পোস্ট শোকেস - সাহিত্যবাসর

চারিদিকের রোদের হাহাকারে : নাহার মনিকা

Reading time 12 minute
5
(22)

বেঁচে যায় যুদ্ধবিদ্ধস্ত মানুষওতো!
বুকের ভেতরে থাকে গোলাগুলি
রহস্যের অগ্নিগোলক।
বয়ে নিয়ে চলে অযুত গল্পের ভেলা
অথচ সকল গল্প এক নয়
উলের দীর্ঘ কাঁটা বুনে চলে ক্ষতের জাম্পার।

. . .

The story of uncertainity and pain-1; AI Generated Image; Chat GPT M-5; @thirdlanespace.com

নির্মোহ ভোররাতে চিড় ধরে গেছে। গা ঘঁষে যাওয়া বাতাসে নিঃশব্দ মানুষ এ-ঘর থেকে ও-ঘর, জিনিসপত্র বাঁধাছাদা করে। বাতাসের পাশাপাশি রিকশাটা ভারের চোটেও কেঁপে কেঁপে ওঠে। তাও যা হোক একটা পাওয়া গেছে।

গায়ে গামছা জড়িয়ে রিকশাওয়ালার সঙ্গে মুরাদ নিজেই তদারকি করছে বাঁধাছাদা। কেউ তেমন কিছু নেবেনা নেবেনা করেও ট্রাঙ্ক-স্যুটকেস, ঝুড়ি আর পোটলাপুটলি মিলিয়ে গোটা সাতেক। মানুষও কম না, শিরিন গুনে রেখেছে—বারেক, সাফিয়া, আবুলের মা, তার নিজের মেয়েদুটো মিলিয়ে আটজন। আগস্টের শেষ, রোদ ওঠার আগেই গরম শুরু হবে। হাতের পার্সে রুলি আর চুড়ি ঢোকাবার পর খুব বেশি আঁটেনি, আঁচলে গিট দিয়ে কিছু বড়ো কানপাশা দুটো আর মটরদানা চেইনটা নিয়ে নেয় শিরিন। বড় হার দুটো নিয়েছে পেটিকোটের ফিতে বাঁধার ভাঁজে। কালরাতেই সেলাইতে মুড়ে রেখেছিল। উঠে দাঁড়াতে গিয়ে মেরুদন্ডসহ মাজা টং করে ওঠে। এ-সময়ে তার ব্যাথাটা হয়। আগের দু’বারের অভিজ্ঞতা আছে।

বাঁশের মসৃণ বাতা রাঙানো জানালা দিয়ে উঠোনে দেখা যায়, মুরাদ বারেককে নিয়ে রিকশার সিটে পাদানিতে মালপত্র তুলে দিচ্ছে। রডের দু’পাশে হালকা দু’একটা ঝুলিয়ে দেয়ার পরে পেছনের দিকে দড়ি দিয়ে প্লাস্টিকের ঝুড়ি দুলিয়ে দেয়া যায় কিনা ভাবে মুরাদ। কিছু খাবার, নিদেনপক্ষে একবস্তা চাল নিতে পারলে ভালো হতো। এতগুলো মানুষ অচেনা জায়গায়! আতাউর অবশ্য বলছে কোনো অসুবিধা হবে না। তাদের কয়েক শরিকের বড়োসড়ো বাড়ি। রহিমানপুরে আপাতত সেই বাড়িই গন্তব্য।

উঠোনের কোণে ট্রেঞ্চটার কাছাকাছি গিয়ে দেখে আসে মুরাদ, ওর মুখটায় কুয়াশার পলকা আভাস। দু’সপ্তা আগে খোঁড়া পরিখা। শান্তি কমিটি থেকে নোটিশ জারি হলো—প্রতিটি বসতবাড়িতে বাসিন্দাদের নিরাপত্তার স্বার্থে ট্রেঞ্চ খনন করা জরুরি। বাড়িটা পাড়ার এক কোণায়, আর তাদের থাকার কথা তেমন জানাজানি হয়নি। না বানালে শান্তি কমিটি ঝামেলা বাড়াতে পারে। জীবনে কোনোদিন মাটি খোঁড়েনি সে। বারেকের বাড়ির বড়ই গাছটার নিচে কোদাল চালাতে চালাতে মনে হচ্ছিল—নিজের কবর খুঁড়ছে কি?

চিফ ইঞ্জিনিয়ার সরফরাজ খান ছুটিতেই ছিল, এপ্রিল মাসে ফেরার কথা কিন্তু ফেরেনি। এর মধ্যে তো যুদ্ধই শুরু হয়ে গেল। মুরাদ নিজের কোয়ার্টারে থাকলো সেপ্টেম্বর পর্যন্ত, শালবনের দিকে মুখ করা সারি সারি দশটা কোয়ার্টার, মুরাদের জন্য বরাদ্ধটা একদম কোণায়। বাকিগুলোর মধ্যে বাঙালি শহীদুল্লাহ সাহেব বন্ধ ব্র্যাকেটের মতো একদম অন্য ধারে, মাঝখানে সব খানেদের আবাস। সেই এপ্রিল থেকে শুরু করে জুন মাসের মধ্যে সবাই কোনো-না-কোনোভাবে সরে গেছে। রাতারাতি, কাদের সহযোগিতায়, কীভাবে, মুরাদ জানেও না। আসলে কাজের বাইরে অত খাতির তার বাঙালি অফিসারদের সঙ্গেও হয়নি।

জনশূন্য কলোনিতে আতঙ্ক ভালোরকম সঙ্গী হয়েছিল। সোমা-সুরভীকে নিয়ে শিরিনের দিনের বেলায়ও ভয় লাগে। তবু দিন পার করছিল, এ-অবস্থায় যাবে কোথায়? কিন্তু দিন দশেক হয়ে গেল পাকিস্থানি আর্মির কনভয় সুগারমিলের গেষ্ট হাউসে আস্তানা গেঁড়েছে। তারা কোয়ার্টার তল্লাশি শুরু করার আগেই বারেক জোর করলো। ওর বাড়িতে আসতে মুরাদ না করেনি। এ-সময় শিরিনকে নিয়ে মানুষের মধ্যে থাকাও নিরাপদ।

বারেক আর আতাউরকে নিয়ে মুরাদ নিজেই ট্রেঞ্চ খুঁড়ে কাঠ আর টিন দিয়ে মুখ আটকে দিয়েছিল। ওপরে মাটি দিয়ে বন্ধ করার পর সাফিয়া এমন করে লেপে দিয়েছে, অন্তত কাছে না গেলে বোঝার কোনো উপায় নেই। একদম উঠোনের সঙ্গে মিশে গেছে। ট্রেঞ্চের মুখের ভেজা মাটিতে ছোট ছোট পায়ের ছাপ। সুরভীর নাকি সোমার? নিজের পায়ের ছাপ খুঁজতে আরো ঝুঁকে আসে মুরাদ। পদচ্ছাপ মানেই তো বেঁচে থাকার চেষ্টা, প্রমাণ। উলটোটাও হতে পারে, এই ঘোর ডামাডোলের মধ্যে মৃত্যু এখনো সামনে এসে দাঁড়ায়নি, কিন্তু দাঁড়াতে কতক্ষণ। মুরাদের ভেতরটা সহসা উদ্বিগ্ন হয়।

The story of uncertainity and pain-2; AI Generated Image; Chat GPT M-5; @thirdlanespace.com

সোমা আর সুরভীকে ঘুম থেকে ওঠায় শিরিন। কাদা হয়ে আছে দুটোই। কাল সারাদিন ট্রেঞ্চে আর বাইরে দৌড়াদৌড়ি করেছে। প্লেনের শব্দ শুনলেই দৌড়ে ভেতরে ঢোকা, নিঃশ্বাস আটকে বসে থাকা, দরদর করে ঘাম। কানে তুলো গুঁজে কতক্ষণ আর এ-বয়সের বাচ্চা চুপচাপ বসে থাকতে পারে। সুরভী দুই বছরেই কট কট করে কথা বলা শিখে গেছে। ঘুম ভাঙা চোখে ফিসফিসিয়ে ওঠে—‘আম্মা আমলা টেনচে নাম্বো? মিলিটালি এছে গেসে?’

ঝটপট ওদের গায়ে জামা চাপায় শিরিন। এই ঘরে তার গত সপ্তা খানেকের দিন যাপন। স্যুটকেসবন্দি। এখন এখান থেকেও বেছে বেছে কেবল অতি দরকারিগুলোই নিতে হচ্ছে। কিছু ওষুধপত্র নিতে পারলে ভালো হতো। কোয়ার্টারে তার ফার্স্ট-এইড বক্স ছিল, এখানে আসার সময় খেয়াল হয়নি। এখন কি আর কোয়ার্টারে যাওয়া সম্ভব! ঢাকায় নিজেদের বাসার কথা মনে হয় শিরিনের, মুরাদের বদলির চাকরি বলে কত-কী-যে সে নিয়ে আসেনি। একটু গুছিয়ে নিয়ে পরে আনবে ভেবেছে। এখানের অফিসার্স কোয়ার্টারেও এই একবছরে কত কিছু জমে গেছে। ফেলে-ছড়িয়ে থাকা অভ্যাস শিরিনের। কম জিনিসে দিন সামলাতে কষ্ট হয়। বারেকরা যত্ন-আত্তির কোনো কমতি করে না, তবু এই ভারী শরীরে অন্যের বাসায় থাকা পোষায়? কবে-যে এই যুদ্ধ শেষ হবে? শরীর মন দুই-ই এত অবসন্ন লাগে শিরিনের।

মুরাদকে বলে কি লাভ? পরিস্থিতি-যে ওর নিয়ন্ত্রণে নাই এটা কি সে বোঝে না? তারপরও সব অভিযোগ, শিশুতোষ জেদ ওর বিরুদ্ধেই মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে—মনে হয় যুদ্ধের জন্যও মুরাদই দায়ী। রাওয়ালপিন্ডির মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হাশমীকে পয়লা বৈশাখে বাসায় দাওয়াত দিলে কী এমন ব্যাপার হতো। সবাই দেয়। ওই লোক কি খবর পায় নাই-যে মুরাদ নিজের বাসায় এ-উপলক্ষ্যে আড্ডা জমিয়েছিল? কী, না, ওই ব্যাটার সঙ্গে উর্দু বলতে হবে, ও বাংলা গান কবিতা এসব বুঝবে না। এতকিছু চিন্তা করলে তুমি চাকরি টিকিয়ে রাখবে কি করে? মাথার তালুকে ধূম্র উদগীরণকারী অবস্থা থেকে নিয়ন্ত্রণে আনতে কষ্ট হয় শিরিনের। পান থেকে চুন খসলেই এখন মুরাদকে ডেকে দোষ ধরিয়ে দিতে ইচ্ছে করছে। এইসময় কোথায় একটু বিশ্রাম, মন ভালো রাখা গান শুনবে—তা না এক আশ্রয় থেকে আরেক আশ্রয়ে ছুটতে হচ্ছে।

উঠানে শব্দ যথাসম্ভব নিচুস্বরে রেখে রিকশায় মালপত্র তোলা হচ্ছে। পেয়ারা গাছের ঝুঁকে আসা ছায়ার আবছা অন্ধকারে মানুষগুলোকে আধিভৌতিক লাগে। অতিরিক্ত ফর্সা, তাই জানলা দিয়ে মুরাদের আদুল গা চেনা যায়, গামছাটা গলার কাছে উঠে এসেছে, স্যুটকেসের হ্যান্ডেলের সঙ্গে গরম পানির ফ্লাস্ক দড়ি দিয়ে কষে বেঁধে দিচ্ছে, এক পা রিকশার পাদানিতে। মনটা নরম হয়ে আসে শিরিনের। নাহ, আর মেজাজ করবে না। ও বেচারার কি দোষ! সে নিজেও কি চায় এইসব মিসেস হাশমীদের সঙ্গে আইয়ে খাইয়ে করতে!

হারিকেনের উসকে দেয়া সলতে কমে আসছে, তেল ফুরিয়ে গেছে। চাবিটা ঘুরিয়ে নিভিয়েই দেয় শিরিন। তার গোছগাছ শেষ। সাফিয়া চুলা ধরিয়ে চা করেছে, সঙ্গে মজনু বেকারির টোস্ট। শিরিন খায় কিন্তু গা গুলিয়ে আসে। সাত মাসেও তার বমি ভাব থাকে, সুরভীর বেলায় তো একদম শেষদিন পর্যন্ত ছিল, কী-যে গন্ধ লাগে সবকিছু, আর আছে বুকজ্বালা করা। এটাই তার গর্ভাবস্থার ধরণ, তিনবারই এক সমস্যা। আতপচালের রান্না কোনকিছুর ধারেকাছে ঘেঁষতে পারে না সে পুরো ন’মাস।

চা খাওয়ারও সাহস হয় না শিরিনের। এর আগের দু’বার সুগারমিলের ডাঃ জালাল বমিভাব আর বুকজ্বালা কমার ওষুধ দিয়েছিল। এপ্রিলের শুরুতেই সপরিবারে গ্রামের বাড়ি চলে গেছে। খুব ভালো সিদ্ধান্ত—শিরিনের মনে হয়। যেসব ঘটনা কানে আসে তাতে সোমত্ত দুই মেয়ে নিয়ে কোয়ার্টারে থাকা একদম নিরাপদ না। শরীরের সওয়া না সওয়া বুঝে কিছু বাছবিচার শিরিন এবার নিজেই করছে। সাফিয়া পীড়াপিড়ি করলেও দুটো টোস্ট বিস্কুট খেয়ে অল্প পানি খেয়ে নেয় সে। রাস্তায় পানির পিপাসা পাবে নির্ঘাত। রহিমানপুর বারো মাইলের ধাক্কা। অন্য সময় হলে অত ভাবত না সে, কলেজ পর্যন্ত দৌড়ে ফার্ষ্ট প্রাইজ আছে তার। কিন্তু এখন, পেটের মধ্যে দস্যুটা যখন ফুটবল খেলে, কারণে-অকারণে ক্লান্তিতে টলে ওঠে সে। তারওপর সোমা-সুরভী দু’জনই দুরন্ত।

মুরাদের তাড়ায় গা তোলে শিরিন। সাফিয়া তার লাল গরুটাকে মতির মায়ের কাছে সঁপে দিচ্ছে উঠোনের একধারে, দড়ি ধরে আছে, তার শ্যামলা পানপাতা মুখে টলটলে চোখ। বাপের বাড়ি থেকে পাওয়া বকনা বাছুর বছর না ঘুরতেই বাচ্চা বিয়ানো গাই হয়েছে। নধর বাছুরটার নাম দিয়েছে লালি, সে মমতামাখা চোখে সাফিয়ার বিহবলতা দেখে।

: মতির মা, দুধ দুহাবার আগেপিছে লালিক দুধ খাইবার দিও। দেখিয়া রাইখো একনা, দোহাই তোমার।

: ‘হামরা আর কুনখানত যামো বাহে, এইঠেই থাকিবা নাগিবে। তবে, যুদিল বাঁচো তুমার লালি আর লালির মাও বাচিবে। চিন্তা না করিয়েন মা’—মতির মা একহারা সুরে আস্বস্ত করে চলে, তার চোখ যাত্রাকালীন সবাইকে জরিপ করে।

বারেকের বাড়ির পেছন দরজা রেললাইনের দিকে গেছে। সেখান দিয়ে বেরুনো নিরাপদ, কিন্তু সমস্যা রিকশা নিয়ে। ঠিক হলো মুরাদ রিকশাওয়ালাকে সঙ্গে নিয়ে ঘুরপথে সুগারমিলের উলটোপারে সবার সাথে মিলবে। শিরিনের ভয় করে। এই যাত্রার কাপড়-চোপড় আর নিতান্ত দরকারি কিছু জিনিস রিকশায় আছে, সেগুলো না হয় গেলে যাক, কিন্তু যদি রিকশাওয়ালার কিছু হয়? মুরাদের কোনো অমঙ্গল আশঙ্কা কোনোভাবেই সে মাথায় আনতে চায় না।

The story of uncertainity and pain-3; AI Generated Image; Chat GPT M-5; @thirdlanespace.com

আগস্ট মাসের দুপুর দীর্ঘ আর পৌরুষময়। তবু তার দাপটে নদী-খালের মতো ক্ষীণাঙ্গী হয়ে সিঁটিয়ে নেই। অল্প ঢেউ আছে, অন্যপাশে পানি কালো দেখাবার মতো গভীরতাও। দুই মেয়েকে নিয়ে নদীর পারে এসে দাঁড়াতে পারলে আর কিছু চোখে পড়ে না শিরিনের। সঙ্গের মানুষজন, নিজের স্বামী সবাইকে অদৃশ্য করে চোখের সামনে শুধু ধূ ধূ। চোখ বোঝাই অন্ধত্ব নিয়ে নিজের ভেতরে আরেকটা প্রাণের আঁকুপাঁকু করা হৃদস্পন্দন শুনতে পায় সে, টের পায় তার পদাঘাত। অস্থির সময়ের তাড়না আট মাসের গর্ভস্থ সন্তানকেও আক্রান্ত করছে তাহলে। হোক না তৃতীয়বারের মত পোয়াতি, এই হাঁটার পরিশ্রম তার প্রাপ্য ছিল না। ছেলে না মেয়ে কে জানেপেটের মধ্যে থেকেও ক্লান্তিকর যাত্রায় শ্রান্ত হচ্ছে। এরকম শ্বাসরুদ্ধকর দুপুরে দূরের টেলিগ্রাফের খাম্বাকেও অপরিচিত লাগছে তার। একটু দূরে উড়ে বেড়ানো কালো ফিঙে পাখি, এর মত্ত, তিরতির, মসৃণ পালকে বলক তোলা দেখে আগে কত উচ্ছসিত হয়েছে! কি স্বাধীন এইসব পাখি! বছর পাঁচেক আগে সে নিজেও ঢাকায় ইডেন কলেজ প্রাঙ্গনে এমন করেই ঘুরেফিরে বেরিয়েছে। শিরিন আলতো হাত বুলিয়ে আদর করে নিজের পেট।

সবারই পা অল্পবিস্তর ফুলে গেছে। সেই ভোর থেকে হাঁটাই একমাত্র উপায়। শিরিন যদিও দু’বার রিকশাতে বসেছে। আবুলের মায়ের পীড়াপীড়ি। কিন্তু সে এক ঝক্কি। গোটা চারেক ব্যাগ-বাক্স তখন নামাতে হয়, সেগুলো ক্লান্ত মানুষজনের হাতে, কাঁধে নিতে হয়। সেবাযত্নে অভ্যস্ত শিরিনেরও অস্বস্তি লাগে, আবুলের মায়ের আবারো অনুরোধে আর রাজি হয় না সে।

ওপার দেখে একটু ধন্ধ আসে—কেমন নদীর পার! বড়ো কোনো গাছের বংশ নাই ধারেকাছে! মুরাদ দুটো গামছা ভিজিয়ে আনে, তাতে গরম পানির পরশ। রিকশার ছায়ায় বসে হাঁপানো যায়।

: আর কতদূর আতাউর?—আবুলের মা সবার হয়ে প্রশ্ন করার হক রাখে। সবচে বয়স্ক মানুষ। বয়স্ক হলেই অভিজ্ঞ হবে এমন না, কিন্তু ত্বকের সোনালি ভাঁজে জীবন বোঝার ছাপ জাজ্বল্যমান।

নদীর ওপারে রিকশা আর যাবে না। সেইমতোই কথা হয়ে আছে। দুপুরের মধ্যে রহিমানপুর পৌঁছাতে পারলে বারেকের ইচ্ছা ছিল সে রিকশাওয়ালাকে এখানেই অপেক্ষা করতে বলবে। একটু বেশি টাকায় যদি রাজি হয়। আসার আগে স্টেশন রোডে তার দোকান একবার ঘুরে আসতে পারেনি। মুরাদ রাজি হয়নি তাকে ছাড়তে। বলা যায় না, কোথায় কি বিপদ ওঁত পেতে আছে। ঠাকুরগাঁ শহর থেকে রেলস্টেশন রোড মাইল তিনেক দূর হলেও এ-জায়গাটার বিশেষত্ব ভিন্ন। চিনিকল আর এ্যারোড্রামের মতো দুটি স্থাপনা আছে, এ-দুটোর ওপর হামলা হতে পারে যে-কোনো সময়।

বারেকের মনটা খচ খচ করে, সুগারমিলের অফিসারদের কতগুলো অর্ডার ছিল। দু’জন অবাঙালি অফিসারের স্যুটের অর্ডার, দিয়ে দিতে পারলে মাসকাবারি টাকার চিন্তা দূর হতো। সরফরাজ খানের বড়োসড়ো ভুঁড়ির কারণে কোনো স্যুটই পরে আরাম পায় না। বারেক টেইলার্সে বানানো স্যুট দিয়ে তার দিল সাচমুচ খুশ হো যাতা হ্যায়। লাহোরেও নাকি এত ভালো দর্জি পায়নি সুগারমিলের ব্যাবস্থাপক। তেমন চৌকস কিছু করতে হয়নি বারেককে, শুধু পেটের ঘেরের কাপড় একটু ঢিলে রেখেছে, যাতে বোতাম আটকানো যায়। মুরাদের মারফত সুগারমিলের অনেক অর্ডার আসে তার কাছে। দূর সম্পর্কের চাচাতো ভাই, এত বড়ো ইঞ্জিনিয়ার, তাকে-যে চেনে তাতেই বারেকের প্রাণ কৃতজ্ঞতায় পূর্ণ হয়ে যায়। এইতো গত বছর কালিয়াচাপড়া থেকে বদলি হয়ে এখানে ঠাকুরগাঁও চিনিকলে এসেছে। মুরাদ ভাই বড়ো চাকুরে, পয়সার ক্ষতি পুষিয়ে যায়, কিন্তু বারেকের তো সতেরো দিকে নজর দিতে হয়। আতাউর কাজ শিখছে, তাই বেতন নেয় না, কিন্তু অন্য আরো দু’জন কর্মচারী আছে। তাদের সংসার আছে। গত সপ্তাখানেকে বাসার খাই-খরচও বেড়েছে। সাফিয়া দু’একবার ফিস ফিস করে কানে তুলেছে, কিন্তু সে তো মুরাদ ভাইয়ের কাছে চক্ষু লজ্জায়ও টাকা-পয়সা নিতে পারে না, জোর করে হাতে গুঁজে দিলেও না।

দোকানে একবার গিয়ে দেখে আসার ভাবনাটা মাথায় পোকার মত কুট কুট করে কামড়ায় বারেককে। নিজে না হলেও আতাউরকে যদি পাঠানো যায়। অন্তত গোটা দুই সিঙ্গার মেশিনের মাথা সে রিকশায় করে নিয়ে আসতে পারে। বলা যায় না—দোকান ভেঙে কেউ তাদের রুটিরুজির যোগানদার মেশিনগুলোই আগে লুট করবে। নাহ, কুচিন্তা মাথার বাইরে থাক, হয়তো কোনো কাস্টমার এসে অর্ডার ডেলিভারি নেয়ার অপেক্ষায় আছে। আতাউরের বাড়িতে সে আগে কয়েকবার গিয়েছে। কাজেই অসুবিধা হবে না।

ক্লান্তিতে হোক, সিদ্ধান্ত দেয়ার দায় এড়াতে হোক—মুরাদ আর কিছু বলে না। বারেকের উপরোধে আতাউর দ্বিধা আর অনিচ্ছা গোপন করে ফিরে যাওয়ার জন্য রিকশায় উঠলে মুরাদ এই দীঘল কালো তরুণের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে।

. . .
নদী ছোট হলে পারাপারের বন্দোবস্ত আগে ছিল ডিঙ্গি, না হলে বাঁশের অথবা কলাগাছের ভেলা—বারেক আগে যখন এসেছে। আজকে সেসব উধাও। সাঁতার দিয়ে পদ্মা পার হওয়ার অভিজ্ঞতা আছে আবুলের মায়ের, সে-তুলনায় এটাতো খাল! সাফিয়াও সাঁতরে ওপারে গিয়ে ওঠে। ওপারে নদীর কাঁধ উজিয়ে ঝুঁকে থাকা একটা ছোট্ট আকন্দপাতার ঝোঁপ! তার বাদে ধারেকাছে কোনো গাছপালা নাই, শুনশান কাশবন রোদের কাছে স্থির, মৌন, উপাসনারত।

আবুলের মা আর সাফিয়া তারা নোঙর করলে বারেক আর মুরাদ একে-একে শিশু আর বাক্স পেটরা পার করতে শুরু করে। প্যান্ট গুঁটিয়ে, লুঙ্গি কাছা মেরেও ভেজা বালিতে পায়ের ভার কমে না। শিরিন রিকশার ছায়ায় হাঁপিয়ে বসে থাকে। খুব ইচ্ছে করে হাঁটুতে মাথা গুঁজে দেয়, কিন্তু পেটটা আগবাড়িয়ে বৈরী হয়ে যায়। তারই সবচে বড়ো অন্তরায়—সাঁতার শেখেনি।

মুরাদ তাকে কোলে আধশোয়া করে পানিতে ধরে রাখে। তেজি রোদের বিপরীতে তার ভেজা আঁচলটাও কম ভারী না, গয়নাগাটি বাঁধা। এখন মনে হয় গায়ে পরে নিলেও হতো। এত গরম লাগে তার গয়না গায়ে জড়ালে! একবারই পরা এসব। মুরাদ একটু নারাজ হয়েছিল বিয়ের পরদিনই সব গয়না খুলে নিরাভরণ হওয়াতে। এখন এসবই তাদের বিপদের সম্বল। কে জানে কোন অচেনার সামনা সামনি হবে তারা, কতদিনের জন্য!

পানির ভেতরে পেটের ব্যথা সহসা মোচড় দিয়ে বেড়ে গেলে শিরিন মুরাদের গলা জোরে জাপটে ধরে। পানির শব্দবেগও যেন হঠাৎ বেড়ে যায়। তার উপুড় হতে ইচ্ছে করে। ‘এইতো আরেকটু’ করে করে মুরাদ তাকে ধীরে ধীরে টানলে শিরিনের মনে হয় সে নিঃসীম কাল ধরে এই নদীর মৃদু উষ্ণ পানির ভেতরে ভেসে বেড়াচ্ছে। কচুরিপানার বেগুনি ফুলগুলো হলুদ ঠিকরানো আলো ছিটিয়ে তাকে পাহারায় রাখে। কনকনে ধারালো ব্যথার একটা ছুরি থেকে থেকে তার পেট এফোঁড়-ওফোঁড় করছে। কয়েকবার সে মুরাদের কাঁধ খাঁমচে নখ বসিয়ে দেয়। আটমাসের দস্যিটা আকুপাকু করে ক্রমাগত লাথি মেরে যাচ্ছে।

: ‘বাবা, বৌয়ের মনে কয় পানি ভাইঙ্গা গেছে।’

আবুলের মা তড়িঘড়ি ঘাসের ওপরে একটা কাঁথা বিছিয়ে দিয়েছে। শিরিনের স্খলিত পেটের চামড়া ভেদ করে শিশুর কনুই কিংবা হাঁটুর ছাপ বেশ স্পষ্ট। শিরিনের বন্ধ চোখের ক্লান্ত চেহারা দেখে সোমা-সুরভী চুপচাপ সাফিয়ার কাছে বসে আছে।

মুরাদ কয়েক মুহূর্ত ভাবলেশহীন, বারেকের দিকে চেয়ে থাকে শুধু। রহিমানপুর আরো অন্তত ঘণ্টা দেড়েকের ধাক্কা।

The story of uncertainity and pain-4; AI Generated Image; Chat GPT M-5; @thirdlanespace.com

‘পেইনলেস কন্ট্রাকশন, হয় কারো কারো। ভালোই তো, কত কম ব্যথা সয়ে মা হয়ে গেলেন!’—এর আগের দু’বার প্রসবের সময় হলিফ্যামিলির লেডি ডক্টর শিরিনকে এভাবে ঠাট্টা করেছে। কিন্তু এবার তার এত তীব্র ব্যথা বোধ হচ্ছে কেন! হাজার হাজার গোখরার ধারালো দাঁত শরীরে ফুটে যাওয়ার মত ব্যথা ছাপিয়ে এই বিরান মাঠের মধ্যে প্রসব উন্মুক্তির ভাবনা তাকে আরো কাবু করে তুলছে। শিরিনের বাহু তার মুখাবয়বের মতোই, চোখ কাড়ে। সে সুতরাং, হাতকাটা ব্লাউজ পরে, সুচিত্রা সেনের মত খোঁপা বাঁধা ঘাড় বাঁকিয়ে ফটোও তোলে। ক্লাবের পার্টিতে অন্যান্য অফিসারদের সামনে আঁচল টেনে কাঁধ ঢাকে কদাচিৎ। কিন্তু তাই বলে এমন উন্মুক্ত নদীর ধারে তাকে সন্তান প্রসব করতে হবে! এত বড়ো শাস্তিযোগ্য পাপ কি সে করেছে!

পেট থেকে ব্যথাটা লাফিয়ে লাফিয়ে সুউচ্চ গিরিশৃঙ্গের উচ্চতা নিয়ে কিছুক্ষণ দম ধরে থাকে, তারপর আবার লাফিয়ে নিচে নেমে সমতলবাসী। শিরিন গোঙানোর পাশাপাশি প্রার্থনা করে চলে—‘না এখানে না। এই খোলা নদীর পারে না’।

আবুলের মা গামছা দিয়ে শিরিনের ঘেমে ওঠা মুখ, গলার কাছটা মুছিয়ে দেয়। ভেজা শাড়ি বদলে দিলে ভালো হতো, জনমনিষ্যি না থাকলেও একটা আড়াল দরকার। পেটিকোটের বাঁধন আলগা করতে গিয়ে গয়নার গিঁটে হাত লেগে যায়।

শিরিন চেষ্টা করেও গোঙানি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছে না। সাফিয়াকে দিয়ে মেয়েদুটোকে একটু দূরে পাঠিয়ে দেয় আবুলের মা। সামান্যই দূর, সেখানে কাশফুল ফোটার পাঁয়তারা করছে, তার আশপাশে ফড়িং ঘোরেফেরে, স্বাধীন।

সূর্য সামান্য হেলে গেছে পশ্চিমে। উল্টোদিকে তাঁকিয়ে চোখ মেলা যায়, নীল রং এর নিচে সাদা উদাসী মেঘেরা মন্ত্রণা করতে করতে ভাসে। ফ্লাস্কের পানি আবুলের মা কাপে ঢেলে দিলে শিরিন চুমুক দেয়।

আতাউরের বাড়ি আরো মাইল তিনেক। বারেক আগেভাগে চলে গিয়ে যদি একটা রিকশা আনতে পারে, নিদেনপক্ষে দু’ চারজন মানুষ। মুরাদ কোনো সিদ্ধান্তে স্থির হতে পারেনা। ব্যথায় শাদা হয়ে ওঠা শিরিনের মুখের খিঁচুনি দেখে আবুলের মা তড়িঘড়ি একটা শাড়ি বের করে ঘের দিয়ে দিতে বলে মুরাদকে। বারেক ছুটে দৌড়ে ডালপালা জোগাড় করে।

জড়িপাড় গোলাপি শাড়ির আলতো ছায়া শিরিনের মুখের ওপর, কাপড়ের পুটলির ওপর তার মাথা। মুরাদ তার জরায়ু ভেদ করে আরো গোলাপী ক্ষুদ্রকায় পায়ের পাতার আভাস দেখতে পায়। দু’সন্তানের বাবা মুরাদ হয়েছে বটে, তার সবটুকু দুঃশ্চিন্তা ভাগ করে নেয়ার মানুষ সবসময়ই পাশে ছিল, শিরিনের মা-বাবা, তার নিজের মা। এবার সে একদম একা। দুঃশ্চিন্তা ছাপিয়ে বুকের মধ্যে সদ্য জন্মানো আতঙ্ক ঝেড়ে ফেলে দিতে চায় সে। শিরিনের বন্ধ চোখ, নিশ্চিন্তে নিজেকে কারো ভরসায় ছেড়ে দিয়েছে।

বিস্তীর্ণ প্রান্তরের দিকে হতবিহবল মুরাদ চেয়ে থাকে কয়েক মুহূর্ত। অতি দ্রুত ডাক্তারি চিকিৎসা দরকার। নিদেনপক্ষে একজন পেশাদার ধাত্রী। কোনদিকে পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি? রহিমানপুরে? নাকি ঠাকুরগাঁও থানা শহরে? সেখানে অন্তত হাসপাতাল আছে। ডাক্তার কি পাওয়া যাবে! নাকি তারা ফিরে যাবে চিনিকলের মেডিকেল সেন্টারে, অন্তত কিছু ডাক্তারি যন্ত্রপাতি থাকবে সেখানে! আতাউরের তো এতক্ষণে ফিরে আসার কথা ছিল, ছেলেটা অক্ষত আছে তো? আতঙ্কের বেগ জেতেজুতে বাক্সে ভরার মতো দমিয়ে রাখে মুরাদ। কোনদিকে যাবে? নদীর ওপারে চিনিকলের গন্তব্যে? নাকি আরো মাইল তিনেক ভেতরে ঘুরে গ্রামে?

শাড়ির ঘেরের গোলাপি ছায়ায় মুহূর্তের জন্য শিরিন মূর্ছা যায়, আবার ব্যথায় জেগে ওঠে। রোদের তেজ কমতে গিয়েও কমে না, থার্মোমিটারের পারদের মতো থির-থির কেঁপে পা ছড়িয়ে বসে থাকে পুরো নদীর পার জুড়ে, যেন সরবে না, রাত্রি নেমে এলেও না।
. . .

লেখক পরিচয়

কবি ও কথাসাহিত্যিক নাহার মনিকা উত্তরবঙ্গের মেয়ে। উত্তর বাংলার জল-হাওয়া-মাটি তাঁকে গড়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখার পালা চুকিয়ে পাড়ি জমান ভিনদেশে। লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্স ও স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিনে পাঠ শেষে জনস্বাস্থ্যকে পেশা করেছেন। কানাডার সরকারি স্বাস্থ্যবিভাগে কর্মরত আছেন বর্তমানে। ব্যস্ত পেশাগত জীবন তাঁর। বাংলাদেশ থেকে কানাডার দূরত্ব বিরাট! বারো-তেরো হাজার কিলোমিটারের কম হবে না। এখানে দিন তো ওখানে রাত! এখানে প্রকৃতির রং-রূপ-বৈচিত্র্যের সঙ্গে ওখানকার বৈচিত্র্যে আসমান-জমিন প্রভেদ। একই পৃথ্বীর ভিন্ন দুটি অভিজ্ঞতাকে দেহমনে বইছেন নাহার। কবিতা, গল্প ও আখ্যানে যার ছাপ পাঠক পাচ্ছেন। ‘মন্থকূপ’ উপন্যাসের বয়ানে কানাডায় দেখা হেমন্তকে ধরেছিলেন লেখক। কানাডায় হেমন্ত ঋতুর অপূর্ব সম্মোহনের মধ্যে স্বদেমে বাড়ির উঠানে ঝরা শিউলির কথা টানছেন আখ্যানে। নাহার লিখছেন :

…এখানে হেমন্তকালের গাছের পাতা খুব কমনীয়ভাবে ঝরে যায়। ঝরে যাওয়ার আগে তারা সাজে, রঙ্গিন হয়, লাল হলুদ, খয়েরী মিশেলে সে এক রঙ্গের উৎসব। টুপটাপ, বাউ করে, তেছড়া টানে ভূমির আকর্ষণে নিচের দিকে পড়তে পড়তে নিজের একটু আগে জুড়ে থাকা গাছের ডালটির দিকে নরম গা এলানো আহ ভাব ছুড়ে দিয়ে নামতে থাকে। গ্রামের বাড়ির উঠানে শিউলী ফুলের টুপটাপ ঝরে পড়ার সঙ্গে এর কোথাও যেন মিল আছে। তবে এখানে হেমন্তের পাতা ঝরার বিস্তার বিশাল। বাড়ি ফেরার রাস্তার দু’ধারে ভুট্টার ক্ষেত থেকে ফসল তুলে নিয়ে মসৃণ সোনালী বিরাট মাঠের অদূরের থোক থোক বনের ভেতর থেকে যেন রঙ্গের আর আলোর কোন গুপ্তধন বেরিয়ে এসে ঠিকরে ঠিকরে পড়ছে। আমি সম্মোহিতের মত গাড়ির গতি কমিয়ে আনি।

Nahar Monica’s books; @thirdlanespace.om

সূক্ষ্ম ডিটেলিং তাঁর লেখার চাবি। জীবন খেকে নেওয়া অভিজ্ঞতা এভাবে লিখে চলেছেন নাহার মনিকা। নারীজীবনের অনুপল মুহূর্তরা ও তা যাপনের রংগুলো ছোট ছোট ডিটেলিংয়ে ধরাটা তাঁর পছন্দের বোঝা যায়। থার্ড লেন স্পেস-এ প্রকাশিত বক্ষ্যমাণ গল্পে পাঠক তা অনুভব করেন। একাত্তর মহাকাব্যিক ঘটনা আমাদের জীবনে। মহাকাব্যিক সেই বিস্তারের মধ্যেই রয়েছে অগণিত আরো ঘটনা, অগণিত সাধারণকে তখন এগুলোর ভিতর দিয়ে গমন করতে হয়েছিল। নাহার মনিকা তার থেকে একটি উঠিয়ে এনেছেন এই গল্পে। সংবেদী বয়ানে ছুঁতে চেয়েছেন এক গর্ভবতী নারীর প্রসববেদনার বিড়ম্বিত মুহূর্তগুলো।

গল্গ ও আখ্যারে নাহার মনিকার বয়ন-কুশলতা পাঠককে অতএব ধরে রাখে। আর্দ্র করে। গল্পের প্রারম্ভিকায় ওই-যে তিনি কবিতার পঙক্তি রচিলেন, যেখানে বলা হচ্ছে : অথচ সকল গল্প এক নয় /উলের দীর্ঘ কাঁটা বুনে চলে ক্ষতের জাম্পার। … এখন তা সার্থকতা পায় এভাবে…।

নাহার মনিকার এ-পর্যন্ত প্রকাশিত বই সংখ্যায় অধিক নয়। বেছে বই করেন। যত্ন নিয়ে করেন। কবিতা, গল্প, আখ্যান মিলে প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে মন্থকূপ, বিসর্গ তান, পৃষ্ঠাগুলি নিজের, জাঁকড় ও সম্প্রতি প্রকাশিত নির্বাচিত গল্প উল্লেখযোগ্য। নাহার মনিকা নিয়মিত সক্রিয় লেখায় নিজ স্বকীয়তায়।

. . .

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 22

No votes so far! Be the first to rate this post.

Contributor@thirdlanespace.com কর্তৃক স্বত্ব সংরক্ষিত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *