পোস্ট শোকেস - বিবিধ ও বিচিত্র

মায়া : মোস্তাফিজুর রহমান জাভেদ

Reading time 8 minute
5
(11)
Conceptual Artwork-I, in collaboration with Gemini; @thirdlanespace.com

মাঘ মাস তখন কেবল ঢুকছে শহরে। শীত এবার বেশিই পড়বে মনে হচ্ছে। বাসায় ফিরব বলে মিনহাজ ভাইয়ের ডেরা থেকে বেরিয়ে মূল সড়কে উঠেছি। ঘড়ি ততক্ষণে মাঝরাতের কাঁটা ছুঁইছুঁই করছিল। আহমদ সায়েম ভাইয়ের ছোটকাগজ ‘সূনৃত’ নতুন সংখ্যার তোড়জোড় চলছিল। লেখকরা একে-একে লেখা পাঠাচ্ছেন। সাপ্তাহিক ছুটির দিন ছাড়া সময় বের করা আমার জন্য কঠিন। আজ যেহেতু শুক্রবার, মিনহাজ ভাইয়ের ডেরায় হানা দিয়েছিলাম কাজ এগিয়ে নিতে। অনেকগুলো লেখা সায়েম ভাইয়ের হাতে এসে গেছে। লেখাগুলো পড়তে বসে সময় কোনদিক দিয়ে চলে গেছে, তার কিছু টের পাইনি! বাড়ি ফিরতে এখন গাড়িটাড়ি কিছু পেলেই হলো!

রাস্তায় লোকজন চোখে পড়ছে না। শীতরাতে এই এক সমস্যা! রাত গভীর হতে-না-হতে শহর খালি হতে থাকে। জরুরি কাজ ছাড়া কেউ বাইরে বের হয় না। কম্বল মুড়ি দিয়ে বিছানায় শুয়ে থাকে। বাজারগুলো ফাঁকা হতে শুরু করেছে ততক্ষণে। ঔষধের দোকান আর দুটো-একটা চায়ের টং ছাড়া দোকানপাট বন্ধ করে দোকানিরা ঘরে ফিরে গেছে।

মিনহাজ ভাইয়ের বাসার এই দিকটা আবার বেশ নির্জন! রাতপ্রহরীদের হুইসেলের আওয়াজ ছাড়া নীরবতা চুঁইয়ে পড়ছে সবখানে। আমি ইতিউতি তাকাই। কুয়াশা ঘন হওয়ার কারণে সবকিছু অস্পষ্ট দেখাচ্ছে। এখানে দাঁড়িয়ে থাকলে গাড়ি পাওয়াটা কঠিন হবে। পকেট থেকে সিগ্রেট বের করে ধরাই। ধোঁয়ার কুণ্ডুলী বাতাসে দলা পাকিয়ে কুয়াশায় মিশে যায়। না, এভাবে হবে না। হাঁটা শুরু করা তারচেয়ে ভালো। সিগ্রেটে ধোঁয়ার কুণ্ডুলী পাকিয়ে হাঁটা শুরু করি। সামনে বেশ বড়োসড়ো একটা বাজার রয়েছে। ঈদগা বাজার বলে স্থানীয়রা। ওখানে গেলে একটা কিছু নিশ্চয় পাওয়া যাবে। না-পেলেও ক্ষতি নেই। হেঁটেই বাড়ি ফিরব বলে ঝটপট ডিসিশন নিয়ে ফেলি।

একটা মনুষ্য অবয়ব চোখে পড়ল এতক্ষণে! ঘন কুয়াশা ভেদ করে কেউ একজন আমার দিকেই আসছিল। যাক, অবশেষে মানুষের দেখা পাওয়া গেল। শীতের পোশাকে পুরোপুরি নিজেকে ঢেকে রেখেছে। মুখটা কেবল দেখা যাচ্ছিল ঝাপসা। কাছাকাছি আসতেই মনে হলো পরিচিত কেউ হবে। আমি আগ্রহ নিয়ে তাকাই। আরে, ইনি তো ফতেহ ওসমানী ভাই। স্বল্পস্থায়ী সাংবাদিক জীবনে আমার সহকর্মী ছিলেন একসময়। কিন্তু, তা কী করে সম্ভব! বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে না তো? মানে আমার এরকম করে ভাবা-যে,—ফতেহ ওসমানীকে দেখছি চোখের সামনে! হ্যালুসিনেশন অথবা ভৌতিক কিছু নয় তো?

আগন্তুক আমার সামনে এসে থমকে দাঁড়িয়ে পড়েন। বিস্ময়কে দ্বিগুণ করে স্মিত হাসেন তিনি,—আমাকে চিনতে পারছেন না জাভেদ? আমি ফতেহ ওসমানী! ওনার দিকে ভালো করে তাকাই পলক। ফতেহ ওসমানীই বটে! শেষবার যেমন দেখেছি, প্রায় সেরকম আছেন এখনো! বয়সটা কেবল একটু বেড়েছে। মুখে বলিরেখার ছাপ বেশ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। গালের অংশটা কুঁচকে গেছে সামান্য। মনে মনে হিসাব করি। প্রায় দশ বছর পর দেখছি তাকে! এটুকু পরিবর্তন স্বাভাবিক। ফতেহ ওসমানী সত্যিই আমার সামনে দাঁড়িয়ে! ঘটনাটি হ্যালুসিনেশন নয় তাহলে!

মাথা ঠাণ্ডা রেখে তবু নিশ্চিত হওয়া দরকার। কিন্তু, এমন পরিস্থিতিতে কী-করে মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হয় তা বুঝে আসছে না! পরিস্থিতির ওপর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করি,—‘আপনি ফতেহ ওসমানী ভাই?’ গলা থেকে কথাগুলো যখন বেরিয়ে আসছিল, আমার নিজের কাছেই বেখাপ্পা লাগছিল শুনে। তিনি হাসতে শুরু করেন। হাসির দমকায় রাতের নীরবতা ভেঙে খানখান হয়। সেই পরিচিত হাসি! অফিসে, রেস্তোরাঁয় বা আড্ডায় অবিকল এরকম হেসে উঠতেন ফতেহ ওসমানী! হাসির মধ্যে ধরা পড়ত সারল্যে ভরা শিশুমন।

হাত বাড়িয়ে দিলেন আমার দিকে। আমিও হাত বাড়ালাম। না, হাতটা মানুষেরই। হাতের আঙুল বেশ উষ্ণ। হৃৎস্পন্দন আর রক্তচলাচল পরিষ্কার টের পাচ্ছি। আমি কি ভুল শুনেছি-যে,—ফতেহ ওসমানী মারা গেছেন! কে বা কারা তাকে রাতের অন্ধকারে খুন করে! মনে করতে পারি না কিছু। মাথা ঠিকঠাক কাজ করছে না। ধুস! দুম করে বলে ফেলি,—আপনি তাহলে বেঁচে আছেন ওসমানী ভাই? কে-যেন আমায় বলেছিল, আপনি আর বেঁচে নেই!

আমার কথায় ওসমানী ভাই হো হো করে হেসে ওঠেন,—কী আশ্চর্য, আমি মারা গেছি এই সংবাদটা একবার যাচাই করেননি আপনি? এটা ঠিক কাজ হলো না জাভেদ। আমার সঙ্গে অবিচার করলেন আপনি! সম্পর্কের দাবি বলে তো কিছু আছে পৃথিবীতে,—নয় কি?

ওসমানী ভাইয়ের কথা শুনে লজ্জা ও অপরাধবোধ ভর করে আমার মধ্যে। উনি কিছু ভুল বলেনি। আমার উচিত ছিল নিশ্চিত হওয়া,—উনি সত্যি বেঁচে আছেন, নাকি খুন হয়েছেন! একটা সময় আমার সহকর্মী ছিলেন। তার বাসায় কত গিয়েছি! এমন একটা মানুষের মারা যাওয়ার খবর আমি কিনা বিশ্বাস করে বসে আছি কিছু যাচাই না করে! আমার এই নিস্পৃহতার জন্য অনুতপ্ত হওয়াটা কম হয়ে যায়। মাথা নিচু করে থাকি।

পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে ওসমানী ভাই মুখ খোলেন,—এত রাতে কোথা থেকে ফিরলেন? বলি,—মিনহাজ ভাইয়ের বাসায় গিয়েছিলাম। সায়েম ভাইয়ের পত্রিকার কাজ চলছে, রাত হয়ে গেছে আজ! গাড়িটাড়ি পাচ্ছি না কিছু;—এর মাঝে হঠাৎ আপনাকে দেখে সত্যি চমকে গেছি!

আমার কথায় ওসমানী ভাই হাসেন,—এত রাতে গাড়ি পাওয়া কঠিন। আমিও পাচ্ছি না। বাজারের ওদিক থেকে আসছিলাম। কিচ্ছু পেলাম না। চলুন, দুজনে গল্প করতে করতে আগাই। আপনার বাসায় যাওয়ার পথে একজনের সঙ্গে দেখা করব বলে বেরিয়েছি। চলুন, আগাই। তার কথায় আমি অপ্রতিভ মাথা নাড়ি। মনে দ্বিধা ও প্রশ্নের ঝড় বইছে এখনো,—সত্যিই কি ওসমানী ভাইয়ের সঙ্গে হাঁটছি আমি? তাও মাঝরাত ছুঁইছুঁই সুনসান শীতের রাতে? ওসমানী ভাই তাহলে মারা যাননি!

কুয়াশাঢাকা নির্জন সড়ক ধরে দুজনে হাঁটতে থাকি। পকেট থেকে সিগ্রেট বের করে ধরাই যেন-বা পরিস্থিতির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার আশায়। এমনকি এটা ভুলে-যে,—অতীতে কখনো ওসমানী ভাইয়ের সামনে সিগ্রেট ধরাইনি। তিনি আমার দিকে থাকিয়ে মৃদু হাসেন :

—আমার মনে হয় আপনার সিগ্রেট আরো কমানো উচিত।

আমি হেসে ফেলি,—খারাপ অভ্যেস। চেষ্টা করেও ছাড়তে পারছি না।

—হুঁ, তা বটে! আচ্ছা কী করেন আজকাল, শুনেছি ব্যাংকে ঢুকেছেন? এখনও আছেন সেখানে? নাকি ছেড়ে দিয়েছেন?

—আছি তো। চাইলেও কি ছাড়া যায় ওসমানী ভাই? বাদুড়ের মতো লটকে আছি জীবনের সঙ্গে।

হো হো করে আবার হেসে ওঠেন ফতেহ ওসমানী,—সুন্দর বলেছেন, লটকে আছেন জীবনের সঙ্গে। আরে ভাই অনেকে তো এই লটকে থাকতেও পারে না। জানে না, কী-করে লটকে থাকতে হয়। সংসার শুরু করেছেন?

—হ্যাঁ, বিয়ে করেছি অনেকদিন হলো। দুটো মেয়ে আছে। বড়োটি স্কুলে যাওয়া শুরু করেছে।

আমার কথা শুনে হঠাৎ আনমনা দেখায় তাকে :

—আমার মেয়েদের কথা মনে আছে আপনার?

আকস্মিক প্রশ্নে হতভম্ব হয়ে পড়ি। সত্যি কথা বলতে কী আমি ভুলে গিয়েছিলাম! অগণিত ঘটনার ভিড়ে কোন অতলে হারিয়ে গিয়েছিল ওসমানী ভাই ও তার পরিবার! বিস্মরণযোগ্য রাতে হঠাৎ তার আগমন ও সরব উপস্থিতি আমায় স্মৃতিকাতর করে তোলে। অবচেতনের গভীর থেকে তুলে আনি টুকরো স্মৃতির অবশিষ্ট। একটু-একটু করে স্মৃতির কপাটগুলো খুলতে শুরু করে।

Conceptual Artwork-II, in collaboration with Gemini; @thirdlanespace.com

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখার পাঠ মাত্র শেষ করেছি তখন। রেজাল্ট বের হয়নি। ঝড়-বাদলার সন্ধ্যায় হঠাৎ লিয়াকত শাহ ফরিদী ভাই দেখা দিলেন জিন্দাবাজারে আমাদের সান্ধ্য আড্ডায়। ফরিদী ভাই বয়সে গুরুজন হলেও তরুণদের সঙ্গে মন খুলে মিশতেন। আমাকে স্নেহও করেন খুব। সান্ধ্য আড্ডায় হুটহাট ঢুকে পড়তেন মাঝেমধ্যে। দেখা দিতেন এবং ডুব দিতেন পুনরায়। শহরে তাঁর খ্যাতি আছে সাংবাদিকতায়। অধ্যাপনাও করেন সুপরিচিত এক কলেজে।

তো সেই ফরিদী ভাই নতুন দৈনিক বের হওয়ার খবর নিয়ে আড্ডায় হানা দিলেন সেদিন। আয়োজন নাকি বিরাট হতে যাচ্ছে। রাজধানীর নামকরা প্রেস থেকে পত্রিকাটি ছেপে বের হবে ও ভোরে পৌঁছাবে শহরে। পত্রিকার মূল দায়িত্ব তার কাঁধে পড়েছে। সম্পাদনা বিভাগে আমাদেরকে কাজে লাগানোর ভাবনা মাথায় ভর করেছে ফরিদী ভাইয়ের। আমি আর তরুণ গল্পকার ও দেশি-বিদেশি সাহিত্যের পোকা এমদাদ ভাই আগ্রহী হয়ে উঠি সবটা শুনে। নতুন কিছুর উত্তেজনা দুজনকে চেপে ধরে। শর্ত জুড়ে দেই,—কাজ করব ফরিদী ভাই, তবে স্বাধীনতা দিতে হবে। জোর করে কিছু চাপানো যাবে না।

যাকগে, পরদিন পত্রিকা অফিসে হাজির হলাম। সুন্দর পরিবেশ। ফরিদী ভাই সকলের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। সম্পাদনা বিভাগে হালকাপাতলা গড়নের মধ্যচল্লিশে পা রাখা ফতেহ ওসমানী ভাইয়ের সঙ্গে ওই প্রথম দেখা ও পরিচয়। সিনিয়র সাংবাদিক। অভিজ্ঞতা অনেক। জাতীয় দৈনিকে কাজ করেছেন। শহরের সাংবাদিকমহলে আলাদা সুখ্যাতি রয়েছে তার। সাংবাদিকতার পাশাপাশি ছড়াও লেখেন। সিলেটে তখন ছড়াসাহিত্য খুবই ফলবান ছিল। ফতেহ ওসমানী নিয়ম করে ছড়া লিখতেন। এমন একটা পোড়খাওয়া মানুষ দিব্যি বরণ করে নিলেন আমাদের মতো শিক্ষানবিশ সংবাদকর্মীকে।

কাগজটির ডামি বেরুচ্ছিল কেবল। আমাদের জন্য রোমাঞ্চক ছিল সেই অভিজ্ঞতা। কিছু একটা লিখছি, আর পরদিন তা কাগজে ছেপে বের হচ্ছে! উত্তেজনা বেগবান হলো উদ্বোধনী সংখ্যার লেখা বাছাই ও সংগ্রহের কাজে নেমে। ওই সময়টায় ওসমানী ভাই ধরে ফেলেন আমাদের মনের গঠন ও তারুণ্যের জেদ। জহুরি চোখ দিয়ে আমার ও এমদাদ ভাইয়ের পছন্দ-অপছন্দকে পড়ে নিচ্ছিলেন তিনি। গতানুগতিকের বাইরে কিছু একটা করার আকাঙ্ক্ষায় তারও সায় রয়েছে, এটা টের পেতে আমাদের অসুবিধা হয়নি।

এমদাদ ভাই শহরের সাহিত্যমহলে যাতায়াত করতেন নিয়মিত। তার পরিচয় ও ঘনিষ্টতার বৃত্ত আমার চেয়ে বড়ো ছিল। সংবাদপত্রের জগতেও অনেকে তাঁকে ভালোই চিনতেন। ওসমানী ভাইয়ের সঙ্গে তার ও আমার অন্তরঙ্গতা এভাবে জমে উঠল। মনে আছে, কোনো এক সন্ধ্যায় একপোটলা কাগজ নিয়ে হাজির হলেন তিনি। চোখেমুখে উত্তেজনার ছাপ। পোটলাটা হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন,—এই দেখেন কী নিয়ে এসেছি!

খুলে দেখি কিছু কিছু গোপন ডকুমেন্টস। এক উপাচার্যের অনিয়মের প্রমাণ বের করে এনেছেন ওসমানী ভাই। একটা প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হতে চলছিল এসব অনিয়মের কারণে। তাকে বললাম,—ওসমানী ভাই, এই কাজে আপনার সঙ্গে আমিও আছি। দুজনে মিলে খাটলাম টানা কয়েকদিন। তৈরি হলো ডকু-ফিচার। ওসমানী ভাই ফিচারটি জাতীয় সাপ্তাহিকে পাঠালেন। সম্পাদকের ফোন পেলেন পরের দিন,—ডকু-ফিচারটি তিনি ছাপতে চাইছেন, সেইসঙ্গে বিভাগীয় প্রতিনিধির অফার দিলেন তাৎক্ষণিক। ওসমানী ভাইয়ের সঙ্গে সম্পর্কের গভীরতায় এই অ্যাসাইনমেন্ট নতুন মাত্রা এনে দিয়েছিল। পরে আমিই ছিলাম তার যে-কোনো লেখার প্রথম পাঠক, অন্তত যতদিন আমরা একসঙ্গে কাজ করেছি।

তার পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হলো। দুটি মেধাবী কন্যাসন্তানের জনক তিনি। ছোটটি তখন সবে স্কুলে যাওয়া-আসা শুরু করেছে। বাবা-মেয়ের ভালোবাসার বন্ধন দেখে মন ভরে যেত। বাবাঘেঁষা ছিল মেয়ে দুটি। হিসাব করে দেখলাম,—আমার বড়ো মেয়ের যে-বয়স এখন, ওসমানী ভাইয়ের ছোট মেয়ের বয়স প্রায় কাছাকাছি ছিল সেইসময়। মেয়েদের নিয়ে গর্বের অন্ত ছিল না ওসমানী ভাইয়ের মনে। ওদরেকে নিয়ে বড়ো স্বপ্ন দেখতেন। শহরের সবচেয়ে ভালো স্কুলে ভর্তিও করিয়েছিলেন। বাসা থেকে স্কুল অনেক দূরে ছিল। ঝুট-ঝামেলার মধ্যেই পরম নিষ্ঠায় মেয়েদেরকে স্কুল থেকে আনা-নেওয়া করতে দেখেছি তাকে।

ভটভটিমার্কা একটা মোটরবাইক ছিল তার। মোটরবাইকটি যেন ট্রেডমার্ক! তার অস্তিত্বের অংশ ছিল যানটি। অফিসে ওসমানী ভাইয়ের উপস্থিতি বোঝার সহজ উপায় ছিল এই বাইক। ওটায় চেপে তার বাসায় গিয়েছি তখন। শহরের উত্তরে চা বাগানের পাশ ঘেঁষে নিরিবিলি জায়গায় বাসা নিয়েছিলেন ওসমানী ভাই।

Journalist Liaquat Shah Faridi and Writer Emdad Rahman; Image Source & Credit: Collected; @thirdlanespace.com

ওসমানী ভাইয়ের ফুটফুটে মেয়ে দুটো প্রথম সাক্ষাতে আমাকে আপন করে নিয়েছিল। পিঠাপিঠি বয়স দুজনের। বড়ো মেয়েটি একটু গম্ভীর স্বভাবের। মুরব্বি টাইপের হাবভাব দেখে মজা লাগত খুব। ছোটোটি ছিল উলটো। চাচ্চু বলে দুনিয়ার যত গল্প আছে সব একনাগাড়ে বলে যেত সে। মাঝেমধ্যে বড়ো বোন এসে হালকা শাসনের সুরে তাকে ঝাড়ি দিত,—চাচ্চুকে বিরক্ত করিস না উর্বি।

ছোটো মেয়ের মধ্যে মানুষকে আপন করে নেওয়ার ঐশ্বরিক ক্ষমতা ছিল। সারাক্ষণ ফটফট করে কথা বলছে! স্মরণশক্তি প্রখর ছিল দুজনের। স্কুলে স্যার-ম্যাডামরা তাদের প্রতিভা টের পেয়ে যত্ন নেওয়ার পরামর্শ দিতেন ওসমানী ভাইকে। মেয়েরা মাঝেমধ্যে মায়ের সঙ্গে নানাবাড়ি গেলে ওসমানী ভাই মনমরা মুখ করে বসে থাকতেন অফিসে। বুঝতে অসুবিধা হতো না,—মেয়েদের মিস করছেন খুব। মাঝেমাঝে স্কুল শেষে বাসায় ফেরার পথে বাবার বাইকে করে অফিসে হানা দিতো দুজন। অফিসের সবার সঙ্গে ভাব হয়ে ছিল তাদের।

শান্ত আর নিস্তরঙ্গ পরিবেশ ভাঙে ওসমানী ভাইয়ের প্রশ্নে। তার মেয়েদের কথা মনে আছে কি না জানতে চাইছিলেন। উত্তরে বলি,—মনে থাকবে না কেন, বেশ মনে আছে। নিশ্চয় অনেক বড়ো হয়েছে। মেধাবী ছিল ওরা। আমাকে দেখলে হয়ত এখন আর চিনতেই পারবে না।

—না না, আমার মেয়েরা এমন নয়। ঠিক চিনে ফেলবে। ছোটোবেলার অনেক স্মৃতি তাদের মুখস্থ। কেমন অবলীলায় বলে, আর আমি মুগ্ধ হয়ে শুনি!

ওসমানী ভাই একটানা তার মেয়েদের কথা বলে যেতে থাকেন। আবেগে তার কণ্ঠ বাষ্পীভূত হয়। পরক্ষণে উচ্ছাসে ফেটে পড়েন। কোন মেয়ে কোথায় কোন পুরস্কার নিয়ে এসেছে, কে কেমন রেজাল্ট করল… এইসব। পিতার আবেগ ঝরে পড়ে কণ্ঠে। আমিও আমার মেয়েদের গল্প শোনাই। কান পেতে শোনেন ওসমানী ভাই। রাস্তা জুড়ে দুই পিতা আর তাঁদের কন্যসন্তানের গল্পরা মিলেমিশে একাকার হয়। মনেই থাকে না মাঘ মাসের শীতরাত্রে তারা হাঁটছে এখন!

ওসমানী ভাই বলেন,—বুঝলেন জাভেদ, পৃথিবীটা অদ্ভুত! এই-যে এত হিংসা, হানাহানি, লোভ,—মানুষে মানুষে এই-যে এত বিভক্তি,—জীবন তবু সুন্দর। আর, এই সুন্দরের মূল কারণ হচ্ছে ‘মায়া’। মায়াই জীবনটাকে বেঁধে রেখেছে। যে-লোক এই মায়াকে উপলব্ধি করতে জানে না, সেই লোকটা জীবনের সবচেয়ে বড়ো রহস্য থেকে বঞ্চিত। জীবনকে উপভোগ করা জানতে হয়, বুঝলেন। সকলে তা পারে না।

কথা আর নীরবতার মাঝে কখন-যে পথ ফুরিয়ে এসেছে টের পাইনি। একসময় আমরা বাসার সামনে চলে আসি। ভদ্রতার খাতিরে ওসমানী ভাইকে বাসায় আসতে বলি।

—আরে না না, এত রাতে কেউ কারও বাসায় যায়! আর, আমারও কাজ আছে, কাজ শেষ করে বাসায় ফিরতে হবে। মেয়েটা যদি কোনো কারণে জেগে ওঠে তাহলে চিন্তায় অস্থির হয়ে পড়বে। আপনাকেও বলছি,—মেয়ে দুটোর যত্ন নিবেন, আর নিজের দিকে খেয়াল রাখবেন। মেয়েদের কাছে বাবা হলো অমূল্য সম্পদ, অমূল্য এক স্মৃতি।

আমি মাথা নাড়ি। তার অবয়ব ধীরে ধীরে কুয়াশার গভীরে হারিয়ে গেলে বাসায় ঢুকে পড়ি। মনে খচখচানি তবু দূর হয় না! এত রাতে কাকে ফোন দিলে নিশ্চিত হতে পারব? না,—ফোন দেওয়া ঠিক নয় এত রাতে! তারচেয়ে ইন্টারনেটে খুঁজে দেখাটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে। অনলাইনে কিছু একটা খবর নিশ্চয় মিলবে। গুগলে ‘ফতেহ ওসমানী’ লিখে সার্চ দেই। অবাক হয়ে দেখি,—যার কাছ থেকে মাত্র বিদায় নিলাম, তিনি আসলেও বেঁচে নেই! মারা গেছেন নয় বছর আগে! পত্রিকার অনলাইন সংস্করণ জানাচ্ছে :

শহরে সন্ত্রাসী হামলায় আহত সাংবাদিক ফতেহ ওসমানী (৫০) মারা গেছেন। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত বুধবার রাতে তার মৃত্যু হয়। তিনি স্ত্রী ও দুই মেয়ে রেখে গেছেন। পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, গত ২০১০ সালের ১৮ এপ্রিল রাতে সাংবাদিক ফতেহ ওসমানী সাংবাদিকতার কাজ শেষে মোটরসাইকেল যোগে বাসায় ফিরছিলেন। রাত আনুমানিক ১১ টার দিকে শহরের শাহী ঈদগাহ এলাকায় সন্ত্রাসীদের ছুরিকাঘাতে আহত হন। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হলে বুধবার রাত সাড়ে ১১টায় তার মৃত্যু হয়। বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিক পত্রিকায় কাজ করার পাশাপাশি সাহিত্যচর্চায়ও সক্রিয় ছিলেন।

আমি অসাড় হয়ে বসে থাকি। মাথা কাজ করছে না। অসীম শূন্যতা যেন গ্রাস করেছে আমাকে!
. . .

Journalist and Writer Fateh Osmani’s Death News; Source & Credit: Collected; The Daily Star Archive

. . .

আহমদ সায়েম সম্পাদিত সূনৃত নবম, গল্প সংখ্যা থেকে পরিমার্জনাসহ সংকলিত

. . .

লেখক পরিচিতি : মোস্তাফিজুর রহমান জাভেদ
এখানে অথবা ওপরের ছবিতে চাপুন

. . .

অবদায়ক : মোস্তাফিজুর রহমান জাভেদ : থার্ড লেন স্পেস.কম

মোস্তাফিজুর রহমান জাভেদ-এর অন্যান রচনা ও
প্রাসঙ্গিক পাঠের জন্য এখানে চাপুন

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 11

No votes so far! Be the first to rate this post.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *