পোস্ট শোকেস - সাম্প্রতিক

‘পরম নৈতিক’ আলী লারিজানির ইরান : মোস্তাফিজুর রহমান জাভেদ

Reading time 12 minute
5
(15)

মিনহাজ ভাই আলী লারিজানিকে নিয়ে যে-লেখার অবতারণা করেছেন (*পরিশিষ্টে সংযুক্ত), তা কিছুটা হলেও বিমর্ষ করে যায়। কেন এই অনুভূতি হচ্ছে, তার গভীরে যাওয়ার চেষ্টা থাকবে যথারীতি। শুরুতে স্বীকার করতে হয়,—আলী লারিজানির মৃত্যু বর্তমান ইরানের জন্য বিরাট ক্ষতি। অনেকে বলছেন,—খামেনির মৃত্যুর চেয়েও বড় ক্ষতি হয়েছে তাঁকে হারিয়ে। কেননা ইরানি শাসকগোষ্ঠীর ভেতরে এমন মানুষ খুব বেশি ছিল না, যারা একইসঙ্গে রাষ্ট্রের কৌশল বুঝত, দার্শনিক ভাষায় কথা বলতে পারত, আন্তর্জাতিক বাস্তবতা ধরতে পারত, আবার ক্ষমতার কেন্দ্রেও নিজেকে গ্রহণযোগ্য রাখতে জানত। তাঁকে শুধু একজন আমলা বা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে ভাবাটা ভুল হবে। একটি সেতু হিসেবে তিনি সেখানে কাজ করছিলেন;—আধুনিক শিক্ষায় গড়া, পশ্চিমা দর্শনে প্রশিক্ষিত, অথচ ইসলামি প্রজাতন্ত্রের শাসনকাঠামোর ভেতরে কার্যকর এক জটিল বুদ্ধিজীবী ও রাষ্ট্রকর্মী রূপে যাঁকে আমরা বিবেচনায় নিতে পারি। এ-কারণে তাঁকে হারানো মানে ইরানি প্রজাতন্ত্রের বৌদ্ধিক ও কূটনৈতিক ভারসাম্যটি ভেঙে যাওয়া।

আলী লারিজানির ব্যক্তিত্বের সবচেয়ে লক্ষণীয় দিক ছিল নীরব সংযম। তিনি প্রচারমুখী ছিলেন না। জনতুষ্টির রাজনীতিও করতেন না, অথচ ক্ষমতার ভেতরে তাঁর উপস্থিতি যথেষ্ট কার্যকর ছিল। ইরাকের নাজাফে তাঁর জন্ম। প্রভাবশালী ধর্মীয় পরিবারে বড়ো হয়েছেন, যদিও কেবল হাওয়া নির্ভর (ধর্মীয় শিক্ষাকাঠামো) জগতে সীমাবদ্ধ থাকেননি। শরিফ বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত ও কম্পিউটার বিজ্ঞানের পাঠ শেষ হলে তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ে পশ্চিমা দর্শন, বিশেষত জার্মান দার্শনিক ইমানুয়েল কান্টকে নিয়ে উচ্চতর পাঠ সম্পন্ন করেন। এই পথচলা তাঁকে ইরানের বহু ক্ষমতাধর ধর্মীয় রাজনৈতিক চরিত্র থেকে আলাদা করেছিল। কারণ, তিনি কেবল বিশ্বাসের ভাষায় নয়, যুক্তির ভাষায় কথা বলতে জানতেন। এখানেই তার স্বাতন্ত্র্য নিহিত ছিল। আলী লারিজানি বুঝতেন,—আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থাকে ন্যায্যতা দেওয়ার জন্য একটি চিন্তাকাঠামো লাগে।

তাঁর লেখালেখির দিকে তাকালে বোঝা যায়, কান্টকে কেবল একাডেমিক আগ্রহ থেকে তিনি পাঠ করেননি, বরং আধুনিক জ্ঞানের ভিত্তি, নৈতিকতার সর্বজনীনতা ও জ্ঞান প্রতিষ্ঠার শর্তগুলো তাঁকে আকৃষ্ট করেছিল। তা-সত্ত্বেও আলী লারিজানি ব্যবস্থাগত সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করতে পারেননি, আর এটি হচ্ছে সবচেয়ে বড়ো ট্রাজেডি! কান্ট যেখানে ব্যক্তির যুক্তিবোধকে নৈতিকতার কেন্দ্র রূপে দেখেছেন, লারিজানি ধীরে ধীরে ব্যক্তি থেকে সরে গিয়ে সমষ্টিকে কেন্দ্রে নিয়ে এসেছিলেন। তাঁর ‘সমষ্টিগত আত্মা’ বা সমাজের স্বতন্ত্র সত্তার ধারণা আসলে নিরীহ কোনো তত্ত্ব ছিল না। এর ভেতরে এমন একটি নৈতিক দিক আছে, যেখানে ব্যক্তি নিজে চূড়ান্ত নয়, বরং বৃহত্তর সমষ্টি;—রাষ্ট্র, উম্মাহ, রাজনৈতিক কাঠামো সেখানে বাস্তবতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল।

Immanuel Kant on Ali Larijani mindframe collage; Image Source: Collected; @thirdlanespace.com

নৈতিকতা, আলী লারিজানির ভাবনায় ব্যক্তিগত বিবেকের প্রশ্ন না-থেকে সমষ্টিগত বেঁচে থাকা, স্থিতি, নিরাপত্তা ও ঐক্যের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তাঁর এই দর্শনচর্চা ইরানি রেজিমকে শক্তিশালী করতে ভূমিকা রেখেছে। সরাসরি দমননীতির তত্ত্ব তিনি লেখেননি, কিন্তু একে এমন এক ভাষা দিয়েছেন, যার ভেতর দিয়ে রাষ্ট্র নিজেকে নৈতিক প্রকল্প হিসেবে ভাবার শক্তি অর্জন করেছিল। এর ফলে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানে নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা, এমনকি কঠোরতা নৈতিক বৈধতায় উপনীত হওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছিল।

এই জায়গায় এসে লারিজানির প্রয়োজনীয়তা ইরানি শাসকগোষ্ঠীর কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি ছিলেন সেই মানুষ, যিনি একদিকে আইআরজিসির আস্থা অর্জনে সক্ষম হয়েছিলেন, অন্যদিকে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের ভেতরেও গ্রহণযোগ্য ছিলেন। একদিকে তিনি পারমাণবিক অস্ত্রকে অপ্রয়োজনীয় ভেবেছেন, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে কঠোর অবস্থান নিতে তাঁকে বিচলিত হতে দেখা যায়নি। তাঁর মধ্যে একধরনের দ্বিধা ও স্ববিরোধিতা যে-কারণে লক্ষ করা যেত, যাকে পশ্চিমা সমালোচকরা দ্বিচারিতা বলে চিহ্নিত করেছেন। তাঁর চরিত্রের সবচেয়ে জটিল দিক এখানেই,—তিনি যেন দুই বিপরীত জগতের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন। ‘পারমাণবিক বোমা আমাদের প্রয়োজন নেই’;—কথাটি বলেছেন নানসময়। একদিকে আলোচনার পক্ষে ছিলেন, আবার দমননীতির অংশ ছিলেন স্বেচ্ছায়। ছাত্রদের ওপর হামলার সমালোচনা করেছেন, আবার প্রতিবাদকে সন্ত্রাস আখ্যা দিতে দ্বিধা করেননি।

আলী লারিজানির এহেন মানসিকতার গভীরে লুকিয়ে ছিল অন্তর্দ্বন্দ্ব, যার বীজ দর্শনচর্চার ভেতরে জন্ম নিয়েছিল। দুটি জগৎ যেখানে একসঙ্গে পাশাপাশি সক্রিয় ছিল। কান্টের দর্শনে উচ্চকিত সর্বজনীন নৈতিকতা, যুক্তি, মানবিকতা, এর বিপরীতে ইরানের বাস্তবতা, যেখানে রাষ্ট্র, নিরাপত্তা, সংঘাত ও ক্ষমতার কঠিন হিসাব-নিকাশ তাঁকে দ্বিধাগ্রস্ত চরিত্র করে তুলেছিল। তিনি দুটি বিপরীতকে একসঙ্গে ধারণ করার চেষ্টা করেছেন। লারিজানির মতো চরিত্রদের সীমাবদ্ধতার জায়গাজমি বোঝার জন্য যে-কারণে বিপ্লবোত্তর ইরানে জ্ঞানচর্চার ধরনে নজর দেওয়া প্রয়োজন।

এটি স্বাভাবিক-যে, বদ্ধ সমাজ জ্ঞানচর্চার উপযুক্ত নয়, তারপরও সিস্টেমের ভেতর থেকে আমরা কিছু চর্চার আভাস পাই। রাষ্ট্রীয়-আদর্শিক কাঠামোর ভেতর থেকে এমন চিন্তক উঠে এসেছেন, যারা জ্ঞানের প্রকৃতি নিয়ে রাষ্ট্রের দাবিকে প্রশ্ন করেছেন। আব্দুলকরিম সোরুশ এক্ষেত্রে অগ্রগণ্য। তাঁর সবচেয়ে আলোচিত ধারণা,—ধর্ম অপরিবর্তনীয়, কিন্তু ধর্ম সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান পরিবর্তনশীল। এই বক্তব্যের তাৎপর্য শুধু ধর্মতাত্ত্বিক নয়; এটি জ্ঞানতাত্ত্বিক এবং রাজনৈতিকও। কারণ, ধর্ম সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান যদি ঐতিহাসিক, পরিবর্তনশীল ও মানবিক হয়, তাহলে রাষ্ট্র যে-‘চূড়ান্ত’ ব্যাখ্যা দাবি করছে, সেটিও চূড়ান্ত নয়।

Abdolkarim Soroush Quote; Image Source: Collected; @thirdlanespace.com

সোরুশ ধর্মকে নস্যাৎ করেননি, তবে ধর্মীয় জ্ঞানকে মানবিক ব্যাখ্যায় ফিরিয়ে আনেন তিনি। এর ফলে ইরানে নতুন বৌদ্ধিক ক্ষেত্র তৈরি হয়, যেখানে সত্য আর একক কর্তৃপক্ষের হেফাজতে থাকা বস্তু নয়, এটি সেখানে বিতর্ক, ব্যাখ্যা, ঐতিহাসিক পরিবর্তন ও মানবিক সীমাবদ্ধতার ভেতর দিয়ে বোঝার বিষয় হয়ে ওঠে। সোরুশ বিজ্ঞানদর্শন, ধর্মদর্শন ও ফার্সি সাহিত্য—এই তিন ক্ষেত্রে একজন গুরুত্বপূর্ণ চিন্তক ছিলেন। তিনি বিশেষভাবে রুমির দর্শন ও সুফি কবিতা নিয়ে কাজ করেছেন। একইসঙ্গে ইসলাম ও গণতন্ত্রের সম্পর্ক নিয়ে তাঁর চিন্তা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। সোরুশ এমন একটি ধারণা উপস্থাপন করেন, যেখানে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও ইসলামি নীতিমালা পরস্পরের সঙ্গে সহাবস্থান করতে পারে। তাঁর দর্শনে যুক্তি, স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারকে এমন মূল্য হিসেবে দেখা হয়, যা ধর্মীয় মতবাদের বাইরে থেকেও স্বতন্ত্রভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

সোরুশের রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রবিন্দু হলো ‘ধর্মীয় গণতন্ত্র’। তিনি মনে করেন, গণতন্ত্র কেবল ধর্মীয় বিধান থেকে উদ্ভূত হওয়া উচিত নয়, বরং তা মানবাধিকার, ন্যায়বিচার ও ক্ষমতার সীমাবদ্ধতার মতো সর্বজনীন মূল্যবোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত হওয়া উচিত। তাঁর এই ধারণা মুসলিম বিশ্বে সংস্কারপন্থী চিন্তাধারার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ ও বহুমাত্রিক অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনব্যবস্থার পক্ষে যায়। কর্মজীবনে ইরানের রক্ষণশীল মহলের তীব্র বিরোধিতার মুখোমুখি হয়েছেন তিনি। বিশেষ করে ইসলামের কঠোর ব্যাখ্যার সমালোচনা করার কারণে কট্টরপন্থী আলেম ও রাজনৈতিক গোষ্ঠীর আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু ছিলেন সোরুশ। তাঁর বক্তৃতা ও লেখালেখি বারবার সেন্সর করা হয়েছে, এমনকি হয়রানির শিকারও হয়েছেন। বৌদ্ধিক অবস্থান থেকে তবু সরে আসেননি সোরুশ। বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন মঞ্চে নিজের চিন্তাধারাকে তুলেও ধরেছেন।

আরেকজনের নাম উল্লেখ করতেই হয়, তিনি হলেন মোস্তফা মালেকিয়ান। তাঁর দর্শনের কেন্দ্রে রয়েছে মানুষের ভেতরের জীবন, তার কষ্ট, নৈতিকতা ও সত্যের অনুসন্ধান। তিনি মনে করেন, মানুষকে সত্যিকার অর্থে সুস্থ, শান্ত ও নৈতিক হতে হলে তাকে একইসঙ্গে যুক্তিবাদী ও আধ্যাত্মিক হতে হবে। অর্থাৎ, একদিকে তাকে নিজের বিশ্বাস, ধারণা ও মূল্যবোধকে যুক্তির আলোকে যাচাই করতে হবে, অন্ধ অনুসরণ থেকে বের হয়ে সত্যকে খুঁজতে হবে, অন্যদিকে নিজের ভেতরের জগৎকে পরিশুদ্ধও করতে হবে,—অহং, ভয়, লোভ, মানসিক অস্থিরতা থেকে মুক্ত হয়ে নৈতিক প্রশান্তি অর্জন সেখানে জরুরি। এ-কারণে ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতার মধ্যে পার্থক্য করেন মালেকিয়ান। ধর্ম একটি প্রাতিষ্ঠানিক, ঐতিহাসিক ও সামাজিক কাঠামো, কিন্তু আধ্যাত্মিকতা ব্যক্তিগত ও অন্তর্মুখী—এটি মানুষের নিজের ভেতরের পরিবর্তনের প্রশ্নকে অনিবার্য করে তোলে।

মালেকিয়ানের মতে দর্শনের প্রধান কাজ হলো মানুষের দুঃখ কমানো। ভুল বিশ্বাস, অযৌক্তিক ধারণা ও মানসিক অশান্তিই মানুষের কষ্টের মূল উৎস। তিনি এমন এক জীবনধারা প্রস্তাব করেন, যেখানে মানুষ সত্যকে যুক্তির মাধ্যমে যাচাই করবে ও এর পাশাপাশি নিজের ভেতরে নৈতিক ও মানসিক পরিশুদ্ধি অর্জনেও ব্রতী হবে। মালেকিয়ান সচেতনভাবে রাজনীতি থেকে দূরে থাকেন, কারণ তাঁর বিশ্বাস, বাহ্যিক রাজনৈতিক পরিবর্তন মানুষের ভেতরের রূপান্তর ঘটাতে পারে না, প্রকৃত পরিবর্তন আসে ব্যক্তিগত স্তরে।

Mostafa Malekian: Iranian philosopher and intellectual; Image Source: Collected; Google Image

এসব কারণে বিপ্লবোত্তর ইরানের জ্ঞানতত্ত্বকে অন্তত তিনটি প্রবাহে ভাগ করে দেখা যায়। প্রথমটি রাষ্ট্রীয়-আদর্শিক প্রবাহ, যেখানে সত্য স্থির, জ্ঞান রাষ্ট্র কর্তৃক স্বীকৃত, আর কর্তৃত্ব ধর্মীয়-রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত। দ্বিতীয়টি সংস্কারপন্থী-সমালোচনামূলক প্রবাহ, যেখানে জ্ঞানকে ব্যাখ্যাযোগ্য, ধর্মকে মানবিকভাবে উপলব্ধিযোগ্য, এবং সত্যকে আলোচনাযোগ্য বলে ধরা হয়। তৃতীয়টি দার্শনিক-সংলাপমূলক প্রবাহ, যেখানে ইসলামি দর্শনের সঙ্গে কান্ট, হেগেল, হাইডেগার… এমনকি আধুনিক পাশ্চাত্য জ্ঞানতত্ত্বের সংলাপ তৈরি হয়। এই তৃতীয় ধারায় এমন ব্যক্তিত্বদের দেখা মিলবে, যাঁরা পশ্চিমা দর্শনকে প্রত্যাখ্যান না করে তাকে ইসলামি বা বিপ্লবী প্রেক্ষাপটে পুনর্ব্যাখ্যা করতে আগ্রহী থেকেছেন।

আলী লারিজানি এই তৃতীয় ধারার একটি আকর্ষণীয় কিন্তু জটিল উদাহরণ। কান্ট নিয়ে কাজ করেছেন, জ্ঞানতত্ত্ব ও মেটাফিজিক্সের টেকনিক্যাল প্রশ্নগুলো নিয়ে লিখেছেন, আবার একইসঙ্গে রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রেও থেকেছেন। তাঁর চিন্তায় ‘সমষ্টিগত আত্মা’ বা সমাজের স্বতন্ত্র সত্তার ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ। ধারণাটি ব্যক্তিকে বৃহত্তর সমষ্টির অধীন করে, এবং নৈতিকতাকে ব্যক্তি-স্বায়ত্তশাসনের বদলে সমষ্টিগত অভিমুখে পুনর্গঠনও করে। ফলে তাঁর ক্ষেত্রে আমরা দেখি, জ্ঞানতত্ত্ব সরাসরি রাষ্ট্রীয় নৈতিকতায় রূপান্তরিত হতে চলেছে। একদিকে তিনি দর্শনের ভাষায় কথা বলেন, অন্যদিকে সেই ভাষা শেষপর্যন্ত রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, স্থিতি ও কৌশলগত স্বার্থকে ন্যায্যতা দেওয়ার কাঠামোয় পরিণত হয়।

১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর জ্ঞানতাত্ত্বিক ঐতিহ্য নতুন রাজনৈতিক রূপ নেয়। বিপ্লবী রাষ্ট্র দ্রুত বুঝে যায় বিশ্ববিদ্যালয়, পাঠ্যক্রম, শিক্ষক, ছাত্র… এগুলো কেবল শিক্ষা সংক্রান্ত বিষয় নয়, এগুলোই ক্ষমতার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে। এই উপলব্ধি থেকে শুরু হয় উচ্চশিক্ষাকে ‘পরিশুদ্ধ’ করার দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প। বিপ্লবের পর বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দুই বছরের জন্য বন্ধ করা হয়, পাঠ্যসূচি পুনর্বিন্যাস করা হয়, এবং একটি সাংস্কৃতিক বিপ্লবী কাঠামো গড়ে তোলা হয়, যার উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষাব্যবস্থাকে বিপ্লবী আদর্শের অনুকূলে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা। উক্ত কালপর্বে ‘জ্ঞান’ আর নিরপেক্ষ থাকেনি। জ্ঞানকে দেখা হয় রাষ্ট্রগঠন, সামাজিক পুনর্গঠন ও মতাদর্শিক নিরাপত্তার কেন্দ্রে থাকা শক্তি হিসেবে।

বিপ্লবোত্তর ইরানের জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রথম বড় বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট হয় জ্ঞানকে কেবল অন্বেষণের বিষয় না রেখে শাসন- অবকাঠামো রূপে ব্যবহারের ভিতর দিয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থী নির্বাচন, পাঠ্যপুস্তক সংশোধন, সাধারণ বাধ্যতামূলক কোর্সে ইসলামি বিপ্লবের ইতিহাস ও ইমাম খোমেনির রাজনৈতিক চিন্তা অন্তর্ভুক্ত করা, সুপ্রিম লিডারের প্রতিনিধি অফিসের মাধ্যমে একাডেমিক পরিসর তদারকি… এগুলো দেখায়, জ্ঞানের প্রশ্ন সেখানে সরাসরি রাজনৈতিক। কে পড়াবে, কী পড়াবে, কোন জ্ঞান বৈধ, কোন জ্ঞান বিপজ্জনক ইত্যাদি নির্ধারণের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র নিজেকে টিকিয়ে রাখতে চাইছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় আচরণবিধি, পোশাকবিধি, ছাত্র বাসিজ, ধর্মীয় অনুষ্ঠান, শহীদ সংস্কৃতি, যুদ্ধস্মৃতি ভ্রমণ… অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়কে কেবল জ্ঞান উৎপাদনের স্থান নয়, বিপ্লবী চরিত্র গঠনের স্থান হিসেবে গড়ে তোলা হয়।

Persepolis (2007) by Marjane Satrapi; Dress Code Scene; Source: Callum Little YTC

এই প্রেক্ষাপটে ইরানের শিক্ষাকাঠামোর সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়। প্রথম সীমাবদ্ধতা হলো, বিশ্ববিদ্যালয়কে সেখানে একটি স্বাধীন বৌদ্ধিক পরিসর হিসেবে ভাবা হয় না, বরং একটি নিয়ন্ত্রিত আদর্শিক ক্ষেত্র হিসেবে পরিচালিত করা হয়। ভিন্নমতাবলম্বী শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের বহিষ্কার, সাসপেনশন, গ্রেপ্তার, জোরপূর্বক অবসর, আচরণবিধি, পোশাকবিধি, সুপ্রিম লিডারের প্রতিনিধি অফিস, ছাত্র বাসিজ… এসব শুধু প্রশাসনিক বিষয় নয়, এগুলো জ্ঞানের ক্ষেত্রকে শাসনের অধীন রাখার উপায়।

দ্বিতীয় সীমাবদ্ধতা হলো পাঠ্যসূচির পুনর্লিখন, বিশেষত মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞানে। জ্ঞানকে যখন আগেই নির্ধারিত সত্যের অধীন করা হয়, তাকে প্রশ্ন করা বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। তৃতীয় সীমাবদ্ধতা হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে আনুগত্যকে মেধার ওপরে স্থান দেওয়া। এর ফলে যে-জ্ঞানচর্চা জন্ম নেয় তা মূলত অনুগত দক্ষতা,—সৃজনশীল স্বাধীনতা নয়। চতুর্থ সীমাবদ্ধতা হলো জ্ঞানকে প্রযুক্তিগতভাবে উৎসাহিত করা হলেও তা শেষপর্যন্ত কৌশলগত রাষ্ট্রীয় লক্ষ্যে আবদ্ধ থাকে। এর ফলে বিজ্ঞানকে উৎসাহ দেওয়া হয়, কিন্তু সেই বিজ্ঞানকে সত্যিকার উন্মুক্ত গবেষণার জায়গায় নেওয়া হয় না। পঞ্চম সীমাবদ্ধতা হলো মেধাপাচার। যে-সমাজে স্বাধীন বৌদ্ধিক বিকাশের ক্ষেত্র সংকুচিত হয়, সেখানে সেরা মেধা টিকে থাকতে চায় না। বিপ্লবোত্তর ইরানের জ্ঞান-প্রকল্প তার নিজের সেরা সন্তানদের যে-কারণে ধরে রাখতে পারেনি।

পুরো ব্যবস্থাটি দেখায় কেন বিপ্লবী ইরানে সত্যিকার অর্থে নতুন জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রসার ঘটেনি বা তা ‘অসম্ভব’ হয়ে পড়েছিল। ‘অসম্ভব’ কথাটি যান্ত্রিক অর্থে নয়,—ইরান তথ্যপ্রযুক্তি, চিকিৎসা, প্রকৌশল, সাইবারনেটিক্স ছাড়াও সামরিক গবেষণায় অগ্রগতি লাভ করেছে ঠিকই, কিন্তু নিত্যনতুন জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রসার সেখানে ঘটেনি। জ্ঞান-বিজ্ঞানে নতুনত্ব বলতে যদি মুক্ত অনুসন্ধান, প্রতিষ্ঠিত সত্যকে প্রশ্ন করার সাহস, তাত্ত্বিক সৃজনশীলতা, ভিন্ন ব্যাখ্যার সহাবস্থান ও রাজনৈতিক নজরদারি আর শাস্তির ভয়ডরহীন চিন্তার প্রসার বলে বুঝি, সেক্ষেত্রে স্বীকার করতেই হবে-যে,—এরকম একটি পরিবেশ ইসলামি বিপ্লব পরবর্তী ইরানে কাঠামোগতভাবে সংকুচিত ছিল। কারণ, নতুন জ্ঞানের জন্য সংশয়, বিতর্ক, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, আত্মসমালোচনা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতার বিকল্প নেই। বিপ্লবী ইরানের রাষ্ট্রীয় শিক্ষাব্যবস্থা অন্যদিকে শুরু থেকে চেয়েছে স্থিতি, শৃঙ্খলা, অনুগত্য ও নিয়ন্ত্রিত সত্য। উভয়ের মধ্যে মৌলিক টানাপোড়েন সবসময় বিরাজিত ছিল সেখানে।

আলী লারিজানির মতো মানুষদের অতুল সম্ভাবনা যে-কারণে বিপ্লবোত্তর ইরানে পুরোপুরি বিকশিত হওয়ার বাস্তব সুযোগ পায়নি। তিনি আরো গভীর অর্থে দার্শনিক হতে পারতেন, যদি তাঁর চারপাশে এমন একটি পরিসর থাকত যেখানে দর্শন কেবল রাষ্ট্রকে ন্যায্যতা দেওয়ার ভাষা না হয়ে সত্যকে অনিরাপদভাবে অনুসরণ করার পথ গণ্য হচ্ছে। লারিজানি একাডেমিক বুদ্ধিজীবী হতে পারতেন, যদি জ্ঞান তাঁকে নিরাপত্তা কৌশলের ভেতর আবদ্ধ না রাখত। তিনি রাষ্ট্রীয় কৌশলবিদ ছিলেন বটে, কিন্তু তাঁর ভিতরে সক্রিয় চিন্তক কি শেষপর্যন্ত মুক্ত ছিল? আমার তা মনে হয়নি।

লারিজানির জীবনবৃত্তান্ত অনুসরণ করলে আমরা দেখি, বিপ্লবী ইরানের কাঠামো কীভাবে তাঁর মতো মানুষের শক্তিকে ব্যবহার করেছে, কিন্তু সম্ভাবনাকে মুক্ত হতে দেয়নি। কাঠামোটি লারিজানিকে প্রয়োজনীয় করে তুলেছিল, যেহেতু সরকার তাঁকে একজন সেতু, একজন ব্যাখ্যাকার ও নীরব নৈতিক স্থপতি রূপে বিবেচনা করছিল। একই কাঠামো অন্যদিকে তাঁকে এমন জায়গায় বন্দি করে, যেখানে চিন্তার পক্ষে ক্ষমতার বাইরে যাওয়া সম্ভব নয়। স্বাধীন পরিণতি পাওয়ার পথ সেখানে অবরুদ্ধই থাকে। জ্ঞান আছে, প্রজ্ঞার ঐতিহ্য আছে, দার্শনিক উত্তরাধিকার আছে, সমালোচনামূলক বুদ্ধিজীবী আছে, কিন্তু এগুলোকে একত্রে এমন একটি স্বাধীন ক্ষেত্র রূপে বিকশিত হতে দেওয়া হয় না, যেখানে সত্য স্বয়ং রাষ্ট্রের অনুমতি ছাড়াও জন্ম নিতে পারে। যার ফলে আলী লারিজানির মতো মানুষ রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করেন, রাষ্ট্রের ভাষাকে গভীরতা দান করেন, ক্ষমতাকে নৈতিকতাও প্রদান করেন, তথাপি নিজের পূর্ণতম সম্ভাবনায় পৌঁছাতে পারেন না। আর এটি সম্ভবত তাঁর মতো মানুষদের জীবনে সবচেয়ে বড় ট্রাজেডির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
. . .

Ali Larijani: A man behind the contradiction; Image Source: Collected; Credit: Asma Azhar FB Profile

পরিশিষ্ট : সংযুক্তি
জনাব আলী লারিজানির ‘পরম নৈতিকতা’
[থার্ড লেন হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ থেকে সংকলিত]

পাশ্চাত্য ও ইসলামি দর্শনের ওপর আপনার দখল ছিল জনাব আলী লারিজানি। আল জাজিরা-সহ বিশ্ব গণমাধ্যমের বরাতে জানা গেল বটে, ধর্মীয় শাস্ত্রে বুৎপত্তি অর্জনের পাশাপাশি গণিত ও কম্পিউটার বিজ্ঞানের ছাত্র ছিলেন আপনি। দর্শনপাঠে সেইসঙ্গে আগ্রহী থেকেছেন আগাগোড়া। জার্মান দার্শনিক ইমানুয়েল কান্টের অনুরাগী রূপে বিশ্ব আপনাকে জানতে পারছে সদ্য। তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করার সময় কাণ্টকে বেছে নিয়েছিলেন। পরম নৈতিকতার যে-পরিমাপক জার্মান দার্শনিক তাঁর দর্শন-কাঠামোয় স্থির করে গেছেন, উক্ত পরিমাপকের নিরিখে ইরানের মতো দেশের পরমাণু কর্মসূচি গ্রহণের যৌক্তিকতা বিষয়ে বইও লিখেছেন আপনি। নেটে এরকম পাঁচ-ছয়খানা বইয়ের খোঁজ মিলল, যার তিনটি আবার কান্টকে নিয়ে ছিল রচিত।

আলী খামেনির সরকারে আপনাকে নিউক্লিয়াসের একজন রূপে চেনাচ্ছে গণমাধ্যম। আপনি নাকি অন্যতম স্তম্ভ ছিলেন সেখানে, যাঁর হাতে ইরানকে নিরাপদ ও সুরক্ষিত ভেবেছেন স্বয়ং আলী খামেনি। বিগত আটারো মাস তাঁর হয়ে ইরানকে মূলত আপনি নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করছিলেন। বিশ্ব যার বিন্দুবিসর্গ জানতে পায়নি এতদিন!

ইরানের লোকজন হয়তো আপনাকে অল্পবিস্তর চেনেজানে। বাকিরা প্রথম জানতে পেরেছে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের বরাতে। বিশ্বজুড়ে মুসলমান জাতটি বেনজামিন নেতানিয়াহু ওরফে বিবির মওত নিয়ে হুদাই লাফালাফিতে ব্যস্ত বিগত কিছুদিন ধরে। সাত আসমানের ওপারে অলিম্পাস পর্বতের চূড়ায় অথবা অথই জলসায়রে ঘেরা আরশের সিংহাসনে বসা বিধাতা তাদের এই বেকুবি দেখে হাসছিলেন আড়ালে। তখন… হ্যাঁ ঠিক তখন… আগাম কোনো আভাস না দিয়ে গভীর রাতে সাজানো এয়ার স্ট্রাইক নেমে এলো আপনার ওপর। নিখুঁত নিশানায় ‘পরম নৈতিকতার আরকে ডোবানো’ আপনার জানখানা কবচ করলেন ঈশ্বর!

যুদ্ধ চিরকাল নির্দয় জনাব লারিজানি। বোকা-বোকা সস্তা আবেগ সেখানে পাছা মোছার জন্যও কেউ ব্যবহার করে না। যুদ্ধের নির্দয় কৌশল ধরতে অক্ষম বোকাদের আবেগে জল ঢেলে তাই মৃত নেতানিয়াহু হেলেদুলে কফিশপে গিয়ে ঢোকে। সমর্থক ও অনুসারীদের উজ্জীবিত করতে তাকে আমরা বলতে শুনি : ‘যুদ্ধে সাফল্য পেতে একাগ্র থাকা জরুরি। একাগ্রতা… একাগ্রতা…এবং একাগ্রতা কেবল পারে সঠিক কৌশলে দাঁড়িয়ে শত্রুকে পরাজিত করতে।’ ডিটারমিনেশন ছাড়া কেউ লক্ষ্য জেতে না। ইসরায়েল, বলাবাহুল্য এই কাজে শিল্পী এখন।

আপনি, মি. লারিজানি এখানে এসে হেরে গেছেন। আলী খামেনি দফা হওয়ার পর ইরান আপনার হাতে চলে আসে। মুজতবা খামেনি তো প্রথম দফার বোমা হামলায় ঠ্যাং হারিয়ে লুলা হলো। হাসপাতালে লড়ছে মরণের সঙ্গে। ইরানের রাজনীতিকে আড়ালে বসে প্রভাবিত করতে থাকা মুজতবার বিলিয়নিয়ার বউসহ বাকিদের দফারফা হয়ে গেছে আগেই। আপনাকে কাজেই সমরনীতি ঠিকঠাক করে নিতে হচ্ছিল প্রতিনিয়ত। আইআরজিসি যতই খামেনি-ছক মেনে মরণপণ লড়াই করুক, কেন্দ্রীয় দিকনির্দেশনা যে-কোনো যুদ্ধে ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়ায় অবশেষে।

আইআরজিসির ভিতরে তৈরি সবচেয়ে নির্দয়-নিষ্ঠুর বেসজি সেনাদের কমান্ডার সুলেইমান ও আপনাকে পরপর খতম করে ইসরায়েল সেই একাগ্রতার পরিচয় দিলো পুনরায়। যারাই আসবে পরে, তাদেরকে মেরে দেবে এভাবে। যেহেতু, সিস্টেমকে নিকাশ করার লক্ষ্যে তারা সক্রিয়। আপনার পয়লা ভুল ছিল খামেনি দফা হওয়ার পর জনসমক্ষে বেরিয়ে আসা। কী ভেবে কাজটি করেছিলেন জনাব? যখন, আপনার মাথার ওপর মুক্ত পাখির মতো মার্কিন-ইসরায়েল বিমানগুলো চক্কর দিচ্ছে? রাডারগুলো সক্রিয় যথারীতি!

কী ভেবেছিলেন আপনি? সমর্থক জনতা পরিবেষ্টিত হয়ে রাস্তায় নামার কারণে ওরা আপনাকে বোমা মারবে না? নাকি, ইসলামি বিপ্লবের অতন্দ্র প্রহরী সেনাদের আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান করতে প্রকাশ্যে আসা আপনার? জনগণকে এই বার্তা দিতে-যে, আপনাদের সরকার এখনো অটল আছে ও এভাবে কেয়ামত অবধি জারি থাকবে ইরানে? পরে অবশ্য এই খবর চাউর হয়েছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত কন্যার কারণে আপনাকে প্রকাশ্যে অসতেই হতো। দেশে ফেরত আসতে বাধ্য কন্যাকে বিমানবন্দর থেকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার নৈতিক দায় পিতার থাকবে এটি স্বাভাবিক। ঘটনা যেমন হোক, অবিরত আস্তানা পরিবর্তন মোসাদের নজর থেকে আপনাকে বাঁচাতে পারেনি।

ভুল… ভুল হে দার্শনিক জেনারেল। ওই মুহূর্তে আপনাকে রাডারে আরো একবার নিয়ে নিলো ইসরায়েল। বাকি কাজটিও মোসাদের জন্য সহজ করে দিলেন! আপনি সম্ভবত ভুলে গেছিলেন, পৃথিবীর এক নাম্বার ইন্টেলিজেন্সকে আপনার লোকেশন ট্র্যাক করার সুযোগ আপনি দিতে পারেন না। আপনাকে অনুসরণের চ্যালেঞ্জ ইসরায়েলের মতো একটি দেশকে আপনি দিতে পারেন না, যেহেতু, দেশটির প্রযুক্তিক সক্ষমতা ঈর্ষনীয়।

দুনিয়া বড়ো অদ্ভুত জনাব আলী লারিজানি! এর আগামাথা ঠাহর করা কঠিন। নিটশেকে এখানে পাঠ করে অ্যাডল্ফ হিটলার। রক্তের শুদ্ধতায় বিশ্বাসী উন্মাদকে চুম্বকের মতো বেঁধে ফেলে নিটশের উবারম্যানশ বা অতিমানবের চিন্তাস্রোতে নিহিত দার্শনিকতা। ফ্যাসিবাদের রূপকার বেনিতো মুসোলিনি ওদিকে গভীর ভাবাবেগে আবিষ্ট থেকে পাঠ করে মেকিয়াভেলি, নিটশে ও জিওভানি জেন্টিল। এঁনারা হয়ে ওঠেন মুসোলিনির দিবাস্বপ্নকে বাস্তব করে তোলার কাণ্ডারি।

একালে ব্যতিক্রম নেই। দেশে-দেশে সরকার পরিবর্তনের খেলায় সিদ্ধ জর্জ সোরসকে দখলে রাখেন কার্ল পপার! ভিয়েনা সার্কেলের এই গুণী চিন্তকের দার্শনিক বিন্দুতে জনাব সোরস মিলিয়ে নেয় শেয়ার বাজার নিয়ন্ত্রণ, সরকার নামানো ও বসানোর মধ্য দিয়ে পৃথিবীর অঘোষিত ঈশ্বর রূপে নিজের ক্ষমতা ও প্রতিপত্তিতে পরিতৃপ্ত হওয়ার কত-না সমীকরণ! আপনি, জনাব আলী লারিজানি বোঝা গেল আবিষ্ট ছিলেন কনিজবার্গের আজীবন অবিবাহিত দার্শনিকের বয়ান সম্ভারে। কাণ্ট বিয়েশাদি করেননি; কেননা তাঁর ভয় ছিল, বিয়েশাদি করলে দার্শনিক চিন্তাস্রোতে বহাল থাকা সম্ভব হবে না।

Image Source: Immanuel Kant AI Portrait; Artist: Unknown; Source: Google Image

কান্ট তাঁর পরম নৈতিকতার দর্শনকে সভ্যতা ও আলোকায়ণে দীপ্ত মানুষদের জন্য এভাবে ভাষা দিয়ে গেছেন বটে। যেখানে আবার আফ্রিকার কালো জংলি মানুষগুলোকে অযোগ্য দাগিয়ে বাতিল করতে তাঁর নৈতিকতায় কাঁপন জাগেনি। ভাবুক তিনি হিমালয় সমান হোন-না-কেন, তাঁকে গড়ে মূলত তাঁর সময়-সমকাল।

জনাব লারিজানি, কান্টের পরম নৈতিকতার প্রতি আপনার আবেগ কি এজন্য-যে, এটি পরিমাপক? ইসলামের সঙ্গে ককটেল বানিয়ে একে আপনারা আরোপ করেছেন ইরানে? এবং এভাবে হয়তো ইরানকে বের করে আনতে চেয়েছেন পারস্য সভ্যতার হাজারবর্ষী বয়ান থেকে, যেগুলো মূলত তাদের জিনের গভীরে সঞ্চারিত? পঞ্চাশ বছরের চেষ্টায় আপনি/ আপনারা কি শতভাগ সফল মি. লারিজানি? তা বোধহয় বলা যাচ্ছে না।

এতো বইপত্র পড়ে কী লাভ হলো বলুন? এতো-এতো দর্শন কপচিয়ে ক্যায়া ফায়দা বলুন? সহজ হিসাব তো ভুলে থাকলেন আগাগোড়া! ভুলতে চাইলেন এই সত্য-যে : আরোপণের অনিবার্য ফলাফল ত্রাসের মধ্যে পরিণাম খোঁজে নিরন্তর। পঞ্চাশটি বছর ধরে পরম নৈতিকতার দোহাই দিয়ে কার্যত ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন ইরানে! হিটলারের নীলরক্তের শুদ্ধতায় জাতির মগজ ধোলাইয়ের সঙ্গে আপনাদের ইসলামসম্মত পরম নৈতিকতার তফাত কি বলুন তো? দুটোই মানুষের সহজ প্রবৃত্তি ও চালিকাশক্তির স্বাভাবিক প্রবণতার বিপরীতে গিয়ে তাকে নির্ধারণ করতে মরিয়া থেকেছে।

মানুষ কোনো নৈতিক জীব নয় জনাব আলী লারিজানি। মানুষ ততটুকু নৈতিক, যতটুকু সামাজিক জীবনধারায় তার জন্য স্থির করে সমাজ। পরম নৈতিকতাও সেখানে আপেক্ষিক ও পরিবর্তনশীল। আপনি এতো এতো বইপত্র পাঠ করে সহজ সত্য ভুলে গেলেন! ইরানের ওপর আরোপ করলেন বানোয়াট বয়ানে ঠাসা সাংস্কৃতিক আধিপত্য। চাপিয়ে দিলেন অবরোধ, অনুসরণ, গুম ও নির্বাসনের বিভীষিকা। সমাজকে বিভাজন ও নজরদারির আওতায় খণ্ড-খণ্ড করলেন। সেইসঙ্গে চাপালেন অনাবশ্যক জুজুর ভয়… যার হাতে নাকি বিপন্ন ইসলাম। নিজেরা হয়ে ‍উঠলেন পরম নৈতিকতার ধারক-বাহক-সংরক্ষক ঈশ্বর। পরিণামটি এখন কর্মফল হয়ে ইরানের মানুষকে ধাওয়া করছে। আপনি কি টের পাচ্ছেন, কী গভীর অনিশ্চয়তা ও দুর্ভোগ ডেকে এনেছেন তাদের জন্য? আপনার কর্মফলের দণ্ডি তারা দিতে থাকবে… কতদিন… তা অজানা!

আপনার জন্য শোক জ্ঞাপন করা হয়তো উচিত জনাব লারিজানি। আপনি এই রেজিমে বিশিষ্ট ও ব্যতিক্রম ছিলেন। নিভৃতে থেকে নিয়ন্ত্রণ করেছেন পরম নৈতিকতা, যেটি আপনার ভাষায় হয়তো পরমাণু সমরাস্ত্রের অনিবার্যতা হয়ে পঠিত হয়েছিল এতদিন। কিন্তু, আপনার হাতে নিজ দেশের হাজারে হাজার মানুষের রক্তের দাগ। করতলে এতো রক্তের স্রোত নিয়ে কী করে বেঁচে থেকেছেন হে সমর-পরিকল্পক? কেমন করে খতম হওয়ার চব্বিশ ঘণ্টা আগে টেলিভিশনে দিয়েছেন সাক্ষাৎকার? যখন, আপনার দেশের মানুষ মরণভয়ে পার করছে প্রহর!

আপনাকে গুডবাইয়ের চেয়ে বাড়তি কোনো শব্দে বিদায় জানানো সম্ভব নয়। গুডবাই হে দার্শনিক জেনারেল। আমরা আশা রাখব, আপনি ও আপনাদের সঙ্গে এই দেশ থেকে পরম নৈতিকতা নামে আরোপিত পরিমাপকরা বিদায় নেবে। মানুষ যাপন করবে স্বাভাবিক নৈতিকতা, যেটি তাকে মানায়, এবং যা নয় আরোপিত বিশেষ অথবা অতিরিক্ত কিছু,—যার ভার বহনে তারা আসলেও অক্ষম।
. . .

Rush Philopher and Poltical Thinker Alexander Dugin’s Comment on Ali Larijani; Source: Collected; Pakistan Observer

. . .

প্রাসঙ্গিক রচনার জন্য থার্ড লেন স্পেস-এ আরো দেখুন …

১. প্রসঙ্গ ইরান : আমাদের দ্বিধা ও স্ববিরোধিতা : মোস্তাফিজুর রহমান জাভেদ

২ “প্রসঙ্গ ইরান” : তাৎক্ষণিক নেটালাপ

৩. ও মাটি হবো মাটি 

৪. চতুর্থ রাজনীতি

. . .

লেখক পরিচিতি : এখানে অথবা ওপরের ছবিতে চাপুন

. . .

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 15

No votes so far! Be the first to rate this post.

Contributor@thirdlanespace.com কর্তৃক স্বত্ব সংরক্ষিত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *