
গায়েবি অনল
(কবি কিশওয়ার ইবনে দিলওয়ারকে নিবেদিত)
আপনাকে দেখে ফেলি কিশওয়ার—
দাঁড়িয়ে আপনি জিন্দাবাজারে, ব্যস্ত চৌরাস্তায়।
হাতের মুঠোয় সিগারেট-শলাকা,
সুকান্তের বারুদ ফুঁকছেন আনমনে—
গায়েব থেকে কবিতা নামাবেন এখনই!
আপনাকে দেখে ফেলি হঠাৎ …
মানুষের ভিড়ে সয়লাব জিন্দাবাজার!
দেখে ফেলি—
বিড়ালের সাথে জাগছেন রাত!
গায়েবি ইঁদুর মুঠোয় ধরবেন তাই,
জেগে জেগে রাত পার দুজনের!
ফুরাবে না এই রাত,
বিড়ালের সাথে নির্ঘুম…
জেগে থাকার অভিশাপ!
আপনাকে দেখেছি কবি—
কবিতার এঁটোকাঁটা মিলবে আশায়,
চোখ মুদে সেজেছেন ধ্যানী বক!
গায়েবি দিদার দিবে দেখা,
চোয়ালে ক্রোধের অনল!
রাতজাগা চোখে খুনরাঙা আকাশের লাল!
দেখে ফেলি আপনাকে, কিন্ ব্রিজে মজনুন্,
নদী সুরমায় ঘোলা জলে লাইলির তালাশ!
চোখে অনন্তের ক্ষুধা,
হাক্ মাওলা বলে এখনই ঝাঁপ দিবেন ফানা ফিল্লাহয়!
কবিতার এঁটোকাঁটা আমাদের মস্তকে নামে,
কবিতা ঝরে অবিরল, ভিজে এই রঙিলা শহর
আমরাও নিদারুণ ভিজি হে কবি,
আপনাকে ভেবে কবিতায় ভিজি নিদারুণ…!
আপনি কি ছিলেন বাবা শাজালাল?
জায়ানামাজ বিছিয়ে নদী সুরমায়,
নিয়েছেন ফকিরি হে কবি!
নিশিজাগা চোখে কেনো তবে খুনরাঙা আকাশের লাল!
এখানে সেখানে আপনাকে দেখে ফেলি—
আলো-অন্ধকারে অস্থির পায়চারি,
হাতের মুঠোয় আগুনের ফুলকি,
দাঁড়ির ভাঁজে থোকা-থোকা গায়েবি অনল…
লেলিহান হে কবি, বড়ো লেলিহান,
এই গায়েবি অনল …!
দেখে ফেলি আপনাকে হঠাৎ—
নিয়েছেন খোদার ফকিরি,
চোখে খুনরাঙা আকাশের লাল …!
. . .
. . .

সংযুক্তি
বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে, কিশওয়ার আপনি খুনরাঙা চোখে কেন হানা দিচ্ছেন বারবার! হানা দিচ্ছে আপনার সঙ্গে কাটানো মুহূর্তরা! জিন্দাবাজার আর জল্লারপাড়ে আমাদের বেহাহিসাব দিন-যাপন। ‘ফোকাস আইটি’-র ছোট্ট খুপড়িঘরে রোজ সন্ধ্যায় আপনি হানা দিতেন। বসতেন জরাজীর্ণ চেয়ারে! দেখতে রাজসিক হলেও মরণের সঙ্গে পাঙ্গা লড়ছিল বেচারা। যেমন ছিলেন আপনি!—মানসিক ব্যাধির সঙ্গে লড়াইয়ের ভারে ক্লান্তপ্রাণ কাপালিক!
শরীর ততদিনে ভেঙে পড়েছিল হে কবি। তবু, আপনাকে দেখে মনে হতো,—এখনো ইচ্ছে করলে বলিষ্ঠ হাতের থাবায় নিমিষে ধরাশয়ী করবেন প্রতিপক্ষকে। যেমন আমরা আপনাকে করতে দেখেছি মেন্টাল ওয়ার্ডের দিনগুলোয়। সেখানেও আপনি ছিলেন মহামহিম সম্রাট,—যাকে কুর্নিশ ঠুকত বাকিরা।
আপনি ফেরত এলেন আমাদের মাঝে পুনরায়। পাল্লা দিয়ে সিগারেট ফুঁকতেন, আর পকেট থেকে মাঝেমধ্যে বেরিয়ে আসত রাত জাগার অকথ্য অভিশাপ থেকে লেখা টাটকা কবিতা। পড়ে শোনাতেন। সাগ্রহে তাকাতেন আমাদের মুখের দিকে। মনে হতো, আপনি চিরকালের ডাকাবুকো এক কবি। আপনার মতোই দুরারোগ্য মানসিক ক্ষতের শিকার শোয়েব শাদাব ও বিষ্ণু বিশ্বাসের সঙ্গে টহল দিচ্ছেন রাজধানী শহর! সেখানে কিছুদিন আস্তানা গেড়েছিলেন। তার কত গল্পই না শুনেছি ঝিম মেরে!
আপনি, এভাবে একদিন ‘ফোকাস আইটি’-র ওই চেয়ারখানাকে অপেক্ষায় রেখে হাওয়া হলেন ফানাফিল্লাহয়। যে-গায়েবি নিদান হানা দিতো মগজে অবিরত, আর আপনি এই ‘সংঘর্ষ আলো অন্ধকারে’ ছিলেন অদম্য ঈশ্বর… এইবার তার পালা সাঙ্গ হলো। আপনি এখন কোথায় কিশওয়ার? ঈশ্বরের সঙ্গে ঘটেছে কি সাক্ষাৎ? নাকি তারার সমাধি নিয়েছেন দূর গ্যালাক্সিতে? জন্ম নিচ্ছেন নতুন করে… উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে!
যেখানেই থাকুন কবি, কবিতায় আর গানের টানে বোনা এই গানালেখ্যটি আপনার কাছে পৌঁছে যাবেই যাবে। জানবেন, আমরা আপনাকে আজো ভুলিনি। আপনি আছেন মনের তারায় অভিশাপ হয়ে। থাকবেন, যতদিন আমাদের আয়ু রয়েছে ধরায়। যতদিন, আমরা শিকার হইনি বিস্মরণের!
. . .
বি. দ্র : দুটি সংস্করণে গানের চরণ ঈষৎ পরিবর্তিত। নিচের আবৃত্তিযোগ্য সংস্করণের চরণের সঙ্গে সুতরাং ওপরের গান ও কবিতার মিশ্রণে বোনা সংস্করণের যৎসামান্য (স্থায়ী অংশে) ভিন্নতা থাকছে, এবং একে আপাতত চূড়ান্ত মানছি।
—আহমদ মিনহাজ : অবদায়ক : থার্ড লেন স্পেস.কম
. . .

. . .



