমে আছে সুধা অপ্রেমে বেহুদা ময়ূর করে না নাচ।
. . .
১৪
ইতা কিতা করো তুমি জিতা তনু যতন না করে
মিছামিছি মূল্য দেও বিনামূল্যে কয়জনে কিনে?
নিজেরেই ভালোবেসে গান গাও হৃদয়ের বীণে
বুঝে নিও প্রেম-প্রীতি বুঝে নিও আড়াই অক্ষরে,
ইতা কিতা করো তুমি কার লাগি বান্ধো বাড়িঘর
কার লাগি মালা কিনো কার গলে পড়াইতে চাও
জগতের লীলাখেলা কয়জনে বুঝি বলো বাও
দেহতরী ভালো রেখো তা না-হলে মিছে এ-নগর।
ইতা খালি ভুঙ ভাঙ কুনিব্যাঙ করে লাফালাফি
কেউ বলে কিছু নায় যা হবার হয়ে গেছে ছাই
অনেকেই বলে যায় শূন্যতার আদি অন্ত নাই
কেউ কেউ বলে যায় কুচ নেহি কুল্লু মাফি,
ইতা তারে কিতা কই পোড়া মন লইবনি জোড়া
ভাঙা মনে দাগ থাকে যদিও তা প্রেমানলে পোড়া
. . .

১৫
যে তোমারে ভালোবাসে কেনে তারে দূরে ঠেলে দাও
যে তোমার অপেক্ষায় বসে থাকে সারা দিনমান
প্রেমের পেয়ালা হাতে নক্ষত্রের নিচে গায় গান
চাঁদের আলোক দুধে ভালোবাসে স্নান সেরে নাও,
যে তোমারে ভালোবাসে দুঃখ ঠেলে পাহাড় সমান
মনে করে তোমার সম্মুখে তার সুখ-শান্তির সকাল,
হৃদয়ে দূরত্ব এলে চারপাশে হাসে নিঃসঙ্গতার জাল
হৃদয়ের সওদায় করো সুতৃষ্ণার চিরায়ত মধুপান।
ভালোবাসা নদনদী সমুদ্র সাগরে বহমান
প্রেম তার জল মাটি উড়ে উড়ে ঘুরে চক্রাকারে
এমন নিয়তি লেখা ক্লান্ত প্রাণ খণ্ডনের ভারে
করে নিতে বিষবাষ্প রোধে অমৃতের সুধা পান,
এইখানে যারা আছে তারা যারা হয়রে প্রেমিক
সূর্যের আলোকরেখা ছুঁয়ে যায় সবগুলো দিক।
. . .
১৬
মনদরিয়ায় উতাল-পাতাল ঢেউ লেগে থাকে প্রাণে
হিংসার খাঁচায় ঘৃণা লোভে ক্ষোভে ঢেলে দিতে কাদাজল
পরাজিত চিহ্ন অঙ্কিত করো না বৃথা কোনো অভিমানে
মনদরিয়ায় মনের সোয়ারি পেতে পারে মনোবল,
মনদরিয়ায় সাধনার ঢেউ চিঠি দেয় দোলা দিয়ে
পেয়েছো যা কিছু দিয়েছো কি কিছু সমানে সমান
মনদরিয়ায় যাই ভেসে যায় আলোতেই দৃশ্যমান
মন দিয়ে মন কিনে কয়জন বলে যেয়ো কাছে গিয়ে,
মনদরিয়ায় ছায়া পড়ে যায় ছায়ায় কায়ায় মিশে
শোষণের স্রোত দূরে ঠেলে দিতে চেতনায় দাও শান
জোড়া জোড়া ডানা অপার আকাশে হয় যেন আগুয়ান
গহিনের ঘুম ভেঙে যায় জানি হৃদয় পাখির শিসে
মনদরিয়ায় জগতের জল তুলে যত কলতান
মনদরিয়ায় ঢেউয়ে ঢেউয়ে শুনি মন্ত্রমুগ্ধ গান
. . .
১৭
পৃথিবীতে দিবস সীমিত তবু দিবসের শেষ নেই
এ-কথা প্রেমিক স্নিগ্ধ কন্ঠে প্রেমিকাকে বলেছিল যেই
প্রেমিকা উত্তরে বলে শুভকর্মে দিবসতো থাকবেই
ভালোবেসে শুদ্ধ হও যদি ভালোবেসে যতিচিহ্ন দেই
পৃথিবীতে তিনভাগ জল তবু লোকে জল কিনে খায়
অর্থ অনর্থের গেরস্থালি ক্রমান্বয়ে বাগান সাজায়
শ্রমের মজুরি সংশোধনে খুঁজে নিও মহৎ উপায়
নৃত্যরত বিনিময় প্রথা কত লোক নৃত্য করে যায়,
প্রেম-প্রীতি করুণার জল দেখেছে কি মুক্ত মহাকাশ
ক্ষুধার অনলে পুড়ে যাঁরা তারা যেন ব্যাথার সন্ন্যাস
ভালোবাসা উড়ো চিঠি প্রেমে ছুঁয়ে যায় কাল বর্ষ মাস
মানুুষে মানুষ ভালোবাসলে হৃদয়ে ফুটবে কার্পাস,
সমস্বরে বলে যাই এসো সবাই — বিশ্ব মানবতা মুক্তি পাক
গলিত লালিত পুঁজিতন্ত্রের সাম্রাজ্যবাদ নিপাত যাক
. . .
১৮
কেমন জীবন তাঁর অগ্নি অগ্নিরথে ধাবমান
জলমাটি হাওয়ায় বাতাসের তীব্র তানপুরা
সুর তুলে বহে যায় কেউ কেউ হয় দিশেহারা
সিনায় সিনায় প্রেম গহিনে গহিনে পড়ে টান
মাহাকাশে মহাস্রোত মহাবিশ্বে জটিল পুরান
কি করে বুঝাই তারে কিছু পেতে হলে লাগে প্রেম
মানুষকে ভালোবেসে পেরুতে হয় কালের হেরেম
মানবসত্তার দেশে দেখা যায় অন্তরাত্মার বাগান,
জীবনের পালাগানে দেখি যত বাধা ব্যাবধান
কী করে বুঝাই তাঁরে শ্রেণিচিন্তা পুঁজির ফারাক
উদ্দেশ্য অটুট রেখো সময় বদলে যায় যাক
বেহায়া মনরে বলো চিনে নিতে পীরিতের ফান
কে তারে বুঝাবে বলো নিজে যদি নিজেরটা না বুঝে
যে যারে বেসেছে ভালো সেই তারে খুব বেশি খোঁজে।
. . .
১৯
মিছা মায়া দূরে ঠেলে ডালের বিশটি ফুল দেখো
কী সুন্দর ফুটেছে পুষ্প মায়ার বৃক্ষের ডালে ডালে
জীবনের পাঠশালা থেকে শেখো দেখো আর লেখো
নামের মালায় নাম, যা থাকুক তোমার কপালে
দমে দমে নাম নিয়ে খুঁজে নিও ভেতরের জন
নিজেকে নিজেই চিনো তাজা করো এই তনু মন
কে তোমাকে ভালোবাসে ভেবে দেখো রঙিন মনন
আধখানা চাঁদ হয় আধখানা চাঁদের স্বজন,
মিছামিছি ডুবিস না পুথি ও কেতাব ‘নাকো’ বুঝে
মিছা প্রেমে ডুব দিলে বাধা পায় আত্মার সংযম
মানুষ যতটা ভাবে তার চেয়ে বুঝে কিছু কম
আত্নার গোপন টানে আত্মা আত্মকেই খোঁজে।
মহাবিশ্ব মহাকাল মহাঘূর্ণনের এই পালা
চক্রাকারে দেখে যাই নিয়মিত নিঝুম নিরালা।
. . .

. . .

লেখক পরিচয় : এখানে অথবা ওপরে ছবিতে চাপুন
. . .


