
লিবিডো বিষয়ে লেখার শুরুতে স্বাভাবিকভাবে সিগমুন্ড ফ্রয়েডের নাম এসে যায়। মানুষের সকল কর্মকাণ্ডের পেছনে এই মনোবিকলন-শাস্ত্রগুরু প্রকাশ্য অথবা সুপ্ত যৌনচেতনার উপস্থিতি লক্ষ্য করেছিলেন। নিরেট যৌনচেতনা নয়, লিবিডো শব্দটাকে তিনি ব্যাপক অর্থে ব্যবহার করেছিলেন। দেহের যেমন রয়েছে ক্ষুধা,—সেভাবেই লিবিডো। শৈশবে এর শুরু। নিজের শরীরে জন্ম এবং পরবর্তীতে বহিরবৃত্তীয়। জীবন ও মৃত্যুমুখী পরস্পর দুই শক্তি কাজ করে মানুষের অন্তর্জগতে। জীবনমুখী শক্তির বিকাশ আত্মরক্ষা ও বংশবৃদ্ধি দুভাবে হয়ে থাকে। মানুষের সকল কর্মকাণ্ড, প্রেম, ভালোবাসা, স্নেহ, অপত্য,—সবকিছুর ভেতরই প্রচ্ছন্ন রয়েছে এ-দুই প্রবৃত্তি। জীবনমুখী এ-প্রবৃত্তি দুটোর পেছনের শক্তিকে ফ্রয়েড বলেছিলেন eros (এরোস) বা আবেগপূর্ণ প্রেম, এবং thenatos (থ্যানাটোস) বা মানুষের মৃত্যুমুখী প্রবৃত্তি। দুদিকে প্রবহমান এ-শক্তি আত্মঘাতী ও পরঘাতী দুটোই হতে পারে।
ফ্রয়েডের বিবেচনায় মানুষের জীবনমুখী শক্তি এরোসই লিবিডোর নিয়ন্তা। লিবিডো ও যৌনপ্রবৃত্তি প্রায় সমার্থক। ভালোবাসা অথবা আকর্ষণের মাধ্যমে এটার প্রকাশ। আত্মমুখী অথবা বহির্মুখী,—দুরকমই হতে পারে লিবিডো। যখন আত্মমুখী, তখন এটাকে নার্সিসাস-এষণা হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায়। আবার এখানে সীমিত থাকে না এটা। আত্মরক্ষামূলক প্রবৃত্তিও লিবিডো! এটা যখন পরমুখী, তখন এর উদ্দেশ্য হলো বংশবৃদ্ধি। মোটা দাগে এটুকু মেনে নেয়া যায়।
মনের উদ্দেশ্যসমূহের উৎসকে আবার তিন স্তরে বিভক্ত করেন ফ্রয়েড, ids (ইডস), ego (অহং), ও superego (অধ্যহং)। অহং এবং অধি-অহং (বা অধিশাস্তা) শক্তি সঞ্চয় করে ইডস স্তর হতে। ব্যক্তিত্বের এক নিগূঢ়তম স্তর এই ইডস, এবং এরই অংশ বাস্তবতার নিরীখে অহং-এ পরিণত হয়। অহং শেষ পর্যন্ত ইডস-এরই অংশ। ইডস শব্দটি সম্ভবত নিটশের থেকে ধার করেছেন ফ্রয়েড। ইডস-এর শক্তিকেই তিনি বলেছিলেন লিবিডো বা কামপ্রেরণা। পৃথিবীর তাবত কবিতার উৎস এই কামপ্রেরণা! গতশতকের কিছু কবিতায় এই কামপ্রেরণা কবিমনের নিগূঢ়তম স্তরে কীভাবে কাজ করেছিল তা লক্ষ করা যেতে পারে :
স্নান করো বিম্ববতী—
স্নান করো প্রাণের ধারায়
শীতল সুতীক্ষ্ম প্রবাহের চাপ
অঙ্গ থেকে ধুয়ে দিক অতনু-উত্তাপ।
চতুরস্র নিতম্বের প্রতিস্পর্ধী কোমল ত্রিভুজ
সাবিত্রী সহায় হয়ে
যজ্ঞব্রতী চতুর্মুখ করুণ রক্ষণ—
সৃষ্টির রহস্য তীর্থ।
জল ঢালো নিম্নোদরে ত্রিবলী-প্রাকারে—
ক্রমশঃ উপরে ওঠো।
নাভি ও নিতম্ব কূপে। শ্রোণির ফলকে
ঢালো পূণ্য জলধারা।
উর্ধ্ব অঙ্গ ক্রমশ উদার-স্তব্ধ
বাহুকূপ স্কন্ধ গ্রীবা পৃষ্ঠ বক্ষোদেশ
—সুবৃত্ত-যুগল
চন্দ্রদেব সুরক্ষিত রাখুন সর্বদা।
—বরতনু : উমা দেবী
[প্রমথনাথ বিশী ও তারাপদ মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘কাব্যবিতান’-এ সংকলিত]
আটাশি পঙক্তির দীর্ঘ কবিতাটি সম্পূর্ণ উদ্ধৃতি দেয়ার ইচ্ছে আপাতত আটকে রাখা হলো। গত শতকের দ্বিতীয় দশকে পশ্চিমবঙ্গের নারী কবিদের মধ্যে আধুনিক কবিতায় সম্ভবত উমা দেবী-ই প্রথম এমন সাহসী পঙক্তিমালা উচ্চারণ করেছিলেন! শুরু থেকে এক আশ্চর্য আকর্ষণ রয়েছে কবিতাটির :
স্নান করো বিম্ববতী
এ দুপুর বড়ই নির্জন—
এই ঘর নির্জন এখন।
একে একে আবরণ উন্মোচন করো—
শাড়ি সায়া চোলি ও পট্টিকা
দূর করো অঙ্গ থেকে
স্নান করো বিম্ববতী।
এরপর শেষপঙক্তি পর্যন্ত না পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব। শ্রীকৃষ্ণকীর্তনে বিরহী রাধার আকুলতায় আছে পেয়ে হারানোর বেদনায় মর্মরিত দীর্ঘশ্বাস ও পুনঃপ্রাপ্তির বাসনা। ভালোবাসার সঙ্গে মিশে রয়েছে ভক্তি ও সমর্পণের নিখাদ আকুতি। স্নান করো বিম্ববতীতে সরাসরি আহবান নেই, কিন্তু প্রত্যাশার তীব্রতা আলোপিপাসী পতঙ্গের মতো পাঠককে কাছে টেনে নেয়। ফ্রয়েড-কথিত আত্মমুখী আকর্ষণের এক উজ্জ্বল উদাহরণ এ কবিতা :
নাসারন্ধ্র ভরে যাক অমর্ত্য সৌরভে
অঞ্জলি অঞ্জলি
জল ছুঁড়ে ছুঁড়ে সর্ব দাহকে জুড়াও।
স্নান করো বিম্ববতী — স্নান করো।
এ জৈষ্ঠ্যের অসহ্য-উত্তাপ দ্বিপ্রহরে
স্নান করে জুড়াও হৃদয়।

চমৎকার এ-কবিতাটি পাঠের পর নিশ্চয় ইচ্ছা জাগে তাঁর ‘গৌরীয় বৈষ্ণব রসের অলৌকিকত্ব’ কবিতাগ্রন্থটি পুরোপুরি উপভোগ করার। কবি উমা দেবীর পর কবি দেবারতি মিত্রকে আরো একজন সাহসী কবি হিসেবে উল্লেখ করা যায়। ‘ভূতেরা ও খুকি’ কাব্যগ্রন্থটির জন্য তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন দীর্ঘকাল। ঐ গ্রন্থের ‘ঝরণার সোনা’ কবিতার কিছুটা :
ঘোর কদমের মাসে
তার সঙ্গে বিয়েভাঙ্গা স্কার্ফখোলা চটুল বত্রিশ
গাড়ি ছাড়বার আগে লাফাতে লাফাতে যেন চাকা ছুটে আসে,
মেয়েলি ঘাড়ের হাড়ে বেঁধে গিয়ে তুরপুনের মতো প্রজাপতি,
জড়াজড়ি মুঠোভর্ত্তি স্বাদু মাংস রান্নার আগুন,
আঠায় মধুতে ঠোঁট ষ্ট্রবেরি জারানো দামি নুন।
রুমাল নাচিয়ে বলে মহিলাটি, ‘চলো যাই, সিংহের কেশর ধরে
ঝাঁকিয়ে
আসিগে,
ভবিষ্যৎ টাইগনের মতো হবে অথবা সফল।
—ঝরণার সোনা : দেবারতি মিত্র; ‘ভূতেরা ও খুকী’ কাব্যগ্রন্থ-এ সংকলিত
সফল শিল্পকুশলতায় কবিতাটির ভেতর প্রবিষ্ট রয়েছে যৌনতা। ‘বিয়েভাঙ্গা চটুল বত্রিশ’, ‘সিংহের কেশর ধরে ঝাঁকানো’, ‘ভবিষ্যৎ টাইগনের মতো’ প্রভৃতি শব্দবন্ধ গভীর ব্যঞ্জনাময় ইঙ্গিত বহন করে। সম্পূর্ণ কবিতাটি পাঠে ভিন্নমাত্রাও প্রতিষ্ঠিত হয়। অন্তরের অভীপ্সার একটি উৎস ইডস-এর কেন্দ্রে কবিতাটির অবস্থান। ইডস-এর মধ্যে মূল্যবোধের অবস্থান নেই। সুখ-ভোগ একমাত্র উদ্দেশ্য। এর মূলে রয়েছে দেহ! দেবারতির ভালো কবিতা এটি। এখানে আবেদন রয়েছে নিপুণভাবে। আরোপিত কিংবা লিবিডো আক্রান্ত মনে হয় না। যৌনতা এসেছে শিল্পের স্বাভাবিক নৈপুণ্যে। তীব্র আবেদন রয়েছে তাঁর ‘আমার পুতুল’ কবিতাগ্রন্থের ‘পৃথিবীর সৌন্দর্য, একাকী তারা দু’জন’ কবিতায় :
ক্রমে তার মুখে আসে ঈষদচ্ছ অনতিশীতোষ্ণ গলা মোম
টুপটাপ মুখের গহ্বরে ঝরে পড়ে
পেলিকান পাখিদের সদ্যোজাত ডিম ভেঙে জমাট কুসুম নয়,
একটু আঁষটে অতি অপরূপ নোনতা স্নিগ্ধ সাদা জেলি।
ডুবে যায় আত্মা অবধি পর্ণপুট,
অপার্থিব মৌচাকের টলটলে মধু, মিষ্টি ঘামে।
অস্থির রমণী গাঢ় উষ্ণ আরামে
পালতোলা জাহাজের ডেকে শুয়ে
মাধ্যাকর্ষহীন ফুরফুরে মোলায়েম
হালকা জলন্তপ্রায় একরাশ বেলুনের ঝাঁক নিয়ে
বিদেশী তারার খুব কাছাকাছি ভেসে যেতে থাকে
যেন ডানা মুচড়ে দেবদূত উড়ে যাবে
এক্ষুনি বিছানাসুদ্ধ তাকে নিয়ে।
মেয়েটির উচ্ছল তৃপ্ত ওষ্ঠাধর, দাঁত, দুচোখের পাতা
চটচটে ঘন লাক্ষারস মাখামাখি,
সজীব রঙিন শান্ত সুস্থ জানুসন্ধির মধ্যিখানে
আস্তে আস্তে তার মুখমণ্ডল অঘোরে ঘুমিয়ে পড়ে
পৃথিবীর সৌন্দর্য একাকী।
—পৃথিবীর সৌন্দর্য, একাকী তারা দু’জন : দেবারতি মিত্র
কবিতাটিকে কবি শামশের আনোয়ার বাংলা ভাষায় লেখা সর্বাধিক যৌন আবেদনের কবিতা হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। আমার কাছে বরং ‘স্নান করো বিম্ববতী’ কবিতাটিকেই অধিকতর আবেদনময় মনে হয়েছে। অবশ্য আত্মমুখী বিবেচনায়, পরমুখী প্রেরণায় শামসের সমর্থনীয়। দেবারতি মিত্রের সময়ও তাঁকে অনেকাংশে প্রভাবিত করেছিল। মলয় রায় চৌধুরী, শৈলেশ্বর ঘোষ, বাসুদেব দাশগুপ্ত, দেবী রায় (হারাধন ধাড়া),—এঁদের প্রতিষ্ঠিত হাংরি জেনারেশনের কৌতুকাশ্রয়ী যৌন অনুষঙ্গের গন্ধবাহী শব্দসমূহের উপস্থিতি সে-সময় কবিতা-অঙ্গনে তুমুল ঝড় তুলেছিল। অবশ্য, যৌনগন্ধী শব্দ পূর্ব-দশকেই শক্তি, সুনীল, সন্দীপন এঁদের কবিতার মধ্য দিয়ে বাংলা কবিতায় ব্যাপকভাবে স্নান করে নিয়েছিল। কিন্তু হাংরি কবিকূল শব্দগুলোকে নিজেদের ইচ্ছায় অপ্রয়োজনেও ব্যবহৃত হতে দিয়েছিলেন, ফলে অনেক ক্ষেত্রে আরোপিত মনে হয়েছে। তাঁদের প্রচেষ্টা অনেকের কাছেই গিমিক বলে মনে হয়েছিল।
কবি দেবারতি মিত্রের ঘরের কবি মণীন্দ্র গুপ্ত তাঁর এক বিশাল প্রেরণাস্থল। অর্ধাঙ্গ অবশিষ্ট অর্ধাঙ্গ হতে প্রভাবিত হবে, এইটেই স্বাভাবিক। বর্ষীয়ান কবি মণীন্দ্র গুপ্তের একটি কবিতা প্রসঙ্গিত হতে পারে, ব্যতিক্রম আয়োজনে :
জলে ভাসতে ভাসতে হঠাৎ মদ্দা হাঁসটা মাদী হাঁসের
গলা কামড়ে ধরে তার উপরে উঠে পড়ে।
তার শরীরের নীচে মেয়ে হাঁসটা পাখা বিস্তার ক’রে
রহস্যময় ছায়ার মতো ডুবে থাকে—
আমি দেখতে পাই, সঙ্গীকে সুবিধে দিতে মেয়েটা
জলের নিচে নিজেকে ছড়িয়ে দিয়েছে।
কালিদাসের বিবৃতজঘনা মনে পড়ে।
—গড়িয়া গ্রামের হাঁস : মণীন্দ্র গুপ্ত
ফ্রয়েডের যৌন-মনস্তাত্ত্বিক অভিজ্ঞান লিবিডোই মানবজীবনের সকলকিছু নিয়ন্ত্রণ করে। এটাই হচ্ছে মূল চালিকাশক্তি। এর প্রভাবে পাশ্চাত্য শিল্প-সাহিত্যে উত্থিত আলোড়ন বাংলা সাহিত্যের তিরিশোত্তর আধুনিককালে যথেষ্ট সাড়া জাগিয়েছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী কালে ফ্রয়েডের মনোবিকলন তত্ত্বের ব্যপক প্রসার অনিবার্যভাবে আধুনিক বাংলা কবিতায় উদ্বেলিত হয়েছিল। কবিদের জন্য একটা গুরুত্বপূর্ণ ভাবনা ছিল ফ্রয়েডের ‘নির্জ্ঞান’ মন সম্পর্কিত ব্যাখ্যা। তাঁর মতে মানুষের মনের ক্ষুদ্রতর অংশ ‘চেতন’ মনের আড়ালে রয়েছে বৃহত্তর ‘নির্জ্ঞান’ মন। প্রকৃত অর্থে মানুষের অন্তর্জগত নিয়ন্ত্রণ করে এটা। এর উৎস যৌনপ্রবৃত্তি। অভিনব এই ধারণা সমাজের চিন্তাজগতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন বয়ে এনেছিল।
যৌনতা ধারণাটিকে ব্যাপক অর্থে সম্প্রসারিত করেছিলেন ফ্রয়েড। তাঁর মতে নরনারীর ভালোবাসার সহজাত সকল প্রবৃত্তির সংহত ও একত্রিত রূপ হচ্ছে লিবিডো বা কাম-প্রবৃত্তি। এমনকি মানবপ্রেম, আত্মপ্রেম, বন্ধুত্ব, বাৎসল্য, অপত্য সবকিছুর পেছনেই রয়েছে লিবিডোর উপস্থিতি। নির্জ্ঞান যৌনচেতনার বাতাবরণে মানুষের মন আবেগে, সংরাগে বিচিত্র পথে বিভিন্ন মাত্রায় আবর্তিত ও বিকশিত হয়। মানুষের জৈবসত্তা ভোগপ্রবণতার অনুসারী। অন্যদিকে বাস্তবসত্তা ধাবিত হয় বাস্তবতার প্রতি। ফলে দ্বন্দ্ব জন্ম নেয় এ দুয়ের মধ্যে। আবার মানুষের নীতিবোধের আশ্রয়স্থল বিবেকেরও নিয়ন্ত্রণ রয়েছে এসবকিছুর ওপর। বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে এভাবে লিবিডো-নিয়ন্ত্রিত হয় মানুষের সকল কর্মকাণ্ড।
ফ্রয়েডের অনুসারী ইয়ুং লিবিডোর পরিসীমাকে অনন্ত বিস্তার প্রদান করেছিলেন। তাঁর মতে, কেবল যৌনআকাঙ্খা নয়, লিবিডো হলো মানুষের সকল উদ্যোগের মূল শক্তি। হাংরি জেনারেশান এটাকে ভালোভাবেই গ্রহণ করেছিল। এঁদের কবিতায় টাটকা মাছের ফুলকোর আগ্রাসী রং, তাতানো মাংসের লোলুপ তাপ প্রভৃতি রগরগে শব্দ দিয়ে যেভাবে প্রকাশিত হয়েছিল তাতে সমসাময়িক অনেকে অতিচমকের আকর্ষণে ওসবে যুক্ত হয়ে পড়েছিল। এঁদের লেখালেখির পেছনে একটা যুক্তি দেখানো হতো—যৌনতার স্বাভাবিকতার সঙ্গে আত্মপ্রকাশের স্বাভাবিকত্বের সম্পর্ক রয়েছে, এবং একজন শিল্পীর রয়েছে আত্মপ্রকাশের অভীপ্সা। জীবন থেকে যদি যৌনতা পৃথক করা না যায় তবে লেখালেখিতে তা হবে কেন? এরা বুঝেও প্রকাশ করেননি-যে,—জীবনে যৌনতার স্থান কিছুটা আড়ালে, অনেকটা গোপনে! গোপনে হয়তো একটা চিঠি লেখা যায়, কবিতা নয়।

লেখালেখি হচ্ছে প্রকাশিত শিল্প। যৌনতা ও লিবিডো এক নয়! মন্দির গাত্রে খোদিত চিত্রকর্মও যৌনতা প্রকাশের উপযুক্ত বলে বিবেচিত হয়েছিল একসময়। সরাসরি অঙ্গ-উপাসনার সূত্রপাতও হয়েছিল অনেক ধর্মে। উপাসনালয়ের গঠনরীতিতেও রয়েছে যৌনতা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে ওসবের। স্বাভাবিকভাবে যা আসে তা খাঁটি। আরোপ করতে গেলে দেখা দেয় সমস্যা। ওটাকে তখন শিল্পের আবেদন ধরে নেয়া যায় না। নিছক যৌনতা অথবা লিবিডো আক্রান্ত হিসেবে তা চিহ্নিত হয়। ঐ দশকেরই কবি রমা ঘোষ-এর লেখা একটি কবিতার শেষাংশ স্মরণ করা যায়, যেখানে কবি লিখেছেন :
তোমার শরীর ঘিরে বৃষ্টিধারা আমি একা কিছুদিন যদি ভোগ করি
উৎসন্নে গেছি বলে কেউ যদি কুকথা রটায়
আমি তা নীরবে শুনে সমুদ্র পাখির
পালক কুড়িয়ে নিয়ে মাথায় সাজাবো,
যাবোনা এখন আমি এই পূণ্য মাতৃভূমি পৃথিবী পেরিয়ে
শুধু কিছুদিন যাবো শাওন তোমার সঙ্গে সমুদ্র ভ্রমণে।
আজ রাতে ছাদে শুয়ে সমুদ্র ভ্রমণে যাবো শাওনের ঘরে।
—সমুদ্র ভ্রমণ : রমা ঘোষ
শিল্পসফল এ-কবিতাটি প্রকট যৌনগন্ধী মনে হয় না। অথচ ব্যাকুলভাবে হৃদয় টানে। শুরু থেকেই পাঠক উপলব্ধি করেন এর সুষমিত লাবণ্য। লিবিডোর বিকশিত স্তরে মানবমন এরকমই কল্পনা করে, স্বপ্ন দেখে।
ষাটের সোচ্চার আন্দোলনের রেশ না মিলাতেই পশ্চিমবঙ্গের কবিতায় সত্তরের তুমুল উত্থান। নারী-কবিরাও পিছিয়ে ছিলেন না। সত্তরে এসে কবিকূল লিবিডো বিষয়ে কুশলী হয়ে উঠেছিলেন। ঐ দশকের কবিতায় একধরনের কাঠিন্যও প্রকাশ পেয়েছিল। শিক্ষিত নাগরিক চেতনাসঞ্জাত কবিতার পাশাপাশি শ্লোগানমুখর কবিতাও উপচে পড়েছিল। একদিকে দুর্বোধ্য কাঠিন্য, অন্যদিকে মেধাহীন কবিতার ছড়াছড়ি অনেকটা দূরে ঠেলে দিয়েছিল পাঠককে। শুরুতেই নকশালবাড়ি আন্দোলনের ঢেউ পশ্চিমবাংলার কবিদের ব্যাপকভাবে আলোড়িত করে। দুর্বল রুচির, অনেকাংশে শালীনতা বর্জিত আত্মপ্রচারসর্বস্ব কবিতা, যেগুলিকে ঘুরিয়ে আত্মজৈবনিক বলে চালানোর প্রচেষ্টাও পরিলক্ষিত হচ্ছিল। যে-সমাজের জন্য কবিতা রচিত হয়েছিল তা ছিল প্রবলভাবে বাত্যাতাড়িত, ক্ষুব্ধ, অত্যাচারিত। সে-সময় যৌনতা নির্ভর কবিতা কবিদের মনোজগতের দুর্বলতা বা মনোবৈকল্যের পরিচয় দিয়েছিল। দুদশক আগের একজন পরিণত কবিও অবলীলায় চরম হতাশাগ্রস্ত পঙক্তি রচনা করেছিলেন। নবনীতা দেবসেন ‘হাজার বছর ধরে একজোড়া যুবক-যুবতী’ কবিতায় লিখেছিলেন :
পৃথিবীতে অন্তর্বাস খোলার মতন
কোনো রাত্রি নেই। পৃথিবীর মুখের ওপরে
ঠাস করে বন্ধ করে খিল তুলে দেবো,
সেরকম কোন দরজা নেই।
—হাজার বছর ধরে একজোড়া যুবক-যুবতী : নবনীতা দেবসেন
অন্তর্যাতনা কিংবা হতাশা কবিতাটির মূল সুর। সত্তরের আরো এক কবি অনুরাধা মহাপাত্রের কবিতায়ও লক্ষ্য করা যায় প্রায় এ-ধরনেরই হতাশা-করুণ পঙক্তি :
সঙ্গমে ভিন্ন কোন আলো নেই — প্রকৃতি অথবা ঈশ্বরের
উপবাস ও পূজার কোন চিদাকাশ নেই
আত্মত্যাগ, আত্মহত্যা উভয়ই সমান
প্রেমিকের মাথা আকাশে তুললেও তবু মুখ,
নেমে আসে অন্ধ পুকুরে
চারিদিকে উঁচু উঁচু ফ্ল্যাটবাড়ি — যৌনতা ও সিমেন্টের
মৃত রসায়ন
কবিমনের ভেতর দ্বৈততা, যৌনচেতনা ও অহং এক কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে;—জীবন্ত সকল সত্তাকে ধরে রাখার প্রয়াস! ‘প্রেমিকের মাথা আকাশে তুললেও তবু মুখ,/ নেমে আসে অন্ধ পুকুরে’;— এখানেই লিবিডো! স্নেহলতা চট্টোপাধ্যায়-এর ‘আজ বৃষ্টিতে’ কবিতার অংশ :
বৃষ্টি এখন ঝড় হয়ে গেছে প্রিয়
দুজনে মৌন, মুখর দুচোখে দাবী,
আলোক-পীড়িত এখনো শয্যাখানি
কেন উদাসীন গৌরবে দেরি কর?
আমার প্রদীপ যত্নে নেভাও তুমি
—আজ বৃষ্টিতে : স্নেহলতা চট্টোপাধ্যায়
যৌনগন্ধী কোনো শব্দ নেই, অথচ আশ্চর্য মধুর আহবান রয়েছে পঙক্তিগুলোয়! এখানে পৌঁছে কবিতা ভিন্ন রূপ নেয়া শুরু করে। সত্তর পরবর্তী কবিগণ লিবিডো বিষয়ে অনেকটা সচেতন হয়ে উঠেছিলেন। আশি ও নব্বুই দশকের কবিগণ আরো ইঙ্গিতধর্মী হয়ে উঠেছিলেন। কাব্যগন্ধী শব্দের পরিবর্তে চাতুর্যময় অভিনব শব্দচয়ন তাঁদের কবিতাকে রহস্যময়তার আড়ালে নিয়ে গিয়েছিল। চৈতালী চট্টোপাধ্যায়-এর ‘কবিতার জন্ম’ :
ট্রামলাইনের পাত বরাবর জ্বলছে নিভছে সাদা ভালোবাসা
ধুয়ে মুছে চাঁদ জ্যোৎস্না-প্রপাত ভাসিয়ে দিয়েছে কে ছোটো কে বড়
মাটির মেঝেয় গণ্ডি কেটো না আল্পনা আঁকো আমাকে শোয়াও
তিথি ও তারারা স্বাগত জানাক স্রোত বয়ে যাক অনাবিল স্রোত
—কবিতার জন্ম : চৈতালী চট্টোপাধ্যায়

লিবিডো বিষয়ে ভিন্নদৃষ্টি রয়েছে এমন তাত্ত্বিকদের মধ্যে ‘নব্যফ্রয়েডীয়’ এডলার, র্যাংক, হর্নী, সুলিভান, ফ্রম প্রমুখ ফ্রয়েডের লিবিডোতত্ত্ব অনেকাংশে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। অন্তর্জগতের কাঠামোয় আন্তর্ব্যক্তিক সম্পর্কের গুরুত্ব প্রাধান্য পেয়েছিল তাঁদের কাছে। যেখানে, ফ্রয়েডীয় মূল তত্ত্বে আত্ম-উপলব্ধিকে ধরা হয় লিবিডোর প্রাথমিক চালিকাশক্তি। আন্তর্ব্যক্তিক সম্পর্কের খোঁজে ঈশিতা ভাদুড়ীর একটি সম্পূর্ণ কবিতা :
কে কতখানি নেমেছে জলে,
কে করবে তার সত্য নির্ণয়!
কে করেছে স্নান, কে ছুঁড়েছে ঢিল!
কে ডেকেছে মূলত অন্ধকার,
কে পূর্ণিমাতে সারারাত,
কে জানে এর সত্য ইতিহাস!
কে দিয়েছে লজ্জাহীন গোপন প্রস্তাব!
কে ছুঁড়েছে হাসি উপেক্ষায়!
আশির দশকের কবি রূপা দাশগুপ্তের ‘ক্রীড়াকাল’ কবিতার শেষাংশ :
ভাবো কি এতই বোকা, এত কৃশ, গূঢ় চালিয়াতি
বরাবর হেসে হেসে ছাড় পাবে যুবতীর কাছে
কি চাই, কখন চাই, চাই কার মুখ
হৃৎ দোলাচল
শরীরে ফ্রিকিক ও সুরক্ষায় গোলপোস্ট রেখে
নিছক ভ্রমণ।
—ক্রীড়াকাল : রূপা দাশগুপ্ত
ফ্রয়েডীয় লিবিডোতত্ত্ব একদিকে পরিবর্তনকামী, পিচ্ছিল, ভোল-পাল্টানো স্বভাবের, অপরদিকে যৌনচেতনানির্ভর স্বজ্ঞার ভেতর অনুপ্রবিষ্ট,—অনেকটা একপেশে। ইয়ুংও একইরকমভাবে স্বজ্ঞানির্ভর শক্তি হিসেবে এটাকে সাধারণীকৃত করেছিলেন। বর্তমান সময়ের অনেক তাত্ত্বিক মনে করেন ফ্রয়েড লিবিডো ধারণাটিকে ব্যক্তিত্ব বিকাশের চালিকাশক্তি হিসেবে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন, বিপরীতে সমাজের চালিকাশক্তিগুলোকে যথাযথভাবে বিবেচনায় আনেননি। লিবিডোতত্ত্ব ক্রমাগতভাবে বিবেচিত-পুনর্বিবেচিত হচ্ছে মূলত তিনটি দিক থেকে, অধিমনোবিকলনগত, উন্নয়নগত ও চিত্তবিকারবিদ্যাগত, এবং কখনো সব মিলিয়ে। সমাজচালিকাশক্তি কীভাবে লিবিডো প্রকাশ করে, কবিমনে এর প্রভাব কেমন, নারীবাদী কবি মল্লিকা সেনগুপ্তের একটি অন্যরকম কবিতার দুটি স্তবক দেখা যাক :
আমার তের বছরে এক কাঠখণ্ডে বেঁধে
ঝুলিয়ে দিয়েছিল মালিক হাটের মাঝখানে
চাবুক মাছে খোঁচালো, গায়ে কাপড় থাকলো না
কানকো তুলে ওরা আমার রক্ত দেখে নিল
লজ্জা নেই আমার ভয় থাকতে নেই জানি
যে মাছ আজ চাবুক তার নিবাসকাল জানি।
নব্বুয়ের শেষদিকে এরকম কবিতা বরং কিছুটা কমই লেখা হয়েছে। কবিরা এ-সময়ে আরো রহস্যনিবিড় হয়ে ওঠেন। তাঁদের কবিতায় যৌন অনুষঙ্গগুলো ইঙ্গিতময় হয়ে যায়। পাঠকের প্রত্যাশাও বেড়ে যায় অনেক, বিপরীতে শিল্পোত্তীর্ণ কবিতার সংখ্যা কমে যেতে থাকে। পুঁজিবাদী অবক্ষয়ে কবিদের অন্তর্জগৎও অক্ষত থাকে না। আন্তর্জালের বিস্তার কবি ও পাঠককে একাধারে নিঃসঙ্গ ও অস্থির করে তোলে। শবরী ঘোষের ‘পুুরুষ-কিম্পুরুষ’ কবিতার কিছু অংশ :
এক্ষুণি একজন পুরুষ চাই আমার
রাত্রি যেভাবে সূর্যের সঙ্গে মেলে
সেরকম সম্পূর্ণ মিলনের জন্য চাই
. . .
তবু প্রতিদিন সকাল থেকে রাত্রি পর্যন্ত
ঠিক নিরানব্বই জন হিজড়ের সঙ্গেই শুধু
ঘুরে ফিরে দেখা হয়ে যায় আমার!
. . .
হায় হিজড়েরা সঙ্গম জানেনা।
এখনই একজন যথার্থ পুরুষ চাই আমার
আমিতো প্রস্তুত হয়েই রয়েছি!
—পুুরুষ-কিম্পুরুষ : শবরী ঘোষ
বাংলাদেশের নারী-কবিদের কবিতায় লিবিডোর উপস্থিতি অনুসন্ধানের বিষয়! তসলিমা নাসরিনের একটি কবিতার কিছু অংশ (এটা হয়তো নিষিদ্ধ নয়!)। হতে পারে, এখানেই শুরু!
আমার বর্ষার জলে
শরীরে বর্ষাতি নিয়ে অনার্য পুরুষ তুমি
চতুর ডুবুরী হও, যতো হও জলজ শরীর
এতোটুকু তবু তোমাকে ছোঁবেনা জল।
আমাতে প্রোথিত হও, সঠিক নিমগ্ন হও
বিবর্ণ খোলস খুলে ফেলে
আমার আগুনে আজ শরীর তাপাও।
. . .

… থার্ড লেন স্পেস-এ প্রাসঙ্গিক আরো দেখুন …
মৌলিক চাহিদায় প্রেম ও যৌনবাসনা-১
. . .
লেখক পরিচয় : কামাল রাহমান : এখানে অথবা ওপরের ছবিতে চাপুন
. . .

কামাল রাহমান : অবদায়ক : থার্ড লেন স্পেস
কামাল রাহমান-এর অন্যান্য রচনা ও প্রাসঙ্গিক পাঠের জন্য এখানে চাপুন



