২০১৯ সাল, দুর্গাপুজা পরবর্তী কোজাগরী বা লক্ষ্মী পূর্ণিমাতে সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুর উপজেলাধীন ভবানীপুর গ্রামে ‘চান্নি পসর গানের আসর’ অনুষ্ঠানের আয়োজন করি। এই গ্রামের সমীরণ তালুকদারের বাড়ির সামনের আঙিনায় আসর বসে। কবি পহেলী দে-র সঞ্চালনায় বিকাল থেকে অনুষ্ঠান শুরু হয়ে সারারাত চলে। নৌকাযোগে টাঙ্গুয়ার হাওরে সূর্যোদয় দেখা আর কবিতাপাঠের মধ্য দিয়ে বাকি আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়। ঢাকা-সিলেট-নেত্রকোনাসহ বিভিন্নস্থান থেকে গুণিজনরা রাত জেগে অনুষ্ঠান উপভোগ করেন। অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ ছিল ধামাইল নৃত্যনাট্য ‘রাইকিশোরী’ মঞ্চায়ন। মূলত ধামাইল পরিবেশনের নিয়ম-কানুন ও ধারাবাহিকতা তুলে ধরার প্রয়াস ছিল যার উদ্দেশ্য।
ধামাইল আসর ভিত্তিক গান। পরিবেশনে যেমন শুরু ও শেষ হওয়ার ধারাবাহিকতা আছে, ঠিক তেমনি আছে ধামাইলের প্রকৃত সুর ও নৃত্যতালের উপস্থাপনা। ধামাইল নৃত্যনাট্য ‘রাইকিশোরী’-র মাধ্যমে তাই তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়। তাছাড়া এ-অনুষ্ঠানে দলীয় ধামাইল গান, মহুয়ার পালা, গাজীগান, বাউল গান, লোকগান ও কবিতাপাঠসহ বিবিধ পরিবেশনা হয়। হাওরের সংস্কৃতি ও স্থানীয় শিল্পীদের সমন্বয়ে এই অনুষ্ঠানের মূল স্লোগান ছিল :
‘বনফুলে ওনাগরী গানের আসর সাজাও গো’।
এই অনুষ্ঠানে সমীরণ তালুকদার ও ভবানীপুর গ্রামবাসী ছাড়াও বিশেষভাবে সহযোগীতা করেন : ফয়েজ আহমদ রাজীব, লেখক ও ব্যাংকার শেখ সুজাদুল হক, বিজ্ঞানী জহিরুল আলম সিদ্দিকী, কামাল আহমেদ, সনৎ সরকার ও শামীম আহমেদ মুরাদসহ অনেকেই। সে যাইহোক, এবার আসল কথায় ফিরে আসি। মনে হচ্ছে ‘ধান ভানতে শীবের গীত’ শুরু করে দিলাম।
অনুষ্ঠান আয়োজনের বেশ ক’দিন পুর্বেই আমি ভবানীপুর গ্রামে সমীরণ তালুকদারের বাড়িতে চলে যাই। তার বাড়ির আলগঘরেই স্থানীয় শিল্পীদের নিয়ে অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি মহড়া চলে। ওস্তাদ ব্রজসুন্দর দে গানের মহড়া পরিচালনা করেন। একপর্যায়ে ধামাইল গানের মহড়া হয় এবং জলভরা ধামাইল গানে (আমরা ভইরে আইলাম শীতল গঙ্গার জল…) ব্যবহৃত ‘ললিতা’ প্রসঙ্গ আসে। গানের ভণিতায় কে সেই ললিতা? তিনি এ-প্রসঙ্গে যে বার্তা দিলেন তা হলো :
গানের ভাব অনুযায়ী ললিতা একটি উপমা। গীতিকার নাও হতে পারে। বিশেষ করে জলভরা ধামাইল গানে এমন উপমা থাকে। আগের (আদি) অনেক গানেই গীতিকারের নাম যুক্ত নেই। মুখে-মুখে আমরা গীতিকারে নাম উল্লেখ করে তারপর গান গাই। গীতিকার কিংবা গুরুর নাম নেওয়ার সময় নিজের কান ধরে মান্যতা প্রকাশ করি।
এই বলে তিনি উদাহরণ স্বরূপ এই আসরে একটি গান গেয়ে শোনান। যে-গানের ভণিতায় গীতিকারের নাম উল্লেখ নেই। তিনি শ্রদ্ধার সাথে গীতিকারের নাম প্রথমে উল্লেখ করেন, এবং নিজের কান ধরে মান্যতা প্রকাশ করে গানটি শুরু করেন :
মথুরার-ই সময় গেলো গৈয়া রে ও সুজনও নাইয়া
নাইয়া রে তুই পার করো সকাল রাধা রে…।
আমি কু-ক্ষেণে বাড়াইলাম পা’উ
খেয়া ঘাটে নাইরে নাউও রে ও নাইয়া
খেওয়ানিরে খাইলো লঙ্কার বাঘে রে সুজনও নাইয়া…
নাইয়া রে তুই পার করো সকাল রাধা রে…।
আমি তো গোয়ালের মাইয়া
তুমি তো সুজনও নাইয়া রে ও নাইয়া
ঠেকছি আমি দধির ভাণ্ড লইয়া রে সুজনও নাইয়া
নাইয়া রে তুই পার করো সকাল রাধা রে…।
যে করিবে মোরে পার
