নেটালাপ - পোস্ট শোকেস

গড প্রব্লেম : যুক্তির জয়-পরাজয়

Reading time 16 minute
5
(70)
@thirdlanespace.com

. . .

যত বিশ্বাস গড়ি, তত প্রশ্ন এসে দাঁড়ায়,
যুক্তির আলোয় ঈশ্বর ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়।
অস্তিত্ব খুঁজি কারণ–কার্যের শূন্য ধারায়,
নীরবতার দর্শনেই নন-এক্সিস্টেন্স কথা কয়।

আবার চারদিকে তাকিয়ে বিস্ময়ে ভরি মন,
মনে হয় শিল্পীর হাতে গড়া এই সৃজন!
বিশ্বাস আর যুক্তির মাঝে চলে জয়–পরাজয়,
প্রশ্নই আঁকে উত্তর, উত্তরেই প্রশ্নের ক্ষয়।

Does GOD Exist? – Javed Akhtar vs Mufti Shamail Nadwi Intense Debate; Source – Hajira Umer Kitchen YTC

. . .

গড প্রব্লেম-১
[সৃষ্টিকর্তা কেন যুক্তির অতীত হইতে বাধ্য]

‘বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর’;—একবিংশ শতকের পৃথিবীতে সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাসের এই একটি মাত্র পথ খোলা হাসান। গড প্রব্লেমকে আউট অব আর্গুমেন্ট মেনে নেওয়াই বরং যুক্তিযুক্ত এখন। জাভেদ আখতারদের সঙ্গে দিনরাত বাহাস করলেও হুজুরকুল কিছু হাসিল করতে পারবেন না।

আমাদের এখানে চার্বাকপন্থী থেকে শুরু করে দুনিয়াজুড়ে আজ-অবধি যারা স্রষ্টার অস্তিত্ব নাচক করে এসেছেন, তাঁদের লজিকসেন্স অনেকবেশি সুগঠিত ও বুদ্ধিদীপ্ত। বস্তুজগৎকে সার ধরে উনারা যুক্তি সাজিয়ে থাকেন। যেখানে বস্তুজগতের গঠন ও কাজ করার পদ্ধতির সবটাই বিজ্ঞানের কল্যাণে অদ্য অনেকবেশি বোধগম্য ও যুক্তিসংগত হয়ে ধরা দেয়। বস্তুজগৎ কে সৃষ্টি করেছেন?—প্রশ্নটি অবিশ্বাসীদের কাছে এখন আর গুরুতর কোনো আর্গুমেন্ট নয়। হুজুরদের এইটা বোঝানো যদিও কঠিন!

এর সহজ কারণ হলো, বস্তুর অতীত কিছু থাকা মানে হচ্ছে তাকে মানুষ ভাষা দিয়ে কল্পনা করে নিতে সক্ষম, কিন্তু যুক্তির সাহায্যে একে প্রতিষ্ঠা দান সম্ভব নয়। এখানে যুক্তি মানে ফ্যালাসি বা ভ্রান্ত যুক্তি। ওই আমার হাত টেবিল স্পর্শ করেছে, টেবিল মাটি স্পর্শ করেছে, সুতরাং আমার হাত মাটি স্পর্শ করছে টাইপের অংবংছং লজিক দিয়ে কিছু প্রমাণের চেষ্টা। একালে যা ধোপে টিকে না। জাভদ আখতার রসিক মানুষ হলেও হুজুরের কথা শুনতে-শুনতে নির্ঘাত হিন্দি সিনেমার কোনো গানের কলি লেখার তালে ছিলেন তখন।

সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বকে প্রতিষ্ঠা দিতে হলে এমন কিছু সেখানে থাকা প্রয়োজন, যেটি তার অস্তিত্বকে সুনিশ্চিত ও যুক্তিসংগত করে তুলবে। যেমন, অনু-পরমাণু বা আরো সূক্ষ্মতর কণা অথবা স্ট্রিং জাতীয় অসীম ক্ষুদ্র কিছু আমরা চোখে দেখি না, কিন্তু বস্তু-গঠনে এগুলোর ভূমিকা গাণিতিক মডেলে ভালোভাবে প্রমাণিত। বাস্তবেও বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব এগুলোর ব্যাপারে এতটাই সুগঠিত ও যৌক্তিক,—খোদাবিশ্বাসীকে এখন এসব আমলে নিয়ে যুক্তি সাজাতে হয়রান হতে হয়। তাদেরকে বলতে হয়,—বস্তুজগৎ গঠনের সূক্ষ্ম উপাদানও খোদার সৃজন! যদিও সেখানে তাদের যুক্তির গঠন যথেষ্ট গোলমেলে দেখায়। পাগল দ্বিজদাস চালাক লোক ছিলেন। বিশ্বাসীদের যুক্তি সাজানোর দুর্বলতাকে গানের চরণে সুন্দর ধরিয়ে দিয়েছেন তিনি। দ্বিজদাস গেয়ে গেছেন :

কেহ বলে আছ তুমি,
কেহ বলে নাই ।।
আমি বলি থাকলে থাকো,
না থাকিলে নাই।।
ও যারে নয়নেও দেখি না,
শ্রবণেও শুনি না,
দরশনে পাই না তার,
মিলে না প্রমাণ।।
শোনো দ্বিজদাসের গান।

মীমাংসা হলনা সৃষ্টি হতে এ যাবৎ
অদ্বৈত আর দ্বৈতবাদীর ভিন্ন ভিন্ন মত।।
কেহ বলে সাকার,
কেহ কয় নিরাকার,
আসলে কী প্রকার,
কে জানে সন্ধান।।

Keu mano ba na mano by Dijo Das; Artist – Ahmed Kayser; Source – Ahmed Kaysher YTC

দ্বিজদাস তাঁর সহজ কাণ্ডজ্ঞানে চরম সত্যি বলে গেছেন তখন। সুতরাং স্রষ্টার অস্তিত্ব নিয়ে ক্যাচাল আমার কাছে মাঝেমধ্যে চরম অর্থহীন মনে হয়। তথাপি এটি এমন এক সমস্যা, যেটি নিয়ে তর্ক ইহজীবনে শেষ হওয়ার নয়। বিজ্ঞান যেমন মহাবিশ্ব সৃষ্টির মূল উপাদান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে তালাশ করে চলেছেন। পদার্থবিদের অনেকে মহাবিশ্ব সৃষ্টির মূলীভূত উপাদান রূপে অতি সূক্ষ্ম রেশমি-কণা জাতীয় উপাদানের (স্ট্রিং) থিয়োরিতে উপনীত হয়েছেন। কথার কথা, স্ট্রিংকে একজন অবিশ্বাসী সৃষ্টির আদি উপাদান ভাবতে পারে, যেহেতু অতি সূক্ষ্ম অবস্থায় তা বস্তুগত চরিত্র বজায় রাখছে। সে নিরাকার হয়েও নয় নিরাকার।

গড পার্টিকল বা ঈশ্বরকণা, অর্থাৎ এমন কোনো মৌল উপাদান, যেটি আণবিক বিশ্ব গঠনে রেখেছিল ভূমিকা, তার সুনিশ্চিত প্রমাণ বিজ্ঞানীরা ঠায়ঠায় প্রমাণ করতে পারেননি। যদি করেন অদূর ভবিষ্যতে কোনোদিন, এর সঙ্গে আমাদের মনে অকাট্য প্রচলিত সৃষ্টিকর্তার ধারণা একজরাতা মিলবে না। সুতরাং সৃষ্টিকর্তা নিয়ে বিজ্ঞান তার কার্যপদ্ধতির কারণে ভাবতে বাধ্য নয়। তার কাছে ফ্যাক্ট ও রিয়েলিটি হলো আসল ঘটনা। বস্তুজগৎ সৃষ্টির প্রমাণিক নমুনা এছাড়া বিজ্ঞানের পক্ষে বের করার অন্য কোনো পন্থা নেই।

এখানেই বিজ্ঞান ও ছদ্মবিজ্ঞানের প্রভেদ। যারা সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাস করেন, তাদের ওই বিজ্ঞানের লেজ ধরে কাজেই ঝুলে লাভ নেই। কারণ, বিজ্ঞানের থিয়োরি প্রামাণিক হওয়ার পরেও মহাবিশ্বে সংঘটিত কোনো পরিবর্তনের প্রভাবে বদলে যেতে পারে।

বিশ্বাসীর কাছে সৃষ্টিকর্তা হচ্ছে এমন কিছু, যিনি কোনো অবস্থায় কোনোকিছুর দ্বারা প্রভাবিত, পরিবর্তিত ও রূপান্তরিত হতে পারবেন না। তিনি অনাদি অনন্ত আলফা বা শুরু। বিজ্ঞানের ওই স্ট্রিং জাতীয় তন্তুর মতো আদি হলেও, স্ট্রিং যেমন পরস্পরের সঙ্গে মিতালি পাতিয়ে পরমাণুর জনয়িতা হয়, তাঁর পক্ষে এরকম কিছু হওয়া যৌক্তিক নয়। সুতরাং, লজিক এখানে এসে কাজ করবে না। থাকবে কল্পনা ও আন্দাজ। তা সেটি বহু ধর্মবেত্তা হুজুরের চেয়ে আমাদের বাউল করিম ভালো ডিফাইন করে গেছেন। করিম তাঁর গানের কলিতে বলেছিলেন :

মক্কা শরিফ আল্লার বাড়ি
বুঝে-না মন পাগলে
ব্যক্তি নয় সে, শক্তি বটে
আছে আকাশ-পাতালে

এরকম শক্তির আধারকে বেদ-বেদান্ত সর্বং খল্বিদং ব্রহ্ম বা সবটাই ব্রহ্মময় বলে পুকারে। তা একে জাভেদ আখতারের মতো পাড় অবিশ্বাসী তাঁর নিজ যুক্তিতে ল অব নেচার বা পরমা প্রকৃতি বা নাথিং বাট সামথিং বলে মানেন বৈকি। প্রচলিত ঈশ্বরের সঙ্গে যার কোনো সহবত নেই। কারণ, ইনি এসবের অতীত এক সক্রিয়তা, যার কাছে পাপ-পুণ্য, দোজখ-বেহশতের কোনোই মূল্য নেই চারিআনা।
. . .

সংযুক্তি :
দ্বিজ দাসের গান মরিয়ম বেগম সুরমার কণ্ঠে জব্বর লাগত একসময়। গানের চরণে ‘পরশন’ ও ‘দরশন’ নিয়ে যদিও ভিন্নতা আছে বেশ। বাউল গান যেহেতু মৌখিক পরম্পরায় চলে, গানের কথায় এদিক-সেদিক হয়ে যায় হামেশা। আমার বিবেচনায় ‘পরশন’-এর চেয়ে ‘দরশন’ অধিক যুক্তিসংগত লাগে। সুরমার গাওয়া সংস্করণ আপাতত ঊহ্য রেখে দোস্ত টি এম কায়সারের কণ্ঠ সংযুক্ত করলাম এখানে। আফটার অল, এসব গান রপ্ত করতে গিয়া সে আমার ও মোস্তাকের অবলা পিঠকে তবলা বানিয়ে বহুত অত্যাচার করছে এককালে! 😉
. . .

দর্শন বিজ্ঞান শিল্প সাহিত্য চিত্রকলা প্রভৃতি এতো ব্যাপৃত-যে, অন্ধবিশ্বাসীদের নিয়ে অগ্রসর বিশ্বের মানুষেরা সাধারণত কোনো সময়ই দেয় না!
. . .

গড প্রব্লেম-২
[সৃষ্টিকর্তা কেন যুক্তির অতীত হইতে বাধ্য]

স্রষ্টার অস্তিত্বের ব্যাপারে ইবনে সিনার দৃষ্টিভঙ্গি আমার কাছে ভালোই সুসংগত মনে হয়। সিনা তাঁর ভাবনাবীজ মূলত অ্যারিস্টোটল থেকে ধার নিয়েছেন প্রথমে, অতঃপর নতুন ব্যাখ্যায় সমৃদ্ধ করেছেন পরে। লাইবনিজের ‘মোনাড’-এ যেমন অ্যারিস্টোটল ও সিনার প্রভাব থাকা বিচিত্র না। ইবনে সিনার মতে ঈশ্বর হচ্ছেন ওয়াজিব আল-ওজুদ বা প্রয়োজনীয় অস্তিত্ব। বস্তুজগতে সবকিছু কোনো-না-কোনোভাবে পরস্পর নির্ভর, যে-কারণে তারা অনন্য বলে বিবেচিত হতে পারে না। স্রষ্টা হচ্ছেন এমন এক অনন্য অবস্থা, যার অস্তিত্ব কোনোকিছুর ওপর নির্ভরশীল নয়। অনন্য হওয়ার কারণে তিনি হলেন নিয়ামক কারণ। সৃষ্টি তাঁকে বাদ দিয়ে সম্ভব নয়

অ্যারিস্টোটল একে আদি চালক বা ফার্স্ট মুভার বলেছিলেন। লাইবনিজ ঘুরিয়ে-প্যাঁচিয়ে কইছেন ‘মোনাড’। গাণিতিক এককের মতো স্বয়ম্ভূ কিছু এই মোনাড। ইবনে সিনার মতে, এই আদি চালক কেবল সৃষ্টির নিয়ামক, কিন্তু সৃষ্টিকে তিনি কোনোভাবে প্রভাবিত ও নিয়ন্ত্রিত করেন না। সোজা কথায়, পয়লা ধাক্কার পর তার আর কিছু করার নেই বা থাকছে না। তিনি ওই সর্বং খল্বিদং ব্রহ্ম-র মতো আকাম্মা একখান জিনিস, এবং শঙ্কারাচার্য, রামানুজ, মাধাবাচার্যের জন্য চিন্তার অতিশয় উত্তম খোরাক।

ইবনে সিনার ব্যাখ্যা প্রচলিত ইসলামি বিশ্বাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, যে-কারণে গাজ্জালি তাঁকে খারিজ করেছেন তখন। আবার সিনার পক্ষ নিয়ে ইবনে রুশদ ওরফে আভেসিনা গাজ্জালিকে আচ্ছোসে ঠ্যাঙ্গানি দিয়েছেন পরে।

খোদাতালার ব্যাপারে সবচেয়ে ভালো আর্গুমেন্ট দিয়া গেছেন মির্জা গালিব। জাভেদ আখতার গালিবের এই শেরটি প্রায়শ আওরান। গালিব আমরা জানি শরাবি ছিলেন। একবার মসজিদে শরাবের বোতল হাতে নামাজ আদায় করতে ঢুকেছিলেন। মুসল্লিারা খেপে লালা তাঁর কাণ্ডে! গালিব তাদের উদ্দেশ্যে আওরেছিলেন শের, যার মোদ্দা কথা হচ্ছে,—ভাইরে খোদা তো এই জাহান সৃষ্টি করেছেন। এমন জায়গা দেখাতে পারো যেখানে তিনি নেই! যদি না পারো, তাহলে মসজিদ আর শুঁড়িখানায় ফারাক নাই। সবখানেই আছেন তিনি সগৌরব! গালিবের কপাল ভালো! এই দেশে একালে জন্ম নিলে মুসল্লিরা তাঁকে তৎক্ষণাৎ পুড়িয়ে মারতেন। যাইহোক গালিবের বিখ্যাত যে-শেরটি জাভেদ আখতার হামেশা কোট করেন ও ভালোই ব্যাখ্যা দিয়ে থাকেন, সেটি বরং কোট করি এখানে। গালিব ফরমাইতেছেন :

না থা কুচ তো খোদা থা, কুচ না হোতা তো খুদা হোতা
ডুবায়া মুঝকো হনে নে, না হোতা ম্যায় তো কিয়া হোতা

Mirza Galib Sher Kuch Na Hota To Khuda Hota; Javed Akhter interpretaion; Source – Jashn-e-Rekhta YTC

অর্থাৎ, কিছু নাই যেখানে, সেখানেও খোদা আছেন। আমি বান্দা মাঝখানে এসে পড়ায় ঘটেছে মুসিবত। আমি যদি না আসতাম ধরায়, তাহলে খোদা নামে কিছু থাকলে কি, আর না থাকলেই-বা কি ছিল! কেউ তো জানত না তিনি আছেন অথবা নেই। মূল কথাটি গালিব এখানে বলেই দিয়েছেন। মানুষ তার মস্তিষ্কের তরক্কিদোষে ভেবেছে,—‘এলেম আমি কোথা থেকে!’ ডাইনোসর ধরায় দাপটের সঙ্গে কোটি-কোটি বছর টিকে থাকলেও তা ভাবেনি। যেমন আজো মানুষ বাদে কোনো প্রাণী তা ভেবেছে, এর প্রমাণ বিজ্ঞান এখনো পায়নি।

মানব মস্তিষ্কে ঈশ্বরের ধারণা গড়ে ওঠার পেছনে এমন কোনো নিউরন ফায়ারিং ছিল কি-না, যেটি সে জন্মের সময় সঙ্গে করে নিয়ে আসে… ইত্যাদির তালাশ বিজ্ঞান করেছে। রজার পেনরোজ ও নিউরো সায়েন্টিস্ট স্টুয়ার্ট হ্যামারহফ যেমন কনশাসনেস বা চেতনার উৎস খুঁজতে যেয়ে মাইক্রোটিউবলের আলাপ তুলেছেন। এমন এক নিউরন সূক্ষ্মতা, যেটিকে উনারা মানব-মস্তিষ্কে ঈশ্বর বিষয়ক ধারণার উদয়ের জন্য অনেকটা দায়ী বলে ভাবেন। তবে, এটি বিতর্কিত মতামত।
. . .

এখা‌নে ৩‌টি বিষয় স্পষ্ট, যুক্তি দিয়ে সৃষ্টিকর্তাকে প্রমাণ করা যায় না। বিজ্ঞান ঈশ্বর-প্রশ্নকে তার আওতার বাইরে রাখে, এবং বিশ্বাস ও অবিশ্বাস, দুটোই শেষ পর্যন্ত দার্শনিক অবস্থান। এই তিনটিই আংশিকভাবে গ্রহণযোগ্য, তবে কিছু সূক্ষ্ম পার্থক্য না মানলে আলোচনা একপেশে হয়ে যায়।

প্রথমত, নিরীশ্বরবাদীরা ঠিকই বলেন, ‘কে সৃষ্টি করেছে?’ প্রশ্নটি বস্তুজগতের ভেতর দাঁড়িয়ে করলে অসীম পশ্চাদগমন তৈরি হয়। তাই আধুনিক দর্শনে ঈশ্বরকে আর বস্তুগত কারণ হিসেবে ধরা হয় না। কিন্তু এখানেই বিশ্বাসীরা বলেন,—সৃষ্টিকর্তা যদি থাকেন, তিনি বস্তুজগতের ভেতরের কোনো উপাদান নন, বরং কারণ-কার্য শৃঙ্খলের বাইরের এক অস্তিত্বগত ভিত্তি। ফলে তাঁকে প্রমাণ করার দাবি যেমন অযৌক্তিক, তেমনি ‘প্রমাণ নেই, তাই নেই’… এই সিদ্ধান্তও দার্শনিকভাবে চূড়ান্ত নয়।

দ্বিতীয়ত, বিজ্ঞান কী বলে? বিজ্ঞান মহাবিশ্ব কীভাবে কাজ করে, তার মডেল দেয়… বিগ ব্যাং, কোয়ান্টাম ফিল্ড, স্ট্রিং থিয়োরি ইত্যাদির মাধ্যমে। কিন্তু কেন কিছু আছে, কিছুই নেই কেন, এই প্রশ্ন বিজ্ঞান পদ্ধতিগতভাবেই তোলে না। তাই বিজ্ঞান ঈশ্বরকে অস্বীকারও করে না, প্রমাণও করে না। ঈশ্বর-প্রশ্ন বিজ্ঞানের নয়, মেটাফিজিক্সের

তৃতীয়ত, বাউল বা বেদান্তের ‘শক্তি’ বা ‘ব্রহ্ম’ ধারণা ব্যক্তিসত্তার ঈশ্বর থেকে আলাদা। এই ধারণার সঙ্গে অনেক নিরীশ্বরবাদীর ‘ল অব নেচার’ বা ‘ইম্পারসোনাল রিয়ালিটি’-র মিল আছে। পার্থক্যটা ভাষায়, ব্যাখ্যায়,— অভিজ্ঞতায় নয়।

আমার ম‌নে হয়, সৃষ্টিকর্তা বনাম নিরীশ্বরবাদ আসলে বিজ্ঞান বনাম বিশ্বাস নয়, বরং এটি ভিন্ন-ভিন্ন দার্শনিক ব্যাখ্যার সংঘাত। যুক্তি এখানে সীমা দেখায়, আর মানুষ সেই সীমার পর নিজের অভিজ্ঞতা, সংস্কৃতি ও কল্পনা দিয়ে অর্থ খোঁজে। এই তর্ক তাই শেষ হয় না, হওয়ার কথাও নয়। তবে স‌ত্যি বলতে কি, একজন বিজ্ঞানমনষ্ক জা‌ভেদ আখতারের এমন ডি‌বে‌টে না যাওয়াই ভালো ছিল।
. . .

গড প্রব্লেম-৩
[সৃষ্টিকর্তা কেন যুক্তির অতীত হইতে বাধ্য]

ইশ্বর থাকুন অথবা না-থাকুন, তাঁকে এই জগতের জন্য অপ্রমাণিত সমস্যা হয়ে থাকতে হবে চিরকাল। তাঁর ব্যাপারে অকাট্য সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না। পুরোটা কাজেই বিশ্বাসের ওপর ছেড়ে দেওয়া ভালো। যার মন চায় বিশ্বাস করতে পারে। যার মন চাইছে না, সে করতে পারে অবিশ্বাস। অথবা টু বি অর নট টু বি দ্যাট ইজ দ্য কেয়েশ্চন বিবেচনা করে অজ্ঞেয়কে বেছে নিলে নেই ক্ষতি। প্রচলিত সকল ধর্ম যে-ঈশ্বরকে হাজির করে তিনি মানবসৃষ্ট কল্পনায় বোনা একখানা ব্যাটা মানুষ। এই হিসাবটি নিজের আকল দিয়ে মেলানো সম্ভব। আমরা যে-ঈশ্বরের আলাপ পাড়লাম, তিনি এর বাইরের কোনো কিছু।

আমরা যে-ঈশ্বরের আলাপ তুলছি, তঁকে নিয়ে পাড় নাস্তিক কল্পবিজ্ঞান লেখক আইজ্যাক আসিমভ দুর্দান্ত সব গল্প লিখে গেছেন। জাভেদের ভাষান্তরে তার একটি (শেষ উত্তর) থার্ড লেন সাইটে তুলেছিলাম আমরা। গল্পটি এই সুবাদে উপভোগ করা যেতে পারে। আর তার সঙ্গে পাগলি শাকিরার পাগলাটে গানখানা করা যাক উপভোগ। অপুট হাতের ভাষান্তর নিচে সংযুক্ত করছি :

Octavo Día – Shakira (Live from MTV Unplugged, 1999); Source – M-Pro Remasters YTC

দিন নাম্বার আট (অক্টাভো দিয়া)
গানের কথা ও আয়োজন : শাকিরা
এমটিভি আনপ্লাগড

হেভবি খাটনি শেষে, আট নাম্বার দিনে,
সবটা দেইখা নিলেন আরেকবার,
টেনশন থাইকা নিতে ছুটি…
কইলেন, ‘সবই তো দেখতাছি জবর, সময় হইছে বিশ্রামের’
আর চক্করে বাইরে দিলেন পা

কে ভাবছিল,
ফেরত আসার পর একই খোদা
সবটা দেখবেন গোলমালে ঠাসা
আর, তাঁরেও পাঁচজনের মতো বেকার হইতে হইলো
সংখ্যার মইদ্যে আরেকটা সংখ্যা,
যেইটা বাড়তাছে প্রতিটা বছর, বিরতি ছাড়াই

তখন থাইকা পাবলিকে
যারা তাঁরে একলা রাস্তা পার হইতে দেখছিল
এমনভাবে হাঁটতেছিলেন,
যেন ধৈর্য ধরে কারো কারো অপেক্ষায় আছেন
এমন কেউ,
যার লগে দুইটা সুখের কথা কওন যায়

তারমইদ্যে দুনিয়াটা বনবন ঘুরতাছে,
আর তা থাইমা যাইতে পাারে না
আর এইখানে,
আমরা য্যান কিছু লোকের দাবার ঘুঁটি
আমারে তাদের মতো বোকা পাও নাই,
যারে চাইলেই বোকা বানাইতে পারো সহজে
আমি কিন্তু সত্য বলতেছি
আর আন্ধাও তা দেখতে পায়

এইটা যদি হয় তুমি বেকার
একলা লাগতেছে চরম
খোদার সেইটা হজম হয় নাই
তাই ভাগা দিছেন অন্যখানে
কপাল তো পুড়ছে আমাগো
আমাদের হাতে আর কোনো অপশন নাই
সেলাম জানাই তবু মাইকেল জ্যাকসনে
বিল ক্লিনটন অথবা টারজানে

এইটা জটিল আরো
রাজারে ভাবা মুকুটহীন
তারে তখন
আম পাবলিক হইতে হয়

গরিব, ঈশ্বর, ম্যাগাজিনের পাতায় তারে দেখি না
সে একখান মডেলও না
অথবা শিল্পী অথবা কেউকেটা আদমি কোনো

তারমইদ্যে পৃথিবীটা বনবন ঘুরতাছে,
আর তা থাইমা যাইতে পাারে না
আর এইখানে,
আমরা য্যান কিছু লোকের দাবার ঘুঁটি
আমারে তাদের মতো বোকা পাও নাই,
যারে চাইলে বোকা বানাইতে পারো সহজে
আমি কিন্তু সত্য বলতেছি,
আর আন্ধাও তা দেখতে পায়
. . .

হাসানকে অসংখ্য ধন্যবাদ,—এরকম একটা বিষয়কে সামনে আনার জন্য। বিষয়টা মূলত পাবলিক প্লেসে `ঈশ্বরের অস্তিত্ব আছে কি নেই’;—এ-নিয়ে খোলামেলা আলোচনা কিংবা বিতর্ক। যাই বলি না কেন, উদ্দেশ্য যাই থাক,—আমার কাছে এই বিতর্কের একটা ইতিবাচক মানে আছে। বিতর্কটি মানবজ্ঞানে নতুন কিছু যোগ করতে পারল কি না, এরচেয়ে এর প্রাসঙ্গিকতা আর প্রেক্ষাপট আমার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এসব নিয়ে আলোচনা পাবলিক স্পেসে করা এখন রীতিমতো কঠিন হয়ে গেছে।

পুরো ভারতবর্ষে—ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ—প্রতিটি দেশেই ধর্মীয় চিন্তার বাড়াবাড়ি এখন আগের যে-কোনো সময়ের চেয়ে বেশি, আর যুক্তিশীল মানুষের সংখ্যা দ্রুত কমছে। ফলে এই ধরনের বিতর্ক থেকে ‘ভালো কিছু অর্জন’ করার চেয়ে আগে দরকার একটা পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে বিনা দ্বিধায় মুক্তবুদ্ধির চর্চা আরও বেশি করে করা সম্ভব হয়। পুরো অঞ্চলজুড়ে এই পশ্চাদগমনের কারণে সহিংসতা বেড়েছে, ধর্মীয় আবেগ তীব্র হয়েছে,—যা অশুভের লক্ষণ। এই বিতর্কের একটা উল্লেখযোগ্য দিক এখানেই। এখন জাভেদ আখতারকে নাস্তিক ঘোষণা দিয়ে বয়কট করা, তাঁর মাথার দাম ঘোষণা করা,—এ-ধরনের পরিস্থিতি যেন তৈরি না হয়, এটাকেই বরং একটা অর্জন বলে ধরতে হয়। আরও বেশি করে বিভিন্ন ইস্যুতে বিতর্ক হোক, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের জায়গা তৈরি হোক,—তাহলে মুক্তির জায়গা হয়তো তৈরি হবে।

শুরুতে বলে নেই, ঈশ্বরের অস্তিত্ব আছে কি নেই, এ-ধরনের বিতর্কে এখন পর্যন্ত কেউ ‘বিজয়ী’ হতে পারেনি। কারণ এখানে এমন কোনো স্বতঃসিদ্ধ সমাধান নেই, যেখানে সবাই একমত হতে পারে। মানুষের যুক্তিচর্চার শুরু থেকে এই বিতর্ক চলছে, এবং এখনও তা চলমান। দীর্ঘদিনের চর্চায় উভয় পক্ষ মোটামুটি জানে,—কোথায় কার যুক্তির শক্তি, কোথায় কার দুর্বলতা। তাই এই ধরনের আলোচনায় হার-জিতের হিসাব অনেক সময় অবান্তর হয়ে যায়। দুই পক্ষ একই প্রশ্নের উত্তর দেয় ভিন্ন-ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে;—একজন ঈশ্বরকে দেখেন নৈতিক-মানবিক সমস্যার ভেতর দিয়ে, আরেকজন দেখেন অস্তিত্বের ‘কারণ’ বা অস্তিত্বের ভিত্তি হিসেবে।

জাভেদ আখতারের যুক্তির দার্শনিক শক্তি হলো : তিনি শুরুতেই আলোচনাকে ‘প্রমাণ’ আর ‘নৈতিক দায়িত্ব’-র দিকে টেনে এনেছেন। ঈশ্বর আছেন কি নেই;—একে শুধু তাত্ত্বিক প্রশ্ন হিসেবে না রেখে বলেন, ‘ঈশ্বর যদি সর্বশক্তিমান ও সদয় হয়ে থাকেন, তাহলে পৃথিবীতে এত নির্মমতা কেন?’ শিশুদের মৃত্যু, যুদ্ধ, নিরীহ মানুষের কষ্ট;—এসব উদাহরণ টেনে তিনি ঈশ্বরের সদয় সর্বশক্তিময় ক্ষমতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দেন। এই কৌশলের গভীরে একটা সুবিধা আছে : ঈশ্বরকে যদি ‘ভালো ন্যায়ের ভিত্তি’ বা ‘নৈতিক বিধানের উৎস’ বলা হয়, তাহলে বাস্তব দুনিয়ার অশুভ এড়িয়ে যাওয়া যায় না;—বিশ্বাসীকে ব্যাখ্যা দিতেই হয় সেখানে।

Faith, Reason and Inner Engineering: Jaggi Vasudev, Javed Akhtar; Source – tehelkatv YTC

দ্বিতীয়ত, জাভেদ আখতার যে-ভাষা ব্যবহার করেন, তা যাচাইযোগ্যতার ভাষা;—অস্তিত্বের দাবি করলে সেটার প্রমাণ হাজির করতে হবে। সাধারণত পাবলিক বিতর্কে এই ভাষা খুব কার্যকর, কারণ এতে বিশ্বাস নয়, বিচার করার মানদণ্ড সামনে আসে। তৃতীয়ত, তিনি মানুষের নৈতিকতার একটা দুনিয়াবি ভিত্তি দাঁড় করাতে চান;—ধর্ম ছাড়াও মানুষ ন্যায্য হতে পারে, আবার কখনও ধর্মীয় পরিচয়ই মানুষকে হিংসা ও বিভাজনের দিকে ঠেলে দেয়;—এই আশঙ্কাও তিনি তুলে ধরেন।

তবে , জাভেদ আখতারের যুক্তির দুর্বলতাও আছে, এবং সেটা দার্শনিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম দুর্বলতা, তিনি অনেক সময় ‘ঈশ্বর নেই’ বোঝাতে গিয়ে আসলে ‘ঈশ্বর সদয় নন’ বা ‘ধর্মীয় ব্যাখ্যা নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়’;—এরকম একটি জায়গায় ঢুকে পড়েন। ‘ঈশ্বর আছেন কি নেই’ আর ‘ঈশ্বর নৈতিকভাবে কেমন’;—দুটো আলাদা প্রশ্ন। পৃথিবীতে অশুভ আছে;—এর থেকে সর্বোচ্চ যা দাঁড়ায় তা হলো : ‘সর্বশক্তিমান ও সদয় ঈশ্বর’ নামক ধারণাটি চাপের মুখে পড়ে, কিন্তু এতে-করে তাঁর অস্তিত্ব সরাসরি বাতিল হয়ে যায় না।

কেউ বলতে পারে ঈশ্বর আছেন, কিন্তু হস্তক্ষেপ করেন না। কেউ বলতে পারে, ঈশ্বর সর্বশক্তিমান নন। অন্যভাবে ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে পারে কেউ। দ্বিতীয় দুর্বলতা, জাভেদ আখতার যে-ধরনের প্রমাণ চান (চোখে দেখা, মাপা,— পরীক্ষাগারের মতো), ঈশ্বর বিষয়ক ধারণা এর সঙ্গে যায় কি-না তা বিতর্কিত। এর ফলে অন্যপক্ষ সহজে বলতে পারে : ‘আপনি যে-প্রমাণ চান, তাতে ঈশ্বরকে বস্তু বানিয়ে ফেলছেন।’

অন্যদিকে শামাইল নাদভীর শক্তির জায়গা ভিন্ন। তিনি বলেন,—জগতের সবকিছু নির্ভরশীল, তাই শেষ পর্যন্ত একটি ‘অপরিহার্য সত্তা’ ধরতেই হয়;—যে-নিজে কারও ওপর নির্ভরশীল নয়। এই যুক্তির শক্তি হলো, এটা কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার ওপর দাঁড়িয়ে নয়, বরং আরও গভীর প্রশ্নের দিকে যায়,—‘কেন কিছু আছে, কিছুই না থাকার বদলে?’—এটা অস্তিত্বের ভিত্তি খোঁজে।

দ্বিতীয় শক্তি হলো, মানুষকে নৈতিক দায়িত্ববান ধরে নেওয়া। যুদ্ধ, হত্যা, নির্যাতন… এসব মানুষের সিদ্ধান্তের ফল;— ঈশ্বরের ওপর দোষ চাপালে মানুষের দায় সুতরাং লঘু হয়। এই যুক্তি মানুষকে নিজের দায়িত্বের দিকে ফেরায়;—‘অন্যায় মানুষই করে, তাই বদলও মানুষকেই করতে হবে।’ তৃতীয়ত, তিনি ন্যায়বিচারকে আখিরাতের ধারণার সঙ্গে যুক্ত করেন;—এই জীবনের অসম্পূর্ণতা চূড়ান্ত নয়; পরবর্তী স্তরে তা পূর্ণতা পায়;—এটা যাঁরা নৈতিকতার পরম ভিত্তি খুঁজছেন, তাঁদের কাছে আকর্ষণীয় লাগে।

The Banshees of Inisherin movie trailer by Martin McDonagh; Source – SearchlightPictures YTC

তবে এখানেও বড়ো দুর্বলতা আছে। প্রথমত, ‘অপরিহার্য সত্তা’ ধরলেও সেখান থেকে সরাসরি ‘আমার ধর্মের ঈশ্বর’-এ পৌঁছানো সহজ নয়। এমন একটি সত্তা থাকলেই-যে তিনি সদয়, ন্যায়পরায়ণ, সচেতন, প্রার্থনা শোনেন, বার্তা পাঠান,—এসব গুণ একলাফে প্রমাণিত হয় না। ফলে প্রশ্ন তোলা সহজ : ‘ধরুন একটি প্রথম কারণ (first cause) আছে, তাতে শুধু কারণ দাঁড়াল, ধর্মীয় ঈশ্বর দাঁড়াল না।’ দ্বিতীয়ত, কারণ-শৃঙ্খল থামাতে এমন সত্তা ‘অবশ্যই’ দরকার;—এ-কথাও সর্বসম্মত নয়।

কেউ বলেন, কিছু বিষয় ব্যাখ্যার বাইরে ‘আপাত সত্য’ হিসেবেই থাকতে পারে, কেউ বলেন কারণের শৃঙ্খল অনন্ত হলেও তা অসম্ভব প্রমাণিত নয়। তৃতীয়ত, ‘মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা’ দিয়ে মানুষের তৈরি অশুভ বোঝানো যায়, কিন্তু প্রকৃতির অশুভ ভূমিকম্প, মহামারি, জন্মগত রোগ, শিশুদের দুর্ভোগ,—এসবকে মানুষের ঘাড়ে চাপানো যায় না। এখানেই দুঃখ বিষয়ক প্রশ্নগুলো আবার ধারালো হয়,—মানুষ না করলেও কেন এমন দুঃখ? আর যদি বলা হয়, ‘এই দুঃখ বৃহত্তর মঙ্গলের জন্য’, তাহলে নৈতিক অস্বস্তি থেকে যায়,—একজন নিরীহ মানুষের দুঃখ কি অন্য কারও নৈতিক উন্নতির উপকরণ হতে পারে?

আমার কাছে এই বিতর্কের সবচেয়ে গভীর জায়গা হলো, দু’জনের প্রমাণের মানদণ্ড ভিন্ন। জাভেদ আখতার বৈজ্ঞানিক ধাঁচের প্রমাণ চান; নাদভী মেটাফিজিক্যাল অনিবার্যতা দেখান। আখতার ঈশ্বরকে দাঁড় করান নৈতিক অভিজ্ঞতার মাটিতে, নাদভী দাঁড় করান অস্তিত্বের ভিত্তিতে। একে অপরকে খণ্ডন করার বদলে তাঁরা প্রায়ই একে অপরের কাঠামোকে অপ্রাসঙ্গিক প্রমাণ করতে মরিয়া থাকেন। আখতার বলেন, ‘এতো দুঃখ যন্ত্রণা থাকলে ঈশ্বর-ধারণা নৈতিকভাবে দুর্বল;—নাদভী বলেন, ‘কষ্ট থাকলেও প্রথম কারণের (first cause) প্রশ্ন থেকে পালানো যায় না।’

এখন এই বিতর্ককে আরও নির্মোহভাবে ধরতে গেলে প্রথমে স্বীকার করতে হয়,—ঈশ্বর প্রশ্নে আমাদের হাতে চূড়ান্ত জ্ঞান নেই। আমরা যুক্তিসঙ্গতভাবে ‘ঈশ্বর নেই’ বলেও নিশ্চিত হতে পারি না, কারণ অস্তিত্বের কারণ নিয়ে প্রশ্নগুলো এখনও মীমাংসিত নয়। আবার ‘ঈশ্বর আছেন’ বলেও নিশ্চিত হতে পারি না, কারণ দুঃখ, অশুভ, ঈশ্বরের নীরবতা, আর ঈশ্বর-ধারণা টিকিয়ে রাখতে অতিরিক্ত ব্যাখ্যার প্রয়োজন। সব মিলিয়ে ধারণাটিকে সমস্যাজনক করে তোলে। এই জায়গায় দাঁড়ানো দ্বিধা নয়; এটা জ্ঞানগত সংযম;—আমি যা জানি না, তা জানি বলে ভান না করা।

এই অবস্থান দর্শনের ইতিহাসে দুর্লভ নয়। ডেভিড হিউম দেখিয়েছিলেন,—কারণ, নিয়ম, উদ্দেশ্য—এসব আমরা প্রকৃতিতে সরাসরি ‘দেখি’ না; আমরা অভ্যাস থেকে অনুমান করি। তাই ঈশ্বরের মতো অতিলৌকিক সত্তা নিয়ে নিশ্চিত দাবি করা মানে নিজের জ্ঞানক্ষমতাকে অতিমূল্যায়ন করা। তাই স্বীকার করে নেওয়াই ভালো যে আমাদের সীমা আছে, এবং তাই আমরা নিশ্চিত নই।

David Hume quote on God’s Existence; Quote Source – Collected; Google Image; @thirdlanespace.com

কিন্তু, যদি শুধু ‘আমি জানি না’ বলেই থেমে যাই, তাহলে সেটা নিষ্ক্রিয়তা হয়ে দাঁড়ায়। তাই পরের প্রশ্নে যেতে আমরা বাধ্য : এই অনিশ্চয়তার মধ্যেও আমরা কীভাবে বাঁচব, সিদ্ধান্ত নেবো, নৈতিক হবো? এইখানে আলবেয়ার কামু জরুরি হয়ে ওঠেন। কামু দেখান,—ঈশ্বর থাকুন বা না-থাকুন, মানুষের দুঃখ বাস্তব। তাই নৈতিকতার ভিত্তি অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ বা পরকাল নয়; নৈতিকতার ভিত্তি হলো এই মুহূর্তের অন্যায়। আমরা ঈশ্বরের অপেক্ষায় বসে থাকি না। ঈশ্বর থাকলেও আমরা তাঁর ‘প্রতিনিধিত্ব’ দাবি করি না। অন্যায়ের সামনে নিজে দাঁড়াতে চাই;—এটাই মানুষ হিসেবে আমার নৈতিক অবস্থান।

এই জায়গায় দাঁড়িয়ে একদিকে কঠোর ধর্মবিশ্বাসকেও প্রশ্ন করা যেমন দরকার, তেমনি আবার কট্টর নাস্তিকতার দাবিও পুরোপুরি গ্রহণযোগ্য মনে হয় না। কট্টর নাস্তিক যখন বলেন, ‘সবই অর্থহীন’, তখন বলাটা জরুরি,—অর্থ অতিলৌকিক হয়তো নয়, কিন্তু মানুষ অর্থ নির্মাণ করতে পারে। আবার বিশ্বাসী যখন বলেন, ‘সব কিছুর অর্থ ঈশ্বর জানেন’, তখন এই কথা অনেকসময় মানুষের দায়িত্বকে দুর্বল করে দেয়। কারণ, মানুষ তখন সহজেই বলে বসতে পারে—‘সবই ঈশ্বরের ইচ্ছা।’

এইখানে হানা আরেন্ট গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন। আরেন্ট দেখিয়েছিলেন : নৈতিক বিপর্যয় ঘটে তখনই, যখন মানুষ নিজের দায়িত্ব ‘ওপরের কোনো কর্তৃত্ব’-এর ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়;—ঈশ্বর, আদর্শ, রাষ্ট্র… তা যে-নামেই হোক। মানুষ ভয়ংকর কাজ করে, কারণ ভাবে,—‘আমি দায়ী নই, আদেশ ছিল।’ ঈশ্বর-ধারণা যদি নৈতিকতার শেষ আশ্রয় হয়, তবে এই বিপদ আরও বাড়তে পারে। মানুষের দায়িত্ব হলো,—কোনো পরম পরিকল্পনা আছে কি নেই, সেই প্রশ্নে আটক না-থেকে নিজের কাজের দায় নিজে গ্রহণ করা। দায় নেওয়াটাই হচ্ছে মানুষের নৈতিকতার কেন্দ্র।

আর, এ-কথা আজ আরও বেশি জরুরি, কারণ ঈশ্বর প্রশ্নটি শুধু ব্যক্তিগত বিশ্বাসের প্রশ্ন নয়;—এটা আইন, রাষ্ট্র, সহিংসতা ও পরিচয়-রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছে। কোনো মানুষের বিশ্বাস করার অধিকারে আঘাত করা যেমন অনুচিত, তেমনি বিশ্বাসকে ‘পাবলিক সত্য’ বানানোর দাবির বিরুদ্ধেও রুখে দাঁড়ানো কর্তব্য। ঈশ্বর থাকলেও,—রাষ্ট্র, আইন, নৈতিক বিচার তাঁর নামে চলতে পারে না, কারণ তাঁর অস্তিত্ব বিতর্কিত। বিশ্বাস ব্যক্তিগত হতে পারে, কিন্তু নাগরিক জীবনের ন্যায্যতা কোনো বিতর্কিত বিশ্বাসের ওপর দাঁড়ালে বিপদ বাড়ে।

ঈশ্বর থাকতে পারেন, আবার নাও থাকতে পারেন; কিন্তু এই অনিশ্চয়তাকে অজুহাত বানিয়ে নিজের নৈতিক দায়িত্ব পরিত্যাগ করা কোনোভাবে যুক্তিসংগত হতে পারে না। ঈশ্বর প্রশ্নের কোনো চূড়ান্ত উত্তর না থাকা সম্ভবত মানব অবস্থার সত্য। এই অনিশ্চয়তা থেকে পালিয়ে কেউ ঈশ্বরে আশ্রয় নেয়, কেউ নাস্তিকতায়, কিন্তু একজন যুক্তিশীল মানুষ এই অনিশ্চয়তার ভেতরে দাঁড়িয়ে থাকে। এই দাঁড়িয়ে থাকা মোটেও সহজ নয়;—কারণ, এতে কোনো চূড়ান্ত সান্ত্বনা নেই, কোনো পরম আশ্বাস নেই। এ-কারণে এই অবস্থান নৈতিকভাবে কঠোর। এখানে চূড়ান্ত বলে কিছু নেই, যার ওপর দায় ঠেলে দেওয়া যায়। এখানে মানুষ একা, কিন্তু পুরোপুরি দায়সহ একা।

দ্রষ্টব্য : মিনহাজ ভাই গড প্রব্লেম নিয়ে ইতোমধ্যে অনেক গভীরে গিয়ে আলোচনা করেছেন। আমি মূলত এই বিতর্কের প্রেক্ষিতে প্রাথমিক কিছু বিষয় সামনে আনার চেষ্টা করেছি। যে-কারণে কিছু জায়গায় ভাবগত পুনরাবৃত্তি আছে বলে মনে হতে পারে।
. . .

First Cause vs Action God

শামাইল নাদভীর আর্গুমেন্ট অতিশয় দুর্বল জাভেদ। হুজুরকুলের বড়ো সমস্যা হলো ঈশ্বরের অস্তিত্বের প্রশ্নে এনারা নিজের প্যাঁচে হামেশা পাক খায়। যেমন ধরেন, অবিশ্বাসীরা যখন চেপে ধরে, তারা তখন অ্যারিস্টোটল-সিনা-লাইবনিজ অবধি ত্যানা প্যাঁচানো ফার্স্ট কজ বা আদিকারণ-এর দ্বারস্থ হয়। এখন, এই আদিচালকের যত ব্যাখ্যা কালে-কালে হয়েছে, সেখানে উনি ইমারজেন্ট, যেহেতু এরকম অনন্যনির্ভর কিছু ছাড়া সৃষ্টি শুরু হতে পারে না। ব্যাস এ-পর্যন্ত তাঁর ভূমিকা।

শামাইল নাদভীকে যদি তর্কে জিততে হয় তাহলে আগে এই আর্গুমেন্টের জবাব দিতে হবে-যে,—আদিকারণকে তিনি কীভাবে দেখেন? ইবনে সিনার মতো অনন্যনির্ভর ভাবেন তাকে? যদি ভাবেন, তাহলে এই অনন্যনির্ভর ‘কিছু’র পক্ষে সৃষ্টিতে অংশগ্রহণ সম্ভব নয়। যেহেতু, সৃষ্টি হলো যৌগিক। যেখানে, এমনকি অ্যাটম মৌলিক নয়। অ্যাটমে রূপ নেওয়ার আগে গ্যাসীয় অবয়বে হয়তো ছিল। হয়তো তাও ছিল না। ডার্ক অ্যানার্জি রূপে মহাবিশ্বে ছিল বিরাজিত। কেননা আমরা এখন জানি,—মহাবিশ্বে শূন্য বলে কিছু নেই। এম্পটি স্পেস নেই। সবটাই কিছুতে-না-কিছুতে পরিপূর্ণ।

মানে দাঁড়াচ্ছে, আদিকারণ-এর বাইরে এমন কোনো মৌলিক, যার পক্ষে এই যৌগ সৃজনে অংশ নেওয়া সম্ভব নয়। তাঁর ওপর সৃষ্টিরক্ষাসহ নিয়ন্ত্রণের ভার চাপানোর যুক্তি সুতরাং থাকছে না। বেদান্তের ফিলোসফিক্যাল ইন্টারপ্রিটেশনে নেমে ব্রহ্মের স্বরূপ নিয়ে তিন আচার্য যে-কারণে তখন প্যাঁচে পড়েছিলেন। অদ্বৈতবাদ, দ্বৈতবাদ ও অদ্বৈত দ্বৈতাদ্বৈতবাদ ইত্যাদি এখান থেকে এসেছিল।

বেদান্ত মানলে হিন্দু বলেও কিছু থাকে কি? ব্রহ্ম-র বাস্তবিক কোনো অ্যাকশন সেখানে থেকেও নেই। তিনি আছেন এবং তার মধ্যে লয়-বিলয় ঘটছে!—মহা অ্যাবস্ট্রাক্ট একখাো প্যাঁচ। মানুষ এঁনাকে দিয়ে করবেটা কী? সুতরাং পুরাণাদি বানিয়ে আচ্ছা মতো হাজারে-বিজোরে অ্যাকশন গড সৃজন করে নিয়েছে। তার উপ্রে চলছে সনাতন।

সবগুলো ধর্মও তাই। অ্যাকশন গড ছাড়া চলতে পারে না এক-পা। এখন, অ্যাকশন গডের ওপর তারা দুটি দায় চাপিয়েছে। যেমন কোরান যদি খেয়াল করেন তাহলে দেখবেন,—একদিকে বলা হচ্ছে, তিনি সৃজন করেছেন সবকিছু। অন্যদিকে বলা হচ্ছে,—তিনি সৃজনের অতীত এমন কিছু, যার তেজল্লি মানুষের সইবে না। ভালো কথা সইবে না। বোঝা গেল তিনি কবি উইলিয়াম ব্ল্যাকের উরিজেন টাইপের কিছু। তাঁকে আবার আরশে কুর্সি বানিয়ে পানির ওপর বসিয়ে রেখেছে! সেটি নাকি তাঁর রাজ্য। তাঁকে কেন্দ্র করে বানিয়ে নিয়েছে আরেকখান জাহান। যেখানে বসে তিনি সব দেখছেন, সব স্থির করে দিচ্ছেন! অর্থাৎ মানুষ যেমন চায়,—সেরকম পাওয়ারফুল ডন বানিয়ে তাঁকে দিয়ে নিজের সকল খায়েশ পুরা করছে আসলে! যে-কারণে ইবনে সিনা তাঁর আদিকারণকে এই ঝামেলা থেকে সরিয়ে কেবল ইমারজেন্ট রেখেছিলেন। বিজ্ঞানী মানুষ;—তাঁর আকল টনটনে সেয়ানা এদিক থেকে।

Lawrence Krauss vs Hamza Tzortzis – Islam vs Atheism Debate; Source – iERA YTC

শামাইল নাদভীকে কেবল এই আর্গুমেন্টে চেপে ধরলে দেখতেন আলাপ লেজেগোবরে করে ফেলেছে। খেই হারিয়ে গমন করছে বিতণ্ডায়। নাস্তিক পদার্থবিদ লরেন্স ক্রাউস ও ছদ্ম দার্শনিক গ্রিক হামজা জার্জিসের বিতণ্ডা ভুলে গেলেন? লন্ডন শহরের নাকের ডগায় কী মচ্ছব তারা করেছিল। বেচারা ক্রাউসকে গলদগর্ম হতে হয়েছিল এটি দেখে-যে,—তাঁর A Universe from Nothing বই থেকে তর্কে সমেবত ছাত্র-ছাত্রীরা কেমন আজব আর উদ্ভট প্রশ্ন তুলছিল!

বইটিকে তারা সকলে মিলে মিস-ইন্টারপ্রিট করেছিল চরম;—তাও আবার লেখকের সামনে! পরে হামলাও করতে নেমেছিল প্রায়। উদ্দেশ্য, ব্যাটা নাস্তিকের ওপর যেমন করে হোক জিততে হবে। নাস্তিক বাহিনিকে প্রেইজ করছি না আমি, তবে আমার কাছে গড প্রব্লেম নিয়ে ক্যাচাল অর্থহীন লাগে এখন। কারণ, আমরা ঈশ্বরকে সাংস্কৃতিক উপাদান রূপে মেনে নিয়েছি। বিশ্বাস-অবিশ্বাস সবটাই পরের প্রশ্ন, সামাজিক বেড়ে ওঠায় ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে এর সবকিছু এনজয় করি কমবেশি। বিতর্ক দিয়ে কাজেই তাঁকে খারিজ অথবা গ্রহণ কোনোটাই সম্ভব নয়।

জাভেদ আখতার একদিক থেকে অবশ্য ভালো করেছেন,—দার্শনিক গভীরতায় তিনি ঢোকেননি। ঢুকলে পরে এই তর্ক ‘বিতণ্ডা’য় খতম হতো। যেখানে বক্তার লক্ষ্য দাঁড়ায়, যেনতেনভাবে হলেও তাকে জিততে হবে। ভারতীয় তর্কযুদ্ধে অতীতে তিনটি ধারা ছিল। প্রথমটি হচ্ছে ভেদ, যেখানে তার্কিকরা মীমাংসায় পৌঁছোনোর জন্য পরস্পরকে সূত্র ধরিয়ে দিতেন। তার ওপর চলত তর্ক, যার উদ্দেশ্য সূত্রগুলো বিশ্লেষণ করে সত্য বের করে আনা। দ্বিতীয়টি ছির জালোপা, যেখানে কূটতর্কের বিস্তার ঘটত বেশি। একালে যেমন ফরহাদ-সলিমুল্লাহরা করে। আর, থার্ড ছিল বিতণ্ডা। প্রতিপক্ষকে চূর্ণ করতে যেমন খুশি, এমনকি নাই থেকে আর্গুমেন্ট হাজির করা হতো, এখন যেটি আল্লামা পিনাকীরা করছে সমানে।

বিতণ্ডায় আর্গুমেন্ট সম্ভব নয়, তবে প্রচুর বাকযুদ্ধ ও উত্তেজনা পয়দা করা যায়। পাবলিকের ভীষণ পছন্দের। সেকালেও তাই ছিল। বিস্তারিত জানতে বিমলকৃষ্ণ মতিলালের ক্যারেক্টার অব ইন্ডিয়ান লজিক বইখানা পড়তে পারেন। উপাদেয়।

মোদ্দা কথা, আদিকারণ রূপে স্রষ্টা অনেকটা ওই বিগ ব্যাংয়ের মতো একখানা শুরুয়াতের জনয়িতা। শুরুর পর যৌগিক হতে থাকা মহবিশ্বের ওপর তাঁর কোনো নিয়ন্ত্রণ-নির্ধারণ কার্যকর নেই। যদি তা থাকে, তাহলে তাঁর মৌলগুণ থাকবে না। শামাইল নাদভীর পক্ষে কোরান হাতে এই ফার্স্ট মুভারকে সামলানো সম্ভব নয়। জায়গামতো পেলে ধুনে দেবে।

মহাবিশ্ব সৃষ্টির নেপথ্যে এরকম মৌলগুণকে নিয়ে বিজ্ঞান কাজ করছে দীর্ঘদিন ধরে। সত্যি কিছু আছে, নাকি মহাবিশ্ব হেগেলের শর্ত মোতাবেক সামথিং ফ্রম নাথিং থেকে বিকাশ লাভ করেছে। হেগেল যে-কারণে এই নাথিংকে অতীন্দ্রিয়-অব্যক্ত পরম ভেবেছেন। মার্কস যাঁকে হেগেলীয় ভাববাদ বলে বুঝে নিয়েছিলেন, এবং তাঁর এই অংশটি তিনি ইগনোর করেছেন। যেহেতু, এরকম মৌল কিছুর ভূমিকা মানব-সমাজে কোনোভাবেই প্রমাণিত নয়।
. . .





How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 70

No votes so far! Be the first to rate this post.

Contributor@thirdlanespace.com কর্তৃক স্বত্ব সংরক্ষিত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *