পপগানের হল অব ফেম-এ যেসব তারকা নিজের স্বাক্ষর পাকাপোক্ত করেছেন, তাঁদের মধ্যে লেডি গাগাকে নিয়ে কথা বলাটা বেশ শক্ত একটি কাজ। গাগা যাঁর সঙ্গে নৈকট্য ধরেন, সেই ম্যাডোনাকে নিয়ে দু-চার কথা বলে ফেলাটা এখন আর শক্ত নয় অতটা। মাইকেল জ্যাকসনের দাপুটে উত্থানপর্বে নিজের জাত চিনিয়ে দেওয়া ম্যাডোনা হয়ে উঠেছিলেন নতুন যুগের জনয়িতা। তাঁর গানে শ্রোতারা খুঁজে পাচ্ছিলেন বৈচিত্র্য ও ভিন্নতা। পপগানে ফল্গুধারার মতো বহতা রোমান্টিক যৌনাবেদনকে একলা হাতে যিনি তখন ভাঙছেন অনেকখানি। মর্জিমাফিক গড়েপিটে নিতেও বাকি রাখেননি কিছু।
পপগানের চিরচেনা চাপল্য ও স্মৃতিকাতর বিষাদে ঘাটতি হতে না-দিয়ে প্রথাভাঙা দ্রোহের জনয়িতা হয়েছেন ম্যাডোনা। বৈচিত্র্য ও অর্থময়তার কারণে তাঁর এই প্রথা-বিধ্বংসী আবেদন উত্তর-প্রজন্মের অগণিত পপতারকার ওপর পড়েছিল বৈকি। লেডি গাগাকে সে-তালিকার বাইরে ভাবার সুযোগ নেই। ম্যাডোনাকে বাদ দিয়ে অগত্যা সোজা-সাপটা গাগায় প্রবেশ করা সম্ভব নয়। স্বকীয়তায় পৃথক হলেও পরস্পর থেকে দূরের নন তাঁরা। একে অন্যের যুগলবন্দি হয়ে ওঠার মধ্য দিয়ে বরং পৃথক দুজনে। সংগতকারণে গাগাপাঠে ম্যাডোনা আসতে থাকবেন ও যথাস্থানে অপসৃতও হতে থাকবেন। গাগার স্থানবিশ্বে ম্যাডোনাকে অনুপ্রবেশ করতে দেওয়া ও সেখান থেকে তাঁকে অপসৃত হতে দেখার ভিতর দিয়ে আমরা বুঝে নিতে চেষ্টা করব লেডি গাগার স্বকীয়তা;—পরিশিষ্টে যা তাঁকে অনন্য পপশিল্পী করে তুলতে ভূমিকা রাখছে।
ম্যাডোনার গানে যৌনাবেদন অবধারিত নিয়মে আলোচনার বিষয় থেকেছে;—যেখানে, এই আবেদনকে স্পিরিচুয়াল ক্যাথারসিস বা আধ্যাত্মিক মোক্ষণে নিংড়ে নেওয়ার মরিয়া চেষ্টা শ্রোতা-দর্শকরা সময়ের সঙ্গে তাঁর মধ্যে প্রবল হতে দেখেছেন। ইহুদি মরমিবাদ তথা কাব্বালাহ্-র সঙ্গে তাঁর সংযোগ সেখানে বিরাট অবদান রেখেছে। ফ্রোজেন (Frozen), নাথিং রিয়েলি ম্যাটারস-র (Nothing Really Matters) মতো গানগুলোয় দেহের আগুনকে ধ্যানমগ্ন স্থিরতায় প্রশমিত রাখার ম্যাডোনাসুলভ আকুলতা গানগুলোকে উপভোগ্য করেছে। অন্যদিকে, নারীদেহকে ঘিরে আবর্তিত সামাজিক সংস্কার বা টাবুকে আঘাত হানার তাগিদে ছুপা বিদ্রুপ-পরিহাস ও নারীবাদী বয়ানের নানান অনুষঙ্গ গানে ঢোকানো ছাড়াও বহু লঙ্কাকাণ্ড অতীতে ঘটিয়েছেন এই পপসম্রাজ্ঞী।
টেকনো-পপ ও ইলেক্ট্রো-পপ ঘরানার আদি জনয়িতা রূপে সুতরাং তাঁকে ভেবে নেওয়াটা আশা করি অনায্য নয়। গানে ম্যাডোনা কেবল দেহ নয়, পরিপার্শ্বকে তুলে আনতে টেকনো স্পিরিচুয়াল সরঞ্জামাদিও ব্যবহার করেছেন অকাতরে। একই ম্যাডোনা কতই-না ভিন্ন, যখন ইরোটিকায় (Erotica) তাঁকে দেখছেন শ্রোতা! বিশেষ এই কালপর্বে পা-দিয়ে তাঁর দেহ রূপ নিয়েছিল এখনই ফাটবে এরকম মারণাস্ত্রে! ওই মারণাস্ত্রই আবার পরিহাসমুখর শারীরিক ভাষায় তির্যক হতে থাকবে আমেরিকান লাইফ (American Life) অ্যালবামের গানসম্ভারে।
পপগানের ভাষাকে ম্যাডোনা নতুন-ছকে ভেঙেছেন বটে! ভাঙার ফিরিস্তি অনলাইনে খোঁজ করলে গণ্ডায়-গণ্ডায় মিলবে, সুতরাং আপাতত সেদিকে না গেলেও চলবে আমাদের। আমরা স্থির থাকতে চাই, যেখানে ম্যাডোনার পরিণত উত্তরসূরি রূপে স্টেফানি ওরফে লেডি গাগা জন্ম নিচ্ছেন… সেখানটায়! ভাঙনের জয়গান ম্যাডোনাকে দিয়ে শুরু, আর লেডি গাগায় পৌঁছে তা বোমার জন্ম দিয়েছিল। জন্ম দিয়ে ক্ষান্ত হয়নি,—ঘটিয়েছিল বড়োসড়ো ‘বিস্ফোরণ’।
পপগানের ইতিহসে লেডি গাগাকে ‘বিস্ফোরণ’ যদি বলা হয়, মনে হয় না একে অতিরঞ্জন ভাববেন পাঠক। ভিন্নমত অনেকের থাকতে পারে, তবে ম্যাডোনার পর স্বকীয় নতুনত্ব গাগার মধ্যে যেভাবে প্রকাশিত হলো, তা একটি যুগের জন্ম অমোঘ করেছিল সে-কথা স্বীকার যেতে হয়। আর কোনো পপতারকাকে সম্ভবত নিজের গানে কৃষ্ণতায় আবিল উদ্ভটরস আমদানির দায়ে এতখানি সমালোচনা ও মিডিয়া ক্রিটিক সইতে হয়নি গাগার মতো করে।
দীর্ঘ গানযাত্রায় লেডি গাগা অনেকটা বোদলেয়ারের কবিতায় ছলকে ওঠা কিংবা ওজি অসবর্নের গানে গুঞ্জরিত ক্লেদজ কুসুমের উপমা হয়ে বিরাজ করেছেন। কুৎসিত-কদাকারকে তিনি আলিঙ্গন করলেন কুসুম ফুটতে দেখার আশায়।লেডি গাগার গানজার্নির মাহাত্ম্য যদি বুঝতেই হয়, সেক্ষেত্রে শার্ল বোদলেয়ার ও জাঁ আর্তুর র্যাঁবো, আর হেভি মেটালে মর্মরিত ওজি অসবর্নের ব্যতিক্রম যাত্রা আপনা থেকে সেখানে জায়গা নিতে থাকে। পপকুইন কী-হেন-কারণে মন্দ ও কদাকার সাজছেন গানে, যদিও তাঁর ভিতরে সক্রিয় রয়েছে সৌন্দর্যকে আলিঙ্গনের সুতীব্র খিদে… এর হদিশ পেতে সুতরাং এসব রেফারেন্স ভালো কাজে দেয়।
এসব কার্যকারণে লেডি গাগাকে নিয়ে বিস্তারিত বলাটা ভীষণ শক্ত কাজ! ম্যাডোনা যদি পপগানের দশভূজা দুর্গা হয়ে থাকেন, গাগা সেখানে জগৎ-সংহারী মা কালী। একই দেবীর ভিন্ন দুটি রূপ আমরা পাচ্ছি কাছাকাছি সময়ে। কথাটি যত সহজে বলছি এখানে, একে ব্যাখ্যা করে ওঠা ততটাই কঠিন। বিস্তারিত হওয়ার প্রয়োজন থাকছে সেখানে। যথেষ্ট পরিসর নিয়ে বলার চেষ্টা ছাড়া উলটো বোঝার সম্ভাবনা বাড়বে বিলক্ষণ। আপাতত যেসব আলাপ এখানে উঠবে, সেগুলোকে ওই বিস্তারে গমনের মহড়া ভেবে নেবো আমরা। কোনো একদিন হয়তো আলাপটি এভাবে পূর্ণতা পেতেও পারে।
লেডি গাগার সঙ্গে ম্যাডোনোকে জুড়ে ধান ভানতে বসে দরকারি হয়ে উঠছে দুই পপতারকার হৃষ্টপুষ্ট গানসম্ভার পুনরায় ভালো করে শোনা ও দেখার। অনেকদিন হয়ে গেল দুজনের কাউকে শোনা হয় না ভালো করে! অ্যা স্টার ইজ বর্ন-র চোখধাঁধানো সাফল্যের পর গাগাকে এই কিছুদিন আগেও ফ্যাশন আইকন গুচি সাম্রাজ্যে ঘটে যাওয়া কুখ্যাত খুনের ঘটনা অবলম্বনে তৈরি ছায়াছবি হাউজ অব গুচি-তে অভিনয় করতে দেখা গেছে। টড ফিলিপসের ‘জোকার’-এ জোয়াকিন ফিনিক্স একলা সকল আলো কেড়ে নিলেও গান ও অভিনয় দিয়ে গাগা ছবিতে ভালোভাবই ছিলেন।
ইদানীং বেশ নিয়মিত সিনেপর্দায় হাজির অভিনেত্রীর সঙ্গে তাঁর গানে বিস্ফারিত লেডি গাগার তফাত রয়েছে বিলক্ষণ। মধ্যবয়সে পা রাখা পপতারকা এখন সুস্থির সংসারী। ঝড়-ঝাপটা সামলে মা হয়েছেন শুনতে পাই। অদ্য বেশ পেলব ও আদুরে দেখায় তাঁকে। সোহাগে ঢলঢল যৌনপুতুল মনে হতে থাকে মাঝেমধ্যে! এর সঙ্গে ওই গাগার তফাত থাকছে, যিনি গানে আমদানি করেছেন বীভৎস অন্ধকার! আলকাতরার মতো ঘন কৃষ্ণতা ছিন্ন করে সুন্দরের আত্মাকে ছুঁয়ে দেখার অক্ষম আক্রোশ যাঁকে একদা পাগলাটে সব ঝড়ের সমুখে দাঁড়াতে উতলা করেছিল।
মনে-মনে ভাবি,—যাচ্ছে না, একদম যাচ্ছে না! মাদার মনস্টার ওরফে মাতৃদানব রূপে যাঁকে একটা সময় নিজেকে ঘোষণা দিতে দেখেছি, যার মধ্য দিয়ে পপগানের খোলসকে তিনি আর্টপপ-এ রূপান্তর করলেন অবলীলায়, সেই গাগা এখন সংসারী! তাঁর গর্ভে বেড়ে উঠছে নতুন প্রাণবীজ! প্রশ্ন জাগে বৈকি,—প্রাণবীজটি কি তাহলে অবশেষে মাতৃদানবের গর্ভে তাঁর বাসনা মিটাতে চলেছে?
মাত্র ঊনিশ বছর বয়সে তাঁকে ধর্ষণ করে অশুভ। প্রলয় কী আর এমনি-এমনি ঘটে। অশুভ ছিল সেখানে প্রলয়ের নটরাজ, যার অভিঘাতে লেডি গাগা হয়ে উঠলেন লেডি মনস্টার। এক মাতৃদানব;—যে-কিনা কদর্যতার অলিগলিতে খুঁজে বেড়ায় কুসুম;—যেটি তাঁর ভাষায় ‘অন্বেষণ সুন্দরের’। লেডি গাগার শিল্পীসত্তা ও গানের ভাষামুদ্রাকে এই ইশতেহার একাধারে গুরুতর ও বিতর্কিত করেছে বহুবার। ম্যারি দ্য নাইট;—রাত্রিকে এই মেয়ে একদিন বিবাহ করবে বলে পণ করেছিল। কেননা, তার মনে হয়েছিল,—মানবজীবন এক অনন্ত অন্ধকার রাত্রির চাদরে ঢাকা, এবং সেখানে বিচরণ চলছে অশুভর; আবার সেখান থেকে জন্ম নিচ্ছে শুভচেতনা। সময় হয়েছে তাকে কবুল বলার। বিবাহটি গাগার মধ্যে জন্ম দিয়েছিল মাতৃদানব। মা কালীর মতো প্রতিপলে জন্ম ও সংহারে লিপ্ত যে-দানব। এই আর্তি নিয়ে,—এভাবে সে কদর্যতায় ফোটাবে কুসুম। এই লেডি গাগার গানযাত্রাকে কলমে বর্ণনা করা তাই কঠিন; যথেষ্ট কঠিন!
বর্ন দিস ওয়ে গানে মাদার মনস্টারের ইশতেহার খুল্লামখুল্লা ঝেড়ে দিয়েছিলেন গাগা। গানলেখায় তাঁর কুশলতা চমৎকার। গানের কথায় উচ্চকিত ইশতেহারে পপকুইন ভিনগ্রহে নতুন প্রজাতির সৃষ্টিলগ্ন বর্ণনা করেছেন। মানব-প্রজাতির বিদ্যমান অস্তিত্বের বাইরে মহাবিশ্বের কোনো এক এলাকায় প্রজাতিটি জন্ম নিচ্ছে। জীবন সেখানে অন্তহীন;—জন্মও অনুরূপ অন্তহীন। মাতৃদানবের গর্ভ থেকে অবিরাম ভূমিষ্ট হচ্ছে তারা। মাতৃদানব সেখানে এমন এক প্রজাতি প্রসব করছেন, যারা সংস্কারে অন্ধ ও অবিচল নয়;—না একে অন্যকে নির্ধারণে তারা মরিয়া সেখানে।
মহাবিশ্বের এই সীমানায় স্বাধীনতা অবারিত। সীমানার প্রাচীর তুলে তাকে নিরোধের সুযোগ নেই। একই মহাবিশ্বের অন্য প্রান্তে ততক্ষণে জন্ম নিতে চলেছে অশুভ। মাতৃদানব স্বয়ং নিজেকে দ্বিখণ্ডিত করে জন্ম দিচ্ছেন শুভ ও অশুভ। তিনি প্রসব করছেন সীমাহীন স্বাধীনতার সুখ, এবং তার গর্ভ চিরে বেরিয়ে আসছে কিম্ভূত কদাকার। চিরায়ত জীবনের দুই চরম শক্তি জন্ম নিচ্ছে সৃষ্টির শর্ত মেনে। কেন? গানে তার উত্তর দিয়েছেন গাগা। মাতৃদানব স্বয়ং দামি কথা বলছেন সেখানে : How can I protect something so perfect without evil?
সৃষ্টিতে নিখুঁত বলে কিছু হয় না। নিখুঁতকে যদি জন্ম নিতে হয়,—খুঁত ও ত্রুটিভরা অশুভকে বাদ দিয়ে তা সম্ভব নয়। বাইবেল-এ প্রায় অনুরূপ ধ্বনি আমরা পাবো, যেখানে যিশু বলছেন : ভালোর মাহাত্ম্য বুঝতে মন্দের আছে প্রয়োজন। লেডি গাগার মাদার মনস্টার-এর কবিতাঘন ইশতেহারে আমরা পাই অনুপম এই কাব্যচরণ :
The pendulum of choice began its dance. It seems easy, you imagine, to gravitate instantly and unwaveringly toward God.
মাতৃদানব নিজেকে দ্বিখণ্ডিত করে শুভ ও সুন্দরের পাশে সৃজন করলেন মন্দ ও অশুভ। ‘বিউটি’ ও ‘আগলি’কে প্রসব করলেন নিজে। তার মাঝখানে দুলছে ঘড়ির কাঁটা;—সে নৃত্য করছে; এবং, বাধ্য করছে দুটির মধ্যে একটিকে বেছে নিতে। লেডি গাগার সংগীতসত্তা এই নিয়মফেরে ‘বিউটি’ ও ‘আগলি’র চিরন্তন দ্বন্দ্বে বোঝাই। কুৎসিতের প্রতিটি রন্ধ্রে তিনি প্রবেশ করছেন, যেহেতু, এছাড়া কারো পক্ষে সুন্দরের মূল্য বোঝা সম্ভব নয়।
লেডি গাগাকে শ্রোতারা একসময় মাদার মনস্টার রূপে চিনেছেন সম্যক। শানদার গলার আওয়াজে ধনী গাগা তখন পুরোটাই ছন্নছাড়া। ছিলেন অদ্ভুত! অনেকের চোখে অশালীন ও কিম্ভূত। দেহ ও ত্বকসজ্জায় কৃত্রিম উপকরণের (Prosthetic) বাড়াবাড়ি ছিল ব্যাপক;—যেখানে বডিহররের অজস্র উপাদান তিনি ব্যবহার করেছেন ওজি অসবর্নের মতোই অবলীলায়। এই গাগা মা কালীর মতো প্রতি পলে প্রসব করেন সংহার। তাঁর গায়ে নাই বসন। মাথার চুল থেকে পায়ের নখ অবধি বিকৃত ও কাদাকার রাখছেন স্বেচ্ছায়। আবার ফিরতে হয় ম্যাডোনায়। আটের দশকে পপকুইনের মুকুটধারী ম্যাডোনা তথাপি যুগের শর্ত মেনে দেহ-প্রদর্শনের ঘটনায় সুবোধ বালিকা থেকেছেন কমবেশি। লেডি গাগায় এসে তার সবটা ভেঙে পড়েছিল নিমিষে।
আশি ও নব্বইয়ে বাজার পাওয়া গানের ঘরানায় ম্যাডোনাকে বিশ্বস্ত দেখেছেন শ্রোতা। ইলেক্ট্রো-পপ, হাউজ, ডিস্কো, আরবান R&B-র জগাখিচুড়িকে বুদ্ধিদীপ্ত মুন্সিয়ানায় ব্যবহার করেছেন গায়িকা। তাঁর কণ্ঠস্বর গাগার মতো শানদার শোনায় না কানে। ঘাটতি ঢাকাতে বুদ্ধিদীপ্ত যৌনাবেদনে ঠাসা মুখশ্রী ও দেহখানা চতুরভাবে ব্যবহার করলেন পপকুইন;—সঙ্গে থাকে বিষয়-বৈচিত্র্য।
লেডি গাগা এদিক থেকে ডিনামাইট। স্পিচলেস (Speechless), ডোপ (Dope), মিলিয়ন রিজনস (Million Reasons), পোকার ফেস (Poker Face),ব্যাড রোমান্স (Bad Romance) ছাড়াও শ্রোতাপ্রিয় বহু গানে পিয়ানো তাঁর হাত পড়ে ঘটিয়েছে প্রলয়। গানের ভাব ও আবেদন অনুসারে পিয়ানোয় লেডি গাগার সঞ্চালন শ্রোতার জন্য বিশেষ অভিজ্ঞতা হয়ে দাঁড়ায় প্রায়শ।
আরো অনেক পপতারকার মতো ম্যাডোনাও হলিউডি কেতায় তৈরি ছবিতে অভিনয় করেছেন। অভিনয়শিল্পী হিসেবে খারাপ করেছেন তা বলা যাবে না। পপগানের পরিবেশনায় অভিনয়শিল্পের খুঁটিনাটি এমনিতেও থাকে মজুদ। ম্যাডোনাকে তা সাহায্য করেছে সেখানে। তথাপি, অভিনয়শিল্পী রূপে ম্যাডোনা বা পরবর্তী আরো অনেক পপতারকার স্বাতন্ত্র্যকে মানুষ মনে রাখার ঠেকা বোধ করেনি। লেডি গাগাকেও গানের শিল্পী রূপে চেনার চেষ্টা করেছে তারা। এ-কথা তবু বলতেই হচ্ছে,—লেডি গাগাকে দেখে মনে হয় মায়ের পেট থেকে নেমেই থিয়েটারে সবক নিয়েছেন! তাঁর গানে যে-কারণে দেহের প্রতিটি বাঁক ও মোচড়ে অভিনয়ের ছলাকলা আপনা বেগে ছলকায়।

গানের এক-একটি জনরা/ঘরানায় ম্যাডোনা মোটের ওপর সুস্থির। লেডি গাগাকে সেখানে নিখাদ কেতাবি বলা মুশকিল হয়ে ওঠে। গানের আবহ বুঝে তাঁর গায়কি পালটেছে ফিরে-ফিরে। শ্যালো (Shallow), অলওয়েজ রিমেম্বার আস দিস ওয়ে (Always Remember Us This Way)… ইত্যাদি গানে গাগার গায়কির সঙ্গে মাদার মনস্টার ও আর্টপপ পর্বে বেরিয়ে আসা গানসম্ভারের ফারাক খোলা চোখেই ধরতে পারেন শ্রোতা-দর্শক।
ম্যাডোনার বিশেষত্ব হলো,—নিজের দেহকে ধারালো ছুরির মতো ব্যবহার করে পপগানে বইয়ে দেন নতুনত্ব। সমাজ-স্বীকৃত অনেক সংস্কারকে ধাক্কা দিয়েছেন মূলত এর জোরে। নারীদেহকে ঘিরে পুরুষমনে যেসব বাসনা ও বিকারের রাজত্ব চলে,—তার অনেকখানি ভাঙতে এটি ছিল তুরুপের তাস। ভাঙচুরের খেলায় যেখানে তিনি শিকার না-হয়ে শিকারি হয়েছেন স্বয়ং। শিকারি তাঁর দেহকে সাক্ষাৎ টোপ হিসেবে হাজির করে গানে, আর সেই টোপ গিলতে আসা পুরুষের তাতেই ঘনায় মরণ। নিজের গানে ম্যাডোনা সর্বাবস্থায় যৌনটোপ। দেহকে পোশাকের আবরণে ঢাকা অবস্থায় যেমন যৌনটোপ, আবরণহীন ম্যাডোনাও তাই বটে! ফলত, তাঁর গানে ছলকে ওঠা রোমান্স, ফ্যান্টাসিঘন ভালোবাসার ক্ষুধা, স্মৃতিকাতর প্রেমোচ্চারণ, আর বিধ্বংসী যৌনাবেদনের সবটুকু মোড় নেয় ছলনা ও প্রতারণায়।
যেসব মন্ত্র আওরে নারীদেহকে বেটাছেলেরা হামেশা গ্লোরিফাই করে, পছন্দের কোনো নারীকে বাগে আনার ফন্দি আঁটে, এবং বাগে আনার পর করে উপভোগ ও প্রবঞ্চনা,—এবং সেখানে আরো যত পন্থা ধরে তারা জাল পাতে সচরাচর,—ম্যাডোনা তাঁর যৌনাবেদনে ঠাসা মুখশ্রী ও দেহত্বকের নিচে সংগোপন মারণবিষ দিয়ে সেই জাল কেটে বেরিয়ে আসেন। সেইসঙ্গে বধ করেন ওইসব টাবু ও টোটেম, যেগুলো নারীত্বের ভূষণ বলে পুরুষরা জগতে প্রচার করে। সুতরাং এ-কথা বলা যায়,—নিজের দেহকে চকচকে ইস্পাতশলাকার মতো ব্যবহারের ক্লান্তি ম্যাডোনার গানে মাঝেমধ্যে প্রকট হয়। তাঁর মধ্যে তখন জেগে ওঠে প্রথাভাঙা ক্রোধ। ইরোটিকা অ্যালবামের গানগুলোয় এর প্রমাণ শ্রোতারা সবথেকে ভালোভাবে পায় বলে আমরা ধরে নিতে পারি।
এসব কাণ্ড ঘটাতে যেয়ে পপআর্টে ম্যাডোনাকে নিয়ে আসতে হয়েছিল নতুনত্ব। পোশাকে তাই এলো ভিন্নতা। গায়ে উঠানো গহনায় পাঙ্কধাঁচের জিনিসপত্রের ঘটালেন সমাহার। মেরিলিন মনরো ও লেডি ডায়ানার মুখশ্রীকে নিজ মুখাবয়বে যেন-বা টুইস্ট করলেন পপতারকা। ভিন্ন দুই পীড়ন ও একাকীত্বের শিকার নারীকে নিজ দেহে জায়গা দিলেন। এই ম্যাডোনা যখন নগ্ন পোজ দিচ্ছেন ম্যাগাজিনের পাতায়, সেখানে তাঁর দেহ নরমা জিন বেকারকে ধারণ করে নিজস্ব কেতা মেনে। দেহটি অবশ্যই ইরোটিক;—তবে মেরিলিন মনরোর মতো নিজেকে অন্যের শিকার হতে দিতে অনিচ্ছা জ্ঞাপন করছে। ম্যাডোনার দেহে উপচে ওঠা মেরিলিন ও তাঁর ভুবনবিখ্যাত নগ্নতা এখানে এসে বিপজ্জনক ফাঁদে পরিণত হয়। বুঝিয়ে দেয়,—এই নগ্নতা কারো প্রতারণা সইতে অভ্যস্ত নয়।
মাথায় ডায়ানার মতো ফ্লানেলের টুপি চাপানো ববকাট ম্যাডোনাকে আবার রাজবধূর মতো নিষ্পাপ ভেবে নেওয়ার কারণ অবশিষ্ট থাকে না। ডায়ানাসাজে ম্যাডোনা হয়ে ওঠেন চতুর চপল ছলনাজাল। সবমিলিয়ে তাঁর মধ্যে নারীবাদ-চর্চিত ব্যাপার-স্যাপার থাকে, যেগুলোকে গানের প্রতি অঙ্গে ঢোকানোর কারণে ম্যাডোনাকে নারীবাদী বয়ানের সাহায্যে পাঠ করা অযৌক্তিক থাকে না।
লেডি গাগার ওপর ম্যাডোনার প্রভাব এদিক থেকে গভীর। তবে, গাগা সেখানে ক্রমশ ছাড়িয়ে যেতে থাকবেন ম্যাডোনাকে। হয়ে উঠবেন এমন এক পপআর্টিস্ট,—পপগানের ইতিহাসে তাঁর মতো করে আর কোনো শিল্পী নারীদেহকে এভাবে রিডিং ম্যাটেরিয়াল করে তুলতে পারেনি। এবং, এটি হলো সেই সময়, লেডি গাগার গানযাত্রার আদি ও মধ্যপর্ব,—গানের দেহে যখন তিনি লিখছেন এমন এক নারীদেহের কথা,—যে কিনা ধর্ষিতা!
মি-টু ঝড় তো উঠেছে অনেক পরে। দুইহাজার তেরো কি চৌদ্দয় লেডি গাগা জানাচ্ছেন,—নাম নিতে চাই না, তবে নামকরা এক সংগীত পরিচালক ঊনিশ বছরে পা-রাখা মেয়েটিকে খুবলে খেয়েছিল। মেয়েটির মধ্যে জন্ম নিয়েছিল ট্রমা। নিজের দেহকে নিয়ে ট্রমা। গন্তব্যহীন নাবিকের মতো যে-তখন নিউ ইয়র্ক শহরের অলিগলি ঘুরছে। নেশা করছে বেহেড মাতাল-প্রায়। ফুটপাতে শুয়ে রাত কাবার করাটা তার কাছে পরম স্বাভাবিক মনে হচ্ছে তখন। এই গাগা সেই গাগা নয়, যে-কিনা ভালোবাসে কবিতা; ফ্যাশনে আছে ঝোঁক; দার্শনিকরা তাকে টানে; আর সে ছিল বটে আর্টলাভার।
ট্রমা গাগার মনে জন্ম দিলো জিজ্ঞাসার : এই-যে একটি পুরুষ তাকে সুযোগ পেয়ে চেপে ধরল, লালসা মিটাতে ছিন্নভিন্ন করল,—পুরুষটি আসলে কাকে ছিন্নভিন্ন করেছিল সেদিন? সেটি কি দেহ ছিল? তাই যদি হয়ে থাকে,—নারীদেহ নামক রক্তমাংসের পিণ্ডটি আসলে কী? যৌনবোমা? পুরুষ সেখানে নিজেকে ঢুকিয়ে দিচ্ছে;—কারণ, সে বিস্ফারিত হতে চায়? গাগা বুঝে গেলেন,—পুরুষের প্রয়োজন একটি পিচ্ছিল পরিসর;—একখানা টানেল কেবল চাই শুধু! টানেলে ঢুকতে তাকে প্রলোভিত করতে পারে এমন একখানা দেহ থাকলেই চলবে সেখানে। দেহটির বয়স, রূপ, গঠন বড়ো বিষয় নয়। দেহ যদি আবেদন জাগাতে পারে পুরুষমনে,—ওতেই চলবে দিব্যি। সেখানে, এই দেহখানা ছুকরি না বুড়ি কারো, বাচ্চা না মাঝবয়সীর,—দেখতে সে মনোহর, চটকদার অথবা কুৎসিত… ওসবে কিছু যায় আসে না। গণ্য হলো,—এই দেহ পুরুষের পাশব প্রবৃত্তিতে কোনো একভাবে জাগিয়ে তুলছে আবেদন।
এখানে পৌঁছে লেডি গাগা বুঝে গেলেন,—আবেদনকামী বুভুক্ষুা, বিস্ফারিত হওয়ার দুর্মর তাড়না পুরুষকুলকে শক্তিশালী করার পরিবর্তে উলটো ভঙ্গুর রেখেছে। এমন এক দুর্বলতা, যাকে ভয় পাওয়ার কারণ নেই। দরকারি হলো,—নিজের আত্মাকে শক্তিশালী করতে ভয়ের সামনে দাঁড়ানো। নারীদেহকে সকল অবস্থায় এমন এক চিহ্ন ও দ্রষ্টব্য করে তোলা, যার আকর্ষণকে পুরুষ অপ্রতিরোধ্য ভাবতে বাধ্য হবে। ম্যাডোনাকে দিয়ে এই জেন্ডার পলিটিক্সের সূত্রপাত ঘটেছিল, আর লেডি গাগায় পৌঁছে তা পেলো পরিপূর্ণতা।
পুরুষশাসিত বিশ্ব নারী থেকে আরম্ভ করে জেন্ডার-রেস-রিলিজিয়নের নামে যত বয়ান তৈরি করেছে, এবং সেগুলোকে মারণাস্ত্রের মতো ব্যবহার ক্ষমতা-রাজনীতির বলয়ে তাকে সুরক্ষিত রাখছে,—নিজের দেহকে এ-বেলায় সেই সুরক্ষাবলয় ভাঙার কাজে নিবেদন করলেন গাগা। তাঁর মধ্যে তখন থেকে আর কোনো ভয় কাজ করেনি। দেহকে অতঃপর সাবজেক্ট করতে সকল দ্বিধা কেটে গেল। যেটি তাঁর ভাষায়,—ট্রমাকে শিল্পে ভাষা দিতে আমাকে সাহায্য করেছিল। আর্টপপ অ্যলবামের গানগুলো ততদিনে পরপর আসছে; আর লেডি গাগা অকথ্য বিতর্ক ও সমালোচনার চাপ সামলে বড়ো তারকা হওয়ার পথ ভাঙছেন তবু। বিশ্বজুড়ে তাকে শুনছে শ্রোতারা। মঞ্চে ওঠার থাকেনি বিরাম।
আর্টপপের গান তৈরি করতে বসা শিল্পী ততদিনে দৈহিক ও মানসিক ধকলে বিধ্বস্ত। হিপ ইনজুরি বাগাড়া দিচ্ছিল বেশ। মনে যখন-তখন হানা দিচ্ছে নির্দয়ভাবে ধর্ষিত হওয়ার মুহূর্তরা। তাঁর গান নিয়ে সমালোচনা ছিল প্রবল। একটি করে অ্যালবাম বের হচ্ছে, আর মিউজিক ক্রিটিকরা সেগুলো নাকচ করতে মরিয়া থাকছেন। মিডিয়া পুরোদমে পাপারাজ্জির ভূমিকায় নিয়েছে পিছু। গসিপ ছড়াচ্ছে যা-খুশি। সবমিলিয়ে পপতারকার মনে ঘনাইছে নেম-ফেমের চূড়া থেকে পতনের শঙ্কা। তার মধ্যেই আর্টপপের এক-একটি গানে মাদার মনস্টারকে পূর্ণতা দানে গাগা থেকেছেন অটল।
দেরিদার তত্ত্ব ধার করে বলা যায়,—দেহ নিয়ে সমাজে যত ধারণা ও সংজ্ঞা বিরাজ করে, সেগুলোকে différance ও undecidability-র সাহায্যে নতুন ন্যারেটিভে পালটে দিচ্ছিলেন লেডি গাগা। এক-একটি গানে তাঁর নিজেকে উপস্থাপনের বিষয়কে যেসব শ্রোতা-দর্শক কুৎসিত ভেবে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছিলেন,—তারা সেখানে ভুল ভাবছিলেন তা নয়। নারীদেহকে ঘিরে তৈরি সমাজ-স্বীকৃত বয়ানগুলো তাতে ইন্ধন যুগিয়েছিল। যেসব বয়ান ব্যবহার করে মানুষের মনোজগতে নারীদেহের প্রতিমা গড়ে তোলা হয়েছে, সেগুলো সকলের মস্তিষ্কে চিরস্থায়ী রূপ নিয়েছে এতদিনে। সুতরাং, দারুণ গায়কি ও কথার ওজন সত্ত্বেও তাদের কাছে লেডি গাগাকে কিম্ভূত ঠাউরানো অবান্তর ছিল না।
লোকজন তাঁর গানকে আগলি মনে করুক;—লেডি গাগা কিন্তু তা চাইছিলেন। তাঁর গানকে এভাবে ভাবার অর্থ হলো,—দেহকে ঘিরে গড়ে ওঠা বয়ানে তিনি ধাক্কা দিতে পেরেছেন। গানের কথা ও উপস্থাপনা এই বার্তা তাহলে পৌঁছে দিতে সফল,—মানুষ যেসব ন্যারেটিভ গিলে তাঁর গান শুনতে ও দেখতে বসছে, সেগুলো একমাত্র নির্ধারক নয়। এগুলোর সাহায্যে নারী, রেস, রিলিজিয়নকে তারা নির্ধারণ করতে পারছে না তাঁকে দেখার পর। বর্ন দিস ওয়ে-সহ এরকম গানগুলোয় বার্তাটি আমরা পাচ্ছি। উল্লেখিত গানে লেডি গাগা অবলীলায় বলে দিচ্ছেন :
I’m beautiful in my way
‘Cause God makes no mistakes
I’m on the right track, baby
I was born this way.
কিম্ভূতসাজে হাজির নারী মারাত্মক আবেদন রাখছে সেখানে। তাকে সম্ভোগের তাড়না জাগিয়ে তুলছে শিশ্নে! এখানে যারা কুইয়ার (Queer) নামক ছাতার নিচে সমবেত, যারা হিজড়া, সমকামী, যৌন-অশক্ত, এবং আরো যারা সমাজ কর্তৃক “অপর” বা “Other” নামে চিহ্নিত, তাদের সকলের কথা চারটি চরণে বলে দিয়েছেন গাগা। ধর্ষিতা নারীদের জন্য এভাবে পৃথক বয়ানবিশ্ব তৈরিতে তাঁর গানে অবিরাম কুৎসিতের প্রবাহ চলে। এটি তাঁর ভাষায়,—তোমরা যকে কুৎসিত দাগিয়ে বাইরে ঠেলে দিতে মরিয়া হয়েছো, সেই তোমাদেরকে বলছি : আই ডিফার। ব্যাড রোমান্স গানে যার নির্যাস শ্রোতারা পাচ্ছেন পরিষ্কার। যেমন পাচ্ছেন ম্যারি দ্য নাইট অথবা দ্য এজ অব গ্লোরির মতো গানে।
ম্যাডোনার ইরোটিক হওয়াটা তবু প্রথার সীমানা ধরে জাগিয়েছে যৌনাবেদন। গাগায় ইরোটিকের রং আগাগোড়া কদর্য কিম্ভূত। পিঠে হাড় বের হয়ে আছে। চোখে অসম্ভব বৃহৎ পিউপিল। দাঁতে হীরার দ্যুতি;—তবু, এবং তবুও… এই কদর্য নারীদেহ সেখানে জাগিয়ে তুলছে কামনা। শ্রোতা ও দর্শক, তাবড় পুরুষবিশ্বের শিশ্নকে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে। এই নারীদেহ পুরুষচোখে ভোগ্য নয় অতটা, এটি সেখানে কামঘন ভয় ও শিহরনের উৎস হয়ে তার শিশ্নকে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে!
ভয় থেকেও জন্ম নিতে পারে দুর্মর কামবাসনা। কুৎসিত থেকে জাগতে পারে যৌনপিপাসা। ধর্ষিতা নারীকে কে আবার চাইবে ধর্ষণ করতে! গাগা ডিফার করছেন। পরিষ্কার বলে দিচ্ছেন,—একটি ধর্ষিত নারী স্বয়ং সেই দানবী, পুরাণকথার লিলিথ, যাকে দানবী ভেবে আদম তার শিশ্ন ব্যবহারে ভীত হয়েছে। লেডি গাগা অদ্য সেই ভয় পয়দা করছেন গানে। ওজি অসবর্নদের হাতে পড়ে নতুন মাত্রা ও চরিত্রে দুর্দমনীয় হয়ে ওঠা বডিহররের মৌলধারণা এভাবে মোড় নিলো নতুন শৈল্পিকতায়। লেডি গাগা তাঁর ধর্ষিত হওয়ার অভিজ্ঞতাকে ব্যাপক করেছেন গানে। সরাসরি বলছেন না একবারও,—আমি ধর্ষিতা। উলটো সমাজ ধর্ষিতার ওপর টাবু চাপিয়ে সব চেপে যেতে বলে, গাগা তাঁর গানের ভাষা ও দেহের মুদ্রায় জাগিয়ে তোলা বীভৎসরসের মধ্য দিয়ে এর সঙ্গে ডিফার করছেন। ভিন্ন আঙ্গিকে দেহকে হাজির করে পুরুষমনে পয়দা করছেন কল্পনা ভারাতুর ফ্যান্টাসি। বলাবাহুল্য, এখানে পা দিয়ে তিনি ম্যাডোনাকে ছাড়িয়ে উঠে গেছেন চূড়ায়।
গাগার সকল গানে ‘আগলি’ ও ‘বিউটি’র দ্বন্দ্ব সুতরাং নিছক নতুনত্ব দিয়ে বাজিমাতের ভাবনা ও ক্রেজ তোলার ঘটনায় আটকে থাকেনি। ‘আগলি’ এখানে যৌনাবেদন ও যৌনসাড়া জাগাতে সফল। দেহকে আবিষ্কারের পথ পেরিয়ে তিনি হানা দিচ্ছেন ব্যক্তিনারীর জগতে। মাদার মনস্টার থিয়োরির সবটা একা গিলে খেয়েছেন গাগা। পৃথিবীতে কতজন লেখক, সিনেমাকার, চিত্রশিল্পী আছেন কে-জানে, গাগার মতো করে যাঁরা বডিহরর, বডিআর্টকে রপ্ত ও ব্যাপ্ত করতে পেরেছেন বিশ্বে! মাদার মনস্টার ও আর্টপপ পর্বে তৈরি গানগুলো নিয়ে কাজেই অনায়াসে লেখা সম্ভব ঢাউস কিতাব।

গাগা এখানে থামবার মেয়ে নন। বর্ন দিস ওয়ে গানে মুখ ও কাঁধে মাংসপিণ্ডের মতো কৃত্রিম হাড় বসিয়ে বলে উঠছেন : This is my original body. পাপারাজ্জি (Paparazzi) গানে হুইলচেয়ারে বসে পোজ দিচ্ছেন। সোনায় সেলাইকরা পা-দুটো সেখানে যেন বলছে, ‘তুমি যদি আমায় অসাড় করো, আমি তথাপি ভোগ্য হয়েই থাকব। তুমি তা উপেক্ষার শক্তি রাখো না হে পুরুষ।’ জি. ইউ. ওয়াই (G.U.Y) গানের ভাষায় গাগা গ্রিক দেবী আফ্রোদিতির বেশ ধরছেন, অন্যদিকে মানব-নির্মিত সংকরসত্তায় হাজির করছেন নিজেকে। লেডি গাগার গান নারীবাদের সকল তত্ত্ব ও তাত্ত্বিকতা অতিক্রম করে নিজ-শক্তিতে গরিয়ান হতে কোনো খামতি রাখেনি কোথাও। ধর্ষিত নারীদেহকে শোকের বিষয় না-করে মিথে শক্তিশালী করা তাঁর লক্ষ্য সেখানে। গাগার গানের ফিলোসফিতে কাজেই এরকম বার্তা অমোঘ হয় : ‘আমি দানব, কেননা সমাজ আমাকে তা বানিয়েছে; আর এখন আমি এইসকল দানবের মা।’
সমাজের সঙ্গে গাগার সংলাপ সরাসরি। মুখাবরণ-এ (Aura) মর্মরিত ভাষায় তাঁকে কি আমরা বলতে শুনিনি : Do you wanna see the girl who lives behind the aura? বোরখার আড়ালে যে-নারীদেহ রয়েছে, তাকে দেখতে চাও তুমি? গাগা এখানে বন্দুক হাতে বোরখায় নিজের মুখ আড়াল করছেন। পিছনে সক্রিয় যৌনহিংসার ইঙ্গিত। গানটিকে জেন্ডার প্যারোডি না-বলে উপায় থাকে না। বোরখা সেখানে পবিত্র শালীনতার চিহ্ন হওয়ার পরিবর্তে ফেটিশ অবজেক্টে মোড় নিতে থাকে। আচ্ছাদনকে এক্ষণে প্রতিশোধ চরিতার্থের হাতিয়ার করছেন গাগা।
দেরিদার তত্ত্ব ধার করে হয়তো বলা উচিত,—‘aura’ কোনো মৌলিকতা নয়। বোরখা বা মুখাবরণ বরং মানবসত্তাকে অনুপস্থিত ও স্থগিত সত্যের ছায়ায় ঢেকে ফেলে। গাগা যেমন তাঁর গানে আবরণকে কাম জাগিয়ে তোলা বিভীষিকার জন্য ব্যবহার করেছেন। বোরখা সেখানে পুরুষকে বোকা বানিয়ে ঘায়েল করার অস্ত্রে রূপায়িত। আড়ালে না-জানি কী আছে ভেবে পুরুষ দুর্মর বাসনায় পোড়ে, আর এটি তাকে ভঙ্গুর ও হাস্যস্পদ প্রাণী করে তোলে গানে।
এতক্ষণ ধরে যে-গাগার বিবরণ আমরা দিয়ে যাচ্ছি, এর সঙ্গে বর্তমানের লেডি গাগার ভিন্নতা খাপছাড়া মনে হলেও, গাগা আসলে কক্ষচ্যুত হননি একচুল। পুরোনো গান নিয়ে দুইহাজার বাইশ সনের টোকিও শহরে ক্রোমাটিক বল এক্সপেরিয়েন্স-এ হাজির হয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন তিনি আরো পরিণত হয়েছেন এখন।মেরিনা আব্রামোভিচের সঙ্গযাপন তাঁকে শিখিয়েছে, দেহকে কীভাবে নীরবতায় ভাষা দিতে হয়; করে তুলতে হয় প্রতিরোধের হাতিয়ার। টোকিওর গানমঞ্চে এর প্রতিফলন শ্রোতা-দর্শকরা পেয়েছেন অনেকটা। লেডি গাগার নতুন পুনর্জন্ম দেখেছে বিশ্ব। যেটি, মেনহাইম অ্যালবামে আধ্যাত্মিক একাগ্রতায় ধরেছেন শিল্পী।
তাঁর গানে সময়ানুগ ঘরানার ব্যবহার বিষয়ে আলাদা করে বলার কিছু নেই। গুচ্ছের বই লিখে সেগুলো বলা হয়েছে ইতোমধ্যে। আর্টপপকে তিনি সস্পূর্ণতা দান করেছেন। ম্যাডোনা যা করে উঠতে পারেননি, তার অনেকখানি গাগা করেছেন বা এখনো করে যাচ্ছেন। এসব কার্যকারণে তাঁকে নিয়ে আলাপ দু-চারকথায় আঁটানোর নয়। পপগানের ইতিহাসে এই শিল্পী সময় থেকে এগিয়ে থেকেছেন। তাঁকে ছেটে দিলে আমরা হারাই এমন এক অনুভূতি ও বয়ান, যেখানে বাকিরা পৌঁছানোর চিন্তা করে না সহজে। কারণ, গাগার গান তার দেহকে দিয়ে লেখা হয়েছে, যেটি একদিন হয়েছিল ধর্ষিত। দেহ থেকে জন্ম নিয়েছিল মাতৃদানব। হল অব ফেম-এ ম্যাডোনা পপগানের মুকুটহীন সম্রাজ্ঞী হতেই পারেন, কিন্তু গাগা সেখানে পৃথক মহিমায় গরিয়ান। পপগানে তিনি পুনর্জন্ম নিয়েছেন দেহকে অগ্নিশিখায় পুড়িয়ে পরবর্তী অধ্যায়টি রচনার জন্য।
. . .
. . .



