শুরুর কথা

তরুণ লেখক ও আলোকচিত্রী নাবিল সালিহ-র জন্ম ইরাকে। যুদ্ধ, ধ্বংস, নির্বাসন ও সাম্রাজ্যবাদের অভিজ্ঞতা তাঁর লেখায় অমোঘ হয়ে আসে ফিরে-ফিরে। ইরাকের আভ্যন্তরীণ সহিংসতা, মার্কিন দখল ও মধ্যপ্রাচ্যে চলতে থাকা দমননীতিকে স্মৃতি, ইতিহাস ও প্রতিরোধের দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করেন নাবিল। আলোকচিত্রে যুদ্ধ পরবর্তী বাস্তবতা, ধ্বংসস্তূপ ও সাধারণ মানুষের জীবনকে নথিবদ্ধ করে তাঁর ক্যামেরা।
ফিলিস্তিন সমস্যার ওপর On an abyssal edge: a streak of blood, and absence শিরোনামের দীর্ঘ রচনাটি Allegra lab-এ জানুয়ারি ২০২৪-এ প্রথম প্রকাশিত হয়। থার্ড লেন স্পেস-এ সম্পূর্ণ রচনাটি ভাষান্তর করেছেন অবদায়ক মোস্তাফিজুর রহমান জাভেদ। নাবিলের রচনাটি ফিলিস্তিন সমস্যার কার্যকারণ তালাশে গভীরে যেতে ত্রুটি করেনি। গুরুত্বপূর্ণ ও হৃদয়কে দ্রবীভূত করে তোলা রচনাটি কয়েকটি পর্বে ভাগ করে আমরা সাইটে তুলব ঠিক করেছি। এটি প্রথম পর্ব। ফিলিস্তিন সমস্যার প্রকৃত জটিলতা অনুভব ও মর্মবেদনায় শরিক হতে পাঠক আশা করি ধারাবাহিকটির সঙ্গে থাকবেন। —থার্ড লেন স্পেস.কম
. . .

এক অতল প্রান্তর : রক্তের দাগ, আর অনুপস্থিতি
যারা খতম হলো, তাদেরকে এখন কাঁধে বয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কাফনে মোড়া লাশগুলো যত দ্রুত সম্ভব ঘরের ভেতরে খোঁড়া গণকবরে মাটিচাপা দেওয়া হলো। পরিবেশ ছিন্নভিন্ন করে যুদ্ধের দামামা প্রতিধ্বনি তোলে পেছনে। বিধ্বস্ত বাড়িটির ভিতরে নামগোত্রহীন, অচিহ্নিতরা শুয়ে থাকে, যেন তারা চিরন্তন নীরব আর্তনাদের সুগন্ধে মোড়ানো!
চির-বিশ্রামের স্থান এই কবরেও বিশ্রামের উপায় নেই।
‘আগের প্রজন্মের সঙ্গে আমাদের প্রজন্মের গোপন চুক্তি রয়েছে‘;—প্রয়াত বিপ্লবী দার্শনিক ওয়াল্টার বেঞ্জামিন তাঁর থিসিস অন দ্য ফিলসফি অব হিস্ট্রি বইয়ে কথাটি লিখে রেখে গেছেন। আমরা এমন এক শক্তিতে সমৃদ্ধ, যার ওপর অতীতের দাবি রয়েছে। আর এইটা… এই দাবি ‘সস্তায়’ নিষ্পত্তি করার বিষয় নয়।
. . .

ওইসব ভূত
আমি যেখান থেকে এসেছি সেখানে প্রিয়জনের পাশে মৃতদেরকে দাফন করা হতো। গুরবা, মানে ওই কবরের চিপায় নির্বাসিত আগন্তুক হয়ে শুয়ে থাকার কথা ছেড়েই দাও,—বেঁচে থাকতেই তা সইতে পারে না কেউ। গাজার গণকবরগুলোয় ফিলিস্তিনিরা দ্বিতীয় দফায় পরকালের দ্বারপ্রান্তে নির্বাসিত হওয়ার শাস্তি ভোগ করে।
নতুন করে খোঁড়া ও তা ভরতি হলে গণকবরগুলো বুলডোজার দিয়ে সমান করা হয়। মাটির নিচে যারা ঘুমিয়ে পড়েছিল, তাদেরকে আরেক দফা হত্যা করতে চিরঘুমের দেশ থেকে হিংস্রতার সঙ্গে উঠানো হয় দ্রুত,—ইসরায়েলের জেনারেলরা সেখানে বন্দুকে বারুদ ঠেসে অপেক্ষায় আছে।
ফিলিস্তিনের প্রয়াত কবি মাহমুদ দারবিশ এমনকিছু দেখেছিলেন, যা আমরা দেখতে পাই না। একটি কবিতায় তিনি লিখেছেন :
জেনারেলের কাছে আমাদের বেঁচে থাকাটাই বোঝা :
‘ভূতের শরীরে রক্ত বইছে কী করে?‘
প্যালেস্টাইনের ধ্বংসস্তূপে জন্ম নিয়ে ও সেখান থেকে পুনরায় উত্থিত ইসরায়েলের ধ্বংসাত্মক প্রকল্পের লক্ষ্যই হচ্ছে, আরিয়েলা আজুলাই লিখেছেন : ‘এখানে গড়ে ওঠা মিশ্র সমাজকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার সঙ্গে যা-কিছু তাদের পুনরুত্থান ঘটাতে পারে, তাকেও নিশ্চিহ্ন করা।’
গাজা ও পশ্চিম তীরের শহরগুলোকে ছারখার করে দেওয়ার এই অন্ত্রচ্ছেদী ব্যবচ্ছেদ দেখে আমার ফাদি জৌদাহর কথা মনে পড়ে : ‘এই ধ্বংস এমনকি ফিলিস্তিনি ভূত-প্রেতের অস্তিত্বও মুছে ফেলাটা অনিবার্য করতে চায়।’
ভূত-প্রেতরা তথাপি এতকিছুর পরেও বিপজ্জনক। দারবিশ লিখেছেন :
আমরা, ‘প্রতিশ্রুত ভূমিতে’ যারা গরহাজির,—যারা হয়ে উঠেছি নিহতদের ভূত,—খুনিকে আমরা ঘুমে ও জাগরণে তাড়া করি;—আর, জেগে ওঠা ও ঘুমিয়ে পড়ার মধ্যবর্তী রাজ্যে,—তাকে অস্থির ও হতাশ করে তুলি।
ইসরায়েলের যুদ্ধবহর একমাত্র নয়, পশ্চিম গোলার্ধের সাংবাদিকরা স্বয়ং জীবিত ও মৃতদের এই ক্ষতিকর অঙ্গহানির অংশ।
যেমন, লুসি হকিংস ইসরায়েলের পবিত্র বয়ান রক্ষায় নেমে তাঁর সঙ্গে আলাপরত অতিথিকে চুপ করিয়ে রাখেন; শ্রেষ্ঠত্ব-গর্বে গর্বিত জুলিয়া হার্টলি-ব্রুয়ার, তিনি যদিও এএস-র ইউনিফর্ম পরে নেই, তবু সরাসরি সম্প্রচারে ড. মুস্তাফা বারঘুতিকে তাতিয়ে তুলতে খোলস ছিঁড়ে বেরিয়ে আসেন;—দুষ্ট ও নারীবিদ্বেষী আরব বলে তাঁকে অপবাদ দিতে থাকেন,—সান্ধ্যকালীন সংবাদের আসরে লোকজনে নজর কাড়াটা তাঁর বড়ো প্রয়োজন।
. . .

