পোস্ট শোকেস - সাহিত্যবাসর

তোমাকে দেখি নদীর মতো : সুনীল শৈশব

Reading time 4 minute
5
(6)
Kite Runner; Image Source & Credit: Collected; Google Image

জীবন

প্রতিটি থাকার পাশে না থাকার কেউ
অস্তিত্বের ভেতর শোয় শূন্যতার ঢেউ।
ফুল ফোঁটে গাছে তবু যেন গন্ধহারা,
বাতাসও থেমে যায় পথে নেই সাড়া!

আলো ভাসে চোখ জুড়ে ছায়া তার পিছে
সব পেয়েও মনে হয় কিছু নেই কাছে।
নদীও গল্প বলে নিবিড়, একান্ত নির্জন
ঢেউয়ের ওপারে দেখি হরিৎ বৃক্ষ বন।

চাওয়ার আকাশ ভরা, তবু দেখি শূন্য
তোমার ভেতর জমা থাকে অদৃশ্য পুণ্য।
থাকবার মাঝে ঝিমোয় গাঢ় শূন্যতা
জীবনের পরতে বাঁধা শূন্যের নামতা।

শূন্যতার এই ঘোর রয়, চেনা-অচেনায়
বিভোর পথে আমার মতো আর কে যায়?
তবু বাঁচা শিখি, থাকা-না থাকার সাঁঝে
জীবন গল্প লিখে যায় শূন্যতার মাঝে।
. . .

শিকল

নদীটির মতো মানুষেরা আজ মৃত
ঘাসের ভাঁজে লুকানো দূর্বাঘাস,
কেউ মাঞ্জা দেয়া নাটাই খুঁজে হয়রান
আর কেউ সৎকারের পরব দেখে।

চিতার আগুন নিভে এলে,
কাদা মাড়িয়ে কিছু পা নদীতে ডোবে।
মেঘের সাথে মিশে যায় কালো ছায়া
মানুষ তাই চিরকাল শিকলে বাঁধা!
. . .

তোমাকে দেখি নদীর মতো

তোমার জন্য কমলারোদে পুড়ি
কখনো পাঞ্চালী বৃষ্টির আঁচে,
রোদে কাপড় শুকাতে যাও মাঠে
দৃষ্টির বারান্দায় মেলে ধরো তোমায়

উঠোনজুড়ে ফসলি মাঠের ছায়া
অনাবৃষ্টির হাহাকার, চোখ বলে…

এভাবেই তোমাকে দেখি নদীর মতো
নদী আর তুমি খুব কাছাকাছি

অনাহারী প্রেমে দহনজ্বালা
নির্জীব অসহায় মরে থাকা।
. . .

Let there be rain; Image Source & Credit: Collected; Google Image

মায়া

ঘুমের ঘোরে দেখি — জোছনামাখা জীবন
তোমার মায়ায় ছুড়ে ফেলা বিগত যৌবন
স্পর্শের ভেতর যত ওম হরিণের চোখে
আমায় রেখেছ তুমি অদ্ভূত আলোকে।

ওগো মায়াবতী, তুমি কি জানো তাহা
প্রার্থনার কড়জোড়ে তোমার দিদার আহা;
আমার অমোঘ প্রেম তোমার দুয়ারে
আকুলি-বিকুলি করে প্রেমের দোহারে।

অমৃতচাঁদ রচে প্রেমের খেয়ালি কবিতা
বর্ষার অগাধ ঘুমে লিখে রাখি আমি তা,
প্রেমে ছলচ্ছল রুপালি রাতের ছায়ায়
বৃষ্টি ঝরিছে আহা অপরূপ জল-মায়ায়!
. . .

গোলাপের খামার

তুমি ঝেড়ে ফেলো মনের অসুখ
জেনে রাখো পাখিদের শিস
অনুবাদ করে সুস্বাস্থ্য গোলাপেরা,
তোমার সকল যন্ত্রণায় স্নেহময় রোদ
পরশ বোলায় কিশোর সকাল,
আর দুপুরের গায়ে নাক ঘঁষে
তোমাকে পৌঁছে দেয় প্রেমময় রাতে।

পাখিদের মতো অনবদ্য প্রাণস্রোতে
মেঘ বৃষ্টির নদী হয় পাহাড় মাটির মুখ
বিশুদ্ধ বাতাসে অনন্ত জীবনের পথে
ছলকে ছলকে নীলাম্বরী আকাশে
আলোক-তরঙ্গে দোয়েলের কাতরতা।

তোমার কথা উড়ে-ঘুরে, গান ভাসে
ব্রণবিন্দু টোল পড়ায় কামুক আগুনে,
কেশগুচ্ছ রহস্যময় ঘূর্ণিপাক খায়
দরজার বসন্ত চিরকাল অগ্রন্থিত।

তোমার বেঁচে থাকা গোলাপের খামার
ফাগুনের আগুনকরা আঁচলের তাপ
জোছনাকুমারীর পোয়াতি স্থির চাঁদ,
প্রেমে ভাসার এক অবর্ণনীয় আনন্দ।
. . .

লেখক পরিচয় : সুনীল শৈশব

নৈসর্গিক মৌলভীবাজার জেলায় কবি সুনীল শৈশবের জন্ম ও যাপন। মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ও পরে স্বনামধন্য মুরারিচাঁদ কলেজ ও সিলেট লা কলেজে পাঠ নিয়েছেন। কবিতা, গদ্য ও ছোটকাগজ সম্পাদনায় তিন দশক ধরে নিবিড় সুনীল শৈশবের প্রথম কবিতাবই ‘জলস্মৃতি উড়ে যায় বাউল বাতাসে’ ২০০৫ সনে আলোর মুখ দেখে। ‘পাখির উড়াল সৌন্দর্য সন্ধ্যার বুকে’ ও ‘ভালোবাসার বিভোর রঙে’ শিরোনামে আরো দুটি বই ২০১০ ও ২০১৬ সনে বের হয়। প্রেম, প্রকৃতি ও যাপন পরস্পর অবিচ্ছেদ্য সুনীল শৈশবের কবিতায়। এই ত্রয়ীর সঙ্গম-মোহনায় গুঞ্জরিত হয় মরমি সংবেদন। মৌলভীবাজার জেলাকে পরিবেষ্টন করে প্রবাহিত ‘মনু’ নদীর সঙ্গে নিজের যাপনকে কবিতায় ভাষা দিতে গিয়ে যেমন লিখেছেন :

তোমার চোখে মায়া, পাখির মতো ডানা
জলের সুরে ওষ্ঠ ভরা সবাক কামনা
অনন্ত পারুল বনের মুগ্ধ করা ভাষা
অগ্নিস্রোতে ভেসেছি প্রেমের কীর্তিনাশায়।

ডাবল মিনিং বা দ্বিরুক্তির আবেশঘন আবহটি এভাবে কবিতায় তৈরি করেন সুনীল। নদী-প্রকৃতি ও নারী-প্রকৃতি যেখানে পরস্পরের ভিতর অবিচ্ছিন্ন থেকে কবিতার জন্য প্রয়োজনীয় আড়াল বুনে চলে। সুনীলের কবিতায় মরমি সংবেদ প্রায়শ উপসংহার হয়ে আসে। উদ্ধৃত ‘মনু’ কবিতার শেষ স্তবকে যেমন কবি উপসংহার এভাবে টানছেন :

জীবনের সত্য ঘেঁটে বুঝেছি একনিমিষে
ছাই হয়ে বিদায় নিবো তোমার কাছে শেষে
পরস্পরায় জলমোহে বাঁধা শূন্য ঘর
চলে গেলে তুমি শুনবে আমার কন্ঠস্বর।

Poet Sunil Shoisob; Image Source & Credit: Author; @thirdlanespace.com

কবিতার বীজমাটি সুনীল শৈশবের কাছে কেমন? এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো মিলবে ফেসবুক প্রোফাইলে সংযুক্ত দুখানা চরণে। কবি লিখেছেন :

সুনীল শৈশবের কাব্যগান
পৃথিবী নয় ফুলেল বাগান

উদ্ধৃত উচ্চারণের অনুরণন ‘গোলাপ — বৃষ্টি ও তুমি’ শিরোনামের কবিতচরণে পায় পাঠক :

জীবন বলে
ভালোবাসার হিসাব নিওনা
লাভ-ক্ষতির সমীকরণে;
আর আমি কেবল ঘাটতির গল্প নিয়ে বাঁচি।

‘ঘাটতির গল্পরা’ যেহেতু মানব-জীবনে চিরন্তন, এর পরিশেষে কী মিলছে তা নিয়ে দ্বিধা, সংক্ষোভ ও নির্বেদঘন উচ্চারণ সুনীলে নয় দুর্লভ। ‘নিশা’ কবিতায় যেমন বহুবার বলতে-বলতে পুরোনো হয়ে যাওয়া অনুভবকে কবি ফেরত আনছেন নতুন করে :

Little Magazine Shonon: Editor: Sunil Shoisob; Image Source & Credit: Author; @thirdlanespace.com

আমি কি মারা যাচ্ছি না মরে গেছি
এত অন্ধকার আমাকে জড়িয়ে
আলোর নামতা পড়া পুরোহিত কই

আমি জেনেছি রাত মূলত পাখি
পাখি অন্ধকারে যেমন নিশ্চুপ থাকে
আমি কি সেরকম
নিশ্চুপ

চিমটি কাটি হাতে
রাত শেষে প্রভাতে শুয়ে পরে কাতরাই
নিশা লাগেনা আর তোমার ঘ্রাণে।

কোনো বাহুল্য নেই, উপমাঘন প্রতীকী চমকেও নয় স্বমহিম, তথাপি অনাড়ম্বর বিঘোষণ পাঠচেতনায় দ্রবীভূত হয় অনায়াসে। সহজ ভাষায় প্রধানত প্রেমানুগ কবিতা লিখলেও সুনীলের কবিতা জীবন ও মাটিলগ্ন উচ্চারণকে এভাবে ধারণ করে আবর্তিত হচ্ছে গত তিন দশক ধরে। গদ্যও লেখেন প্রয়োজনে।

কবিতা-যাপনের পাশাপাশি নয়ের দশকে সম্পাদনা করেছেন ‘বর্ণমালা’ ও ‘স্বপ্ন’, আর শূন্য দশকের গোড়ায় ‘নদীকথা’ নামে প্রকাশনা। অতঃপর ‘স্বনন’ ছোটকাগজের সম্পাদনা ও প্রকাশনায় রয়েছেন ধারাবাহিক। মৌলভীবাজার থেকে প্রকাশিত ছোটকাগজের তালিকায় কাগজটি স্থান করে নিয়েছে সফলভাবে। ব্যক্তিজীবনে পারিবারিক কবি ভালোবাসেন বন্ধুসঙ্গ, আড্ডা ও ভ্রমণ।

. . .

সুনীল শৈশব : অবদায়ক : থার্ড লেন স্পেস.কম

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 6

No votes so far! Be the first to rate this post.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *