
গালের রং হলুদ
এসো বেদনার দাগে কুমড়োগাছ লাগাই
হলুদ ফুল ফুটলে আমরা বাতাসা খাবো
তখন বাতাসে আর উড়বে না কণ্ঠনালী
তখন গোয়ালন্দে নামবে না সন্ধ্যার কুয়াশা
কেউ কেউ ফুটপাত দখল করে
শুয়ে থাকতেই পারে, থাকুক না
যেমন তুমি স্কার্পের সাথে মনোভূমিকেও রেখেছ
যেমন শরীর বিকিয়ে অনেকেই ঘরে ফিরে যায়
জানো তো?
কৃষ্ণচূড়া আর ধঞ্চেপাতার আয়তন একই
কিন্তু শব্দ দুটি আলাদা ব্যঞ্জনায় অভিসিক্ত
ধঞ্চে নদীবাহিত আর কৃষ্ণচূড়া রাবীন্দ্রিক
তোমাদের টিনের চালের রিমঝিম শব্দ
শেষ হয়েছিল বলেই
আমরা শহরের রিকশায় ঘুরতে পেরেছিলাম
তারপর : এই শহর সন্ধি-বিচ্ছেদের মতো
আলাদা হয়ে গেছে, হোক
তবু খুব মনে আছে
তোমার গালের রঙ ছিল
কুমড়ো ফুলের মতো হলুদ
. . .
গোলচিহ্ন মানে ফলশূন্য
ভালো থেকো তুমি, শুয়ে থেকো নাবিকের ভেজা বুকে
ভয়, ঢেউ এসে কেড়ে নেবে তোমার কান ও কব্জি…?
পার্থ এসেছিল, জানতে চাইনি তোমার কথা!
আমিও নাকের ঠোঁটে অভিমান মাখিনি
মূলত অভিমানের কাল কেটে গেছে…
দেখতে চাই না তোমার হিজাবি মুখ
শুনি না, মধ্যরাত-টেলিফোনকথা
মাশরুম-গোলচিহ্ন যেন
ব্লক করেছো, বেশ
শেষরাত এখন
শুয়ে থাকো…
শেষমেষ
কচ্ছপ
তুমি…
. . .
চলো ছবি হই
সুলিখিনি
চলো ছবি হই
ছবির হাটে গিয়ে প্রদর্শনী হই
আমার ছবি দেখে
শাড়িপরা বালিকার মন ভাঙবে
তোমার ছবি দেখে
প্যান্টপরা বালকের স্বপ্ন ভাঙবে
আর সোহরাওয়ার্দির ঘাসেরা
কামচোখে রোদের সাথে কেলি করবে
কাচঘরে বসে—ছবির বদলে
কখনো আমার দিকে ছুড়ো না পাথর
ছুঁয়ে দেখো আমার আত্মা
কার যেন ছবি তাকিয়ে থাকে
কার যেন ফুসফাস কথা শোনা যায়
নির্জনে থেকো কিছুটা সময়
কে যেন ডেকে নিয়ে যাবে তোমায়
গানের অন্তরা শুনাতে
যে-ভোর একবার হয়েছে
সেখানে শালিকের ডানা ঝরেছে
তুমি সেই দৃশ্য দেখার আগে
ছবি হয়ে গেছো
সবাই ছবি হতে পারে না
আমি কখনো ছবি না
তুমি তো জানো
শাসক দুর্বল হলে
চুরি-ডাকাতি বেড়ে যায়
দরিদ্ররা আরো নিরন্ন হয়
তুমি প্রেমের শাসক হয়ে
আমাকে করেছ নিঃসীম
সুলিখিনি
তোমার মতো শাসকরূপী প্রেমিকারা
কখনো ভালো থাকে না!
মরে যায় রৌদ্রকিরণ থেকে
তুমি নেই বলে
সোহরাওয়ার্দীর সবুজ ঘাসগুলো
তোমার মতোই মরে গেছে
শহর ঢাকা
এখন ফাঁকা…
তাই আমি ছবি হতে পারি নি?
. . .

পারফিউম
পারফিউম
একদিন তোমার স্নিগ্ধ গোসলের
ঘ্রাণ মেখেছিল আমার নাসিকাকুঞ্জে
কবিকুঞ্জ আর নাসিকার কুঞ্জ এক নয়
বাতাসে ছেড়া চিঠির কাগজ-টুকরাটি
সরে সরে অনেক দূরে চলে গেছে
চিঠির চলে যাওয়ার অভিমান আর
স্নিগ্ধ গোসলের ভেজা চুল একই
বর্ণমালার মতো পাশাপাশি শুয়ে থাকে
গুগুলে খুঁজে পেলাম
তোমাদের মধ্যবিত্তের আঁতুরঘর
ঘরের কোনায় দেখলাম
টেলিফোনের তারটি টিকটিকির মতো
পড়ে ও মরে আছে আর তোমার
চুলে বাঁধা লাল ফিতাটির রঙ ঝলছে গেছে
চিঠির কাগজের মতো উঠে যাচ্ছে ফিতার সুতা
নগর থেকে অতো দূরে তোমার চোখ যায় কি?
মনে হয় অযথাই তোমাকে সাইকেলে উঠিয়ে ছিলাম
আসলে কী জানো?
কৈশোরের হারানো দিনগুলো দুধভাতের মতো
সে কেন তোমাকে মনে করিয়ে দেবে জানালার কথা?
. . .
পাতাদের আচরণ
কিছু পাতা ঝরুক এই ফাগুনে
কিছু নাভি পুড়ুক—নারীদের
যখন
পুড়বে
তখন
অদৃশ্য হামাগুড়ি নড়ে ওঠবেই
তখন
তুমি আক্রান্ত হবে শিশুকাল নিয়ে
তুমি ব্যস্ত হবে নতুন চোখ নির্মাণে
কিছু পাতা ঝরুক এই ফাগুনে
কিছু নাভি পুড়ুক—নারীদের
তোমার নাভিও কি পুড়ে গেছে?
পুড়ে গেছে কি নখের আচরণ?
. . .

লেখক পরিচয় : শিহাব শাহরিয়ার
মধ্যষাটের দশকি সীমায় নিসর্গমেখলা শেরপুর জেলায় কবি শিহাব শাহরিয়ারের জন্ম। জামালপুর জেলার ঐতিহ্যবাহী নান্দিনা মহারানী হেমন্ত কুমারী পাইলট সরকারি বিদ্যালয় ও পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। ছাত্রত্বের সময় থেকে লিখে চলেছেন ধারাবাহিক। কবিতা মূল আশ্রয় হলেও গল্প, প্রবন্ধ, আলোচনা-সাহিত্য ও লোকসাহিত্যের গবেষণায় থেকেছেন নিবেদিতপ্রাণ।
সংস্কৃতির নানা উৎসে সঞ্চারী শিহাব শাহরিয়ার আবৃত্তি এবং বেতার ও টেলিভিশন অনুষ্ঠানের উপস্থাপনায় চার যুগ ধরে সক্রিয়। সংবাদকর্মী হিসেবে পেশাজীবন শুরু করে পরে সরকারি চাকুরি বেছে নেন। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের জনশিক্ষা বিভাগের কিপারের দায়িত্ব সামলেছেন সর্বশেষ।
ছোটকাগজ ‘বৈঠা’র সম্পাদনায় নিরলস কবি নানামাত্রিক প্রকাশনায় ঋদ্ধ করেছেন পাঠককে। এ-পর্যন্ত প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে রয়েছে ‘অদৃশ্যগুচ্ছ’, ‘পড়ে থাকে অহংকার’, ‘রাত পৌনে চারটা’, ‘নিঃসঙ্গ নদীছায়া’, ‘উড়ছে দূরের বসন্ত’, ‘স্মৃতিসুধা ধরা থাক’, ‘সাক্ষাৎকারে সমকালীন বারো কবি’-র মতো নানামাত্রিক প্রকাশনা।

শিহাব শাহরিয়ারের পায়ের তলায় শর্ষে। দেশ থেকে ভিনদেশ সফরে বেরিয়ে পড়েন সুযোগ পেলে। দুই পুত্র সন্তানের জনক কবি ইউরোপ, এশিয়া, উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার একাধিক দেশে ঘুরেছেন ইতোমধ্যে। ভিনদেশের জীবন ও প্রকৃতির ছবি তুলে ধরতে ভ্রমণসাহিত্য লিখেছেন একাধিক।
শিহাব শাহরিয়ারের নানামত্রিক কাজের মধ্যে ‘বৈঠা’র কথা আলাদা করে না বললেই নয়। কাগজটির বিষয়-ভাবনা ও সম্পাদনা সৃজনশীলতায় ব্যতিক্রম। এ-পর্যন্ত প্রকাশিত সংখ্যাগুলোয় শিহাব শাহরিয়ার সচেতনভাবে বেছে নিয়েছেন মানুষের বেড়ে ওঠার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য কিছু এলাকা। এমন সব এলাকা, যারা একটা মানুষের যাপন মানচিত্রকে ধরে রাখে আমৃত্যু। ‘গ্রাম’, ‘সমুদ্র’, ‘পাহাড়’, ‘জ্যোৎস্না’, ‘বৃষ্টি’ ও ‘শৈশব’ নিয়ে বিষয় ভিত্তিক সংখ্যা ‘বৈঠা’কে বাংলা ভাষায় প্রকাশিত ছোটকাগজে যে-কারণে দান করেছে স্বতন্ত্র মহিমা।
. . .

শিহাব শাহরিয়ার : অবদায়ক : থার্ড লেন স্পেস.কম


