বাংলার ভোর একসময় নদীর জলেই হেসে উঠত। প্রথম আলোর শিশির যখন ঘাসে পড়ে ঝিকিমিকি করত, তখন দূরের গ্রামের ওপারে নৌকার বইঠা ভেঙে দিত নিস্তব্ধতার সূক্ষ্ম আলোকে। সেই শব্দ ছিল বাংলার হৃদস্পন্দন। আজ সেই ভোর কোথায়? আজ বাতাসে নদীর গন্ধ নেই। যে-নদী জন্ম দিয়েছিল মানুষের গান, জীবনের রসায়ন—সেই নদী এখন নীরব। নীরবতা মানেই মৃত্যু নয়; কিন্তু নদীর নীরবতা মানে প্রবাহের অভিমান, শুকনো বুকে জমে থাকা অসংখ্য না-বলা গল্পের তীব্র যন্ত্রণা। বাংলার নদীগুলো বাংলার ইতিহাসেরই জন্মদাত্রী। যে-সব নদীর জলে আমাদের প্রথম সভ্যতা দাঁত গেড়েছিল। সেই নদীর কোনও-কোনওটি আজ ক্লান্ত, কানও-কোনওটি রোগগ্রস্ত, মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাওয়া বৃদ্ধার মতো নুয়ে আছে। আবার কোনও-কোনওটির অস্তিত্বই ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে যেতে বসেছে।
যে-সব নদী ছিল বাউল—অবাধ, উচ্ছল, বৃষ্টিস্নাত যুবতি। যে নদীর ঢেউয়ে দুলত নৌকার পাল, আজ সেই নদী জীর্ণ, ক্লান্ত কিংবা মৃত। গ্রাম-শহরের বর্জ্যে কালো সব নদীরই রূপ, দখলের শৃঙ্খলে বন্দি কত নদীর হাঁফধরা নিশ্বাস। যে-সব নদী বুকে ধারণ করতে চেয়েছিল জীবন, সেগুলোকে আমরা বানিয়ে ফেলেছি মৃত্যুর পরিখা। কারও কারও বুকের ভাঁজে হয়তো কাঁদে একটু-আধটু অপরাধবোধ; তবু যন্ত্রণা দূর করার বদলে আমরা আরও দূষণ ছড়িয়ে দিচ্ছি নদীদের শরীরে। নদী সরে যায়, ভেঙে পড়ে, পথ পাল্টায়, আর একদিন নিঃশব্দে হারিয়ে যায়। সেই হারিয়ে যাওয়া নদীর জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে কেবলই স্মৃতি, ভাঙন, আর অভিশপ্ত শুষ্কতা।
আজকের দিনে নদীর মৃত্যু কি কোনও কাব্যিক উপমা, নাকি ভূগোলের নীরব রূপান্তর? না, এ-তো মানুষের বিবেকের উপরে খোদাই করা নির্মম মৃত্যুলেখা। যে-নদীরা একসময় অতল স্রোতে বয়ে চলত, মাছেদের গান শোনাত, শস্যের ভবিষ্যৎ রচনা করত, সেইসব নদীরা ক্রমে ক্ষীণ, নিঃশব্দ, অবসন্ন। শুকিয়ে যাওয়া নদীদের প্রতি ইঞ্চি মাটিই অপূরণীয় শূন্যতার দলিল হয়ে উঠছে। জলের অভাবে জমি কেবলই হারাচ্ছে প্রাণ, মরে যাচ্ছে কৃষকের স্বপ্ন। নদীতীরবর্তী জীববৈচিত্র্যের ভাষা একে একে স্তব্ধ হয়ে যাচ্ছে। জলজ প্রাণীরা হারিয়ে যায় অন্ধকারে।

জলের দেশ বলে যে-বাংলাদেশকে আমরা ভালোবেসে বুকে ধরি, সেই দেশেরই নদীগুলো আজ জলের জন্য হাহাকার করে। স্রোতহীন তাদের বুক যেন ছিন্নবক্ষ মায়ের মতো, এক মৃত সন্তানের শোকে বিহ্বল। তবু এখানেই গল্পের শেষ নয়। নদী এখনও বাঁচতে চায়—যেমন বাঁচতে চায় মানুষ, যেমন বাঁচতে চায় ভবিষ্যৎ। নদীর চোখে ভাসে আকুতির স্রোত। কে দেবে তাকে আবার সেই প্রাচীন গান? কে ফিরিয়ে দেবে তার প্রাণ?
আমরা যখন বলি ‘নদী মরছে’, তখন সেটা কোনও রাজনৈতিক বিবৃতি নয়, কোনও পরিবেশগত পরিসংখ্যান নয়; তা আমাদেরই শিরা ছিঁড়ে যাওয়ার শব্দ, যে-শব্দ আমরা শুনতে পাই না, কারণ আমরা সভ্যতার নামে তৈরি করেছি এক বিশাল, যুগদর্শী বধিরতা। আমরা ভুলে যাই—নদী শুধু জল নয়, তারও হৃদয় আছে, তারও স্মৃতি আছে, তারও পরম সহ্যক্ষমতার সীমা আছে। যে-নদী শস্য ফলায়, সে-নদী বিষ নিতে নিতে একসময় নিজেকেই শুকিয়ে ফেলে। কিন্তু নদী কি সত্যিই মরে? না—নদী মরে না, মরে আমাদের বিবেক। নদী শুকিয়ে যায়, শুকিয়ে যায় আমাদের ভবিষ্যৎ।
আজকের দিনে কত নদীকে দেখলে মনে হয় যেন কঙ্কালসার ইতিহাসের শরীর। নদীদের বুকে মাটির চামড়া ফেটে ফেটে অভিযোগের নীল দাগ ফুটে ওঠে। দূষণের ভারে নুয়ে পড়া খরস্রোতা নদীরা নিজের মৃত্যুকে গোপন করতে চায়, কিন্তু আমরা-মানুষ নামের আজব প্রাণীরা-সেই গোপন-ইচ্ছাও ছিনিয়ে নিই। প্রিয়জনের কাছে ফিরে যাওয়া প্রেমিকার মতো, বৃষ্টির জলে নদী দৌড়ে যাবে সাগরের দিকে, এটাই স্বাভাবিক; কিন্তু আজ বৃষ্টি পড়লেও নদী দৌড়াতে পারে না, কারণ পথের ওপর আমরা দাঁড় করিয়েছি দখল, বাঁধ, বর্জ্য আর অবহেলার বহুতল প্রাসাদ। নদীর চোখে তাই প্রবাহ নয়, অভিমানের জল জমে থাকে নীরবে।
আমরা নদীর প্রতি কী করেছি? আমরা নদীর শৈশব কেড়ে নিয়েছি, তার যৌবন বোতলবন্দি করেছি, বিষাক্ত করেছি তার বার্ধক্য। তারপরও নদী কিছু বলে না। তার ঢেউয়ে আমরা ফেলে দিয়েছি মানুষের ব্যর্থতা, লোভ, স্বার্থ, ক্ষত আর কুকীর্তি,—নদী সব সয়ে যায়। কিন্তু নদীও একসময় ক্লান্ত হয়। আজ বাংলার নদীরা সেই ক্লান্তির শেষ সীমানায় দাঁড়িয়ে। যে-নদীরা ছিল জলঢেউয়ের হাসিমাখা, সেই নদীরা আজ শ্বাসকষ্টে কাঁপে। যে-নদীরা ছিল খরস্রোতা, সেই নদীরা আজ শিরশিরে নীরবতায় থমকে আছে।
নদী মানে বিস্মৃত না-হওয়া স্মৃতি, চাষের মাটিতে তার চিহ্ন, মানুষের গান-গাথায় তার উপস্থিতি, শিকড় থেকে শিরায় শিরায় মানুষের অস্তিত্বে তার আহ্বান। কিন্তু সেই আহ্বান আজ ভাঙা। নদী শুকিয়ে গেলে তার পাড়ের মানুষ প্রথমে বুঝতে পারে গভীর কূপে জল কমে গেছে, ধানি জমির বুক ফেটে গেছে, মাছেদের ভেসে ওঠা বুদ্বুদ থেমে গেছে। নদী তখন অদৃশ্য ধারালো ছুরি হয়ে কাটতে থাকে মানুষের প্রতিদিনের চাহিদা—জল আর জীবনকে আলাদা করে দেয় মৃত্যু-সীমানায়। একটি নদী যখন শেষবারের মতো নিজের বুকের ভেতর একটু আলো জমাতে চায়, তখন তার সেই ক্ষীণ আলোতেই কত মানুষ খুঁজে পায় ভবিষ্যতের সূর্যোদয়। কারণ নদী বাঁচলে স্রোত বাঁচে, মাটি বাঁচে, শস্য বাঁচে, মৎস্য বাঁচে, মানুষ বাঁচে।

আমরা নদীর মৃত্যু টের পাই নানাভাবে। প্রকৃতি রুষ্ট হয়ে ওঠে। মেঘ আসে, কিন্তু বৃষ্টি আসে না; কিংবা বৃষ্টি আসে, কিন্তু নদী ধরে রাখতে পারে না। নদীর ক্ষুধা যখন মানুষের লোভে পরিণত হয়, তখন দুর্ভিক্ষ ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বাসে, ভবিষ্যতের স্বপ্নে। আর নদীর মৃত্যুতে প্রকৃতি কাঁদে নিঃশব্দে। প্রজাপতির ডানায় জমে ওঠা শোক, জলজচরদের বিলুপ্ত প্রার্থনা, স্বচ্ছ জলের নিচে হারানো শুশুকের কান্না—সবই রয়ে যায় আমাদের বিবেক-অন্ধ দৃষ্টির আড়ালে।
আমরা বুঝি না—নদী সাগরের পথে-যে ছুটে চলে, সেই যাত্রায় সে সঙ্গে করে নিয়ে যায় মানুষের যন্ত্রণা, বর্জ্য, এবং লোভের কালো ছায়া; যেন অবলীলায় ক্ষমা করে দেয় মানুষের সব দোষ। কিন্তু নদী যখন তার পথ হারায়, ক্ষমা করার সেই স্রোতটাও থেমে যায়। নদীর মৃত্যু তাই কেবল একটি ভৌগোলিক পরিবর্তন নয়—এটি মানুষের জীবনে দাগ কেটে যাওয়া স্থায়ী ক্ষত, যা সময়েও শুকোয় না, সমাধিতেও মরে না। তবু আমরা দেখেই যাই, জেনে-শুনে অপরাধে জড়াই—কারণ নদীর কণ্ঠস্বর শুনতে আমরা অনেক আগেই বধির। কখনও কি আমরা ভাবি—একদিন এই বধিরতা আমাদের নিজের বেঁচে থাকার ঘোষণাপত্রটিকেই বাতিল করে দেবে?
আমরা নদীর বুকের ওপর ইট-সিমেন্টের দাবাখেলা খেলি। নীল কালি দিয়ে মানচিত্রে তার পথ সোজা করি; মনে হয় নদী যেন একটি ভুলে যাওয়া রেখা, যাকে চাইলে এপাশ-ওপাশ টেনে বসানো যায়। দখলদারির নখর নদীর শিরায় গোঁজা। বাঁধ দিয়ে আমরা তার স্রোত আটকে রাখি, যেন প্রাণকে শেকলে বেঁধে রাখলেই সে আরও অনুগত হবে। নদী কি কখনও বন্দি ছিল? যে-দিন বন্দি হলো, সে-দিনই শুরু হল তার অপমৃত্যুর ইতিহাস।
দূষণ এই গল্পের আরেক মহাশত্রু। শহরের নর্দমা নদীর ঘাড়ে ঢালা হয়, কারখানার বিষ নদীর গর্ভে জমা হয়, মানুষের স্বার্থ নদীর ফুসফুসে ক্যান্সার সৃষ্টি করে। একটা সময় নদীর জল ছিল আকাশের আয়না; আজ তার রঙে ফুটে ওঠে মানুষের দোষের প্রতিচ্ছবি। আর, আমাদের উদাসীনতা সবচেয়ে ভয়ংকর শত্রু। নদী যখন ধীরে ধীরে মরতে থাকে, আমরা তাকে দেখি দূরের ঘটনা বলে। এক নদী শুকিয়ে গেলে রাজনীতি হয়, কিন্তু সেই নদীর মৃত্যুতে শোক হয় না। এই সমাজে নদী হারিয়ে গেলে কেউ সমাধিতে ফুল দিতে আসে না—কারণ নদীর মৃত্যুর শোক মানুষের স্বার্থের বোঝায় ঢেকে যায়।
আর লোভ? লোভ নদীর পরম শ্বাসরোধকারী দস্যু। লাভের চোখ নদীর বুকে জমে ওঠা বালুকণা দেখে ধনভান্ডারের সোনা কল্পনা করে। মানুষ বার বার নদীকে বোঝাতে চায়— ‘তোমার জমি আমার, তোমার পথ আমার, তুমি বাঁচবে আমার নিয়মে।’ কিন্তু নদীর নিয়ম মানুষ লিখতে পারে না, পারে শুধু নষ্ট করতে। জলের স্মৃতিতে জমা হচ্ছে আমাদের অন্যায়, দখল আর পাপের দলিল। নদী যদি কথা বলত, তার প্রতিটি ঢেউ হতো অভিযোগের তলোয়ার। কিন্তু নদী কাঁদে নিঃশব্দে; মরেও যায় অনুচ্চারিত যন্ত্রণা বুকে নিয়ে।

নদী আসলে সময়ের গল্পকার। তার বুকে বয়ে চলে যাত্রার ইতিহাস, তার ঢেউয়ে লেখা থাকে ভবিষ্যতের ভবিষ্যদ্বাণী। যদি আমরা সেই গল্প পড়তে পারতাম, যদি সেই ভাষা বুঝতাম, তবে দেখতাম—নদীর জীবন বাঁধা আছে মানুষের নিশ্বাসের সঙ্গে, মানুষের স্বপ্নের সঙ্গে, মানুষের ভবিষ্যতের সঙ্গে। নদী বাঁচলে সভ্যতা বাঁচে; নদী মরলে সভ্যতা ঝড়ের দিকেই এগোয়।
নদীর জল—কৃষির ধমনিতে প্রণোদনা, কৃষক কিংবা মৎস্যজীবীর মুখে হাসি, বিশাল আকাশের ডাকে সাড়া দেওয়া জীবনের ছন্দ। প্রকৃতিও নদীর বন্ধু, বিরহে অসহায়। নদী শুকালে জলাভূমিও শুকিয়ে যায়, বিল-হাওরের গান নীরব হয়, পাখিরা অভিবাসন ভুলে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে, ডাঙার প্রাণী খুঁজে পায় না তৃষ্ণা মেটানোর পথ। আর যদি নদী বেঁচে ওঠে? তাহলে নীল জল চুঁয়ে গিয়ে উর্বর হয়ে ওঠে মাটি, নারকেলের পাতায় বাতাসের গান বাড়ে। একটি নদী প্রাণ পেলে তার আশপাশে জেগে ওঠে আশা, স্বপ্ন ও শিকড়ের গল্প।
নদী আমাদের বাঁচিয়ে রাখে ছায়াস্বরূপ; আমরা তা টের পাই তখনই—যখন নদী আর থাকে না। তাই নদীর জীবন শুধু স্রোতের মুক্তি নয়, মানুষের ভবিষ্যতের আমানত। যদি সেই আমানত আমরা রক্ষা না করি, আগামী প্রজন্মের হাতে আমাদের একমাত্র উত্তরাধিকার হবে তৃষ্ণা আর মৃত্যুর রুক্ষ ইতিহাস।
নদীর গল্পটা শুধু শোকের কাব্য নয়, সেটা আশা ও সংগ্রামের মহাকাব্য। নদীকে বাঁচানো কোনও দয়া নয়, এ মানুষের নিজের ভবিষ্যৎকে বাঁচানো। আর সে-পথ অসম্ভব নয়—তার জন্য প্রয়োজন ইচ্ছাশক্তি, সৎ নীতি, এবং প্রকৃতির সঙ্গে মমতাভরা মিত্রতার শপথ। প্রথমে প্রয়োজন—দখলমুক্ত নদী। নদীর বুক থেকে সরিয়ে নিতে হবে সব স্বার্থপর শেকল, সব বেআইনি আগ্রাসন। কারণ নদী বন্দিনীর মতো বাঁচতে পারে না। সে বাঁচবে বিস্তৃত স্রোতে, অবাধ নিশ্বাসে। তারপর চাই প্রবাহের পুনরুদ্ধার। শুকনো নদীতে বর্ষার জল এলে ছুটে যেতে দাও তার নিজস্ব পথে। মানচিত্রের রেখা নয়, প্রকৃতির বুকে আঁকা মৌলিক পথেই নদীর স্বাধীনতা। দূষণের বিষ থেকে রক্ষা করাই একটি বাঁচার যুদ্ধ। কারখানার কালো বর্জ্য নদীর গর্ভে যখন পচে ওঠে, তখন শুধু মাছেরই ক্ষতি হয় না, মানুষের দেহেও জন্ম দেয় অসংখ্য অনিরাময় রোগের বীজ। তাই কঠোর শাসনে দূষণের বিষ-প্রবাহ বন্ধ করতে হবে দ্রুত। আরও দরকার জলাভূমির পুনর্জন্ম। চর, বিল ও হাওর নদীর হৃদয়ের স্পন্দন। যেখানে নদী শ্বাস নেয়, যেখানে জলের স্বপ্ন নতুন হয়।
আমাদের মন বদলাতে হবে। আমাদের নদী-চেতনা নতুন ইতিহাস লিখতে পারে। স্কুলের শিশুরা নদীর গল্প শিখুক, নাগরিকেরা নদীর পথ অণুপরিমাণও বাধা দিক না, প্রশাসন নদীকে বাজেটের খাতা নয়—জীবনের পবিত্র স্বাক্ষর হিসেবে দেখুক। হ্যাঁ, অনেক নদী আবার ফিরবে—যদি আমরা একটু হাত বাড়াই, যদি নদীর আহত বুকের উপরে রাখি স্নেহের শান্তি।
. . .

নদী, তুমি কোন কথা কও?
[পাঠালাপ : থার্ড লেন হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ থেকে সংকলিত]

নদীর সঙ্গে কথা কইতে না-পারা ও কইতে না-চাওয়াই অভিশাপ হয়ে আমাদের তাড়া করছে এখন। নদীর একটি সচেতন-সত্তা রয়েছে। তার ভাঙা-গড়া ও বয়ে চলার মধ্যে রয়েছে নীরবে মর্মরিত ভাষা-সংকেত। মানুষ, কোনো-এক-কালে ভাষাটি পড়তে চেষ্টা করেছে। এখনো এরকম কোনো নদীমাতৃক মানবগোষ্ঠী হয়তো সে-ভাষা অনেকটা বোঝে, বাকিদের কাছে তা অবোধ্য আজ!
সভ্যতা মানুষকে বিস্ময়কর প্রাণীর মহিমা দান করলেও, তামাম জাহানের সঙ্গে সংযোগের ভাষা কেড়ে নিয়েছে। মানুষ এখন আর পিঁপড়ের ভাষা বোঝে না। পাখির ভাষা বোঝে না। নদী-পাহাড়-সাগর-অরণ্য অথবা পাহাড়চূড়া থেকে নেমে আসা ধবল জলরাশির ভাষা-সংকেত ধরতে পারে না। সে এগুলোকে উপযোগ বলে ভাবে, এবং কাজে লাগায়। এমনকি এগুলোর বিউটিকে নিজ মাপে কেটেছেটে নেয় অবিরত। শখের ভ্রামণিকরা পিকনিক মুডে যা আজকাল করে উপভোগ। সেখানে জীবনানন্দ দাশের মতো করে তার সঙ্গে কথা কওয়ার তাড়না থাকে নিখোঁজ। থাকে না নদীকে নিয়ে সজাগ শিহরন :
নদী, তুমি কোন কথা কও?
তুমি যেন আমার ছোট মেয়ে— আমার সে ছোটো মেয়ে :
যতদূর যাই আমি— হামাগুড়ি দিয়ে তুমি পিছে পিছে আসো,
তোমার ঢেউয়ের শব্দ শুনি আমি : আমারি নিজের শিশু সারাদিন নিজ মনে
কথা কয় (যেন)
কথা কয়— কথা কয়— ক্লান্ত হয় নাকো
এই নদী
একপাল মাছরাঙা নদীর বুকের রামধনু
বকের ডানার সারি শাদা পদ্ম— নিস্তব্ধ পদ্মের দ্বীপ নদীর ভিতরে
মানুষেরা সেই সব দেখে নাই।
এই না-দেখাটাই নদীর সঙ্গে আমাদের বিচ্ছেদকে চিরকালীন করে দিয়েছে বাবুল ভাই। যেখানে, এখন আর কেউ বার্ট্রান্ড রাসেলের মতো ‘নদী’কে সচেতন বা কনশাস সেল্ফ ভাবার দার্শনিকতা ধরে-না হৃদয়ে! রাসেল, তাঁর বুঝমাফিক অবিশ্বাসী জড়বাদী ছিলেন বটে! মানুষের সভ্যতায় গড়া বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের দ্বন্দ্ব নিরসনে ব্যাখ্যা ও যুক্তি দিয়ে গেছেন। তাঁর মনে হয়েছে, ‘ফিয়ার’ বা ‘আতঙ্ক’ হলো বিশ্বাসেরর জননী। মানবরচিত সভ্যতার বাইরে গিয়ে রাসেল যবে ধরনী ও মহাবিশ্বকে নিরিখ করলেন, তাঁর মনে হলো,—বস্তু-সমাহারে বিরচিত প্রকৃতির সচেতন-সত্তা রয়েছে। যেখানে, এই নদী নির্ভুলভাবে স্মৃতি ধরে রাখছে।
বিপুল জলরাশি বুকে নিয়ে নদীর ছুটে চলা, চলার পথ করে নিতে গড়াভাঙা, এবং এভাবে সাগরে নিজেকে বিসর্জন… যাত্রাটি প্রকারান্তরে স্মৃতির ভিতর দিয়ে যাত্রার শামিল। নদী ধরে রাখে যাত্রার স্মৃতি ও তা অনুসরণ করে নির্ভুল। সুতরাং, তাকে কনশাস-সেল্ফ না-বলে উপায় থাকে না।

নদীর এই স্মৃতিযাত্রাই তার ভাষা। সেটি যখন মানুষের হঠকারিতায় বিঘ্নিত হয়, তখন আসলে কী ঘটে? নদীর বয়ে চলা ও বিসর্জনে কি ঘটে গোলযোগ? সে কি আমাদের মতো স্মৃতি-বিস্মৃতির খাদে দাঁড়িয়ে অভিশপ্ত ভাবে নিজেকে? কী ভাবে তা রাসেল বেঁচে থাকলে হয়তো উত্তর দিতেন নিজের মতো করে। আমার কেন জানি মনে হয়, নদী তখন সাময়িক বিরাম নেয় যাত্রায়। সে হয়তো ঘুমিয়ে পড়ে আপাতত;—মাটির গভীর স্তরে সকল জল লুকিয়ে সাজে বন্ধ্যা। একে আমরা নদীর মৃত্যু বলে বুঝি তখন।
মৃত্যু! হায় মরণ! রাসেল একে দেখেছিলেন অভিজ্ঞতা হিসেবে;—যেটি এখন পর্যন্ত সত্য বলে প্রতিভাত মানুষের কাছে। যেখানে, আমাদের স্মৃতি বিরাম নেওয়াকে মরণ নামে পুনরাবৃত্তি করে আজো। কবির মতো বলে ওঠে, ‘মরণ রে, তুহু মম শ্যাম সমান।’ কোনো কারণে যদি মরণে ব্যাঘাত ঘটে? ধরা যাক, যিশুর মতো কেউ অলৌকিকস্বরে বলে উঠছে, ‘ওঠো ল্যাজারাস, আর কত ঘুমাবে? তুমি তো মরো নাই এখনো। আমি বলছি, কফিন থেকে বেরিয়ে আসো। আলোয় নিঃশ্বান নাও।’ ল্যাজারাস তার কফিন থেকে যদি পুনরায় আড়মোড়া ভেঙে জাগে, মরণের স্মৃতি মোড় নেবে রূপান্তরে।
বাইবেল-এ ল্যাজারাসকে ঈশ্বর কেন পুনর্জীবিত করেন? সেটি কি যিশুর নবিত্বের ক্ষমতাকে প্রতিষ্ঠা দিতে তিনি ঘটান? আমার তা মনে হয়নি কখনো। যিশুর আহবানে ল্যাজারাস ফের জেগে ওঠে এই সংকেত জানাতে,—মরণ হলো যাত্রাবিরতি, নতুন করে নতুন রূপে জেগে ওঠার আগে আমরা ইতি টানছি সাময়িক। নদী, সুতরাং মরে না; সে কেবল তার চলার স্মৃতিতে গড়বড় ঘটছে বুঝে স্রেফ ঘুমিয়ে পড়ে সাময়িক। বুকের ভিতরে বইতে থাকে বন্য ক্রোধ, আর চোখ দিয়ে গড়ায় অশ্রুফোঁটা। এখান থেকে যদি ভাবি একবার, জড়প্রকৃতির স্বভাবে বইতে থাকা নদী আসলে মরে না। সে কেবল বিঘ্ন এড়াতে না পেরে, এড়ানোর উপায় না পেয়ে ঘুম যায়। সময় হলে জেগে উঠবে পুনরায়, যখন সে দেখবে, বিঘ্ন এখন আর নেই।
করোনা অতিমারির দিনগুলো স্মরণ করুন। মানুষ বন্দি ঘরে। সঙ্গনিরোধের খাঁচায় তারা নিয়েছিল সাময়িক নির্বাসন, আর তখন জেগে উঠেছিল প্রকৃতি। আমরা দেখেছি নদীর জেগে ওঠা। হিমালয় থেকে নেমে আসা নির্মল জলরাশি তাজমহলের পাশ দিয়ে বইতে থাকা যমুনার কালো জলকে করে তুলেছিল স্বচ্ছ সুনীল। এমনকি বুড়িগঙ্গার দূষিত জলরাশিতে বেড়েছিল অম্লযানের পরিমাণ। মানে দাঁড়াচ্ছে এই,—নদী তার স্মৃতিযাত্রার আদি উৎসটি ফেরত পেয়েছিল সাময়িক।

কল্পনা করুন, মানব সভ্যতা বিলুপ্ত হয়েছে কোনো কারণে। হতে পারে মহাকাশ থেকে অতিকায় উল্কাপিণ্ড ভূমিতে আছড়ে পড়েছে;—যেমন পড়েছিল একদা ধরায় দাপটের সঙ্গে বিচরণ করতে থাকা ডাইনোসরদের আমলে। পরের কাহিনি আমরা জানি কমবেশি। ডাইনোসরের মতো সুবিশাল সম্রাটরা স্রেফ মাটির বুকে ফসিল হয়েছিল ক্রমশ। তারা ঘুমিয়ে পড়েছিল গোবি মরুর অতল চোরাই খাদে। ডাইনোসর-সভ্যতার তুলনায় মানব সভ্যতার আয়ু অকিঞ্চিৎকর এখনো। তার মধ্যেই তারা সকলের স্মৃতি মুছে দিতে থেকেছে তৎপর। ফলাফল, এরা সবাই বিরতি নিতেছে নিদ্রায়। মানুষ একে ভাবছে বিলোপ, আসলে তা ল্যাজারাসের মতো পুনরায় আড়মোড়া ভেঙে জেগে ওঠার প্রস্তুতি নিচ্ছে এখন।
আমার অতি পছন্দের পরিবেশবিজ্ঞানী জেমস লাভলক শতায়ু পূর্ণ করে ঘুমিয়ে আছেন আপাতত। অনেক বই লিখে গেছেন। বলে গেছেন কথা। ডেলফি মন্দিরে তিনি এ-যুগের ওরাকল ছিলেন বটে! গ্রিক ধরিত্রীদেবী ‘গাইয়া’র নামে তাঁর গবেষণাকে মুদ্রিত করতে পরামর্শ দিয়েছিলেন প্রতিবেশী নোবেলজয়ী সাহিত্যিক বন্ধু উইলিয়াম গোল্ডিং। লাভলক কথা রেখেছিলেন।
তো সেই লাভলক বলেছিলেন, প্রকৃতির একটি নিজস্ব ভাষাচক্র আছে, যেখানে সে জানে কীভাবে নিরাময় হতে হয়। কাক যেমন জানে, তার দেহে জমে থাকা ব্যকটেরিয়াকে নাশ করতে পিঁপড়ে কী-কারণে জরুরি। পিঁপড়ের ডেরায় সে হানা দেয়। আচ্ছামতো পিঁপড়েকে নিজের গায়ে ঠেসে ধরে, আর তারা ভক্ষণ করে ব্যাধি। বাঁচে কাকের জীবন। প্রকৃতিও এভাবে জানে নিরাময়। কথার কথা, পরামাণুযুদ্ধে পৃথিবী সমূলে বিনষ্ট হলো কোনো উন্মাদক্ষণে। ফেলিনির লা দলচে ভিতার সেই পাগলা লোকটির মতো কেউ নিদান হেঁকে জানিয়ে দিলো,—এই শান্ত-সুস্থির সময় কোনো নিরাপত্তা নয়, পাগলা ঘণ্টি এখনই বাজাতে পারে কোনো উন্মাদ। ঘণ্টি বেজে গেলো ধরে নিন। লাভলক বলছেন,—ধ্বংসযজ্ঞ থেকে প্রকৃতির নিজ স্বরূপে ফিরতে বেশি হলে আট-দশ বছর লাগবে। সে পুনরায় ফেরত আনবে নিজের সচেতন-সত্তায় মওজুদ স্মৃতি। হয়ে উঠবে সুনীল মনোরম। আফসোস এই থাকবে সেখানে,—তা দেখার জন্য একটি মানুষও সেদিন বেঁচে থাকবে না।
. . .

নদী, তুমি কোন কথা কও?—এই প্রশ্নটা আসলে নদীর কাছে নয়, আমাদের নিজের কাছেই ছুড়ে দেওয়া। কারণ, নদী কথা কয় বরাবরই। আমরা আর তা শুনি না, মিনহাজভাই! বদলেছে কেবল আমাদের কান, চোখ, হৃদয়ের সংবেদন।
আপনি যেভাবে নদীকে স্মৃতি-বহনকারী এক সচেতন-সত্তা হিশেবে ভাবছেন, তা কাব্যিক রোমান্টিসিজম নয়, তা এক গভীর দার্শনিক প্রত্যাবর্তন। জীবনানন্দের নদী, রাসেলের জড়প্রকৃতির কনশাসনেস, লাভলকের গাইয়া—সবাই আলাদা ভাষায় একই সত্যের দিকে ইঙ্গিত করে : প্রকৃতি নীরব নয়, আমরা বধির। নদীর ভাঙা-গড়া, তার পথ-সংশোধন, তার হঠাৎ ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠা কিংবা একসময় শুকিয়ে যাওয়া—এসব কোনো ‘দুর্ঘটনা’ নয়; এগুলো তার ভাষার ব্যাকরণ। আমরা সেই ব্যাকরণ পড়তে ভুলে গিয়ে নদীকে কেবল উপযোগ বানিয়েছি। ফলে নদীর সঙ্গে আমাদের সম্পর্কটা রয়ে গেছে একতরফা ভোগের সম্পর্কে।
ল্যাজারাসের উপমা অসাধারণভাবে যথাযথ। নদীর তথাকথিত ‘মৃত্যু’ আসলে মৃত্যু নয়, এক যাত্রাবিরতি। মানুষ যেমন স্মৃতি নিতে না-পেরে ক্লান্ত হয়ে পড়ে, তেমনই নদীও মানুষের হঠকারিতার চাপে সাময়িক ঘুমে যায়। করোনাকাল সেই ঘুম ভাঙার এক ক্ষণিক দৃশ্য দেখিয়েছিল;—মানুষ অনুপস্থিত থাকলেই নদী নিজের স্মৃতি ফিরে পায়।
আপনার এই মন্তব্যে এই সত্যটি ধরা পড়েছে—প্রকৃতির পুনরুত্থান মানববর্জিত ভবিষ্যতের দিকেই ইঙ্গিত করে। গাইয়ার নিরাময় সম্ভব, কিন্তু সেই সুস্থ পৃথিবীতে মানুষ থাকবে কি না, তার কোনও নিশ্চয়তা নেই। ডাইনোসরদের মতো মানুষও হয়তো একদিন কেবল ফসিল হবে, আর নদী তখনও বইবে, স্মৃতি নিয়ে, নতুন ভূগোল আঁকতে আঁকতে। তাই ‘নদী, তুমি কোন কথা কও?’—এই প্রশ্নের উত্তর নিশ্চয় নদী দেয়। প্রশ্ন হলো, আমরা কি আবার কখনও জীবনানন্দের মতো থেমে দাঁড়িয়ে শুনব? নাকি শেষপর্যন্ত সেই সভ্যতার অংশ হয়েই থাকব, যারা নদীর ভাষা না-বুঝে তাকে ‘নীরব’ ঘোষণা করেছিল?
. . .

নদী তীরবর্তী মানুষেরা মাছ ও তৃণভোজী তাই ওদের স্বভাব কোমল। উষর-অঞ্চলের মানুষেরা মূলত মাংসাশী, ফলে ওদের স্বভাবও উগ্র ও নিষ্ঠুর। বিষয়টা প্রাকৃতিক।
. . .
. . .

লেখক পরিচয় : উপরে ছবি অথবা এখানে চাপুন
. . .



