নেটালাপ - পোস্ট শোকেস

বই পড়া ও না-পড়ার ফজিলত-২

Reading time 10 minute
5
(32)
@thirdlanespace.com

. . .

বই কেন বিপজ্জনক বনসাই

আমার বক্তব্যের প্রতি-উত্তরে আপনার ব্যাখ্যা পাঠ করে ভালো লেগেছে বাবুল ভাই। আমার কথার স্বরটি আপনি ধরতে পেরেছেন, সেজন্য কুর্নিশ জানাই। তিন কিস্তিতে সাজানো প্রতি-উত্তরে আপনার আর্গুমেন্টে আরো কিছু দিক উঠে এসেছে। প্রশ্নও রেখেছেন আপনি। আমার মনে হয় এগুলো নিয়ে আরেক দফা ভাবতে পারি আমরা। কিস্তি ধরেই আগাই বরং…

আপনার লেখার পাঠ-প্রতিক্রিয়ায় বইকে আমি বিপজ্জনক উদ্ভাবন বলেছিলাম। যেটি আপনার ভাষায়,—বই পাঠ করা অথবা না-করা নিয়ে পাঠকমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিতে পারে। হ্যাঁ পারে;—কিন্তু তাতে অসুবিধা কেন ঘটবে সেটি বোধগম্য নয়।

দেখুন বাবুল ভাই, বিপজ্জনক শব্দটিকে আমরা ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয় অর্থে বিবেচনা করতে পারি। মানব-সভ্যতা বলতে আমরা এখন যা বুঝে নিয়েছি, সেখানে বই হচ্ছে জ্বালানি;—তাকে বাদ দিয়ে সভ্যতা টিকবে না। কেন টিকবে না তার ব্যাখ্যা আগেই দিয়েছি। আপনিও একে প্রলম্বিত করেছেন যথেষ্ট। সুতরাং এদিক থেকে বই নামধারী বিপজ্জনক বস্তুটি সভ্যতার জিয়নকাঠি, এবং আমাদের জন্য তার প্রয়োজন ইতিবাচক।

অন্যদিকে বইকে ব্যবহার করে যে-সভ্যতা আমরা জন্ম দিলাম, এর অশুভ পরিণাম নিয়ে বলে ফেলেছি বিধায় পুনরুক্তির প্রয়োজন দেখছি না। পরিণামগুলোকে যদি একত্র করি আমরা, সেক্ষেত্রে বইয়ের উপযোগিতাকে নেতিবাচক ভাবা ছাড়া পথ খোলা থাকবে না।

সময়টানে বই বস্তুটি আমাদের জন্য শাঁখের করাত হয়ে উঠেছে। তাকে বাদ দিয়ে সভ্যতার আয়ু দীর্ঘ রাখা সম্ভব নয়। বিপরীতে, তাকে সঙ্গে নিয়ে চলা বিড়ম্বনার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে হামেশা। বই এমন এক প্রপঞ্চে মোড় নিয়েছে, যার উত্তম কোনো বিকল্প আমাদের হাতে আপাতত নেই। পরিণাম স্বরূপ এটি অ-প্রাকৃত বিশ্বাসের মতো ক্ষতিকর একটি প্রপঞ্চে পরিণত হতে চলেছে। বইপ্রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে ধর্মবিশ্বাসের মতো কিছু, যেখানে আমরা একে সমীহ ও পূজার চোখে দেখি, কিন্তু ভালোবাসি কি?

এরকম একখানা বস্তুর দেখা যে-পায়নি, ধরুন টারজানের মতো অরণ্যমানব,—তাকে অধিক প্রাণবন্ত ও সজীব ভাবার অবকাশ থেকেই যাচ্ছে। এডগার রাইস বারোজ এই-যে টারজান নামক চরিত্রটি সৃষ্টি করলেন, এবং সভ্যতার সঙ্গে তার সংযোগ পাঠ করলেন অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে, তা এজন্য-যে,—বইয়ের ওপর গঠিত মানব সভ্যতার মর্মান্তিক পরিণাম থেকে তিনি আসলে বেরিয়ে যাওয়ার মতলব ভাঁজছিলেন মনে-মনে।

যদিও এটি এমন এক গোলকধাঁধা, এমন এক ল্যাবিরিন্থ, যেখানে প্রবেশ করার হাজার দুয়ার খোলা রয়েছে, কিন্তু নিষ্ক্রমণের দুয়ার পাবেন না খোঁজে। সুতরাং, বইকে আমি মহিমান্বিত করার পক্ষে নেই। মানব-সভ্যতার বিচিত্র ঝকমারি বোঝার সামগ্রী হিসেবে তার-যা গুরুত্ব।

Legenday Ornithologist Salim Ali; Image Source: Collected; Google Image

আমার কাছে বইয়ের দাম বলতে এটুকু। চা-বাগানের পাশে থাকি বলে প্রতিদিন ভোরে প্রচুর পাখির কূজন কানে আসে। এই কূজন বরং অনেক দামি ঠেকে এখন। তার মানে এই নয়, সেলিম আলীর মতো পক্ষীবিশারদের দ্য ইন্ডিয়ান বার্ডস বইটি পড়তে আমার কোনো অনীহা বা বিরক্তি থাকছে। তবে, এটি মাথায় রেখে পড়ব-যে, পাখিপ্রেমী সেলিম আলী আমাকে পাখির জগৎ চিনতে সাহায্য করছেন, এবং তথ্য হিসেবে এটি অত্যন্ত দামি। বইয়ের গুণগান ও স্তুতি কেবল এই পরিধিতে যৌক্তিক, কিন্তু সামগ্রিক অর্থে তাকে মহিমা দান ক্ষতিকর। আমি এরকম ভাবতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। অন্যদের সেখানে ভিন্নমত থাকতেই পারে।

মানুষ ঠেকায় পড়ে বই পড়ে;—এরকম একটি কথা আমাদের প্রথম দফার তর্কালাপে লিখেছিলাম। প্রতি-উত্তরে আপনি লিখেছেন,—‘বই পাঠ অনেকের কাছে পবিত্র অভ্যাস, অনেকের কাছে অভিজাত শখ। তবে যারা ঠেকায় পড়ে পড়ে, তাদের কাছে বই একধরনের যন্ত্রণার উৎস।’ পবিত্র অভ্যাস ও অভিজাত শখ তো সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই-এর মতো ভ্রমাত্মক ধারণা বাবুল ভাই। বড়ু চণ্ডীদাস উৎকৃষ্ট কবি হতে পারেন, কিন্তু তাঁর কবিজীবনে সবচেয়ে সস্তা লাইন ছিল এটি।

প্রকৃতিতে পূতঃপবিত্র কিছু নেই। যে-কণার সমাবেশে আবিশ্ব গঠিত ও জায়মান, সেখানে আছে গতি ও বলের খেলা। আছে এনট্রপি বা বিশৃঙ্খলা থেকে শৃঙ্খলায় শাসিত জড় ও প্রাণবান বৈচিত্র্যে ভরপুর বিশ্ব জন্ম নেওয়ার আশ্চর্য ঘটনা। আছে শক্তির অন্তহীন রূপান্তরের জান্তব উল্লাস। বইয়ে যার বিবরণ বিজ্ঞানীরা অবিরত দিয়ে চলেছেন।

জগৎসৃষ্টির গণ্য-কারণ কণাকে কি আমরা পূতঃপবিত্র ভাবব এখানে? সূক্ষ্মতর পর্যায় বা কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যা হাতে নিলে একটি ইলেকট্রনের আচরণকে অনিশ্চিত ভাবতে আমরা বাধ্য হই। ম্যাক্রো বা বৃহৎ পর্যায় যাকে নিউটনের বিশ্ব বলে বুঝে নিয়েছি, সেখানে আবার অন্য খেলা চলে! নিউটনের গতিসূত্র মেনে অযুত ইলেকট্রন কাঠামোয় শৃঙ্খলিত;—শঙ্খলাকে যেখানে পরম নিশ্চয়াত্মক লাগে দেখে। খোদ বইয়ের পাতায় এই-যে বিবরণ লিপিবদ্ধ দেখতে পাচ্ছি, একে যদি আমলে নেই তাহলে কোনোকিছুকে পবিত্র ভাবার নেই সুযোগ। কাগজে মোড়ানো বই যেসব কণা-সমাবেশে গঠিত, তাকে অগত্যা পূতঃপবিত্র ভাবার কারণ থাকে না।

যে-তথ্যকে আপনি উপভোগ্য পাঠ-অভিজ্ঞতার অন্তরায় ভাবছেন, এই তথ্যই কিন্তু বই লেখার মূল উদ্দেশ্য মিটায় সেখানে। পৃথিবীর মহত্তম সাহিত্য তথ্যের সমাবেশ ছাড়া অন্য কিছু কি? তথ্যের সবটুকু কোনো-না-কোনো উদ্দেশ্য সরবরাহ করছে। একটি কবিতা আর ক্যালকুলাসে অতএব তফাত সামান্য। দুটোই ধরিত্রীবক্ষে ঘটমানকে নিরিখ ও ব্যাখ্যা করে যায় ভিন্নছকে। ডেটা সেখানে মূলাধার। ডেটাকে ব্যাখ্যার তরিকাটি কেবল ভিন্ন।

কবিতাপাঠে পাঠকমনে রূপকাভাসের দোলা লাগে। অনুভূতি ও আবেগের জোয়ার বহে মনে। ক্যালকুলাস থেকে বুঝে নেই বিশ্বের গাণিতিক কাঠামো। আমরা কীসের জোরে করে খাচ্ছি, তার একখান দিশা দেখান জনাব নিউটন। জটিল যন্ত্রপাতি বানিয়ে নিতে পারি ঝটপট। কবিতা ও ক্যালকুলাস উভয়েই তথ্য-সরবরাহক। কবিতা পাঠ যাই, আর সরল-অঙ্ক বা অ্যালজেবরা অথবা জ্যামিতি… সবটাই কেজো। বইয়ের উদ্দেশ্য হচ্ছে কাজ উদ্ধার করা। কাজ যদি উদ্ধারিতে পারে, তবেই আনন্দ ও পরিতোষ জাগে মনে।

Harry Baker: A love poem for lonely prime numbers; Source: TED YTC

বইকে এভাবে ভাবতে পারলে ঝামেলা কমে। পূতঃপবিত্র ভেবে বন্দনা করলে বিপদ বাড়ে। আমরা বইকে কার্যত ধর্মগ্রন্থ করে ফেলি। একে এখন যত্ন করে রাখতে হবে, পড়ার চেয়ে ভক্তি আর পেন্নাম ঠোকা একমাত্র কাজ যেখানে! বই তখন হয়ে ওঠে অপাঠ্য ও সর্বাধিক ক্ষতিকর বস্তু।

ধর্মগ্রন্থের দিকে তাকান, এগুলোকে শোষণ ও পীড়নের কাজে কীভাবে ব্যবহার করে কিছু লোক। বই নমস্য কিছু নয়;—নিছক প্রয়োজন। তাও সভ্যতার জেলখানায় কয়েদ থাকতে বাধ্য হওয়ার কারণে একে কমবেশি গিলতে হয়, নয়তো এর ধার ধারত কোন শালা!

বইকে পড়তে ও প্রশ্ন করতে জানলে ঠিক আছে, অন্যথায় তা বিপজ্জনক। সেখানে ত্রুফোর ফারেনহাইট 451 ছবিতে দেখানো দৃশ্যের মতো ফ্যাসিবাদী শক্তি যদি বইনিধন যজ্ঞে নামে,—এখন এই নিধনকে ঠেকানো কঠিন হয়। সুতরাং, বইয়ের প্রতি প্রেম নয় বরং এর দিকে তির্যক নজরে তাকানো অধিক জরুরি; অন্যথায় বইয়ের কবলে পড়ে সভ্যতা হয়ে ওঠে মর্মান্তিক জড় ও দূষিত কারাগার।