অতিরিক্ত অস্তিত্বহীনরা (Superfluous Nonbeings)
আজকে ফিলিস্তিনিদের যে-অবস্থা, সেটি কয়েক যুগ আগে এডওয়ার্ড সাঈদ তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ Permission to Narrate-এ বর্ণনা করে গেছেন। তিনি বলেছিলেন,—আরামদায়ক অনিশ্চয়তায় ঝুলে থাকা অবস্থা থেকে ফিলিস্তিনিদেরকে ধীরে-ধীরে ‘দুই পা-ওয়ালা পশু’ ও ‘পশুমানব’-র শ্রেণিতে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।
এই নীরবতা ও মুছে ফেলার মধ্যে তবু ফিলিস্তিনি ও সহযোদ্ধাদের মতো আমিও সেখানে ভিন্ন এক পাঠ খুঁজে পাই। আজুলাই সম্প্রতি তাঁর নিবন্ধে বলেছেন, ফিলিস্তিনিদেরকে ‘ঔপনিবেশিক গণহত্যার শিকার রূপে স্বীকৃতি না দিয়েই অদ্য সারা বিশ্বের চোখের সামনে নির্মূল করা হচ্ছে।‘
তাদেরকে মনে হচ্ছে পরবর্তীতে বিস্মৃতির কোণে, মানবিক মর্যাদা থেকে সুদূর কোনো প্রকোষ্ঠে গাদাগাদি করে রাখা হবে। হামাস এখানে একমাত্র জন্তু নয়। জৌদাহ যেমন লিখেছেন : ফিলিস্তিনিরা সকলে এখানে ‘অতিরিক্ত ও সত্তাহীন অস্তিত্ব‘।
আরো অনেকের মধ্যে সাঈদ তাঁর সংস্কৃতি ও সাম্রাজ্যবাদ (Culture and Imperialism) বইয়ে দেখিয়েছেন,—শ্রেণিবিন্যাসের সিঁড়িতে গাঢ় বর্ণের মানুষকে নিচে নামিয়ে দেওয়া অথবা একযোগে ‘সভ্যতার’ বাইরে ছুঁড়ে ফেলার এক দীর্ঘ ইতিহাস সাদা মানুষের রয়েছে। ফিলিস্তিনে আমরা ঔপনিবেশিক ভূগোলের সুদূর প্রান্তে দৃষ্ট বিমানবিকীকরণের জীবন্ত দৃষ্টান্ত দেখছি।
কিউবান সমালোচক রোবের্তো ফের্নান্দেস রেতামার তাঁর ক্যারিব-কাম-ক্যালিবান-এ (Carib-cum-cannibal) আমাদের জানান,—কলম্বাসের লেখায় ও ইউরোপীয়দের চোখে ক্যারিব-কাম-ক্যানিবাল ছিল ‘এক নরখাদক, এক জন্তুসদৃশ মানব, সভ্যতার প্রান্তরেখায় যে-কিনা অবস্থান করছে,—তাকে অবশ্যই ঠেকাতে হবে।‘
খ্রিস্টীয় মানচিত্রের অচিহ্নিত প্রান্তরেখার নিহারীকামণ্ডলে ইউরোপীয় কল্পকাহিনির পৌরাণিক দানবদেরকে আটলান্টিক বাণিজ্যপথের উত্থান ঘটার সঙ্গে-সঙ্গে ‘নরখাদক‘ ও ‘বর্বর‘-এ ভাষান্তরিত করা হলো;—লাস ইন্ডিয়াস অক্সিদেন্তালেসে বা পশ্চিম ইন্ডিজে এখন যাদের দেখা মিলতেও পারে।
কলম্বাসের লেখায় ‘ক্যারিব‘রা সেখানে আবিষ্কৃত অন্য আমেরিকান থেকে ভিন্ন। গ্রেটার অ্যান্টিলিস অঞ্চলের ‘আরাওয়াকো‘ বা আমাদের পরিচিত তাইনো ইন্ডিয়ানকে শান্ত, নম্র, এমনকি একটুতে ভয় পেয়ে যায় ও কাপুরুষ রূপেই বর্ণনা করেছেন তিনি।
ক্যারিবদের এই তথাকথিত পশুভাব তাদের নিশ্চিহ্ন করাটাকে অনিবার্যতা দিয়েছিল। এই দৃষ্টিভঙ্গি কিন্তু ব্যাখ্যা দিতে পারে না, রেতামার যেমনটি বলছেন : ‘ক্যারিবদের আগেই কেন তাহলে শান্ত, সদয় আরাওয়াকোদের নির্মূল করা হয়েছিল।‘
ওয়াল্টার মিগনোলো লিখেছেন, আটারো শতকে এসে সময়কে ঔপনিবেশিক অস্ত্রে স্থানান্তরিত করা হয়েছিল। বর্বররা এখন হয়েছে ‘আদিম’,—প্রকৃতির কাছাকাছি একটা কিছু;—আর, ইউরোপ বর্তমানের কেন্দ্রস্থল,—সভ্য ও আধুনিক।
অগ্রগতির মতাদর্শকে ধারণাটি ন্যায্যতা দিয়েছে, যেটি আজো তার রক্তের ছাপ ইতিহাসের পথে রেখে চলেছে। বিংশ শতকে এসে ধারণাটি উন্নয়ন ও উন্নয়নের অধীন নামক অজুহাত খাড়া করতে কাজে লাগানো হয়েছিল।
বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু যেমন ‘অন্ধকারের সন্তান’ লেবেলটি ফিলিস্তিনকে দিয়েছেন;—যারা এখনো সেখানে পড়ে আছে, গভীর এক খাদে ডুবে যাচ্ছে ক্রমশ। আমি পরে আবার এই প্রসঙ্গে ফেরত আসব।
পূবসূরীদের ধারা বজায় রেখে চলা শক্তিশালী মার্কিন সাম্রাজ্যের আশীর্বাদ ও বস্তুগত সমর্থনে ইসরায়েল গাজায় নিধনযজ্ঞ চালায় নির্বিচারে;—যা নড়ে, যা স্থির… সবকিছু তারা মুছে ফেলে। এরপর আমাদের তথাকথিত সম্মানিত মূলধারার সাংবাদিক বন্ধুরা বাকি কাজটুকু সমাপ্ত করেন।
পশ্চিমা লেখকরা যখন তেলআবিবের বয়ান তোতাপাখির মতো আওড়ায়, আর কেলেঙ্কারিকে লঘু করে, তখন ফিলিস্তিনের জনগণ পৃথিবীর মুখচ্ছবি থেকে অদৃশ্য হতে থাকে। যখন, এসব ভাড়াটে লেখকের কেউ-কেউ ঘোষণা দিয়ে বসে,—‘গাজার অদ্ভুতুড়ে মরুভূমির দিকে তারা আলো ফেলছে’, তখন স্থানীয় সংবাদকর্মীদের দলে-দলে হত্যা করা হয়, আর তারা ছাইয়ের মতো মিলিয়ে যায়।
গোল্ডা মেয়ার একা নন। জাতি হিসেবে ফিলিস্তিনিরা অনেকের কাছেই অস্তিত্বহীন। তারা অতিরিক্ত অপ্রয়োজনীয় অস্তিত্ব।
. . .

. . .
লেখক পরিচিতি

থার্ড লেন স্পেস.কম-এর অন্যতম অবদায়ক মোস্তাফিজুর রহমান জাভেদের জন্ম ও বেড়ে ওঠা সিলেট মায়ের কোলে। পেশায় ব্যাংকার। নিভৃতচারী এই সাগ্নিক লেখালেখিতে অনিয়মিত হলেও পাঠনিবিড় গোড়া থেকেই। বিচিত্র বিষয়ে তাঁর আগ্রহ ও মনোযোগ, যদিও অধিক ভালোবাসেন সাহিত্য, দর্শন, সিনেমা ও সংগীত। আহমদ সায়েম সম্পাদিত ছোটকাগজ সূনৃত-এর অন্যতম সহযোদ্ধা তিনি।
তারুণ্যের দিনগুলোয় কিছুকাল কাটিয়েছেন সাংবাদিকতায়। ব্যাংকিং পেশার প্রচণ্ড চাপের মধ্যেও দেশি-বিদেশি ভাবুকদের নিয়ে কথালাপ এবং গদ্য ও অনুবাদে রয়েছে বিশেষ ঝোঁক। থার্ড লেন স্পেস-এ অবদায়ক হিসেবে ইতোমধ্যে বিয়ং-চুল হান, হানা আরেন্ট ও আইজ্যাক আসিমভকে নিয়ে লিখেছেন গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষণী গদ্য ও ভাষান্তর। পারিবারিক জীবনে বিবাহিত ও দুটি কন্যা সন্তানের জনক এই লিখিয়ে ভালোবাসেন বন্ধুসঙ্গ ও আড্ডা। এখনো কোনো বই প্রকাশিত হয়নি, তবে ছোটকাগজে লেখেন মাঝেমধ্যে, যদি মন চায়।
. . .



