
. . .
. . .

সিকান্দার আবু জাফর স্মরণে মোহাম্মদ আজমের বক্তব্য আমার কাছে কৌশলী বোধ হচ্ছে সুমনদা। একটি বাছাই প্রক্রিয়ার ভিতর দিয়ে তিনি নির্ধারণ করে দিতে চাইছেন,—কারা বাংলাদেশে বিকাশমান জাতীয়তার জন্য অনুকূল ছিলেন, আর কারা তা ছিলেন না। আজমের বক্তব্যকে যদি মোটাদাগে বিশ্লেষ করি, বিষয়টি তাহলে ধরতে সহজ হবে।
ষাটের দশকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বিকশিত বাঙালি জাতীয়তাকে মোহাম্মদ আজম তাঁর বক্তব্যে উন্মুক্ত একটি পরিসর রূপে তুলে ধরেছেন। ভিন্ন মেরুর দুই লেখক ফররুখ আহমদ ও সিকান্দার আবু জাফর যেখানে আনায়াসে সহাবস্থান করতে পারছেন। দুজনের মাঝখানে আবার বদরুদ্দীন উমর ও সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর মতো শক্ত বামঘরানার লোকজন সক্রিয় থেকেছেন পুরোদমে। অর্থাৎ, বাঙালি জাতিসত্তাকে সংজ্ঞায়িত করার পরিসরটি পরস্পবিরোধী বয়ানে সমৃদ্ধ ছিল। আসলেও কি তাই?
উক্ত কালপর্বে গমন করলে বাঙালি শিক্ষিত সমাজে দুটি প্রবণতা দেখতে পাই। কবি-লেখক-বুদ্ধিজীবীদের একটি বৃহৎ অংশ ওইসময় মূলত পাকিস্তানপন্থী ছিলেন। থাকাটা দোষের, সে-কথা বলছি না। দেশভাগের অনিবার্য বাস্তবতা তাঁদেরকে প্রভাবিত করেছিল। বলা ভালো, প্রভাবটি তাঁরা সযত্নে লালন করতেন;—মুসলমান জনগোষ্ঠীকে ভিকটিম ভাবার তীব্রতা যেখানে গভীর থেকেছে। এই মুসলমান একদিকে হাজার বছর ধরে বিবর্তিত বাঙালি সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। অন্যদিকে, ইসলাম প্রভাবিত সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যও রক্তে ধরে। এখানে যে-দ্বন্দ্ব অমোঘ হলো, সেটি এখন তাঁদের পাকিস্তান প্রীতির নেপথ্যে ব্যাপক অবদান রেখেছে।

ঊনবিংশ শতকে হিন্দু শিক্ষিত সমাজ পাশ্চাত্য প্রভাবিত যে-নবজাগরণকে ত্বরিত করলেন, সেখানে দ্বৈত প্রবণতা লক্ষণীয়। শিক্ষিত সমাজের একাংশ সায়েবিয়ানাকে ভিত্তি ধরে ইংরেজরাজকে প্রকারান্তরে বৈধতা দিয়েছেন তখন। রবি ঠাকুরের লেখাপত্রে সায়েবিয়ানায় ভর দিয়ে দাঁড়ানো এই ভদ্রসমাজের বিবরণ ও তা নিয়ে রঙ্গ-পরিহাস আমরা পাবো। অন্য অংশটি ইংরেজ হটাতে মরিয়া হয়েছেন ক্রমশ। ফলশ্রুতিতে ভারতীয় জাতীয়তার মতো বিমূর্ত এক ধারণার উদয় ঘটে। জাতীয়তাকে তাঁরা যে-আঙ্গিকে হাজির করেন, সেটি ছিল খণ্ডিত। হিন্দু সম্প্রদায় সেখানে বলিষ্ঠভাবে চিত্রিত হলেন, কিন্তু মুসলমানসহ অন্যান্য জনগোষ্ঠী গৌণ বা অচিহ্নিত থেকেছেন! সাম্প্রদায়িক সচেতনা ও আত্মভিমানকে এটি ত্বরান্বিত করেছিল।
নবজাগরণ, বিচ্ছিন্ন ব্যতিক্রম বাদ দিলে চরিত্রের দিক থেকে সেকুলার হতে পারেনি। সেই লক্ষ্য তার ছিল না। হিন্দু ধর্মে সংস্কারকে কেন্দ্র করে এটি তখন দানা বাঁধে। বিচিত্র পথে মোড় নিলেও জাতিসত্তা ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যে বর্ণিল এক সমাজকে একসুরে বাঁধার উপকরণে ঘাটতি ছিল পীড়াদায়ক। সোজা কথায়,—হিন্দু ভদ্রসমাজে দেখা দেওয়া জাগরণ বাংলা তথা ভারতবর্ষের শিক্ষিত সমাজে প্রভাব রাখলেও মুসলমানসহ অন্যান্য সম্প্রদায় ও জাতিসত্তার নিজেকে সেখানে প্রাসঙ্গিক ভাবার জায়গা থাকেনি। বিরোধের সূত্রপাত মূলত এখান থেকে পরে তীব্র হয়েছিল। ইংরেজরা যে-উদ্দেশ্য থেকে নবজাগরণকে বিকশিত হতে দিয়েছিল, সেটি এভাবে তাদেরকে লম্বা সময় মাইলেজ দিয়েছে এখানে।
যেমন ধরুন, বঙ্কিমকে হিন্দু জাতীয়তাবাদের অন্যতম প্রবক্তা ও সাম্প্রদায়িক অভিমানে উগ্র বলে বুঝে নিয়েছেন অনেকে। বঙ্কিমের মনোজগতে মুসলমান শাসনের ধারাবাহিক অবক্ষয় ও এর জের ধরে ইংরেজের ভারতবর্ষ কবজা করার অভিঘাত ব্যাপক ছিল। মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের কালপর্বকে তিনি অবক্ষয় ও স্থবিরতার অন্যতম সূচক মনে করতেন। ইংরেজের আগমনকে অগত্যা স্থবিরতার পাক থেকে বেরিয়ে আসার পাথেয় ভাবতে দ্বিধা করেননি। একই বঙ্কিম আবার এটি টের পাচ্ছিলেন,—ইংরেজদের কারণে ভারতবর্ষে নবতরঙ্গের সূত্রপাত ঘটলেও পেছনকার মতলব সাধু নয়। প্রগতি ও জাগরণ ঘটানোর বাসনায় তারা এখানে আসেনি। ভারতবাসীকে যদি মাথা তুলে দাঁড়াতেই হয়, সেক্ষেত্রে জাতীয়মুক্তি ঘটানোর রসদ স্থানিকতা থেকে খুঁজে নিতে হবে।
এখন তা খুঁজতে নেমে বঙ্কিম গোড়ায় চলে গেলেন। অর্থাৎ, সনাতন ভারতবর্ষে মর্মরিত আত্মিক জাগরণকে প্রাসঙ্গিক করলেন তিনি। মাঝখানের সুদীর্ঘ মুসলমান কালপর্বকে বিবেচনার অবকাশ সংকুচিত ও অনেকক্ষেত্রে একদেশদর্শী হলো তাতে। অন্তর্ভুক্তির (Inclusive) আলাপ তোলার অবকাশ থাকল না সেখানে। বঙ্কিমের এই ভাবনাছক হিন্দুত্ববাদী জাতীয়তার উন্মেষ ত্বরিত করে দিলো। তিনি সাম্প্রদায়িক ছিলেন, এইটা হচ্ছে বাজে আলাপ। তবে এ-কথা সত্য,—ভারতবর্ষের মুক্তির প্রশ্নে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তাধারায় সামগ্রিক বিবেচনার ঘাটতি প্রবল থেকেছে।

প্রতিক্রিয়া আমরা দেখতে পেলাম ইসমাইল হোসেন সিরাজীদের মধ্যে। দুর্গেশনন্দিনীর পালটা জওয়াব রায়নন্দিনী। যেহেতু, সদ্য রাজ্যহারা সিরাজীরা ইংরেজকে কোনোভাবে মেনে নিতে প্রস্তুত ছিলেন না। অন্যদিকে, ইংরেজশাসনকে মোকাবিলার প্রশ্নে হিন্দু সম্প্রদায়ের ভূমিকা তাঁদের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। ভারতমুক্তির পথ খুঁজতে নেমে ইসলামকে তাঁরা হাতিয়ার করলেন। এর পেছনে আবার বিশ্বব্যাপী মুসলিম উম্মাহ ও ইসলামি খেলাফত কায়েমের বাসনা থেকেছে সংগোপন। হিন্দু সহ অন্যান্য সম্প্রদায় যেখানে ওই অনির্দিষ্টই থাকলেন!
সিরাজীদের একাংশ পরে আবার ইংরেজকে বৈধতা দিতে মরিয়া হয়েছেন। রায় বাহাদুরের প্যারালাল খান বাহাদুরকে আমরা পেলাম। বাকিরা ইসলামি রেনেসাঁসের খোয়াবে হলেন বিভোর। এই কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্টের মধ্যে রুশ বিপ্লবের অভিঘাতে শিক্ষিত সমাজে বামপন্থীরা বেশ প্রবল হয়ে উঠলেন। হিন্দু ও মুসলমানের অব্যাহত ক্যাচালের মীমাংসায় শ্রেণিমুক্তির বিপ্লবকে তাঁরা হাতিয়ার করলেন সেখানে। দুটি সম্প্রদায়ে সক্রিয় শিক্ষিত সমাজের বড়ো অংশ যদিও বামপন্থীদের শত্রু জ্ঞান করছিল তখন।
ত্রিমুখী এই সংঘাতের বিষফল হচ্ছে ভারত বিভাজন। আবু জাফর শামসুদ্দীন তাঁর ম্যাগনাম ওপাস পদ্মা মেঘনা যমুনায় কনফ্লিকটি তুলে ধরেছিলেন! ফররুখ আহমদরা ত্রিমুখী এই সংঘাতকে উত্তরাধিকার হিসেবে বহন করছেন তখন। ভাবাদর্শের প্রশ্নে মুসলমান কবি-লেখক-বুদ্ধিজীবী সমাজ যারপরনাই দেশবিভাজনের জেরে দুটি ধারায় ভাগ হয়ে গেলেন। এর একটি ভাগে সৈয়দ আলী আহসানরা পাকিস্তানের মধ্যে মুসলমান সম্প্রদায়ের আত্মপরিচয়ের সুরাহা ও আত্মজাগরণের উপায় দেখতে পাচ্ছিলেন।
অন্য ভাগে সিকান্দার আবু জাফররা দেখছিলেন মরণবীষ। ধর্মীয় পরিচয়কে তীব্র করে তোলা মানচিত্রভাগ তাঁরা মানতে পারেননি। দ্বিজাতি তত্ত্ব নিয়ে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী যে-কারণে সবসময় সমলোচনামুখর থেকেছেন। অন্যদিকে, ভারত রাষ্ট্রে এভাবে পড়ে থাকাটাও পোষাচ্ছিল না। এখান থেকে বামঘরানায় ইমান রাখা লোকজন বিপ্লবের কথা ভেবেছেন। বিপ্লব-অনুকূল পরিবেশ তৈরির রসদ সমাজদেহে মজুদ ছিল, তবে নিজস্ব ক্ষমতায় একে তুঙ্গে নেওয়ার যজ্ঞে বামপন্থাকে আমরা ফিরে-ফিরে ব্যর্থ হতে দেখেছি।
পূর্ব পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশকে জন্মদানের ঘটনায় সিরাজুল আলম খানদেরকে যে-কারণে আমরা প্রথমে মাওলানা ভাসানীর ঘাড়ে চাপতে দেখছি। ভাসানী অপারগতা প্রকাশ করায় তাঁরা আতাউর রহমানের ঘাড়ে বন্দুক রেখে বাংলাদেশের জন্ম দিতে মরিয়া হলেন। আতাউর রহমান ফিরিয়ে দিলে, অগতির গতি শেখ মুজিবের ঘাড়ে সওয়ার হতে হলো! দেশ স্বাধীন হওয়ার পর শেখ মুজিবের মধ্যে তাঁরা দেখতে পেলেন বিপ্লব ব্যর্থ করে দেওয়ার অপচেষ্টা। মুজিব যদিও তাঁদেরকে এরকম প্রতিশ্রুতি কখনো দেননি যে,—তিনি মহান বিপ্লব সাধন করিতে যাইতেছেন। তাঁর কাছে বাংলাদেশ স্বাধীন করার বিষয়টি ছিল নিখাদ নেগোসিয়েশন।
পাকিস্তানি শাসকরা যদি সেইসময় বৈষম্য বিলোপে বিবেচনার পরিচয় দিতে পারত, পাকিস্তান তাহলে ভাঙে না। তারা তা করেনি। সংগতকারণে স্বাধীনতার দিকে হাঁটা ছাড়া শেখ মুজিবের বিকল্প থাকেনি। মুজিব তাঁর সময়কার যুগবিশ্ব অনুসারে দেশগঠনের ভাবনাটি ভেবেছেন, এবং তা কোনো অপরাধ হতে পারে না। আওয়ামী লীগকে তিনি এরকম কোনো দল হিসেবে বিবেচনা করেননি অথবা নেতৃত্বও দেননি, যেটি কিনা নিখাদ বিপ্লবী পার্টিলাইন মানতে বাধ্য থাকবে! সমাজতন্ত্র ও গণতন্ত্র বলতে শেখ মুজিব যেরকম বুঝতেন, এর সঙ্গে সিরাজুল আলম খানদের মিলবার কথা নয়। তাঁর ঘাড়ে সওয়ার হওয়া সুতরাং ঐতিহাসিক ভ্রান্তি ও চিরাচরিত বাম-হঠকারিতাকে পুনরায় নগ্ন করে যায়।

মজার ব্যাপার হলো, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম আবুল মনসুর আহমদ, সৈয়দ আলী আহসান থেকে আরম্ভ করে তামাম পাকিস্তানপন্থী লেখকসমাজ, এবং সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, বদরুদ্দীন উমর থেকে সেকালের লাল বিপ্লবী আল মাহমুদ গং… সকলকে এককাতারে দাঁড় করিয়ে দিলো! আবুল মনসুর আহমদরা বাংলাদেশের অভ্যুদয়কে মন থেকে মেনে নেননি। তাঁদের মনে এই শঙ্কা ছিল,—এতে করে ভারতকে সুবিধা করে দেওয়া হলো। বাঙালি মুসলমানের আত্মবিকাশ ও আত্মপরিচয় ঘুরেফিরে ভারতবর্ষের প্রভাববলয়ে জিম্মি থেকে যাবে।
ওদিকে, শেখ মুজিবের মতো ভুল ব্যক্তির ঘাড়ে চড়ে বিপ্লব সম্পাদন করতে নামা বামপন্থীরা ভারতকে আঞ্চলিক সাম্রাজ্যবাদী ও তাদের অন্যতম প্রতিপক্ষ সাব্যস্ত করলেন। চৈনিক বাম বদরুদ্দীন উমর আগে থেকে ভারত ও মুজিববিরোধী ছিলেন। একাত্তরের যুদ্ধে তাঁর না ছিল কোনো আগ্রহ অথবা অংশগ্রহণ। অনেকে আবার কট খাওয়ার দোষ এড়াতে পিনাকীর ভূমিকায় থেকেছেন সক্রিয়। আহমদ ছফার ম্যাগনাম ওপাস বাঙালি মুসলমানের মন বইটি কার্যত এই ফেরে জন্ম নিয়েছিল।
দুটি ভিন্নধারার বুদ্ধিজীবীতা এভাবে যখন পরস্পরের কাছাকাছি হতে থাকে,—বিপজ্জনক প্রতিক্রিয়াশীলতার জন্ম সেখানে অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায়। আবুল মনসুর গং চাইছেন বাঙালি মুসলমানের স্বকীয়তা, তার ইমান-তাহজিব ও তমদ্দুনকে নির্ভয় দেবে এরকম রাষ্ট্রকাঠামো;—এটি প্রতিহত করবে ভারতীয় আগ্রাসন! বামরা চাইছেন রাষ্ট্রের খোলনলচে পালটে দেওয়া বিপ্লব;—সেখানে আবার ধর্মীয় আত্মপরিচয়কে মুখ্য করা হবে না; তবে ধর্মীয় সম্প্রদায় রূপে প্রত্যেকের স্বকীয়তা ও সহাবস্থান বজায় থাকবে… ইত্যাদি। দিল্লি ও ওয়াশিংটনের আগ্রাসনকে তাঁরা এভাবে ঠেকাবেন। পিকিংকে কী দিয়ে কী করবেন, সেটি তাঁরা জানেন ভালো।
ঐতিহাসিকভাবে ধর্মীয় সংস্কারে জেরবার বাঙালিকে কোন পথে আজব এই মেওযা তাঁরা পাইয়ে দেবেন, উক্ত বিষয়ে বামানুগ শিক্ষিত সমাজকে মুখে মারি বিশ্ব ছাড়া বিকল্প ভূমিকা নিতে দেখিনি। যার নাই কোনো গতি, সে করে ওকালতির মতো ঘুরেফিরে মাওলানা ভাসানীকে দিয়ে শেখ মুজিবকে রিপ্লেস করার খেলা খেলছেন আজো! এর ফলে তাদেরকে আমরা চট করে ইসলামপন্থীদের পাজামার নিচে ঢুকে পড়তে দেখি! দুটি প্রবল প্রতিপক্ষের চাপ শেখ মুজিবকে বাকশাল গঠনের ভাবনায় ঠেলে দিয়েছিল। ভারতের সঙ্গে বিনিময় ও লেনদেনের প্রকৃত বাস্তবতাকে মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য বয়ানে তুলে ধরার ঘটনায় আওয়ামীদের বুদ্ধিজীবীতার বহর ছিল লজ্জাস্কর।
মোহাম্মদ আজম তাঁর সেমিনার বক্তব্যে এই-যে ষাটে দশকে দেখা দেওয়া জাতীয়তাকে ভিন্ন-ভিন্ন প্রসূন বলে বাহবা দিলেন,—একে যে-কারণে কৌশল ভাবতে হচ্ছে। দুটোর কোনোটাই শেষ পর্যন্ত ভিন্ন প্রসূন থাকেনি। পাকিস্তান রাষ্ট্র জন্ম নেওয়ার সুখস্বপ্ন বিভীষিকায় মোড় নিয়েছিল। যেখানে, উভয়পক্ষ এই বিভীষিকাকে মোকাবিলার সাহস দেখাতে পারেননি। তাঁরা আসলে একে অন্যের প্রতিধ্বনি;—এবং প্রতিক্রিয়াশীল। তাঁদের কারণে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে এতো ক্যাচাল ও ঘৃণার চাষাবাদ ঘটেছে দেশে।
আনিসুজ্জামান ও সিকান্দার আবু জাফরকে এই-যে মোহাম্মদ আজম বেছে নিতে আগ্রহী, এর পেছনে কাজ করেছে পঁচাত্তর পরবর্তী ঘাত-প্রতিঘাত থেকে জন্ম নেওয়া উগ্র প্রগতিশীলতা ও একে প্রত্যাখ্যানের বাসনা। যদিও, এই প্রগতিশীলতা তার নিজস্ব ভ্রান্তিসহ কেন ওইসময় জন্ম নিয়েছিল,—সেটি সুচতুরভাবে পাশ কাটিয়ে গেছেন মোহাম্মদ আজম।
মানে দাঁড়াল, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, শওকত ওসমান, আবু জাফর শামসুদ্দীন থেকে আরম্ভ করে শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, হুমায়ুন আজাদ… পঁচাত্তর পরবর্তী প্রগতিশীল লেখকের লম্বা লিস্টকে তিনি একপ্রকার ছাটাইয়ের ক্ষেত্র তৈরি করছেন। বাংলাদেশে উৎকৃষ্ট সাহিত্যের বড়ো অংশ এঁদের হাতে জন্ম নিয়েছিল;—কথাটি বলছেন বটে, কিন্তু এই সাহিত্যসৃষ্ট জাতীয়তাকে ভিন্ন প্রসূন রূপে জায়গা দেওয়ার প্রশ্নে তাঁর ভূমিকা সিলেক্টিভ।
মোহাম্মদ আজমরা এভাবে ক্ষেত্র তৈরির কাজে সক্রিয় আছেন। স্বাধীনতার পর থেকে এটি চলছে। ইউনূস স্যারের মুখনিঃসৃত অমর শব্দযুগল ম্যাটিকৌলাসলি ডিজাইনড সুতরাং নতুন ঘটনা নয়। এর বীজ পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মলগ্নে বোনা হয়েছিল। আর, মুজিব হত্যার মধ্য দিয়ে একে পূর্ণতা দানের কাজে মোহাম্মদ আজমরা নিরলস শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন।
. . .
. . .