বইপ্রেমীর কোনো অর্থ খুঁজে পাই না আর! অভিজাত শখ হিসেবে যারা বই পড়েন অথবা বই জমিয়ে রাখেন, কাজটি তারা কেন করেন তা মাথায় ঢোকে না! একটি কিতাবের হয়তো লম্বাচওড়া মহীরুহ হওয়ার কথা ছিল। বইপ্রেমীর খপ্পরে পড়ে সে হারায় তার স্বকীয়তা। এরা তাকে শখের ফুলদানি করে রাখে। বইকে মহিমান্বিত করার নামে ডালপালা ছাটাই করতে-করতে একে বনসাই করে তোলে। বইকে যদি সত্যি পাঠ করতে হয়, তাহলে তাকে বনসাই করে রাখাটা কি সমীচীন? বইপাঠ অনেকের কাছে আভিজাত্য, এবং এখানে এসে সে হয়ে ওঠে দূষিত ও ক্ষতিকর। শখের গ্রন্থপ্রেমিকের সঙ্গে শখের ডাকটিকেট জমানেওয়ালার তফাত তাই নগণ্য।

বইপ্রেমীরা কি আসলেও বই পাঠ করে? আমার মনে হয়, জরিপ করলে ভিমড়ি খাওয়ার মতো তথ্য পাওয়া যাবে। দেখা যাবে,—আকাটের দল বই জমায়, কিন্তু পড়ে না। পড়া ও পড়ার ভান করা পৃথক ঘটনা। তবে এই-যে তারা পড়ে না, তাতে আমি আনন্দিত। সভ্যতা এতো-এতো বেশি বইয়ে বোঝাই হয়ে আছে, মানুষের হয়তো প্রয়োজন আছে পুনরায় মূর্খ হওয়ার। মূর্খতা নিয়ে আসতে পারে অজ্ঞতা ও সারল্য। সেইসঙ্গে পতন। সেখান থেকে পুনরায় শুরু করতে পারবে মানুষ। মন্দ নয় যদি তা ঘটে ভবিষ্যতে।

Iconoclast Humayun Azad: Image Source: Collected; Google Image

হুমায়ুন আজাদের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। এক বস্তা বইয়ের ওপর ঠ্যাং তুলে আজাদ তাঁর আমার অবিশ্বাস বইটির প্রচ্ছদে হাজির ছিলেন। সেখানে ছিল জ্ঞানের দম্ভ। আজাদ বোঝাতে চেয়েছিলেন, তিনি এসব বই পড়েছেন, প্রশ্ন করেছেন, এবং গ্রহণ-বর্জনের ভিতর দিয়ে এর তথ্যকে যাচাই শেষে নিজের একটি বিশ্বাসে হয়েছেন উপনীত। সুতরাং, তাঁর পায়ের নিচে পড়ে থাকা বইগুলো এখন আর তাঁর থেকে বৃহৎ নয়।

আজাদের এই তাচ্ছিল্য হাস্যকর মনে হলেও বইকে এভাবে পাঠ করা ছাড়া এর ক্ষতিকর প্রভাব কাটিয়ে উঠা কঠিন। বই কোনো প্রথা নয়, বইকে হতে হবে প্রথা চূর্ণ করতে জানে এরকম কিছু। মানব-সভ্যতায় সেই বইগুলো আমরা আজো পড়ে চলেছি, যেগুলো কোনো-না-কোনোভাবে পূজনীয় না থেকে নিন্দনীয় হতে চেয়েছিল। এমনকি ধর্মগ্রন্থরাও তার বিকাশলগ্নে নিন্দনীয় ছিল; পরে এগুলোকে পূতঃপবিত্র করে তুলেছে একদল ধান্ধাবাজ।

মানব-সভ্যতায় বই হলো ধান্ধাবাজির হাতিয়ার। জেনেশুনে কোন দুঃখে আমি তার প্রেমে পড়তে যাবো। এখানে এসে বরং মিশেল ফুকোর কথা আমরা আমলে নিতে পারি। ফুকো বলেছিলেন বটে,—Knowledge is not for knowing; knowledge is for cutting.

শখের বইপ্রেমী, অভিজাত বইপ্রেমী, বইপাগলরা এখানে এসে ক্ষতিকর হয়ে উঠছেন। তারা হলেন মৃত প্রজাপতি সংগ্রাহকের দল। প্রজাপতিকে মমি করে কাচের দেয়ালে লটকে রাখছেন। এর ফলে বই হয়ে ওঠে পুরাতত্ত্ব। অ্যান্টিক পিস! নিলামে চড়ালে ভালো দামে বেচা যায়। কিন্তু ওই-যে, সেখানে সংরক্ষিত তথ্য, তা এখন অনুভূতি, জ্ঞান, প্রজ্ঞা… যা-খুশি সরবরাহ করে থাকুক-না-কেন,—সেগুলোকে আর ছেদন-কর্তন করে না মানুষ। বই এভাবে হয়ে ওঠে অ্যান্টিকুইটি;—শখের ইকাবেনা। এই বই দিয়ে কী করবে মানুষ, আমাকে বোঝান এবার!

হুমায়ুন আজাদের আমার অবিশ্বাস বইয়ের প্রচ্ছদ দেখে অনেকে শিউরে উঠেছিলেন মনে পড়ে। তা এজন্য নয়,—আজাদ জ্ঞানকে পায়ের তলায় রেখেছেন নিজেকে বড়ো দেখাতে। এজন্য-যে,—বই নামক পূতঃপবিত্র বস্তুর ওপর লোকটি খাটাশের মতো পা তুলে বসে আছে। সংস্কারে ঘা লেগেছিল জবর।

সংস্কারের কিছু কি সত্যি ছিল সেখানে? বই হলো প্রয়োজন। মুগ্ধতা জানানোর সময় তাকে সন্দেহ করা ও প্রশ্নে জারি থাকা আবশ্যক;—যেন পরে তার ওপর নতুন করে তুলি টানা যায়;—যেন সে দেবতা বা ঈশ্বর না হয় কখনো! ঈশ্বর সম্ভবত একমাত্র অজানা সত্তা, তাঁকে আমরা দুদিক থেকে পবিত্র ও নোংরা ভাবতে পারছি। যেখানে, কেউ তাঁকে মাথায় তুলে নাচে। কেউ আবার আছাড় মারতে দ্বিধা করে না। উভয় পরিস্থিতিতে বেচারা থাকে যথারীতি নির্বিকার।

Michel Foucault Quote; Image Source: Collected; Google Image: Pinterest

বইয়ের জন্ম হচ্ছে তাকে আছাড় মেরে ফেলার জন্য;—মাথায় নিয়ে নাচার জন্য নয়। বাস্তবে ঘটনা যদিও উলটো ঘটতে দেখি আমরা। শখের পাঠক, অভিজাত পাঠকরা হয়ে উঠেন বালের পাঠক। তারা বই পড়ে না, কেবল একে ড্রইংরুমে বনসাই বানিয়ে রাখায় খুঁজে নেয় পরিতোষ। এই আনন্দে সায় দিতে পারি না বলে বইকে নিয়ে ফ্যাসিনেশন দেখানোর মানে খুঁজে পাই না। সভ্যতার এই নির্মম সৃষ্টিকে বরং ফুকোর পন্থা মেনে ছেদন-কর্তনের চেষ্টা কিছুটা হলেও কাজে দিতে পারে।

মার্টিন হাইডেগারের উক্তি মনে পড়ে যাচ্ছে। কোনো এক সেমিনারে সংবাদকর্মী ও কতিপয় বিদ্বান তাঁকে প্রশ্ন করেছিলেন,—‘বিয়িং অ্যান্ড টাইম’-র দ্বিতীয় খণ্ড লিখবেন বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন; তার কী হলো?’ হাইডেগার উত্তর দিয়েছিলেন,—আপনারা প্রথম খণ্ডকে কবে বাতিল করছেন সেই অপেক্ষায় আছি। বাতিল হলে দ্বিতীয় খণ্ড লিখতে বসব।

বইপড়ুয়া, বইখোর, বইপাগলা, বইলাভারের প্রয়োজন নেই সাচমুচ। আমাদের দরকার একদল কাঠুরে। হরফে সাজানো বইয়ের পাতায় তারা কুঠার হানবে। করবে এর ময়নাতদন্ত। বইয়ে সাজানো তথ্যকে যেন এভাবে জখম করা যায়। জখম থেকে সেরে ওঠার পর তারা হয়ে উঠবে নতুন ও প্রাণবন্ত। ঠিক যেমন, ঝড় আসার আগে আকাশে চমকায় বিদ্যুৎ। অন্তত কিছু লোককে যেন তা দেখাতে পারে আলো। যেন তারা বুঝে : বই তাদেরকে বন্দি করেনি, উলটো তারা বইকে মুক্ত করেছে কয়েদখানা থেকে।
. . .

মিনহাজভাই, আপনি বলছেন—বইপাঠ অনেকের কাছে পবিত্র অভ্যাস, আবার অনেকের কাছে অভিজাত শখ ;— কথাটি ঠিক নয়।

কিন্তু, এই বক্তব্যের সত্যতা নির্ভর করে সমাজ ও মানুষের মনস্তত্ত্ব পর্যবেক্ষণের উপর, এবং তা বাস্তব অভিজ্ঞতা ও যুক্তির নিরিখে সহজেই যাচাই করা যায়। প্রথমেই বলা যায়, বইপাঠকে বহু মানুষ আজও নৈতিক উন্নয়ন বা আত্মশুদ্ধির একটি পথ হিসেবে বিবেচনা করেন। শিশুকে বইয়ের অভ্যাস গড়ে দিতে বলা হয়, যেন সে ‘ভালো মানুষ’ হয়। স্কুলের পাঠ্যবই হোক বা বাইরের সাহিত্য, তাকে ঘিরে এক ধরনের ‘পবিত্রতা’ তৈরি করে ফেলা হয়েছে;—যেন বই পড়া মানে আত্মার পুণ্য অর্জন। বই পড়া ও না-পড়ার ভিতরে তৈরি হয়েছে একধরনের অপরাধবোধ, একধরনের আত্মগ্লানি;—’আরও পড়া উচিত ছিল’, ‘এই বই না-পড়েই কীভাবে পাশ করেছি’, ওই বই/লেখা আমি পড়িনি?’—এসব বাক্য আমাদের চারপাশে অহরহ শোনা যায়।

অন্যদিকে, মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত শ্রেণিতে বইপাঠ প্রায়শ এক ধরনের সামাজিক প্রতীক বা স্ট্যাটাস সিম্বলের মতো,—উপলব্ধি করা যায়। দামি সংস্করণ, বিদেশি প্রকাশনা, প্রচ্ছদনির্ভর সংগ্রহশালা, বুকশেলফের ঝলমলে সৌন্দর্য… এসব কখনও কখনও বইয়ের ভিতরের পাঠের চেয়ে অনেকবেশি গুরুত্ব পায়। অনেকেই বই কেনেন, সাজিয়ে রাখেন, কিন্তু পড়েন না;—এমন দৃশ্য অপ্রচলিত নয়। সেখানে বই হয়ে ওঠে আভিজাত্যের অংশ, একধরনের নিপুণ অভ্যাস, যা মূলত দর্শন-প্রদর্শনের খেলা।

বইয়ের বিপণনকৌশলও এই দুটি রূপকে লালন করে। ‘বই বদলায় মানুষ, ‘বই হোক শ্রেষ্ঠ উপহার’, ‘পাঠ করো, আলো জ্বালো’;—এইসব স্লোগান বইকে একধরনের পবিত্রতা ও আত্মউন্নয়নের মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। অর্থাৎ একদিকে বই মানে ভেতরের পরিশীলন, অন্যদিকে বাইরের পরিপাটি শ্রেণিচিহ্ন। এইসব পর্যবেক্ষণ থেকে স্পষ্ট হয় : বইপাঠ আসলে একটি দ্বিমুখী অবস্থানকে ধারণ করে। কারও কাছে এটি অন্তর্জগৎ নির্মাণের সৎ প্রয়াস, আবার কারও কাছে বাহ্যিক শ্রেণিচর্চার কৌশল। কেউ বই পড়ে নিজের মধ্যে আলো জ্বালাতে চান, আবার কেউ বই রাখেন যাতে অন্যের চোখে আলোকিত বলে মনে হয়। ফলে বই হয়ে দাঁড়ায় একাধারে পবিত্রতার প্রতীক এবং শ্রেণিকেন্দ্রিক অভিজাত শখের বস্তু। এই দ্বৈততা বইপাঠকে একটি মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক প্রশ্নে পরিণত করে—যার উত্তর পাঠকভেদে ভিন্ন হলেও, বাস্তব পর্যবেক্ষণে তা কি অস্বীকারযোগ্য?

পাঠের ধারণা প্রথমে নিরীহ দেখালেও, তা মোটেও নিরপেক্ষ নয়। একজন শিশু পাঠ করে তার জীবনের প্রয়োজন মেটাতে, আর একজন মধ্যবিত্ত মানুষ বই পড়ে ‘আলোকিত’ জ্ঞান অর্জন বা আলোকিত হওয়ার জন্য। কারও কাছে বই হল জীবনের প্রয়োজন, কারও কাছে সখ/আভিজাত্যচর্চা;—এমনকী বিনোদনের মাধ্যম।

সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই;—(তার গুণমান কেমন, তা নিয়ে প্রশ্ন নাই), এই ধারণা কেন, কীভাবে ভ্রমাত্বক, মিনহাজভাই?

Friedrich Nietzsche Quote; Image Source; Collected; Google Image Pinterest

আনুমানিক ২২/২৪ বছর আগে আজাদের ‘আমার অবিশ্বাস’ বইটি পড়েছিলাম। বেলালভাইয়ের নিকট থেকে নিয়ে। হুমায়ুন আজাদ তাঁর চিন্তার অন্তঃস্থল খুলে ধরেছেন;—নির্মম, নির্ভীক, যুক্তিনির্ভর ভাষায়। তিনি ঈশ্বরে অবিশ্বাস করেন বলেই মানুষে বিশ্বাস রাখেন, ধর্মে আঘাত করেন বলেই মানবতাকে সজাগ করতে চান। সমাজ যেখানে অন্ধ অনুসরণে গর্ব করে, তিনি সেখানে যুক্তিকে আহ্বান করেন, প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন প্রাচীন সব মিথের বুকে। তাঁর অবিশ্বাস আসলে এক জাগরণের ডাক,—যেখানে মানুষ মুক্তচিন্তায় চলবে, ঈশ্বরভয়ে নয়; যেখানে বিশ্বাস নয়, দায়িত্বজ্ঞান হবে নৈতিকতার মূল।

‘আমার অবিশ্বাস’ এক অর্থে আত্মজীবনী নয়, অথচ এটি তাঁর মনের জীবনী। এখানে তিনি বিশ্লেষণ করেন ধর্মীয় ভণ্ডামি, রাজনৈতিক ধর্মীয়তা, কুসংস্কার ও রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়াশীলতার প্রকৃতি। ইসলামি মৌলবাদ তাঁকে ক্রমাগত নীরব করতে চেয়েছে, আর তিনি কলমে করেছেন প্রতিবাদ। তাতে আছে সাহসের আগুন, যুক্তির ধোঁয়া, এবং এক অকপট নাস্তিকের মানবিক যন্ত্রণা। বইটি একজন ‘অবিশ্বাসী’র আত্মার ডায়েরি—যে ডায়েরির প্রতিটি পাতায় লেখা আছে মুক্তির স্বপ্ন, মানুষের জন্য বিশ্বাসহীন ভালোবাসা। আজাদের ভাবনা/চিন্তা/মতকে আমরা (আপনি আমি) তো বইয়ের মাধ্যমেই জানি, তাই না? তাছাড়া, এই যে তর্ক/আলোচনা, এর নেপথ্যে কি বইয়ের কোনও অবদান নাই?
. . .

বাবুল ভাই, ‘বইপাঠ অনেকের কাছে পবিত্র অভ্যাস, আবার অনেকের কাছে অভিজাত শখ’;—কথাটি বোধহয় আমি বলিনি। আপনার রাখা বক্তব্যের পয়লা কিস্তি থেকে কোট করে এর বিপক্ষে বরং আর্গুমেন্ট সাজিয়েছি। আমার রাখা ২ নাম্বার কিস্তির বক্তব্য যদি আরেকবার খেয়াল করেন, তাহলে মনে হচ্ছে ভালো হয়।

যাইহোক, আপনার সদ্য রাখা বক্তব্য কিন্তু আমার বলা কথার সঙ্গে দ্বিমত করছে না। আমি তো ঘুরেফিরে বলছি, বইয়ের মূল উদ্দেশ্য হলো দুটি : প্রথমত, বই হচ্ছে তথ্যের আকর বা মহাফেজখানা। দ্বিতীয়ত, বই মাত্রই কোনো-না-কোনোভাবে কেজো। পারপাস সার্ভ যেন করতে পারে, সেই উদ্দেশ্য থেকে মানব-সভ্যতায় তার লালন-পালন ও পরিবর্ধন অব্যাহত রয়েছে। বইয়ের বিপণন মূলত এ-দুটি উদ্দেশ্য সফল করতে প্রযোজিত হয়ে থাকে। পুঁজিবাদে যার মাত্রা ও বৈচিত্র্যের অন্ত নেই।

শিশুকে যেসব উদ্দেশ্য থেকে বই পাঠে দীক্ষিত করা হয়, মানব-সভ্যতায় স্থিরকৃত উদ্দেশ্যের নিরিখে তা যৌক্তিক। কিন্তু ওই-যে বললেন, মধ্যবিত্ত (বা মোটা দাগে বৃহত্তর শিক্ষিত সমাজ ধরি বরং) বই পড়ে আলোকিত মানুষ হওয়ার জন্য;—এটি আমাদের এখানে মিথ ছাড়া কিছু নয়। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে জনাব আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ মিথটিকে ব্যবহার করেছেন একসময়। বই পড়ে আলোকিত মানুষ হওয়ার প্রকৃত অর্থ ও সারার্থের কোনোকিছু জনাব সায়ীদের মাধ্যমে চাউর রেটোরিকে ছিল না। তিনি একটি ব্যবসা সাজিয়ে বসেছিলেন। এর দ্বারা আমরা কিছু ভালো বই হয়তো পড়তে পেরেছি, কিন্তু বইকে প্রশ্ন ও ছেদন করতে শিখিনি। উলটো ভাবালুতায় একে করেছি মহান।

এগুলো হাস্যকর ও বাজে প্রথা। কেন, তার ব্যাখ্যা ইতোমধ্যে দিয়েছি বাবুল ভাই। আশা করি আপনি তা পাঠের পরে কথা আরো আগানো যাবে। বিষয়টি আগ্রহ-উদ্দীপক, এবং এসব নিয়ে কথা যত বেশি হবে, আমরা একে অন্যকে বুঝতে ও শুধরে নিতে পারব।
. . .

বইপাঠ অনেকের কাছে পবিত্র অভ্যাস, আবার অনেকের কাছে অভিজাত শখ;—কথাটি আমার বক্তব্যে ছিল। আপনি বলেছেন,—ঠিক নয়;—ভ্রমাত্মক। আমি আত্মপক্ষ সমর্থন করেছি, মিনহাজভাই!
. . .

My Book Life; Image Source and Credit: The Sun Magazine

. . .

বই পড়া ও না-পড়া : পূর্ববর্তী পর্বের লিংক

বই পড়া না-পড়ার ফজিলত-১

. . .

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 32

No votes so far! Be the first to rate this post.

Contributor@thirdlanespace.com কর্তৃক স্বত্ব সংরক্ষিত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *