রূপকথা নয় ভাই! নানি-দাদির কোল ঘেঁষে কোনো রূপকথা শুনছেন না আপনি। চোখ কচলে বরং মেনে নিন,—যা দেখেছেন ও শুনেছেন চারটা দিন ধরে, এর সবটাই সত্যি এবং বাস্তব ছিল। টানা চারদিন ধরে ক্রিকেট পরাশক্তি অস্ট্রেলিয়ার ওপর ছড়ি ঘুরিয়ে প্রথম টেস্ট ম্যাচ নিজের করে নিয়েছে বাংলাদেশ! অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে আয়োজিত কোনো টেস্ট ম্যাচে ‘অজিবধ’ যেনতেন ব্যাপার না বাহে! ক্রিকেট খেলুড়ে দেশগুলোয় বাংলাদেশের কাণ্ড নিয়ে যে-কারণে সোরগোল ছিল ব্যাপক। ক্রিকেটবোদ্ধা ও ক্রিকেটভক্তরা সব ফেলে রেখে ডারউইনে চোখ গেঁথে রেখেছিলেন গেল চারদিন। গণমাধ্যমেও আপডেট এসেছে প্রতিনিয়ত। বাংলাদেশ কি পারবে? দাপুটে ও অভিজাত অজিদের কফিনে পেরেক ঠুকে তারা কি লিখতে পারবে নয়া ইতিহাস? সমাজমাধ্যম সয়লাব থেকেছে জল্পনায়।

বাংলাদেশ কবে ক্রিকেট বিশ্বের এতটা মনোযোগ ও বিরামহীন প্রশংসা কুড়িয়েছে, তা স্মরণে আসছে না এখন। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বড়ো অর্জন বলতে আজ থেকে কুড়ি-একুশ বছর আগে ষোল-সতেরো বছরের আশরাফুলের দুর্দান্ত শতক। চোখ ধাঁধানো শতকের বদৌলতে ব্যাটিংশিল্পী আশরাফুল ওয়ান্ডার বয় হয়ে বিশ্বে ঝড় তুলেছিলেন রাতারাতি। সাকিব আল হাসানের আগে বাংলাদেশের প্রথম পোস্টার বয় সেই আশরাফুল দলটির ব্যাটিং কোচের দায়িত্বে আছেন। টেস্ট ম্যাচ খেলতে অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার আগে কটুকথা হজম করতে হচ্ছিল বেচারাকে। দায়িত্ব কাঁধে নেওয়ার পর জিম্বাবুয়ের কাছে ইনিংস ব্যবধানে দল হেরেছিল। অস্ট্রেলিয়ায় প্রস্তুতি ম্যাচেও হেরে বসে। ব্যাটিং কোচ হিসেবে তাঁর কার্যকরিতা নিয়ে সুতরাং প্রশ্ন ও পরিহাসে মুখর ছিলেন সমর্থক ও সমালোচকরা। তো, সেই আশরাফুল অজিবধের মন্ত্র ছেলেদের ভালোই রপ্ত করিয়েছেন মনে হচ্ছে। নিজের দোষে অকালে শেষ হয়ে যাওয়া ওয়ান্ডারবয়ের ক্যারিয়ার অস্ট্রেলিয়ায় বড়ো শানদার ছিল-যে!
ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে অস্ট্রেলিয়াকে মাঝেমধ্যেই হারিয়েছে বাংলাদেশ। ওয়ানডে সিরিজ জিতেছে দু-একটি। সবুজ ঘাসের স্পোর্টিং উইকেট বানিয়ে পূর্ণশক্তির অস্ট্রেলিয়াকে হারানোর ঘটনা যার মধ্যে সবচেয়ে সাম্প্রতিক। অস্ট্রেলিয়াকে হারানোর আগে পাকিস্তানকে দেশের মাটিতে ও পরে তাদের ওখানে গিয়ে ছাতু করে এসেছিল তারা। নিউজিল্যান্ডের সঙ্গেও জয় আছে বোধহয়। দারুণ এক পেস স্কোয়াড ও ডরভয়হীন ক্রিকেট খেলার ফলাফল হাতেনাতে পাচ্ছে দলটি।
ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে নিজের শক্তি জানান দেওয়া মন্দ নয়, তবে আসল পরীক্ষা বা অ্যাসিড টেস্ট যাই বলি-না-কেন,—সেই টেস্ট ব্যাটলে বাংলাদেশের রেকর্ড এখনো মলিন! বলার মতো অর্জন ভাণ্ডারে বিশেষ একটা নেই। অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দল তাদের সঙ্গে পারতপক্ষে ম্যাচ খেলতেই চায় না। স্পন্সর, টেলিভিশন সম্প্রচার স্বত্ব, দর্শকখরা, ব্যস্ত সূচি… এরকম একশো বাহানায় এড়িয়ে যাওয়ার তালে থাকে।
তারওপর আছে ক্ষণে-ক্ষণে রং বদলাতে থাকা আভ্যন্তরীণ ও ভূ-রাজনীতির মারপ্যাঁচ। ক্রিকেটকে সেখানে হাতিয়ার করা হয় হামেশা। রাজনীতির জটিল প্যাঁচে পড়ে ভারতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপটা খেলতেই পারেনি বাংলাদেশ! দেশের ক্রিকেটে পেরেক ঠোকার অবস্থা করেছিল ইউনূস গং। তো এরকম একশো হুজ্জতে পড়ে তেইশ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট ম্যাচ খেলতে গেল বাংলাদেশ! ভাবা যায়!
এই-যে অস্ট্রেলিয়া টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ঠেলায় পড়ে খেলতে বাধ্য হচ্ছে, সেখানেও সত্তর-আশি হাজার থেকে লক্ষাধিক দর্শক হয় এরকম মাঠে খেলা রাখেনি। সামার টাইমে অস্ট্রেলিয়ানরা টেস্ট ম্যাচ দেখে আয়েশ করে। অভিবাসী বাংলাদেশীও কম নেই সেখানে। টাকা উঠবে না ভেবে তারা ডারউইনে খেলা রেখেছিল। যে-ডারউইনে শেষ দিনের খেলায় অজিরা হারছে ধরে নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার সমর্থকরা আর টিকেট কাটেনি। শুধু কী তাই, বাংলাদেশের সঙ্গে ম্যাচে কমেন্ট বক্সে অন্তত আতাহার আলী খান অটোচয়েস থাকেন। তাঁকে হায়ার করার কথা ভাবেনি আয়োজক দেশটি। অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট কিংবদন্তিরা ধারাভাষ্য দিয়ে গেলেন টানা চারদিন। ভালোই হয়েছে অবশ্য। আতাহার আলী খানকে আর যেচে প্রশংসা ও সাফাই গাইতে হলো না বাংলাদেশের;—অস্ট্রেলিয়ান কিংবদন্তিরা প্রশংসায় ভাসালেন বাংলার দামাল ছেলেদের।
মান ধরে রাখার অজুহাতে টেস্ট ক্রিকেটের কাঠামো এমন করে রেখেছে আইসিসি, বড়ো দলগুলোর সঙ্গে খেলার ভাগ্য বাংলাদেশ, আফগানিস্তান বা জিম্বাবুয়ের কপালে জোটে না নিয়মিত। নিচের সারিতে থাকা দলগুলো সাহস ও অভিজ্ঞতায় পিছিয়ে থাকে বছরভর। এমনও হয়, বড়ো দলগুলো পূর্ণশক্তির দল নিয়ে খেলে না। বি-টিম মাঠে নামিয়ে দায় সারে কোনোমতে। বর্ণাশ্রম প্রথার মতো অচলাবস্থা বহাল রেখে ছোট দলগুলোর কারণে ক্রিকেট কৌলিন্য গেল গেল রব তোলেন বোদ্ধারা। ‘দ্বিস্তর টেস্ট ক্রিকেট’ চালুর পক্ষে এমনকি শেন ওয়ার্ন থেকে রবি শাস্ত্রীরাও সুর মিলান!
জটিলতা নিরসনে ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইসিসির ভূমিকা গয়ংগচ্ছ। এক-একসময় মনে হয়,—ভারত, ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট বোর্ড খেলাটির সর্বেসর্বা, আর আইসিসি সেখানে জাতিসংঘের মতো নিকম্মার মহড়া দিচ্ছে কেবল! টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার দুই যুগ পার করেও ভারত, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দলের সঙ্গে খেলার জন্য চাতকপাখির মতো তাকিয়ে থাকতে হয় আজো!

ছাব্বিশ বছরে অজিদের সঙ্গে মাত্র ৭টি টেস্ট খেলার চুক্তি করতে পেরেছিল বাংলাদেশ। ৪টি দেশের মাটিতে খেলেছে তারা, আর এবার নিয়ে মোট ৩টি ম্যাচ খেলতে প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ি দিলো দলটি। মজার ব্যাপার হচ্ছে, অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অজিবধের জন্য ক্রিকেট-কুলীন ভারতকে ১২টি ম্যাচ খেলতে হয়েছিল। ৭ নাম্বার ম্যাচ খেলতে নেমে পাকিস্তান অজিদের দর্প চূর্ণ করে প্রথমবার। লংকানদের সঙ্গে ১৫ বার মোকাবিলায় অজিরা নিজের মাটিতে এখনো অপরাজিত। বাংলাদেশ সেখানে ৩ নাম্বার টেস্ট খেলতে এসে অজিদের বধ করল! দক্ষিণ আফ্রিকা ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যানের হিসাবে এখানে সমানে সমান। প্রোটিয়ারা যদিও প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ি দিয়ে খেলতে আসে নিয়মিত! খেলার সুযোগ একমাত্র পারে ছোটদলকে বড়ো দলের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার কৌশলে অতুল করতে। টেস্ট ক্রিকেটের বিশ্বায়নে যা এখনো সুপরিকল্পিত নয়। বর্ণপ্রথাটাই যেন অমোঘ নিয়তি সেখানে।
যাইহোক, মূল প্রসঙ্গে ফেরত যাই। অস্ট্রেলিয়ায় ২৩ বছর পর খেলতে যাওয়ার আগে বাংলাদেশের অবস্থা সুবিধের ছিল না। জিম্বাবুয়ের সঙ্গে বাজে খেলে ইনিংস পরাজয়ের লজ্জায় পুড়তে হয়েছিল! এই বাংলাদেশের পক্ষে বাজি ধরতে যাবে কোন বোকা? কিন্তু ডারউইনের পিচে খেলতে নেমে পোড়ারমুখী দলটা বদলে গেল নিমিষে! অনিশ্চয়তার খেলা ক্রিকেটে সকল হিসাব-নিকাশ উলটে দিয়ে সারা বিশ্বের নজর কেড়ে নিয়েছিল প্রথম দিন থেকেই! সবাই বলাবলি করছিলেন,—বাংলাদেশ যেভাবে টানা সেশন-বাই-সেশন আধিপত্য রেখে খেলছে, ক্রিকেট স্কিল ও প্ল্যানিংয়ের পরাকাষ্ঠায় বিশ্বের নাম্বার ওয়ান ক্রিকেট দলকে দিশেহারা করে ফেলেছে,—বড়ো কোনো ভুল না করলে জয়টা তাদের পাওনা। তাই করে দেখিয়েছে বঙ্গ শার্দুলরা। চারদিনের নিখুঁত গেম প্ল্যান ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে স্কিলের সমাহার মিলে যা করেছে তা মহাকাব্য সমতুল ঘটনাই বটে! কোনো এক মহাকবি নিশ্চয় লিখবেন একদিন এই ‘অজিবধ’ কাব্য।
অনেকে বলছেন বটে, অজিদের বাংলাদেশকে হালকাভাবে নেওয়া কিংবা ডারউইনের মতো দেশের কোণায় পড়ে থাকা ভেন্যুতে ম্যাচ ফেলা ব্যাকফায়ার করেছে। পার্থ, সিডনি, মেলনবোর্ন, অ্যাডিলেডে ম্যাচ খেললে এমনটা ঘটত না। তাই কি? ডারউইনে বাংলাদেশ যে-সংকল্প ও একতায় সংহত হয়ে খেলেছে, অস্ট্রেলিয়ার নামকরা ভেন্যুতে খেললেও তা বজায় থাকত বলেই মনে হয়েছে। অস্ট্রেলিয়াকে নিয়ে বাংলাদেশ ভেবেছে ও পরিকল্পনামাফিক খেলতে ত্রুটি করেনি। সাফল্যও ধরা দিয়েছে সহজে। যেখানে, অজিরা পূর্ণশক্তি নিয়ে মাঠে নামলেও, বাংলাদেশের খেলার ধরন ও খেলোয়াড়দের নিয়ে ভেবেছে কম। আধুনিক ক্রিকেটে টিম স্টাডি গুরুত্বপূর্ণ, এবং সেখানে অজিদের থামতি ঘটেছিল বৈকি।
কে না জানে, স্লেজিংয়ে প্রতিপক্ষের মনোবল গুঁড়িয়ে দিতে অস্ট্রেলিয়ানরা ওস্তাদ। প্রতিপক্ষকে উত্তেজিত করে তুলতে বাক্যবাণ ছোঁড়ার কেরামতিকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছে তারা। কত-না কাহিনি আছে এই স্লেজিংয়ের। মজার জন্য যেমন করে, ম্যাচের মোমেন্ট হাতে নেওয়ার ভাবনা থেকেও করে প্রায়ই। বাংলাদেশের সঙ্গে স্লেজিংটা এবার কাজে আসেনি। অবাক লেগেছে দেখে,—মিরাজ, শান্ত, লিটনরা স্লেজিং সামলে পালটা বাক্যবাণ ছুড়তে দ্বিধা করেনি! লিটনদের দেহের ভাষায় ভয়ডর দূরে থাক, সমীহে কুঁচকে যাওয়ার লক্ষণ ছিল না!
বিশ্বসেরাদের নিয়ে ম্যাচটি খেলতে নেমেছিল অস্ট্রেলিয়া। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের লড়াই, তাও আবার নিজের মাটিতে, দলটি বি-টিম নামানোর ঝুঁকি নেবে না এটা সবাই বলাবলি করছিলেন। হয়েছেও তাই। বিশ্বসেরা পেস স্কোয়াড আর পরীক্ষিত ব্যাটারদের এক-একজন মহাতারকা। সলিড টিম নিয়ে মাঠে নামার একটাই কারণ ছিল,—ভুলেও যেন পচা শামুকে পা না কাটে টেস্ট গরবে গরিয়ান অস্ট্রেলিয়ার। তা আর হলো কই! বাংলাদেশ ম্যাচটা বের করে নিলো রীতিমতো দাপুটে ক্রিকেট খেলে। অজিরা কবে এমন হতভম্ব বোধ করেছে তা ইয়াদ হচ্ছে না ভাই!
কয়েক মাস আগে বাংলাদেশে ওয়ানডে সিরিজ খেলতে এসে নতুন গতিদানব নাহিদ রানাকে মোকাবিলার রাস্তা খুঁজে পায়নি অজিরা। তারপর থেকে তাদের কাছে নাহিদ রানা হয়ে উঠেছিল অ্যা বিগ স্পিডস্টার। সত্যি বটে,—এই ছেলে ক্রিকেট পিচে শোয়েব আখতার, ব্রেট লিকে যেন ফেরত এনেছে পুনরায়। ঘণ্টায় দেড়শো কিলোমিটার গতিতে বল ছোঁড়ার সঙ্গে কার্যকর লাইন-লেন্থ ও সুইং… সোজা কথায় লা জবাব! নাহিদ রানা অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে কী করে তা দেখার জন্য অজিরাও উন্মুখ ছিল। ইনজুরিতে পড়ে খেলতে পারেনি।

অজিরা এখানেও হিসাবে গরমিল করেছে। তাদের মাথায় থাকেনি,—নাহিদ রানা ছাড়াও বাংলাদেশের ভাণ্ডারে একঝাঁক পেস ব্যাটারি মজুদ আছে এখন। প্রত্যেকে নিজের দিনে হয়ে উঠতে পারে ভয়ংকর। অফ স্পিন ও লেগ স্পিনে দলটি আগের চেয়ে গোছানো। নাহিদ রানা ছাড়াও বাংলাদেশের পেস স্কোয়াড কতটা গভীর… অস্ট্রেলিয়া তা টের পেয়েছে এই চারদিনে। ইংল্যান্ডে কাউন্টি মওসুম কাটিয়ে আসা হাসান মাহমুদ একা মোড় ঘুরিয়ে দিলো ম্যাচের প্রথম দিন। হর্ষা ভোগলেকে বলতে শুনেছি আগেও,—এই ছেলেটাকে বাংলাদেশ যদি ঠিকমতো তৈরি করতে পারে, তাহলে টেস্ট ক্রিকেটে গেম চেঞ্জার হয়ে উঠবে একদিন। সত্যিই তা করে দেখিয়েছে হাসান মাহমুদ। সঙ্গে তাসকিন, এবাদতের ইমপ্যাক্ট বোলিং ছিল লা জবাব!
দুদিন পরে পিচে বল নামতে শুরু করেছিল। এর থেকে আবার মোক্ষম ফায়দা তুলেছে স্পিনাররা। শুরুটা হাসান মাহমুদ, তাসকিন, ইবাদতের মোক্ষম গতিঝড় ও ডারউইনের বাতাসকে কাজে লাগিয়ে কার্যকর সুইং দিয়ে শুরু হয়েছিল। শেষ খেলটা দেখালেন মিরাজের মতো পরীক্ষিত স্পিনার। মাঝখানে তানজিদ তামিম, শান্ত, মমিনুলের হিসাবি ও ডারভয়হীন ব্যাটিং, আর নিচের সারির ব্যাটারদের সঙ্গে নিয়ে মিরাজের ওই কঠিন পরিস্থিতিতে উইকেট ধরে খেলা ছিল দেখবার মতো। ফলাফল, টেস্টের প্রথম দিনের প্রথম সেশন থেকে অস্ট্রেলিয়া ব্যাকফুটে!
এটা আরো অবিশ্বাস্য রূপকথা এ-কারণে,—অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ম্যাচের প্রথম দিন থেকে আধিপত্য বজায় রেখে খেলার নজির ক্রিকেট ইতিহাসে বিরল। অ্যাশেজ খেলতে আসা ইংল্যান্ড কিংবা বর্ডার-গাভাস্কার ট্রাফি খেলতে আসা ভারতও সচরাচর পারে না। নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা কিংবা ওয়েস্ট ইন্ডিজ তাদের স্বর্ণযুগে প্রথম দিন থেকে অস্ট্রেলিয়াকে চেপে ধরতে পেরেছে, এমন নজির বিরল। পাকিস্তান সম্ভবত শেষবার চেপে ধরেছিল প্রায় দশ-বারো বছর আগে। বাংলাদেশের জয়টা যে-কারণে সকলে মনেপ্রাণে চাইছিলেন। এই প্রথম ভারত-পাকিস্তান থেকে শুরু করে ক্রিকেট বিশ্ব বাংলাদেশের ডাই হার্ড ফ্যান বনে গিয়েছিল। এটা এখন ইংল্যান্ড ও ভারতকে ভাবাবে,—অস্ট্রেলিয়ায় নিয়মিত টেস্ট সিরিজ খেলতে নেমেও কেন তারা এতদিনে এই ডমিনেন্সটা দেখাতে পারেনি!
যাইহোক, উচ্চ প্রযুক্তির যুগে ভারত, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড বা দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দলের বিরুদ্ধে অন্যরা বেশিদিন ডমিনেন্স ধরে রাখতে পারে না। বাংলাদেশের বোলারদের বায়ো ম্যাকানিক্স অজিরা দ্রুত বের করে নেবে। আহত বাঘ যেহেতু, পরের টেস্টে হয়তো একলাই নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করবে ম্যাচের। বাংলাদেশকে সুতরাং এটা হিসাবে নিয়ে খেলতে হবে দ্বিতীয় টেস্ট। দুই টেস্টের সিরিজে পরের টেস্টে বাংলাদেশ যদি হেরেও যায়, সিরিজ ড্র করে দেশে ফিরবে। আর ড্র করতে পারলে এই প্রথম সিরিজ জয় অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে! আর, যদি জিতে যায়… ধবলধোলাই! টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশ কবে এমন সুখের মওকা পেয়েছে তা এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না!
বড়ো কথা, দলটি বড়ো ক্রিকেটশক্তি হওয়ার সম্ভাবনা জানান দিচ্ছে একটু-একটু করে। সরকার ও বোর্ডের দায় হলো একে ধরে রাখার জন্য সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া পরপর। অজিদের বিপক্ষে এরকম জয় ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জয়ের চেয়েও বেশি কিমত রাখে। তা এ-কারণে-যে,—বাংলাদেশকে এখন ক্রিকেট এলিটরা হিসাবে নেবে। বিশ্বের টপ ক্লাস টেস্ট খেলুড়ে দেশগুলোর সঙ্গে নিয়মিত সিরিজ খেলার সুযোগ বাড়বে সামনে। পার্থ, সিডনি, মেলবোর্ন, লর্ডস কিংবা ওভালের মতো ক্রিকেট মক্কায় সামার টাইমে টেস্ট ম্যাচ এনজয় করতে আসা শ্বেতাঙ্গরা টিকিট কাটবে বাংলাদেশের সঙ্গে খেলা কেমন জমে তা দেখার আশায়।
সুখকর লেগেছে দৃশ্যটি দেখে,—কিছু অস্ট্রেলিয়ান বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা গায়ে জড়িয়ে ‘আমার সোনার বাংলা’ গানের সঙ্গে তাল দিচ্ছে। কবে এমন দিন দেখেছে বাংলাদেশ! একমাত্র খেলা হয়তো পারে সীমানাকে অচল করে ভালোবেসে কাউকে হৃদমাঝারে আপন করে নিতে।
. . .

… থার্ড লেন স্পেস-এ প্রাসঙ্গিক আরো দেখুন …
বিশেষ আয়োজন : ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬
. . .

অবদায়ক : আহমদ মিনহাজ : থার্ড লেন স্পেস.কম
আহমদ মিনহাজ-এর অন্যান্য রচনা ও প্রাসঙ্গিক পাঠের জন্য এখানে চাপুন



