ছবির অন্তরালে - পোস্ট শোকেস

ছবির অন্তরালে : মহাবিশ্ব দেখতে কেমন?

Reading time 5 minute
5
(27)

. . .

বিশেষ ও সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদের ঘোরপ্যাঁচে লোকের মাথা যিনি ঘুরিয়ে দিয়েছেন, তাঁর ছবি তুলতে আমার সহকর্মীরা ওঁত পেতে থাকে। মওকা পেলেই হলো, ক্যামেরার শাটারে ফটাফট চাপ পড়ে। আলবার্ট আইনস্টাইন নামের লোকটিকে নিয়ে এই আদিখ্যেতা আমার পোষায় না। আলোকচিত্রী হওয়ার সুবাদে বহুবার তাঁকে কাছে থেকে দেখেছি। ছবিও তুলেছি অনেক;তবু মনে হয়েছে লোকটিকে কেন জানি দেখতে পাচ্ছি না। ছবি তুলছি ঠিক আছে, কিন্তু ছবির আড়ালে কিছু বাকি থেকে যাচ্ছে সেখানে! সেটি কী…? প্রশ্নটি যতবার নিজেকে করেছি, মহাবিজ্ঞানীর ছবি তোলার উৎসাহ মিইয়ে এসেছে। ঘটনাটি আশ্চর্যের বটে!

লোকজন তাঁর সম্পর্কে জানতে চায়। প্রতিদিনের কাজ-কারবার খবরের কাগজে উপাদেয় রসদের খোরাকি হয়। এসব আমার অজানা নয়। তাঁকে দেখে তবু ক্যামেরার শাটার টিপতে ইচ্ছে করে না। সহকর্মীদের মধ্যে আমি খাপছাড়া আলোকচিত্রী। আইনস্টাইনকে হাতের নাগালে পেয়ে ক্যামেরাবন্দি করতে যে-কিনা খেপে ওঠে না। অবাককরা ঘটনা হলেও আমি জানি, আমার এই হাত কেন তাঁর ছবি তুলতে গিয়ে থমকে পড়ে! আর, কেনই-বা তাঁকে ক্যামেরায় ফ্রেমবন্দি করতে মন নেচে ওঠে না!

আমার জন্য আলবার্ট আইনস্টাইন হচ্ছেন সমস্যা,যাঁকে আমি কখনো সঠিক দেখতে পাই না। ক্যামেরা তাক করে তাঁকে দেখার চেষ্টা করি। আমার চোখ দুটো তখন আপনা থেকে বুজে আসে। ছবি তোলার মুহূর্তরা ক্রমাগত পিছনে সরে যায়, আর আমি ঢুকে পড়ি অনামা কোনো দেশে! আলবার্ট আইনস্টাইন নামের লোকটি সেখানে বিচরণ করলেও, সময়ের তীর তাকে ছোট্ট বালক করে রেখেছে। আইনস্টাইনের ছবি তুলি না তাই ভয়ে! ছবি তুলতে গিয়ে কোনো এক বালকের ছবি তুলছি ভেবে হাত আড়ষ্ট হয়ে আসে!

Albert Einstein as a young child, c1880s; Image Source – Collected; Google Image

দিব্যি দিয়ে বলছি, আইনস্টাইনকে দেখলে আমার চোখ বুজে আসে। ছেলেবেলায় অঙ্কে কাঁচা ও বোকাসোকা বালকের মুখ চোখের সামনে ভাসে কেবল। ভাবনা-প্রবণ বোকাসোকা ছেলেটিকে যদিও বিলক্ষণ বুদ্ধিমান মনে হয় সেখানে। যদি সম্ভব হতো, তাহলে আইনস্টাইনকে আমি বালক করে পাঠিয়ে দিতাম অতীতে। আমার ক্যামেরা টপাটপ ভাবনা প্রবণ বালকের ছবি তুলে রাখত। আমি তাকে বলতাম,‘অঙ্কগুলো ঝটপট করে ফেলো দেখি।’

আমি জানি সে তা কিছুতেই পারত না। তার মানে পরীক্ষায় আবারো ডাহা ফেল! আমি হেসে জিজ্ঞেস করতাম তাকে,‘ব্যাপারখানা কী বলো তো? অঙ্কগুলো পারছো না কেন? এবারো ডাব্বা!’ আমি নিশ্চিত বালক আইনস্টাইন মাথা চুলকে উত্তরটি দিত,—‘অঙ্কগুলো তো পারি। কিন্তু, সূত্র মিলছে না! মহাবিশ্বে আলোর গতি-প্রকৃতির সঙ্গে অঙ্কগুলোর সংযোগ ধরতে সমস্যায় পড়েছি। গণ্ডগোল হয়ে যাচ্ছে সব!’

মহাবিশ্বের সমীকরণ মিলাতে বসে অঙ্কে ডাহা ফেল বালককে আমি ঝটপট ক্যামেরায় তুলে নিতাম। আমি তুলতাম তার বেহালা শেখার দিনগুলো। বাগানে প্রজাপতির পেছনে ছুটতে-ছুটতে নীল আকাশের দিকে বোবা বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকা বালককে। যে-হয়তো নিজের ঘরের জানালার ধারে বসে গালে হাত দিয়ে ইউক্লিডের প্রতিপাদ্য মিলানোর চেষ্টা করছিল :

যার কোনো অংশ নেই, সেটি হলো বিন্দু। যে-বিন্দুর দৈর্ঘ্য রয়েছে কিন্তু প্রস্থ ও উচ্চতা নেই, সেটি রেখা। যার দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ দুটোই রয়েছে, সেটি তল। আর, যে-বিন্দুগুলো এক বরাবর থাকে, সেটি সরলরেখা।

The Einstein Ring: Captured by Hubble Telescope; Image Source – Collected; Google Image

মহবিশ্ব হয়তো সেরকম কিছু! অনিঃশেষ বিন্দুর যোগফল মিলে তৈরি হয়েছে অনিঃশেষ সরলরেখা। আলোর গতি ও প্রতিসরণে সরলরেখা বিচিত্র রূপে আমাদের মনে বিভ্রম জাগায়! আমি সেই বালককে সত্যি-সত্যি দেখতে পাই, যে-ছিল স্কুলের অঙ্কে কাঁচা। জানালার কাচে সূর্যের আলো প্রতিফলিত হয়ে বর্ণিল ছটা তৈরি হলে ভাবত,—সুদূর দূরত্ব পাড়ি দিয়ে আসা আলোকরশ্মি জানালার কাচে আঘাত করছে, চলার পথে তাদের জীবনে না-জানি কী কী ঘটেছিল! আমি জানি বালক আলোর বিভূতিতে সম্মোহিত। বাদবাকি ছাপিয়ে একমাত্র আলো তার জীবনের ধ্রুবতারা ছিল। বয়স্ক আনইস্টাইন এ-কারণে আমায় টানে না। আমি আজো সেই বালককে খুঁজি,ক্লাসে বসে খরগোশের মতো উঁকিঝুঁকি দিয়ে জানালার কাচে বর্নিল আলোর ফোয়ারা দেখছে!

সে যাকগে, আমার কাছে টাইম মেশিন নেই-যে বুড়োধাড়ি আইনস্টাইনকে ধা করে পাঠিয়ে দেওয়া যাবে অতীতে। মানতেই হবে,মহাবিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন তার পুরুষ্টু গোঁফসহ ভারিক্কি লোক। মহাবিশ্বে স্থানকালের ভূমিকা নিয়ে জটিল ধাঁধা মিলানোয় ব্যতিব্যস্ত বিজ্ঞানী। আমি অবশ্য গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি,—তাঁর চোখের দিকে নিবিড় তাকালে কারো বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়,—লোকটি আসলে তেমন পালটায়নি! ছেলেবেলার ঝকঝকে চোখের কৌতূহলী এক বালক তাঁর বয়স্ক চোখের তারায় এখনো উঁকি দিচ্ছে।

চার্লি চ্যাপলিনের ছবি দেখে হেসে কুটিকুটি লোকটিকে যখন দেখি,মনেই হয় না, মহাবিশ্ব নিয়ে মাথা ঘুরিয়ে দেওয়া জটিল ভাবনায় ডুবে আছে! ডাকাবুকো লোকজন তাঁকে সারাক্ষণ ঘিরে রাখ। জটিল তর্কের ঘোরপ্যাঁচে মাথা ভার হয়ে আসে। তার মধ্যে বেখাপ্পা তালে মাথা নাচায়, আর মজাদার ভঙ্গিতে হাসে! আমি বুঝতে পারি,—সে আসলে ঘোরপ্যাঁচের দুনিয়া থেকে বেরিয়ে পড়েছে। ওখানে নেই। বিশ্ব-রহস্যের জটিল অলিগলি পেরিয়ে বেহালা কাঁধে হয়তো প্রজাপতির উড়ান দেখছে! উড়ানের পিছনে ছুটতে-ছুটতে স্থানকাল আর ভর-শক্তি ও মাধ্যাকর্ষণের সমীকরণগুলো গুবলেট হয়ে যাচ্ছে তার। আমার হাত দুটো তাকে এই আইনস্টাইনকে ক্যামেরায় ধরতে নিশপিশ করে!

Albert Einstein; Image Source – Collected; Google Image

লোকজন এসব কতটা বুঝে জানি না, তবে আলবার্ট আইনস্টাইনকে দেখলে মনে হয়, তিনি সুযোগ খুঁজছেন। বোকা-বোকা হাসিখুশিভরা অনিশ্চিত দিনগুলোয় ফেরত যাওয়ার সুযোগ পেলে সেখানে চলে যেতে দেরি করবেন না। কনফারেন্স হলে বসে দেখতে পাচ্ছি, দাপুটে বিজ্ঞানীদের সঙ্গে জোর তর্ক চলছে তাঁর। মহাবিশ্ব অসীম ও অনিশ্চিত হতে পারে না। যে বা যারা এই পাশার দান ফেলেছে, তারা তাহলে কেমন করে একে এমন নিখুঁত ছন্দে বেঁধে রাখছে! আমার সহকর্মীরা ক্যামেরায় দেদার ছবি তুলছিল, আর আমি বালক আইনস্টাইনের কান পাকড়ে জানতে চাইছি,এবারো অঙ্কে ডাহা ফেল মারার পেছনের রহস্যটি আমায় বলো!

সত্যি বলতে কী, আমি সুযোগ খুঁজছিলাম,আলবার্টকে একা পেলে নিজেে বালক হয়ে যাবো। বোকাসোকা নিরীহ মুখে জানতে চাইব,মহাবিশ্ব জিনিসটা কী, আর এই ব্যাপারে বালক আইনস্টাইনের মতামত কী ছিল তখন? তক্কে-তক্কে ছিলাম একদিন তাঁকে ধরবই ধরব। বাহাত্তর বছরে পা রাখার দিনে সুযোগটি এসে গেল। প্রিন্সটনে সবাই সমবেত হয়েছিল একালের ক্ষুরধার মস্তিষ্ককে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে। পার্টি জমে উঠেছিল সেদিন। ক্যামেরায় ছবি তোলার বিরাম ছিল না কারো।

আইনস্টাইন খোশমেজাজি মানুষ। রসবোধ ক্ষুরধার। সব ভুলে গুরুতর ভাবনায় ডুব দিতেও সময় লাগে না! প্রহেলিকাই বটে! পার্টি শেষে গাড়ি করে বাড়ি ফেরার পথে প্রশ্নটি ছুড়ে দিলাম তাঁকে। আমার প্রশ্নে এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেলেন বলে মনে হলো। তারপর সেই বিখ্যাত ছবিটি জন্ম নিলো। চোখ বড়ো করে আইনস্টাইন জিভ বের করে দিয়েছেন! আমার হাতে ক্যামেরা থাকলেও তখন তা নামানো ছিল। বুঝতে পারিনি ছবিটি কে তুলছে! পরে জেনেছি আর্থার সেসে তা তুলেছিল।

Albert Einstein: Getting Tongues Wagging; Photography: Arthur Sasse; Image Source – cOllected; Wikipedia

ছবিটি দেখার পর বাকিরা কী বলাবলি করছিল জানি না, তবে আমার যা বোঝার সেটি বুঝে নিয়েছিলাম। বুঝতে অসুবিধা হয়নি,ডাকাবুকো বিজ্ঞানী আর মহাবিশ্বের ভূত-ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা সাজানোর ঘোরপ্যাঁচে ব্যস্ত থাকলেও, আলবার্ট আইনস্টাইনের মধ্যে আজো ভাবনা-বিভোর ও আমোদ প্রবণ বালকটি হারিয়ে যায়নি। এখনো বহাল তবিয়তে সেখানে বেঁচে আছে সে!

মহাবিশ্বের পরিণতি ও ভূত-ভবিষৎ নিয়ে গুরুতর কিংবা বোকাসোকা প্রশ্নের জবাব বালকটি এভাবে জিভ বের করে দিতে জানে। আমার মনে পড়ছিল গণিতে আবারো ডাহা ফেল বালক আইনস্টাইনের কান পাকড়ে জানতে চাইছি.মহাবিশ্বের সূত্র সে মিলাতে পেরেছে কি-না! তার কাছে একে কী মনে হয় দেখে। মহাবিশ্ব আসলেই দেখতে কেমন! বালক তার দুষ্টুমিভরা চোখ বড়ো করে তুলেছিল, আর জিভ বের করে বুঝিয়ে দিয়েছিল,মহাবিশ্ব আসলেই দেখতে কেমন!
. . .

Our Iniverse in the Hubble Telescope; Image Source – Collected; Google Image

সংযুক্তি

Getting Tongues Wagging শিরোনামের ভুবন বিখ্যাত আলোকচিত্র মহাবিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টইনের বাহাত্তরতম জন্মদিন উদযাপনের সময় প্রখ্যাত আলোকচিত্রী Arthur Sasse তাঁর ক্যামেরায় তুলেছিলেন। আলোকচিত্রটি বিজ্ঞানীর প্রখর রসবোধের প্রতিফলন হয়ে অমরত্ব লাভ করেছে।

উল্লেখ থাকে-যে, আইনস্টাইন ছবিটি ভীষণ পছন্দ করেছিলেন। পরে তাঁর স্বাক্ষরসহ অসংখ্যবার এটি মুদ্রিত ও প্রচারিত হয়েছে। ছবি তোলার ঐতিহাসিক পটভূমি ও আলবার্ট আইনস্টাইনের ছেলেবেলা সম্পর্কিত বিবরণগুলো বয়নের সময় রচয়িতা প্রকৃত ঘটনা থেকে সরে এসে কাল্পনিক হওয়ার চেষ্টা করেছেন।

মহাবিশ্বের ভূত-ভবিষ্যৎ সম্পর্কে শেষ কথা বলা দুরূহ! এ-সম্পর্কিত যাবতীয় অনুমান ও নিরীক্ষণ, সকল হিসাব-কিতাবের সবটাই হয়তো Arthur Sasse-র তোলা আলোকচিত্রের মতো অবোধ্য ও দুষ্টুমিভরা প্রহেলিকার রোমাঞ্চ দিয়ে ঘেরা!
. . .

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 27

No votes so far! Be the first to rate this post.

Contributor@thirdlanespace.com কর্তৃক স্বত্ব সংরক্ষিত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *