দিওয়ান-ই-মাখফি : জেব-উন-নিশা
মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেব-দুহিতা রচিত গজলের বাংলা ভাষান্তর

বন্দিনী এক রাজকন্যার প্রেমাশ্রু : অনুবাদকের কৈফিয়ত
মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেব-দুহিতা শাহজাদি জেব-উন-নিশা (১৬৩৯-১৬৮৯) ছিলেন একাধারে কবি, সংগীতজ্ঞ, দানশীল ও ধর্মাচারী। তাঁর জননী, ইরানের বিখ্যাত সাফাভি রাজবংশের কন্যা দিলরুশ বানু বেগম।
শিল্পসাহিত্যের প্রতি মোগল রাজবংশের অনুরাগ উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিলেন এই মহিয়সী নারী জেব-উন-নিশা। মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বাবর ছিলেন উচ্চমানের কবি। ফার্সি ও তুর্কি, দুভাষাতেই কবিতা রচনা করতেন তিনি। কবিতা নির্মাণের নতুন এক শৈলীও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বাবর। বাবরপুত্র মির্জা কামরানও ছিলেন কবিতা রচনায় সিদ্ধহস্ত। সম্রাট আকবরের জীবনে কাব্যচর্চার সুযোগ যদিও আসেনি, কিন্তু শিল্পসাহিত্যের গুণীজনেরা তাঁর রাজসভা অলঙ্কৃত করে রাখতেন। সম্রাট জাহাঙ্গীর তাঁর স্মৃতিকথা নিজেই রচনা করেছিলেন। সম্রাট শাহজাহানও তাঁর ভ্রমণলিপি ও আইন বইয়ের অনেকাংশ রচনা করেছিলেন। মোগলদের এই সাহিত্যপ্রেম ভারতবর্ষের শেষ সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ পর্যন্ত প্রবহমান ছিল। আওরঙ্গজেব ছিলেন কট্টর সুন্নি। কাব্যচর্চার দিকে না গেলেও আইন বিষয়ক গ্রন্থ রচনা করেছিলেন তিনি। তাঁর রচিত পত্রাবলীর রয়েছে উচ্চ সাহিত্যমূল্য।
সাত বছর বয়সে জেব-উন-নিশা কোরান মুখস্ত করেছিলেন। তাঁর কণ্ঠ ছিল সুললিত। অনেকটা রূপকথার মতো ছিল তাঁর জীবন। মোগল রাজবংশের পারিবারিক কাহিনী অনেকটা ধোঁয়াশা। সম্ভবত ব্যর্থ কটা প্রেম এসেছিল তাঁর জীবনে। কিন্তু কবিতায় সে-সবের স্বাক্ষর রাখা তাঁর জন্য ছিল আত্মহননের সামিল। ওগুলোকে তিনি আড়াল করেছিলেন পারস্যের দুই কিংবদন্তি, জামশেদ ও কায়কাউসের ছদ্মাবরণে। মোগলদের পারিবারিক রীতিনীতি অথবা কঠোর ধর্ম-শৃঙ্খল এড়িয়ে প্রকৃত প্রেমিকদের নামোচ্চারণ তাঁর পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। কারণ মোগলদের রাজ্য লিপ্সা মিটাতে তাদের পূর্বপুরুষ চেঙ্গিস খানের আইন ‘যাসা’ ত্যাগ করে আরবদের কট্টর শরিয়া আইন ততদিনে নিয়ে নিয়েছিল তাঁর উত্তরসূরিরা।
জেব-উন-নিশার সব গজল ও রুবাই সুফি ভাবধারায় রচিত। দারা শিকোর পুত্র সুলেইমান শিকোর সঙ্গে তাঁর বিয়ে ঠিক করেছিলেন সম্রাট শাহজাহান। কিন্তু আওরঙ্গজেব ওটা হতে দেননি। দারা শিকো ছিলেন শিয়া ও উদারপন্থি।
তুর্কিস্তানের মেয়েদের পোশাক অনুসরণ করে ও ভারতবর্ষের জলবাতাস উপযোগী করে আঙ্গিয়া-কুর্তির প্রচলন করেছিলেন জেব-উন-নিশা। ওটার ডিজাইনার ছিলেন তিনি। বর্তমানে জনপ্রিয় সালোয়ার-কামিজ এসেছে ওটা থেকে। লাহোর বাগিচা ও দিল্লির অনেক বাগবাগিচার নকশাকার ও নির্মাতা ছিলেন তিনি।
এই মহিয়সী নারীর জীবনের শেষ বিশ বছর কাটে কট্টর আওরঙ্গজেবের কারা-প্রাসাদের অন্তরালে। মাত্র পঞ্চাশ বছর বয়সে এই বিদুষী নারীর দেহাবসান ঘটে। প্রায় পাঁচ হাজার পঙক্তি রচনা করেছিলেন জেব-উন-নিশা। ১৭২৪ সনে, তাঁর মৃত্যুর পঁয়ত্রিশ বছর পর, ভারত ও পারস্যে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কিছু গজল ও রুবাই উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল। ওগুলো থেকে চারশ বিশটি রুবাই ও গজল নিয়ে সঙ্কলিত হয়েছিল ‘দিওয়ান-ই-মাখফি’ নামের কবিতা-সঙ্কলনটি। এটা এখন দুষ্প্রাপ্য।
উইজডম অব দ্য ইস্ট সিরিজের দ্য দিওয়ান অব জেব-উন-নিসা বইটি হতে প্রথম পঞ্চাশটি গজল ফার্সি থেকে অনুবাদ ও সঙ্কলন করেছিলেন মাগন লাল ও জেসি ডানকান ওয়েস্টব্রুক। ১৯১৩ সনে ওটা প্রকাশ করেছিল লন্ডনের নর্থব্রুক সোসাইটি। যৌথভাবে বইটা সম্পাদনা করেছিলেন এল ক্র্যানমার-বিং ও এস এ কাপাডিয়া। এ বইটাও এখন আর পাওয়া যায় না। গবেষণা ও একাডেমিক প্রয়োজনে ওটার ফটোকপি সংগ্রহ করা হয়তো সম্ভব হতে পারে। সম্প্রতি অবশ্য সেক্রেড টেক্সটের সাইটে ভূমিকাসহ পঞ্চাশটি গজলের ভাষান্তর সুলভ হয়েছে।
জেব-উন-নিশা নিজেকে ‘মাখফি’ নামে প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর এই কলম-নামের অর্থ : ‘লুকিয়ে যে-জন।’ মাখফির পঞ্চাশটি গজল বাংলায় ভাষান্তর করতে যেয়ে অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিলাম। পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষার সাহিত্যে কত যে মণিমুক্তো ছড়িয়ে রয়েছে সেসবের খুব কমই আমাদের নাগালে আসে। সবদিক থেকেই ভাগ্যবান ইউরোপীয়রা। ওদের ভালো একটা বই, সিনেমা, চিত্র প্রভৃতির সবকটা মাধ্যমের যেমন ভোক্তা রয়েছে, তেমনি রয়েছে পৃষ্ঠপোষক;—রাষ্ট্রীয়, সামাজিক এবং এমনকি ব্যাক্তি পর্যায়েও। বাকি বিশ্বের অবস্থাটা শাব্দিক অর্থেই শোচনীয়। বাংলাদেশের শিল্পী সাহিত্যিকদের অবস্থা সম্ভবত একেবারে তলানীতে।
যাহোক, দিওয়ান-ই-মাখফির গজলগুলো দশটি পর্বে সাবস্টেকে আমার নিজস্ব লেখালেখির সংগ্রহশালায় তুলে রেখেছি পাঠকের কথা ভেবে। থার্ড লেন স্পেস তার থেকে তাদের পছন্দমাফিক কুড়িটি এখানে বেছে নিয়েছেন। বাকিগুলো পড়তে চাইলে সাবস্টেক-এ গমন ও সাবস্ক্রাইব করার সবিনয় অনুরোধ থাকছে পাঠক বরাবর। মাগন লাল ও জেসি ডানকান ওয়েস্টব্রুক-এর ভাষান্তরে ব্যবহৃত ফরমেট অনলাইনে বজায় রাখা সম্ভব হয়নি।
বিনয়ের সঙ্গে জানিয়ে রাখে, আমি কবি নই যেহেতু,—কবিতায় ভাষার প্রবহমান ছন্দ ব্যবহারে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি, যেটি ব্যাকরণ মানে না। ভাষার গতিছন্দের স্বাধীনতা এখানেও নিয়েছি। শব্দকে প্রচুর রদবদল ও চরণের স্বাভাবিক লয়কে নিজের মতো ভাঙাগড়া করি গতিছন্দ ধরার খাতিরে। প্রাগৈতিহাসিক মনে হতে পারে, তবে এতেই ভাষান্তর প্রাণ পায় বলে আমি বিশ্বাস করি। পাঠক তা বিবেচনায় নিবেন আশা করি। আপনাদের সামান্য উপভোগ দিয়ে থাকলেও আমার পণ্ডশ্রম সার্থক মনে করব। পাঠক-আগ্রহ যদি থাকে, ভবিষ্যতে পঞ্চাশটি রুবাই অনুবাদের ইচ্ছে রয়েছে। — কামাল রাহমান
. . .

গজল-১
শুরু করি তোমার নামে, যার করুণা
ঝরে ওই মেঘ হতে, দেখি যাকে আমি আমার বাগানের
গোলাপকলিটির মতো!
শুরু করি তোমার ভালোবাসার স্তুতি দিয়ে
উদ্ভাসিত হয়ে উঠুক আমার এ কবিতাগ্রন্থটি অপার মহিমায় তোমার।
তৃষ্ণার্ত এ হৃদয়,
আমার শরীর ও আত্মা, তোমার ভালোবাসা পাওয়ার জন্য
মনসুরের মতো এক দিওয়ানা; মাটির ঢেলা আমার এ শরীর,
সশব্দে ঝঙ্কার তোলে ওরা। এর ধূলিকণাগুলো তোমারই অংশ, তুমি হলে পূর্ণ,
আমার এ শরীর অংশত ওই পূর্ণতা, তোমারই অন্তর্গত ওটা।
তোমার ভালোবাসায়
মুখর ঢেউগুলো মহাপ্লাবনের নৌকোটির উপর আছড়ে পড়ে,
মৃত্যুশীতলতায় জড়ানো ওগুলো, এমনকি নবি নূহও ভাসিয়ে রাখতে
পারবে না তোমার ভালোবাসায় নিমজ্জমান ওই নৌকোটি
যদি না তুমি ওপরে উঠিয়ে আনো ওটাকে।
দাসেদের মতো
আনুগত্যে আমার প্রতি বয়ে যাবে অন্ধকারের
ওই কালো শক্তি;
তোমাকে প্রশংসার একটা শব্দও যদি গ্রহণ করো তুমি
নিজেকে তবে বাদশা সুলাইমান ভেবে নেব আমি।
চোখের কোণে টলটলায়মান অশ্রুর
ওই ধারাটি আর বইবে না তখন
যেমন করে আমার কণ্ঠ হতে ঝরে পড়বে না আর কোনো বিলাপ,
আমার হৃদয় হতে শুষে নেয়া হয়েছে
চুনিলাল রক্তের ফোটাগুলো
মুক্তোর মতো জড়িয়ে থাকবে ওগুলো আমার চোখের পাপড়িতে।
ধারণ করো আমাকে
হে মাখফি, অনুভব করো আমাকে তোমার ব্যাথার স্থৈর্য নিয়ে,
অন্তহীন ওটা, ছেড়ে দাও রাত্রিগুলো;
তোমার অনুরাগের প্রহরগুলোয় খিজির এসে যেন
উপনীত না হয়, দোলা-দেয়া
এক আনন্দ-বসন্ত নিয়ে।
. . .
গজল-৪
উন্মুখ হৃদয় আমার বিদ্ধ হয় এক নগ্নতার অনুশোচনায়
প্রলম্বিত এলোমেলো বাতাস যখন বয়ে আনে আমার ভেতর
এটার ডানায় তোমার উপস্থিতির সৌগন্ধ।
এবং এভাবে অপেক্ষা করি আমি আমার বিষাদরাত্রিগুলোয়,
যে-পর্যন্ত না আমার আহত দৃষ্টির ভেতর তুমি ছড়িয়ে দাও
সৌন্দর্য তোমার, আমার উন্মুখ চোখে আনন্দ-প্রশান্তি দেয়ার জন্য।
শান্তিধর্মের ভেতর দিয়ে অন্ধকার পৃথিবী দেখে আলোর নিশানা,
নিরাপদে হেঁটে যায়, অনুসরণ করে এটার কানুনগুলো,
ঈশ্বরের কাছে নত হয়ে আশা করে পবিত্র সম্ভ্রম।
ঈশ্বরের প্রতি, যিনি ক্ষমা করেন পাপীদের, এবং পরিচালনা করেন,
নিজেকে নির্দেশ্য তিনি, তথাপি যিনি পাঠ করতে পারেন
গোপনে লুকিয়ে রাখা অন্তর-কথা এবং উপলব্ধি করতে পারেন ওটার প্রয়োজনীয়তা।
হে পয়গাম্বর, জ্বলজ্বলে একটি মাত্র রত্নের মতো
সুন্দরতম স্বর্গের সর্বোচ্চ উষ্ণীষ,
তাকিয়ে দেখো মানুষের প্রয়োজনের প্রতি, এবং মিনতি জানাও ওদের জন্য।
তোমার শিল্প মুখোশ যার মধ্য দিয়ে আলো উজ্জ্বল হয়ে প্রতিফলিত হয়,
নাহ্, তুমি নিজেই এক বিশেষ স্বর্গীয় আলোকবর্তিকা
কখনো উপেক্ষা করে না কাউকে তোমার ওই উজ্জ্বল চোখদুটো।
. . .
গজল-৫
এখানে : ভালোবাসার পথ — অন্ধকারে ঢাকা,
দীর্ঘ ও ঘোরালো, প্রলুব্ধ করে এটার চতুর্দিকের প্রলোভন
তবু এগিয়ে চলে পুণ্যার্থীদের কাফেলা,
অতঃপর পায়রার মতো জড়িয়ে যায় পুষ্পজালে।
বলো দেখি, কি ওই দানা যা উড়িয়ে আনে পায়রাদের?
কপোলের ওই তিলটি কি এতই সুন্দর!
বলো দেখি, কি দিয়ে বোনা হয়েছিল ভালোবাসার ওই জাল
যা এক প্রেমিকের কোঁকড়ানো কেশে দোলা দেয়।
ভালোবাসার উৎসব ধরা রয়েছে এখানে।
পরিবেশিত হয় পানপাত্র, পান করো তুমি ওই মদিরা,
নিঃশেষ করো পিপেটির তলানি পর্যন্ত,
বিষাক্রান্ত হওয়ার ভয় করো না কখনো, ওটার আবেশ স্বর্গীয়।
কত সহজ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলা, অনুযোগ করা
এবং পৃথিবী কাঁদে এটার শোক প্রশমনে;
কিন্তু গর্বভরে তোমার হৃদয় লুকিয়ে রাখে তোমার ব্যথা,
এবং নীরবে পান করো তুমি তোমার শোকতাপের গরল,
এখানে আলোর উৎস, স্বর্গের প্রস্রবণ,
এখানে সনাতন সাবলীল লক্ষ্য;
নবী মুসা হতেও উজ্জ্বলতর তুমি, পর্বত হতে যখন
সে এসেছিল, ঈশ্বরের আলোয় উদ্ভাসিত হয়েছিল ওর মুখমণ্ডল।
রাতের মদিরা, সকাল পর্যন্ত ছড়িয়ে দেয়
এটার আবেশ, বিনিময়ে ওই সকাল এটার স্বপ্ন বিলিয়ে দেয় রাত্রিকে
এভাবে বয়ে যায় অন্তহীন ওই
সুখী হৃদয়ের আনন্দধারা।
কিন্তু, মাখফি, বলো তো আমাকে কোথায় ওই তুরীয় আনন্দের আতুরঘর?
কোথায় আমার বিয়ের ঘটকেরা? বিচ্ছিন্নভাবে
এখানে, আমার আত্মায় রাখা আছে ঈশ্বরের ভোজ,
আমার হৃদয়ের এই গোপন কুঠুরিতে।
. . .
গজল-৮
চকিত চাউনি তোমার, প্রিয়তম হে,
ঝরে পড়ে সুন্দরে, কোনো শব্দেই প্রকাশ-সম্ভব নয় ওটা;
তোমার প্রাচুর্যের বিপরীতে তোমাকে অর্ঘ্য দেয়ার জন্য
এজীবন খুবই সংক্ষিপ্ত আমার।
কত লজ্জাবনত ছিল পুণ্যবানদের ওই সমাবেশগুলো! কত
দুঃখপীড়িত ছিল ওদের অন্তর, যখন ওরা শুনেছিল
যে তোমার ভালোবাসার জন্য অস্থির হয়ে থাকা আগ্রাসী জাতিগুলো সবলে একটা ঝাঁকুনি খেয়েছিল।
আমার হৃদয় সেদিন বিচূর্ণিত হয়েছিল অসংখ্য টুকরোয়, ধ্বসে পড়েছিল আমার শোকের অশ্রুতে,
কিন্তু একজনের কাছে, যাকে তোমার চাবুক
আহত করেনি কখনো ওগুলো উপশমের জন্য।
তোমার পদতলে, হে উদ্ধত, প্রিয় আমার, আমি পেতে রাখি
আমার গর্বের ভ্রুযুগল,
তোমার হৃদয়ের এতটাই কাছে থাকি আমি, যেন এক পোশাক তোমার, কেন তুমি
বলো আমাকে, ‘তুমি এক অচেনা আগন্তুক?’
হে মাখফি, হেঁটে এগিয়ে যাও দৃঢ় পদবিক্ষেপে, যেমন এক মজনু
আমৃত্যু থাকে নিঃশঙ্ক, চিরদুঃখের উপত্যকায়,
পেঁচিয়ে বাঁধো কোমরবন্ধ তোমার নতুন ওই উৎসর্গের প্রতি,
তুমিই দিয়েছিলে ভালোবাসার ওই প্রতিশ্রুতি।
. . .

গজল-৯
কাজটি তোমার করে যাও তুমি, হে সাকি;
চাঁদের মতো মসৃণ এই গ্লাসটিতে ঢালো স্বর্গের
সোনালি সুধা, চকচক করে ওটা সকালের সূর্যের মতো,
গোধুলি-রং এই পানপাত্রটি হতে
উপচে ওঠে বুদবুদ, তারপর গড়িয়ে যায় গ্লাসটির শরীর বেয়ে,
ঠিক যেমন পূরবীর আকাশ হতে মেঘেরা দেখা দেয় রাত্রিশেষে।
শক্ত হাতে ধরে রাখো আমার ভাগ্য-বিড়ম্বিত হৃদয়টি
এত বেশি ভাঙা ওটা, এত বেশি ব্যথায় গলে-যাওয়া যে,
আমার চোখের পাপড়িগুলোর ভেতর দিয়েও অশ্রুধারার মতো বয়ে যেতে পারে ওটা;
তবুও কীভাবে বল তুমি যে আমি অংশী হতে পারি ওটার!
তারপরেও ছড়িয়ে ছিটিয়ে থেকে যায় পোড়ামাটির ভাঙা
টুকরোগুলো ওটার — আমি অপেক্ষা করি যে-পর্যন্ত না ওটা জ্বলে উঠে পুরোপুরি ছাই হয়ে যায়।
আগেই জানতাম আমি, অনেক অনেক আগে,
তোমার প্রতিশ্রুতিগুলো ছিল বিনাশের চেয়েও অনেক বেশি কিছু,
অন্তর হতে মুছে ফেলেছিলাম ওগুলো আমি।
কেন আমি জন্মেছিলাম শুধু তা জানার জন্য
পেরিয়ে এসেছিলাম একটা বয়স, সর্বোপরি অন্যদের পূর্ণ করার জন্য,
একটা অবিনীত ভালোবাসার জন্য ও একটা অকরুণ ভোগের জন্য!
অথচ সারাক্ষণ ধরে থাকি আমি তোমার আনন্দ;
কে জানে, মাখফি, কি নেমে আসবে তোমার ভাগ্যে?
হয়তো কোনোভাবে কেঁপে উঠবে পৃথিবীর দৃঢ় এই ভিত্তিভূমিটি।
মৃদুমন্দ যে সমীরণ বয়ে যায় এখন,
যদি এ শূন্য জীবনটাই হয় সবকিছু,
তাহলে আমাদের নিষ্ফলা বুদবুদটার অস্তিত্ব লুটিয়ে পড়বে শূন্যতায়।
. . .
গজল ১১
জাগো, ওঠো, হে আত্মা আমার, জাগো এটার বসন্তপ্রহরগুলোর জন্য;
নার্গিস ফুলেরা যেন বাতাসে ছড়াতে পারে ওদের স্বর্গীয় সৌগন্ধ,
সন্মোহনের নিবিড় নিমগ্নতায়, আরাধ্য পানপেয়ালাটি বয়ে আনুক
সাকি, মদিরায় প্রলোভন জানাতে সে জানে বটে।
অন্যদিকে ফিরে যেও না ওই পথ নিষিদ্ধ বলে, হে নিদয়া
প্রিয়তম আমার, তোমার চোখদুটো যেন তাকিয়ে দেখে
তোমার গর্বিত পায়ের নিচে পিষ্ট এটার বলীবর্দটিকে, একটুখানি
চকিত চাউনির জন্য তোমার যে বিলিয়ে দিতে পারে ওর প্রাণ!
কেউ কেউ প্রার্থনা জানায় কাবাঘরে, কেউ বা আবার মন্দিরবেদীতে,
কিন্তু মাখফি, ভাবো দেখি, ভেতরে তোমার কী গোপন
আনন্দ বয়ে চলেছে নিজের প্রতিমা ঘিরে তোমার,
এবং যেটি চিরভাস্বর তোমার অন্তরপ্রাকারে।
. . .
গজল-১২
অসংখ্য বন্ধু ছিল আমার, ওরা ভাগ করে নিতো
আমাদের সুখ ও দুঃখের দিনগুলো,
কিন্তু এখন ওরা নেই আর, বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছি আমি,
অনেক দূরে সরে এসেছি ওসব হতে।
ধুলোর নিচে ঢাকা পড়েছে
কায়কোবাদ এবং জামশিদের পানপেয়ালা,
নয়তো এ পৃথিবী পুনর্মূল্যায়ন করত ওদের,
দুঃখ বা আনন্দ — যা করেছিল ওরা, তার জন্য।
মরুবালির মধ্য দিয়ে এখন টেনে নিয়ে যাই আমাদের মলিন পা-দুটো,
ক্লান্ত হয়ে পড়ে ওরা,
এগিয়ে যাই তবু, অথচ পৌঁছাতে পারি না কখনো ওই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ভূমিতে
অথবা যেখানে যেতে চায় আমাদের হৃদয়।
হয়তো কখনো অনুসরণ করি আমি,
নিয়ে যায় যেখানে আমার প্রজ্ঞার পা-দুটো
এবং স্থাপন করে দৃঢ়ভাবে। এখন এই কণ্টকিত বন্ধুর পথ
মাড়িয়ে যাই আমি, হারিয়ে যাই তাঁর পোশাকের ভাঁজে।
কত হৃদয় ভেঙেছে, হত্যা করেছে কতজনে ওই তরবারি তোমার।
এবং হত্যা করে যাবে অনেক আরও!
তবুও আশীর্বাদ জানায় ওরা তোমাকে, নাকি ওরা অভিযোগ জানাবে
ঈশ্বরের কাছে, শেষ বিচারের দিনে।
যখন প্রার্থনাগৃহে ওরা প্রত্যাশা করবে তোমার বিগ্রহ, তোমার সদিচ্ছা,
তোমার পদক্ষেপগুলো হয়তো হবে তখন অনেক ধীর ও শান্ত
মাখফি, তোমার ভয় হবে খুব কম,
পাখিগুলোর উড়ে যাওয়া দূরত্বে হবে তোমার অবস্থান।
. . .

গজল-১৩
নিজেকে কেন তর্কে জড়াব আমি ওই সিনাই উপত্যকা নিয়ে
যেখানে ছড়িয়ে থাকে কোনো দিব্যজ্যোতি?
কোনো কারণ তো দেখাতে পারি না আমি, যদিও পৃথিবী অস্বীকার করে ওটা,
আমার আলোকিত হৃদয় নিশ্চয় জানে ওটা কি।
উত্তপ্ত হয়ে ওঠে আমার হৃদয়, হ্যাঁ, বিস্ফোরণ ঘটে ওখানে
ভালোবাসার অগ্নিশিখা যখন দাউ দাউ করে জ্বলে আমার ভেতর
বুকভরা তৃষ্ণায় ওটা কেবলি একবিন্দু জল,
নীলনদের প্রমত্ত প্লাবন হতে দেয়া।
এত গভীর পাপে নিমজ্জিত আমি — কখনও যেতে চাই না আমি ওখানে,
ওই মক্কানগরে, যেখানে ভিড় করে পুণ্যার্থীরা…
এমনকি ঈশ্বরের বন্ধুজন, আব্রাহামও যদি
আসে ওখানে নিয়ে যেতে আমাকে,
থেমে যাব আমি প্রজ্ঞার রাজত্বে, যেটা একান্ত আমারই,
থেমে থাকি আমি কার্যকারণের দোলাচলে :
ভালোবাসার স্থৈর্য আমাকে নিয়ে যায়
তোমার কাছ থেকে যোজন যোজন দূরে।
যখন আসি আমি জলের ধারে
থেমে যায় তোমার অনুগত ঢেউগুলো।
মুসার হাতের মশালের মতো
জয়োল্লাসে ওরা পথ দেখাবে আমার প্রজ্জ্বলন্ত হৃদয়কে।
যদিও নষ্ট দিনগুলো সব থেকে যায় আমারই কাছে। বঞ্চিত ওরা আনন্দ-উৎসব হতে,
নিমজ্জিত ওই যাতনা, কোনো অন্ত নেই ওটার,
ভাগ্য আমাকে নিয়ন্ত্রণ করে তোমার সবচেয়ে খারাপটি দিয়ে, তবু সেখানে থেকে যায়
সকল বন্ধুর চেয়েও অনেক বড়ো এক বন্ধু!
বলো আমাকে, মাখফি, এটা কি আমি, যে পাপ করে?
এটা কি ওই পাপ যা বয়ে বেড়াই আমি?
এটা কি আমার শরীরের পাপ, না আমার আত্মার,
যা রয়েছে অন্য কোথাও, এবং পাপ করে অন্য কোনোখানে?
. . .
গজল-১৫
ধরে রাখো ওই আগুন যা বারবার জ্বলে ওঠে আমার হৃদয়-গভীরে,
আমার দীর্ঘশ্বাসের প্রাবল্য ইন্ধন যুগিয়েছে ওটার প্রজ্জ্বলনে।
আমার এ দুর্বল দেহ অথবা এ মলিন ও ভঙ্গুর খাঁচাটি যেন টিকে থাকে, এবং
সজীব থাকে আমার আত্মা। অসহায় এ পাখিটির পাখাঝাপটানো যেন টিকে থাকে
ওই দূরে উড়াল দেয়া পর্যন্ত। পর্বতশীলা গলে যেতে পারে, এবং অশ্রু
বয়ে যেতে পারে, ওরা কি কখনও শুনতে পাবে আমার এ বিলাপ-মর্মর,
অন্ধকারের ভেতর হতে উৎসারিত আমার হৃদয়-দুর্বিপাকের সংকেত-ধ্বনি?
ওদের শব্দগুলো নির্দেশ দেয় ওই কাফেলাগুলোকে এ-সরাইখানা ছেড়ে যেতে।
ভালোবাসা! এত বছর ধরে শুধু বিলাপই করেছি আমি। ওটা ছিল কেবলি
এক স্বৈর-নিপীড়ন, কিন্তু কেউ তো শোনেনি আমার কণ্ঠনিঃসৃত ওইসব শব্দ,
শুধু অশ্রু জমেছে আমার চোখে, দেখো, কত তুচ্ছ আমি, তবুও কত গর্বিত,
কখনোই বসব না আমি এক দঙ্গল জনতার সঙ্গে, ওই দাতা হাতেম তাঈয়ের টেবিলে :
নিঃসঙ্গ রাতগুলোর ভেতর দিয়ে প্রত্যক্ষ করেছি আমি আমার ছেড়ে যাওয়া, একা থাকা,
সেখানে কখনও আসেনি কেউ আমার হৃদয়ে একবিন্দু ভালোবাসা দিতে
এবং নিষাদিত আমার রুধিরাশ্রুর প্লাবন ঠেকাতে, আঘাত-জর্জর হৃদয় হতে
আমার অকস্মাৎ অগ্নিলাভা নিঃসরণ, পরিত্যক্ত শরীর হতে বয়ে যাওয়া অনিঃশেষ বাণ :
তবুও আমার দুঃখযাতনা ঘোঁচাতে আশা জাগে এক মরীচিকার মতো, এবং
বিবর্ণ এ জপমালা বদলে যায় স্বর্গপুষ্প হতে আসা সৌরভে, ভালোবাসা
ধরে রাখে আমাকে ওইসব নির্দয় শেকলের বাঁধনে, তোমার প্রতি
আমার বিশ্বস্ততা : তোমার পায়ের নিচে, মার-খাওয়া এক কুক্কুরী,
গুটিয়ে থাকি আমি ও লেজ দোলাই তোমার ভালোবাসা পাওয়ার জন্য!
মাখফি, যদি তোমার দীর্ঘশ্বাসগুলো পৌঁছাতে পারত সমুদ্রক্রোড় পর্যন্ত
অথবা শীতলতম ও গভীর অতল অন্ধকারে, তবে আবার
জ্বলে ওঠা উচিত ছিল তোমার হৃদয় হতে প্রজ্জ্বলিত ওই অনির্বাণ শিখাটি।
. . .
গজল-১৭
পেয়ালার মদিরা আমার হারিয়ে ফেলেছে উৎফুল্লতা;
অস্তিত্বের বিশ্ব আমার পরিবর্তিত হয়েছে আবর্জনাস্তুপে,
প্রশান্তি-দেয়া সবুজ ঘাসেরা আর বেড়ে ওঠে না ওই আগাছা-জঞ্জালে,
জীবনের রঙিন বসন্ত আমার হয়েছে বিলীন, ছিল কত ক্ষণজন্মা ওটা!
আনন্দের সন্ধান করেছি আমি, অথচ কখনোই স্পর্শ করতে পারিনি
ওটার প্রান্ত; প্রসারিত হয়েছে শূন্য বাহু দুটো আমার, পায়নি
আলিঙ্গন, হয়তো বিবর্ণ ঘাসগুলোর চেয়েও অকিঞ্চিৎ ছিল আমার প্রার্থনা।
কিন্তু মাখফি, তাকিয়ে দেখো তোমার অন্তর-চোখে,
ওই প্রার্থনার চেয়েও অধিক, স্বর্গসুখ রয়েছে তোমার অপেক্ষায়;
যদিও ভালোবাসার পথপরিক্রমায় ক্লান্ত হয়েছে তোমার চরণদুটো,
কিন্তু নব-উদ্যম আসবে আবার তোমার কাছে, নতুন প্রত্যাশায়।
. . .
গজল-১৯
নিঃসঙ্গ হে, কখন
আবার দেখবে তুমি ওই বাগানের উজ্জ্বলতা?
বরাবরই এখন তোমাকে রাখো তুমি তোমার
ভেতরে, পবিত্র ও বিচ্ছিন্ন। তোমার হৃদয়-বাগানে যেন
দীর্ঘকালের খাঁচাবন্দী এক পাখি।
ভুলে যায় সে যে কখনও উড়তে পারত এবং শুনত
বুনো প্রজাপতিদের গান এবং আকাশে প্রসারিত পাখির ডানার আস্ফালন।
ওর ওই খাঁচাটিকে সে এখন বানিয়ে তুলেছে ওর পৃথিবী।
কোনো ভয় নেই বটে তোমার,
হৃদয়ের ভালোবাসার জালে ধরা থাকে
তোমার দ্রুত পৃথক হওয়ার তিক্ত ভাবনা,
তোমার ভালোবাসা কেবল তোমারই জন্য।
দুঃখ নিয়ে অপেক্ষা করি আমরা এবং ক্লান্ত হই, থেমে যাই
এবং প্রিয়মুখের ইচ্ছেগুলো দৃশ্যমান হয়
বৃথাই, তবুও আমাদের হৃদয়ে আশা জাগে
পুনর্জন্মের ওই সকালটির জন্য।
হায় হৃদয়, তপস্বী এক সন্তের বিশ্বাস হতে
একটুও কম নয় ওটা, জটপাকানো ওর শিরাগুলো
জড়িয়ে থাকে ওর নষ্ট হয়ে যাওয়া শরীরে,
পবিত্র কোনো সুতো যেমন আমরা ধারণ করি আমাদের মণিবন্ধে।
কী এমন ভাগ্য এক প্রেমিকের?
দুর্ভাগ্যের চুড়ো হতে কি নেমে আসবে ওর কাছে?
পৃথিবীর অলস খেয়াল চরিতার্থ করতে বরং
শূলে চড়াও ওকে!
কেন তবে অভিযোগ করো যে তোমার ক্লান্ত পা-দুটো
সারাক্ষণ টেনে বেড়ায় ভারী শেকল?
না, এমন ভারী বোঝা বয়ে বেড়ানো কখনোই ভালো মানায় না তোমাকে,
বয়ে বেড়ানোর জন্য অন্য অনেক কিছু শেখার আছে তোমার।
জীবন-যাতনা নিয়ে ওই দূর-পর্বতের চূড়ায় নিরাশ ও নিঃসঙ্গ ফরহাদ
যেমন ক্ষয় করে চলেছে নিজেকে,
করুণ মৃত্যুকে এখন স্বাগত জানায় সে, এবং কাঁদে মুক্তি পাওয়ার জন্য,
কাঁদো তুমিও, এবং প্রশমিত করো তোমার দুঃখযাতনা!
ওই কণ্টকিত আবর্জনা, যেখানে তোমার
কালশিটে পড়া পায়ের পাতা খোঁজে ওদের পথ;
এই বন্যতা, প্রবহমান রক্ত যা ছুঁয়েছে;
গোলাপ হতে যেমন বাতাসে ভেসে বেড়ায় সৌগন্ধ।
ভালোবাসা, আমি কি পরিতাপ করব
আমার গ্রীবা বেষ্টন করা তন্তু, ওই মৃত্যুর কাছে ফেঁসে যাওয়া
তোমার হত্যাদেশে? নাকি তোমার মহিমা লাভ করে
আমার যাতনা নিয়েও গর্বিত হব আমি?
হে মাখফি, যদি তোমার ভাগ্য
ওরকম হয়, কামনাবিহীন, নিঃসঙ্গ
বাস করো তুমি — পরোয়া কোরো না ওটার জন্য, কেবলি এক স্বপ্ন এ-জীবন,
এবং আমরা, যেমন মনে হয়,
যাপন করা এবং এগিয়ে যাওয়া শুধুই এক ভালোবাসার জন্য, এর বেশি কখনোই না,
তারপর ওটা দেয়ালে নৃত্যপর একটা ছায়া মাত্র।
. . .

গজল-২৩
আমার প্রেম-উন্মাদনার জন্য পুরো পৃথিবী আমার উপর
চাপিয়ে দিয়েছে অশেষ অবজ্ঞারাশি; যেন পালিয়ে যাই আমি ওই পথ হতে,
ওটার নিষ্ঠুরতা হতে রক্ষা পেতে যেন আমি খুঁজে নিই একটা আশ্রয়।
প্রাজ্ঞ এক ঋষি, গভীর প্রশান্তি নিয়ে আশীর্বাদ করেন
আমার আত্মাকে, এখানে, এই অমলিন বন্যতার এক কোণে,
আমার মলিন চোখদুটোর দেখার বাইরে!
কে ওই মানুষটি যে দম্ভ করে ভালোবাসার ভৃত্য হতে এবং
বাঁচিয়ে রাখে সুন্দর এ জীবনের মুহূর্তগুলো? হায়, কতই না তুচ্ছ
এ ভালোবাসা, সাহসী হয় না কি কখনও এটার পূজারীরা!
হৃদয়ের আয়নাটিকে রং করেছি আমি এক উজ্জ্বল বিভায়,
ওটা প্রতিফলিত করেছিল আমার মনোময় আনন্দের প্রতিফলন,
আমার একান্ত, সনাতন সুন্দর অভ্যর্থনা জানায় আমাকে, আমার দৃষ্টিকে।
যেভাবে ওই কিংবদন্তি ইয়াকুব অন্ধ হয়ে গিয়েছিল তার দুঃশ্চিন্তাগ্রস্ততায়।
পৃথিবীর এক পরিপূর্ণ অবয়ব উদ্ভাসিত এখন আমার হৃদয়-দুয়ারে;
চোখের কি ব্যবহার আর আছে নিজের দিকে তাকিয়ে দেখা ছাড়া?
. . .
গজল-২৫
কোনো এক বসন্ত-সকালে মুগ্ধচোখে যখন তাকাই আমি বাগানের দিকে,
ছোট্ট একটা বুলবুলির মতো প্রাণোচ্ছল হয়ে গেয়ে উঠি আমি আনন্দগানে
এবং যদি কখনও বাগানের ক্রুব্ধ মালিটি চাতুর-ফাঁদে ফেলতে
চায় আমাকে — প্রস্ফুটিত এক গোলাপের মতো হাসি আমি তখন।
ভোরের যে-হাওয়া বয়ে যায় বাগানের ভেতর দিয়ে তা কোনো
আনন্দ দিতে পারে না আমাকে, না ওটা দেয় কোনো উপভোগ আমার
চোখদুটোয়; যে-পর্যন্ত-না ওই সমীরণ ওটার পাখায় বয়ে আনে তোমার
সুললিত পোশাকের সুবাস, আমার অন্তরের ভেতর।
কিন্তু এখানে, বাগানের প্রবেশপথের সামনে, অপেক্ষা করি আমি;
কেনই বা নিজেকে এক হতভাগ্য মনে করব আমি?
তোমার দুয়ার-সুমুখে থেকে যাব আমি,
এবং আমার চোখের পাতা দিয়ে মুছে দেব ওটার ধুলো।
ছোট্ট এই পাখিটি, আমার হৃদয়, ধরা পড়ে আছে তোমার জালের ভেতর,
নিরাশ নিস্ফলতায় অস্থির পাখা দোলায় এখন ওটা, তবুও
তোমার কাছে বন্দি সে, কিন্তু কীভাবে এক বন্দিশালায় আটকে রাখতে
পারো তুমি ওর বুকের পাঁজর ভেঙে বেরিয়ে আসা ওই দীর্ঘশ্বাসগুলো।
ওহে, পৌরাণিক ফিনিক্স পাখিটি, বৃথাই প্রত্যাশা করি তোমাকে আমি
অনিয়ন্ত্রিত হৃদয় আমার ব্যাকুল হয়
তোমার জন্য; যদি কখনও তোমার পাখাদুটো
ঝুলে থাকত আমার আত্মার কল্পলোকের উপর!
তোমার শত্রু, যে আমাকে বিরত রাখে তোমার অনুসন্ধান হতে,
এমনকি, যদি তুমি কখনও প্রবেশ করো ওই দূর সমুদ্রের গভীরে
যখন আমার ক্রোধ হতে পালিয়ে যেতে চাও তুমি,
প্রজ্জ্বলিত আত্মা আমার খুঁজে পাবে, আবিষ্কার করবে তোমাকে।
হে বুলবুল, গান গাও তোমার প্রাণের, সুখে থাকো ওই বাগানের ভেতর,
এটা মাখফি, যে জয় করেছে তোমার জন্য বসন্ত ঋতুটি,
যা প্রস্ফুটিত হয় তোমার হৃদয়-গভীরে; কিন্তু তার নিজের
নিঃসঙ্গ পাখা দুটি রিক্ত শরতের মতো কেঁদে বেড়ায়।
. . .
গজল-২৭
পেয়ালার ওই সুধারসের কোনো প্রয়োজন নেই আমার :
বাগানের ভেতর নিঃশ্বাস-নেয়া ফুলের সুরভিমাখা
যাদুগন্ধ ও উপবাসকালের অবসন্নতা ও নির্বিষকরণ
বরং অনেক বেশি স্বর্গীয় আমার কাছে।
ক্ষমা করো তুমি আমাকে, প্রার্থনা করি আমি,
যে-আমি পান করিনি অমিয় পানশালার কোনো মদিরা, শুধুই
পান করেছি আমি ওই স্বর্গসুধার একটি মাত্র চুমুক, দিনে ও
রাতে, সারাক্ষণ তাড়া করে ওটা আমাকে।
আমার হৃদয় ধরে রেখেছে এক পাখি,
যে কখনও ডানা মেলে না উল্লাসে,
ভেসে থাকে না, গান গায় না ওই উঁচু আকাশে,
বন্দি থাকে ওটা চিরদুঃখের খাঁচার ভেতর, পুষ্পবিকশিত
একটা কানন দেখে সে শুধু ওর স্বপ্নের ভেতর।
কখনও কি কোনো অভিযোগ করব না আমরা
যখন প্রতিটা পরমাণু আমার শরীরের কাঁদে তোমার
নিপীড়নের বিপক্ষে, ক্রুদ্ধ যে-আকাশ আমাকে দেয়
কালো, অন্ধকার ও ব্যথাতুর দিন, তার বিরুদ্ধে?
দাও আমাকে, বিড়ম্বিত হে ভাগ্য আমার, ওই বর দাও আমাকে,
উৎফুল্ল একটা দিন দাও আমাকে, ছোট্ট একটা দিন, বসন্তের,
এমনকি বন্দি এই খাঁচাটির ভেতর থেকেও যেন আমার হৃদয় গাইতে পারে
বাগানের একটা পাখির মতো উল্লাসে : খুব শীঘ্র আসে মৃত্যু, জানো তুমি।
যদিও মনে হয় অনেক বেশি ভঙ্গুর ও দুর্বল আমার হৃদয়, তবু
করুণা করো না আমার শূন্য এ-হাতদুটোর জন্য আমাকে,
আমার আত্মাটি, উদ্ধত এই বাজপাখিটি এখনও বুকে ধারণ করি আমি
এবং আছে আমার ওই দুঃসাহস, যা সয়ে যেতে পারে যে-কোনো দুঃখদহন।
আর কতকাল, কত বছর, কারাপ্রাকারের ভেতর আমার নিঃসঙ্গ
মর্মপীড়া বয়ে বেড়াব আমি, পাব না কি পরিত্রাণ এটা থেকে,
ওই ইয়াকুবের মতো, যে
অন্ধ হয়েছিল বৃথা অশ্রুজলে?
যদিও ওই গর্বিত আত্মা আমার ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে, লুটানো হয়েছে ধুলোয়
ওটার হৃদয়বৃন্ত হতে, হয়তো বা ক্রুদ্ধ ওই হাতদুটো নিচে নামিয়ে আনতে
চেয়েছে আমার ভাগ্যের চাকাটিকে, কিন্তু জানি আমি, আমার উদ্ধত পা-দুটো
কোনো না কোনোভাবে পৌঁছে দেবে আমাকে, আমার অভীষ্টে, আমার লক্ষ্যে।
জীবনযাতনার মোহমায়া-কণ্টকিত পথচলায় ভালোবাসার পুণ্যার্থী,
হে মাখফি, এটাই হয়তো তোমার গর্ব, ভালোবাসার কল্পিত স্বর্গরাজ্যে
ওদের ক্লান্ত কাফেলাগুলোকে পথ দেখাতে তোমার পায়ের চলার শব্দ
ঘন্টাধ্বনি হিসেবে বাজে, ওদের নেতৃত্ব দিতে ওই কল্পলোকে।
. . .

I am the daughter of an Emperor, yet I have set my face towards poverty
This is what adorns my beauty, and my name is Zebunissa, the adorned of (amongst) women!
Zeb-un-issa in her own words: Image and Text Courtesy: theheritagelab.in
গজল-৩১
ধুলোয়, অসম্মানের নিচে চাপা পড়ে আছে
আমার মর্যাদা, সাদা চোখে যা দেখে পৃথিবীর মানুষেরা,
কিন্তু কেন আমি প্রকাশ করব লজ্জা আমার মুখমণ্ডলে,
কী সম্মান দিয়েছে আমাকে এ পৃথিবী!
অসহ বোঝার মতো আমার চিরদুঃখী শিরোপরে
স্তূপীকৃত আমার সময়গুলো, তবুও কাঁদিনি কখনও
বরং হেসেছি গর্বভরে; যত্নের কোনো ছোঁয়া নেই ওখানে,
নেই কোনো মায়াবী প্রলেপ আমার ভ্রুযুগলে।
দীর্ঘ, অতি দীর্ঘকাল ধরে একত্রবাস করে এসেছে দুঃখ আমার সঙ্গে,
অনুতাপ করিনি কখনও, নিত্যমজুরি করে গেছি বুনো হিংস্রতা নিয়ে,
নিয়ত যুদ্ধ করেছি নৈরাশ্যের বিরুদ্ধে। পালিয়ে যেতে দিয়েছি
ওটাকে : হা হা, এখন শেষ বয়সের এক রুস্তম আমি।
উদাসীন ভাগ্য আমার চরিতার্থ করেছে প্রতিহিংসা,
ওহে স্বর্গ হতে বয়ে আসা সমীরণ, বয়ে যাও আমার
উপর দিয়ে একটিবার, ইয়াকুবের মতো প্রত্যাশা করি আমি
তোমার ভালোবাসার পোশাক হতে ভেসে আসা সুগন্ধী।
. . .
গজল-৩৪
কেন এমন জমায়েতে প্রার্থনা করব আমরা যেখানে ডাকা হবে
শুধু বন্ধুদের এবং ওটা হবে মূলত সুরাপানের জন্য?
দেখো, এ ছলনাটি যদিও ধরে ফেলেছি আমি
এবং সর্বদা প্রার্থনা করি ও পান করি ঐশ্বরিক পেয়ালাটি হতে।
চেতনার করুণাধারাটি আমার শুকিয়ে গেছে,
অশ্রুতে আমার আর বয়ে যায় না কোনো দুঃখযাতনা
নিঃশ্চুপ হয়ে গেছে ওই হৃদয় আমার যা হাহাকার করত
অবিরাম, শান্ত হয়ে পড়েছে বাগানের বুলবুলিটি।
এখানে, যেমন করে পুণ্যযাত্রীদের পথ অতিক্রম করি আমরা,
আমরা পাই প্রণোদনার একটা আগুনে-মশাল
মানুষেরা দেখে না এটা, এত নিষ্প্রভ ওরা এবং অন্ধ,
ওরা বোনে না কোনো তন্তু ওদের প্রত্যাশার পোশাকের জন্য।
সৃষ্টির প্রথম দিনটিতে প্রত্যেকের কাছে দেয়া হয়েছিল
ওদের প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো, যার যার প্রাপ্য অংশগুলো,
কেন তবে চাইবে না তুমি ওই নিয়তি হতে আরও বেশি আনন্দ
যা আছে অন্যদের, অপেক্ষাকৃত কম বেদনা বয়ে বেড়ানোর জন্য।
হে মাখফি, তোমার পরামর্শের জন্য এসেছে সকলে,
আড়ালে রেখেছ তুমি ওদের গোপন, পৃথকভাবে,
কিন্তু কেন তোমারটি নয়, কেন নির্বাক রয়েছ ওদের নিমিত্তে
বলো না কেন তোমার হৃদয়ের গোপন কথাটি, নির্ভুলভাবে।
. . .
গজল-৩৬
কত কঠিন এটার পাঠ, হে আত্মা,
জীবনের বাধা এখানে এবং জীবনের বাইরে।
কাচকাটা হীরে ছাড়া একটা মুক্তোর
শরীর ফুটো করার মতো।
ফুল থেকে ফুলে উড়ে চলা কোনো পাখির কূজন
নয় ওটা, যেমন ওই বুলবুলিটি গায় ওর আনন্দগান;
ওর আবেগ, হ্যাঁ, এবং ওর উল্লাস হলো
আমাদের চিরচেনা এক পাগলের পথ জুড়ে আঁকাবাঁকা রেখা।
বুকভরা ব্যথা নিয়ে সাহসী থাকি আমরা,
চাইনে নিরাশা কখনও, অথবা কোনো আশা; এমনকি দীর্ঘ একটা
কালযাপন ওদের ছোট্ট দিনগুলোয়। হাত পেতে নিই যা ভাগ্য দেয় আমাদের
জুলেখার মতো নয় কখনও, অতীতের ডিমে অকারণ তা দিয়ে যাওয়া।
হে অসতর্ক মানুষটি, অকারণে অতিক্রান্ত তোমার
জীবনের বহুমূল্য সম্পদটি, হেলায় কেটে গেছে বছরগুলো তোমার
কিছুই আর অবশিষ্ট নেই ওগুলোর,
এখন কথা বলো তুমি অন্য কোনোদিনের শিশুদের মতো।
কতই না বৃথা ওই অশ্রু তোমার, মিছেমিছি ঝরাও এখন তুমি ওসব!
তোমার, তোমার অনুশোচনা এসেছিল অনেক দেরিতে;
ওরা এখন চাবুক দিয়ে ঝাড়ু দেয় তোমার চৌকাঠ,
দেখো এখন, মাখফি, প্রার্থনাগৃহটি কত নির্জন।
. . .

গজল-৪০
যদি আমার কালিমালিপ্ত হৃদয় হতে পর্দাটি
সরে যায়, এবং যদি পুরো পৃথিবী জেনে যায় আমার গল্পটি, যে
কীভাবে গোলাপকলিগুলো পুড়ে খাক হয়ে গেছে পরশ্রীকাতর আলোতে, ও
মিথ্যে অভিযোগে যে ওরা কম উজ্জ্বল, এবং
যদিও সারাটি দিন দীর্ঘশ্বাসের লাফিয়ে চলা আগুন
জ্বলে আমার দ্রুত ফুরিয়ে যাওয়া হৃদয়ের ভেতর, ওখান হতে এখনও
বয়ে যায় অপয়া বাতাস, এবং চারদিকে ছড়িয়ে দেয় ওটাকে,
আমার প্রদীপটি যে হায়, জ্বালানো হয়নি এখনও!
ভালোবাসার অসুখ ঘুরিয়ে দিয়েছে আমার মস্তিষ্ক,
নিদারুণ এক বেদনায় বাস করেছি আমি সমগ্র জীবন
তবে কেন আর পালিয়ে যেতে চাইব আমি এ যাতনা হতে?
দুঃখ আমার পরমাত্মীয়, আপনজন।
এমন অসুখী থাকার মধ্যে এখানে বাস করি আমি,
আমার এ নির্জন নীরব দুঃখ অধিকারে রাখি আমি,
জ্বলজ্বলে উজ্জ্বল ভালোবাসা কেমন করে থেকে যাবে
আমার সঙ্গে, এই বেদনার কারাগারে?
তাকিয়ে দেখো তুমি কখনও আমার জীবনপাতায় গাঁথা এ বইটির ভেতর।
কালিমালিপ্ত ওটার লিপিগুলো, বিবাদ ও পাপাচরণে কলুষিত।
যেন পুরো পৃথিবীর ঋণ অনুসরণ করে
চলেছে আমাকে সারাক্ষণ।
হে মাখফি, এই পানপাত্রটি অর্জন করবে তুমি
কোনো উল্লাস নয়, কোনো উপশম নেই তোমার ওই ব্যথা হতে;
রক্তের অশ্রু, যা প্রবাহিত হয় তোমার চোখ হতে, তা অস্পষ্ট হয়ে যাবে,
পূর্ণ করো এটা তুমি এখন কানায় কানায়।
. . .
গজল-৪৮
এত নিষ্ঠুর, নিদয় তোমার চোখ দুটো,
এমনকি ভোরের ললিত হাওয়াও উষ্ণ হয়ে ওঠে ক্রোধে,
কোমল কোনো আশ্বাস ছিল না ওটার নিঃশ্বাসে,
কেবলই মিইয়ে যায় ওটা, এবং মরে যায়।
খিজিরের মতো শক্তিশালী ও সুন্দর
যার আত্মা কঠোর ও অমর ওই বসন্তে,
জীবনের কুয়োটি তোমার উপাসনা করবে তা
প্রার্থনার পবিত্র শব্দ দিয়ে।
এক খলিফার প্রাসাদে জন্ম নিয়ে আর কেউই
এত উঁচু অবস্থানে পৌঁছেনি, যেমন তুমি,
তোমার আছে অপরূপ সৌন্দর্য যার সবটুকুই স্বর্গীয়,
পেরির অনুগ্রহ থেকেও বেশি সৌন্দর্যময় ওটা।
অতি দ্রুত বয়ে যায় জীবন তোমার, মাখফি,
দিনগুলো আরও বেশি করে খসে পড়ে তোমার হাত হতে;
ফিরিয়ে দিও না কোনো ক্লান্ত পরিব্রাজককে তোমার দুয়ার হতে
দিও ওকে ওই আনন্দ-উল্লাস, যতটুকুই আছে তোমার।
. . .
গজল-৫০
ওহো, আমার চোখদুটোর জন্য কালো সুরমার মতো আমি
কেবলই ওই ধুলো, যা হয়তো জমে ওঠে কারো অসুখী প্রাঙ্গণে,
অবশেষে নতজানু হয় ওর পায়ের পাতায় ওই চোখদুটোয় চুমো
দেয়ার জন্য, ওই দেবদূতদের মতো যারা বিশ্বাস স্থাপন করে অতীতে!
আমার আত্মার আছে বিদ্রুপ, যাতনা ভোগের চারদিকে
এটা পরিধান করে এক রাজার পোশাক, তারপর ওটা
দেয় ওর ভৃত্যদের, অনেক গর্বের সঙ্গে।
হে আমার শত্রু, যে অপেক্ষায় রয়েছ আমার পাশে,
আর কতকাল আনত হয়ে থাকব আমি তোমার ওই দণ্ডের নিচে,
এবং অতিক্রম করে যাব যন্ত্রণাকাতর ওই পথ যা আমার বন্ধুরা মাড়িয়ে গেছে?
ঝড়ো বাতাস উড়িয়ে নেয় আমার বাড়ির চারপাশ, ভেঙে যায় এটার প্রাচীর,
ঝঞ্ঝাবাতাসে দুলে ওঠে এটার গভীর ভিত্তিমূল।
ছোট্ট একটা পাখি আমি যে ঘরে উড়ে যায় বিশ্রামের জন্য, এবং
খুঁজে পায় যে ঝড়জলে তছনছ করে রেখেছে ওর জীর্ণ আবাসাটি।
বিকিয়ে দিও না তোমার আত্মার ওই অমূল্য রত্নটিকে এত অল্পমূল্যে, বন্ধুরা
কখনও সাহায্য করতে পারবে না তোমার হৃদয়ের সম্পদগুলো।
সকল গোলাপের রাজা তুমি হে, কৃপাশীল হও, দয়া রাখো
ওই বুলবুলটির জন্য, যার অশান্ত ঢেউ
পাগল করে তোলে ওকে, তোমার ভালোবাসায়
এমনকি রাজারাও, যারা বসে রাজাসনে
থামিয়ে দেবে ওদের রথ একটা পাগল-ফকিরের আলোড়নে।
আশীর্বাদপুষ্ট তুমি মাখফি: ঈশ্বর তোমাকে দিয়েছে
শব্দের মুক্তোরাশি; স্বর্গীয় সংগীতের রত্নরাজি, সুন্দরতম লুণ্ঠন
হতে মহাসমুদ্রের প্রাচুর্য, অথবা যেগুলো অন্যদের হতে অনেক ভিন্ন।
. . .

নির্দেশিকা : দিওয়ান-ই-মাখফি
আলেক্জান্ডার : ফার্সি কবিতায় আলেক্জান্ডার একজন অতিসৌভাগ্যবান চরিত্র, দারিয়ুস যেমন অতিদুর্ভাগা।
দিওয়ান: অনেকগুলি গজলের সমষ্টি। এগুলো আক্ষরিকভাবে সাজানো। প্রথম গজলটি শুরু হয় ফার্সি ভাষার প্রথম অক্ষর দিয়ে, দ্বিতীয় গজলটি দ্বিতীয় অক্ষর দিয়ে এবং এভাবে, অক্ষরক্রমে দিওয়ান বা গজলসমষ্টি এগিয়ে যায়।
ফরহাদ : প্রাচ্যের গল্প-গাথা, গান, কবিতা প্রভৃতিতে এক চিরন্তন প্রেমিকপুরুষ। তাঁর প্রেমিকার নাম ছিল শিরিন, অর্থাৎ সুমিষ্ট যে-জন। ষোড়শ শতকে শিরিন ছিলেন সম্রাট খসরুর স্ত্রী। ফরহাদ ছিলেন একজন খ্যাতিমান ভাস্কর। পারস্য সাম্রাজ্যের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছিল তাঁর সুখ্যাতি। সম্রাট খসরু প্রতিপক্ষকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য এক অভিনব কৌশল অবলম্বন করেন। ফরহাদের প্রেমিক সত্তাটিকে অন্যদিকে প্রবাহিত করার জন্য একটা অসম্ভব কাজের পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি। শিরিন তাঁর জন্য চেয়েছিলেন একটা দুধের নহর, শাব্দিক অর্থে “স্বচ্ছ জলের প্রবাহ”। একটা অনতিক্রম্য বিশাল পর্বতের অপর পার্শ্বে ছিল একটা স্বচ্ছ জলের উৎস। খসরু ফরহাদকে শর্ত দিয়েছিলেন যে তিনি যদি ওই পর্বত কেটে ওই স্রোতধারাটিকে শিরিনের জন্য এপাশে এনে দিতে পারনে তাহলে শিরিনকে তাঁর জন্য দিয়ে দেয়া হবে। ওই শর্তে রাজি হয়ে ওই অসম্ভব কাজটি শুরু করনে ফরহাদ এবং কঠোর পরিশ্রম করে ওটার শেষ প্রান্তে এসে উপস্থিত হন। ওই খবর খসরুর কানে গেলে দূরভিসন্ধিমূলকভাবে তিনি ফরহাদের কাছে রটিয়ে দেন যে শিরিনের জীবনাবসান হয়েছে। এ-খবর শোনার পর ফরহাদ আত্মহত্যা করেন। অম্লান প্রেমের স্মারক হিসেবে দুধের ওই নহর এখনও পারস্যের হামাদান ও হুলওয়ান পর্বতের মাঝ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে চলেছে।
হাতিম তাঈ : মুসলমান-পূ্র্ব ইয়েমেনের একজন বিখ্যাত দাতা। কথিত আছে যে তিনি কারও অনুরোধ এড়িয়ে যেতেন না। কোনো একজন তার মাথাটি চাওয়াতে ওটাও তিনি দিয়ে দেন ও মারা যান।
হেজাজ : আরবের সবচেয়ে বড় মরুভূমি।
জামশেদ/ জামশিদ : পৌরাণিক রাজা। খ্রীস্টপূর্ব অষ্টম শতকে তিনি পেস্দাদ সাম্রাজ্যের অধীশ্বর ছিলেন বলে উল্লেখ রয়েছে। সম্রাট দারিয়ুস নির্মীত ঐতিহাসিক পার্সিপোলিস নগরীর সৌন্দর্যবর্ধন ও বিস্তার ঘটানোর জন্য বিখ্যাত তিনি। তাঁর শাসনামলটি পারস্যের প্রাচীন ইতিহাসে স্বর্ণযুগ হিসেবে খ্যাত। কথিত আছে যে ওই সময়টাতে রোগ-ব্যাধি, জড়া ও মৃত্যু থেমে ছিল। স্বর্গ হতে দেবতা সিরাউস নেমে এসেছিলেন তাঁর কাছে এবং একটা অলৌকিক পোশাক ও মন্ত্রপূত কোমরবন্ধ উপহার দিয়েছিলেন। মূসার মতো স্বর্গীয় আলোকপ্রাপ্ত হয়েছিলেন তিনি এবং আলবোর্জ পর্বত হতে তাঁর নেমে আসার সময় জনতা আকাশে দুটো সূর্য দেখতে পেয়েছিল। তাঁর অঙ্গুরীয় ও সিংহাসনের ছিল অতিলৌকিক ক্ষমতা। যখন তিনি তাঁর সাতটি বলয়বিশিষ্ট পানপাত্রের মধ্য দিয়ে তাকাতেন তখন পৃথিবীর কোথায় কি ঘটছে তা তিনি দেখতে পেতেন। কিন্তু এক সময় তাঁর ভেতর অহঙ্কার জন্ম নেয় এবং তিনি ঈশ্বরকে ভুলে যান। অতঃপর তাঁর প্রজারা বিদ্রোহী হয়ে ওঠে ও তাঁকে সিংহাসনচ্যূত করে। এরপর তিনি শত বছর ধরে পৃথিবীময় ঘুরে বেড়ান ও নির্বাসিত জীবন কাটান। অবশেষে অনুতপ্ত হন তিনি এবং অসীম যৌবনপ্রাপ্ত হয়ে রাজ্য ও ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করেন।
কায়কোবাদ : সেলজুক সাম্রাজ্যের একজন দুর্ধর্ষ সম্রাট। অসংখ্য যুদ্ধজয় ও বিলাসবহুল প্রাসাদ নির্মাণের জন্য বিখ্যাত।
খিজির : চির বসন্তের দেবদূত।
লেইলা ও মজনুন : আরব্য-প্রেমকাহিনীর দুই বিখ্যাত চরিত্র। জামি, নিজামি, হাতিফি প্রভৃতি বিখ্যাত কবিদের কবিতায় এ-প্রেমিকযুগল বিশেষভাবে উল্লেখিত। মজনুনের প্রকৃত নাম কায়েস। প্রেম-উন্মাদনার জন্য তাকে মজনুন নামে ডাকা হতো, যার অর্থ পাগল মানুষ। মজনুনের পিতা ছিল একজন গোত্রপ্রধান। প্রতিবেশী লেইলার পিতাও ছিল এক গোত্রপ্রধান। আরও প্রভাবশালী এক আরবের সঙ্গে লেইলার বিয়ে হয়ে যাওয়ায় মজনুন দিওয়ানা হয়ে যায় ও মরুভূমির পথেপ্রান্তরে ঘুরে বেড়াতে থাকে। অবশেষে ওখানের পশু ও পাখিদের ভালোবাসার গোপন কথাটি জানিয়ে জীবন কাটিয়ে দেয়।
মনসুর : মনসুর আল হাল্লাজ, নবম শতাব্দীর একজন সাধুপুরুষ। ঈশ্বরপ্রেমে তিনি এতটাই দিওয়ানা হয়েছিলেন যে নিজেকেই ঈশ্বরের অংশ হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন। তৎকালীন শাসক মনসুরের ওই দাবীর অন্তর্নিহিত অর্থ বুঝতে পেরে বা না পেরে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেয়।
ফিনিক্স : পৌরাণিক পাখি। ককেশাস পর্বতমালায় দীর্ঘদিন পরপর ওদের দেখা যেত। বিশাল আকার ও সৌন্দর্যের জন্য ওরা বিখ্যাত ছিল। তখন এটা বিশ্বাস করা হতো যে যদি কোনো ফিনিক্স পাখি কোনো মানুষের মাথার উপর দিয়ে উড়ে যেত বা পাখা মেলত তবে সে একটা রাজত্ব পেত। ফিনিক্স পাখিরা নাকি প্রায় সতেরোশ বছর বাঁচত এবং ওই সময়কালে পৃথিবীতে একটাই মাত্র ফিনিক্সের অস্তিত্ব থাকত।
রুস্তম : পারস্যের সিস্তান প্রদেশের রাজপুত্র ছিলেন এই বীরপুরুষ। মহাকবি ফেরদৌসি রচিত শাহনামা মহাকাব্যগ্রন্থের নায়ক ছিলেন রুস্তম। তাঁর বীরত্বগাথা সম্রাট হারকিউলিসের সঙ্গে তুলনীয় ছিল।
সাকি : মদ্য পরিবেশনকারী বা পরিবেশনকারিণী।
সুলেইমান : রাজা সোলোমোন। পরাক্রমশালী সম্রাট, মুসলমানদের বিশ্বাস অনুযায়ী যিনি পশু ও পাখিদের ভাষাও নাকি জানতেন।
ইয়াকুব : জ্যাকব, মুসলমানদের বিশ্বাস অনুসারে তিনি তাঁর প্রিয় পুত্র যোশেফকে হারানোর শোকে কেঁদে কেঁদে অন্ধ হয়ে যান। কথিত আছে যে যোশেফকে তাঁর ভাইয়েরা মিসরীয়দের কাছে বিক্রি করে দেন। পরে ইয়াকুব আবার তাঁর দৃষ্টিশক্তি ফিরে পান যখন যোশেফের পোশাক তাঁর কাছে আনা হয়।
ইউসুফ : যোশেফ, তাঁর সৌন্দর্যের জন্য তাঁকে অতিমানব হিসেবে কল্পনা করা হতো। স্বর্গের সুচারু প্রতীক হিসেবে একটা স্বর্গীয় আলোর বলয় তাঁকে ঘিরে থাকত। পৃথিবীর তাবৎ সৌন্দর্যের নয় দশমাংশ ছিল তাঁর একার!
জুলেইখা : মৌরিতানিয়ার রাজা তাইমুসের কন্যা ছিলেন অপরূপ সুন্দরী জুলেইখা। এক স্বপ্নঘোরে তিনি ইউসুফকে দেখতে পান ও তাঁর প্রেমে পড়েন। ওই স্বপ্নমধ্যে ইউসুফ তাঁর নাম বলেননি। শুধু জানিয়েছিলেন যে তাঁর আবাস মিসরে। অতঃপর জুলেইখা কল্পনার বশবর্তী হয়ে ইউসুফকে বিয়ে করার জন্য মেমফিসে যান। ভুলক্রমে তখনকার ফারাও-এর উজির আজিজ পোটিফারকে তাঁর স্বপ্নে দেখা স্বামী মনে করে বিয়ে করেন। ইউসুফকে সেসময় দাস হিসেবে বিক্রি করার জন্য মিসরে আনা হয়েছিল। জুলেইখা তাঁকে কিনে নেন। কিন্তু দেবদূত গ্যাব্রিয়েলের (মুসলমানদের কাছে জিব্রাইল) সাহায্যে ইউসুফ তাঁর পিতা জ্যাকবের মতো পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। জুলেইখা অবশিষ্ট জীবন এক দুঃখী রাজকন্যা হিসেবে অতিবাহিত করেন।
. . .
. . .
লেখক পরিচয়

কথাশিল্পী ও অনুবাদক কামাল রাহমানের জন্ম শেরপুর জেলায়। বেড়ে উঠেছেন তিতাস নদীর কোলে—কুমিল্লায়। পেশায় ব্যাংকার ছিলেন দীর্ঘদিন। প্রিমিয়ার ব্যাংক ট্রেনিং একাডেমির অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে ইস্তফা নিয়ে নেন। পাড়ি জমান যুক্তরাজ্যে। বর্তমানে সেখানেই কাটছে দিনরজনি। মাঝখানে লেখলেখি থেকে বিরতি নিলেও পুনরায় ফিরে এসেছেন নবীন তুর্কি হয়ে। লিখছেন নিয়মিত। কলম পেষায় পুনরায় সক্রিয় এই লেখক ‘সাবস্টেকে’ গড়ে তুলছেন নিজের লেখালেখির সংগ্রহশালা।
দীর্ঘ লেখক-জীবনে প্রখর বীক্ষণে ধরেছেন নিজের চারপাশ ও এর ভিতর দিয়ে তাঁর যাত্রার খুঁটিনাটি। উল্লেখযোগ্য আখ্যানের মধ্যে রয়েছে তাজতন্দুরি; মাটি মানুষ ও অরণ্য; লুসাইরূপসী ও জলের কান্না; জুম ও জোনাকির আলো; অরোরা বোরেয়্যালিস; বুনোবর্বর; দেবপাল; রাজাধিরাজ; রাজনন্দিনী পরিবিবি ও কিল্লাপুরাণ-এর মতো ব্যতিক্রমী সৃষ্টি। কামাল রাহমানের গল্পবয়নে স্মৃতিকাতরতা অনুষঙ্গ হলেও তা স্থানিকতায় কেবল আটক রাখে না নিজেকে। স্থানকালের প্রতি পরতে মিশে থাকে স্থানকাল ছাপিয়ে যাওয়া অনুভবও। শীতের আপেল ও কমলা গল্পগ্রন্থটি যার স্মারক হয়ে আছে। ‘সাবস্টেকে’ এর অনেকখানি পাঠের জন্য সুলভ করেছেন গল্পকার। এছাড়া স্টোনহেঞ্জ, ইঁদুর-এর মতো দুটি গল্পগ্রন্থও তাঁর স্বকীয়তা চিনিয়ে যায়।
অনুবাদে তিনি কুশলী বরাবর। এ-পর্যন্ত প্রকাশিত অনুবাদগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে, মেসোপটেমীয় মহাকাব্য: গিলগামেশ; পৃথিবীর প্রথম কবি এনহেদুয়ান্না রচিত মহাকাব্য, যেটি তাঁর অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য একটি কাজ। হায়াৎ মামুদের পর এটি সম্ভবত দ্বিতীয় ভাষান্তর এই সুমেরীয় মহাকাব্যের। এছাড়াও ইনান্না; প্রেম ও অন্যান্য; গোলাপ ও গোধূলি, ভালোবাসার রং সবুজ শিরোনামে ভিন্নস্বাদের অনুবাদের জনয়িতা।
তাঁর আগ্রহের বড়ো জায়গা জুড়ে আছেন রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথের জীবনদেবতা ও অন্যান্য প্রসঙ্গ নিয়ে বিরচিত প্রবন্ধ সংকলনে ধরেছেন ঠাকুরকে নিয়ে নিজের ভাবনা ও বীক্ষণ। ভালোবাসেন সংগীত ও সিনেমা।
. . .



