ইরানের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে পক্ষ-বিপক্ষে মতভিন্নতা বেশ প্রবল হতে দেখছি আমরা। বিষয়টি নিঃসন্দেহে স্পর্শকাতর। কেবল ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া যার একমাত্র কারণ নয়। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের ভূমিকাও সংগতকারণে গুরুতর ভাবছেন অনেকে। একটি স্বাধীন দেশের ওপর আগ্রাসনের প্রশ্নটি যেখানে পুরো বিষয়টিকে ঘোলোটে করে তুলেছে যথেষ্ট। সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিরোধের জায়গা থেকে চলমান পরিস্থিতি নিয়ে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব-মতভেদ ও স্ববিরোধীতা তীব্র হচ্ছে সবখানেই।
নিজ দেশে নিজ গৃহে সর্বোচ্চ একজন নেতাকে হত্যা করা, নিরীহ মানুষকেও সেইসঙ্গে মৃত্যুর স্বাদ নিতে বাধ্য করার মতো ঘটনা মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে কতটুকু গ্রহণযোগ্য?—এই প্রশ্নটি উঠছে। বিবেকবান মানুষের তাতে ক্ষুব্ধ হওয়া স্বাভাবিক। যুক্তির চেয়ে আবেগের মাত্রাছাড়া প্রাধান্য ও পক্ষপাত অন্তত ইরান-প্রশ্নে দোষনীয় নয়। ভিন্নমত কাজেই শ্রদ্ধা ও সুবিবেচনার সাথে জায়গা পাওয়া উচিত মনে করি।
আমার ব্যক্তিগত অভিমত অবশ্য কিছুটা ভিন্ন। থার্ড লেন হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে ইরান পরিস্থিতি নিয়ে অতীতে যেসব তর্কালাপ হয়েছে বা এখন হচ্ছে,—নিজের অবস্থান সেখানে যথাসম্ভব খোলাসা করার চেষ্টা করেছি। বলে রাখা ভালো,—অন্তর্গত কিছু যুক্তিকাঠামোর কারণে নিজের ভাবনা ও মতামতে আমি অটল এখনো। কারণগুলো আগে বলার চেষ্টা করি, তারপর প্রসঙ্গান্তরে যাবো :

প্রথমত, ইরান বিগত প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে ধর্মতাত্ত্বিক কাঠামোয় দেশের মানুষকে এমনভাবে আবদ্ধ করে রেখেছিল,—স্বাধীন চিন্তার অস্তিত্ব প্রায় বিলুপ্ত সেখানে। বলাবাহুল্য, ধর্মতাত্ত্বিক শাসনব্যবস্থার এটি হচ্ছে অন্যতম মৌলিক বৈশিষ্ট্য।
দ্বিতীয়ত, মানবাধিকার লঙ্ঘনের এত এত ঘটনা ঘটেছে… এখন এর ফিরিস্তি দিতে গেলে একটি বই লিখতে হয়! মানবাধিকারের মৌলিক বিষয়কে যারা মানবসভ্যতার অবিচ্ছেদ্য অংশ বিবেচনা করেন, তাদের কাছে এটি অজানা বা অপ্রত্যাশিত হওয়ার কথা নয়।
তৃতীয়ত, বর্তমান শাসনকাঠামোর পদ্ধতি ইরানের মতো সমৃদ্ধ সভ্যতাকে প্রায় পঙ্গু করে দিয়েছে। জ্ঞানবিজ্ঞান, সাহিত্য-শিল্পকলা ও দর্শনচর্চার যে-দীর্ঘ ঐতিহ্য এই অঞ্চলের ছিল, তা আজ ক্ষয়িষ্ণু দশায় পৌঁছেছে;—মুক্তির পথ মনে হচ্ছে সুদূর পরাহত!
চতুর্থত, যারা সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা করছেন, তাদের অনেকের কাছে সুস্পষ্ট বিকল্প রাজনৈতিক কল্পনা নেই অথবা এখন পর্যন্ত তা দেখাতে তারা ব্যর্থ হয়েছেন।
আমি কিছু উদাহরণ সংযুক্ত করছি আমার বক্তব্যের সপক্ষে। উদাহরণ হিসেবে এগুলো ইসলামি ইরানের সামগ্রিক বাস্তবতার তুলনায় অতি নগণ্য, তবু মনে করি এগুলো যুক্তিকাঠামোকে অগ্রসর হতে সাহায্য করবে :
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর ইরানে খুব অল্প সময়ের মধ্যে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ধর্মীয় নেতৃত্বের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়। বিপ্লববিরোধী, বামপন্থী, উদারপন্থী, রাজতন্ত্রপন্থী.. সব রাজনৈতিক শক্তিকে ধাপে ধাপে নিষ্ক্রিয় করা হয়।
১৯৮০–৮২ সময়কালে বিপুলসংখ্যক রাজনৈতিক কর্মী ও বিরোধী গোষ্ঠীর সদস্যকে দ্রুত বিচার কিংবা বিচারবহির্ভূত পদ্ধতিতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এই সময়টিকে অনেক গবেষক ইরানের আধুনিক ইতিহাসের প্রথম বৃহৎ মানবাধিকার বিপর্যয় হিসেবে বিবেচনা করেন। এর সবচেয়ে ভয়াবহ অধ্যায় ১৯৮৮ সালের কারাগার হত্যাযজ্ঞ। ইরান–ইরাক যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে হাজার হাজার রাজনৈতিক বন্দিকে গোপনে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। বহু পরিবার আজও জানে না তাদের স্বজন কোথায় সমাহিত। রাষ্ট্র দীর্ঘদিন এই ঘটনাকে অস্বীকার করেছে বা আংশিকভাবে স্বীকার করেছে, কিন্তু আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আলোচনায় এটি ইরানের ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়গুলোর একটি হিসেবে চিহ্নিত।
নব্বইয়ের দশকে রাষ্ট্রীয় সহিংসতা আরও সূক্ষ্ম রূপ নেয়। সরাসরি গণহত্যার বদলে শুরু হয় লক্ষ্যভিত্তিক দমন। ১৯৯৮ সালে কয়েকজন লেখক, অনুবাদক ও বুদ্ধিজীবীর রহস্যজনক হত্যাকাণ্ড ‘চেইন মার্ডার’ নামে পরিচিত হয়। এতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে-যে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ইরানে নিরাপদ নয়।
১৯৯৯ সালের ছাত্র আন্দোলনে রাষ্ট্র আবার তার কঠোর মুখ দেখায়। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে হামলা, গ্রেপ্তার ও নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাগুলো স্পষ্ট করে এই রাষ্ট্রে রাজনৈতিক সংগঠনের পরিসর সীমিত।
২০০৯ সালের নির্বাচনের পর ‘গ্রিন মুভমেন্ট’ ছিল আরেকটি বড় জাতীয় প্রতিবাদ। লক্ষ লক্ষ মানুষ ভোট জালিয়াতির অভিযোগে রাস্তায় নামে। রাষ্ট্র কঠোর দমন চালায়;—গণগ্রেপ্তার, নির্যাতন, জোরপূর্বক স্বীকারোক্তিকে সম্প্রচার, সাংবাদিক গ্রেপ্তার, রাজনৈতিক নেতাদের গৃহবন্দি করার মতো ঘটনা ঘটে তখন। এই সময় থেকে নিরাপত্তা কাঠামো আরও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি অর্জন করে।
২০১৭–২০১৮ সালে অর্থনৈতিক সংকটের প্রতিবাদ ও ২০১৯ সালের জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি-পরবর্তী বিক্ষোভে প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগের অভিযোগ ওঠে। বহু মানুষ নিহত হয়, হাজার হাজার মানুষকে জেলে পাঠানো হয়। ওইসময় প্রথমবারের মতো ইন্টারনেট সম্পূর্ণ বা আংশিক বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, যেন তথ্য বাইরে যেতে না পারে। আধুনিক রাষ্ট্রীয় দমননীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হিসেবে এটিকে দেখা হয়।
২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর ‘Woman, Life, Freedom’ আন্দোলন ইরানের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় তৈরি করে। এটি কেবল রাজনৈতিক আন্দোলন ছিল না;—এটি ছিল সাংস্কৃতিক ও নারীমুক্তির আন্দোলন। রাষ্ট্র কঠোর বলপ্রয়োগ করে। গ্রেপ্তার, মৃত্যুদণ্ড, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বহিষ্কার, সাংস্কৃতিক নিষেধাজ্ঞা… সব একসাথে প্রয়োগ করে ইরানের সরকার। প্রতিবাদের এই পর্বটি দেখিয়েছে,—তরুণ প্রজন্ম রাষ্ট্রীয় ধর্মতন্ত্রকে আর অনিবার্য হিসেবে মেনে নিতে রাজি নয়।
ইরানে মানবাধিকার সংকট শুধু রাজনৈতিক বন্দি বা বিক্ষোভ দমনে সীমাবদ্ধ থাকেনি। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, বিশেষ করে বাহাই, কুর্দি, বালুচ ও অন্যান্য জাতিগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে বৈষম্যের শিকার। ধর্মত্যাগ (apostasy), ‘জাতীয় নিরাপত্তা’, ‘ঈশ্বরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ (moharebeh)… এই ধরনের অভিযোগে দ্রুত বিচার ও মৃত্যুদণ্ডের অসংখ্য ঘটনা আন্তর্জাতিকভাবে সমালোচিত হয়েছে। মৃত্যুদণ্ডের হার ইরানে ধারাবাহিকভাবে উচ্চগামী থেকেছে। এখন কিছু লেখক, চলচ্চিত্রকার ও বুদ্ধিজীবীর নাম নিচ্ছি, যাঁরা ইরানি শাসনযন্ত্রে নিগৃহীত অথবা হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন :
লেখক ও বুদ্ধিজীবী
সাঈদ সুলতানপুর : কবি ও নাট্যকার; ১৯৮১ সালে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
মোহাম্মদ মোখতারি : লেখক; ১৯৯৮ সালের চেইন মার্ডারে নিহত হন।
মোহাম্মদ জাফার পুয়ান্দেহ : অনুবাদক; একই ঘটনায় নিহত।
শিরিন এবাদি : নোবেলজয়ী আইনজীবী; হয়রানি ও নির্বাসনে যেতে বাধ্য করা হয়।
নাসরিন সতোদেহ : মানবাধিকার আইনজীবী; একাধিকবার কারাবন্দি হয়েছেন।
মোস্তফা তাজজাদেহ : রাজনৈতিক চিন্তাবিদ; দীর্ঘ কারাবাসে ছিলেন।
চলচ্চিত্রকার
জাফর পানাহি : একাধিকবার গ্রেপ্তার ও চলচ্চিত্র নির্মাণে নিষেধাজ্ঞার বলি হয়েছেন।
মোহাম্মদ রাসুলফ : গ্রেপ্তার, কারাদণ্ড ও বিদেশে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন।
আব্বাস কিয়ারোস্তামি : সরাসরি জেলে দেয়নি, তবে সেন্সরশিপ ও রাষ্ট্রীয় চাপের মুখোমুখি হতে হয়েছে তাঁকেও।
তাহমিনে মিলানি : গ্রেপ্তার ও রাষ্ট্রবিরোধী অভিযোগে জিজ্ঞাসাবাদের শিকার হয়েছেন।
কেইওমার্স পুরআহমদ : রাষ্ট্রীয় চাপের সমালোচনার জন্য পরিচিত; তাঁর মৃত্যুকে ঘিরে বিতর্ক ছিল।
সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক কর্মী
আকবর গঞ্জি : অনুসন্ধানী সাংবাদিক; দীর্ঘ কারাবাস ভোগ করেছেন।
মাসিহ আলিনেজাদ : সাংবাদিক ও কর্মী; দেশত্যাগে বাধ্য করা ছাড়াও তাঁর পরিবারকে হয়রানির শিকার হতে হয়।
নিলুফার হামেদি ও এলাহে মোহাম্মদি : মাহসা আমিনি ইস্যু কভার করার পর গ্রেপ্তার হন।
তালিকাটি সম্পূর্ণ নয়। ইরানে গত চার দশকে শত শত সাংবাদিক, লেখক, শিল্পী ও শিক্ষাবিদ হয়রানি বা কারাবাসের শিকার হয়েছেন। রাষ্ট্রীয় সেন্সরশিপ শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য নয়; সাহিত্য, সিনেমা, সংগীত, এমনকি একাডেমিক গবেষণাকেও প্রভাবিত করেছে।
সর্বশেষ যে-গণআন্দোলন হয়েছিল, সেটিও নির্মমভাবে দমন করা হয়েছে। ধারণা করা হয়, খুব অল্প সময়ের মধ্যে বিপুলসংখ্যক মানুষ নিহত হয়েছেন। প্রতিবাদ করার সুযোগ নেই; প্রতিবাদ করলেই তাকে সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্ত বলে দমিয়ে দেওয়া হয়। শাসনকাঠামোর ধরন এতটাই গভীরে প্রোথিত-যে, দেশের মানুষের পক্ষে তা ভেঙে ফেলা সহজ নয়।
এই যে জটিলতা, এর থেকে মুক্তির পথ কোথায়?সাম্রাজ্যবাদ বা ইসরায়েলের আগ্রাসনকে নিন্দা করা অবশ্যই জরুরি; কিন্তু সেই অজুহাতে ইরানের জনগণকে চরমভাবে নিপীড়নের মধ্যে রেখে দেওয়া কতটা নৈতিক? এটি এখানে গুরুতর বিবেচ্য হয়ে দাঁড়ায়। প্রশ্নগুলো নিয়ে সম্প্রতি বিশদ একটি আলোচনা চোখে পড়ল। মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর ইরানে যে-গণআন্দোলন জন্ম নিয়েছিল, তার প্রেক্ষাপটে লেখা। বহিরাগত শক্তির অজুহাতে কীভাবে নাগরিক স্বাধীনতা সংকুচিত হয়, সেই জটিল বাস্তবতাকে সেখানে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। আলোচনাটি প্রাসঙ্গিক মনে হওয়ায় ভাষান্তরে তুলে ধরছি। আশা করি পাঠককে তা ভাবাবে।
—মোস্তাফিজুর রহমান জাভেদ
. . .

ইরানে ধর্মনিরপেক্ষতা
প্যাট্রিক হাসান ও হুসেইন দাববাগ
ভাষান্তর : মোস্তাফিজুর রহমান জাভেদ
ইরানে সাম্প্রতিক যে-গণঅভ্যুত্থানের ঢেউ দেখা গেছে, বিশেষত ইরানি নারীদের স্বাধীনতা রক্ষার আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে, এটি ১৯৭৯ সালে মোহাম্মদ রেজা পাহলভির পতনের জের ধরে প্রতিষ্ঠিত ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর একটি। এই আন্দোলনের জবাবে রাষ্ট্র যে-দমন-পীড়নের পথ বেছে নিয়েছে—ব্যাপক গ্রেপ্তার, দীর্ঘ কারাদণ্ড, ধারাবাহিক মৃত্যুদণ্ড… তা কেবল তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া নয়; বরং বহুদিন ধরে জমে থাকা গভীর এক সামাজিক, রাজনৈতিক ও নৈতিক অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ। এই অসন্তোষের বড় উৎস হলো এমন এক শাসনব্যবস্থা, যার ভিত্তি একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় বিশ্বদৃষ্টিতে স্থাপিত, এবং যার ফলে নাগরিক স্বাধীনতা ক্রমাগত সংকুচিত হয়েছে। এই সংকোচনের সবচেয়ে দৃশ্যমান, সবচেয়ে প্রতীকী উদাহরণ ও প্রতিরোধ আন্দোলনের কেন্দ্রীয় ইস্যু হলো নারীদের জন্য বাধ্যতামূলক হিজাব আইন।
ইরানে ধর্মীয় বিশ্বাস সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান ভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ সহজ নয়। কারণ, ধর্মত্যাগ, বিশেষত ইসলাম ত্যাগ আইনগতভাবে অপরাধ হিসেবে গণ্য, এবং ‘ইফসাদ ফিল আরজ’ বা ‘পৃথিবীতে দুর্নীতি সৃষ্টি’ নামে অস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত এক অভিযোগের আওতায় এর শাস্তি মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে। তথাপি ২০২০ সালের কিছু তথ্য থেকে বোঝা যায় বাধ্যতামূলক হিজাবের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিরোধিতা রয়েছে ইরানে। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই বিরোধিতা কেবল তাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় যারা হিজাব পরেন না;—বহু হিজাবপরা নারীও এই প্রতিবাদে অংশ নিয়েছেন। কারণ, তাদের কাছে বিষয়টি কেবল পোশাকের প্রশ্ন নয়,—সকল মানুষের সমান স্বাধীনতা ও অধিকারের প্রশ্নও বটে।
২০২২ সালের গবেষণাও দেখায়,—ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতি ইতিবাচক মনোভাব লক্ষণীয়ভাবে বেড়েছে। বেশি সংখ্যক মানুষ মনে করছেন ধর্মীয় ও নাগরিক অধিকারকে আলাদা রাখা প্রয়োজন। কিছু সমকালীন গবেষণা এমন এক বিদ্রুপাত্মক বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করে-যে, ইরানের ধর্মতান্ত্রিক শাসন উলটো এই প্রবণতাগুলোকে আরও তীব্র করে তুলেছে। অর্থাৎ, রাষ্ট্র যত বেশি ধর্মকে ক্ষমতার কেন্দ্রস্থলে বসিয়েছে, সমাজের ভেতরে তত বেশি সংখ্যক মানুষ ধর্মের রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন।
জনপ্রিয় প্রতিরোধ স্লোগান ‘জান, জেন্দেগি, আজাদি’—অর্থাৎ ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’—এই পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে সামনে নিয়ে আসে। তবে, ধর্মনিরপেক্ষ ইরানের এই দাবির বিরুদ্ধে পুনরাবৃত্ত সমালোচনাও আছে। সেই সমালোচনায় বলা হয়,—ধর্মনিরপেক্ষতা আসলে সাম্রাজ্যবাদী বা ঔপনিবেশিক শক্তির ছদ্মবেশী হাতিয়ার, যা স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের ভাষা ধার করে নিজের রাজনৈতিক লক্ষ্যকে আড়াল করে। ধর্মনিরপেক্ষতার এই সমালোচনা নতুন নয়। ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবের আগে ধর্মীয় নেতৃত্বাধীন বিপ্লবী গোষ্ঠীগুলোর আলোচনায় এটি একটি ধারাবাহিক ও মৌলিক বিষয় ছিল। আজও সেই বক্তব্য জীবিত ও সক্রিয়। এমনকি ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার কিছু বামঘেঁষা অ-ইরানি গোষ্ঠী, যারা উত্তর-ঔপনিবেশিক তত্ত্ব দ্বারা প্রভাবিত,—তারাও একই ভাষায় সমালোচনাটি ফিরে-ফিরে উত্থাপন করে।
এই আলোচনার উদ্দেশ্য প্রথমে একটি ধর্মনিরপেক্ষ ইরানের বিরুদ্ধে উত্থাপিত তথাকথিত সাম্রাজ্যবাদবিরোধী যুক্তিকে স্পষ্টভাবে পুনর্গঠন করা, যেন তার সমর্থকরা নিজের অবস্থান কীভাবে বোঝেন তা পরিষ্কার হয়। তারপর দেখানো-যে, বাস্তবে এই যুক্তি দুর্বল;—অন্তত যেভাবে সচরাচর এটি প্রয়োগ করা হয়। কারণ, ধর্মনিরপেক্ষতার অন্তর্নিহিত গুণাবলী এমনভাবেও ব্যাখ্যা করা যায়, এবং প্রায়ই করা হয়, যা কোনো ঔপনিবেশিকের চাপিয়ে দেওয়া কাঠামোর সঙ্গে অবশ্যম্ভাবীভাবে যুক্ত নয়।
১৯৭৯ সালে আয়াতুল্লাহ খোমেনি ক্ষমতায় আসার পরপরই একটি নতুন সংবিধান প্রণয়ন করেন। এর লক্ষ্য ছিল, শিয়া ইসলামের দ্বাদশ ইমামপন্থী জাফরী মতবাদের ধর্মীয় নীতিগুলোকে রাষ্ট্রের কাঠামোয় প্রতিফলিত করা। সংবিধানে বলা হয় : রাষ্ট্রের মৌলিক ভিত্তি হলো ‘এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস; তাঁর একচ্ছত্র সার্বভৌমত্ব ও আইন প্রণয়নের অধিকার; এবং তাঁর নির্দেশের প্রতি আত্মসমর্পণের অপরিহার্যতা’;—সেইসঙ্গে ‘ঐশী প্রত্যাদেশ ও আইন নির্ধারণে তার মৌলিক ভূমিকা’ (অনুচ্ছেদ ২)। আরও বলা হয়, ‘সমস্ত দেওয়ানি, দণ্ডবিধি, আর্থিক, অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক, সাংস্কৃতিক, সামরিক, রাজনৈতিক এবং অন্যান্য আইন ও বিধি অবশ্যই ইসলামি মানদণ্ডের ভিত্তিতে প্রণীত হবে’ (অনুচ্ছেদ ৪)। একইসঙ্গে দ্বাদশ ইমামপন্থী জাফরী মতবাদকে রাষ্ট্রের সরকারি ধর্ম হিসেবে ঘোষণা করা হয় (অনুচ্ছেদ ১২)।

স্পষ্ট-যে, এই ধরনের ধর্মতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ধর্মনিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে মৌলিকভাবে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। ধর্মনিরপেক্ষতার মূল ধারণা হলো, জনপরিসরের রাজনৈতিক আলোচনায় কেউ যেন ধরে না নেয়-যে, অন্য সবাই তার মতো একই ধর্মীয় অনুমান ও বিশ্বাসে আস্থাশীল। রাষ্ট্রের উচিত জননীতি নির্ধারণে ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রশ্নে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করা। অনেকের ভুল ধারণার বিপরীতে এর মানে কিন্তু রাষ্ট্রীয়ভাবে নাস্তিকতা চাপিয়ে দেওয়া নয়। এর অর্থ হলো, নাগরিক জীবনে ধর্মীয় বিশেষাধিকারকে নিরুৎসাহিত করা, এবং নিরপেক্ষতা ও বহুত্ববাদকে গুরুত্ব দেওয়া, যেন প্রত্যেক নাগরিক তার ধর্মীয় বিশ্বাস থাকুক বা না থাকুক, রাষ্ট্রে সমান সুযোগ ও সম্মান পায়।
এই অবস্থানের একটি বাস্তব প্রয়োগ হলো জনপরিসরের রাজনৈতিক আলোচনায় কেবল ধর্মীয় যুক্তির ভিত্তিতে এমন আইনকে ন্যায্যতা দেওয়া যথেষ্ট নয়, যা নাগরিককে নির্দিষ্ট আচরণ মেনে চলতে বাধ্য করবে। ধর্মনিরপেক্ষতার আধুনিক যুগের অন্যতম প্রভাবশালী দার্শনিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন জন লক তাঁর Letter on Toleration (১৬৮৯) গ্রন্থে। সেখানে তিনি লিখেছিলেন :
আমি মনে করি সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো নাগরিক সরকারের দায়িত্ব ও ধর্মের দায়িত্বকে স্পষ্টভাবে পৃথক করা, এবং এই দুইয়ের মধ্যে যে ন্যায্য সীমারেখা রয়েছে তা নির্ধারণ করা। যদি তা না করা হয়, তবে মানুষের আত্মার কল্যাণের দায়িত্ব দাবি করা ব্যক্তিদের সঙ্গে রাষ্ট্রের কল্যাণের দায়িত্ব নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে যে-বিরোধ, তার কোনো শেষ থাকবে না।
ধর্মনিরপেক্ষতা অনেকের কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয়, কারণ বাস্তবে খুব কম ক্ষেত্রে দেখা যায় একটি পুরো জাতি একই উৎস থেকে উৎসারিত আইনের প্রতি সমান বিশ্বাস রাখে কিংবা সেই আইনের একই ব্যাখ্যা মেনে নেয়। কোন ধর্ম, যদি আদৌ কোনোটি ‘সত্য’ ধর্ম হয়ে থাকে, তার বিষয়ে বিস্তৃত ও জ্ঞাত কোনো ঐকমত্য নেই। জ্ঞানের সীমাবদ্ধতাই আমাদের সতর্ক করে দেয় : নাগরিক আইনকে কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর চেষ্টায় বিরত থাকা বুদ্ধিমানের কাজ। কারণ এভাবেই কেবল নাগরিকের অধিকার তুলনামূলক সুরক্ষিত রাখা সম্ভব হয়। যেসব দেশে ধর্মীয় বৈচিত্র্য বেশি, সেখানে এই নিরপেক্ষতার প্রয়োজন আরও তীব্র।
তবে আপত্তি উঠতে পারে, ধর্মনিরপেক্ষতার এই ‘নিরপেক্ষতা’ কি আদৌ নিরপেক্ষ? অনেকে বলেন, আমরা নিরপেক্ষতাকে যেভাবে কল্পনা করি, তা নিজে একটি নির্দিষ্ট সামাজিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে নির্মিত। ফলে ‘নিরপেক্ষতা’ও শেষ পর্যন্ত প্রেক্ষাপট-নির্ভর, ক্ষমতা-নির্ভর। নৃতত্ত্ববিদ সাবা মাহমুদ যুক্তি দিয়েছিলেন,—রাজনৈতিক ধর্মনিরপেক্ষতার আইনি কাঠামো পুরোপুরি নিরপেক্ষ নয়, কারণ জাতিরাষ্ট্রের গঠন তার নিজস্ব ইতিহাস, মূল্যবোধ ও সামাজিক মানদণ্ড দ্বারা গড়ে ওঠে বা নির্ধারিত হয়।
এই পর্যবেক্ষণকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। নিখুঁত, পরম নিরপেক্ষতার কোনো বাস্তব আদর্শ নেই। মানুষ সবসময় নির্দিষ্ট কোনো সামাজিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বসবাস করে; ফলে পৃথিবীকে বোঝার জন্য যে-মূল্যবোধ আমরা ব্যবহার করি তা স্বভাবতই প্রেক্ষাপট নির্ভর। এখান থেকে অবশ্য এই সিদ্ধান্ত টানা যায় না-যে, আমাদের নিজস্ব প্রেক্ষাপটের বাইরে গিয়ে অন্য মূল্যবোধ কল্পনা বা কোনো মাত্রাতেই নিরপেক্ষতার দিকে আমরা অগ্রসর হতে পারব না। নাগরিকদের ভিন্ন ভিন্ন ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতি একটি কার্যকর নিরপেক্ষতার সন্ধান করা বরং জরুরি; কারণ তা-না-হলে নিপীড়ন প্রায় অনিবার্য হয়ে ওঠে।
এটিও সত্য-যে, ধর্মনিরপেক্ষতাও কখনো কখনো নিপীড়নের রূপ নিতে পারে; যদি ধরে নেওয়া হয় ধর্মনিরপেক্ষ আইন নিজে ‘পবিত্র’; অতএব তাকে সমালোচনার ঊর্ধ্বে রাখতে হবে। ধর্মনিরপেক্ষতা তখন আর নিরপেক্ষতা বা বহুত্ববাদকে সম্মান করে না। পরিহাসের বিষয়, ইরানের ইতিহাসে এর একটি উদাহরণ আছে। পাহলভি আমলের প্রথম দিকে (১৯৩৬–১৯৪১) ‘কাশফ-এ হিজাব’ নীতির মাধ্যমে জনপরিসরে হিজাব নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। এই নীতিকে আমরা সমালোচনা করি, যেহেতু মানুষের বিবেকের স্বাধীন বিশ্বাসকে তা রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছিল। ধর্মীয় বিশ্বাসও সেই বহু ধরনের বিবেকগত বিশ্বাসের একটি অংশ, যা একটি সহনশীল সমাজে রাষ্ট্রের উপযুক্ত নিরপেক্ষতার মাধ্যমে সুরক্ষিত হওয়া উচিত।
সুতরাং, ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি ও ইসলামি প্রজাতন্ত্রের নীতির মধ্যে যে-টানাপোড়েন তা আকস্মিক নয়;—এটি সচেতনভাবে নির্মিত। সমকালীন ইরানের শাসনব্যবস্থায় ধর্মের ভূমিকা বোঝার জন্য স্বীকার করতেই হবে ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্র’ ধারণাটি নিজেকে স্পষ্টভাবে ধর্মনিরপেক্ষ শাসনের বিকল্প ও অনেকের কাছে শ্রেষ্ঠ বিকল্প রূপে নিজেকে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে।
আগেই বলা হয়েছে, ধর্মনিরপেক্ষ ইরানের বিরুদ্ধে সবচেয়ে প্রচলিত আপত্তিগুলোর একটি সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ও উত্তর-ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। আপত্তির কিছু সংস্করণ আবার দাবি করে, ধর্মনিরপেক্ষতা প্রকৃতিগতভাবে ধর্মবিরোধী, আর সেই অর্থে ইসলামবিরোধীও। এর সঙ্গে যুক্ত করা হয় আরেকটি ধারণা : ইসলামি আদর্শই ইরানের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের কেন্দ্র হওয়া উচিত। দুই ধারণা মিলে এমন এক সিদ্ধান্তে পৌঁছায়-যে,— ধর্মনিরপেক্ষতা আসলে ইরানবিরোধী; এটি বিদেশি শক্তির একটি কৌশল, যার মাধ্যমে ইরানিদের চিন্তা, মূল্যবোধ ও স্বার্থকে নিজের মতো গড়ে তোলা যায়, যাতে সেই শক্তিগুলোর প্রভাব বিস্তার ও সম্পদ আহরণ সহজ হয়।
এই আপত্তির উৎস আংশিকভাবে নিহিত রয়েছে পাহলভি রাজবংশের (১৯২৫–১৯৭৯) সময় রাষ্ট্র-নির্দেশিত দ্রুত আধুনিকায়নের বিরুদ্ধে অসন্তোষের মধ্যে। সেই সময়কার ধর্মনিরপেক্ষ নীতি পশ্চিম, বিশেষত ব্রিটিশ ও আমেরিকান প্রভাবের সঙ্গে নিবিড় ছিল। ১৯৫৩ সালে সিআইএ সমর্থিত অভ্যুত্থানের মাধ্যমে জাতীয়তাবাদী প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেককে ক্ষমতাচ্যুত করে শাহকে পুনঃস্থাপন করা হয়। এর ফলে অনেকের চোখে ধর্মনিরপেক্ষতা ও বিদেশি হস্তক্ষেপ প্রায় একই ধারার অংশ হয়ে ওঠে।
তবে, এই ধরনের বয়ান শুধু ইরানের ভেতরে সীমাবদ্ধ নয়; বৃহত্তর মুসলিম বিশ্বেও এর ব্যাপক প্রতিধ্বনি আছে। ইউরোপীয় সমাজে ধর্মনিরপেক্ষতার উদ্ভব হয়েছিল দীর্ঘ সামাজিক বিতর্কের মধ্য দিয়ে : অর্থনৈতিক পরিবর্তন, ধর্মীয় কর্তৃত্বের অবক্ষয় ও নাগরিক শৃঙ্খলার প্রশ্নকে কেন্দ্র করে; কিন্তু মুসলিম বিশ্বে আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষতা প্রায়ই ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে : প্রথমে ঔপনিবেশিক শক্তির মাধ্যমে ও পরে স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রের মাধ্যমে। তিউনিসিয়া, আলজেরিয়া, মিশর, সিরিয়া, ইরাক, ইয়েমেন ও তুরস্ক… অনেক ক্ষেত্রেই এই রাষ্ট্রগুলো ছিল ধর্মনিরপেক্ষ স্বৈরতন্ত্র, যেগুলো পশ্চিমা সরকারের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সমর্থন পেয়েছিল। তারা দ্রুত আধুনিকায়নের পথে এগোতে চেয়েছিল, যা বহু মানুষের কাছে অত্যন্ত ত্বরিত, জোরপূর্বক ও সামাজিকভাবে বেখাপ্পা মনে হয়েছিল। এর ফলে ইসলামি চিন্তার গবেষক মুহাম্মদ খালিদ মাসউদের ভাষায় মুসলিম চিন্তাবিদগণের কাছে ধর্মনিরপেক্ষতার মতো নতুন ধারণাগুলোকে খ্রিষ্টান বা পশ্চিমা ঔপনিবেশিক প্রাধান্য থেকে আলাদা করে বোঝা কঠিন হয়ে পড়েছিল।
ইতিহাসের নিরিখে ধর্মনিরপেক্ষতা ও সাম্রাজ্যবাদের মধ্যে অন্তত আংশিক একটি সম্পর্ক ছিল এ-কথা কাজেই অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু আসল প্রশ্ন হলো : এই সম্পর্ক কি ধর্মনিরপেক্ষতার অন্তর্নিহিত ও অনিবার্য বৈশিষ্ট্য? ঠিক এই দাবিটিকে প্রশ্নের মুখে তোলা জরুরি।

ঔপনিবেশিক শোষণের বৃহত্তর বয়ান মুসলিম বিশ্বের বৌদ্ধিক পরিসরে বিশেষ প্রভাবশালী হয়ে ওঠে এডওয়ার্ড সাঈদের প্রাচ্যবাদ (Orientalism) বইটির মাধ্যমে। সেখানে তিনি দেখান : ‘পশ্চিম’ কীভাবে প্রায়শই ‘পূর্বকে’ সরলীকৃত, অবমাননাকর এবং একরৈখিকভাবে উপস্থাপন করে। সাঈদের মতে, এর ফলে মধ্যপ্রাচ্য বা পূর্বের সমাজগুলোকে নিয়ে যে-জ্ঞান তৈরি হয়, তা অনেকসময় রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ থাকে না, বরং বিদ্যমান ঔপনিবেশিক ক্ষমতা-কাঠামোকে শক্তিশালী করে।
ইরানের প্রেক্ষাপটে এই চিন্তা বৌদ্ধিক রূপ পেয়েছিল বিশেষ করে জালাল আল-ই-আহমদের (Jalāl Āl-e-Ahmad) Occidentosis: A Plague from the West এবং দারিউস শায়েগানের (Dariush Shayegan) Asia v the West বইয়ে। আল-ই-আহমদ ‘গার্বজাদেগি’ শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন, যার অর্থ প্রায় ‘পশ্চিমে আক্রান্ত হওয়া’ বা ‘পশ্চিমের বিষে আক্রান্ত হওয়া’। এর মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন, ইরান পশ্চিমা উপকরণ ও ধারণার ওপর এমনভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে যে তার নিজস্ব স্বকীয় পরিচয় গড়ে তোলা কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
পরিহাস এই-যে, পশ্চিমা প্রভাবের এই সমালোচনামূলক দর্শন স্বয়ং ইউরোপীয় দর্শনের নানা প্রবাহের দ্বারা প্রভাবিত ছিল;—বিশেষত জঁ-পল সার্ত্র, মার্টিন হাইডেগার, ফ্রঁৎস ফানোঁ ও কার্ল মার্কসের চিন্তা দ্বারা; তবু এই অবস্থান ১৯৭৯ সালের বিপ্লবকে এগিয়ে নেওয়া বহু গোষ্ঠী ও ব্যক্তির মধ্যে গভীরভাবে প্রভাব ফেলেছিল। ১৯৭১ সালে নির্বাসিত অবস্থায় রুহুল্লাহ খোমেনি মুসলিম সমাজে সাম্রাজ্যবাদী সংস্কৃতির বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর মতে এই প্রভাব কোরানের শিক্ষাকে আড়াল করছে ও তরুণ প্রজন্মকে বিদেশি স্বার্থের সেবায় ঠেলে দিচ্ছে।
উক্ত বয়ানের একটি মৌলিক দুর্বলতা আছে : এটি ‘পূর্ব বনাম পশ্চিম’ নামের কঠোর দ্বৈততার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ইসলামি প্রজাতন্ত্রের আদর্শিক ভিত্তিও অনেকাংশে এই দ্বৈততার ওপর নির্ভরশীল। অথচ, এখানে সঙ্গে-সঙ্গে একটি প্রশ্ন হাজির হয় : ‘পশ্চিম’ বলতে আসলে কী বোঝানো হচ্ছে? এটি কি কেবল ভৌগোলিক অঞ্চল? একটি নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, যেমন পুঁজিবাদ? বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিশেষ স্তর? নাকি, রাজনৈতিক জোট? নৈতিক প্রতীক বলে কি ধরব একে?
খোমেনির কথাবার্তায় এই অস্পষ্টতা দেখা যায়। কখনও তিনি ‘পশ্চিম’কে ঔপনিবেশিকতার সমার্থক হিসেবে ব্যবহার করেছেন, আবার কখনও নৈতিক অবক্ষয়ের প্রতীক হিসেবে জাহির করেছেন। এই অস্পষ্টতা গুরুত্বপূর্ণ; কারণ ‘পশ্চিম’ যদি পরিষ্কারভাবে সংজ্ঞায়িত না হয়, তাহলে তার বিপরীতে দাঁড় করানো ‘পূর্ব’-ও অস্পষ্ট থেকে যায়। আর, এই অস্পষ্টতার ওপর দাঁড়িয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সহজে পৃষ্ঠস্থ হয়ে পড়ে। বাস্তবতাও তাই দেখায়। মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া বা জাপানের মতো দেশগুলো তথাকথিত ‘পশ্চিমা’ কিছু মূল্যবোধ গ্রহণ করেছে, কিন্তু তাতে তাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয় নিশ্চিহ্ন হয়নি।
ইসলামি প্রজাতন্ত্র যে-‘পূর্ব বনাম পশ্চিম’ দ্বৈততার ওপর নির্ভর করে, সেটিও শেষ পর্যন্ত সেই একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করে, যার সমালোচনা সাঈদ করেছিলেন : অর্থাৎ, পুরো সংস্কৃতিকে অতিরিক্ত সরলীকরণ করা। এই দ্বৈততা একধরনের কৃত্রিম একরূপতার কল্পনা তৈরি করে, যা ইরানের ভেতরের বহুবিধ রাজনৈতিক মত, আকাঙ্ক্ষা ও সামাজিক গোষ্ঠীর বাস্তবতাকে আড়াল করে দেয়। এদিক থেকে ইসলামি প্রজাতন্ত্র নিজে সেই সরলীকরণের ফাঁদে পড়ে, যাকে সে তাত্ত্বিকভাবে প্রত্যাখ্যান করতে চায়।

ইরানে সংবিধানের ভূমিকাতে বলা হয়েছে : ‘ইমাম খোমেনির নেতৃত্বে জাতির জাগ্রত বিবেক’ একটি ‘ঐক্যবদ্ধ জনআন্দোলন’ গড়ে তুলেছিল, যা ‘প্রকৃত ইসলামি ও আদর্শিক পথে সংগ্রাম’ পরিচালনা করেছে। বিবরণটি ইতিহাসকে অত্যন্ত সরল করে ফেলে। কারণ, বিপ্লবের আগের ইরানি সমাজকে একটি অভিন্ন লক্ষ্যসম্পন্ন একরৈখিক সত্তা হিসেবে দেখানোটা বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না। পাহলভি রাজবংশের বিরুদ্ধে অসন্তোষ ব্যাপক ছিল সে-বিষয়ে সন্দেহ নেই। কিন্তু তার বিকল্প হিসেবে কী ধরনের রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েম হবে এই নিয়ে সর্বজনীন ঐকমত্য সমাজে ছিল না। সমাজটি নানা গোষ্ঠীতে বিভক্ত ছিল : কমিউনিস্ট, ব্যবসায়ী, ছাত্র, শ্রমিক, শিক্ষিত নারী, ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদী… যাদের অনেকের লক্ষ্য ধর্মীয় নেতাদের লক্ষ্য থেকে ভিন্ন থেকেছে।
এমনকি বিপ্লবে অংশ নেওয়া সকল গোষ্ঠীও পরে গড়ে ওঠা ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নীতি সমর্থন করেনি। উদাহরণস্বরূপ, বিপ্লবের মাত্র কয়েক সপ্তাহ পর ১৯৭৯ সালের ৮ মার্চ খোমেনি ঘোষণা করেন,—ইরানে নারীদের ধর্মীয় পোশাকবিধি মেনে চলা উচিত;—তখন তেহরানের রাস্তায় দশ হাজারের বেশি নারী ছয় দিন ধরে বিক্ষোভ করেছিলেন। ইরানের রাজনৈতিক ইতিহাসে ধর্মের ভূমিকা, এমনকি সাম্প্রতিক ইতিহাসেও সরকার একে যেমন একরৈখিকভাবে উপস্থাপন করে থাকে,—বাস্তবতা এরচেয়ে অনেক বেশি জটিল, দ্বন্দ্বময় ও বহুত্ববাদী। এই জায়গায় এসে দেখা যায় ‘সাম্রাজ্যবাদবিরোধী’ বয়ানকে সমর্থন করা ইসলামপন্থী ও কিছু উত্তর-ঔপনিবেশিক চিন্তাবিদ অনেক ক্ষেত্রে একই জায়গায় এসে দাঁড়ান, এবং একই ধাঁচের ধারণাগত সমস্যায় পড়েন।
এখন পর্যন্ত যে-বয়ানটি দেখা হলো সেটিই মূলত একটি ধর্মনিরপেক্ষ ইরানের দাবি প্রত্যাখ্যান করার নৈতিক ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। যুক্তিগতভাবে একে সাজালে তা এমন :
প্রথমত, যেখানে সাম্রাজ্যবাদ আছে ও একে প্রতিরোধ করা উচিত। দ্বিতীয়ত, একটি ধর্মনিরপেক্ষ ইরানের ধারণা পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের মধ্য থেকে এসেছে, এবং এখনও তার স্বার্থকে এগিয়ে নিচ্ছে। অতএব তৃতীয়ত, একটি ধর্মনিরপেক্ষ ইরানের ধারণা প্রতিরোধ করা উচিত।
প্রথম দাবিটি নানা নৈতিক ভিত্তিতে সমর্থন করা যেতে পারে। সাম্রাজ্যবাদ ভুল, কারণ এটি নিপীড়নের একটি রূপ; এটি জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে ক্ষুণ্ণ করে; ব্যক্তি ও সংস্কৃতিকে আঘাত করে; এবং প্রায়শ সাংস্কৃতিক আত্মাভিমানের বহিঃপ্রকাশ হয়ে ওঠে। আপাতত এই দাবিটি মেনে নেওয়া যেতে পারে।
দ্বিতীয় দাবিটি সবচেয়ে দুর্বল, এবং এখানে এসে যুক্তির ভঙ্গুরতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কারণ, এই দাবি শুধু বলে না,—ধর্মনিরপেক্ষ ইরানের ধারণার একটি উৎস পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের ইতিহাসে নিহিত; বরং বলে,—এটি এখনও পুরোনো লক্ষ্যকে মঞ্জিল ধরে এগিয়ে যাচ্ছে। কেবল উৎসের কথা বললে যুক্তিটি সহজে ভ্রান্ত হয়ে পড়ত। কারণ, কোনো ধারণার বর্তমান মূল্য বা ভূমিকা কেবল তার উৎপত্তিস্থল দিয়ে নির্ধারণ করা যায় না। একটি ধারণা ইতিহাসে একসময় যে-কাজে ব্যবহৃত হয়েছিল, এর থেকে উক্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না,—পরবর্তী প্রেক্ষাপটেও তা অবিকল একই ভূমিকা পালন করবে। অতএব, এমনকি যদি মেনে নেওয়া হয়-যে, ইরানের প্রেক্ষাপটে ধর্মনিরপেক্ষতা একসময় পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল, তথাপি এর থেকে এরকম সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় না,—ধর্মনিরপেক্ষতা অনুরূপ ভূমিকা পালন করছে কিংবা তার পক্ষে স্বাধীনভাবে নতুন নৈতিক ও রাজনৈতিক যুক্তি দাঁড় করানো সম্ভব নয়।
যুক্তির দ্বিতীয় অংশ, যেখানে বলা হয়েছে,—একটি ধর্মনিরপেক্ষ ইরানের দাবি এখনও পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থকে এগিয়ে নিচ্ছে… এটি আসলে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে নেই। সত্যিকার যুক্তিসংগত হতে হলে তাকে অন্তত দুটি বিষয় প্রমাণ করতে হবে : প্রথমত, ধর্মনিরপেক্ষ ইরান বাস্তবিক সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর স্বার্থে কাজ করবে; দ্বিতীয়ত, এবং আরও গুরুত্বপূর্ণভাবে, ধর্মনিরপেক্ষ ইরানের দাবি কেবল সেই সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর প্রভাবে গড়ে উঠেছে।

বাস্তবতা এখানে ভিন্ন কথা বলছে। ইরানের ভেতরে বিপুলসংখ্যক মানুষ রাষ্ট্র ও ধর্মীয় কর্তৃত্বকে আলাদা করার দাবি তুলছেন। তাদের কণ্ঠকে অস্বীকার করা, পশ্চিমা প্রচারণার শিকার বলে দাগানো, ‘মিথ্যা চেতনায়’ বন্দি বা বিভ্রান্ত জনগোষ্ঠী বলে তাদের চাওয়াটাকে উড়িয়ে দেওয়া… পরিহাস এখানেই,—এটি তাদেরকে নীরব করে দেওয়ার আরেক রূপ হয়ে দাঁড়ায়। যদিও এই নীরবীকরণকে তথাকথিত সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধীরা সাধারণত ঔপনিবেশিক নিপীড়নের লক্ষণ বলে সমালোচনা করে থাকেন। অবশ্য কেউ আরও ভিন্নভাবে আপত্তি তুলতে পারেন;—তারা বলতে পারেন, ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণা যেহেতু ইউরোপীয় সমাজের ভেতর জন্ম নিয়েছে, তাই সেটি সেই বিশেষ সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় প্রেক্ষাপটের জন্য উপযোগী; অন্যত্র প্রয়োগ করা হলে তা অপ্রাসঙ্গিক বা ক্ষতিকর হতে পারে;—কিন্তু এই আপেক্ষিকতাবাদী যুক্তির অন্তত দুটি গুরুতর সমস্যা আছে :
প্রথমত, ইতিহাসগতভাবে দেখলে এটি ভুল। ইউরোপের বাইরে উপনিবেশবাদের আগেকার বহু সমাজে ধর্মনিরপেক্ষতার নানা রূপ পাওয়া যায়। ভারতের দার্শনিক ঐতিহ্য ও রাজনৈতিক কাঠামোর ভেতরে, চীনের বিভিন্ন সাম্রাজ্য-শাসিত যুগপর্বে, এমনকি ইসলামি সভ্যতায়ও রাষ্ট্র ও ধর্মের সম্পর্ককে পৃথক করে ভাবার ঐতিহাসিক নজির রয়েছে। যার ফলে ধর্মনিরপেক্ষতা কেবল ইউরোপ বা ‘পশ্চিম’-র জন্যই উপযোগী… এই দাবি ধোপে টেকে না।
দ্বিতীয়ত, এই আপেক্ষিক অবস্থান নিজে অবমাননাকর। কারণ, এতে ধরে নেওয়া হয় ইরানিরা যেন স্বভাবগতভাবে ধর্মীয় কাঠামোর বাইরে দাঁড়িয়ে নিজের সামাজিক রীতি, মূল্যবোধ ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বাধীন পথে ভাবতে সক্ষম নয়। ধারণাটি এই অর্থে পিতৃতান্ত্রিক, সংকীর্ণ… এমনকি বর্ণবাদীও।
সাম্রাজ্যবাদবিরোধী যুক্তির আরেকটি গুরুতর সমস্যা হলো এটি প্রায়শ সেই বাস্তব সমস্যাগুলোকে আড়াল করে দেয়, কখনও-কখনও বৈধতা দিয়ে দেয়, যেগুলো সমাধানের প্রয়োজনীয়তা থেকে ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণা শক্তি পেয়েছিল। সমস্যাগুলোর একটি হলো ধর্মতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার অন্তর্নিহিত সীমাবদ্ধতা, যার দিকে বহু আগে জন লক দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। তাঁর মতে, এমন শাসনব্যবস্থা ধর্মীয়ভাবে বৈচিত্র্যময় সমাজে নাগরিক স্বাধীনতা রক্ষা করতে প্রায়শ ব্যর্থ হয়। ইতিহাসে এর বহু উদাহরণ আছে, আর ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ক্ষেত্রেও তা স্পষ্ট।
ইরানের সংবিধানে কেবল তিনটি ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে : খ্রিস্টান, ইহুদি ও জরাথ্রুস্ট (অনুচ্ছেদ ১৩)। এই নির্বাচন নৈতিকভাবে অনেকটাই ইচ্ছাকৃত। বাস্তবে ইরান একটি বহুধর্মীয় সমাজ। তিনটি ধর্মের বাইরে বাহাই, মাণ্ডিয়ান ও ইয়ারসান সম্প্রদায় চর্চিত ধর্ম-বিশ্বাসের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অনুসারী রয়েছেন। ইসলামের ভেতরেও সুন্নি মুসলমানদের বড়ো উপস্থিতি আছে। তেহরানে ক্ষুদ্র হলেও একটি শিখ সম্প্রদায় আছে। পাশাপাশি আছে নাস্তিক, সংশয়বাদী ও এমন মানুষ যারা কোনো সংগঠিত ধর্মে নিজেকে যুক্ত করেনি। এই বাস্তবতা দেখায়-যে, ইরান একটি বহুমাত্রিক বিশ্বাসী সমাজ। আর, ঠিক এ-কারণে রাষ্ট্র যদি একক কোনো ধর্মীয় কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আইন ও নীতি নির্ধারণ করে, তবে সেই সমাজের সবার স্বাধীনতা ও সমান মর্যাদা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যরা জীবনের নানা ক্ষেত্রে বৈষম্যের মুখে পড়েন। বিশেষত, বাহাই সম্প্রদায়ের মানুষদের নিয়মিত বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়, অনেকসময় তাদের বাড়িঘর থেকে উচ্ছেদ করা হয়, বিনা অভিযোগে গ্রেপ্তার ও আটক করা হয়, এমনকি কেবল ধর্মীয় বিশ্বাসের অপরাধে কারাগারে পাঠানো হয়। ১৯৯১ সালে ‘বাহাই প্রশ্ন’ নিয়ে সরকারের একটি গোপন নথি ফাঁস হয়েছিল, যেখানে সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির স্বাক্ষর ছিল। সরাসরি নির্মূলের কথা না বললেও, সম্প্রদায়টিকে ধীরে-ধীরে নিশ্চিহ্ন করার নানা কৌশল প্রস্তাব করা হয়েছিল সেখানে; যেমন, তাদের সন্তানদেরকে এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠানো যেখানে কঠোর ইসলামি মতাদর্শ শেখানো হবে;—ইরানের বাইরে তাদের সাংস্কৃতিক শিকড় দুর্বল করে দেওয়া ও গুরুত্বপূর্ণ পেশাগত ক্ষেত্রে তাদের প্রবেশাধিকার বন্ধ রাখা ইত্যাদি।
ধর্মীয় বিশ্বাসের ভিত্তিতে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বৈষম্য কেবল অমুসলিমদের বিরুদ্ধে নয়, তা অন্য মুসলিম মতাবলম্বীদের প্রতিও বিস্তৃত। আর, যেসব ধর্মীয় সংখ্যালঘুকে সংবিধানে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, তারাও শিয়া মুসলমানদের মতো সমান নাগরিক অধিকার ভোগ করেন না। সংবিধানের তৃতীয় অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রের লক্ষ্য হিসেবে ‘ইসলামি ভ্রাতৃত্বের বিস্তার ও শক্তিশালীকরণ’-এর কথা বলা হয়েছে। বাস্তবে এর ফল দাঁড়ায় এমন এক ব্যবস্থায়, যেখানে খ্রিষ্টান, জরাথ্রুস্ট ও ইহুদিরা সমান নাগরিক মর্যাদা পান না। যেমন, সরকারের উচ্চপদগুলো কার্যত শিয়া পুরুষ মুসলমানদের জন্য সংরক্ষিত। কোনো ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্য রাষ্ট্রপতি হতে পারে না। আবার সংখ্যালঘু ধর্মের অনুসারীদেরকে ইসলামি সামাজিক বিধি মেনে চলতে বাধ্য করা হয়, যেমন হিজাব পরিধান বা রমজানকে ঘিরে সামাজিক আচরণবিধি পালন।
এই ধরনের বৈষম্য যে অন্যায্য, তার পক্ষে আলাদা নৈতিক যুক্তি দেওয়া যায়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এসব নীতি ইসলামি প্রজাতন্ত্রের নিজস্ব সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতির সঙ্গেই সাংঘর্ষিক! সংবিধানের তৃতীয় অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে : রাষ্ট্র এমন এক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যেখানে ‘সমস্ত জনগণ তাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ভাগ্য নির্ধারণে অংশ নিতে পারবে।’ একটি বহুধর্মীয় সমাজে যদি রাষ্ট্র পরিচালনার ভিত্তি হিসেবে একক ধর্মীয় বিধান চাপিয়ে দেওয়া হয়, তবে এই অংশগ্রহণ বাস্তবে অসম্ভব হয়ে পড়ে। কারণ, তখন সমাজের বড় একটি অংশ কার্যত জনপরিসর থেকে বাদ পড়ে যায়।
সুতরাং ইরানে যে-ধর্মীয় বৈষম্য দেখা যায়, তাকে যদি কেউ নিছক কাকতালীয় বলে ব্যাখ্যা করতে চান, এবং মনে করেন এর সঙ্গে রাষ্ট্রের ধর্মতান্ত্রিক চরিত্রের কোনো সম্পর্ক নেই, তবে তা হবে অত্যন্ত সরলীকৃত ধারণা। বাস্তবতা দেখায়,—ধর্মনিরপেক্ষতা ধর্মবিরোধী নয়, বরং ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে এটি প্রয়োজনীয়।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে বোঝা যায়, ‘সাম্রাজ্যবাদবিরোধিতা’কে কেন্দ্র করে ইরানে ধর্মনিরপেক্ষতার বিরুদ্ধে যে- পুরোনো বয়ান নির্মিত হয়েছে তা খুব শক্তিশালী নয়। এমন অনেক সমস্যা আছে, যেগুলোর জন্য প্রকৃত সাম্রাজ্যবাদকে সমালোচনা করা হয়, যেমন স্থানীয় মানুষের কণ্ঠকে অগ্রাহ্য করা, ভিন্ন সংস্কৃতিকে অতিরিক্ত সরলীকরণ করা, এবং মৌলিক নাগরিক স্বাধীনতাকে অস্বীকার করা। যারা ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে এক সাহসী প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করেন, তারা শুধু এর বৈদেশিক নীতির বাস্তবতাকেই আড়াল করেন না, বরং ইরানের ভেতর নানা সম্প্রদায়ের দুর্দশাকেও অদৃশ্য করে দেন। এর ফলে তারা অজান্তে চলমান নিপীড়নের পক্ষে এক অগভীর সাফাই গেয়ে বসেন।
এই সাম্রাজ্যবাদবিরোধী যুক্তির ভেতরের দুর্বলতা এখানেই স্পষ্ট : এটি শেষ পর্যন্ত প্রকৃত সাম্রাজ্যবাদী হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে যে-বাস্তব উদ্বেগ থাকা উচিত, তাকে দুর্বল করে দেয়। যেহেতু, সবকিছুকে যখন একই সন্দেহের ভাষায় ব্যাখ্যা করা হয়, তখন আসল সমস্যাগুলো ঝাপসা হয়ে যায়।
যারা ‘গার্বজাদেগি’, অর্থাৎ পশ্চিমভীতি বা পশ্চিম দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার মোহে আবদ্ধ, তাদের প্রয়োজন এই আতঙ্কের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসা। তাদের বুঝতে হবে, পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা করা মাত্রই কোনো শাসনব্যবস্থা নৈতিকভাবে বৈধ হয়ে যায় না। ধারণাটি শেষপর্যন্ত অপরিণত, সরল ও বিপজ্জনক।
. . .
রচনাকার পরিচিতি :
প্যাট্রিক হাসান (Patrick Hassan) যুক্তরাজ্যের ওয়েলসের Cardiff University-র School of English, Communication and Philosophy বিভাগে একজন প্রভাষক। তিনি ২০২২ সালে প্রকাশিত Schopenhauer’s Moral Philosophy গ্রন্থটির সম্পাদক এবং ২০২৩ সালে প্রকাশিত Nietzsche’s Struggle Against Pessimism বইটির লেখক। হুসেইন দাববাগ (Hossein Dabbagh) Northeastern University London-এ প্রয়োগমূলক নৈতিকতা বিষয়ের সহকারী অধ্যাপক। পাশাপাশি তিনি Oxford Department of Continuing Education-র একজন সহযোগী সদস্য। তিনি ২০২২ সালে প্রকাশিত The Moral Epistemology of Intuitionism গ্রন্থটির লেখক।
. . .

লেখক ও অনুবাদক পরিচিতি : এখানে অথবা ওপরের ছবিতে চাপুন
. . .


