পোস্ট শোকেস - সাহিত্যবাসর

জীবনানন্দ, তোমাকে ভেবে-২ : হেলাল চৌধুরী

Reading time 5 minute
5
(27)

কবিতা সিরিজ : জীবনানন্দ, তোমাকে ভেবে : পর্ব-২
(নিরীক্ষা ও বিনির্মাণে জীবনানন্দ দাশের অন্ধকার)
রচনা : হেলাল চৌধুরী

Poetry Series: Jibanand, Thinking of You-2 by Helal Chowdhury; @thirdlanespace.com

ফাল্গুনে আগুনে জ্বলে উঠলেন তারা

Hiroshima mon amour: Song Version of the poem, V 1; Created in collaboration with AI; @thirdlanespace.com

এখনও
বুকে হিরোশিমা নাগাসাকি পোড়ে;
হেলেন চেয়ে শোভনারে খোঁজে
এখানে আজও, হেলাল হাফিজ জীবনানন্দ মনে…

ইসাক আর ব্লন্ডিরে চেয়ে
জ্বলে উঠলেন একদিন হিটলার মিউনিখ আগুনে;
এখানে আগুনের প্রেমে বললেন
রায়হান, বারবার আসবেন তিনি আরেক ফাল্গুনে…

এখানে নিয়ত হেলেন পোড়ে
পোড়ে ইসাক আর ব্লন্ডি
বারবার তাই জ্বলে ওঠেন
এখানে, রায়হান হিটলার হেলাল হাফিজ আগুনে।
. . .

অথচ বলেছিলে তুমি

আজ তোমার কলকাতা-চিল কাঁদে ঢাকার আকাশে
চিমনির মুখ ধোঁয়াশায় উন্মুখ
তোমার পেঁচার ঠোঁট সাঁড়াশি বুট;
বাস ট্রাম তোমার করেছে আজ ধর্মঘট, অথচ
বলেছিলে তুমি, কলকাতা একদিন কল্লোলিনী তিলোত্তমা হবে…

ব্যাবিলনের রানির ঘাড় — তোমার
আজ পৃথিবীর অন্ধকার ভাগাড়
হাইড্রেন্ট খুলে দিলে সহজেই জল গড়ায় রাস্তায়;
বাস ট্রাম তোমার করেছে আজ ধর্মঘট, অথচ
বলেছিলে তুমি, কলকাতা একদিন কল্লোলিনী তিলোত্তমা হবে…

আজ পাড়ায় পাড়ায় হিরোশিমা নাগাসাকি জাগে
পার্ল হারবার ফুঁসে ওঠে আরবার
করুণ কান্নায় আকাশে তোমার শঙ্খচিল ওড়ে;
বাস ট্রাম তোমার করেছে আজ ধর্মঘট, অথচ
বলেছিলে তুমি, কলকাতা একদিন কল্লোলিনী তিলোত্তমা হবে…
. . .

তোমার সুদর্শনাকে নিয়ে পৃথিবী আজ ব্যস্ত

উঠোনে কিন্নরশরীর দেবদারু গাছ নড়ে
তার চিকন আঙুলের মুদ্রায় তোমার অমৃত সূর্য হাসে
আমি জানি চন্দ্রমল্লিকায় কোনও কলুষিতা নেই;
তোমার পাঁচ রমণীর মতো নয়, আমাকে
বনলতানসেন-চোখে আজ ইলাও দিয়ে যায় দুদণ্ড শান্তি…

তোমার সুদর্শনাকে নিয়ে পৃথিবী আজ বড়ো বেশি ব্যস্ত
মৃতদার নারী নয় সে, হয়তবা সে কোনও-এক নির্জন মানুষ
নারী সে যৌনতা চায়নি, আজও জানি পবিত্র তার শরীর;
তোমার পাঁচ রমণীর মতো নয়, আমাকে
বনলতানসেন-চোখে আজ ইলাও দিয়ে যায় দুদণ্ড শান্তি…

দাঙ্গা, মন্বন্তর, মহাযুদ্ধ — নারী তার নিলয়ে ক্ষত-বিক্ষত
সুন্দর নয় সে, তবু সে তোমার পরিচিত রোদের মতো
সুদর্শনা তাই, যৌনতা আগলে মৃত নয় আজ — অমৃত;
তোমার পাঁচ রমণীর মতো নয়, আমাকে
বনলতানসেন-চোখে আজ ইলাও দিয়ে যায় দুদণ্ড শান্তি…
. . .

তোমার সবুজ ঘাসের দেশ

তোমার সবুজ ঘাসের দেশ এখন অদ্ভুত আঁধার এক
এখানে আবারও তোমার কবেকার বিদর্ভ নগর জাগে
এখানে তোমার চিলেরা চায় সূর্যের বিধান
অন্ধকারের জোনাকির মতন;
এখানে এখনও তোমার হাজার বছর শুধু খেলা করে
আমার দেবদারু ছায়া জোছনায় বালির উপর ইতস্তত
তোমার পিরামিডের কায়া শব হয়ে আজ চিতার কবলে…

তোমার রাত্রির নিধান
শুয়ে আছে আজ কল্লোলিনী তিলোত্তমা জলে
বিচূর্ণ থাম দেবদারু ছায়া
এখন ব্যাবিলনের রানির কায়া;
এখানে এখনও তোমার হাজার বছর শুধু খেলা করে
আমার দেবদারু ছায়া জোছনায় বালির উপর ইতস্তত
তোমার পিরামিডের কায়া শব হয়ে আজ চিতার কবলে…

শরীরে ঘুমের ঘ্রাণ
ধূপ হাওয়া শতাব্দীর বিরহিণী মন
নির্বাক পিরামিড মেঘালয় মেঘ মেঘের সীমানা
অথবা নীলিমায় আজও তোমার রুধির-লিপিকা;
এখানে এখনও তোমার হাজার বছর শুধু খেলা করে
আমার দেবদারু ছায়া জোছনায় বালির উপর ইতস্তত
তোমার পিরামিডের কায়া শব হয়ে আজ চিতার কবলে…
. . .

জ্বলে ওঠো তুমি সুকান্তের দেশলাই ঠোঁটে বারুদে

Ganalekhkho : Tumake Bolochi Shuno, Version-2 by Helal Choudgury in collaboration with AI; @thirdlanespace.com

তোমাকেই বলছি, শোনো
তোমাকেই বলছি পিয়াইন — শোনো
জ্বলে ওঠো তুমি সুকান্তের দেশলাই ঠোঁটে, বারুদে
এখানে বারবার জীবনানন্দের রূপসী গতর পোড়ে
নখর হায়েনা শকুন শৃগালের প্রখর চক্ষুর আগুনে…

এখানে জীবনানন্দের সুচেতনা বোধে
বিকারগ্রস্ত মগজের কীটেরা বারবার হানা দেয়
তিমির ঘন-ঘোর অন্ধকারে
এখানে
ভাই বোন বন্ধু পরিজন কাঁদে সুচেতনারে চেয়ে
তাই
তোমাকেই বলছি, শোনো
তোমাকেই বলছি পিয়াইন — শোনো
জ্বলে ওঠো তুমি সুকান্তের দেশলাই ঠোঁটে, বারুদে
এখানে বারবার জীবনানন্দের রূপসী গতর পোড়ে
নখর হায়েনা শকুন শৃগালের প্রখর চক্ষুর আগুনে…

এখানে জীবনানন্দের কল্লোলিনী তিলোত্তমা জলে
ধানসিঁড়ি নদী শুকায় শুশুক অসুরের তীব্র বাড়বানলে
এখানে দিবালোকে হাঁটে বিভীষণ রাবণ
কালনেমি এবং দুঃসাশন
হাঁটে পিরামিড-মানুষ আলখাল্লা দুর্বৃত্ত দুর্জন
তাই
তোমাকেই বলছি, শোনো
তোমাকেই বলছি পিয়াইন — শোনো
জ্বলে ওঠো তুমি সুকান্তের দেশলাই ঠোঁটে, বারুদে
এখানে বারবার জীবনানন্দের রূপসী গতর পোড়ে
নখর হায়েনা শকুন শৃগালের প্রখর চক্ষুর আগুনে…
. . .

Ganalekhkho : Tumake Bolochi Shuno, Version-1 by Helal Choudgury in collaboration with AI; @thirdlanespace.com
Click the image to know details about the music composition and arrangement of this particular poem.

তোমার মিরুজিন নদী

তোমার মিরুজিন নদী আজ সুজলা স্রোতস্বিনী
মৃত সারসের মতো নয় সে, আজ তারা একভিড় হাঁস
আমার ভোরের জলে, পুকুরে;
তোমার লাবণিরা আজ
লবণরাশি ফেলে দেবে নৃমুণ্ডের হেঁয়ালিতা ভালোবেসে
আগুন নেভা আমার নদীর জলে তোমার শায়িত প্রাসাদে…

প্রাসাদ তার বিবর্ণ নয়
জলে সে উচ্ছল প্রণয়
সেখানে বসবাস পৃথিবীর সব রাজহাঁস, দুপুরে;
তোমার লাবণিরা আজ
লবণরাশি ফেলে দেবে নৃমুণ্ডের হেঁয়ালিতা ভালোবেসে
আগুন নেভা আমার নদীর জলে তোমার শায়িত প্রাসাদে…

ভোরের সংকেতে আজ তোমার নদী সরে আসে কাছে
পৃথিবীর সৈনিকেরা জেগে থাকে বিম্বিসার রাজার ইঙ্গিতে
জ্বলে ওঠে দীপ আজ প্যারাফিন মুকুরে;
তোমার লাবণিরা আজ
লবণরাশি ফেলে দেবে নৃমুণ্ডের হেঁয়ালিতা ভালোবেসে
আজ আগুন নেভা আমার নদীর জলে তোমার শায়িত প্রাসাদে…
. . .

তোমার জলসিড়ি নদীর জলে

তোমার বনহংসী — পেঁচা হয়ে
একদিন এসেছিল সে, আমার দক্ষিণের জানালা ধরে
আমি শুধু বনহংস হয়ে ছুঁতে পারিনি তোমার হিজলের ডানা;
আজ তোমার জলসিড়ি নদীর জলে
তার ফাল্গুনের চাঁদ বিবর্ণমুখ — একাকী জল মাখে জলে…

গুলির শব্দে ফ্যাকাশে ঠোঁট… দূরে তোমার ফাল্গুনের চাঁদ
তারপর দুজনের নক্ষত্র টুকরো টুকরো অন্ধকার
জলসিড়ি নদী মাখে তারা — তোমার রূপালী জোছনার ভেতর;
আজ তোমার জলসিড়ি নদীর জলে
তার ফাল্গুনের চাঁদ বিবর্ণমুখ একাকী জল মাখে জলে…

পাখনায় আমাদের আজ পিসটনের উল্লাস
ছুঁয়ে নিতে চায় এখনও তোমার দারুচিনি দ্বীপের আভাস
বাতাসে, ডানায়, বৃষ্টিতে ভেজাতে চায় — তার প্রবালের হাড়;
আজ তোমার জলসিড়ি নদীর জলে
তার ফাল্গুনের চাঁদ বিবর্ণমুখ একাকী জল মাখে জলে…
. . .

এখনও তোমার শেয়াল আর শকুনেরা

এখনও তোমার
শেয়াল আর শকুনেরা হামাগুড়ি দেয়
নরম আলোর হলুদ সবুজ টিয়েদের
রোদ মাখা ভোরে
আবারও তোমার সবুজ ঘাসের দেশে
বুঝি, অদ্ভুত আঁধার এক নেমে এসেছে….

এখানে আজও
তোমার নিশীথের অন্ধকার জাগে
বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগত
আজ আমার দারুচিনি দ্বীপের দেশ;
আবারও তোমার সবুজ ঘাসের দেশে
বুঝি, অদ্ভুত আঁধার এক নেমে এসেছে….

এখানে বারবার
তোমার বন্দুকের গুলির শব্দ
কেঁপে ওঠে তাই ফিরে ফিরে
ঘাইহরিণীরা সবুজ অরণ্যের পাতাবাসে;
আবারও তোমার সবুজ ঘাসের দেশে
বুঝি, অদ্ভুত আঁধার এক নেমে এসেছে….
. . .

তোমার সুচেতনা কেঁদে ওঠে

তোমার সুদর্শনাকে বোলো, সে যেন
ফিরে আসে আবারও সুজলা সুফলা এই বাংলায়
তার তরে শুয়ে আছে আজ যৌবন মুমূর্ষু অন্ধকারে;
নিমসন্ধ্যায় সুদর্শনাকে চেয়ে তাই
তোমার সুচেতনা কেঁদে ওঠে আঁধারের নিষ্ফল মাঠে;

আজ শুনি না কিন্নরকণ্ঠ দেবদারু পাতায়
সেখানে তোমার অমৃতসূর্য গেছে মরে
সময় তোমার স্থির হয়ে শুয়ে গভীরতর জলে;
নিমসন্ধ্যায় সুদর্শনাকে চেয়ে তাই
তোমার সুচেতনা কেঁদে ওঠে আঁধারের নিষ্ফল মাঠে;

অপরিচিত রোদের মতন আজ তোমার শরীর
হলুদ জলে শুয়ে আছে স্থির
শুয়ে আছে মৃদু নুয়ে, তোমার আকাশের গ্রীবা;
নিমসন্ধ্যায় সুদর্শনাকে চেয়ে তাই
তোমার সুচেতনা কেঁদে ওঠে আঁধারের নিষ্ফল মাঠে;
. . .

Jibananda Das; Image Source – Collected; Credit: Jibananda Das – Poet of Suurrealism FB Page

তোমার প্রাদেশিক ঘাস

তোমার পাখিদের নয়
আমাদের গানে আজ অজস্র ভ্রান্তি
নিষ্ফলতা শুধু, অন্ধকার পতঙ্গের প্রাণে
দূর মেরুনিশীথে সমুদ্র অনুজ্জ্বল;
সুরমার পারে শিশিরের ঘুম চায়
আজ তাই, আমার কবিতায় তোমার প্রাদেশিক ঘাস…

তোমার সমাধির ভাঙা ইট
পড়ে থাকে
আমাদের খাড়ুবিলে — রোদেলা জোছনার মাঠে
তারপর, পরগাছা ধরে ঝিঁঝিঁ-দম্পতির ক্ষুধা বাড়ে;
সুরমার পারে শিশিরের ঘুম চায়
আজ তাই, আমার কবিতায় তোমার প্রাদেশিক ঘাস…

একটি নয়
দুটি বাদুড়
উড়ে যায় দূরে তোমার স্বোপার্জিত জ্যোৎস্নায়
আমাদের ঘাসজল খাড়ুবিল প্রান্তর;
সুরমার পারে শিশিরের ঘুম চায়
আজ তাই, আমার কবিতায় তোমার প্রাদেশিক ঘাস।
. . .

আগের পর্বের লিংক :

জীবনানন্দ, তোমাকে ভেবে-১ : হেলাল চৌধুরী

লেখক পরিচিত : হেলাল চৌধুরী :
ওপরের ছবি অথবা এই লিংক চাপুন

. . .

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 27

No votes so far! Be the first to rate this post.

Contributor@thirdlanespace.com কর্তৃক স্বত্ব সংরক্ষিত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *