পোস্ট শোকেস - সাহিত্যবাসর

“কুত্তা” : কামাল রাহমান

Reading time 22 minute
5
(30)

শীতের শুরুতে আর চারটে ভাইবোনের সঙ্গে জন্ম নেয় আগামীদিনের সারমেয় সর্দার বাঘা কাল্লু। এক কুকুরের দুটো নাম তো আর হতে পারে না। অথচ সর্দার বলে কথা। শরীরের কুচকুচে কালো রংয়ের জন্য প্রভু-কর্তা নাম দিয়েছেন কাল্লু আর ওর গলার গুরুগম্ভীর বাঘস্বরের জন্য বাড়ির বড়ো ছেলে নাম রেখেছে বাঘা। বড়ো বাড়ির কুকুরের নাম আর কী, প্রভু কিংবা প্রভুপুত্র, কারো আজ্ঞাই তো আর ফেলা যায় না, তাই দুয়ে মিলে বাঘা কাল্লুই হয়ে যায় ঐ কুকুরটা।

সর্দার হয়ে ওঠার আগের দিনগুলো কোনোভাবেই সুখের ছিল না ওর। জন্মের পর পুরোনো বাড়ির সিঁড়িঘরের নিচের আশ্রয়টুকু ওর বাবা-মা দখল করে নিয়েছিল। কিন্তু এর কদিন পরেই ঘরছাড়া হতে হয়েছিল ওদের। এদিকে শীত আসতে থাকে বেশ জাঁকিয়ে। মাকে জড়িয়ে জাপটে ভাইবোনেরা যতই উষ্ণতা পেতে চায় শীতের প্রকোপ তত নিষ্ঠুরভাবে কাবু করে ফেলে ওদের। মার খেয়ে ওদের বাবা-যে কোন দিকে ভেগেছে তার আর দেখা নেই। বাবামায়ের প্রেমের তাগাদাও ছিল না ঐ সময়টায়। শেষ পর্যন্ত একটা খড়ের গাদার নিচে আশ্রয় পেয়ে বর্তে যায় ওরা। গৃহস্থ পরিবারের ঐ বাড়িটা ছিল লোকালয়ের একেবারে শেষ সীমানায়। খড়ের গাদার পর সমুদ্রের খোলা তট। সূর্যের অবারিত আলো ও জলের উষ্ণতা শীতের মারমুখী আক্রমণ অনেকটা ঠেকিয়ে রাখে ওখানে।

অন্য চারটে ভাইবোনের তুলনায় কাল্লু অনেকটা নাদুস-নুদুস হয়ে বেড়ে উঠছিল। মায়ের অধিকারও খানিকটা বেশি ছিল ওর। বিপদের কোনো গন্ধ পেলে কিংবা কোনো কারণ ছাড়াই ওদের মা যদি কখনো ডেকে উঠত, সেও খেঁকিয়ে উঠে মায়ের সঙ্গে ওর অপরিণত ও তীক্ষ্ন গলার স্বর মিলিয়ে দিত। জন্মের পর থেকে এক অজানা ভীতির ভেতর থাকতে থাকতে অতলস্পর্শী অজ্ঞতা জমা হয়েছিল ওর ভেতর। সেইসঙ্গে শিকারি প্রাণীর প্রকৃতিগত পাশবিক স্বভাবগুলোও দেখা দিতে শুরু করেছিল। মাটিতে নখের আঁচড় কাটা, সূঁচালো দাঁত দেখানোর ঠোঁট-ওলটানো ভঙ্গি, ভীষণ জোরে ঘেউ ঘেউ করা, প্রভৃতিকে মনে করত ওর পৌরুষ। বিপদের গন্ধ পেয়ে সতর্ক থাকা, প্রতিপক্ষকে যুদ্ধে আহবান জানানোর কৌশল, প্রতিরোধের বিভিন্ন দিক, এসব দ্রুত শিখে নেয় সে। বেশিদিন তো আর মায়ের মুখাপেক্ষী থাকা যাবে না। একটু এদিক-সেদিক হলে এখনই খেঁকিয়ে ওঠে আর তেড়ে আসে কামড়াতে। যদিও সব কটা ভাইবোন এখনো অনেকটা অসহায়। নাগালের মধ্যে ঐ খড়ের কুঁজো, সমুদ্রের ধারের গাছপালা, কয়েকটা গৃহস্থ বাড়ির আঙিনার ছোট্ট বিস্তৃতি, সামান্য এসবই ছিল ওদের সহায় ও সম্বল।

Balck Dog; Image Source – Collected; Dreamstock; Google Image

খামার বাড়িটা পেরিয়ে দুকদম এগোয় ওরা। প্রতিবেশী বাড়ির দুতিনটা কুকুর যেভাবে তেড়ে আসে ওদের দিকে তাতে পালিয়ে বাঁচাই দুঃসাধ্য হয়ে ওঠে। খড়ের কুঁজোর নিচের ছোট্ট জগত একটা কুকুর পরিবারের জন্য নিতান্তই অপরিসর। ওরা বড়ো হতে থাকে ও মায়ের সঙ্গে ওদের নিবিড়তাও কমে আসতে থাকে। প্রকৃতির রহস্যও একটু একটু করে আগ্রহী করে তুলে ওদের। কখনো কখনো নিজেরাই সমুদ্র সৈকতের দিকে ধীরে ধীরে পা বাড়ায়। কিছুদিনের মধ্যেই ওখানে যেয়ে লুটোপুটি খেলায় অভ্যস্ত হয়ে ওঠে ওরা। জোয়ারজলে ভেসে আসা ছোট ছোট মাছ, কাঁকড়া কিংবা মৃত ঝিনুক কোনো-কোনোদিন ওদের খাবারের প্রয়োজন মিটিয়ে ফেলে।

ক্ষুধা প্রশমিত করে এক শান্ত বিকেলে সমুদ্র সৈকতে ছুটে বেড়াচ্ছিল ওরা। এক দল ছেলে ধাওয়া করে ওদের দুভাই ও এক বোনকে ধরে ফেলে। প্রাণপণে দৌড়ে রক্ষা পেয়েছিল সে ঐদিন। ছেলেগুলো দৃষ্টির আড়ালে চলে না যাওয়া পর্যন্ত সে শুনতে পেয়েছিল ওর ভাইবোনদের কান্না। ভীষণ মন খারাপ হয়েছিল ওর। তার থেকেও বড়ো কথা, ঐ বিশাল বিশ্বে সম্পূর্ণ একা হয়ে পড়েছিল সে। ওর মায়ের কোনো খোঁজ পায় না আজ অনেক দিন হয়েছে। ওর কথা অবশ্য এই কদিন মনেও পড়েনি। আজকের এই অসহায়ত্বের ভেতর ভীষণভাবে ওকে মনে পড়ে। সারা রাত কুঁই কুঁই করে তীক্ষ্ন গলায় মাকে ডেকে ডেকে অস্থির হয়ে ওঠে সে। কুকুর সমাজে দীর্ঘ পরিবার জীবন এখনো গড়ে ওঠেনি। অবশেষে অসহায় ঐ একাকীত্বই মেনে নেয় বাচ্চা কুকুরটা। সমুদ্রতীরেই শুরু করে ওর একান্ত নিজস্ব কুকুর জীবন।

সমুদ্রের এলোমেলো ঢালের অমসৃণতার ভেতর জমে থাকা জল ঘিরে জন্মানো ঝোপ-ঝাড়ের উপরেও জ্বলন্ত সূর্যের উত্তাপ বোঝা যায় খুব স্পষ্টভাবে। সূর্য ওঠার সময় ডাঙার দিক থেকে যখন বাতাস বয় প্রকৃতিতে নেমে আসে ক্ষণিকের স্নিগ্ধতা। এর পুনরাবৃত্তি ঘটে সূর্য ডোবার সময়। সূর্যের কিরণ দূরে সরে যাওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে দ্রুত পাল্টে যায় সমুদ্র থেকে আসা বাতাসের আগুনে তীব্রতা। এক মনোরম আবেশ জড়িয়ে নেমে আসে সাগরের অপরূপ সন্ধ্যা। সারা দিন সূর্যের প্রচণ্ড ক্ষমতার কাছে সব কিছু সমর্পণ করে দেয় প্রকৃতির গাছপালা ও প্রাণীকূল। প্রায়ান্ধকার ঝোপ ও ঘন পাতায় ছাওয়া গাছ ও নিবিড় তরুলতার ফাঁকে একটু ঠাণ্ডা মাটির আশ্রয়ে শরীর বিছিয়ে দেয় নিঃসঙ্গ কুকুরটা।

দুপুরের দিকে প্রকৃতির চাঞ্চল্য থেমে যায়। পোকা মাকড় ও প্রাণীগুলো আগমনী অন্ধকারের অপেক্ষায় থাকে। এই অন্ধকারের ভেতর ভারী দুএক খণ্ড মেঘ সমুদ্রের হু হু বাতাসের স্বর ছাপিয়ে নেমে আসে ওদের উপর। কষ্টের আপাত সমাপ্তি ঘটে ঐ মধুর বর্ষণে। প্রকৃতির অতি সাধারণ কিছু শব্দের প্রতি অভ্যস্ত হয়ে ওঠে কুকুরটা। সমুদ্রঘেঁষা পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে আসা বাতাসের সঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকা সারি সারি গাছের পাতার হিস হিস শব্দ আর সীমাহীন ঢেউ ছুঁয়ে আসা জলের সাঁই সাঁই শব্দ ওর মধ্যে এক ধরনের চঞ্চলতা সৃষ্টি করে। দমকা বাতাসে কূলে আছড়ে পড়া ফেনিল ঢেউয়ের গমগমে শব্দ কখনো আনচান করে তোলে ওর শরীরের পেশি ও শিরা-উপশিরা। এসবকিছুও ওর ভেতর জন্ম দেয় অতিরিক্ত ক্ষুধা। যদিও এই ক্ষুধার রাজ্যে খাদ্যের অভাব নেই কিন্তু খাবার জোগাড় করতে যেয়ে বারবার পড়তে হয় বিপদ থেকে আরও বড়ো বিপদে। পরিবারের সঙ্গে যখন একত্র-জীবন কাটাচ্ছিল সে তখন বিষয়টা এত কঠিন ছিল না। বরং আনন্দই পেত সে। কিন্তু এখন এই একাকিত্বের ভেতর এগুলোকে মনে হয় যেন জীবনের এক অপ্রার্থিত বোঝা।

প্রকৃতির নিত্যনতুন শব্দাবলী ধীরে ধীরে হেঁয়ালিপূর্ণ হয়ে ওঠে ওর কাছে। পারিপার্শ্বিক ভয় কাটিয়ে ওঠার স্বাভাবিক চেষ্টা আর ক্ষুন্নিবৃত্তির তাড়নায় ছোটখাটো প্রাণীর চলাফেরার খস খস শব্দের প্রতি সচেতন হয়ে ওঠে ওর স্নায়ু। ক্ষুধায় তিষ্টাতে না পেরে এক ভরদুপুরে সৈকতে পড়ে থাকা প্রায়-মৃত একটা কাঁকড়ার শরীরে আলতো থাবা বসায় সে। কাঁকড়াটার প্রতিরোধ ক্ষমতা না থাকায় খুব সহজে খাবারে পরিণত হয় ওটা। খাদ্য সংগ্রহের প্রথম পদক্ষেপ এভাবেই শিখে ফেলে সে। ক্ষুধা-পেটে খাবারটাও খুব খারাপ লাগেনি তখন। এরপর প্রায় প্রতিদিন ভাটার সময় কাঁকড়া শিকারে নেমে যেত সে। নিয়মিত খাবার না পেয়ে এরিমধ্যে এক দুর্বল হাড্ডিসার প্রাণীতে পরিবর্তিত হয়েছে বাচ্চা কুকুরটা। সমুদ্রে যখন জোরে বাতাস বয় তখন ওর মনে হয়-যে সেও হয়তো উড়ে যাবে ঐ বাতাসের তোড়ে। শরীরটাকে তখন ভূমি সমান্তরাল করে তটের বালু আঁকড়ে ধরে থাকে। অনেকটা সহজলভ্য হওয়ায় বেশ অনেক দিনের জন্য সমুদ্র-তীরের মৃত কিংবা দুর্বল কাঁকড়া খুঁজে খুঁজে ওর ভেতরে ধীরে ধীরে এক শিকারী চরিত্র গড়ে ওঠে। ঝোপের ভেতরে বাগে পেয়ে একটা ইঁদুরকে আক্রমণ করে বসে এক সন্ধ্যায়। নিজে আহত হয়েও খুদে প্রাণীটাকে ছিন্ন ভিন্ন করে ফেলে সে। প্রথমবারের মতো ওর জীবনে তাজা রক্তের স্বাদ জিভে অনুভব করে বাচ্চা কুকুরটা। কিন্তু ইঁদুরটার মাংস ওর ভাল না লাগায় কাকের হাতে ছেড়ে দেয় সে ওটাকে।

ওর ছোট্ট দুনিয়ায় শিকারের জন্য ইঁদুরের চেয়ে বড়ো প্রাণী তখনো দেখা দেয়নি। মাঝে মাঝে পাখির উপর ঝাঁপ দিলেও সেসব বৃথাই থেকে যেত। ওটাকে বরং এক কৌতুককর খেলার মতো ভাবত সে। এক জোছনা রাতে সত্যি সত্যি পাখির মাংসের স্বাদ অনুভব করে। শিকার করা একটা মুরগি মুখে নিয়ে একটা শেয়ালকে পালাতে দেখে ঘেউ ঘেউ করে ডেকে উঠেছিল সে। ভেবেছিল যে ওর মাকে বোধ হয় পেয়েছে। শেয়ালটা দৌড়াতে শুরু করলে ওর পিছু ধাওয়া করে সে। ওটা হয়তো ছিল খুব রোগা কিংবা বুড়ো একটা শেয়াল। শেষ পর্যন্ত ঐ বাচ্চা কুকুরটার কাছেই হার মেনেছিল সে। মুরগিটা ছিনিয়ে সে ফিরে আসে নিজের আস্তানায়। এত সুস্বাদু খাবারও-যে এ-দুনিয়ায় আছে ঐ প্রথম বোঝে ওটা। পিঁপড়ের জন্য পালকগুলো ছাড়া কিছুই অবশিষ্ট রাখে না সে। খড়ের কুঁজোর নিচে মায়ের মুখ থেকে বের করে দেয়া মজাদার খাবারের স্মৃতি মনের পর্দায় ভেসে ওঠে ওর। ভালো ভালো ও যথেষ্ট খাবার সংগ্রহ করতে সক্ষম হওয়ায় ওর শরীরের বৃদ্ধিও ঋতুবদলের মতো দ্রুত ঘটে যেতে থাকে। এসব পরিবর্তনের শেষ দিকটা ছিল চোখে পড়ার মতো। শরীরের লোমগুলো ছিল ওর চিকচিকে কালো আর চোখ দুটো কিছুটা লালাভ উজ্জ্বল কাচের গোলকের মতো ঝিলিক দিত। শিকারের পেছনে ছুটে ছুটে অনেকদূর অবধি যেতে পারত সে। অচিরেই বুঝে যায় সে যে এক বিশাল সংহারের জগৎ রয়েছে তার নিজেরও এবং তাকে ভয় পায় এমন অনেক প্রাণীও রয়েছে এ জগতে।

গ্রীষ্মের প্রচণ্ড উত্তাপে খই-ফোটা বালুর সৈকতে যখন প্রথম বৃষ্টির ফোঁটা ঝরতে শুরু করে তখন অবাক হয় সে। নেমে আসা জলের বিন্দুগুলোকে উৎপাত ভেবে অকারণে এদিক ওদিক দৌড়াতে থাকে। তারপর মুষলধারে বৃষ্টি যখন বাতাসে শীতলতা ছড়িয়ে প্রকৃতিতে মধুময় স্নিগ্ধতা এনে দেয় তখন পুলকিত হয়ে ওঠে সে। এরপর ঘন ঘন বৃষ্টি আসতে থাকায় একটা আশ্রয়ের সন্ধানে হন্যে হয়ে ওঠে। সারাক্ষণ তো আর বৃষ্টিজলের নিচে কাটানো যায় না। যে- বাড়িটা থেকে অন্য কুকুরেরা ওদের দিকে তেড়ে আসত অবশেষে ঐ বাড়িটাকেই আশ্রয়স্থল করে নেয় সে।

Dog’s gang in Seabeach, Saintmartin, Bangladesh; Image Source – Collected; Unplash; Google Iamge

প্রাণীদের যে তিনটা ক্ষুধা জয় করতে হয় তার প্রথমটা অনেকদিন আগেই সম্পন্ন করেছে কাল্লু। দ্বিতীয়টা আজ সাঙ্গ হলো। পুরোপুরি আধিপত্য বিস্তার করতে পেরেছে সে তার গোত্রের ভেতর। ওর চলাফেরায় কোনো শব্দ করতে পারে এমন একটা কুকুরও আশেপাশে নেই এখন। বরং সে কোনো দিকে তেড়ে গেলে তাকে সমর্থন জানাতে অন্যেরাও ছুটে আসে। তৃতীয়-যে ক্ষুধাটা ওকে পূর্ণতা দেবে অনেকটা অসম্পূর্ণ এবং অপ্রথাসিদ্ধ পথে এসে কিছুটা বিহ্বল করে দেয় ওকে। নতুন-যে বধূটি কিছুদিন যাবত এ-বাড়িতে এসেছে, সে খুব যত্ন নেয় ওর। মনভোলানো আ-তু-তু ডেকে প্রতিবেলা ভাতের বাটি সামনে ঢেলে দেয় সে। মুগ্ধ চোখে ওর খাওয়া দেখে। নরম তুলতুলে খালি পায়ে শরীর ঘষে দেয়। বিশেষ করে কাল্লুর ঘাড়টাই যেন ওর প্রিয়। পা দিয়ে যখন আদর করে তখন ঘুম পায় ওর। আহ্লাদে গড়িয়ে শুয়ে পড়ে সে একদিন। ঘাড় থেকে ঐ যাদুমাখা পা নেমে আসে গলায়। গলা থেকে বুক হয়ে আরো নিচে। ওর পুরো শরীর জুড়ে যেন এক আবেশ ছড়িয়ে পড়ে। ওর পায়ের পাতা ওর শরীরের নিম্নাংশ থেকে মস্তিষ্কের ভেতর এক অদ্ভুত শিহরণ ছড়িয়ে দেয়। মনে নেই কতক্ষণ সে এক মুগ্ধ পুলকের ভেতর ডুবে ছিল। ও যখন চলে যায় তখন লাফিয়ে ওঠে গা ঝাড়া দিয়ে বুঝতে চেষ্টা করে সে যে কী ছিল ওটা। কিন্তু প্রকৃতি তো তখনো ওসবকিছু শেখায়নি ওকে! বিষয়টা যখন প্রতিদিন ঘটতে থাকে তখন খাবারের চেয়ে ওটাই প্রধান হয়ে ওঠে ওর জীবনে। মাটিতে ছড়ানো খাবারের দিকে মুখ না বাড়িয়ে ওকে দেখলেই সে ওর পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়ে। আকস্মিকভাবে একদিন ওটার অবসান ঘটে। মানুষটাই যেন বাড়ি থেকে কোথায় হারিয়ে গেছিল! ওর বোবা চোখ দুটো বৃথাই ওকে খুঁজে ফিরেছে অনেক অনেকদিন।

এ-বাড়িতে ঢোকার দিনটা নিরাপদ ছিল না ওর জন্য। কিছুটা ভয় আর অনিশ্চিত জীবনের দুর্ভাবনা জয় করার দুঃসাহস বাড়িটার দিকে এগিয়ে দিয়েছিল ওকে। পেটে ছিল ওর প্রচণ্ড ক্ষুধা। দিনের শুরুতে জোয়ার থাকায় কাঁকড়া ভোজন হয়নি সেদিন। প্রথমে সে চোখে পড়ে গৃহকর্তার। বাড়ির রাখাল ছেলেটাকে দেখে বলে সে, ‘পেকাম, দেখ তো দেখি একবারে আমাগো কাল্লু না?’

‘হ খালু, একবারে কাল্লু। ঐ কাল্লু আ… আ…’

হাত বাড়িয়ে ডাকে সে ওকে। দৌড়ে ঘর থেকে একবাটি ভাত এনে মাটিতে ঢেলে দেয় সে। প্রথমে এগিয়ে যেতে সাহস পায় না কাল্লু। ওর ছোট ভাইবোনদের অসহায় কান্নাটা মনে পড়ে। ছেলেটা পিছনে সরে গেলে ধীরে ধীরে ভাত কটা খাওয়া শুরু করে সে। আড়চোখে দৃষ্টি রাখে অন্য সবদিকে। খাওয়া প্রায় শেষ হতেই ঝড়ের বেগে ছুটে আসে বাড়ির পোষা কুকুরটা। তারপর সরাসরি ঝাঁপিয়ে পড়ে ওর উপর। কিন্তু এ-হচ্ছে ভাতের লড়াই। কাল্লুও বাঘের শক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে ওর উপর। নিজেকে ক্ষতবিক্ষত করে তোলে। কিন্তু কোনোভাবেই হার মানে না।

প্রতিটা প্রাণীর যতটুকু শক্তি আছে ওটাকে সারাজীবনে বিন্যস্ত করলে একটা কুকুরের আর কটাই-বা যুদ্ধ চালিয়ে যাবার ক্ষমতা থাকে? প্রথমটাতেই তো আর নিজেকে নিঃশেষ করে দেয়া যায় না। প্রতিপক্ষকে বড়োজোর দশটা দাঁত বসাতে দেয়া যেতে পারে শরীরের বিভিন্ন অংশে। লড়াই করার ক্ষমতা সবার আবার সমানও থাকে না। কেউ দুটো আঁচড়েই লেজ গুটিয়ে ফেলে। শরীরের গড়ন আর খেয়েদেয়ে পেশি গঠনের ক্ষমতার উপর লড়ার ক্ষমতাও নির্ভর করে। কাল্লুর শক্তি ও কৌশলের চেয়ে গলার আওয়াজটাই আসল কাজটা করেছিল। মার খেয়েছিল সে অনেক বেশি কিন্তু চিৎকার আর ঝাঁপিয়ে পড়ার ভঙ্গিতে মনে হয়েছিল যে সে জয়ী হয়েছে। ওকে ছাপিয়ে বাড়ির পুরানো কুকুরটার গলা একবারও উপরে উঠতে পারেনি। বিশ্ববিবেক যেমন স্বভাবত বিজয়ীর দিকে প্রসারিত হয় তেমনি বাড়ির সবার সহানুভূতিও কাল্লুর দিকে নেমে আসে। বাড়ির কর্তা আদর করে ওকে কাল্লু নামেই ডেকে ওঠে, ‘বাহ, কাল্লু বাহ!’

বাড়ির বড়ো ছেলে ওর নাম দেয় বাঘা। এভাবে দুটো নাম এক হয়ে বাঘাকাল্লু নামে বাড়িটাতে প্রতিষ্ঠা পেয়ে যায় একদা নিঃসঙ্গ ও ভাগ্যবিড়ম্বিত কুকুরটা। ধীরে ধীরে পুরোনো কুকুরটার সঙ্গেও ভাব জমে যায় ওর। দুজনে মিলে বাড়িটাকে সুন্দরভাবে পাহারায় রাখে ওরা। অপরিচিত কাউকে দেখলে এমনভাবে ছুটে আসে দুজনে-যে, আগন্তুক ভয় পেয়ে পালাতে চায়।

বেশ ঘনঘটা করে আকাশে মেঘ জমেছিল এবারের বসন্তে। প্রলম্বিত বৃষ্টির একটা ধারা ধীরলয়ে প্রকৃতিকে স্নিগ্ধভাবে স্নান করিয়ে দিয়ে যায়। ওটার রেশ পুরোপুরি কেটে গেছে। গ্রীষ্ম শুরু হয়ে শেষ হতে চললেও দাবদাহ মেটানোর জন্য এক টুকরো মেঘও দেখা দেয় না আকাশে। বর্ষার জন্য মন উচাটন হয়ে রয়েছে সবার। কুকুরটা বুঝতে পারে না-যে শরীরের পেশিগুলো কেন মাঝে মাঝে টান-টান হয়ে ওঠে। ঐ নববধূর পায়ের পাতার অভূতপূর্ব স্পর্শের দূরস্মৃতি সুনীল আকাশের গায়ে ঝাঁপসা কুয়াশার মতো মেঘের বিভ্রম ফাঁদে ফেলে দেয় ওকে। অবশেষে যখন বৃষ্টি নামে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তখন বৃষ্টিধারার নিচে নিজেকে মেলে রেখেও শরীর জুড়াতে চায় না। কেমন উড়ু উড়ু লাগে ওর। ক্ষুধা কমে যায়।নতুন আমেজ ধরানো কি একটা গন্ধ যেন বাতাসে ভেসে রয়েছে। কিছুতেই ওটাকে ধরতে পারে না সে। বৃষ্টি নামার পর ঝকঝকে সূর্য মাথার উপর উঠে এলে সমুদ্রের বাতাসে ভেসে থাকা জলকণার হিস হিস শব্দ মাতাল করে তোলে ওকে। প্রচণ্ড বেগে সৈকতে ছুটে বেড়ায় সে। কোথা থেকে-যে আরো দু-একটা কুকুর এসে জুটেছে কে জানে। ওদের বোধহয় এখন ঘুমোতে ভালো লাগে না। চাঁদের আলোয় সমুদ্রের ধারে দৌড়ে বেড়ায় দল বেঁধে। ভরা পূর্ণিমায় তটরেখা বরাবর ঢেউগুলো সাদা ফেনায় আছড়ে পড়ে।

ধীরে ধীরে বুঝতে পারে সে যে, তৃতীয় ক্ষুধাটা জন্ম নিচ্ছে ওর ভেতরে। তীব্রতর হতে থাকে ওর কামনা। ক্ষুধা-তৃষ্ণা ভুলে সে ছুটতে থাকে এক পাগলের মতো। পরের রাতে সমুদ্রের ধারে দেখতে পায় একজোড়া মিথুনরত কুকুর ও কুক্কুরীকে। তীব্রতায় ফেটে পড়তে চায় ওর শরীর। ঐ কুকুরগুলো দূরে তাড়িয়ে দেয় ওকে। প্রচণ্ড বেগে সমুদ্রের তীর ঘেঁষে ছুটে চলে সে। আর একটা কুকুরকে অন্যদিকে দৌড়ে যেতে দেখে ওটাকে ধরার চেষ্টা করে কাল্লু। ওটাও যেন ধরা দেয়ার ইচ্ছায় প্রস্তুত হয়েছিল। ঐ অজানা গন্ধটা তীব্রভাবে নাকে হামলে পড়ে ওর। অচেনা হলেও এমনই একটা কিছুর জন্য অস্থির হয়ে রয়েছে সে। ঘাড়ের লোমগুলো খাড়া হয়ে ওঠে ওর। সামনের পা দুটো কাঁপতে থাকে অবিরত। কামড়ে প্রায় আহত করে তোলে ওকে ঐ কুকুরটা। সে তখন হিতাহিত জ্ঞানশূন্য। কোনো না কোনোভাবে বাঁধা পড়ে যায় সে ওর সঙ্গে। আকাশ ভেঙ্গে তারার বৃষ্টি নামে। অনাস্বাদিতপূর্ব ঐ বৃষ্টি এক সময় থেমেও যায়। ঘরে ফেরে কাল্লু। এখন সে পরিপূর্ণ। ওর ক্ষুধা পায় শরীর কাঁপিয়ে। যা পায় তাই খেয়ে ঘুম দেয় সারারাতের জন্য। প্রাণীটার তিনটে ক্ষুধাই এখন পরিতৃপ্ত।

Rain Dogs in the mode of love; Image Source – Collected; Platform.mag; Google Image

এ-সময়টাতে কুকুরেরা পাহারা দেয়ার কথাও ভুলে যায়। পরের বর্ষার আগমনী জানিয়ে গুরু গুরু ডেকে ওঠে আকাশ। তৃতীয় ক্ষুধাটা আবার নতুন এক প্রচণ্ডতা নিয়ে ফিরে আসে ওর কাছে। অনেক কটা বান্ধবী পেয়ে যায় সে এবার। চাড়িয়ে উপভোগ করে সে প্রকৃতির মধুর সব উপহার। বাতাসের কানাকানি, বৃষ্টির ধেয়ানি মুখরতা, এমনকি ব্যাঙের গানের শব্দেও উতলা হয়ে ওঠে ওর দেহ ও মন।

কিছুতেই আর ভয় পায় না এখন সে। শ্রবণশক্তি অত্যন্ত সজাগ এখন ওর। চোখের দৃষ্টিও তীক্ষ্ম। প্রকৃতির মতো সেও উদ্দাম ও কিছুটা নিষ্ঠুর হয়ে ওঠে। মাটিতে কান পেতে ঘুমিয়ে থাকার সময়ও ছোট্ট একটা পাতা নড়াচড়ার শব্দ সতর্ক করে দেয় ওকে। এবারের বর্ষায় সঙ্গী-সাথী জুটিয়ে বেশ বড়ো একটা দল গড়ে তোলে সে। চলাচলের পরিধিও বাড়িয়ে নেয় সে। প্রায়ই ওর দলবল নিয়ে পাশের গ্রামের সীমানা পর্যন্ত ধেয়ে যায়। সেখানের কুকুরগুলোকে চিৎকার করে গালাগাল করে অবশেষে ক্লান্ত হয়ে ফিরে আসে।

কাল্লুর জীবনে গভীরতম ঘটনাটা ঘটে পঞ্চম শরতে। সমুদ্রের ধারে পাইনবনে বৃষ্টিকে সঙ্গে নিয়ে তখন ছোটাছুটি করছে বাতাস। পাহাড়ের বুকে রোদের আড়ালে ধূসর ধোঁয়ার মতো ভেসে রয়েছে জমাটবাঁধা মেঘ। নিচু জমির ঘাস ডুবে যাওয়ায় পোষা গরু-মহিষেরা পাহাড়ের ধার বেয়ে উপরে উঠে লতাপাতা ছিঁড়ে খেয়ে ক্ষুধার নিবৃত্তি ঘটায়। সমুদ্রের গভীরে ঘন মেঘ জমেছে সেদিন। তটের পাথরের উপর বারবার হুমড়ি খেয়ে পড়ে অশান্ত ঢেউ। একটা ঘোরের ভেতর সময় কাটায় কুকুরগুলো। আগের কটা শরতের মতো উচ্ছল জীবনে মেতে আছে অনেকে। কোথা থেকে যে মৃত্যুদূতেরা এসে উপস্থিত হয় তা কেউ বুঝতে পারে না। কুকুরের শবে স্তূপ জমতে থাকে খোলা আকাশের নিচে। কাল্লু-যে কীভাবে রক্ষা পেয়েছিল সেদিন তা সে নিজেও জানে না। জঙ্গলের ভেতরে পালিয়ে আসার পর বুঝতে পারে-যে ওর ডান পাটা একেবারে ভেঙে গেছে। মাথায় সৃষ্টি হয়েছে গভীর ক্ষত। ঠোঁটের ভেতর রক্তের ধারা গড়িয়ে আসে। ঐ রক্তের স্বাদ নিতে হয় ওর নিজেকেই। ভালো তিনটা পা কাজে লাগাতে পারে না একটা পায়ের অভাবে। অনেক সময় নিয়ে চেষ্টা করে সে ভাঙা পা মাথা পর্যন্ত পৌঁছে ক্ষতটাকে ঘেঁটে দিতে। কষ্টের তীব্রতা আরো বেড়ে যায় ওতে। হাল ছেড়ে দেয় সে। ভাঙা পা সামনে ছড়িয়ে মরার মতো চুপচাপ শুয়ে থাকে কিছুক্ষণ। রক্তক্ষরণে অনেক দুর্বল হয়ে পড়েছে সে। ঝোপের আড়াল থেকে কুকুর শিকারীদের ছায়া আবার দেখতে পায় সে। ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে উঠে বাঘস্বরে হুঙ্কার ছেড়ে লাফিয়ে যেতে চায় সামনের দিকে। ওভাবে এগোতে চেষ্টা করে কয়েকবার গড়াগড়ি খায় মাটিতে। বুঝতে পারে সে যে ঐ ভাঙা পা আর কখনো বহন করতে পারবে না ওকে। নিজেকে টেনেহিঁচড়ে জঙ্গলের গভীরে পালিয়ে যায় সে। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে শিকারিটা ফিরে যায়। একটা আহত কুকুরের কোনো প্রয়োজন নেই ওর।

কূলে আছড়ে পড়া জোয়ারজলের শব্দ আর নোনতা বাতাসের তীব্র গোঁ গোঁ আর্তনাদ ছাড়া অন্য কোনো শব্দ ওর কানে পৌঁছে না আর। সমস্ত দুর্বলতার কাছে পরিপূর্ণরূপে আত্মসমর্পণ করে কাল্লু। চোখের পাতা দুটো ফুলে ভারী হয়ে ঢেকে দিয়েছে আগুনের ভাটার মতো জ্বলতে থাকা ওর চোখ দুটো। খুব দুর্বলভাবে নিঃশ্বাস নেয় সে। ডান পা থেকে বিদ্যুৎ চমকের মতো আগ্রাসী ব্যথার অনুভূতি পাগলপ্রায় করে তোলে ওকে। ঐ তুলনায় মাথার জ্বলুনিটা তেমন কিছুই না। যদিও ওখান থেকে রক্তক্ষরণ হয়েই এমন দুর্বল হয়ে পড়েছে সে। ঘুম অথবা অচেতন অবস্থার ভেতর কত দিন বা কত সময় ডুবে ছিল আঁচ করতে পারে না কাল্লু। এভাবে কদিন প্রায় অচেতন থাকার পর ওর অনুভূতি আবার কাজ করতে শুরু করে। ধীরে ধীরে মাথা তোলার চেষ্টা করে সে। ডান পাটা কোনোভাবেই নড়াতে পারে না। শুয়ে থেকে পরিপার্শ্ব বোঝার চেষ্টা করে সে। মাথা সামান্য এদিক ওদিক ঘুরিয়ে দেখে। সবকিছু কেমন ঝাঁপসা দেখায়। সব চেয়ে বড়ো আকারের যে-প্রাণী ওর দৃষ্টিতে ধরা দেয় তা একটা ইঁদুরের।শিকারি জীবনের প্রথম দিনের হালকা স্মৃতি মনে পড়ে ওর। শিকার করেও ঐ প্রাণীটার মাংস ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল সে। এখন ওটার জন্যই জিভ লালাসিক্ত হয়ে ওঠে। চলৎশক্তিহীন অবস্থায় এমন একটা চঞ্চল প্রাণীকে তো আর শিকার করা যায় না। হোক না সে যতই ছোট। ভাগ্য প্রসন্ন বলতে হয় ওর। একেবারে নাগালের ভেতর চলে আসে ওটা। কামড়ে ধরে মাথায় প্রচণ্ড একটা ঝাঁকুনি দেয় সে। যদিও ইঁদুরটা মারা পড়ে কিন্তু ঐ ধকলে নিজেও সম্বিত হারিয়ে ফেলে। ব্যথা কিছুটা কমে আসার পর মৃত প্রাণীটার দিকে লোভাতুর দৃষ্টিতে তাকায় সে। কিছুটা ছেঁচড়ে নিজেকে সামলে নেয়। সামনের ভালো পা দিয়ে ইঁদুরটাকে কোলের কাছে টেনে নেয়। ধীরে সুস্থে ওটার মাংস সাবাড় করে হাড় পর্যন্ত চিবিয়ে খায়। জানে না সে যে কদিন পর ওর পেটে খাবার পড়েছে।

আগের কদিন ও রাত নিশ্চয় খুব বৃষ্টি গেছে। অলস চোখে চারপাশের নিচু জায়গায় জমে থাকা জল দেখে সে। রাতের আকাশ আজ পুরোপুরি ঢেকে রয়েছে ঘন মেঘের আড়ালে। গাছ পালার ফাঁক দিয়ে যতটুকু আকাশ দেখা যায় তাতে একটা তারাও চোখে পড়ে না। সমুদ্রতীরের ঝোপঝাড়ে সারা রাত লুটিয়ে বেড়ায় এলোমেলো বাতাস। পরের দিনও আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থেকে যায়। সূর্যের একটুও আলো নেই সমুদ্রতটে। নিজেকে টেনেহিঁচড়ে কোথায় নিয়ে যাবে বুঝতে পারে না সে। সমস্ত দুর্বলতা মেনে নিয়ে আরো একটা দিন স্থির হয়ে থাকে উদরের সামান্য ঐ খাবারের উপর নির্ভর করে। মাটি সেদ্ধ করা রোদ ওঠে পরদিন। সামান্য একফোঁটা পানি খাওয়ার সামর্থ্যও হারিয়ে ফেলেছে সে। ইচ্ছে হয় শরীরে বসে থাকা পোকামাকড়গুলোই খেয়ে ফেলে। কচি কটা সবুজ ঘাস ছিঁড়ে চিবুতে থাকে সে। ওর ভাগ্য ভালো যে পরের দিনও রোদজ্বলাভাবে শেষ হওয়ার পর সন্ধ্যায় আকাশ আর সমুদ্র মাখামাখি হয়ে যায় বৃষ্টিতে। দুদিনের শুকনো ঝোপঝাড় ও গাছের ডালপালা আর ধুলো জমা সৈকতের মাঝে প্রথমে বড়ো বড়ো ফোঁটায় বৃষ্টি ঝরে। তারপর শুরু হয় একটানা ঘন বর্ষণ। সারারাত থামেনি আর ঐ বৃষ্টি। হয়তো হালকাভাবে ঝরেছে কিছু সময়। বাতাসের ঝাপটায় বৃষ্টির মাতামাতি এক সময় প্রায় দমবন্ধ করে ফেলে ওর। ফুঁসে ওঠা ঢেউগুলোকে সমুদ্রের তটের উপর চেপে ধরে বৃষ্টির প্রবল পতন। ওটা অগ্রাহ্য করার সাধ্য কারো নেই। অবিরত বর্ষণে জমে ওঠা পানি শরীরের নিচের অংশে পীড়া দেয় ওর। জলের ঐ চতুর্ধারা আক্রমণ থেকে নিজেকে বাঁচাতে মরিয়া হয়ে ওঠে সে। কোনো একটা উঁচু গাছের গুঁড়ির খোঁজে প্রথমে মাথা তোলে। তারপর শরীর ছেঁচড়ে সামান্য এগিয়ে যেতে চায়। এতে সফল হয় কিছুটা। বেশ বড়ো একটা গাছের গোড়ায় পৌঁছে ওটার শেকড়ের খোঁদলে নিজেকে টেনে নিতে সক্ষম হয় সে। অবশিষ্ট জীবনীশক্তির সবটুকু নিঃশেষ হয়ে যায় ওটা করতে যেয়ে। প্রায় অচৈতন্যের ভেতর হারিয়ে যায় আবার কাল্লু। ঝড়ের গতি পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যায় ভোরের দিকে। অনেক দূর দিয়ে অন্য কোথাও চলে যায় ঝড়ের তাণ্ডব। বাতাসের উন্মাদনায় থেমে থাকা সমুদ্র-গর্জনের স্বাভাবিক সুর একটু একটু করে ফুটে ওঠে আবার। আকাশে সূর্য উঁকি দেয়ার পর বৃষ্টির কাছে সমুদ্রের সাময়িক পরাভবের রেশটা কেটে যায়।

সকালে বাতাস কিংবা রোদ না থাকায় সমুদ্রের গর্জন বড়ো নির্মম মনে হয়। গাছের পাতা চুঁইয়ে বড়ো বড়ো ফোঁটায় টুপটাপ জল ঝরে। শুষে নেয়ার ক্ষমতা হারিয়ে মাটি বুকে ধরে রাখে ঐ জল। কাল্লুর জীবনে শুরু হয় বেঁচে থাকার আরো একটা যুদ্ধ। কোনোভাবে তিন পায়ে দাঁড়াতে চেষ্টা করে সক্ষম হয় সে। কয়েক পা সামনে এগিয়ে যায়। সামান্য দূরে যেয়ে হাঁপাতে থাকে সে। এতদিনের অভ্যাসবশে ওর ডান পা একবার ফেলতে যেয়ে ভুল করে বসে। প্রচণ্ড ব্যথায় মাটিতে গড়িয়ে পড়ে সে। কিন্তু পড়ে থাকা তো আর জীবন নয়। উঠে দাঁড়ায় সে আবার। ঝোপের বাইরে টেনে আনে নিজেকে। জীবনের শুরুর দিকের কাঁকড়া শিকারের অস্পষ্ট ঐ হালকা স্মৃতিটা মনে ভেসে ওঠে ওর। সৈকত পর্যন্ত পৌঁছাতে পেরে বেঁচে থাকার আশা তীব্র হয় আরো। ওর মনে আশা রয়েছে যে কোনো না কোনো খাবার ওখানে পাবেই সে। ভাগ্য কিছুটা উদার ওর। পেয়ে যায় বেশ ভালো একটা খাবার। ঝড়ে উলটে পড়া একটা কচ্ছপের মৃতদেহ দেখতে পেয়ে ওখানেই খুঁজে পায় জীবনের অতি প্রয়োজনীয় রসায়ন। ভেতর থেকে উগড়ে না আসা পর্যন্ত পেটের ভেতর চালান দিতে থাকে ওটার উপাদেয় মাংস।

Dog’s fight; Image Source – Collected; Google Image

ভাঙা পা সামনে ছড়িয়ে সারাদিন শুয়ে থাকে ওখানে। মাথার ঘায়ে নাকি কুকুর পাগল! অথচ আশ্চর্যরকম ভাবে ওর মাথার ক্ষতটাই আগে সেরে ওঠে। এটার কারণ হতে পারে-যে অবিরাম বৃষ্টিজলে ধুয়ে ওখানে পুঁজ জমতে পারেনি। ঐ ঝড়জলের দিনগুলোই বরং জীবনটা টিকিয়ে রাখে ওর। সন্ধ্যার দিকে নিজেকে টেনে নিয়ে যায় আবার ঐ গাছের খোঁদলে। এখন অনেকটা সমর্থ মনে হয় ওর শরীর। পায়ের ব্যথা আর তত তীব্র মনে হয় না পরের দিন। ওটাকে আবার ব্যবহার করতে সাহসী হয় না সে। তিন পায়ে চলার একটা কায়দা ধীরে ধীরে রপ্ত করে নেয় আর নিরাময়ের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে ঝোপের ঐ নিরাপদ আশ্রয়ে।

হেঁটে চলার শক্তি ফিরে পাওয়ার চতুর্থ দিনে বিকেলের দিকে বৃষ্টি একেবারে থেমে ঝকঝকে আকাশ দেখা দেয়। সমুদ্রজলে সূর্যের অসংখ্য প্রতিবিম্ব চোখ ধাঁধিয়ে দেয় ওর। সৈকতে যাওয়ার জন্য প্রাণ আঁইঢাঁই করে। কিন্তু এত দুর্বল হয়ে পড়েছে সে যে সুস্থ পা তিনটাও ওকে বয়ে বেড়াতে অস্বীকৃতি জানায়। চকচকে কালো পাথুরে রং শরীরে ওর যে-চোখ দুটো ছিল চুনির মতো উজ্জ্বল, এই কদিনে ওদুটোতে এক বিন্দু জ্যোতিও অবশিষ্ট নেই। নিষ্প্রভ চোখজোড়া কোটরের এত গভীরে ঢুকেছে-যে, সামান্য দূর থেকে মনে হয় ছোট দুটো গর্ত রয়েছে ওখানে। মাথার ক্ষত প্রায় শুকিয়ে উঠেছে। পায়ের ভাঙা হাড়ও জোড়া লেগেছে। অবশ্য কিছুটা বাঁকা হয়ে। খিদের অনুভূতি আবার পুরোপুরি ভাবে ফিরে পায় সে। সমুদ্র তীরে অসংখ্য পাখির কলকাকলি ও উড়ে বেড়ানোর শব্দ ওর কান দুটোকে সচল রাখে সারাক্ষণ। ঝোপের ভেতর ছোট ছোট পাখির আনন্দমুখর অস্পষ্ট কিচিরমিচির ধ্বনিতে নতুন জীবনের সজীবতার সন্ধান পায় সে। ঝোপঝাড়ের ওপারে বিস্তীর্ণ মাঠ ঘাসে ভরে ওঠায় গরু-মহিষের স্বচ্ছন্দ বিচরণ চঞ্চলতা এনেছে মুখর প্রকৃতিতে। ঝড়ের তাণ্ডব থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পেরেছে যে-সব পোকামাকড়, ওরাও দ্রুত বংশ বৃদ্ধিতে সক্রিয় হয়ে ওঠে। খাদ্যের সন্ধানে সরীসৃপেরা ঘন ঘাসের ভেতর নেমে যায় মাথা উঁচু করে। প্রাণীদের ঐ বিচিত্র জগতে কেউ তো আর একা নয় কাল্লুর মতো।

সে এখন আর কারো প্রিয় বাঘা তো নয়ই এমনকি কাল্লুও যেন নয় আর। জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ করতে থাকা নিঃসঙ্গ একটা কুকুর। শুধুই কুকুর! ক্ষুধা জ্বলে ওঠায় তিনটা পায়ের উপর নির্ভর করে খাদ্যের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ে সে। সৈকতে ফিরে-ফিরে আসা ঢেউয়ের উপর উড়ে উড়ে ক্লান্ত হয়ে বিশ্রাম নেয়া গাঙচিলের দিকে চেয়ে ওর চোখ দুটোও জ্বলে ওঠে। মনে পড়ে পাখির মাংসের অপূর্ব স্বাদ। আরেক ঝাঁক হট্টিটি তটের রুপালিরেখা বরাবর আরো অদ্ভুত গলার স্বর ছড়িয়ে পালা করে উড়ে বেড়ায় আর নেমে আসে কাঁকড়াদের ছোট ছোট গর্তের উপর। সৈকতের কোনো একটা অংশ টুকটুকে লাল জবা ফুলের মতো ছেয়ে যায় অসংখ্য কাঁকড়াঝাঁকে। পাখির ঝাঁক উড়ে আসায় নিমেষেই আবার ধূসর হয়ে ওঠে ওখানটা। তটের এই মুহুর্মুহু পালাবদল ক্ষণেকের জন্য ওর চোখে পড়ে। অল্প পানিতে একটা জ্যান্ত কাছিমের আভাস পাওয়া যায় ভেঙে পড়া ঢেউগুলোর কাছে। টুকটুকে লাল লম্বা দুটো পা লেজের মতো ঝুলিয়ে আড়াআড়ি উড়ে যায় একটা সমুদ্রসারস। প্রকৃতির এসবকিছুর যে-কোনোটাই হতে পারে ওর খাদ্য। অথচ নাগালের মধ্যে নেই একটাও। শিকার করার সামর্থ্যহীন একটা কুকুরের জন্য এসব শুধুই অর্থহীন লালসা।

হঠাৎ এক শুভ সূচনা ঘটে বিচিত্র ঐ বিকেলটায়। দুটো গাঙচিল একটা আরেকটাকে ধাওয়া করে আক্রমণ করায় ওর নাগালের মধ্যে টাটকা একটা মাছ ঝরে পড়ে। কোথায় যায় আর ওটা। সঙ্গে সঙ্গে সে দখল নিয়ে নেয় মাছটার। ঐ দুটোর সঙ্গে আরো অনেক কটা চিল ঘিরে ধরে ওকে। মাথার উপর চিঁ চিঁ চিৎকার করে ঘুরে বেড়ায় অনেকক্ষণ। মাছটাকে অন্য প্রাণীর অধিকারে ছেড়ে যেতে প্রস্তুত নয় ওরা। সামনের ভাল পা দিয়ে মাছটাকে আঁকড়ে ধরে ঘুরে ঘুরে তাড়াতে চেষ্টা করে সে ওদের। শক্তি না পেলেও ওর বাঘস্বর যেন কিছুটা ফিরে পায় কাল্লু। পাখিগুলো বুঝতে পারে-যে ওটা ফিরে পাওয়ার কোনো আশা আর নেই। ওকে অভিসম্পাত দিতে দিতে আবার সমুদ্রের দিকে ঘুরে যায় পাখিগুলো। আয়েশ করে কাঁটাশুদ্ধ ঐ মাছটা সাবাড় করে সে। বিকেলের নরম রোদে শুয়ে বিশ্রাম নিতে যেয়ে প্রায় ঘুমিয়ে পড়ে কাল্লু। অনেকদিন পর আবার শান্তি ফিরে আসে ওর জীবনে। বিশ্রাম শেষে সে ফিরে যায় ওর আপাত আশ্রয়ের ঐ ঝোপটার ভেতর।

একাকিত্বের অবশিষ্ট দিনগুলো ঝড়বৃষ্টির ফাঁকে ফাঁকে সমুদ্র সৈকতে শিকার, শিকার না বলে বরং লুণ্ঠন করে চলে সে। ধীরে ধীরে শরীরে শক্তি ফিরে এলেও ভাঙা পা আর পুরোপুরি সমর্থ হয়ে ওঠে না। ওটাতে ভর করে কিছুটা দৌড় দেয়া যায়। ঝড়ের গতিতে ছুটে চলা কিংবা অন্য পাড়ার কুকুরের পিছু ধাওয়া করার শ্বাসরুদ্ধকর স্মৃতি মনে হলে এখন কাঁদতে ইচ্ছে করে ওর। ভাঙা পায়ের বিষয় ভুলে কখনো দুরন্ত দৌড় দেয়ার জন্য মাঝেমাঝে ঝাঁপ দেয় সে। পরক্ষণেই ওর অসামর্থ্য বিরত রাখে ওকে। জোরে দৌড় দিতে যেয়ে অনেকদিন হুমড়ি খেয়ে পায়ের ব্যথাটাকে নতুনভাবে জাগিয়ে দেয়। এ রকম অনেক নিষ্ফল প্রচেষ্টা ওকে বিক্ষুব্ধ করে তোলে নিজের প্রতি। আকাশের দিকে মুখ তুলে অকারণে দীর্ঘ চিৎকার জুড়ে দেয় কোনো-কোনো দিন। ওটা হয়তো ঐ বিধাতাকে অভিসম্পাত জানাতে ওর এই করুণ পরিণতির জন্য। ঐসব চিৎকারের সঙ্গে বাঘার নয় বরং শেয়ালের গলার স্বরের কিছুটা মিল খুঁজে পাওয়া যায়। এটা মেনে নিতে খুব কষ্ট হয় ওর।

পুরোনো জীবনে ফিরে যাওয়ার প্রচেষ্টা ক্রমাগত ব্যর্থতায় পরিণত হতে থাকলে নিজেকে মেনে নেয় সে। বুঝতে শেখে সে যে বিড়ম্বিত এক অসহায় জীবন যাপন করতে হবে ওকে। অনেকটা উচ্ছিষ্টভোগী হিসেবে বেঁচে থাকতে হবে বাকি দিনগুলো। বাঁধাহীন দৌড়ে ছুটে চলার ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত হয়ে সীমাহীন শূন্যের একাকিত্বের আনন্দ থেকেও বঞ্চিত মনে হয় নিজেকে। অনেকের মধ্য থেকে ছুটে বেরিয়ে এসে পাওয়া যায় একাকিত্বের স্বাদ। কিন্তু নিরবচ্ছিন্ন একাকিত্বের ভেতর একঘেঁয়েমির যন্ত্রণা ছাড়া আর কিছু নেই। কামড়াকামড়ি ছাড়া কুকুরের জীবনে কিই-বা আর আনন্দ অথবা শান্তি রয়েছে! কুকুরের কামড়াকামড়ি মানেই তো এক ধরনের যুদ্ধ। পৃথিবীর প্রতিটা প্রাণীকে শান্তিতে রাখতে পারে একমাত্র যুদ্ধ। যুদ্ধ না করে কোনো প্রাণী জীবন যাপন করেছে এমন উদাহরণ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। আমৃত্যু যুদ্ধলিপ্সা প্রাণীদের একটা প্রবল চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। একমাত্র দুর্বলতা কখনো কখনো বিরত রাখে ওদের। প্রতিপক্ষ না পেয়ে ঝাঁকবাঁধা গাঙচিলের উপর কখনো ঝাঁপিয়ে পড়ে ভয় দেখায় সে। মনের মধ্যে আশা রাখে সে যে হয়তো কোনোদিন সংঘবদ্ধভাবে যুদ্ধ করতে চাইবে ওরা। কিন্তু কখনোই তা করে না ঐ বোকা পাখিগুলো। ওকে আসতে দেখলে বরং নাগাল থেকে দূরে সরে যায়।

রাতের আলো অন্ধকারে দুএকটা শেয়াল ছুটে যায় সামনে দিয়ে। তিষ্টোতে না পেরে এক রাতে একটা শেয়ালকেই যুদ্ধে আহ্বান করে বসে সে। ওর দিকে ফিরেও তাকায় না প্রাণীটা। খুব অপমানিত বোধ করে কাল্লু। এতবেশি ক্ষুব্ধ আর লজ্জিত বোধ করে যে, সারারাত গড়াগড়ি করে কাটিয়ে দেয় সমুদ্র সৈকতে। একবারও ফিরে যায় না সে ওর ঝোপের আস্তানায়। কোনো একটা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার সুযোগ পাওয়ার অপেক্ষায় মনে মনে প্রস্তুত হতে থাকে সে। উচ্ছিষ্টভোজন কদিনই-বা আর টিকিয়ে রাখতে পারে বাঘা কাল্লুর মতো বিশালদেহী একটা কুকুরকে। এরিমধ্যে জেনে গেছে সে যে রাতের বেলায় সামুদ্রিক পাখিগুলো ঝাঁক বেঁধে বালিতে পা গুটিয়ে ঘুমোয়। ওদের সুখনিদ্রা ভেঙ্গে দেয়ার একটা বিকারগ্রস্ত আনন্দ পায় সে। সেইসঙ্গে পাখির মাংসের স্বাদ পুনর্বার পাওয়ার ইচ্ছা নিদ্রাহীন রাখে ওকে। দূরে দূরে ভেসে থাকা মেঘের ফাঁকে একচিলতে চাঁদ উঁকি দেয় বারবার। সামান্য আলোর পর অন্ধকারে চুপি চুপি গাঙচিলগুলোর একেবারে মাঝখানে ঝাঁপিয়ে পড়ে সে। ওর শরীরের ভারে প্রায় আহত বেশ বড়ো আকারের একটা পাখি ধরাশায়ী হয়। বাকিরা চিৎকার চেঁচামেচি করে যে যেদিকে পারে সরে পড়ে।

Dog’s Gang; Image Source – Collected; Courtesy: The Hindustan Time; Google Image

ঐ একটা পাখি শিকারের আনন্দেই উৎফুল্ল হয়ে ওঠে কাল্লু। গলায় কামড়ে ধরে নিজের আস্তানার দিকে ফিরে যেতে পা বাড়ায় সে। জিভে তাজা রক্তের স্বাদ উত্তেজিত করে ওকে। এবার বিধি বোধ হয় ওর বাম। যে শেয়ালকুলকে আক্রমণের জন্য ফন্দি আঁটছিল অনেকদিন ধরে ওদেরই একটা ছোট্ট দল সামনে পড়ে যায় ওর। কি করবে বুঝতে না পেরে প্রথম ভুলটা করে বসে সে। পাখিটা নিয়ে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করে। সঙ্গে সঙ্গে শেয়ালের দল ঘিরে ধরে ওকে। পাখিটা মুখে রেখেই ওদের প্রতিহত করার চেষ্টা করে সে। এক সময় ওরা ছিনিয়ে নেয় ওটাকে। মুখ উন্মুক্ত হয়ে যাওয়ায় ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে পড়ে সে। শরীরের সকল শক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে ওদের উপর। এবার আর খাদ্যের জন্য নয়। যুদ্ধের জন্য নিজেকে সম্পূর্ণরূপে নিয়োজিত করে। একদল শেয়ালের সঙ্গে পঙ্গু শরীর নিয়ে কীভাবে সফল হবে সে। কামড়ে আঁচড়ে ওকে কাবু করে ফেলে ওরা। একসময় উভয়পক্ষ রণে ভঙ্গ দেয়। ঐ ফাঁকে পাখিটা যে কে উধাও করেছে তার হদিস পায় না সে।

পরাজয়ের বেদনা নিয়ে ঐরাত সমুদ্র সৈকতে ছটফট করে কাটায় কাল্লু। পাখিগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে পালিয়ে থাকায় ক্ষুধার্ত আরো একটা রাতের নির্মমতার জন্য প্রস্তুতি নেয়। সৈকতেই পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়ে সে। যেখানে সফল শিকার সমাধা করেছিল ওখানে কিছু একটা নড়ে ওঠায় মাথা তুলে দেখে। তার পর ধীরে ধীরে সেখানে যেয়ে অবাক হয়। আরো একটা প্রায় মৃত পাখি পড়ে রয়েছে সেখানে। ধীরেসুস্থে প্রথমে একটা থাবা বসায় ওর মাথায়। তারপর কামড়ে ধরে ওটার গলা। চোখেমুখে কিছুক্ষণ পাখা ঝাপটানো খেয়ে পাখিটাকে মাটিতে নামিয়ে রাখে সে। তখন ওটা নিস্পন্দ। সমুদ্র সৈকতেও হঠাৎ কোথা থেকে নেমে আসে ক্ষণিকের স্তব্ধতা। একটা মাত্র শিকারের পাশে নিজেকে পরিত্যক্ত ও ভীষণ একা মনে হয় ওর। মনে মনে প্রার্থনা করে সে যে পাখিটা বরং প্রাণ পেয়ে সঙ্গ দিক ওকে। ক্ষুধা থাকা সত্ত্বেও ওটাকে আর খাওয়া হয় না ওর। শিকারী হিসেবে নিজেকে এখন জয়ী ভাবতেই পারে সে। মুখের সামনে ওর শিকার করা তাজা খাবার। কিন্তু এ-জয়ে কোনো আনন্দ নেই। আছে কেবল হতাশার বেদনা। এ যেন শিকার নয়। জোচ্চুরি। এ চরিত্র কুকুরের নয়। শেয়ালের।

পরাজয়ের রাতটা সুদূর-প্রসারী পরিবর্তন এনে দেয় ওর জীবনে। শেষ পর্যন্ত রাতের অন্ধকারে চৌর্যবৃত্তিই নিয়তি হয়ে ওঠে ওর। যুদ্ধের ধকল প্রায় একটা হপ্তা দুর্বল করে রাখে ওকে। বিস্তৃত সমুদ্র-সৈকতে প্রতিরাতে পাখিদের নতুন আস্তানায় হানা দিতে থাকে সে। অন্তরে হতাশা জন্ম নিলেও শরীরে যথেষ্ট শক্তি বৃদ্ধি ঘটে ওর। কোনো কোনো রাতে একাধিক শিকারের সফলতা পায়। এসব আপাত-উত্তেজনার প্রশমন অন্তরে তৃপ্তি না দিয়ে বরং এক ধরনের বিকৃতি এনে দেয় ওকে। একটা শিকারী কুকুরের অসংযমী ও বিকারগ্রস্ত নেশার মতো আনন্দমুখর ও দ্রুত উত্তেজনায় আপ্লুত হওয়ার কোনো সুযোগ এখানে নেই। বেঁচে থাকার রসদ জোগানোর জন্য যদি না হতো তাহলে পাগল হয়ে যাওয়ার কথা ওর। এক দল তাগড়া কুকুরের বিশাল একটা দলের সর্দার ছিল সে। এমনকি পাঁচটা কুকুরও এক সঙ্গে আক্রমণ করে কাবু করতে পারত না ওদের। সেখানে কটা শেয়ালের কাছে পরাজয়! ছিঃ ছিঃ, ঘেন্না, ঘেন্না! নিজেকেই ধিকৃত করে সে। গলার স্বর শুনেই যেখানে শেয়ালের দল কাছে ভেড়ার কথা ভাবতে পারত না . . . । চোখে জল জমে বাঘার। নাহ্, সে আর মোটেও বাঘা নয়। নিতান্তই এক হতভাগা কুকুর।

জীবনে আবার ফিরে আসে অনিশ্চয়তা ও ভীতির সংক্রমণ। অবশিষ্ট যুদ্ধলিপ্সাটাও পরিবর্তিত হয় অপরিণত বয়সের মতো ধীর। ঝোপের ক্ষুদ্র ঐ পরিসরে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছে হয় না আর। জীবনের নতুন ঐ প্রয়োজনটা আবার নতুনভাবে দেখা দেয় ওর ভেতর। জন্মের পর মায়ের আশ্রয়ে, তারপর খড়ের কুঁজোর আশ্রয়ে, গৃহপ্রভুর আশ্রয়ে, এভাবে বিভিন্ন আশ্রয় বদলে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে সে। গাছের খোঁদলটা অসুস্থতাকালীন আশ্রয় ছিল ওর। ওটা তো নিত্যদিনের কিংবা চিরজীবনের আশ্রয় হতে পারে না। পরের হপ্তায় স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে সে। অস্থির হয়ে থাকে শিকারের জন্য। অতিরিক্ত শিকার সঞ্চয় করে রাখে সুবিধেমতো সময়ে খাওয়ার জন্য। শরীরের শক্তি প্রায় সম্পূর্ণ ফিরে এলে সে মনস্থির করে ওর পুরোনো আশ্রয়ে ফিরে যেতে। রাতে শিকার করা দুটো পাখির অবশিষ্টটা সকালে শেষ করেছে সে। পুরোনো পথে ফিরে যেতে যেতে সর্বত্র যেন মৃত্যুর মতো নতুন কিছুর গন্ধ পায় কাল্লু। সেই সঙ্গে জীবনেরও। শুরুর জীবনে যখন একটা একটা করে বিচ্ছিন্নভাবে তিনটা ক্ষুধার প্রতিটার সাক্ষাৎ লাভ করে অবশেষে পরিপূর্ণ প্রাণীতে পরিণত হয়েছিল সে, এবার তা নয়। ঐ তিনটার মিলিত এক সৌগন্ধ বাতাসে ভেসে বেড়ায়। সেই সঙ্গে প্রাচীন ভীতিটাও চেপে থাকে ওর সমগ্র অস্তিত্ব জুড়ে। অবশেষে সন্ধিগ্ধ চিত্তে সে মুখোমুখি হয় এসবকিছুর।

অনেকটা নির্বিঘ্নে পুরোনো আবাসে ফিরে আসে সে। বাড়ির কাছে আসতেই কে যেন চিৎকার দিয়ে ওঠে, কাল্লু, কাল্লু। মনে করতে চেষ্টা করে সে এ-যেন কার গলা? কিছুতেই মনে পড়ে না ওর।

Lonely Struggle; Image Source – Collected; Platform.mag; Google Image

ঘড় ঘড় শব্দে লাফিয়ে ওঠে আরেকটা কুকুর। দৌড়ে এসে সামনে দাঁত খিঁচিয়ে দাঁড়ায়। কাল্লুর শরীর ও আগুনে দৃষ্টি কিনা কে জানে, সামান্য সময় চোখে চোখে তাকিয়ে শান্ত হয়ে যায় ঐ কুকুরটা। থেমে থেমে শুধু ঘড় ঘড় শব্দ করতে থাকে সে। দ্বিতীয় ক্ষুধাটা জীবনের সকল তীব্রতা নিয়ে জেগে ওঠে ওর। বাঘের মতো গর্জন করে সে। এ-হচ্ছে কর্তৃত্বের লড়াই। নিজের হারানো অবস্থান ফিরে পাওয়ার লড়াই। এমনই একটা লড়াইয়ের জন্য প্রায় মৃত অবস্থা থেকে পুনর্জীবন পেয়ে ফিরে এসেছে সে। অবস্থানটার দখলে থাকা কুকুরটাও বা তা ছাড়বে কেন? কাল্লুর ডেকে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে সে ঝাঁপিয়ে পড়ে শরীরের সকল শক্তি নিয়ে। শুরু হয়ে যায় দুপক্ষের টিকে থাকার লড়াই। দু-কুকুরের ঐ যুদ্ধটা একটা দেখার মতো দৃশ্যের অবতারণা করে ওখানে। অনেকক্ষণ ধরে চলে ঐ যুদ্ধ। কাল্লু যখন প্রায় জয়ী হয়ে এসেছে তখন অন্য দুটো কুকুর প্রথমটার পক্ষ নিয়ে ওর উপর যৌথ আক্রমণ চালায়। এমনিতেই মরণদশা তার উপর তিনটা কুকুরের সঙ্গে কুলিয়ে ওঠে সে কীভাবে? জীবনের প্রথম দিকের দিনগুলো মনে পড়ায় নতুন উদ্যম ফিরে পায় সে। নিজেকে ক্ষতবিক্ষত করেও কুকুর তিনটাকে জয়ী হতে দেয় না। কিন্তু প্রকৃতি তো নিয়ম রক্ষা করে চলে। বেকায়দায় পড়ে ভাঙা পায়ে ভীষণ আঘাত পায় আবার। ব্যথায় কঁকিয়ে ওঠে সে। তবু যুদ্ধ থামাতে চায় না। অথচ কখন-যে ওর সদা বাঁকানো লেজটা পেছনের দুপায়ের আশ্রয়ে অবস্থান নিয়েছে তা সে বুঝতে পারেনি। কুকুর জগতে এটা ভীষণ অর্থ বহন করে। আক্রমণে বিরতি দেয় ওর প্রতিপক্ষ। হাঁফ ছেড়ে বাঁচে সে। সেইসঙ্গে চিরজীবনের জন্য নিবৃতি ঘটে একটা ক্ষুধার। বাকি দুটো ক্ষুধা নিয়ে সত্যি অর্থে এক পঙ্গু জীবন যাপন করবে সে আরো কিছু কাল।

অনেকটা আপস করে বাড়িটাতে আবার আশ্রয় ফিরে পায় কাল্লু। অনায়াসে খাবার পেয়ে কিছুটা বিশ্রামেরও অবসর পায়। সে ফিরে আসায় প্রভুকর্তাটি খুশি হয়েছে। প্রায়ই যখন ‘আ কাল্লু’ বলে ওকে কাছে ডাকে সে তখন ওর পায়ের কাছে এসে ঘুরে ঘুরে লেজ দোলায়। বিশেষ ভঙ্গিতে মুখ উঁচু করে এক অবোধ্য উচ্চারণে জবাব দেয়। বর্ষা মওসুম শেষ হয়নি তখনও। তৃতীয় ক্ষুধাটায় ওর মন আনচান করে ওঠে আবার। যে-তিনটা কুকুর ওকে আক্রমণ করেছিল ওদের একটা ছিল কুক্কুরী। অন্য কুকুর দুটো কখনো সঙ্গ ছাড়া করে না ওকে। দুএক বার সুযোগ পেয়ে ওর কাছে ঘেঁষার চেষ্টা করে কাল্লু। কিন্তু ওর বিশাল শরীর দেখেই হয়তো বারবার পালিয়ে যায় সে। মারমুখী হয়ে একদিন ওকে আক্রমণ করে বসে কাল্লু। এতে অন্য কুকুর দুটো ক্ষিপ্ত হয়ে ওর দিকে তেড়ে আসে। তীব্র হয়ে ওঠা ঐ ক্ষুধাটা শেষ পর্যন্ত অতৃপ্তই থেকে যায় ওর। এভাবে ঐ বর্ষা ঋতুটারও সমাপ্তি ঘটে। জীবনে টিকে থাকে অবশিষ্ট আর একটাই মাত্র ক্ষুধা।

ঝকঝকে আরো একটা শরৎ আসে প্রকৃতিতে। বর্ষা শেষে ঘিনঘিনে প্যাঁচপ্যাঁচে ভাবের অবসানে আবার মসৃণ হয়ে উঠতে থাকে চারদিক। মাঠ থেকে পানি নেমে যাওয়ায় ও চাষবাসের কাজ শুরু হওয়ায় মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীদের কর্মচঞ্চলতা অনেক বেড়ে যায়। সবার ঘুরে বেড়ানোর পরিসর হয় বিস্তৃত। কাল্লুর কাছে এসবের প্রয়োজন মনে হয় ফুরিয়ে এসেছে। একবেলা কটা খাবার পেলে মন চায় শুধু ঘুমোতে। দ্বিতীয় বেলা খাওয়ার ভাবনাও থাকে না ওর। অপরিতৃপ্ত প্রেমের ক্ষুধা সহ অন্য সব ক্ষুধাই তখনো জড়িয়ে রয়েছে ওর ভেতর। ফলে মেজাজ হয়ে ওঠে খিটখিটে। মাঝে মাঝে অযথাই বাড়ির গৃহপালিত পশুপাখিদের দিকে তেড়ে যায় সে। বিষয়টা মানুষগুলোর মনে বিরূপতার জন্ম দেয়। ওরা ভাবে-যে কাল্লু বোধ হয় পাগল হতে চলেছে। ওর মাথার গভীর ক্ষতচিহ্নটা ওদের ঐ ভাবনাকে আরো নিশ্চয়তা দেয়।

প্রকৃতি জুড়ে আসে হেমন্তের শূন্যতা। ওর ঐ রিক্ত জীবনটাও তখন অসহ্য হয়ে ওঠে। শুধু মাত্র খাওয়ার জন্য এভাবে বেঁচে থাকতে যেয়ে হাঁপিয়ে ওঠে ওর মন। সমুদ্র সৈকতের শিকারি জীবনটাকে ওটার বিকল্প মনে হয়। একরাতে ফিরে যায় সে ওখানে। কিন্তু ওখানেও শান্তি খুঁজে পায় না সে। সব যেন শূন্যতার হাহাকার। ভয়ঙ্কর একাকিত্ব মনে ভয় ধরিয়ে দেয়ায় আবার ফিরে আসে সে। সঙ্গে নিয়ে আসে পুরোনো ঐ শিকারলিপ্সাটা। এক নিশুতি রাতে হাঁস-মুরগির খামারের দরোজা খুলে চুপিচুপি ভেতরে ঢুকে সে। এক অসামান্য আক্রোশে রক্তাক্ত করে ওদের। কটা হাঁস-মুরগি দরোজার ফাঁক দিয়ে উঠোনে বেরিয়ে এসে প্রচণ্ড সোরগোল তোলে। ঘুমভাঙ্গা মানুষজন বেরিয়ে আসে ঘর থেকে। ওর কাণ্ড দেখে অবাক হয় সবাই। ওরা ভাবে যে নিশ্চয় পাগল হয়ে পড়েছে কুকুরটা। আর পাগলা কুকুরের পরিণতি তো একটাই। হাতে হাতে লাঠি নিয়ে ওকে ঘিরে ধরে সবাই। বাড়ির কুকুরগুলোও ঝাঁপিয়ে পড়ে ওর উপর। প্রতি-আক্রমণ নয় এবার। শুধু বেঁচে থাকার জন্য প্রাণপণ লড়ে যায় কাল্লু জীবনের শেষ এবং ভয়ঙ্কর ঐ যুদ্ধটা। এতগুলো প্রাণীর সঙ্গে একা কুলিয়ে উঠবে সে কীভাবে! মাথায় একটা বাড়ি খেয়ে টলে পড়ে যায়।

সম্ভবত প্রথম ক্ষতটাই আবার জীবন্ত হয়ে ওঠে ওর। রক্তে চোখ দুটো ভরে যায়। সবকিছু ঝাঁপসা দেখে সে। এমনকি স্মৃতিও মুছে যেতে থাকে ওর কাছ থেকে। মৃত্যুর অনুভূতি দেখা দেয় ওর ভেতর। জীবনের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত সব কিছু খুব দ্রুত মনে পড়ে ওর। জন্মের পর সিঁড়িঘরের নিচে ভাঙ্গা বাকশো, আর ছেঁড়া কাপড়ের ভেতর শুয়ে থেকে মায়ের বুকের দুধ খাওয়া থেকে পিতৃমাতৃহীন হয়ে যাওয়া, তারপর আবার কুকুর-সম্রাট হওয়ার পর সব হারানো থেকে এই শেষ পরিণতি পর্যন্ত সবকিছু চলচ্চিত্রের মতো এক ঝলক আনন্দানুভূতি দিয়ে শূন্যে মিলিয়ে যায়। শরীর নিষ্ক্রিয় হয়ে যেতে থাকলে পরিপার্শ্বের শব্দগুলোও আর কানে আসে না। প্রভুর দিকে চোখ মেলে চাইতে চায় সে প্রাণপণে। জীবনে শেষবারের মত শুনতে চায় ওর কাল্লু কিংবা বাঘা ডাকটা। ঝাঁপসা চোখে দেখতে পায় প্রভুপুত্র হাতের লাঠি ফেলে প্রচণ্ড ঘৃণাভরে উচ্চারণ করে ‘বাঘা’ নয়, ‘কাল্লু’ নয়, ‘শালার কুত্তা’! শালার শব্দটার সঙ্গে ওর পরিচয় নেই। মৃত্যু-মুহূর্তে কুত্তা শব্দটাকে বড়ো অশ্লীল মনে হয় ওর কাছে। মনে হয় পৃথিবীর নৃশংসতম ও অতি-ঘৃণিত একটা শব্দ ওটা। একটা কুত্তার জীবন কখনোই যাপন করতে চায়নি সে!

এক সময়ের প্রবল পরাক্রমশালী সারমেয় সর্দার বাঘা কাল্লু শেষ পর্যন্ত ঘৃণ্য ‘কুত্তা’ শব্দটার রেশ নিয়ে নিস্পন্দ হয়ে রাত-ভর উঠোনে পড়ে থাকে। পরদিন সূর্য উঠার সঙ্গে সঙ্গে ঘর থেকে বেরিয়ে কাল্লুর কাছে ছুটে যায় ঐ প্রভুগিন্নী। ওর বিশাল মৃতদেহটার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে আর উচ্চারণ করে ‘বড়ো লড়াকু ছিল কুকুরটা!’ কিন্তু ঐ প্রশংসা কিংবা সহানুভূতির কোনোকিছুই আর স্পর্শ করতে পারে না প্রাণহীন ঐ নিঃসঙ্গ প্রাণীটাকে।
. . .

Lonely Death; Image Source – Collected with edit; Google Image

. . .

লেখক পরিচয় : এখানে অথবা নিচের ছবিতে চাপুন

. . .

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 30

No votes so far! Be the first to rate this post.

Contributor@thirdlanespace.com কর্তৃক স্বত্ব সংরক্ষিত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *