
আমার সাধের গিত্তাইন বড়ো ভালা
কালাই ক্ষেত্য ধান ফলাইয়া ভরছে ধানের গোলা॥
শোনেন শোনেন ভদ্রশ্রোতা গিরস্তপুরাণ
গিরস্তের মেন্নতে হয় শাইল বোরো ধান॥
সেই গিরস্ত কেমন হয় ভাটিময়াল জুড়ে
চাষ-বাস বারোমাস গিরস্ত কয় তারে॥
ভাটি দেশের হাল-গিরস্তি কী বলিব আর
গাঙের পাড়ে বসত করে জমিন হাওরপাড়॥
কালিদহ সাগর ছিল হাওর বিল খাল
আদিবাসী প্রথম বান্ধে ভাটির ময়াল॥
সেই ময়ালে কৃষককুলের কেমনে বসতি
গিরস্তালি কেমনে হয় কীবা তার রীতি॥
এসব কথা আমি-রে ভাই করিব বর্ণন
শোন শোন দেশবাসী শোন দিয়া মন॥
বন-জঙ্গল কাটিয়া তারা আবাদ করে মাটি
কতজনা মইল খেটে জমিন করতে খাঁটি॥
কেহ বাঁচে মাছ ধরে কেহ করে শিকার
আল্যুয়া-জাল্যুয়ার হয় বসতি হাওরের পাড়॥
আল্যুয়া করে কৃষিকাজ জাল্যুয়া মাছ ধরে
শাইল-বোরো স্বাদুমাছ ফলে হাওর পাড়ে॥
লাঙলে করিয়া চাষ আল্যুয়া ফলায় সোনা
জমিন থেকে বাড়ির উঠান মাড়ায় শস্যদানা॥
জাল্যুয়া পুতে মাছ ধরে আল্যুয়া পুতে খায়
ধানে-মাছে উদল-বদল মাপে না পাল্লায়॥
খোলা আসমান মুক্ত বায়ু হাওর নদী-খাল
দূরে দূরে ঘর-বসতি ভূমির নেই আকাল॥
হাওর-বিলের মিঠাপানি স্বাদু মাছে ভরা
হিজল-কড়চ নলখাগড়া বন-জঙ্গলে ঘেরা॥
পাখি আছে নানারকম হাওর-বিলের পাড়
ভয় ছিল বাঘ-শিয়ালের এখন নেই-যে আর॥
মাঘের শীতে পাহাড় হতে ছিল বাঘের ভয়
লোকালয়ে বাঘের তাড়া দিনেরাতে রয়॥
পাখি আসত হাজার-বিজার আসমানে যত তারা
ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ত পাখি ফান্দে পড়ত ধরা॥
হাওরের প্রাণপ্রকৃতি অতি মনোহর
এই হাওরে বসত করে কৃষিকারিগর॥
শাইল বোরো ধান আছে বিল ভরা মাছ
মিঠাপানি পাথরখনি হিজল-করচ গাছ॥
ভাটির দেশের দুইটি রীতি বর্ষা আর হেমন্ত
বর্ষাকালে জলের তাণ্ডব হেমন্তে দিগন্ত॥

জ্যৈষ্ঠ থেকে কার্তিক মাস অথই জলে খেলা
এমন সময় গিরস্ত হায় কাটায় অলস বেলা॥
বিয়েসাদী হয়গো তখন ভাটির ময়াল
ধামাইল গীতে বিয়ে মাতে আনন্দে উতাল॥
ভইন-ভাগ্নি আসে নাইয়র কেরাইয়া নাউ দিয়া
মাসাবধি থাকে তারা ইষ্টিকুডুম লইয়া॥
ডুবুডুবু করে জলে ভাটির ওই না গাঁও
সুর তুলে ঢেউপবনে মাঝি বায় নাউ॥
গাজীগান ঘাটুগান আর বাউল আসর জমে
দৌড়ের নাউ হাইর গাইয়া বৈঠা বায় দমে॥
গিরস্তের বাড়ি-বাড়ি গায় কীর্তন গায় ঊরি
দলে-দলে ছৈর গাইয়া মাগে চাল-কড়ি॥
দাসের বাড়ি শেখের বাড়ি কীবা আসে যায়
ঘাটে-ঘাটে নাউ লাগাইয়া আনন্দে গান গায়॥
গান গায় ভাটিয়ালি ঢেউয়ে করে কলকলি
হালে-পালে নাউ চলে লাগে না বাইছালি॥
রঙে-আউসে দিন ফুরায় নেই কোনো ভাবনা
ভবিষ্যতের সঞ্চয় করতে করে না বাসনা॥
ভাটির দেশে এক ফসলেই বছরের সম্বল
সমাজ-নমাজ ভরণ-পোষণ তাতেই হয় সকল॥
ভাটির দেশে বর্ষাকালে আয়-উপার্জন নাই
ভাড়ার ভরা শাইল বোরো বছরের কামাই॥
এক ফসলের সঞ্চয় তখন অলস বসে খায়
সেই ফসলের কিছু হইলে প্রাণে বাঁচা দায়॥
ফসল ফলাইতে ভাইরে কত আয়োজন
বর্ষা শেষে রঙ উল্লাসে জমির নিমন্ত্রণ॥
রঙ-তামাশা সব ভুলিয়া জমিন পানে চাইয়া
লাঙল-জোয়াল বানায় তারা চাষের লাগিয়া॥
বানায় তারা চাষের লাগি উরা, কোদাল, মই
কোণ, কোড়া, দড়ি, খাড়া — কত কী-যে কই॥
বানায় চাটাই, বানায় ধারি; ডুলি, খলই, ফলা
বানায় চাকা, বানায় গাড়ি আরও বানায় গোলা॥
জীবন যুদ্ধের স্বার্থকতা কৃষিকাজেই সার
জমিন তার যুদ্ধক্ষেত্র ফসল বিজয় তার॥
জমিন পানে চেয়ে তারা গোনে চাষের বেলা
ডুবা জমির আইল দেখিয়া জমি চাষে ফলা॥
ছয় মাসের ডুবা জমিন — আগন মাসে বাত
আগন থেকে বৈশাখ মাস কৃষাণেরও ঘাত॥
পতিত জমিন আবাদ করে ফলায় বোরো ধান
ভাতে-মাছেই বাঁচে তারা সহজ-সরল প্রাণ॥

সেই জীবনের কথকতা কী বলিব আর
জমিনেতেই স্বপ্ন বুনে জীবন করে পার॥
ধানের বিছুন বুনে তারা টানি-খিল খেতে
দুইপক্ষ বয়স হইলে রুয়ে ঘাত মতে॥
নিশিকালে যায় জমিনে হালের বলদ লইয়া
কৃষাণী ডাকিয়া তুলে অভিসার ভুলিয়া॥
জমিনেতে কৃষিকাজে নিশি হয়-যে ভোর
পেটে ক্ষুধা লাগে তার উঠান-সমুদ্দুর॥
কৃষাণবধূ জমিনে যায় পান্তাভাত লইয়া
ক্ষুধার জ্বালা হয় নিবারণ কৃষাণীরে পাইয়া॥
সারাদিনের কাজে কাজে সন্ধ্যা যখন নামে
কাজ ফুরায় না তবুও তার দিনরাত্রির ঘামে॥
পুত্র-কন্যা স্ত্রী-পতি কৃষিকাজেই মতি
শৈশব কাটে হেন কাজেই নাতি আর পুতি॥
লায়েক-জুত কামলা-পুত ভবিষ্যৎ ভাবনা
লেখা-পড়া জ্ঞিয়ান অর্জন প্রকৃতির সাধনা॥
কৃষিযুদ্ধই বড়ো যুদ্ধ আদি হইতে অন্ত
যৌবন লুকাইয়া বধূ মাতৃত্ব দেয় ক্লান্ত॥
কেহ যদি পোয়াতি হয় গিরস্তালীর কালে
বধূদোষে ফসল নাশে লোকে মন্দ বলে॥
ক্লান্তঘুমে পোহায় নিশি দিন ফুরায় কাজে
শ্যাম অঙ্গে অঙ্গ দিয়া বধূ মরে লাজে॥
কৃষিকাজে ভাগাভাগি দয়া নাই অন্তরে
অকর্মারে মায়া ছেড়ে নিত্য শাসন করে॥
স্ত্রীর আদর পুত্রের আদর কাজের বেলা নাই
জমির আদর বড়ো আদর জীবনের কামাই॥
এক ফসলের ভালোবাসা কতই-যে নিষ্ঠুর
কাজের নেশায় থাকে সদা গিরস্ত বিভোর॥
কত কিছু করে মানত ফসলের লাগিয়া
জমিনেতে আড়ক দেয় করুণা মাগিয়া॥
ধরে বামন ধরে হিরাল চণ্ডাল মুচির পা
তাবিজ-কবজ দিয়া বধূ নিয়মে বাঁধে গা॥
হিরালে বান্ধিয়া আসমান শিলা করে জল
শিলাবৃষ্টি হয় না তাই পাকিলে ফসল॥
ছাতা মাথায় যায় না কেহ জমিনেরও ধার
চুলের খোপা খুলে না বধূ শনি-মঙ্গলবার॥
কৃষিকাজের নানা পদ্যি আছে রীতি-নীতি
রীতি মেনেই হয় গিরস্তি দেখে লগ্ন-তিথি॥
কাজে কাজেই হয় গত আগন-ফাগুন মাস
বসন্তে নাই ভালোবাসা বাঁচাই অভিলাষ॥

. . .
এক ছিল কথা
আরেক ছিল কথি
কথা কহিল—
কথি, আমি ক্ষুধার্ত
খাবার দাও।
কথি ক্ষুব্ধ হয়ে কহিল—
চাল আনও, ডাল আনও
তবে তো খাবার তৈরি করিব!
কথির কর্কশ বচন শুনে
কথা কহিল—
আজ মাঘী পূর্ণিমা
চলো চাঁদ দেখি।
কথি কহিল—
বেশ তো! বেশ তো!
জেগে থাকতে পারবে তো?
কথা কহিল—
পারবো তো, পারবো তো
চাঁদ যে রুটির মতো।
. . .
এই ফসল ফলাইতে তার অনেক হয়-যে দেনা
তারপরেও বিকাইতে হয় বধূর কানের সোনা॥
সোনায় পাওয়া সোনার ধান জমিনে জুড়ে হাসে
দারুন চৈত তখন রে ভাই অভাব লইয়া আসে॥
অভাবেতে পুত্র-কন্যা পায় না-যে খাইতে
জমির ধান আগাম বিকে নামমাত্র মূল্যেতে॥
তারপরে ভাই বৈশাখ মাসে পাকে জমির ধান
পাহাড়ি ঢল নামে তখন নইদে উঠে বান॥
মাড়াখলা গরুর গাড়ি ধানকাটার বেপারি
পাকা ধান কাটিতে ভাই লাগে হুড়াহুড়ি॥
দেয়া ডাকে বাজ পড়ে পাহাড়ি ঢল আসে
দুর্যোগ কাটিয়া উঠে সবাই মিলেমিশে॥
হামুর করে মিলেমিশে ফসলের লাগিয়া
মায়েঝিয়ে ব্রত করে লক্ষ্মীচরণ লইয়া॥
সেই ফসলের কিছু হলে আর-যে উপায় নাই
মরণ হলেও ঋণের বোঝা পিছু ডাকে ভাই॥
গিরস্তের বউ ব্রত করে আকালে পড়িয়া
তবু ফসল ডুবে যায় পাহাড়ি ঢল আইয়া॥
ভালোবাসা কৃষি পেশা আগের দিন তো নাই
ধানের জমি মইরা গেছে বাড়ির হউঁমনে ভাই॥
চৈতমাস্যিয়া ঢল আইয়া জমিন যখন ডুবে
দুধের গাই গৈল ছাড়ে খোরাকির অভাবে॥
শাইলের ভাত খাইয়া তখন শইল অয় না মুডা
তহন চাউল কিন্যিয়া খায় যখন মিলে যে’ডা॥
জোয়ান বেডি বুইড়া অইত খাইয়া মাছের পেডি
অহন পায় না কানি-বউগলা খাইত্য তিতনা-হুডি॥
জামাই খায় কষ্ট কইরা মরিচপোড়া দিয়া
ফসল মরার বছর তাই চলতে অইব সৈয়া॥
দুধেভাতে জামাই আদর কার-না মনে লয়
পানিভাত আর মরিচপোড়া পরানে কি সয়॥

সামনের বছর আইও জামাই নাতিপুতি লৈয়া
আস্তা ডিম খাওয়াইয়াম শাইলের ভাত দিয়া॥
এই আশাতে শাইল-বোরো আবার যখন ফলে
মহাজনের ঋণের দায় সকলি যায় চলে॥
ধানের ঋণে বারেবারে গিরস্ত হয় ঋণী
সুদের দায়ে মহাজনে করে পেরেশানি॥
সুদে-সুদে প্রতি বছর বাড়ে ঋণের রেশ
চক্রবৃদ্ধি সুদ বাড়ে হয় না ঋণের শেষ॥
কৃষক-কৃষাণী কান্দে ঋণেরও জ্বালায়
হালের বলদ তুলিয়া নেয় মহাজনের নায়॥
সোনাদানা গাভী-বলদ ঋণে হয় গো সারা
শাইল-বোরো জমি বিকে পানির মূল্যে ধরা॥
জমি-বাড়ি সব বিকাইয়া গিরস্ত হয় শেষ
অন্নযুদ্ধই সার করিয়া দিনমজুরের বেশ॥
বস্তিবাসী হয় গো তারা শহরের গলিতে
ভাত-বেগারে মরে কেহ শতায়ু থাকিতে॥
ভূলোক ছেড়ে তালুক ছেড়ে হয়-যে ভূমিহীন
কেউ খুঁজে না কেউ বুঝে না দেশে বাড়ে ঋণ॥
কৃষিকাজের তুলনা-যে হয় না কিছু আর
কৃষিছাড়া কপালপোড়া গিরস্তি নাই যার॥
গাঁয়ে ফিরো কৃষি ধরো ও ভূমিহীন ভাই
জন্মমাটি করতে খাঁটি ফসলও ফলাই॥
দীনবন্ধুর এই মিনতি সবারে জানাই
গিরস্তি করিয়া সবাই ঘরের ভাত খাই॥
. . .
দিশা : আমার সাধের গিত্তাইন বড়ো ভালা
কালাই ক্ষেত্য ধান ফলাইয়া ভরছে ধানের গোলা॥
. . .

. . .
… থার্ড লেন স্পেস-এ প্রাসঙ্গিক আরো দেখুন …
কৈবর্তপুরাণ : সজল কান্তি সরকার
বন্দনা গানে হাওরপুরাণ : সজল কান্তি সরকার
বান্দিপুরাণ : সজল কান্তি সরকার
. . .
লেখক পরিচয় : সজল কান্তি সরকার : ওপরের ছবি অথবা এই লিংক চাপুন
. . .

অবদায়ক : সজল কান্তি সরকার : থার্ড লেন স্পেস.কম
সজল কান্তি সরকার-এর অন্যান্য ও প্রাসঙ্গিক রচনা পাঠের জন্য এখানে চাপুন



