কবিতা সিরিজ : জীবনানন্দ, তোমাকে ভেবে : পর্ব-৩
(নিরীক্ষা ও বিনির্মাণে জীবনানন্দ দাশের অন্ধকার)
রচনা : হেলাল চৌধুরী

তুমি এলে বুঝি আজ
তুমি চেয়েছিলে
জীবনানন্দ,
আবার আসিবে ফিরে
শঙ্খচিল শালিকের বেশে
ধানসিঁড়ি জলে নবান্নের ঘ্রাণে;
তুমি এলে বুঝি আজ
এখনও সবুজ ঘাসের দেশে, হেলালের বেশে..
জীবনানন্দ,
তোমার বুনোহাঁস
মরে গেছে সে কবে
সূর্যের আগুনে
কার্তিকের মাঠে রূপসীর দেহে;
তুমি এলে বুঝি আজ
এখনও সবুজ ঘাসের দেশে, হেলালের বেশে…
অরুণিমা স্যান্যাল
তোমার,
এলো আজ ফিরে
তোমার কবেকার রাত্রির বিধানে
পৃথিবীর সব রাজকন্যাদের ভিড়ে;
তুমি এলে বুঝি আজ
এখনও সবুজ ঘাসের দেশে, হেলালের বেশে।
. . .
জীবনানন্দপথিক
কুড়ি বছর পর পথ হাঁটা শেষ হলে
পর্বত হতে নেমে এলো সে
কবেকার জীবনানন্দপথিক
ধানের আমের জামের ঘ্রাণে
ইলার রাত মাখে মনিয়ার রাতে জীবনানন্দপথিক…
দেবদারু পাতায় মাখে সে ঝাউ শিরিষের হাত
মাঝরাতে চাঁদ পামের পাতার আড়ালে
জীবন গিয়েছে বেঁচে তার বাবলার অন্ধকারে
ধানের আমের জামের ঘ্রাণে
ইলার রাত মাখে মনিয়ার রাতে জীবনানন্দপথিক…
জানালার কাচে দেখে সে কুয়াশায় হলুদ নদী
মৃদু আলোয় সেখানে হাঁসের শরীর
ইলার শরীর মনিয়ার শরীরে
ধানের আমের জামের ঘ্রাণে
ইলার রাত মাখে মনিয়ার রাতে জীবনানন্দপথিক…
. . .
পাঁচফুট জমিনে এখনও তোমার অ্যামিবারা
তোমার মক্ষিকারা এখনও
পৃথিবীর দেয়ালে কার্নিশে
লবেজান হাওয়ায় গাঁথুনির ইট করে ফাঁস
অযথাই ঘুরে ঘুরে
আজও আমাদের পাঁচফুট জমিনে উড়ে উড়ে…
চেঙ্গিস আজও ঘুরিতে আছে
রক্তের অভিযানে নদী ও নারী চেয়ে
উপদেশ দিয়ে যান তবু কনফুসিয়াস
অযথাই ঘুরে ঘুরে
আজও আমাদের পাঁচফুট জমিনে উড়ে উড়ে…
তোমার সেই সব অ্যামিবারা
সহাসে জেগে ওঠে ইস্পাত নদী জলে
সারস-দম্পতি চোখে দেখে শুধু অরণ্যের রঙ
অযথাই ঘুরে ঘুরে
আজও আমাদের পাঁচফুট জমিনে উড়ে উড়ে…
. . .
তোমার শঙ্খমালারা
জীবনানন্দ
এখনও তোমার শঙ্খমালারা
নামে, পৃথিবীর গভীর অন্ধকার ভালোবাসে
তোমার হরিণেরা তাই জোছনায় শুয়ে থাকে
অরণ্যের গহিন অন্ধকারে;
শ্যামলীরা শুনো, যেয়ো নাতো জোছনায় আলোর মাঠে…
জীবনানন্দ, এখনও তোমার
চিতা বাঘেরা এখানে
রাতে নয়, ভোরের সূর্যে নেমে আসে প্রবল কামাতুর চোখে
হরিণেরা তাই জোছনায় শুয়ে থাকে
অরণ্যের গহিন অন্ধকারে;
শ্যামলীরা শুনো, যেয়ো নাতো জোছনায় আলোর মাঠে…
জীবনানন্দ, এখনও এখানে
তোমার বিদর্ভ নগর জাগে
মিশরের মানুষীটি হাঁটে মুক্তায় মদের গেলাসে
হরিণেরা তাই জোছনায় শুয়ে থাকে
অরণ্যের গহিন অন্ধকারে;
শ্যামলীরা শুনো, যেয়ো নাতো জোছনায় আলোর মাঠে…
. . .

সরোজিনী তোমার শুয়ে নেই
সরোজিনী তোমার
শুয়ে নেই, জেগে আছে অন্ধকারের প্যাঁচাদের তাড়িয়ে
পাখিদের মতো পাখা মেলে উড়ে উড়ে সে আজও;
সরোজিনী যায়নি তো দূরে
জেগে আছে এই হৃদয়ের আবাসন আলোকিত কন্দরে।
আলোর আবেগে
এখনও সে মৃত্তিকার মেঘে
জমাট বৃষ্টি সরিয়ে হৃদয়ে দিতেছে জ্যামিতিক ঢেউ;
সরোজিনী যায়নি তো দূরে
জেগে আছে এই হৃদয়ের আবাসন আলোকিত কন্দরে।
সন্ধ্যার আকাশে
আর্দ্রতা দেখি আজ তোমার
বেড়াল নয় সে, কুকুরের মতো নামে হাসি মেখে পশমে;
সরোজিনী যায়নি তো দূরে
জেগে আছে এই হৃদয়ের আবাসন আলোকিত কন্দরে।
. . .
তোমার অমল অমেয় নয়টি হাঁস
নয়টি হাঁস তোমার অপরাহ্ণের রোদে
আজও হাঁটে আমাদের উঠোনে
নামে না আজ তারা অমেয় খইয়ের রঙে
তোমার জলপাই পল্লবের মতো স্নিগ্ধ জলে;
তোমার নদীর জলে নয়টি অমল হাঁস
আজও গভীর আর গভীরতর
তাই তারা আজ আর নামে না নদীর বুকে
তোমার জলপাই পল্লবের মতো স্নিগ্ধ জলে;
এখানে উলুবন নেই, ঘাসের বিছানা নেই
পাহাড়ের মতো হেমন্ত শিশির ভরা নীলাকাশ
নদীর কোলে তখন তোমার হাঁসের দলবল
তোমার জলপাই পল্লবের মতো স্নিগ্ধ জলে।
. . .
এখনও তোমার নয়টি হাঁস
নয়টি হাঁস তোমার
জল ভুলে
ভোরে
পুকুরে
হেমন্তনারীর কোলে
উঠে এলো পৃথিবীর পার ধরে;
জলপাই পল্লবে আমার
মায়াবী জাদুবলে
তারা হাঁটে
মুকুরে
হেমন্তনারীর কোলে
উঠে এলো পৃথিবীর পার ধরে;
এখনও তোমার
নয়টি অমল হাঁস
অমেয় খইয়ের রঙে
হাঁটে
হেমন্তনারীর কোলে
উঠে এলো পৃথিবীর পার ধরে।
. . .
সৎ আঁধারের সংশয়
আমিও তোমার অন্ধকার সমুদ্রের মতন
তিমির দেখি; উদীচীরে চেয়ে হাঁটি
দেখি, চারিদিকে হনলুলু সাগরের ঢেউ
আমরা তো চেয়ে আছি তাই
এখনও তোমার তিমির হননের গান ভালোবেসে…
ম্যানিলা হাওয়াই
টাইটির দ্বীপ চাই
চাই দূরতর দারুচিনি দ্বীপে নৈঋতের প্রত্যয়
আমরা তো চেয়ে আছি তাই
এখনও তোমার তিমির হননের গান ভালোবেসে…
অবাচীর অন্ধকার নয়, প্রাচীর বিস্ময়
আরও-এক ভোর উদীচীর প্রত্যয়, থাকুক
পুনরায় সাগরের তোমার সৎ আঁধারের সংশয়
আমরা তো চেয়ে আছি তাই
এখনও তোমার তিমির হননের গান ভালোবেসে।
. . .

তোমার হরিণীরা যদি জাগে
এক চিলতে রোদের শরীর নিয়ে, তুমি যদি
হেঁটে চলো মিশিগান; ফিরে এসো তবে
সবুজ রোদের দেশ আমাদের নরম ঘাসে।
তোমার হরিণীরা যদি জাগে আজ লেবুপাতা ঘ্রাণে
আমাদের পথ হাঁটা তবে হবে হলুদ জোছনায় অবসান…
ঘাসের বুকে তার খুঁজে নিয়ো হাওয়ার রাত
এখনও হরিণেরা গেলাসে গেলাসে মদ করে পান
তোমাকে পাওয়ার বহুবাসনায়।
তোমার হরিণীরা যদি জাগে আজ লেবুপাতা ঘ্রাণে
আমাদের পথ হাঁটা তবে হবে হলুদ জোছনায় অবসান…
এখনও রক্তে রচে নিই মিশর পিরামিড
বুকে কেঁদে ওঠে আস্তাকুঁড়ে কবেকার তোমার স্ফিংক্স
মৃতের নগর কায়রোয় হলুদ অন্ধকারে।
তোমার হরিণীরা যদি জাগে আজ লেবুপাতা ঘ্রাণে
আমাদের পথ হাঁটা তবে হবে হলুদ জোছনায় অবসান…
. . .
তোমার চোখে নদী ছিল একদিন
তোমার চোখে নদী ছিল একদিন
পুনরায় তোমাদের দেশে ভোর হয়েছিল
শুধু একটি নারী আজও কুয়াশার ভেতর
মানুষের শরীরে মূর্তির মতো এসে ঘোরে…
তোমার সূর্যের পরিধি এখনও বিভোর
ভোরের নদী শিশিরের ভেতর
শুধু একটি নারী আজও মাছির মতো
মানুষের শরীরে মূর্তির মতো এসে ঘোরে…
নদীর শিয়রে আজও হেমন্তের রাত্রি
সময়ের কাছে করে কুর্ণিশ
সূর্যের আলো তাই সহিষ্ণু নদীর জলে
মানুষের শরীরে মূর্তির মতো এসে ঘোরে।
. . .
তোমার কবেকার ব্যাবিলন লন্ডন
আজও তোমার ক্ষেতে-প্রান্তরে সম্রাট নেই
এখনও দেখি চাষা — বলদেরা হাঁটে পৃথিবীর মাঠে
বাংলার প্রান্তর, তবে কবেকার ব্যাবিলন লন্ডন
এখনও
তোমার কামিন ও কামিনীরা বুঝি মমির গহ্বর…
আজও গাছের দীর্ঘ ছায়া
মেখে নেয় বাংলার প্রান্তর
এখনও তো তবু, কৃষক চোত-বোশেখের দিবাকর
এখনও
তোমার কামিন ও কামিনীরা বুঝি মমির গহ্বর…
আজও উনিশশো বেয়াল্লিশ
হেঁটে যায় কৃষাণের বিবর্ণ লাঙলের ফলায়
কবেকার সে সোভিয়েত নাইন্টিথ্রি নচিকেতা দুর্মর
এখনও
তোমার কামিন ও কামিনীরা বুঝি মমির গহ্বর।
. . .
তোমার ধানসিঁড়ি নদী
জীবনানন্দ, তোমার ধানসিঁড়ি নদী আজ রূগ্ন
রক্তে তার মারির যৌবন — ঘনঘোর শ্যামলা
আজ তাই রূপসীর গায়ে নিদারুণ উৎকট কলরব
আবারও কবেকার অশোকের ধূসর পৃথিবী বিকট
তোমার বনলতা সেন এখানে আজ
ইলার রাত মাখে মনিয়ার রাতে জীবনানন্দপথিক…
জীবনানন্দ, তোমার ধানসিঁড়ি নদী আজ শুকনো
বুক তার বারবার মড়কের যৌবনে নির্জলা
সারির জলে উৎলার চর বুনোহাঁস ডানার উৎসব
নারীর বুকে পালকের শোকে শাড়ির সংকট
তোমার বনলতা সেন এখানে আজ
ইলার রাত মাখে মনিয়ার রাতে জীবনানন্দপথিক…
জীবনানন্দ, তোমার ধানসিঁড়ি নদী আজ ভগ্ন
ধানের ক্ষেত তার জলের আকালে নিষ্ফলা
মাঠে সবুজে তোমার খয়েরি ডানা চিলের পালক নীরব
ঘাটে মানুষের মাকালে নির্জনতার নিদারুণ উৎকট
তোমার বনলতা সেন এখানে আজ
ইলার রাত মাখে মনিয়ার রাতে জীবনানন্দপথিক।
. . .
আমিও তোমার মতো
আমিও তোমার মতো বলে বেড়াই
আমাকে খোঁজে না সে কতদিন
আমিও খুঁজি না তারে বহুদিন রূপসী ধানের শিষে
আমরা তবু এক নক্ষত্রের নিচে—
দুজনে আলো অন্ধকারে আজও পৃথিবীর পারে…
তোমার হংকঙের তৃণের মতন
এখনও সে অন্ধকারে ম্লান জোছনায় হাঁটে
প্রেম বুকে ঘুঘুর পালকে শালিকের রোদেলা ঠোঁটে
আমরা তবু এক নক্ষত্রের নিচে—
দুজনে আলো অন্ধকারে আজও পৃথিবীর পারে…
কুয়াশা রেখে যাব জানি, আমিও একদিন
শিশিরের রূপালি ঠোঁটে; তবু আমাদের দুস্থহৃদয়
উপশম খুঁজে নেবে তোমার দায়ভাগী নক্ষত্রের বুকে
আমরা তবু এক নক্ষত্রের নিচে—
দুজনে আলো অন্ধকারে আজও পৃথিবীর পারে।
. . .

. . .
কবিতা সিরিজ : জীবননানন্দ, তোমাকে ভেবে : আগের পর্বের লিংক
জীবনানন্দ, তোমাকে ভেবে-২ : হেলাল চৌধুরী
জীবনানন্দ, তোমাকে ভেবে-১ : হেলাল চৌধুরী

লেখক পরিচয় : ওপরের ছবি অথবা এখানে চাপুন
. . .



