পোস্ট শোকেস - সাম্প্রতিক

নারীশক্তি ও দেবী দুর্গা : সুমন বনিক

Reading time 6 minute
5
(16)
Awaken, O woman—awaken, O flame!; Collage; Image Source: Wikipedia; @thirdlanespace.com

বিশ্বের যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর,
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের কণ্ঠস্বীকৃত ‘নারী’ মানব সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকে রাষ্ট্র ও সমাজ বিনির্মাণে ভূমিকা রেখে চলেছে। কন্যা-জায়া-জননী রূপে তার ভূমিকা শাশ্বত ধরিত্রীর। মানবশক্তির ‘অর্ধেক’ ভার তার কাঁধে। শোষণ-নিপীড়ন-বঞ্চনার নাগপাশ ছিন্ন করে প্রাপ্য অধিকার আদায়ে নারীকে অকুতোভয়া মাতঙ্গিনী হতে দেখেছে মানুষ। নদী, প্রকৃতি, কোমলতা ও সৌন্দর্যের প্রতীক যে-নারী, নতুন ভাষা ও আত্মশক্তির মন্ত্রে জেগে ওঠার আধারও সেই ‘নারী’! স্থবিরতা ও কলুষতায় সমাজ দূষিত হলে, তাকে উদ্ধারিতে নারীকেই প্রেরণাদায়ী প্রাণশক্তির ভূমিকা নিতে হয়েছে। কবিকণ্ঠে আহবান তাই ঝরে পড়েছিল একদিন :

জাগো নারী জাগো বহ্নি-শিখা।
জাগো স্বাহা সীমন্তে রক্ত-টিকা॥
দিকে দিকে মেলি’ তব লেলিহান রসনা,
নেচে চল উন্মাদিনী দিগ্‌বসনা,
জাগো হতভাগিনী ধর্ষিতা নাগিনী,
বিশ্ব-দাহন তেজে জাগো দাহিকা॥

নারীর সৌন্দর্যের সঙ্গে দাহিকাশক্তির তেজ ফুটে ওঠে তার কর্মে। বেগম রোকেয়া, ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল, মাদার তেরেসার মতো নারী সভত্যা ও মানবতাকে নতুন ভাষা দিয়ে গেছেন। ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখি, মিসরে রানি নেফারতিতি রাজকার্যের সিদ্ধান্তে অংশ নিচ্ছেন। মিসরীয় দেয়ালচিত্রে যে-ইতিহাস খোদাই হয়ে আছে। গ্রিক সভ্যতা জানায়,—চিত্রকলা, স্থাপত্য ও ভাস্কর্যে পুরুষদের সঙ্গে নারীর অংশগ্রহণ স্বাভাবিক ঘটনা ছিল। প্রাচীন ভারতবর্ষে রচিত মহাকাব্যে অস্ত্রবিদ্যায় চিত্রাঙ্গদা, রথচালনায় সুভদ্রা, সুকুমার কলায় দ্রৌপদীকে আমরা পারদর্শী দেখতে পাই।

শোষণ-পীড়ন ও পরাধীনতার বিরুদ্ধে ন্যায় ও স্বাধিকার আদায়ের লড়াইয়ে সমসাময়িক পুরুষের চেয়ে নারী অনেকক্ষেত্রে এগিয়ে থেকেছেন। ঝাঁসির রানী লক্ষ্মীবাঈ, কমরেড প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ও নবাব ফয়জুন্নেসার মতো নারী উপমহাদেশে দেখা দিয়েছিলেন একদিন। বেগম রোকেয়া যেমন যুক্তিবাদী মননচর্চায় ছিলেন অগ্রণী। বাঙালি নারী জাগরণের অগ্রদূত প্রথম উপলব্ধি করেন,—শিক্ষা হচ্ছে নারীর আত্মমর্যাদা ও অধিকার আদায়ের প্রধান হাতিয়ার। এই তো সেদিনের কথা, ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতাযুদ্ধে নারীদের সর্বজনবিদিত ভূমিকা বিশ্ববাসী দেখেছেন। বাঙালি নারীর ত্যাগ ও সেখানে বীরাঙ্গনাদের ভূমিকা মহান মুক্তিযুদ্ধের উজ্জ্বলতম অধ্যায়।

উপমহাদেশে নারীমুক্তি আন্দোলনের সূচনা যাঁদের হাত ধরে, তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য ছিলেন সরলা দেবী চৌধুরানী ও লীলাবতী নাগ। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে ভূমিকা রেখেছিলেন সময়ের সাহসী এই নারীরা। দেশভাগ পরবর্তী সময়ে রাজশাহীর নাচোলের সাঁওতাল কৃষি বিদ্রোহে অকথ্য পুলিশি অত্যাচার সহ্য করে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখেন সাহসিকা ইলা মিত্র। কুসংস্কারাচ্ছন্ন নারীসমাজকে অন্ধকার নিগড় থেকে মুক্ত করে আলোর পথ দেখাতে নিরলস লড়াই করেছেন কবি সুফিয়া কামাল। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করতে যেমন ক্যান্সার আক্রান্ত জাহানারা ইমাম লড়েছেন অসীম সাহসিকতায়।

জাতি গঠনে নারীর মর্যাদা, শক্তি ও অপরিহার্য ভূমিকা সম্পর্কে স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন—‘নারীদের অবস্থার উন্নতি না হলে বিশ্বের কল্যাণের কোনো সম্ভাবনা নেই।’ সনাতন ধর্মে নারীর মর্যাদা, তার সম্মান, অধিকার ও ক্ষমতায়নের গুরুত্ব এই সূত্রে আমরা একঝলক দেখে নিতে পারি। দেবী ও শক্তির প্রতীক রূপে নারীর সম্মান ও মর্যাদা সেখানে স্বীকৃত। শাস্ত্রে উল্লেখ আছে ‘যত্র নার্য্যস্ত পূজ্যন্তে রমন্তে তত্র দেবতাঃ’;—অর্থাৎ, নারীকে যেখানে পূজা বা সম্মান করা হয়, সেখানে দেবতা বাস করেন।

বৈদিকযুগ থেকে শুরু করে উপনিষদ, মনুসংহিতার সারাৎসারে সমাজ-রাষ্ট্রে নারীর অবস্থান অনন্য উচ্চতায় উচ্চকিত। প্রাচীন ইতিহাসে আমরা দেখি—বৈদিক বা ঋগ্বৈদিক যুগে (আনুমানিক ১৫০০-১০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ) সমাজে নারীগণ সম্মানজনক মর্যাদার অধিকারী ছিলেন। শিক্ষা, ধর্মাচার ও জীবনসঙ্গী নির্বাচনে পুরুষের প্রায় সমান অধিকার তারা ভোগ করতেন। বৈদিক যুগে নারীরা শিক্ষা ও যজ্ঞে অংশ নিয়েছেন। ঋগ্বৈদিক যুগে মেয়েদের উপনয়ন সংস্কার হতো। ব্রহ্মচারিণী হিসেবে বেদ অধ্যয়ন ও জ্ঞানচর্চায় অংশ নেওয়াটা ছিল ব্যাপক স্বীকৃত। আজীবন জ্ঞানসাধনায় ব্রত নারীদের ‘ব্রহ্মবাদিনী’ বলা হতো। লোপামুদ্রা, ঘোঁষা, অপালা ও বিশ্ববরা-র মতো বিদুষী নারী ঋগ্বেদের বহু মন্ত্র বা স্তোত্র রচনা করেছিলেন। প্রাচীনকালে গার্গী ও মৈত্রেয়ীর মতো বিদুষী নারীরা উচ্চশিক্ষা ও ব্রহ্মবাদিনী হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন।

মধ্যযুগে সামাজিক পরিবর্তনের ফলে বাল্যবিবাহ ও পর্দাপ্রথার মতো কিছু নেতিবাচক প্রথা যুক্ত হলেও মূল সনাতন ধর্মে নারীর উচ্চাসনের কথা বারবার বলা হয়েছে। পরিবারে স্ত্রীর অবস্থান ছিল অত্যন্ত সম্মানিত। স্বামী-স্ত্রী একত্রে যজ্ঞানুষ্ঠান ও ধর্মীয় আচার সম্পন্ন করতেন। পূর্ণ বয়সে নিজের পছন্দমতো স্বামী বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে নারীরা স্বাধীন ছিলেন। এমনকি, বিদীন ও সভা নামক প্রাচীন রাজনৈতিক ও সামাজিক সমাবেশে নারীদের উপস্থিতি ও অংশগ্রহণের প্রমাণ পাওয়া যায়।

প্রাচীন ভারতীয় স্মৃতিশাস্ত্র ‘মনুসংহিতা’য় নারীর মর্যাদা ও অধিকার বিষয়ে নানানদিক বর্ণিত রয়েছে। একদিকে নারীর সম্মান, সুরক্ষা ও পারিবারিক গুরুত্বের কথা বলা হয়েছে, অন্যদিকে তাদের স্বাধীনতা সীমিত করে পুরুষদের অভিভাবকত্ব ও নিয়ন্ত্রণের বিধান রাখা হয়েছিল। নারীদের পূজা বা সম্মান যেখানে করা হয়, সেখানে দেবতারা আনন্দিত হন; এবং যেখানে সম্মান করা হয় না, সেখানে সব সৎকর্ম ব্যর্থ হয় (মনুসংহিতা ৩/৫৫-৫৬)। ‘মনুসংহিতা’য় উল্লেখ আছে—নারীরা গৃহের দীপ্তি, সৌভাগ্য, আশীর্বাদ ও ঘরের শ্রী স্বরূপ (মনুসংহিতা ৯/২৬)। উপদেশ সূচকে বলা হয়েছে—যারা সুখ-ঐশ্বর্য চান, তারা যেন উত্তম বস্ত্র, খাদ্য ও অলংকার দিয়ে স্ত্রীদের প্রীত ও সম্মানিত করেন।

উপনিষদ মূলত জীবাত্মা ও পরমাত্মার ঐক্য নিয়ে আলোচনা করে। উপনিষদের দৃষ্টিতে প্রকৃত সত্তা বা আত্মা পুরুষও নয়, নারীও নয়। পরমব্রহ্ম সবার মধ্যে সমানভাবে বিরাজমান। তাই জ্ঞান ও মুক্তির পথে নারী ও পুরুষে ভেদাভেদ নেই। অর্থাৎ, উপনিষদের দর্শন অনুযায়ী আত্মা লিঙ্গহীন; পুরুষ বা নারী ভেদাভেদ কেবল শরীরের, আত্মার নয়। উপনিষদে নারীরা উচ্চ আধ্যাত্মিক জ্ঞান, মেধা ও ব্রহ্মবিদ্যায় পারদর্শী রূপে সম্মানিত হয়েছেন। গার্গী ও মৈত্রেয়ীর মতো বিদুষী নারী পুরুষ ঋষিদের সাথে গভীর তাত্ত্বিক ও দার্শনিক বিতর্কে অংশ নিতেন।

উপনিষদের দর্শন অনুযায়ী আত্মা লিঙ্গহীন;—পুরুষ বা নারী ভেদাভেদ কেবল শরীরের, আত্মার নয়। বেদ ও উপনিষদের যুগে নারীদের জ্ঞানার্জনের পথ উন্মুক্ত থেকেছে। বৃহদারণ্যক উপনিষদে গার্গী বাচাকনভী ঋষি যাজ্ঞবল্ক্যের সাথে ব্রহ্মজ্ঞান নিয়ে প্রকাশ্য সভায় কঠিন বিতর্কে অংশ নিয়েছিলেন। মৈত্রেয়ী তাঁর স্বামী যাজ্ঞবল্ক্যের কাছে অমৃত-তত্ত্ব বা আত্মজ্ঞান লাভ করার উপায় জানতে চান। তিনি নশ্বর ধনসম্পদের চেয়ে সেই জ্ঞানকে বেশি মূল্য দেন। কিছু নারী সেকালে আচার্য বা শিক্ষকের মর্যাদা লাভ করেছিলেন।

সনাতন ধর্মে নারীকে শক্তির উৎস, মা ও দেবী রূপে সর্বোচ্চ সম্মান দেওয়া হয়েছে। দুর্গা, কালী ও লক্ষ্মীর মতো প্রধান শক্তিরা নারী রূপে পূজিত হন। মহাভারত অনুযায়ী মাতার সমান পবিত্র আশ্রয় বা প্রিয় কেউ নেই। মনুস্মৃতিতে বলা হয়েছে, নারীরা পূজিত না হলে সব শুভকর্ম বিফলে যায়। বেদ ও উপনিষদে নারী ও পুরুষের আধ্যাত্মিক মুক্তি ও জ্ঞান অর্জনের সমান অধিকারের কথা স্বীকৃত।

Ma Durga; Artist: Jogen Chowdhury; Image Source & Credit: Artcloud

পৌরাণিক তথ্য ও আধ্যাত্ম চেতনার আলোকে দুর্গা আদ্যাশক্তি মহামায়া এবং নারীরূপে পরম-শক্তির প্রকাশ। বিভিন্ন নামে তিনি পূজিতা। মহিষ-মর্দিনী, শূলিনী, পার্বতী, কালিকা, ভারতী, অম্বিকা, গিরিজা, বৈষ্ণবী, কৌমারি, বাহারী, চণ্ডী, লক্ষ্মী, উমা, হৈমবতী, কমলা, শিবাণী, যোগনিদ্রা ইত্যাদি নামে ও রূপে আবির্ভূতা যুগেযুগে। ভক্তকুল নানান রূপে-ধ্যানে দেবীর আরাধনা করে থাকেন, কখনও ‘মাতৃরূপ’, ‘পিতৃরূপ’, ‘শক্তিরূপ’, ‘শান্তিরূপ’, ‘বিদ্যারূপ’-এ আরাধিত হন মা দুর্গা। ‘দেবী ভাগবত’, ‘মার্কণ্ডেয় চণ্ডী’ ও ‘কালিকা পুরাণ’-এ দেবীর আবির্ভাবের হেতু নির্ণীত হয়েছে এভাবে :

পুরাকালে অসুরদের প্রধান মহিষাসুর দেবতাদের স্বর্গ থেকে বিতাড়িত করেন, রাজ্যহারা দেবতাকুলের তপস্যায় দেবী প্রসন্ন হন। বিষ্ণুর পরামর্শে দেবতাদের সম্মিলিত তেজে পরমশক্তি নারীরূপে আবির্ভূত হন দুর্গা। দেবতাকুল নিজ-নিজ অস্ত্র ও তেজে দেবীকে মহাপরাক্রমশালী করে তোলেন।

পুরাণে দেবী দুর্গা তাই শুধু একটি রূপ বা প্রতিমা নন। তিনি মহাশক্তির আধার ও পরম নারীশক্তির প্রতীক। মহিষাসুরকে বধ করে অশুভ শক্তি, অহংকার ও অজ্ঞতার বিরুদ্ধে শুভ শক্তির বিজয় ঘটিয়েছেন। দেবীর দশটি হাত দশটি দিকের প্রতীক, যা তাঁর সীমাহীন শক্তি এবং যেকোনো বিপদ থেকে ভক্তকে রক্ষার সামর্থ্য প্রকাশ করে। বাঙালিঘরে আজও প্রতিভাবান, কর্মক্ষম নারীকে দশভুজা দুর্গার সঙ্গে তুলনা করা হয়। পৌরাণিক কাহিনি ও আধ্যাত্মিক দর্শন অনুযায়ী দেবী দুর্গার দশটি হাতের (দশভুজা রূপের) অন্তর্নিহিত তাৎপর্য ও মাহাত্ম্য রয়েছে। দুর্গামূর্তি কেবল একটি রূপক নয়, এর অন্তর্নিহিত আধ্যাত্মতত্ত্ব রয়েছে।

পৃথিবীর সৃষ্টিতত্ত্ব অনুযায়ী দিক দশটি—পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর, দক্ষিণ, ঈশান, নৈঋত, বায়ু, অগ্নি, ঊর্ধ্ব ও অধঃ। দেবী দুর্গার দশটি হাত দিয়ে বোঝানো হয় তিনি মহাবিশ্বের দশদিক থেকে তাঁর ভক্ত ও সৃষ্টিকে রক্ষা করেন এবং সমগ্র জগতের ওপর তাঁর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখেন। মহিষাসুর বধের সময় দেবতারা যখন বিপন্ন হয়েছিলেন, তখন তাঁদের নিজ নিজ তেজ বা শক্তি থেকে দেবী দুর্গার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ও দশটি হাতের সৃষ্টি হয়। কুবের, যম, ইন্দ্র, বরুণ, ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহাদেবসহ বিভিন্ন দেবতা তাঁদের শ্রেষ্ঠ অস্ত্র ও শক্তি দেবীকে প্রদান করেছিলেন। দেবীর দশটি হাতে যে-দশটি প্রধান অস্ত্র ও প্রতীক থাকে, তা জীবনের নানা গুণ ও অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের নির্দেশ করে। দেবী দুর্গার দশ হাতে সজ্জিত অস্ত্রগুলো বিশ্লেষণ করলে আমরা আধ্যাত্মবাদের মর্মার্থ উপলব্ধি করতে পারব :

ত্রিশূল : মহাদেবের দেওয়া ত্রিশূল মানুষের ত্রিগুণ (সত্ত্ব, রজ ও তম) এবং অশুভ শক্তিকে বিনাশের প্রতীক।

চক্র : বিষ্ণুর দেওয়া চক্র সৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দু ও কালচক্রের প্রতীক।

শঙ্খ : বরুণের দেওয়া শঙ্খ হলো পবিত্রতা, সৃষ্টির আদিধ্বনি এবং অশুভ শক্তি বিতাড়িত করার প্রতীক।

পদ্ম : ব্রহ্মার দেওয়া পদ্ম পঙ্কিলের মাঝেও পবিত্র থাকা এবং আত্মিক আলোর প্রতীক।

বজ্র : ইন্দ্রের দেওয়া বজ্র হলো দৃঢ় সংকল্প ও মানসিক শক্তির প্রতীক।

তির ও ধনুক : লক্ষ্য স্থির রেখে সঠিক পথে এগিয়ে যাওয়ার এবং শক্তির একাগ্রতার প্রতীক।

খড়্গ বা তলোয়ার : ধারালো বুদ্ধির প্রতীক, যা দিয়ে মোহ ও কুসংস্কার কেটে ফেলা যায়।

গদা : যমরাজের দেওয়া গদা ভক্তি, আনুগত্য এবং মানসিক ও আধ্যাত্মিক শক্তির প্রতীক।

কুঠার ও অন্যান্য অস্ত্র : অশুভ ও ক্ষতিকর প্রভাব ধ্বংস করার প্রতীক।

অর্থাৎ দেবীর দশ হাত হলো অসীম শক্তি, বহুমুখী কর্মক্ষমতা এবং সবধরণের প্রতিকূলতা জয় করে সমাজে ন্যায় ও ধর্ম প্রতিষ্ঠার সর্বময় ক্ষমতার আধার। এই রূপটি মনে করিয়ে দেয়, নারী বা সৃষ্টিশক্তি হলো অসীম শক্তির বাহক। সিংহের ওপর তাঁর অবস্থান সাহস, নির্ভীকতা এবং হিংস্র প্রবৃত্তির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের পরিচায়ক। তিনি একইসঙ্গে মহাবিশ্বের সৃষ্টি, স্থিতি এবং ধ্বংসের মূল চালিকাশক্তি ‘আদ্যাশক্তি’। তিনি যেমন মমতাময়ী জননী, তেমনি প্রয়োজনে অন্যায়ের বিরুদ্ধে ধ্বংসাত্মক ও অপরাজেয় যোদ্ধা। সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে, মহিষাসুরমর্দিনী রূপটি প্রাচীন মাতৃতান্ত্রিক সমাজের নারীনেতৃত্ব ও প্রকৃতির সৃষ্টিশীল শক্তির মর্যাদাকে স্মরণ করিয়ে দেয়।

পৌরাণিক তথ্যানুসারে (Mythologically) দেবী দুর্গার আবির্ভাবের কারণ ও শক্তি-ক্ষমতা বিশ্লেষণ করলে আমরা নারীর প্রতি আস্থা ও সম্মানের বিষয়টি লক্ষ করি। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারী যেখানে কোমল, ক্ষমতাহীন, যৌনতার প্রতীক, দেবী দুর্গা সেখানে ‘শক্তি-রূপেন সংস্থিতা’। তাঁর মহিষাসুরমর্দিনী রূপ স্মরণ করিয়ে দেয় পৌরাণিক মাতৃতান্ত্রিক সমাজের নারী-নেতৃত্বের মহিমা, যা আজও আধুনিক সমাজব্যবস্থায় ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

. . .

Durga; Artist: Ganesh Pyne; Image Source & Credit: bonhams.com

. . .

… থার্ড লেন স্পেস-এ প্রাসঙ্গিক আরো দেখুন …

নূর-ই পাক ‘আনাহিতা’ ও নির্মল জল ‘সরস্বতী’

সরস্বতীকথা : সজল কান্তি সরকার

বিশ্বাসের উৎস

বিশ্বাসের উৎস – পাঠ-সংযোজন

জাগো নারী জাগো বহ্নিশিখা

ওড টু দ্য ক্যাটকিনসফিল্ড

দুর্গাবন্দনা : মহাসপ্তমী ও কুমারী পূজা — সুমন বনিক

. . .

লেখক পরিচয় : সুমন বনিক : ওপরের ছবি অথবা এই লিংক চাপুন

. . .

অবদায়ক : সুমন বনিক : থার্ড লেন স্পেস.কম

সুমন বনিক-এর অন্যান্য রচনা ও প্রাসঙ্গিক পাঠের জন্য এখানে চাপুন

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 16

No votes so far! Be the first to rate this post.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *