হিন্দু মিথোলজির অলিগলি চষে বেড়ানো নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ীকে পরিচয় করানোর কিছু নেই। বেদ-উপনিষদ-পুরাণ তো রয়েছেই, মহাভারত ও রামায়ণের মতো মনুমেন্টাল সাহিত্যের খুঁটিনাটির সঙ্গে আমাদের চেনাজানা তাঁর সুবাদে নিবিড় থেকেছে। দেবতার মানবায়ন পাঠের স্মৃতি মনে আজো অক্ষয়। যেমন অক্ষয় মহাভারত ও রামায়ণের মহাকাব্যিক পরিসর থেকে ছেকে তুলে আনা চরিত্রগুলোর ওপর তাঁর আলোকপাত। জীবিত পুরাণকারদের মধ্যে আনন্দ নীলকান্তন ও নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ীকে যে-কারণে উপভোগ্য লাগে সবসময়।
আনন্দ নীলকান্তন দক্ষিণ ভারতের মানুষ। মহাভারত ও রামায়ণ নিয়ে তাঁর তত্ত্ব-তালাশ লক্ষ্য ও পরিধি বিবেচনায় নৃসিংহপ্রসাদ থেকে ভিন্নতর। এপিক দুখানা থেকে তিনি নিষ্কাশন করেছেন সারবস্তু, এবং এটি তাঁকে নতুন আখ্যান রচনার পথে নিয়ে গেছে। নীলকান্তন কার্টুনিস্ট ছিলেন। মহাভারত-রামায়ণের তত্ত্ব-তালাশ করতে নেমে হয়ে উঠলেন পুরাণখোর। এস. এস রাজামৌলির পর্দাকাঁপানো ছবি বাহুবলী মূলত তাঁর রচনা থেকে ধার করে বানানো। টিভি সিরিয়াল ও ওটিটি ওয়েব সিরিজে যেসব ভারতীয় পুরণাকাহিনি আমরা দেখে এসেছি নানাসময়, তার অধিকাংশ নীলকান্তনকে দিয়ে লেখানো অথবা তাঁর রচনা থেকে নির্মাতারা নিয়েছেন।
এগুলো অবশ্য আনন্দ নীলকান্তনের গুরুত্ব ঠাহর করতে অধিক কাজে দেয় না। তাঁর স্বকীয়তা টের পাই এ-পর্যন্ত প্রকাশিত বইগুলোয় চোখ রাখলে। প্রথম টের পেয়েছি রামায়ণের প্রাণভোমরা রাবণকে নিয়ে রচিত কল্পআখ্যান Asura: Tale of the Vanquished পড়তে যেয়ে। বেশ চমকপ্রদ ছিল এই পাঠ-অভিজ্ঞতা। কল্পআখ্যানটিকে এর রচনা-কৌশলের কারণে বিশিষ্ট মানতে হয়। রাবণের বয়ানে এমন এক যুগের কাহিনি আমরা শুনে চলি, যেখানে রাবণ আয়নায় নিজেকে দেখছে। রামায়ণ-স্বীকৃত চরিত্রগুলো তো আছেই, এর বাইরে একাধিক কাল্পনিক চরিত্র লেখক আখ্যানে জায়গা দিয়েছেন,—নিজের কাহানি শোনাবার ছলে রাবণকে যারা চুলচেরা ব্যবচ্ছেদ করে চলে। সোশিও-পলিটিক্যাল কনফ্লিক্ট ও এথিক্যাল ডুয়ালিটির আভাস আখ্যানের প্রতি পরতে এভাবে তীব্র করেন নীলকান্তন, যেটি এর প্রতিটি অধ্যায়কে সমকালীন হয়ে উঠতে বড়ো ভূমিকা নিভিয়েছে।
আখ্যানটি এমন এক আঙ্গিকে লিখেছেন ভদ্রলোক,—পৌরাণিক আবহ ধারণ করলেও, একবারও মনে হয়নি আমরা কয়েক হাজার বছর আগের প্রত্নসময়ে ঘুরছি। মধুসূদন দত্তের ‘মেঘনাদবধ’-এর পরে বিষয়টি আমাদের এখানকার রচনারীতিতে একপ্রকার উপেক্ষিত বলা যায়। আনন্দ নীলকান্তন একে নতুন আঙ্গিকে ফেরত এনেছেন, যেখানে মধু কবির নামখানা তিনি স্মরণ করেছেন নানাসময়। তবে, মধু কবির সঙ্গে তাঁর প্রভেদ এখানে গুরুতর। নীলকান্তনের বয়ানে হিরো অথবা অ্যান্টিহিরোর বালাই নেই। রাবণ, রাম, হুনুমান অথবা সীতা… এঁনারা যতটা পৌরাণিক চরিত্র, ততটাই মানবনিয়তির স্মারক। গ্রিক মিথবিশ্বে যেমন আমরা দেখি, নীলকান্তনে এর একখানা সর্বভারতীয় প্রতিরূপ যেন আঁকা!
দূর-অতীত ও বর্তমান তাঁর বয়ানে পাশাপাশি হাত ধরাধরি করে বিরাজ করে। আমাদের কালপর্বে যেসব ঘটনা ও অনুঘটক মানবনিয়তিকে বিচিত্র টানাপোড়েনে জেরবার রাখে, এর অনেকখানি রাবণনামায় কাজে লাগিয়েছেন নীলকান্তন। মিথ ছাপিয়ে বড়ো হয়ে ওঠে এমতো বাস্তবতা, যেটি ছিল রাবণের মহিমান্বিত উত্থান ও পর্বতপ্রায় পতনের নিয়ামক কারণ। বিড়ম্বিত মানব-সমাজে ক্যাপিটালিজম কীভাবে অমোঘ ভূমিকায় অবতীর্ণ হলো, তার একখানা ইতিবৃত্ত আনন্দ নীলকান্তন তাঁর রাবণচরিতনামায় ধরতে ত্রুটি করেননি। যেহেতু সুলেখক, তাঁর বর্ণনাভঙ্গি পাঠককে ধরে রাখে আগাগোড়া।
সীতাকে নীলাকান্তন এখানে রাবণের কন্যা রূপে দেখিয়েছেন। বিষম পরিস্থিতিতে এই সীতা রাবণের কন্যা রূপে জন্ম নেয় অনিচ্ছুক ব্রাহ্মণযোনিতে। দেবতা-কৌলিন্যের গরিমায় উচ্চবর্গীয় ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়রা অসুর-গরিমায় নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সফল রাবণের কাছে শ্রেণিশত্রু বটে! কিন্তু, সে-তো প্রেমিক ও ভোগী। সুতরাং যে-পরিস্থিতি সীতার জন্মকারণ ছিল, রাবণের পরিষদবর্গ তা মেনে নিতে পারেনি। তাদের মনে ভর করে দেবকুলের সঙ্গে বিরোধের দুর্ভাবনা। গোপন শলাপরামর্শে সীতা ও তার জন্মদ্রাত্রীকে তারা রাবণের অজ্ঞাতসারে হাপিশ করে দেয়। সীতাকে মৃত/ নিখোঁজ বলে জানলেও সময়ের সঙ্গে প্রকৃত সত্য রাবণের কাছে গোপন থাকেনি। কন্যাকে অগত্যা ফেরত পেতে মরিয়া হলো অসুর। রাবণ তাকে ছিনিয়ে আনে ও নিজের পিতৃত্ব প্রতিষ্ঠায় উঠেপড়ে লেগেছিল। সীতা ওদিকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেন তার দাবি। নীলকান্তনের আখ্যানে সীতার চরিত্রায়ণ বেশ অন্যরকম, আর তা হৃদয়গ্রাহী যথেষ্ট।

বাল্মীকির ভূমিকাও এখানে পৃথক। সীতাকে জড়িয়ে তাঁকে কলঙ্কিত করার রাজনীতিকে সামনে অনেন নীলকান্তন। এমনকি রামকে আমরা একালের বিড়ম্বিত পলিটিক্যাল ক্যারেক্টার রূপে আখ্যানে বিচরণ করতে দেখি। ভালো মানুষ রাম হচ্ছেন এমন এক বুর্জোয়া কাঠামোর উত্তরসূরি, যেটি তার ব্যক্তিত্বকে দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও দোটানায় নাজুক হতে মজবুর করছে।
আনন্দ নীলকান্তনের ফিলোসফি এখানে পরিষ্কার : প্রাচীন ভারতে পাপ-পুণ্য, ভালোমন্দের হিসাব আমাদের সময় থেকে পৃথক ছিল । রামায়ণের চরিত্ররা পরিস্থিতির টানাপোড়েন ও মানব-কর্মফলকে অনুসরণ করছে সেখানে। তাদের মধ্যে না ছিল কেউ দেবতা অথবা অসুর;—তারা সকলে যে-যার মাপে মহৎ ও খল থাকতে বাধ্য ছিল। আলগা করে দেবমহিমা, আর ওদিকে অশুভশক্তির দ্যোতক ইত্যাদি বিশেষণ আরোপের পরিসীমা উক্ত কালপর্বে সবল ছিল না। এরকম ধারণার বিকাশ মূলত ভারতবর্ষে মুসলমান রাজ প্রতিষ্ঠার পর থেকে তীব্র হয়েছে। মহাভারত হাতে নিলে নীলকান্তনের কথার সারসত্য আমাদের টের পাওয়ার কথা। একাল ও পুরাকালের জনজীবন, রাজনীতি ও নৈতিকতার সংযোগসেতু আখ্যানে এভাবে গড়ে দিয়েছেন তিনি, যেটি একে সমকালীনতা দিয়েছে অবিরত।
যাকগে, নৃসিংহপ্রসাদ বা আনন্দ নীলকান্তনের ধান ভানা উদ্দেশ্য নয় এখানে। দেশে কিছুদিন আগে সংঘটিত কুকুরকাণ্ড মনকে বিচলিত করে তুলেছিল যথেষ্ট। মহাভারত-এ দ্রৌপদীসহ পঞ্চপাণ্ডবের স্বর্গযাত্রায় কুকুরের ছদ্মবেশে যুুধিষ্ঠিরের সঙ্গী ধর্মরাজের কাহিনি ফিরে-ফিরে মনে পড়ছিল। সেই সুবাদে এই সহাতকাহন। বুদ্ধদেব বসুর কাছে যুধিষ্ঠির এই-যে বাকি সকল চরিত্র ছাপিয়ে মহার্ঘ হলেন, তার পেছনে কুকুরের সঙ্গে তাঁর আচরণ গুরুত্ব রাখে বৈকি। শান্তিপর্ব চুকলে পরে স্বর্গযাত্রার অধ্যায় শুরু হলো, যেটি যুধিষ্ঠিরের প্রতি নিজের অনুরাগ প্রমাণে দরদ ঢেলে লিখেছেন বুদ্ধদেব বসু। নৃসিংহপ্রসাদ যেহেতু পুরাণব্যাখ্যা করেন পটুত্বের সঙ্গে, তাঁর বিবরণে আরো অনুষঙ্গ সংযুক্ত হয়েছে। কুকুরচরিতায়ণ হয়তো আমাদের মানবচরিত্র বোঝার বেলায়ও অমোঘ বলে আমরা ধরে নিতে পারি।
আনন্দ নীলকান্তন ও নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ীর চেয়েও বেশি চমকে উঠেছি কুকুর-এর আভিধানিক অর্থসম্ভারে চোখ রেখে! প্রচলিত অভিধানের কথা বলছি না। বাংলা একাডেমিসহ যত আকারের অভিধান আমরা ব্যবহার করি, সেগুলো মোটের ওপর ইংরেজিবিধি মেনে প্রণীত, যেখানে শব্দের আদি অর্থমূল ও ইতিহাস জানার উপায় থাকে সংকীর্ণ। কেন সংকীর্ণ তার ব্যাখ্যা কলিম খান যাঁরা অল্পবিস্তর পাঠ করেছেন,—তাঁদের নিশ্চয় অজানা থাকার কথা নয়।
একালে সকল অভিধান প্রতীকী বা সিম্বলিক শব্দার্থ দিয়ে সাজানো থাকে। প্রাচীন ভারতে শব্দের বুৎপত্তি ও অর্থের বিবর্তন (কলিম খানের মতে) সেরকম ছিল না। কলিম ও রবি চক্রবর্তীর ব্যাখ্যা যদি আমলে নেই, তাহলে মানতে হবে,—শব্দের অর্থ ও বুৎপত্তির সবটাই আমাদের এখানে ক্রিয়াভিত্তিক ছিল তখন। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বঙ্গীয় শব্দকোষ-এ গমন করলে যার পরিচয় আমরা বেশ নিবিড়ভাবে পাই। বিষয়টি নিয়ে থার্ড লেন হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে একাধিকবার আলাপ হয়েছ অতীতে। সাইটে যার কিংদাংশ সংরক্ষিত আছে বটে।
যাইহোক, কলিম খান ও রবি চক্রবর্তীর অভিধান উলটে কুকুর শব্দের বুৎপত্তি দেখছিলাম। হরিচরণ থেকে মূল রসদ ধার করেছেন দুজনে, এবং সঙ্গে জুড়েছেন ব্যাখ্যা। তাঁদের মতে, কুকুর শব্দটি আদি ধাতুমূল কুক্-এর সঙ্গে সর্ম্পকিত। হরিচরণে গমন করলে আমরা দেখি কুক্-এর অভিধান-স্বীকৃত অর্থ হচ্ছে গর্ভাশয় বা পেট। আরো স্পষ্ট করে বললে বলতে হবে, যিনি গর্ভ ধারণ করেন বা গর্ভধারিণী। কুকুর-এ এসে হরিচরণ জানাচ্ছেন, এটি হলো এমন এক প্রাণী, যে খাদ্য গ্রহণ করে, কিন্তু অন্যকে খাদ্যের ভাগ দেয় না। কলিম খান ও রবি চক্রবর্তী তাঁদের বঙ্গীয় শব্দার্থকোষ-এ অর্থটি উদ্ধৃত করেছেন।
যদুবংশ-রাজ অন্ধকের পুত্রধনকে স্মরণ করেছেন দুজনে। মহাভারতকার এই রাজাকে কুকুরবংশীয় বলে অভিহিত করেছিলেন। কী-কারণে কুকুরবংশ তার ব্যাখ্যা নৃসিংপ্রসাদ দিয়েছেন তাঁর মতো করে। এখানে বরং উদ্ধৃত করি কলিম-রবির ব্যাখ্যা। কুুকুরের প্রচলিত অর্থ ছাড়াও অপ্রচলিত অর্থব্যাখ্যায় দুজনে বলছেন সেখানে :

“ ‘কুকুর : /কুক্ (আদান) + উর (উরচ্) – কর্তৃবাচ্যে। [ব.শ (বঙ্গীয় শব্দকোষ)]। কুক্-এর নবরূপে উত্তীর্ণ সত্তা রহে যাহাতে।। যে খাদ্য গ্রহণ করে (দেয় না)। (ব. শ)। সারমেয়, যদুবংশীয় অন্ধকরাজের পুত্র, কুকুরের অপত্যগণ, কুকুরবংশীয় ক্ষত্রিয়গণ, দশাহ দেশ, দশাইবাসী যাদবগণ, গ্রন্থিপর্ণী-বৃক্ষ, হেয়ব্যক্তি, নরাধম। (ব.শ.)।
dog অর্থে প্রচলিত। মানুষের বংশকে-যে এভাবে ‘কুকুরবংশ’ বলা যেতে পারে, প্রথমে আমাদের তা বিশ্বাসই হয়নি। তারপর মহাভারত ও হরিবংশপুরাণে কথাটি লেখা রয়েছে দেখে চক্ষু সার্থক হল। ব.শ (বঙ্গীয় শব্দকোষ) জানিয়েছেন, এই সত্তার স্বভাব হল, সে নিজে খায় এবং অন্যকে দেয় না। কথাটি একশো ভাগ ঠিক। সবাই জানেন, স্বভাবটি dog-এর যেমন রয়েছে, কোনো কোনো মানুষেরও রয়েছে। আমরা দেখছি, একটি বস্তু যে-অবস্থায় রয়েছে, তাকে তার চেয়ে উপরে বা নীচে আনার প্রক্রিয়াই হল কুক্ করা (cook), যার একটি মানে হল ‘রান্না করা’; তা সে বাহ্যিক রান্না হোক আর পণ্যাদি বা কাব্য-দর্শনাদি রান্নাই হোক। কিন্তু সেকালের সামাজিক নিয়মে তা করা হত সকলের জন্য। কিন্তু কাউকে না দিয়ে কেউ যদি নিজেই খায়, তাকে বলে কুকুর।
ব.শ. (বঙ্গীয় শব্দকোষ) অতএব কুকুর শব্দের অর্থটি সঠিক ভাবেই নিষ্কাশন করেছেন। কিন্তু সকলে মিলে বা সকলের জন্য যে সত্তা কুক্ করে, কিন্তু নিজে খায়, কাউকে দেয় না; তাকে তার নিজের স্বজাতীরাই সহ্য করতে রাজি হবে না; বিজাতীয়রা তো তার শত্রু হবেই। যে কারণে কুকুর মাত্রেই খাদ্যের ব্যাপারে অন্য কুকুরকে সহ্য করতে পারে না, শকুন শেয়ালের তো কথাই নেই। একালে এমনকি মানুষের মধ্যেও তেমন চরিত্রের দেখা মেলে! তবে এরকম স্বভাবের কারণে আজকের সমাজে এমন ঝগড়া হামেশাই ‘দেখা যায়, যেখানে পুরুষ-প্রকৃতি দু-পক্ষের কেউ কাউকে ছাড়ে না। খাদ্য বা আহার, যা নিয়ে ঝগড়া, তা পড়ে থাকে; পক্ষ দুটি পরস্পরের বিরুদ্ধে নানা ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া নিয়েই তাদের চব্বিশ ঘণ্টা খরচ করে দেয়।
…একালের রাজনীতি, অর্থনীতি প্রভৃতি তথাকথিত ‘প্রতিযোগিতার’ ক্ষেত্রগুলিতে এর সাক্ষাৎ মেলে হামেশাই। এরই প্রাকৃতিক স্বরূপ দেখা যায় কুকুরের সঙ্গমে। তারা পরস্পরের সঙ্গে পরস্পরবিরোধী ক্রিয়ায় দীর্ঘকাল এমনভাবে আবদ্ধ (inter-locked) হয়ে থাকে, যে, তার থেকে তাদের মুক্তি মেলে কেবলমাত্র সময়ের কৃপায়। দ্র. অন্ধক। ইংরেজি cook।” [দ্রষ্টব্য : বঙ্গীয় শব্দার্থকোষ : কলিম খান ও রবি চক্রবর্তী]

কলিম খান ও রবি চক্রবর্তীর শব্দার্থ ব্যাখার আকর্ষণীয় দিক হলো, ইংরেজি প্রতীকভিত্তিক শব্দের সঙ্গে ক্রিয়াভিত্তিক শব্দের সংযোগ তাঁরা অনেকসময় ধরিয়ে দেন। এখানে যেমন ইংরেজি Cook বা রান্নার সঙ্গে জুড়েছেন প্রচীন ভারতের সমাজ-ইতিহাস;—যেটি কলিম খান তাঁর একাধিক বইয়ে ফিরে-ফিরে বলেছেনও,—সামাজিক সমতার ওপর দাঁড়ানো থাকলেও পুঁজিসঞ্চয় ও পরধন অপহরণের যাত্রা প্রাচীন ভারত থেকে শুরু হয়েছিল। মার্ক্স যে-পুঁজিবাদী বিন্যাসকে তাঁর ভাবনায় পরে ধরছেন, এর আদি উৎপত্তিস্থল রূপে পৌরাণিক ভারতকে অতএব বিবেচনার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। ফিরে আসতে হয় আনন্দ নীলকান্তনে। তাঁর কল্পআখ্যানও কলিম বর্ণিত অর্থ-ব্যাখ্যার প্রতিভাস আমরা পাবো।
বড়ো কথা হচ্ছে, প্রাণীজগতে কুকুর হলো জৈববিবর্তনের স্মারক;—যার অনেকখানি আমরা স্বভাবে ধারণ করছি, এবং তা নিজের অজান্তে। ধারণ করতে অবশ্য ভুলে যাই তার এমতো স্বভাব,—কুকুরের বিশ্বস্ততাও কুক্-এর সমগ্রোত্রীয়। নিজ খাবারের ভাগ সে যেমন অন্যকে দিতে পছন্দ করে না, তেমনি বিশ্বস্ততা বস্তুটিকে এমনভাবে ধারণ করে চলে, যেটি কারো প্ররোচনায় ছিন্ন হওয়ার নয়। তার মমতা ও হিংস্রতার মতোই তা একমেবাদ্বিতীয়ম!
. . .
. . .



