
নীরব ভাষা
হয়তো সব কথা উচ্চারণের জন্য নয়।
কিছু শব্দ জন্ম নেয় চোখের গভীরে,
ঠোঁটপর্যন্ত এসে ফিরে যায় নিজের অন্ধকারে।
কতশত না-বলা কথা ধুলোর মতো জমে থাকে
পুরোনো চিঠির ভাঁজে
অথবা মানুষের হাসির আড়ালে।
নদী যেমন সকল স্রোতের হিসাব রাখে না,
আকাশ যেমন সব পাখির নাম মনে রাখে না,
তেমনই মানুষও সব দুঃখের ভাষা খুঁজে পায় না।
রাত গভীর হলে চাঁদ কিছু বলে না,
গাছেরা কোনও প্রশ্ন করে না,
তবু অন্ধকারের বুকজুড়ে অদৃশ্য সংলাপ
ধীরে ধীরে জেগে ওঠে।
সেখানে কান্নারও শব্দ নেই,
অভিমানেরও কোনও উচ্চারণ নেই—
শুধু সময়, নিজের ক্লান্ত মুখখানি নিয়ে,
নিঃশব্দে বসে থাকে।
. . .
অচেনা শহর
একদিন ফিরে গেলাম
আমার পুরনো শহরে।
শহরটি তখন
আমাকে চিনতে পারল না।
যে-রাস্তায় একদিন খালিপায়ে হেঁটেছি,
সেখানে এখন উঁচু দালান।
যে-পুকুরে দুপুরের রোদে
আকাশের মুখ দেখতাম,
সেখানে আজ কাচের বিশাল ভবন।
চায়ের দোকানটি নেই।
নেই সেই বেঞ্চ,
যেখানে বসে বন্ধুরা
ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার
হাজার পরিকল্পনা করত।
শুধু মোড়ের পূরাতন কৃষ্ণচূড়া গাছটি
আমাকে দেখে স্থির হয়ে রইল।
কাছে গিয়ে জিগ্যেস করলাম,
আমাকে চিনতে পারছে কি না;
গাছটি কোনও উত্তর-ই দিল না।
তার একটি শুকনো পাতা
ধীরে ধীরে মাটিতে পড়ল।
তখন মনে হল—
কোনও শহর বদলায় না,
বদলে যায় তার ভিতরের মানুষগুলো।
কেউ চলে যায় দূর-দেশে,
কেউ চলে যায় অন্য-জীবনে,
কেউ কেউ থাকে—
তবু আগের মানুষটি আর থাকে না।
সন্ধ্যা নামে।
আমি সেই পুরনো পথ ধরে
হাঁটতে লাগলাম।
হঠাৎ মনে হল,
পেছন থেকে কেউ
আমাকে ফিরে যেতে বলছে।
আমি ঘুরে দাঁড়ালাম।
আমার পেছনে কেউ-ই নেই।
শুধু বাতাসের ভিতর
কিছু পুরনো সময় দাঁড়িয়ে ছিল।
আমি হাত বাড়ালাম।
একটু হাসির শব্দ শোনা গেল,
তারপর অন্ধকারের ভিতর
সবকিছু মিশে গেল।
. . .

শহরে বৃষ্টির আগে
বৃষ্টির আগে
শহরটা অদ্ভুত শান্ত হয়ে যায়।
দোকানের সাইনবোর্ডগুলো
নিভে যাওয়া মাছের চোখের মতো
ঝুলে থাকে।
রাস্তার ধারে জমে ওঠে
অপেক্ষার গন্ধ।
মানুষ হাঁটে দ্রুত,
যেন প্রত্যেকে কোথাও
বড়ো দেরি করে ফেলেছে।
আকাশ নিচু হয়ে আসে,
ধুলো ও কাগজ
উড়িয়ে নেয় হাওয়া।
মনে হয়—
শহরটা ভিজে যাওয়ার আগে
কাঁপছে।
. . .
ফিরে যেতে পারি না
শৈশবে ফেলে আসা মাঠ
আর আগের মতো নেই।
ঘাসের ওপর দৌড়ানো বিকেলগুলো
কবে যেন নীরবে বড়ো হয়ে গেছে।
একসময় সেখানে
আমাদের চিৎকারে আকাশ কেঁপে উঠত,
এখন শুধু বাতাস আসে
পুরনো নামে ডাকতে।
দূর থেকে তাকিয়ে থাকি—
মনে হয় মাঠটা এখনও অপেক্ষা করছে।
শুধু আমরা আর
ফিরে যেতে পারি না আগের বয়সে।
. . .
আমার শহর
কতদিন হয়ে গেল
আমার শহর ঘুমায় না।
রাত-গভীরেও
জানালাগুলো খোলা রাখে,
যেন কেউ হঠাৎ আসবে ফিরে।
. . .
লেখক পরিচয় : মোহাম্মদ জায়েদ আলী : ওপরের ছবি অথবা লিংক চাপুন
. . .

মোহাম্মদ জায়েদ আলী : অবদায়ক : থার্ড লেন স্পেস.কম
মোহাম্মদ জায়েদ আলী-র অন্যান্য রচনা ও প্রাসঙ্গিক পাঠের জন্য এখানে চাপুন