তারে দেবো গলার হারও রে ও নাইয়া
তারে দেবো এই লাখের যৌবনও রে সুজনও নাইয়া…
নাইয়া রে তুই পার করো সকাল রাধা রে…।
গানটির রচয়িতা দীন ভবানন্দ। পঞ্চদশ শতকের কবি দীন ভবানন্দ ভারতের উত্তর ত্রিপুরা জেলার ধর্মনগর শহরের পার্শ্ববর্তী জুড়ি নদীর তীরে অবস্থিত নতুনবাজার গ্রামে ব্রাহ্মণ বংশে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্মস্থানে দীন ভবানন্দ নামে একটি দিঘী এখনও টিকে আছে। তাঁর এই গানটি (মথুরার-ই সময় গেলো গৈয়া রে…) ভাটি অঞ্চলে খুবই জনপ্রিয়। যেখানে অনেকেই জানেন না এই গানের গীতিকার কে? অবশ্য এই গানের আদলে উকিল মুন্সি (আব্দুল হক আকন্দ) রচিত একটি গানও বারী সিদ্দিকীর কণ্ঠে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তা হলো :
আমি ভাবছিলাম কি এই রঙে দিন যাবে রে
সুজন নাইয়া পার করো দুঃখিনী রাধারে\
কুক্ষণে বাড়াইলাম পাও, খেয়াঘাটে নাইরে নাও
খেয়ানীরে খাইলো জংলার বাঘে রে সুজন নাইয়া\
যে আমারে করবে পার, তারে দিবো গলার হার
আরো দিবো লাখের যৌবন রে সুজন নাইয়া\
আশা নদীর কূলে বইয়া, কান্দে উকিল পন্থ চাইয়া রে
মথুরার সময় গেলো বইয়া রে সুজন নাইয়া\
তাছাড়াও ‘মথুরার-ই সময় গেলো গৈয়া’ ও ‘সুজন নাইয়া’ এবং ‘আমি ভাবছিলাম কি এই রঙে দিন যাবে’ এমন অংশ বিশেষ রাধারমণ দত্তের গানেও রয়েছে। তবে এই গানটি (মথুরার-ই সময় গেলো গৈয়া রে…) প্রসঙ্গে ওস্তাদ ব্রজসুন্দর দে দৃঢ়ভাবে বলেন :
দীন ভবানন্দ গানটির গীতিকার। আমরা বংশ পরম্পরায় ও গুরুদের মুখে তাই জেনেছি। যে-গানের রচনাকাল রাধারমণ কিংবা উকিল মুন্সির সময়েরও অনেক আগে।
দীর্ঘ আলাপচারিতায় ওস্তাদ ব্রজসুন্দর দে ভণিতাহীন (অচেনা গীতিকার) এমন অনেক গানের উপমা তুলে ধরেন। যে-গানগুলো আমাদের চেনা কিন্তু গীতিকার অচেনা।
‘চান্নি পসর গানের আসর’ অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে ভবানীপুরের আশেপাশের গ্রামসহ দীর্ঘ ফিল্ডওয়ার্কে ললিতা কিংবা লীলাবালী সম্পর্কে তেমন কোন তথ্য উদঘাটন না হলেও অনেক জনপ্রিয় এবং চেনাজানা গানের রচয়িতা নিয়ে যে-বিভ্রান্তি আছে তার একটা আলামত পেলাম। ‘চেনা গান অচেনা গীতিকার’ এই ভাবনাটুকু মূলত তখনই আমার মাথায় আসে এবং ‘ললিতা’ ও ‘লীলাবালী’ অনুসন্ধানের সাথে নতুন করে যুক্ত হয়। ঠিক তখনি মনে পড়ে ২০১৭ সালে নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া উপজেলাধীন সাজিউরা গ্রামে বাউল দীন শরৎ নাথকে নিয়ে কাজ করতে গিয়ে একটি জনপ্রিয় চেনা গানের কথা :
গুরু উপায় বলো না
জনমদুঃখী কপাল পোড়া
গুরু আমি একজনা…।

ভুলক্রমে বিভিন্ন লেখক, গবেষক ও শিল্পীদের দূরদর্শিতার অভাবে এই গানটি বাউল দীন শরৎ নাথ এর দখলে চলে আসে। যা দীন শরৎ নাথ নিজেও জানেন না। পরে অবশ্য দীন শরৎ নাথের প্রশিষ্য সুমঙ্গল শীল এর সহযোগিতায় গানটি দখল মুক্ত হয়। এ-বিষয়ে বিস্তারিত ‘দীন শরৎ ও তাঁর গান মানবমঙ্গল’ বইয়ে আমি উল্লেখ করেছি। তবে এই গানটির রচয়িতা কে? তার সমাধান হয়নি! তখন (২০১৭ সালে) এই গানটি নিয়ে আমার মাঝে কোনো প্রশ্ন তৈরি বা আগ্রহ সৃষ্টি হয়নি। তবে সুমঙ্গল শীল ও সংগ্রাহক আবু হান্নান গানটির বিষয়ে আমাকে কিছু যৌক্তিক তথ্য দিয়েছিলেন, যা আমি তখন আমলে নেইনি। আজ এ-বিষয়টি বিশেষভাবে স্মরণে এলো, যা আমার কাছে মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই প্রতীক্ষা কেন্দুয়া, সাজিউরা চলে যাওয়া।
চিশতী বাউল রচিত একটি গানে শুনেছি : ‘যদি থাকে নসিবে, আপনি আপনি আসিবে…’। কিছুদিন পর একটি বিশেষ কাজে আমি ঢাকায় অবস্থান করছি। এমন অবস্থায় মোহাম্মদ রোমেলের (কবি ও ফিল্মমেকার) ফোন :
সজল দা কেমন আছেন? ফরহাদ ভাই হাওরে যেতে চান আপনাকে নিয়ে। সুর্যব্রত সংগীত ও গোষ্ঠ গান শুনতে চান।
এ-বিষয় নিয়ে পূর্বেও বেশ কথাবার্তা হয়েছে। আজ আমার কাজের সাথেও মিলে গেছে। তাই আমি সায় দিলাম। যথারীতি পরদিন কবি ও ভাবুক ফরহাদ মজহার-এর গাড়িতে চড়েই সরাসরি ঢাকা থেকে হাওরের উদ্দেশে রওয়ানা হই। তারা আমাকে ঢাকার একটি আবাসিক হোটেল থেকে নিয়ে যান। আমরা সরাসরি মধ্যনগর যাই। টানা দু’দিন কাটে গান-আড্ডায়। ধামাইল, সূর্যব্রত, গোষ্ঠ, ললিতা, লীলাবালী, কীর্তন, যাত্রাসহ নানা বিষয়। ফরহাদ মজহারের সাথেও কথা হয় ‘চেনা গান অচেনা গীতিকার’ বিষয়টি নিয়ে। তিনি এ বিষয়ে আমার উপর বিশ্বাস রাখেন।

মধ্যনগর থেকে আমরা গাড়ি নিয়ে সরাসরি চলে চাই নেত্রকোনা জেলার মদন উপজেলা রেস্টহাউজে। সংগ্রাহক আবু হান্নান ভাই যাবতীয় ব্যবস্থা করেন। তারপর উকিল মুন্সির পৈত্রিক নিবাস খালিয়াজুরী উপজেলাধীন নূরপুর বোয়ালী গ্রামে। তারপর জালালপুর, বরান্তরসহ অনেক উকিলভক্তদের কাছে। ভাবশিষ্য বাউল শিল্পী নুরুজ্জামান হাওরের হিজলতলায় বসে আমাদেরকে উকিল মুন্সির গান গেয়ে শোনান। সর্বশেষ বাউল দীন শরৎ নাথ এর জন্মভিটা সাজিউরা গ্রামে সুমঙ্গল শীলের বাড়ি যাই। তাঁর সাথে অনেক আলোচনার পর একপর্যায়ে আমি গুরুত্ব দেই দীন শরৎ নাথের নামে দখলে দেওয়া সেই জনপ্রিয় গান নিয়ে। সম্পূর্ণ গানটি হলো :
গুরু উপায় বলো না
জনমদুঃখী কপাল পোড়া
গুরু আমি একজনা।
গিয়েছিলাম ভবের বাজারে
ছয় চোরাতে করলো চুরি
গুরু ধরলো আমারে,
চোরায় চুরি করে খালাস পাইল গো
ও গুরু আমায় দিলো জেলখানা।
শিশুকালে মইরা গেল মা
গর্ভে রাইখা পিতা মরল
গুরু চোখে দেখলাম না,
আমায় কে করিবে লালন পালন গো
ও গুরু কে দিবে যে সান্ত্বনা।
ভাটির ময়ালে এই গানটি দীন শরৎ রচিত বলে কেউ কেউ দাবী তোলেন, কিন্তু গানটি বাউল দীন শরৎ নাথ রচিত নয়। কারণ দীন শরতের গান ভণিতাযুক্ত। তাছাড়া তাঁর জীবদ্দশায় প্রকাশিত কোন বইয়ে বা পাণ্ডুলিপিতেও বহুল প্রচারিত ও জনপ্রিয় গানটির উল্লেখ নেই। দীন শরৎ নাথের প্রশিষ্য সুমঙ্গল শীলও (প্রত্যক্ষদর্শী) তা নিশ্চিত করেন। তাছাড়া সত্তর-আশির দশকে শিল্পী মলয় কুমার ভৌমিক ‘পুত্রবধু’ ছবিতে প্রথম এই গানটি গান, যেখানেও গীতিকারের উল্লেখ নেই। তাহলে এই চেনা গানটির রচয়িতা কে? উত্তরে প্রত্যক্ষদর্শী সুমঙ্গল শীল, আবু হান্নান, সুলতান ফকির, ভূপালকৃষ্ণ রায় ও হারাণ দেবনাথ দাবী জানান, গানটি প্রভাত বাউল রচিত।
এখন প্রশ্ন আসে,—কে সেই প্রভাত বাউল? প্রভাত বাউল (১৯১৮-১৯৭১)। গ্রাম : কমুরা; উপজেলা : কেন্দুয়া; জেলা : নেত্রকোনা। তিনি জন্মান্ধ ছিলেন। গর্ভে রেখে পিতা ও শৈশবে মাতা মারা যান। সুকণ্ঠি শিল্পী ছিলেন। একতারা বাজিয়ে দীন শরৎ নাথ, জালাল উদ্দীন, রশিদ উদ্দীন ও দ্বিজদাসের গান গাইতেন। কবিয়াল সাধু সরকার ছিলেন তাঁর গানের গুরু। প্রত্যক্ষদর্শী সুমঙ্গল শীল১, আবু হান্নান২, সুলতান ফকির৩, ভূপালকৃষ্ণ রায়৪ ও হারাণ দেবনাথ৫ এ-গানটির গীতিকার প্রসঙ্গে বলেন :
এই গানটি (গুরু উপায় বলো না…) ছিল তাঁর (প্রভাত বাউল) জীবন-ঘনিষ্ঠ, জীবন থেকে নেয়া সুর-শব্দ দিয়ে রচিত১। …তিনি এই গানটি গাইতে গাইতে কেঁদে কেঁদে বুক ভাসাইতেন৪। …প্রতিটি আসরেই এই গানটি গাইতেন। তিনি দীন শরতের গান বেশি গাইতেন বিধায় সকলের ধারণা এই গানটিও দীন শরৎ রচিত২। তাঁর কণ্ঠ ছিল ভালো, গাইতেন বেশি, লিখতেন না৩। তাঁর গুরু সাধু সরকার ছিলেন খুব পণ্ডিত ব্যক্তি। অনেকের ধারণা গুরুর সহযোগীতা নিয়েই তিনি এই গানটি লিখেছেন। অথবা গুরু লিখে দান করেছেন৫।
যাইহোক, এই গান (গুরু উপায় বলো না…) নিয়ে আপাতত এরচেয়ে বেশি মীমাংসা পাওয়া গেলো না। বরং নতুন করে জানা গেল-যে,—অন্য আরও একটি গানের রচয়িতা নিয়ে দীন শরৎ নাথ ও রাধারমণ দত্ত পুরকায়স্থের মাঝে প্রচার ও প্রকাশ নিয়ে বিভ্রান্তি আছে। গানটি হলো :
বলে না ছিলাম গো প্যারী পিরীতি করিস্ না।
পিরীতি বিষম জ্বালা প্রাণেতে বাঁচ্বে না\
সাধ করে প্রাণ সঁপে দিলে ঘটল্ বিড়ম্বনা।
হিয়ার মাংস কেটে দিলে পর কি হয় আপনা\
বনে থাকে ধেনু রাখে শ্যাম কালিয়া সোনা।
অবলা নারীর মরম রাখালে জানে না\
কত না বুঝাইয়া ছিলাম শুইনেও ত শুন্লে না।
এখন নয়নের জল হল সম্বল সার হইল ভাবনা\
দীন শরৎ বলে প্রেম করিলে পাইতে হয় যাতনা।
তাই ভাবিয়া প্রেম না করে আছে বা কয় জনা\
গো প্যারী পিরীতি করিস্ না।
দীন শরৎ নাথ রচিত ‘দীন শরতের বাউল গান’ গ্রন্থে রাই ও বৃন্দার প্রশ্ন-উত্তর পর্বে বৃন্দের উক্তি হিসেবে লেখকের জীবদ্দশায় উক্ত গানটি প্রকাশিত (১৯৩৪) হয়েছিল। অপরদিকে রাধারমণ দত্ত পুরকায়স্থ রচিত ‘রাধারমনের গান’ তপন বাগচী সম্পাদিত গ্রন্থে প্রকাশিত (২০০৯) গানটি হলো :
বলে না ছিলাম গো পিয়ারি ও তুই পিরিতি করিছ না
পিরিতি বিষম জ্বালা প্রাণে তো বাঁচবি না\
বনে থাকে ধেনু রাখে শ্যামকালিয়া সোনা
অবলা রমনীর মরম রাখালে জানে না\
কতই না বুঝাইয়া ছিলাম শুনেও শুনলে না
নয়নের জল হইল সম্বল সার হৈল ভাবনা\
রাধারমণ বলে প্রেম করিলে পাইতে হয় লাঞ্চনা
তাই ভাবিয়া প্রেম না করিয়া আছে বা কয়জনা\
এই দুটি গান নিয়ে সুমঙ্গল শীলের সাথে বিস্তর আলোচনা হয়। তাঁর দাবি, গানটি দীন শরৎ নাথ রচিত। স্বপক্ষে যুক্তি এই-যে, দীন শরৎ নাথের ‘রাই-বৃন্দা’ ধারায় গানটি বৃন্দার উক্তি। যেখানে রাইয়ের উক্তির (প্রশ্ন-উত্তর পর্বের ধারা) সাথে বৃন্দার উক্তির যৌক্তিক মিল আছে। তাছাড়া গানটি দীন শরৎ নাথের জীবদ্দশায় ‘দীন শরতের বাউল গান’ গ্রন্থে প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে রাধারমণ দত্ত পুরকায়স্থ-এ গানটি সম্পাদিত ও তুলনামূলক সংক্ষিপ্ত। তাছাড়া এই ধারার গান রাধারমণের রচনায় নাই বললেই চলে।
যাইহোক, একপর্যায়ে উক্ত গানটি আমরা স্থানীয় শিল্পী নুরুল ইসলামের কণ্ঠে শুনি। তিনি একতারা বাজিয়ে ‘দীন শরৎ’ ভণিতা দিয়ে গেয়ে শুনান। তাঁরও দাবি, তিনি দীর্ঘদিন যাবত এই গানটি দীন শরৎ নাথের কথা ও সুরে গাইছেন।
কেন্দুয়া, মদন ও খালিয়াজুড়ি টানা দু’দিন মাঠ পর্যায়ে কাজ করে অবশেষে ফরহাদ মজহার চলে গেলেন ঢাকা। আমি তাঁকে নেত্রকোনা বিদায় দিয়ে কমরেড, গবেষক যতীন সরকারের সাথে সাক্ষাৎ করে মোহনগঞ্জ কবি ও গীতিকার রইস মনরম-এর বাসায় রাত্রিযাপন করি। গান-আড্ডা হয়। শিল্পী আলোক জাহানের কণ্ঠে রইস মনরম রচিত গান শুনলাম নিশিরাত পর্যন্ত। পরদিন সঙ্গীতজ্ঞ, রবীন্দ্র সংগীত শিক্ষক শৈলজারঞ্জন মজুমদারের বাড়ি মোহনগঞ্জ থানাধীন বাহাম গ্রাম ঘুরে বাড়ি ফেরার পথে ধর্মপাশা এসে দেখা হয়ে যায় ওস্তাদ ছানাগোপাল সরকারের সাথে। তিনিও আমার মতো অ-কাজে বের হয়েছেন। সাংসারিক দায় নেই। পথে যেতে-যেতে তাঁর সাথে গান-গীতিকার নিয়ে দীর্ঘ আলাপচারিতায় আমি ঘটনার পিছনে ফিরে যেতে বাধ্য হই। মনে পরে যায় পূর্বের আরও কিছু মাঠকেন্দ্রিক অভিজ্ঞতার কথা।

২০১৪ সালে মধ্যনগর হাওর উৎসবে এসেছিলেন বিশিষ্ট নৃত্যশিল্পী লুবনা মরিয়ম। উৎসবে পরিবেশিত ধামাইল গান ও নৃত্য নিয়ে তিনি বেশ আগ্রহ প্রকাশ করেন। যার ফলস্বরূপ ঢাকাস্থ ছায়ানট মঞ্চে একটি একক ধামাইল আসরের আয়োজনের আহবান জানান আমাকে। আমি সম্মতি দেই এবং সে-অনুযায়ী প্রস্তুতি নেই। সুনামগঞ্জ জেলার ‘হাপাধা’ সভাপতি শাহ আলম শেরুল ভাইয়ের সহযোগিতায় বিভিন্ন গ্রাম থেকে শিল্পী নিয়ে একটি বিশেষ ধামাইল দল গঠন করি। এই কাজটা বেশ কঠিন ছিল। কেননা ঢাকাতে সবাই যেতে চায় না। তাছাড়া ব্যয়বহুল ও কষ্টকর জার্নি তো আছেই। লোকগানের শিল্পী কৃষ্ণচন্দ্র ছন্দ (ষোলঘর, সুনামগঞ্জ) আমাদের গানের মহড়ায় সহযোগিতা করেন। মহড়ার ফাঁকে ললিতা, লীলাবালী নিয়ে কথা হয় তাঁর সাথে। তিনি ললিতা সম্পর্কে ওস্তাদ ব্রজসুন্দর দে এর কথায় সুর মিলিয়ে বলেন :
ধামাইল গান রাধা-কৃষ্ণের প্রেম-বিরহ নিয়ে বেশি জনপ্রিয় ও প্রচলিত। ধামাইল গানে রাধা-কৃষ্ণ বা রাধা-কানু বা রাই-শ্যাম ও বৃন্দা-বিশখা যেমনভাবে ব্যবহার হয়েছে, ললিতাও ঠিক তেমনভাবে ব্যবহার হয়েছে। গানের গীতিকার ললিতা নাও হতে পারে। যেমন : ‘আমার গলার হার খুলে নে, ওগো ললিতে…’ এই গানে ললিতা গীতিকার নয়; রাধার সহচরী। যেখানে রাধা তাঁর আক্ষেপ-অনুরাগের কথা প্রকাশ করছেন। তবে জলভরা এ-গানে (আমরা ভইরে আইলাম শীতল গঙ্গার জল…) ললিতার বিষয়টি ভিন্ন।
ধামাইল গানে নানাভাবে ললিতার ব্যবহার আছে। গায়ের বধূগণ গান রচনা করে ভণিতায় ললিতার নাম দিয়েছেন এমন বাস্তবতা অনেকে জোর দিয়ে বলেছেন। বিশেষ করে রাই-সখি ধারায় জলের ঘাটে যে-সকল ধামাইল গান জনপ্রিয়, তার বেশিরভাগ জিজ্ঞাসা বা উপমা ললিতা কেন্দ্রিক। যদিও আমরা জানি রাধার সবচেয়ে প্রিয় সখি বৃন্দা। বৃন্দার কাছে রাধার আক্ষেপ জানিয়েও ধামাইল গানে বেশ উল্লেখ আছে। যেমন :
আমার প্রাণ যায় প্রাণবন্ধু বিহনে ওগো বৃন্দে…।
রাই-সখি ও রাই-শ্যাম, এই দুই ধারার ধামাইল গানের মধ্যে রাই-শ্যাম ধারার গানে বৃন্দার ব্যবহার বেশি। যা কেবল বৃন্দাবন কেন্দ্রিক। জলধামাইলে বৃন্দার ব্যবহার নেই। লোকগানের শিল্পী কুমকুম ছন্দ (কৃষ্ণচন্দ্র ছন্দ-র মা) রাধার সখি বৃন্দা প্রসঙ্গে বলেন :
বৃন্দার কারণেই জংলা অইছে প্রেমের বৃন্দাবন। বৃন্দাবনে রাধা-কৃষ্ণের প্রেম কাহিনী নিয়া ধামাইল গানের অন্ত নাই। বৃন্দাবনে রাধা-কৃষ্ণের যত গান আছে তার বেশির ভাগ গানেই… বৃন্দা। আর জলের ঘাটে… ললিতা-বিশখা। জলের ঘাটে রূপ, বাঁশি নিয়াও কত-কত গান। ধামাইল গানের রচিতকর্তাগণ সখিগণের উক্তি দিয়া গান লেখছে, রাধার প্রশ্ন নিয়া লেখছে, রাধার আক্ষেপ নিয়াও লেখছে। আগের এইসব গানে গীতিকারের নাম নাই। ধামাইল গানে ললিতা, বিশখা, বৃন্দা একটা অলংকার, একটা চরিত্র, কখনো-সখনো গ্রামের অবলা নারীগণ তারে (ললিতাকে) গীতিকার বানাইছে। আমরা এইডাই জানি।
আমি কৌতুহলী হয়ে তাঁকে প্রশ্ন করি :
—মাসীমা আপনি কি ধামাইল গান লিখছেন?
মাসীমা কালক্ষেপণ না করে উত্তর দেন :
: লেখছি না বাপু; মুখে মুখে বানছি। গীত। মুখস্ত রইছে। অন্নে বউ-ঝি’রা লেক্কিয়া রাখছে।
—আপনার গানে কি ভণিতা আছে?
: না বাপু, কোনু ভণিতা নাই।
—একটা গান কী শোনাবেন মাসীমা?
তিনি অঙ্গভঙ্গিতে সায় দিলেন। বয়সের ভারে নতজানু দেহটা যেন খোলস পাল্টিয়ে জোয়ান হয়ে উঠলো। দু’লাইনের বেশি আর গাইতে পারলেন না। আমরা হাতেতালি দিয়ে তাঁকে সম্মান জানালাম।
২০১৬ সালে ঢাকাস্থ ন্যাম ভবনে ধামাইল উৎসবের আয়োজন হয়। অনেক লেখক, গবেষক, শিল্পী ও গুণিজন নিয়ে আয়োজনের ডালা সাজানো হয়। এ-যেন ধামাইল গানের জাতীয় প্রোগ্রাম। ভালো পরিবেশনা দরকার। আয়োজক কর কমিশনার রঞ্জিত তালুকদার দায় দিলেন আমার ওপর। আমি ভাটি অঞ্চলের সুপরিচিত গানের শিক্ষক টিয়ন তালুকদারের শরণাপন্ন হই। তিনি তার পরিচিত বাঁশিয়াল ও ঢোলবাদক ব্যবস্থা করেন। শিল্পীদের নিয়ে মহড়ার আয়োজন করা হয় সুনামগঞ্জ জেলার মধ্যনগর উপজেলাধীন সাভারীপাড়া গ্রামে।
আমি সিলেট থেকে টিয়ন তালুকদারের মেয়ে সুকণ্ঠি ধামাইল শিল্পী সিলেটস্থ লিপি তালুকদারকে নিয়ে সভারীপাড়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হই। প্রথমে তাহিরপুর যাই। তখন ছিল বর্ষাকাল। তাই তাহিরপুর থেকে ট্রলার রিজার্ভ করে সরাসরি সাভারীপাড়া গ্রামের উদ্দেশ্যে ট্রলার ছাড়ি। হাতে সময় কম। অন্যান্য শিল্পীগণ মহড়ার জন্য অপেক্ষা করছেন। তাই হাওরের মাঝ বরাবর ট্রলার ছাড়ি। মাঝখানে টাঙ্গুয়ার হাওর। হাওরের মাঝামাঝি পৌঁছাতেই শুরু হয় ঝড়-তুফান। ট্রলারে আমরা মাঝিসহ চারজন। একজন ছোট্ট শিশু। মাঝির ছেলে। সে ট্রলারের পানি সেচ দেয়। হাওরে প্রচণ্ড ঢেউ উঠেছে। ট্রলার ডুবে যাবে এটাই নিশ্চিত মনে হচ্ছে। আমি ক্যামেরা বের করে মৃত্যুর আগ মুহূর্ত ভিডিও ধারণের চেষ্টা করি। এদিন বেঁচে যাওয়াটাই ছিল অসম্ভব। ভিডিও দেখলে এখনও ভয়ে হিম হতে হয়।
যাইহোক, ঝড়-তুফান উপেক্ষা করে সাভারীপাড়া অখিল তালুকদারের বাড়িতে পৌঁছাই। এদিন প্রতিকূল পরিবেশের জন্য গানের মহড়া হয়নি। পরদিন গানের মহড়া শুরুর পূর্বে অনুষ্ঠানের গান নির্ধারণ নিয়ে আলোচনা হয়।ছয়টি গান নির্ধারণ করা হয় : বন্দনা, জলভরা, রূপ, বাঁশি, কুঞ্জ ও মিলন। গান নির্ধারণ করতে গিয়ে গ্রামের মহিলাদের গীত-গান নিয়ে পাণ্ডিত্য দেখে আমি অবাক হই।

গানের মহড়া শেষে দীর্ঘ রাত জেগে গীত-গান নিয়ে কথা হয় খেলা রাণী সরকারের সাথে। তিনি ভালো গাইতে পারেন। ধামাইল ও গীত নিয়ে তাঁর নানা অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। বিশেষ করে ধামাইল ও গীত-যে নারী জাগরণে বিশেষ ভূমিকা পালন করে তা তিনি দৃঢ়ভাবে উচ্চারণ করেন। ললিতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন :
রাধা-কৃষ্ণ ও সখিদের নিয়ে অনেক ধামাইল গান রচিত হয়েছে। যেখানে অনেক গানে তাদেরকে গীতিকার বলে মনে হয়;—মূলত তা নয়। এগুলো জিজ্ঞাসা এবং আক্ষেপ অনুরাগের বহিঃপ্রকাশ।
এই বলে তিনি এমন কিছু গান আমাকে গেয়ে শোনান। যেমন :
‘কুঞ্জের মাঝে কে গো রাইয়ার কুঞ্জের মাঝে কে
এগো ললিতা বলে রাধার বন্ধু আইসাছে…। ’
‘শুন এগো প্রাণ ললিতা কী বলব বাঁশির কথা
ধ্বনি শুইনে গৃহে থাকা দায়…।’
‘শ্যাম বিচ্ছেদে অঙ্গ আমার জ্বলে গো ললিতে
আমি কী করিব কোথায় যাব শান্তি নাই মনেতে…।’
‘আগে না জাইনে গো ললিতে
কুল দিলাম কুল-নাশার হাতে…।’
‘ও প্রাণসখি ললিতে কী জন্য আসিলাম কুঞ্জেতে
বৃথা আমি বসে রইলাম প্রাণ-বন্ধের আশাতে…।’
‘শোন গো সখি ললিতে
আমার কৃষ্ণ প্রেমের লাঞ্চনা
বন্ধে আমার দুঃখ বুঝলো না…।’
‘ও বিশখা গো
আমার মত জনম দুক্ষী নাহিগো সংসারে
রসিকচান্দে প্রেমডোরে বান্ধিয়াছে মোরে…।’
‘বিশখা গো শোন শ্রবণে
ও নিশাতে বন্ধুয়ার বাঁশিয়ে আমায় ডাকে কেনে…।’
‘ও বিশখা সই গো,
কই গো আমার মনমোহন কালিয়া…।’
‘ও প্রাণ বিশখে ললিতে গো কহগো মোরে
মোহনবাঁশি কে বাজায় ওগো কালিন্দির তীরে…।’
‘ললিতা বিশখা শ্যামকে আনিয়া দেখা
প্রাণ যায় বিচ্ছেদেও জ্বালায়…।’
‘দূতী কইও গো বন্ধুরে
এগো কাইল নিশিতে একা কুঞ্জে রইয়াছি বাসরে…।’
‘যাও গো দূতী পুষ্পবনে পুষ্প তুলো গিয়া
আমি সাজাইতাম বাসরশয্যা প্রাণবন্ধুর লাগিয়া…।’
‘বৃন্দে গো আয় গো বৃন্দে শ্যামকে দেখাও আনিয়া
মনপ্রাণ সদায় পুড়ে তাহার লাগিয়া…।’
‘চন্দ্রার কুঞ্জে বৃন্দা দূতী শ্যামচান্দেও উদ্দেশে যায়
কও গো চন্দ্রা সত্য করি রাধার বন্ধু হরিল কোথায়…।’
‘সুচিত্রে আমি কার লাগিয়া গাঁথিলাম গো
বিনাসুতে বিচিত্র মালা…।’
গান যেন তাঁর থামছিলই না! এক পর্যায়ে রাতের আধিক্যতায় তাঁর কণ্ঠ বিরতি হয়। তারপর শুরু হয় শেষ কথা। শেষকথায় ধামাইল প্রসঙ্গে তিনি বলেন :
ধামাইল গীতাশ্রয়ী গান। আগের গানে ভণিতা নাই। ধামাইল গানের কেউ একক জনক-টনক নাই। গীতনি মেয়েরাই ধামাইল গানের জনক-জননী। রাধারমণের গান মেয়েরা গেয়ে ধামাইলে রূপ দিছে বা জনপ্রিয় করছে। রাধারমণ ধামাইল হিসেবে গান লিখেননি। তিনি রাধা-কৃষ্ণবিচ্ছেদে গান লিখছেন। অনেক বাউল গানও এখন ধামাইল ঢংয়ে গাওয়া হয়।
কথায় কথা বাড়ে, মন্থনে বাড়ে ননী, কথায় কথায় রাইত পোহায়, যদি কথা জানি। খেলা রানী তালুকদারের কথা-গান যেন থামছেই না। কখনও সাধু, চলিত, কখনওবা কথ্যভাষায়। মনে হচ্ছে যেন শৈশবে শোনা রেডিওতে সেই ‘নিশুতি’ গানের আসর চলছে। তবে এখানে বিজ্ঞাপন বিরতি নেই। শুধু ধামাইলের কথকতা;—কত গান। এক পর্যায়ে আসে লীলাবালীর কথা। এ প্রসঙ্গে তিনি সাফ বলে দিলেন :
শুনো! একটা স্পষ্ট কথা কই। এখন ‘মহলা’ ঢঙের গানই বেশি। আসল গান কয়জন লেখতে পারে।
আমি বললাম : মহলা ঢং কীরকম? তিনি জবাব দিলেন :
একটা গানকে অনুকরণ করে আরেকটা গান লেখা। গানের আশয়-বিষয় মেজাজ-মর্জি সব ঠিকই থাকে। মাঝে মাঝে শব্দ বদল হয়। অবশ্য, গীতে মহলা নিয়মের প্রচলন আছে। লোকাচার, বর-কৈন্যা কিংবা বিষয়-আশয় ভেদে আমরা মহলা গীত গাই। যেমন—ওই-যে তুমি একটু আগে কইলা সেইম-সেইম দুইটা গানের কথা! একজনে লেখছে—‘মথুরার-ই সময় গেলো গৈয়া রে ও সুজনও নাইয়া।’ আরেকজনে লেখছে-—‘আমি ভাবছিলাম কি এই রঙে দিন যাবে রে…।’ এইডা মহলা রীতি।
আমি অবাক হয়ে বললাম : অহ! আচ্ছা! এই তাহলে মহলা গীতের রীতি। তাহলে অন্য একটা মহলা গীত শুনান তো?
তিনি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে দম নিয়ে একটু পান মুখে দিয়ে চুনমাখা আঙুল নাড়াতে নাড়াতে মহলা গীতে টান দিলেন। রাতের নীরবতা যেন আচমকা জেগে উঠল। তিনি গাইলেন :
ভালা কইরা বাজাও ঢুল গ ঢুলিয়া
ভালা কইরা বাজাও ঢুল। (দিশা)
খাইতে দেব খৈলসা মাছের ঝুল গ ঢুলিয়া
খাইতে দেব খৈলসা মাছের ঝুল।
খাইতে দেব বোয়াল মাছের ঝুল গ ঢুলিয়া
খাইতে দেব বোয়াল মাছের ঝুল।
খাইতে দেব পাটা-খাসির ঝুল গ ঢুলিয়া
খাইতে দেব পাটা-খাসির ঝুল।
শুইতে দেব কৈন্যার মায়ের কোল গ ঢুলিয়া
শুইতে দেব কৈন্যার মায়ের কোল।
শুইতে দেব কৈন্যার কাকির কোল গ ঢুলিয়া
শুইতে দেব কৈন্যার কাকির কোল।
শুইতে দেব কৈন্যার জেডির কোল গ ঢুলিয়া
শুইতে দেব কৈন্যার জেডির কোল।
চাউল দেব কড়ি দেব বাজানির উশল গ ঢুলিয়া
ভালা কইরা বাজাও ঢুল গ ঢুলিয়া
ভালা কইরা বাজাও ঢুল। (মহলা)
গীতের দুই-তিনটি পদ গেয়েই তিনি বললেন :
এই গীতের শেষ নাই। চলতেই থাকে। লাচারী। গীতনিবৈনাইনরা এই গীত গাইতে গাইতে জিরায়, চা-পান খায়। ছোটুতায় এই গীত গাইয়া আসর ধইরা রাখে।
কথার ফাঁকে আমি তখন মূল কথায় ফিরে এসে তাঁকে প্রশ্ন করলাম : তাহলে লীলাবালীর সাথে মহলা গীতের সম্পর্ক কি? তিনি রহস্যের হাসি হেসে উত্তর দিলেন : আছে! আছে! এই ব্যপারে ভালা জানৈন আমার মাসীমা তার কাছে যাও। সব উত্তর পাইবা। এই বলে তিনি চিন্তায়-মননে কী যেন খুঁজতে লাগলেন! মুহূর্তেই যেন আবার পেয়েও গেলেন। সামনে-পিছে নিজের দেহটাকে দেয়ালঘড়ির দণ্ডের মত তালে তালে দোল দিয়ে দরদ দিয়ে গাইলেন :
লীলাবতী লীলাবতী রসের যুবতী সই গো
কী দিয়া সাজাইব তোরে…\
ক্ষীর নদীর জল দিয়া
স্নানও করাইব সই গো
কী দিয়া সাজাইব তোরে…\
গেরানে সাবান দিব বিষ্ণুর তেল দিব
অঙ্গে মাখাইয়া সই গো
কী দিয়া সাজাইব তোরে…\
ভুল্লিয়া গেছি! কবে-কোনদিনের গান! সব কী আর মনে থাকে! মাসীমার কাছে যাও, সব পাইবা। পাকিস্তানের গানও আছে;—ভারত হলো পাকিস্তান, নমঃ নমঃ হে পাকিস্তান।
যতই সময় গড়াচ্ছে। গানের ডালপালা যেন আমাকে ক্রমান্বয়ে মায়ামৃগের মত গহীনে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। কারো চোখে ঘুম নাই। বিরক্তি নাই। চা-মুড়ি খাওয়া হয়েছে বেশ কয়েকবার। রাতও প্রায় শেষ। একটু না ঘুমালে রাতের অমর্যাদা হয়। তাই কথার জাল টানতে টানতে আমরা যে-যার মতো ঘুমাতে গেলাম।

খেলা রাণী তালুকদারের কল্যাণে তাঁর মাসীর সন্ধ্যান পেলাম। মোবাইলে যোগাযোগের কোন সুযোগ নাই। তাই সরাসরি চলে গেলাম। এই গ্রামে আমারও মাসীর বাড়ি। তাই কিছুটা সুবিধা হল। কিন্তু মুশকিল হলো, তিনি (খেলা রাণীর মাসী) খুব রক্ষণশীল। কিছুই বলতে চান না। প্রশ্ন করলে, উত্তর জানা থাকলেও এড়িয়ে যান। কিন্তু আমি বুঝতে পারছি-যে তিনি এ বিষয়ে সমৃদ্ধ। দু’দিন থেকেও কোনো কাজের কাজ হলো না। একজন তো আমাকে বলেই বসলেন : তুমি এই গান নিয়া কোটি কোটি টেকা বেচবা! আর আমরা তোমারে মাগনা দিতাম?
কথাটা শোনে আমি মোটেও বিচলিত হইনি। কেননা এমন কথা বা তার চেয়েও অনেক অখাট্য কথা শোনার অভিজ্ঞতা আমার অনেক আছে। ধৈর্যও আছে। তাই হাসতে হাসতে তার মত করে বললাম : ধুরু বেডি মাসী; কেলায় কইছে তোমারে এইতা? আমার কথায় বা হাসিতে কাজ হয়নি। আমি-যে হাসি বিক্রয় করছি, এটা হয়তো তিনি বুঝে গেছেন। তাই তিনি তার আশপাশে বসা অন্যদের প্রতি দৃষ্টি বিনিময় করে আরও দৃঢ়তার সাথে বললেন : হুনছি হুনছি! এই গান নিয়া বই মানায়। পরে বেচে। তুমিও ত বই মানাও। তুমিও ত বেচও?
আমি নিজের ভেতরের কষ্টের হাসিটা কোনোমতে সামলিয়ে নিলাম। নীরব রইলাম। যেন তার কথাই ঠিক। এই সুযোগ পেয়ে তার কথায় সায় দিয়ে পাশে বসা একজন মুরুব্বী বিড়ির শেষ অংশ টানতে টানতে গান বেচাকেনার খবরাখবর ও ইতিহাস শুনিয়ে নানা উদাহরণ টেনে বললেন : সিনেমাতে একটা গান বেচলে বহুত টেকা পাওয়া যায়। সম্মানও আছে। কত জনরে দেখছি! ভাত খাওয়ার পয়সা নাই! পরে হুনি বাড়ি-গাড়ির মালিক।
এসব কথার যুক্তি খণ্ডানোর মত উপায় আমার জানা নেই, সমাজে এ-অবিশ্বাস বা বিতৃষ্ণা তৈরির কারণও আছে। তাই আনাড়ি হয়ে বসে রইলাম। তর্কজয়ের আনন্দে তাঁদের কণ্ঠস্বর একতরফা বেড়ে গেলো। তাঁরা জয়ী হলো। আলোচনা এখন আর দাঁড়িকমায় রইল না। কথা বাঁক বদল করতে করতে কালীদাস, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল হয়ে হুমায়ূন আহমেদ পর্যন্ত গড়ালো। অনেক খাট্য-অখাট্য আলোচনার পর মূল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠলো ‘ঘাটুগান’।
বিড়িটানা মুরব্বি ভালো ঘাটুগান গাইতে পারেন। তার কথায় মনে হলো এ নিয়ে তাঁর বেশ জানাশোনা। আমাকে আনাড়ি ভেবে মুরুব্বি নিজেকে জাহির করতে আমাকে এবার ঘাটুগানের জ্ঞান দিতে শুরু করলেন। আমি তাঁর অজান্তে মোবাইল রেকর্ড অন করে শ্রোতা হয়ে তাঁর কথা ও জানাশোনার তারিফ করতে শুরু করলাম। গানে ও কথায় জমে উঠলো আসর। সত্যি সত্যি আমি যেন গবেষণা নামক মায়ামৃগের নাভিতে কস্তুরি পেয়ে গেলাম। এ-যেন ছিল আমার কাছে ‘মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি।’
. . .

. . .
আগের পর্ব :
হাওরজীবন-৩ : চেনা গান অচেনা গীতিকার — সজল কান্তি সরকার
হাওরজীবন-২ : চেনা গান অচেনা গীতিকার — সজল কান্তি সরকার
হাওরজীবন-১ : চেনা গান অচেনা গীতিকার — সজল কান্তি সরকার

লেখক পরিচয় : ছবি অথবা এই লিংক চাপুন
. . .



