
দিওয়ান-ই-মাখফি
বাচিকপাঠে গজল
রচয়িতা : জেব-উন-নিশা
ভাষান্তর : কামাল রাহমান
. . .

. . .
দিওয়ান-ই-মাখফি : গজল-৩১
[মূল ভাষান্তরিত পাঠ শ্রুতিপঠনে ঈষৎ পরিবর্তীত]
ধুলোয়, অসম্মানের নিচে চাপা পড়ে আছে
আমার মর্যাদা, সাদা চোখে যা দেখে পৃথিবীর মানুষেরা,
কিন্তু কেন আমি প্রকাশ করব লজ্জা আমার মুখমণ্ডলে,
কী সম্মান দিয়েছে আমাকে এ পৃথিবী!
অসহ বোঝার মতো আমার চিরদুঃখী শিরোপরে
স্তূপীকৃত আমার সময়গুলো, তবুও কাঁদিনি কখনও
বরং হেসেছি গর্বভরে; যত্নের কোনো ছোঁয়া নেই ওখানে,
নেই কোনো মায়াবী প্রলেপ আমার ভ্রুযুগলে।
দীর্ঘ, অতি দীর্ঘকাল ধরে একত্রবাস করে এসেছে দুঃখ আমার সঙ্গে,
অনুতাপ করিনি কখনও, নিত্যমজুরি করে গেছি বুনো হিংস্রতা নিয়ে,
নিয়ত যুদ্ধ করেছি নৈরাশ্যের বিরুদ্ধে। পালিয়ে যেতে দিয়েছি
ওটাকে : হা হা, এখন শেষ বয়সের এক রুস্তম আমি।
উদাসীন ভাগ্য আমার চরিতার্থ করেছে প্রতিহিংসা,
ওহে স্বর্গ হতে বয়ে আসা সমীরণ, বয়ে যাও আমার
উপর দিয়ে একটিবার, ইয়াকুবের মতো প্রত্যাশা করি আমি
তোমার ভালোবাসার পোশাক হতে ভেসে আসা সুগন্ধী।
. . .

সংযুক্তি
দুর্ভাগ্যজনক মানতে হবে, সম্রাট আওরঙ্গজেব-দুহিতা জেব-উন-নিশা বিরচিত ‘দিওয়ান-ই-মাহফি’-র পঙক্তিচরণে গজলের রসাভাস বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও ফার্সি কিংবা হিন্দি/উর্দু ভাষান্তরে আবৃত্তি ও গীত হওয়ার নজির আমাদের আজানা! পিতার অমতে যাওয়ার কারণে কার্যত কারাবন্দি এই রাজকন্যার গজলাঙ্গে রচিত কবিতা ও রুবাইয়ের সাংগীতিক পরিবেশনার শুলুক বাংলায় মাখফিগুলোর অনুবাদক কামাল রাহমানেরও অজানাই থেকে গেছে ধারণা করি!থার্ড লেন স্পেস-এ তাঁর-করা পঞ্চাশটি অনূদিত মাখফি থেকে কুড়িটি বেছে পরিবেশনের ক্ষণে আরো খুঁটিনাটি জানার চেষ্টায় আমাদেরকে সুতরাং নিরাশ হতে হয়েছিল!
বিচ্ছিন্ন কিছু বাচিক-পাঠ ও ছাওয়া ছবিতে তাঁর গৌণ উপস্থিতির অধিক কোনো খবর নেট-দুনিয়া দিতে পারেনি। তবে হ্যাঁ, এটুকুন জানা গেল,—ভারত থেকে ‘Here Lies Makhfi’ শিরোনামে একখানা তথ্যচিত্র বিগত বছর আলোর মুখ দেখার কথা ছিল। নেটে অনেক ঘেঁটে এই ব্যাপারে কিছু জানা গেল না! তথ্যচিত্রটি সম্ভবত এখনো ক্যামেরাবন্দি পড়ে আছে। যাইহোক, জেব-উন-নিশার পঞ্চাশখানা দিওয়ানের হৃদয়গ্রাহী বাংলা ভাষান্তরের জন্য কামাল রাহমানকে কুর্নিশ। ৩১ নাম্বার গজলটি যৎসামান্য সাংগীতিক যন্ত্রাদি জুড়ে এআইকে দিয়ে আবৃত্তিযোগ্য সুরে শ্রবণের কৌতূহল থেকে গানালেখ্য’র এই সংযোজন। কামাল রাহমান আশা করি অপরাধ ক্ষমায় নেবেন।
এআই মডেল দিয়ে ‘গজল’ গানের আঙ্গিকে এটি করা যেত, ইচ্ছে করে সেদিকপানে আমরা গমন করিনি। বড়ো কারণ,—ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের রাগ-রাগিণী অ্যালগরিদমে রপ্ত করার ঘটনায় এআই আগের চেয়ে পটু হলেও নিখাদ লয়তান মিলাতে বসে হাশেমা ঝামেলা পাকায়। তাকে দিয়ে পিয়ানোর বোন হারমোনিয়াম বাজানোর যন্ত্রণা যেখানে আগের মতোই কঠিন বটে! কী চাইছি তা ধরতে পারে না ভালো করে। সেতার, সরোদ, রাবাব, সারেঙ্গি ও তবলা সে বেশ ভালো বোঝে। বাঁশি বা এরকম ভারতীয় বাদ্যযন্ত্রেও মন্দ নয়, কিন্তু হারমোনিয়াম এখনো তার কাছে অধরা থেকে গেছে! আবৃত্তিযোগ্য সাংগীতিক পাঠ যেহেতু বিবেচনায় ছিল, মিনিমাল অ্যারেঞ্জমেন্ট রেখছি। খুব-যে শ্রুতিমধুর ও প্রাসঙ্গিক হলো তা অবশ্য বলা যাচ্ছে না; তবে চেষ্টা করলে সামনে ভালো কিছু সম্ভব হয়তো।
এআইকে ধরিয়ে দেওয়ার স্বার্থে মূল ভাষান্তরের দু-এক জায়গায় শব্দ ছাটাই করতে হয়েছে, তবে তা যৎসামান্য, এবং গজলের রসহানি না ঘটিয়ে করা হয়েছে। অনুবাদকের কাছে তথাপি আগাম ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। নিছক খসড়া; সুতরাং উনি সদয়গুণে মার্জনা করবেন আশা করি।
. . .

. . .
দিওয়ান-ই-মাখফি ও সংগীত-আয়োজন নিয়ে একপশলা পাঠালাপ
[থার্ড লেন স্পেস-এর হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ থেকে সংকলিত]

বাহ্, মাখফিকে নিয়ে অনেক পরিশ্রম করেছেন আপনারা! সাধুবাদ জানাই। কৃতজ্ঞতা রইল।
. . .

মাখফিকে আপনার ভাষান্তরের সুবাদে পড়তে পারা ছিল আনন্দের। আমার মনে হয়, রুবাইগুলাও পাঠকের পড়তে ভালো লাগবে। স্মৃতি প্রতারণা করে মারাত্মক! তা-নইলে জেন-উন-নিশা/জেব-উন-নিসা-কে বঙ্কিমের ‘রাজসিংহ’ উপন্যাসে পাঠ যাওয়ার ঘটনা মনে পড়ত। বহুদিন আগে পাঠ করার দোষে স্মৃতি থেকে সবটুকু মুছে গিয়েছিল। আওরঙ্গজেব-দুহিতা সেখানে ‘জেব-উন্নিসা’ নামে চিত্রিত হয়েছেন। নেটে ‘রাজসিংহ’ উপন্যাসে এতোদিন পর চোখ বোলাতে যেয়ে বঙ্কিম এভাবেই লিখেছেন দেখতে পাচ্ছি।
মোগল বাদশাহির মধ্যে আওরঙ্গজেবের ওপর তাঁর বিরাগ তীব্র ছিল, এবং সে-কথা কারো অজানাও নয়। মুসলমান শাসনের অবক্ষয় ও হিন্দু ভারতবর্ষের পুনর্জাগরণ-স্বপ্নে বিভোর লেখকের মনোজগতে মোগল সম্রাট মূলত খলনায়ক হয়ে ধরা দিয়েছিলেন। বঙ্কিমের এই বিবেচনা কতখানি সঠিক অথবা ভ্রান্ত ছিল… সে-তর্কে আপাতত মাথা না-ঢুকালেও চলবে মনে করি। আমরা বরং এটি দেখতে পাচ্ছি, আওরঙ্গজেব-দুহিতা জেব-উন-নিশাকে কল্পনা মিশ্রিত অবয়বে নিজের উপন্যাসে বেশ বড়ো পরিসরে ধরেছেন বঙ্কিম।
এই ‘জেব-উন্নিসা’ পিতার আদেশে কারাবন্দি, কাব্য-প্রতিভায় দ্যুতি-ঝলমল কোনো নারী নন। ইনি এখানে বাদশাহর ওপর প্রভাববিস্তারী এক রাজকন্যা। প্রসাদ-ষড়যন্ত্রের গতিবিধির খবর নিতে পটু। ভালোবাসার খেলায় পুরুষকে দাগা দিতেও সমান কুশলী। বঙ্কিম লিখছেন :
বলিয়াছি, জেব-উন্নিসা একজন প্রধান politician, মোগলসাম্রাজ্যরূপ জাহাজের হাল, এক প্রকার তাঁর হাতে। তিনি মোগলসাম্রাজ্যের “নিয়ামক নক্ষত্র” বলিয়াও বর্ণিত হইয়াছেন। জানা আছে, “politician” সম্প্রদায়ের একটা বড় প্রয়োজন – সংবাদ। কোথায় কি হইতেছে, গোপনে সব জানা চাই। দুর্মুখের মুনিব রামচন্দ্র হইতে বিসমার্ক পর্যন্ত সকলেই ইহার প্রমাণ। জেব-উন্নিসা এ কথাটা বিলক্ষণ বুঝিতেন। চারিদিক হইতে তিনি সংবাদ সংগ্রহ করিতেন।
উপন্যাসের খাতিরে চরিত্রকে নাটকীয় করতে বঙ্কিম খেটেছেন বেশ! তবে, ‘জেব-উন্নিসা’র কাব্যপ্রতিভার সুরতহাল সম্ভবত তাঁর ওইসময় কিছু জানা ছিল না। ঊনবিংশ শতকে হিন্দু শিক্ষিতজনরা যদিও ফার্সি চর্চায় দক্ষ ছিলেন। ফার্সি সাহিত্যের ভাষান্তর ওই সময়ে বরং অধিক হয়েছিল। যাকগে, চরিত্রটিকে রাজসিংহ-এ পরিণতি দানে বঙ্কিমকে সফল বলা যাচ্ছে না। উপন্যাসে কাহিনির গতি ও মোচড়ের একপর্যায়ে জেব-উন্নিসাকে বরং আমরা ম্রিয়মাণ ও গৌণ হতে দেখি। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে-জেব-উন-নিশাকে ক্যানভাসে এঁকেছিলেন পরে, সেখানে সম্ভবত বঙ্কিমের উপন্যাস পাঠের প্রভাব ভালো করে তাকালে টের পাওয়া যাবে।
. . .

. . .
‘দিওয়ান-ই-মাখফি’র রচয়িতা বিতর্ক

কামাল ভাই, নেটে জেব-উন-নিশার ব্যাপারে অনুসন্ধান করতে যেয়ে আরো কিছু তথ্য সাামনে এলো। আপনি হয়তো অবগত, তবু সংক্ষেপে বলার চেষ্টা করছি :
‘দিওয়ান-ই-মাখফি’ আদৌ জেব-উন-নিশার রচনা কি-না তা-নিয়ে মতান্তর আছে দেখতে পাচ্ছি। যেমন, স্যার যদুনাথ সরকার তাঁর ‘অ্যা শর্ট হিস্ট্রি অব আওরঙ্গজেব’ এবং ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ‘মোগল-বিদুষী’ বইয়ে এই ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করেছেন।
জেব-উন-নিশার পাণ্ডিত্য, বিদগ্ধতা ও কবিপ্রতিভা দুজনে একবাক্যে স্বীকার করেছেন; তথাপি ‘দিওয়ান-ই-মাখফি’-র মধ্যে সংকলিত কবিতার অনেকগুলো অন্য কারো রচনা বলে অভিমত দিচ্ছেন তাঁরা। যদুনাথ সরকার আওরঙ্গজেব-দুহিতার উন্নত চরিত্র ও দ্যুতিময় ব্যক্তিত্বের আভাস দিয়ে লিখছেন, আমি ‘কোট’ করছি আংশিক :
‘…যেহেতু আওরঙ্গজেব কবিতা পছন্দ করতেন না, জেব-উন-নিসার বদান্যতা দরবারের পৃষ্ঠপোষকতার অভাবকে অনেকটা দূর করত, আর সমসাময়িক বেশির ভাগ কবি তার কাছেই আশ্রয় খুঁজে নিত। পারসি গীতিকবিতা (ode) লিখতেন তিনি মাকফি’ ছদ্মনামে, যার অর্থ আড়ালের একজন’, তবে আজও বিদ্যমান দিওয়ান ই-মাকফি অবশ্যই জেব-উন-নিসার সাহিত্যকর্ম নয়।’ [দ্রষ্টব্য : এ শর্ট হিস্টরি অব আওরঙ্গজেব – স্যার যদুনাথ সরকার : অনুবাদ : খসরু চৌধুরী]
পক্ষান্তরে ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ‘মোগল-বিদুষী’ বইয়ে এই ব্যাপারে বিস্তারিত আলোকপাত করেছেন। বইটি যদি পাঠ না-করে থাকেন, তাহলে একবার চোখ বোলানো সময়ের অচপয় হবে না আশা করি। ব্রজেন্দ্রনাথ জানাচ্ছেন,—মোগল অন্তঃপুরে ‘মাখফি’ ছদ্মনামের আড়ালে সম্রাট আকবরের মহিষী সলীমা সুলতান বেগম ও সম্রাজ্ঞী নূরজাহানও ফার্সিতে কবিতা ভানতেন।
স্প্রেঙ্গার ও রিউ ‘দিওয়ান-ই-মাখফি’-র রচয়িতা রূপে জেব-উন-নিশাকে স্বীকৃতি দান করলেও, ব্রজেন্দ্রনাথ সন্দেহ পোষণ করে জানাচ্ছেন : মাখফি-তে এমন কিছু কবিতা আছে, যেগুলো পাঠ করার সুবাদে আমরা জানতে পারি দিওয়ান-রচয়িতার জন্ম খুরাসানে, এবং বর্তমানে ভারতবর্ষে তিনি অবস্থান করছিলেন মাত্র! উদ্দেশ্য,—সম্রাট শাহজাহানের দরবারে জায়গা করে নেওয়া, যদিও তাঁর আশা পূরণ হয়নি তখন। অন্যদিকে জেব-উন-নিশা জন্মে নিয়েছেন দৌলতাবাদ। এরকম কয়েকটি কবিতার ফার্সি ও বাংলা ভাষান্তর পেশ করেছেন ব্রজেন্দ্রনাথ, যেমন :

দিল আশুফ্তা-ই-মখ্ফী বফন্-ই-খুদ্ আরস্তু ইস্ত্।
বহিন্দ উফ্তাদা আস্ত, আম্মা খুরাসানস্ত্ ইউনানশ্॥
দরী কিশ্ ওর্ জবুনীহাএ তালা নাকিসশ্ দারদ্।
ও গর্ না দর্ হুনর্মন্দী নবাশদ্ হীচ্ নুকসানশ্॥
মখ্ফীর উন্মত্ত হৃদয় নিজ বিদ্যায় স্বয়ং এরিষ্টটল্। (যদিও) সে হিন্দুস্থানে আসিয়া পড়িয়াছে (কিন্তু) খুরাসান্ তাহার পক্ষে গ্রীস। এই দেশে তাহার মন্দভাগ্য অনেক হীনতা (ক্ষতি) অনিয়া দিয়াছে। তাহা না হইলে, তাহার বুদ্ধির (ত) কোনই হ্রাস হয় নাই।।
বুআলী-এ-রোজগারম্ আজ্ খুরাসান্ আমদা।
আজ্ পায়্ এজাজ্ বর্ দরগাহ্-ই-সুলতান্ আমদা॥
হয়রতে দারম্ কে চুঁইয়া রব্দরীঁ জুলমাৎ-ই-হিন্দ্।
তুতী এ ফিকরম্ পায়্-শক্বর্ জে রিজওয়ান্ আমদা॥
আমি বর্ত্তমান যুগের Avicenna (মহাপণ্ডিত),―খুরাসান হইতে আগত। ভক্তির চরণে সম্রাটের সভায় আসিয়াছি। হে ভগবান! ভাবিয়া আশ্চর্য্য হই, কেন মিছরী খণ্ডের মিষ্টতায় আকৃষ্ট শুকপাখীর মত আমার বুদ্ধি হিন্দুস্থানের এই গাঢ় তিমিরে আসিয়াছে।
বর্ দর্-ই-সুলতান্-ই-আসর্ হএফ্ নাদারম্ কসে।
তা কে রসানদ্ বআর্জ-ই-মকসদ্ আর্কানে-উ।
সানি সাহিব্-ই-কিরাণ পাদিশাহে-ইন্স্ ও জান্।
আঁকে মুল্ক্ সর্ নেহদ্ বর্ খৎ ই ফর্মানে-উ॥
কি দুঃখ! এই যুগের সম্রাটের দরবারে আমার কেহ (বন্ধু) নাই। যে (আমার) প্রার্থনা তাঁহার শ্রুতিগোচর করিবে। দ্বিতীয় সাহিব্-ই-কিরাণ (=শাহ্জহান্) নরজাতি এবং জিনের সম্রাট্। যাঁহার আজ্ঞাপত্রের উপর জগৎ (ভক্তিভরে) মস্তক অবনত করে।
ব্রজেন্দ্রনাথ সারাংশ টানতে যেয়ে লিখেছেন :
…ইহা হইতে স্পষ্টই বুঝা যাইতেছে, আলোচ্য দিউয়ান্-ই-মখ্ফীর লেখক ও জেব্ উন্নিসা একই ব্যক্তি নহেন। দিউয়ানের লেখক সম্রাট্ শাহ্জহানের দরবারে প্রবেশলাভে অসমর্থ হইয়া আক্ষেপ করিতেছেন। তিনি কখনও জেব্-উন্নিসা হইতে পারেন না।… এখন জিজ্ঞাস্য, বর্ত্তমান-প্রচলিত দিউয়ান-ই-মখ্ফীর গ্রন্থকার তবে কে? আমাদের মনে হয়, ইহার রচয়িতা গীলান্ প্রদেশের রশ্টু নগরের মখ্ফী,—জেব্-উন্নিসা নহেন। ইনি পারস্যের ফার্স প্রদেশের শাসনকর্তা ইমাম্ কুলী খাঁর (মৃত্যু ১০৪৩ হিঃ=১৬৩৩) কর্ম্মচারী—শাহ্জহানের আমলে (১৬২৮-১৬৫৭) ভারতে আসিয়াছিলেন। ১২৬৮ হিজ্রায় কানপুরে, এবং ১২৮৪ হিজ্রায় লক্ষ্মৌ শহরে দিউয়ান-ই-মখ্ফী লিথোগ্রাফে মুদ্রিত হয় ‘ [দ্রষ্টব্য : মোগল-বিদুষী : ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়]

ওয়েস্টব্রুক ও মাগনলাল দিওয়ানে জেব-উন-নিশার প্রণয়কাহিনির ব্যাপারে ভূমিকায় যেসব কথা লিখেছেন, সেগুলো মুনশী আহ্মদ্-উদ্দীনের উর্দুতে রচিত গ্রন্থ থেকে ধার করা ও মৌলিক গবেষণার ফসল নয় বলে ব্রজেন্দ্রনাথ একপ্রকার খারিজ করে দিয়েছেন। যদুনাথ ও ব্রজেন্দ্রনাথের দাবির সত্যতা যাচাই আমার কর্ম নয়, তবে মোটা দাগে এটি মনে হচ্ছে :
‘দিওয়ান-ই-মাখফি’-র সিংহভাগ কবিতা অতি অবশ্যই জেব-উন-নিশার রচনা। কারণ, সেগুলোয় পিতা আওরঙ্গজেবের সঙ্গে তাঁর সংঘাত ও কারাবন্দিত্বের আভাস স্পষ্ট। সেইসঙ্গে কিছু কবিতায় ব্যক্তি/ স্থান/ ঐতিহাসিক চরিত্রের রেফারেন্স এমনভাবে এসেছে, পড়তে যেয়ে খটকা জাগে মনে। সেগুলো সম্ভবত ‘দিওয়ান-ই-মাখফি’-তে কোনো একভাবে ঢুকে পড়েছিল। এতো পুরোনো পাণ্ডুলিপি!—পরিষ্কার সিদ্ধান্ত টানা পাহাড়সমান গবেষণা দাবি রাখে। আপাতত পাঠেই সুখ, এবং সেখানে এটি মানতে হবে,—দিওয়ান সংকলন নিয়ে ভিন্নমত সত্ত্বেও সিংহভাগের রচয়িতা রূপে জেব-উন-নিশা অতি উত্তমভাবে সেখানে প্রতিভাসিত।
. . .

আমার কাছে মনে হয়েছে যে-কয়েক হাজার দিওয়ান থেকে যে-চারশো বিশটি দিওয়ান মাখফির বলে উদ্ধার করা হয়েছিল, সেসবের মধ্যে একটা সুরসংগতি আছে। যেভাবেই দেখি না কেন পোয়েটিক ডিকশন পুরুষ ও নারী কবির অবশ্যই ভিন্ন। ফার্সি ভাষার লক্ষ-লক্ষ দিওয়ান হতে মাখফির বলে যারা ঐসব উদ্ধার করেছিলেন, তারা ফার্সি ভাষার বিশেষজ্ঞ। যাহোক, শেক্সপিয়ারের রচনা নিয়েও মতভেদ রয়েছে। আপনার পর্যবেক্ষণ চমকপ্রদ। ভাবতেও পারিনি এতটা মনোযোগ মাখফি পাবে।
. . .

যথার্থ বলেছেন। পরিষ্কার সহমত। আপনার ভাষান্তরে করা মাখফিগুলোর মধ্যে এই সুরসংগতি আছে বিধায় আমার মনে হয়েছে, এগুলো জেব-উন-নিশাকেই প্রোর্ট্রে করছে। তবে তার মধ্যে কয়েকটি আবার আছে, যেখানে আরব-জলবায়ুর রেফারেন্স টানার ভঙ্গি হঠাৎ অচেনা লাগে! এসব নিয়ে মতান্তর থাকা অস্বাভাবিক নয়।
ব্রজেন্দ্রনাথ এক জায়গায় লিখেছেন,—মাখফিগুলো যে-আবহে রচিত, মোগল অন্তঃপুরের কোনো রমণীর পক্ষে এভাবে লেখার কথা নয়। উনার এই কথাটি ‘আজব’ লেগেছে! কারণ, জেব-উন-নিশার কবিপ্রতিভা ও বিদগন্ধতার কথা তিনি তুলে ধরেছেন। এমনকি পরোক্ষে বঙ্কিমকে ঝেড়েছেন তাঁর নির্মল চরিত্রকে উপন্যাসে কলঙ্কিত করার জন্য। যদিও, কোনো ঔপন্যাসিক ইতিহাসের কাছে দাসখত লিখে চরিত্র বয়নে বাধ্য নন। ফিকশনে পল্লবিত অতিরঞ্জনকে ইতিহাস ভাবাটাই বরং ভ্রান্তি।
তবে হ্যাঁ, উদ্দেশ্যমূলক অথবা পরিষ্কার ও যৌক্তিকভাবে প্রমাণিত ঐতিহাসিক ব্যক্তির চরিত্রহনন ও ঘটনাকে যেমন খুশি অতিরঞ্জনের অধিকার লেখক রাখেন বলে মনে হয় না। এরকম কিছু ঘটে থাকলে তা-নিয়ে আপত্তি তোলা যেতেই পারে। হুমায়ূন আহমেদ এই কাণ্ডটি বঙ্গবন্ধুকে পোর্ট্রে করতে যেয়ে করেছিলেন। বিতর্কিত বা প্রশ্নবিদ্ধ কিছু বই পড়ে উনি ধাম করে লিখে ফেললেন যা-তা। খুবই কাণ্ডহীন কাজ ছিল তা।
বিষয়টি প্রভোকেটিভ জার্নালিজমের কুইন ওরিয়ানা ফাল্লাচির শেখ মুজিবকে মহা উত্তেজনার ঠেলায় বারবার ফ্যাসিস্ট বলে চিল্লানোর মতো ছিল অনেকটা। ওরিয়ানা কোনো বাইবেল নয়, তিনি অনেকগুলো রেফারেন্সের অংশ, এবং বাকিগুলোর সাপেক্ষে অবশ্যই যাচাইযোগ্য। আমাদের লেখকরা এসব খেয়াল করেন না। বোঝেন বলেও মনে হয় না। কেউ আবার মতলব থেকেও করেন। যে-কারণে এখানে উমবার্তো একোরা জন্ম নেয়নি আজো। নেবেও না হয়তো কোনোদিন।
. . .

ওরিয়ানাকে তো উদ্দেশ্য-প্রণোদিতভাবে পাঠানো হয়েছিল। সে তো মুক্তভাবনার কেউ না, হুকুমের দাস। নবীর প্রসঙ্গ এলে আরবের জলবায়ু স্বাভাবিক। নজরুলেও আছে না! মানুষে মানুষে মতদ্বৈততা থাকতেই পারে। নিজের ভেতরই বাস করে কত শত আমি!
. . .

. . .



