নেটালাপ - পোস্ট শোকেস

নেটালাপ : কেতকী, তাঁকে কি ভাবব তবে “মিস হ্যাভিশ্যাম”?

Reading time 12 minute
5
(18)
@thirdlanespace.com

. . .

চমৎকার একটা সাক্ষাৎকার পড়লাম;—কেতকী কুশারী ডাইসনের চিন্তার ভঙ্গি, তাঁর দেখার দৃষ্টি—এই নাতিদীর্ঘ আলাপেই বেশ ভালোভাবে ধরা পড়ে। একইসঙ্গে কামাল ভাইয়ের বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গিটাও চোখ এড়ায় না। ফলে একটা জমজমাট আলোচনা হয়েছে। শুরুতে স্বীকার করে নিচ্ছি,—কেতকীর লেখা নিয়ে আমার নিজের বিস্তৃত জানাশোনা নেই। আমার মতো পাঠকের জন্য এটি তাই নতুন অভিজ্ঞতা নিয়ে এসেছে। সাক্ষাৎকারটি বেশ পুরোনো। ২০১২ সালে নেওয়া হয়েছিল, তবে সময় বিচারে যথেষ্ট প্রাসঙ্গিক লেগেছে পাঠ করে। কামাল ভাইসহ যাঁরা আলাপটি সম্ভব করলেন তখন, তাঁদেরকে ধন্যবাদ দিতে হচ্ছে। থার্ড লেন স্পেসে এটি পৃথক মাত্রা যোগ করবে তা নির্দ্বিধায় বলা যায়।

কেতকীর বহুমাত্রিক, বৌদ্ধিক জগৎকে উন্মোচিত করার চেষ্টা চোখে পড়েছে সাক্ষাৎকারে। এমন একজন লেখক হিসেবে তাঁকে তুলে ধরা হয়েছে, যিনি বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষায় স্বচ্ছন্দে বিচরণ করছেন। এই চলাচল কেবল ভাষাগত দক্ষতা নয়, এটি তাঁর অস্তিত্বের অংশ। আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে, আর তা হলো ‘ডায়াস্পোরা’ নিয়ে তাঁর ভাবনা। আমরা সাধারণত ভাবি,—প্রবাস মানেই শেকড়হীনতা ও একধরনের বিচ্ছিন্নতা। কেতকী নিজেকে বরং ‘শেকড়বদ্ধ লেখক’ দাবি করছেন। তাঁর কাছে শেকড় মানে নিছক ভৌগোলিক সীমানা নয়; ভাষা, স্মৃতি—সব মিলিয়ে একধরনের বেঁচে থাকা। এটি খুব দরকারি; কারণ এখানে প্রবাস যাপন মানে দেশ হারানোর পরিবর্তে নতুন অভিজ্ঞতাকে নিজের ভাষায় ধারণ করার বিষয় হয়ে উঠছে।

বাংলা সাহিত্য কেন বিশ্বে দৃশ্যমান নয়? এই বিষয়টি আলোচনায় সরাসরি উঠে এসেছে। নোবেল প্রসঙ্গে কেতকী যখন বলেন, এটি হচ্ছে ‘সংস্কৃতির রাজনীতি’, পরে অনুবাদ নিয়ে যে-কথাগুলো বলেছেন,—দক্ষ অনুবাদক নেই, প্রকাশকের বাজার-চিন্তা, আন্তর্জাতিক আগ্রহের অভাব… এসব মিলিয়ে বোঝা যায় সমস্যা কেবল সাহিত্যিক নয়, বরং তা কাঠামোগতও। সাক্ষাৎকারের গুরুত্ব ও প্রাসঙ্গিকতা বৃদ্ধিতে এসব প্রসঙ্গ বড়ো ভূমিকা রেখেছে। তারপর এসেছে তাঁর নিজের ‘খাঁটি হওয়ার’ প্রসঙ্গটি। স্পষ্ট করেই বলেছেন কেতকী,—ওপরচালাকি তাঁর পছন্দ নয়; নিজের সংস্কৃতিকে বাজারের জন্য সাজিয়েও তুলতে চান না। অরুন্ধতী রায়, সালমান রুশদি বা মনিকা আলিকে নিয়ে তাঁর আপত্তিগুলো এই জায়গা থেকে এসেছে মূলত।

শেষদিকে মারুফ রায়হানের প্রশ্নে যে-প্রসঙ্গটি উঠে আসে তা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। কেতকী স্পষ্ট করে বলছেন সেখানে,—কবিতাবিচারে Politics আছে, `Out of sight out of mind’ এখানে কাজ করে থাকে, এবং তাঁর মূল্যায়ন কম হওয়ার পেছনে নারী হওয়া ও পুরুষ-নিয়ন্ত্রিত সমালোচনা-সংস্কৃতির ভূমিকা কম নয়। সরাসরি বলেছেন,—সাহিত্যে ‘Male Bias’ আছে, যেটি তাঁর কবিতাকে কেন্দ্র করে আলোচনা-সমালোচনার পথ রোধ করেছে অনেকখানি।

সাক্ষাৎকারটি বিভিন্ন বিষয়ে গমন করেছে, যথেষ্ট বৈচিত্র্য রয়েছে, তা-সত্ত্বেও কিছু আফসোস থেকেই যাচ্ছে! অনেক গুরুত্বপূর্ণ জায়গা ছুঁয়ে গেলেও আলাপটি ধারাবাহিক হয়নি, দ্রুত অন্যদিকে চলে গিয়েছিল। সময়ের সীমাবদ্ধতা হয়তো ভূমিকা রেখেছে সেখানে। পুরো সাক্ষাৎকার পড়ার পর দু-একটি বিষয় মাথায় এলো, যদিও বুঝতে পারছি না এগুলো এখানে যথেষ্ট প্রাসঙ্গিক হবে কিনা। যেমন, ‘দুই মাতৃভাষা’র প্রসঙ্গটি আলোচনার দাবি রাখে। প্রশ্ন হলো,—দুটি ভাষায় কি একইভাবে অনুভব করা সম্ভব? স্বপ্ন, স্মৃতি, বেঁচে থাকার ধরণ… এসব কি অবিকল একই থাকে?

‘The Breeders’ (2013) by Janine Shroff; Image Source andCredit: designpataki.com

প্রবাসে থেকেও শেকড়বদ্ধ থাকা… এই কথাটির মানে কী দাঁড়ায়? শেকড় কি কেবল স্মৃতিতে বেঁচে থাকে, নাকি বর্তমান জীবনধারায় তা নিহিত? আমরা সাধারণত শেকড় বলতে যা বুঝি তা হলো নির্দিষ্ট জায়গা—ভূগোল, মানুষ, ভাষা ও প্রতিদিনের জীবনযাপন। এদিক থেকে দেখলে, দীর্ঘদিন প্রবাসে থাকার অর্থ হচ্ছে সরাসরি সংযোগের অবক্ষয়। ফলে প্রশ্ন ওঠে,—এই পরিবর্তনের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা কোনো লেখক কি সত্যি সেই দেশের ‘বর্তমান’কে ধারণ করতে পারেন?

কেতকীর কাছে শেকড় শুধু ভৌগোলিক বিষয় নয়, বরং ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক। তিনি বাংলায় লেখেন, বাংলার সাহিত্যিক পরম্পরায় নিজেকে যুক্ত রেখেছেন, এমনকি ইংল্যান্ডের অভিজ্ঞতাকে বাংলায় রূপান্তরও করছেন তিনি। অর্থাৎ, একধরনের ‘ভাষাগত শেকড়’ তৈরি করে নিয়েছেন কেতকী, যেখানে দেশ মানে হচ্ছে একটি ভাষার ভেতরে বসবাস করা। ধারণাটি আকর্ষণীয়, কারণ এটি শেকড়কে বহনযোগ্য করে তুলছে। প্রশ্ন তবু থেকে যায়,—ভাষা কি একা যথেষ্ট সেখানে?

প্রবাসী লেখকদের ক্ষেত্রে প্রায়ই দেখা যায়, তারা যে-দেশকে লিখছেন, তা বাস্তবের দেশ নয়, বরং তাদের মনে বেঁচে থাকা একটি সংস্করণ। সংস্করণটি বর্তমানের জটিল, পরিবর্তনশীল বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি খাপ খায় না। প্রশ্ন তাই অনিবার্য হয়,—প্রবাসী লেখক কি ‘বাস্তব দেশ’কে লেখেন, নাকি ‘স্মৃতির মধ্যে সজাগ দেশ’ এটি? কেতকী নিজে অবশ্য মনে করেন, তাঁর ভাষা ও সাহিত্যিক চর্চা তাঁকে শেকড়ের সঙ্গে সংযুক্ত রাখে, কিন্তু এই সংযোগ কতখানি প্রত্যক্ষ, আর কতটা নির্মিত তা আলোচনার দাবি রাখে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক আছে এখানে। প্রবাসে থাকা মানে শুধু দেশ থেকে দূরে থাকা নয়, বরং নতুন একটি সংস্কৃতির মধ্যে থাকা। নতুন এই অভিজ্ঞতা লেখকের ভেতরকে পালটে দেয়। তার চিন্তার ধরন, দেখার ভঙ্গি, ভাষার ব্যবহার… সবকিছু এর দ্বারা প্রভাবিতও হয়। এর ফলে একজন প্রবাসী লেখক যখন নিজের দেশ নিয়ে লেখেন, তিনি আসলে দুটি দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে দাঁড়িয়ে লেখেন,—একটি ভেতরের ও অন্যটি বাইরের। এই দ্বৈততা থেকে নতুন অন্তর্দৃষ্টি তৈরি হয়, আবার দূরত্বও গড়ে ওঠে। সব মিলিয়ে, কেতকীর ‘শেকড়বদ্ধতা’র ধারণাটি একদিকে শক্তিশালী, অন্যদিকে প্রশ্ন তোলার বিষয়। কেতকীর ভাবনায় শেকড় কেবল মাটিতে নয়, তা এখানে ভাষায়, স্মৃতিতে, অভিজ্ঞতায় থাকতে পারে। এই শেকড় একইসঙ্গে কিছুটা নির্মিত ও রূপান্তরিত, এটি কিন্তু অস্বীকার করা যায় না।

Christmas Feast (2009) by Janine Shroff; Image Source andCredit: designpataki.com

‘ডায়াস্পোরা’-কাহন : ভারতীয় বংশোদ্ভূত বৃটিশ চিত্রশিল্পী জেনিন শ্রফ-এর অনুভবে দেশ ও অভিবাসন : Mentally, one half of you lives in India and the other half in the UK. It took me a little while, about eight years, to feel at home. As an immigrant you may need to live in this half-in half-out hazy limbo for a long time. [Source: www.designpataki.com]

কেতকী সরাসরি বলছেন,—সাহিত্যে ‘Male Bias’ আছে। তাঁর অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বোঝাতে চাইছেন মূল্যায়নের ক্ষেত্রে অদৃশ্য এক কাঠামো কাজ করে, যেখানে পুরুষ লেখকের লেখা সহজে গুরুত্ব পায়, আর নারী লেখকের ক্ষেত্রে সেটি হয় না। আজকের দিনে অনেক নারী লেখক আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পাচ্ছেন। তাহলে কি বলা যায় Bias কমছে, নাকি এটি কেবল দৃশ্যমানতার পরিবর্তন? কম মূল্যায়ন কি সবসময় Gender Bias-এর জন্যই হয়? সাহিত্যিক স্বীকৃতি তো অনেক কিছুর উপর নির্ভর করে,—ভাষা, অঞ্চল, পাঠকগোষ্ঠী, প্রকাশনা, এমনকি সময়ও সেখানে ভূমিকা রাখে। আবার দেখা যায় বৌদ্ধিক অবনতি ও সামাজিক অবক্ষয় অনেকক্ষেত্রে প্রতিভাকে চিনে নিতে পারে না। সমস্যাটি শুধু অবমূল্যায়নের নয়,—পরিচয়েরও। একজন নারী লেখককে কীভাবে পড়া হচ্ছে এই প্রশ্নটি সেখানে গুরুত্বপূর্ণ। সব মিলিয়ে বলা যায় ‘Male Bias’ একটি বাস্তবতা, তবে তা সরল নয়।

অথেনটিসিটি বা ‘খাঁটি হওয়া’র বিষয়টি আসলে কী? সাহিত্য কি কখনো পুরোপুরি খাঁটি হয়? নাকি সব লেখাই কোনো না কোনোভাবে নির্মাণ? একজন লেখক যখন লিখছেন, তখন তিনি নির্বাচন করেন… কিছু সামনে আনেন ও কিছু আড়াল করে যেতে থাকেন। প্রতিটি লেখাই যে-কারণে আংশিকভাবে নির্মিত। কেতকী যেমন কৃত্রিম উপস্থাপনাকে অস্বীকার করছেন, তেমনি তাঁর নিজের লেখাও তো এক ধরনের রূপান্তর নয় কি? রুশদি বা অরুন্ধতী রায়ের লেখাকে একমাত্রিকভাবে দেখা যায় না। তাঁদের কাজ অনেকসময় নতুন ভাষা ও বর্ণনার ধরন তৈরি করেছে। ফলে প্রশ্ন থেকে যায়,—এটি কি আপস, নাকি সৃজনশীল কৌশল?

সালমান রুশদি, অরুন্ধতী রায়ের পাশাপাশি মনিকা আলি, ঝুম্পা লাহিড়ী, বিক্রম শেঠ, অমিতাভ ঘোষের প্রসঙ্গ সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে, যেখানে বিচার পদ্ধতি প্রায়শ রুচি নির্ভর অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকে। কেতকী রুশদিকে পড়তে পারেন না। অরুন্ধতীর লেখায় ভারতবর্ষকে ‘এক্সোটিক’ রূপে উপস্থাপনের অভিযোগ তোলেন। মনিকা আলির বর্ণনায় সাংস্কৃতিক অনভ্যস্ততাও তাঁকে পীড়িত করছে। এগুলো গুরুত্বপূর্ণ আপত্তি, তবে এখানে কিছু প্রশ্ন উঠবেই,—‘এক্সোটিক’ আর বিশ্বজুড়ে পাঠযোগ্য হয়ে ওঠার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য কোনখানে?

প্রান্তিক বাস্তবতাকে তুলে ধরতে যেয়ে কি সবসময় পশ্চিমা পাঠকের কথা ভেবে তা সাজানো হয়? রুশদির ভাষা ও লেখার ধরনকে সোজাসপটা অস্বীকার করা যায় কি, নাকি এখানে নৈতিক আপত্তি তাঁর সাহিত্যিক কৌশলের ওপর প্রভাব রেখেছে? প্রশ্নগুলো নিয়ে যদি আরো খোলামেলা আলোচনা হতো, তাহলে বিষয়টি অনেকবেশি তীক্ষ্ণ হয়ে উঠত। এখনকার অবস্থায় তাঁর আপত্তিগুলো গুরুত্বপূর্ণ হলেও, সেগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত মতামত হিসেবে ধরে নিতে হচ্ছে।

সাক্ষাৎকারে ব্রিটিশ উপনিবেশ নিয়ে আলাপ বড়ো বিতর্কের সম্ভাবনা তৈরি করেছিল। কেতকী একদিকে শোষণের কথা স্বীকার করছেন, অন্যদিকে জ্ঞানচর্চার প্রসঙ্গও তুলেছেন। এখান থেকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের আগমন, শোষণ ও সামাজিক ব্যবস্থার উপর এর অভিঘাত নিয়ে বিস্তারিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছিল। পরাধীনতা কি কেবল ক্ষতি করেছে, নাকি আত্মপরিচয়ের নতুন রূপ গঠনে ভূমিকা রেখেছিল তা? আলোচনা এখানে এসে বেশিদূর অগ্রসর হয়নি। কামাল ভাই ভিন্নমত পোষণ করলেও একে এগিয়ে নেননি। এতে করে সম্ভাব্য তাত্ত্বিক বিতর্ক অসম্পূর্ণ থেকে গেল!

নোবেল নিয়ে কথাবার্তাও অনেকটা তাই ছিল। ‘সংস্কৃতির রাজনীতি’ নামে একে চিহ্নিত করা হলেও, স্বীকৃতি আসলে কীভাবে তৈরি হয় তা নিয়ে আলাপ হয়নি। বিশ্বসাহিত্য কোন প্রক্রিয়ায় গড়ে ওঠে (?)… এটি জায়গা পায়নি সেখানে! তবু, সবমিলিয়ে আমার কাছে সাক্ষাৎকারটি উপভোগ্য লেগেছে।বড়ো কথা হলো, এইধরনের আলাপ পাঠককে যথেষ্ট ভাবতে প্ররোচিত ও বাধ্য করে।
. . .

Diaspora in Rap Music: Bindis and Bangles by Raja Kumari; Source: Sony Music India YTC

. . .

বিস্তৃত করতে পারলে আমারও ভালো লাগত। এটুকু প্রায় দুই দিনের ফসল। আমাকেও অনেক কাটছাট করতে হয়েছে। কেতকীদিও অনেক কাটছাট করেন। তবে একটুও বা ক’জনে পড়ে! প্রথম আলো এটা ছেপেছিল চুম্বক অংশগুলো আবার কাটছাট করে। এরপর ওখানে আর কোনো লেখাই আমি লিখিনি। অবশ্য এতে ওদের কিছুই আসে যায় না। যাহোক, পুরোনো এ সাক্ষাৎকারটা-যে আপনারা পড়ছেন এজন্য কৃতজ্ঞতা।
. . .

কেতকীকে কি বলব তবে মিস. হ্যাভিশ্যাম?

কামাল ভাই ও মারুফ রায়হানের সঙ্গে কেতকী কুশারী ডাইসনের আলাপটি প্রসঙ্গ-অনুষঙ্গে ঠাসা জাভেদ। থার্ড লেন স্পেস-এ তোলার সময় আমার খেই হারানোর অবস্থা দাঁড়িয়েছিল। যদিও এই খেই হারানোকে বিরক্তিকর বলাটা অবশ্যই ভুল হবে। আলাপের ভিতরে ফোর্স কাজ করেছে আগাগোড়া, যা আপনাকে টেনে নিতে থাকে।

খেই হারানো বলতে ফিরে-ফিরে থমকে দাঁড়ানোর কথা আমি বুঝাচ্ছি এখানে। কারণ, কেতকী তাঁর সহজাত মেধার টানে অনেককিছু খারিজ করছিলেন! অনেককিছু আবার তাঁর নিজের জায়গা থেকে ডিফেন্ডও করেছেন তিনি; এবং যেখানে বাহাসের সম্ভাবনা অনিবার্য হতে যাচ্ছিল প্রায়… সেখানে এসে প্রসঙ্গ মোড় নিয়েছে অন্যদিকে। অর্থাৎ, কামাল ভাই মূলত লেগ স্পিন বোলারের ভূমিকা নিভানোর চেষ্টা করেছেন। পিচ ও ব্যাটসম্যান বুঝে লেগিরা পাঁচ-ছয় কায়দায় সচরাচর কবজি ঘোরায়। তিনিও চেষ্টা করেছেন যথাসাধ্য। কিছু প্রশ্ন ছিল, যেগুলোকে আমরা টপস্পিন ধরতে পারি। দ্রুত ও বল পিচে পড়ে লাফিয়ে উঠছিল আচমকা। কেতকী অবশ্য ভালোই সামলেছেন।

আলাপটি সুষম নয়। একাধিক জায়গায় দেখবেন কামাল ভাই ও মারুফ রায়হান (বিশেষত বাংলাদেশের কবিলেখকদের ব্যাপারে) বেশ সুবোধ বালকের মতো ফ্লিপার দিয়েছেন। বল পিচে নিচু করতে কবজি ঘুরিয়েছেন দুজন। কেতকীকে এটি বেশ বিব্রত ও বিভ্রান্ত করেছে। আই এনজয়! গুগলি, স্পিনের আসলি জাদু, যার জোরে আব্দুল কাদির ও শেন ওয়ার্ন ঈশ্বর আজো… অথবা অফস্পিনার হয়েও যিনি লেগ স্পিনারদের মতো ধাঁধা জন্ম দানের কারণে সুমহান… সেই মুরালিধরনের কারিশমা ‘দুসরা’… এগুলা দুজনে কম দিয়েছেন। যেখানে দিয়েছেন, কেতকী কিন্তু সেখানে হার মানেননি;—বল খেলেছেন… এইটা মানতেই হবে।

কেতকী প্রতিটি বল খেলে দেওয়ার পর পালটা গুগলি ছুড়ে দেওয়ার দিকে আলাপিরা আগাননি। হতে পারে সময় স্বল্পতা সেখানে ফ্যাক্টর ছিল। কেতকীর মতো অলরাউন্ডারকে আপনি যাই ছুড়ে দিন-না-কেন, উনি কিন্তু খেলে দেবেন।

গায়ত্রী, কেতকী ও নবনীতা… প্রেসিডেন্সি কলেজ কাঁপানো এই ত্রিরত্ন হয়তো আমাদের শেষ পূর্বসূরী… যেখানে এসে বাংলার নবজাগরণ আসলে অস্তমিত হয়েছিল। এঁনাদের সঙ্গে যে-কারণে সময় নিয়ে লম্বা আলাপ ছাড়া তাঁদের ব্যক্তিত্বকে আপনি পুরোপুরি টেনে বের করতে পারবেন না। এই সমস্যাটি আলাপিদের এখানে ভুগিয়েছে।

Gayatri Chakravorty Spivak; Ketaki Kushari Dyson; Nabaneeta Dev Sen; Image: Collected; @thirdlanespace.com

যেমন ধরেন, কেতকীর কাজের পরিধি ব্যাপক। কবিতা লিখেছেন। অনুবাদ করেছেন। গবেষণায় থেকেছেন সার্বক্ষণিক। একদিকে বাংলা ও ভারতবর্ষের চৌহদ্দিকে ধারণ করছেন, এবং একইসঙ্গে ওই সীমারেখা পেরিয়েও যাচ্ছেন। যার ফলে এক-একটি প্রসঙ্গ ধরেও যদি আগান, আপনাকে কয়েক দফা বসতেই হচ্ছে। এছাড়া সম্ভব নয়।

আলাপিরা, বিশেষত কামাল ভাই তবু চেষ্টা করেছেন বিচিত্রবিহারী গুণীর কাজের জায়গাগুলো ছুঁয়ে যাওয়ার। সেইটা করতে গিয়ে আলাপ প্রসঙ্গ থেকে প্রসঙ্গে ছুটেছে আপনা বেগে। এখন, তা পড়ার সময় মনের ভিতরে পরপর প্রশ্ন জাগছে পাঠকের। আপনি তার সবটাই তুলে ধরেছেন এখানে।

তবে মানতে হবে,—আলাপকে এভাবে চলতে দেওয়াটা মন্দ ছিল না। এটি একে প্রাণ প্রাণবন্ত ও খোলামেলা করেছে। কামাল ভাইকে যতটুুকু বুঝেছি, তিনি এভাবে কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। রাদিচের সঙ্গে হোক, কেতকী বা রাজীব বালাসুব্রামানিয়াম অথবা আমি-আপনি… এইটা উনার ধাত। এখানে তা বজায় থাকাটা আমার কাছে অবান্তর মনে হয়নি। আমরা যেমন আড্ডায় বসে প্রসঙ্গ থেকে প্রসঙ্গান্তরে গমন করি অবলীলায়… এখানে তা ঘটেছিল। গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ যখন আলাপে উঠছে ও মনে হচ্ছে একে নিয়ে আরো ডিপে যাওয়া দরকারি, তখন হয়তো দেখা গেল অন্য প্রসঙ্গে মোড় নিয়েছে তা।

কেতকীর সঙ্গে আলাপিদের কথা-বিনিময় এ-কারণেই বাহাসে গড়ায়নি। নানা প্রসঙ্গে বাতচিতের মধ্য দিয়ে তাঁর বহুমাত্রিক মননকে তুলে আনার দিকে আলাপিরা মূলত স্থির থেকেছেন। এভাবে যদি দেখি, সেক্ষেত্রে উনারা সফল। কথার পিঠে কথা জুড়েছেন, এবং কেতকী তাঁর মতো করে পিক করেছেন পুরোটাই। আপনি যে-প্রশ্নগুলো তুলেছেন তার ব্যাপারে কামাল ভাই কী বলবেন তা জানার আগ্রহ থাকছে। আমি কেবল আপাতত একটি প্রসঙ্গ ছুঁয়ে যেতে চাই :

আমার এটি মনে হয়েছে, কেতকীর সমস্যা একজন ইংরেজের মতো করে ইংরেজি জানা ও বলায় নিহিত। ইংরেজি এক্ষেত্রে তাঁর জন্য আর সেকেন্ড ল্যাঙ্গুয়েজ নেই। বাংলার মতো ওটাও মাতৃভাষা হয়ে গেছে। দুটি ভাষায় তিনি অবলীলায় যাতায়াত করছেন। অনুবাদে এইটা আবার তাঁকে সাংঘাতিক শক্তি যোগাচ্ছে। যে-কারণে রবীন্দ্রনাথ-সহ যা-কিছু বাংলা থেকে ইংরেজিতে এনেছেন, এখন এর শক্তি ও গভীরতা সায়েব-মেমদের টের পেতে অসুবিধা হচ্ছে না। এখানে তিনি নমস্য।

অন্যদিকে, একই কেতকী যখন বাংলার জল-মাটি-হাওয়া নিয়ে কবিতা বা আখ্যান লিখতে বসছেন, সেখানে এই ইংরেজি তাঁর কাজে আসছে না। বাংলায় লিখছেন তখন। ইংরেজিতে লিখতে হলে সেই ইংরেজি দরকার হচ্ছে, যেটি তাঁর পরবর্তী প্রজন্মের লেখকরা ব্যবহার করেন। যার সঙ্গে তিনি স্বচ্ছন্দ নন বোঝা যাচ্ছে।

ভারতীয় ইংরেজিটা কেতকী ইচ্ছে করলে রপ্ত করতে পারতেন না এমন নয়। তিনি মেধাবী। লেগে থাকলে ঠিক পারতেন, কিন্তু এতে তাঁর সায় নেই বিলকুল। উলটো ভারতকে বিষয় করে যারা ভারতীয় ইংরেজির কায়দা-কানুন রপ্ত করছেন, তাদেরকে একপ্রকার বাউন্ডারির বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছেন তিনি। এখানেই কামাল ভাইদের উনাকে চেপে ধরা উচিত ছিল। গুগলি, দুসরা থেকে ম্যালক্যম মার্শাল বা শোয়েব আখতার, ব্রেট লিদের মতো দুমদাম বাউন্সার দিলে আলাপ অন্যমাত্রায় চলে যেত।

ভারতীয় ইংরেজির জনকরা আমি বলব কাজের কাজ করেছেন। ইংরেজির এই স্থানিক ভাষারীতির মধ্যে কেতকীদের সঙ্গে পরবর্তীদের আসমান-জমিন দূরত্ব তৈরি করে দিয়েছেন তাঁরা। ভারতীয় ইংরেজির বিকাশ ঘটায় এসব লেখকের ব্রিটিশ ইংরেজির ব্যাকরণ মানতে হচ্ছে না। মানতে গেলে ইংরেজ সায়েব-মেমদের মতো লিখতেন তাঁরা। রুডইয়ার্ড কিপলিং বা ই. এম ফরস্টার যেমন লিখেছেন। এমনকি জর্জ অরওয়েল, যেহেতু তিনি ভারতে থেকেছেন অনেকদিন।

Diaspora: “You, Reader” after Charles Baudelaire by Jeet Thayil; Music: Jeet Thayil, Hollis Coats; SourceL hotpoem YTC

ভাষার হেজিমনিটা তখন নিজের অজান্তে এসব লেখকের ঘাড়ে চেপে বসত, যা দিয়ে আসলে মুম্বাই মাফিয়া বলেন অথবা ঢাকা কিংবা কলকাতার দ্রুত বদলে যেতে থাকা যাপনকে ধরা সম্ভব নয়। চিনুয়া আচেবেরা এইটা গোড়ায় ধরতে পেরেছিলেন বলে আফ্রিকান ইংরেজিতে লাগাতার লিখে গেছেন। ব্রিটিশ কিংবা আমেরিকান ইংরেজির তোয়াক্কা উনারা করেনি। উলটো একে তাঁদের আফ্রিকান স্বকীয়তার শিকড় কেটে ফেলার সমস্যা রূপে নিয়েছেন বিবেচনায়; এবং তা ভুল ছিল না।

ভারতেও কেতকী পরবর্তী প্রজন্মে এসে তা তৈরি হতে শুরু করে। উপনিবেশ ইংরেজের শেখানো ইংরেজি ভাষা ভারতবর্ষের মতো অসম্ভব ভাষা বৈচিত্র্যে ভরাট মাটিতে শেষপর্যন্ত কুলিয়ে উঠতে পারেনি। ভারতবাসীরা তাদের ইংরেজি নিয়েছে নিজ ভাষার উচ্চারণরীতি ও সংস্কৃতির সঙ্গে গড় করে। যার ফলে জিৎ থাইলরা এই ইংরেজি দিয়ে ভারতে যেমন পৌঁছে যাচ্ছে সহজে, ভারতের বাইরে নিজের একটি বলয় গড়ে নিতে পেরেছে। আমি একে ভেট ভাবি না, বরং লড়াইয়ের অন্য একটি দিক তা খুলে দিয়েছে।

তাঁরাও সীমানা পেরুচ্ছেন, তবে দেশকে সঙ্গে নিয়ে। কেতকীও সীমানা পেরুচ্ছেন দেশকে হৃদয়ে ধরে, কিন্তু সেখানে উনার ওই চোস্ত ব্রিটিশ ইংরেজি তাঁকে দিয়ে সায়েব-মেমের মতো লেখাবেই লেখাবে। তিনি চাইলেও ‘রো’ ফ্লেভার আনতে পারবেন না, যেইটা ভারতীয় ইংরেজি, আফ্রিকান ইংরেজি, ক্যারিবিয়ান ইংরেজিতে প্রবলভাবে বিরাজ করে এখন।

কেতকী এই দিকটা উপেক্ষা করতে চাইছেন বারবার! কামাল ভাইয়ের এখানে আর্গুমেন্ট করা উচিত ছিল। সেই অ্যানার্জি কেন জানি তাঁকে দিতে দেখলাম না! জানি না কেন স্কিপ করেছেন। সম্ভবত রুশদি ও অরুন্ধতীর প্রতি কেতকীর মতো তাঁর মনেও বিরক্তিভাব থাকায় স্কিপ করেছেন। অরুন্ধতী আমারও পোষায় না, তবে রুশদির প্রতি এতটা নির্দয় হওয়া লজিক্যাল ঠেকেনি।

যাইহোক, আবার পুনরাবৃত্তি করি কথাটি,—বাংলার জলমাটিহাওয়া নিয়ে লেখার সময় কেতকী বাংলায় ফেরত যাচ্ছেন; আর ইংরেজিতে যখন লিখছেন, সেখানে চরিত্ররা নির্দিষ্টভাবে বাংলা অথবা ভারতীয় রাখাটা তাঁর কাছে অবান্তর হয়ে উঠছে। তারা ওই গলেমিশে সীমানাহীন আয়তনে কেবল ভাষা পাচ্ছে সেখানে। বিষয়টি কেতকীর জীবনালেখ্য তিসিডোর কিংবা ভিকতোরিয়া ওকাম্পোর সন্ধানের মতো বইয়ে গমন করলে আমরা পাবো।

এই জায়গা থেকে আমার মনে হয়েছে,—কেতকী এখানে এসে চার্লস ডিকেন্সের গ্রেট এক্সপেক্টেশনস উপন্যাসের মিস হ্যাভিশ্যামের প্রতিধ্বনি করছেন। হ্যাভিশ্যামও শুদ্ধতা ও অথেনসিটিতে বিশ্বাসী ছিল। ভগ্নপ্রসাদে থাকে, যদিও চাইলে প্রসাদ পালটানো তার জন্য কঠিন নয়। জীর্ণ হয়ে যাওয়া বিয়ের পোশাক গায়ে থাকে চিরকুমারী। একটি মেয়েকে দত্তকও নিয়ে বসে। তার আহার-বিহার-শয়ন থেকে ঘরের দেয়ালে টাঙানো ঘড়ির কাঁটা স্থির থাকে সবসময়।

হ্যাভিশ্যাম এভাবে ধরে রাখে কৌলীন্য। কেতকীও যেন-বা বাংলার কৌলীন্য ও ইংরেজের রেখে যাওয়া কৌলীন্যকে একত্রে ধরছেন মননে। ‘অথেনটিসিটি’ হয়ে দাঁড়াচ্ছে তাঁর জন্য ফাঁদ। এটি তাঁকে প্রখর ও বিদগ্ধ রাখছে তাতে সন্দেহ নেই। একটি সংস্কৃতির মর্মমূলকে ইন্টালেকচুয়্যালি পারসিভ করতে দারুণ ভূমিকা নেভাচ্ছে; কিন্তু, দিনশেষে এই বিদগ্ধ মেজাজ সায়েবদের রেখে যাওয়া ও বানিয়ে তোলা মানদণ্ডে তাঁকে বন্দিও করছে।

Miss Havisham: Great Expectations (1946) Movie by David Lean; Source: T Daws YTC

বাংলার নবজাগরণ অপার সম্ভাবনা নিয়ে হাজির হওয়ার পর ওই-যে শেষপর্যন্ত সর্বগ্রাসী সংস্কৃতিকে মোড় নিতে পারল না… রাজনৈতিক ভাষা তৈরি করতে পারল না… এর পেছনে মানদণ্ডকে দেশিছকে তৈরি করতে না পারার ভূমিকা আছে বৈকি। যে-কারণে নীরদ সি. চৌধুরীকে দেখবেন, বাংলা ও ভারতবর্ষকে দেখার চোখকান তাঁর অসাধারণ ছিল, তা-সত্ত্বেও একটি যুগে এসে আটকে গেছেন! পরবর্তী সংঘাত ও পালাবদল তিনি বুঝেও বুঝতে চাইতেন না।

মার্কস যেমন ভেবেছিলেন, সায়েবরা আসায় নিস্তরঙ্গ ভারতবর্ষে পুঁজির অনুপ্রবেশ শুধু নয়, এর বুর্জোয়াকারণ ঘটবে পুরোদস্তর, ঘটবে শিল্পায়ন ইত্যাদি, ‍যা শ্রেণিসংগ্রামের পটভূমি স্বচ্ছ করে তুলবে… বাস্তবে তার বিপরীত ঘটনাই তখন ঘটছিল। ইংরেজরা অবশ্যই গতি ও পালবদল এনেছিল, এবং পরিকল্পিতভাবে এর মধ্যে ঝাঁকে-ঝাঁকে নেটিভ মিস হ্যাভিশ্যাম রেখে গিয়েছিল। স্পর্ধা হয়ে যাচ্ছে, তবু বলতে বাধ্য হচ্ছি,—কেতকী নিজের অজান্তে সেরকম একজন।

তাঁর সীমানা অতিক্রমী মানস অনন্য, অনেকক্ষেত্রে অসম্ভব উপকারী ও উপাদেয়… এর দরকার নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই, কিন্তু এটি ব্যর্থ হয় যখন তা জিৎ থাইল, ঝুম্পা লাহিড়ী বা মনিকা আলীদের একটি ফ্রেমে ফেলে নাকচ করতে চায়। মানে দাঁড়াচ্ছে, এঁদের মধ্যে প্রবাহিত দুটি সংস্কৃতির সাংঘর্ষিক টানাপোড়েন তিনি ধরতে অক্ষম।

মনিকা আলী-যে ভুল বাংলায় বা বিক্রম শেঠ ভুলভাবে বিয়ের অনুষ্ঠানকে রিপ্রেজেন্ট করছেন লেখায়… আমার কাছে তা বড়ো কোনো অপরাধ নয়। কারণ, কেতকীর যেমন শক্ত শিকড় আছে বাংলায়, পরে সেই শিকড় তিনি ব্রিটেনে পুঁতেছেন, বিক্রম শেঠদের সেরকম কোনো শক্ত মাটি নেই। সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় নির্মাণের প্রশ্নে বেচারারা অনিকেত ও উন্মূল। সালমান রুশদিকে এ-কারণে মধ্যরাতের সন্তান লিখতে হচ্ছে জাদুবাস্তবতায়। কেতকী এই সহজ ইকুয়েশন কেন ধরতে পারছেন না…তা এক প্রশ্ন বটে! এবং আশ্চর্যজনকভাবে কামাল ভাইও তাঁর সুরে সুর মিলিয়েছেন।

রুশদির ভাষা জটিল পর্যায়ের রূপকাচ্ছাদিত। ওইটা ভারতীয় ইংরেজিও নয়। আবার নিখাদ ব্রিটিশ কি? আমার পক্ষে বলা কঠিন। রুশদির বই আমরা অখাদ্য অনুবাদে পড়ে অভ্যস্ত মূলত। তথাপি নানাসময় তাঁর গণ্য রচনাগুলোর কিছু তো দেখেছি কৌতূহল থেকে, নিশ্চিত হতে পারিনি। ভাষাকে এই লোক জটিল ও রূপকায়িত করায় ওইটা নির্দিষ্ট ঘরানার মুখাপেক্ষী নয়। তার পক্ষে এমনকি অমিতাভ ঘোষ কিংবা আর কে নারায়ণের মতোও লেখা সম্ভব ছিল না।

উনাদের যতখানি শিকড় ভারত ও বৈদেশ মিলে দাঁড়াচ্ছে… রুশদি মুসলমান ঘরে পয়দা হওয়ার বরাতে তারচেয়ে জটিল অবস্থায় খাবি খেয়েছে ও খাচ্ছে এখনো। সুতরাং, একে বিদেশির জন্য ভেট বলা কেতকীর সীমাবদ্ধতা ও ধ্রুপদি উন্নাসিকতা। একটি মুসলমান মনকে তিনি আজো পাঠ করতে পুরোপুরি ব্যর্থ। ভাইরে, মুসলমান বাস করে ফ্যান্টাসম্যাগোরিয়ার (Phantasmagoria) জগতে। স্বপ্ন ও আধিভৌতিক এক খোঁয়ারি তাকে তাড়া করে সারক্ষণ। রুশদির এই অভিজ্ঞতাটি হয়েছে বহুত। তার মধ্যে যেসব দ্বন্দ্ব ও কৌণিকতা সেগুলো মুসলমান ও অ্যাংলো ইংরেজ পরিধিতে বেড়ে ওঠার দান। যেখানে ইসলামের সঙ্গে তাকে সংলাপে যেতে হয়েছে ফিরে-ফিরে। তাঁর ভাষা ঐন্দ্রিজালিক পর্যায়ের কাব্যিক হয়েছে, যেহেতু, দেশ ও মানচিত্র মিলে অথেনটিসিটির প্রশ্নই তার কাছে আরেক ফ্যান্টাসম্যাগোরিয়ার নামান্তর হয়ে উঠছিল।

ভারতবর্ষকে (যার ভিতর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও শেখ মুজিবও পড়ছেন) সে যখন ফ্যান্টাসাইজড করে, সেটি ইতিহাসসম্মত হওয়ার ধার ধারে না। তা অবান্তর ও আধিভৌতিক ইন্দ্রজালের মধ্যে মধ্যরাতে জন্ম নেওয়া এক মানসন্তানের ক্রাইসসিকে সামনে আনে। কেতকীর হয়তো উচিত ছিল পলিটিক্যাল কারেক্টনেসের বলি রুশদিদের আরেকটু সদয় হয়ে দেখার চেষ্টা করা। মনে হলো এই ভাষা তিনি ধরতে অক্ষম। যেটি আবার গায়ত্রী তুলনামূলক ভালো বোঝেন।

যাইহোক, আপাতত এখানে থামি। আরো প্রসঙ্গ আছে অস্বস্তির। তথাপি কেতকী প্রণম্য তাঁর উপভোগ্য রচনাশৈলী ও বিদগ্ধ ভাষাজ্ঞানের কারণে। এটিও এক সমীহ করার মতো অর্জন। ত্রিশের দশক থেকে পঞ্চাশ-ষাট অবধি ছিল… তারপর সবটাই ফাঁকা। বাংলায় কেবল ঘোর অমানিশা মূর্খতা ও মৌলবাদিতার!—ফ্যান্টাসম্যাগোরিয়ার..!
. . .

. . .

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 18

No votes so far! Be the first to rate this post.

thirdlanespace.com কর্তৃক স্বত্ব সংরক্ষিত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *