পোস্ট শোকেস - সাহিত্যবাসর

ব্লাইন্ড সাবমিশন : জওয়াহের হোসেন

Reading time 13 minute
5
(16)
Painting Constanze Mozart; Image Source: Collected; Credit: Getty Images

দ্য মার্জিনালিয়ান

প্রেমপত্রটি পড়ছি—টলমল করছে অক্ষর।
গরম কফিতে চুমুক দিতে দিতে
শ্বেতধোঁয়ায় তোমার মুখ ভেসে উঠছে।

তোমার মর্ম-বিচ্ছুরিত
ব্যাকুল মুহূর্ত শিহরিত করছে আমায়।

সবুজ ড্যান্ডেলিয়নের পাতায় পাতায়
ঝাঁক ঝাঁক প্রজাপতি উড়ছে।

তোমাকে মনে পড়ছে আজ বারবার—
কনস্টানজে।

আমি আহত মোজার্ট।
. . .

মর্মক্রন্দন

ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছে শব্দহীন সন্ধ্যা।
এমন নিষ্কম্প এখন সময়—আধোনিদ্রা।

শুধু অশ্রুর দাগ লেগে আছে
ব্যথিত শরীরময়।

হয়তো অসংখ্য বিষাদ লেগে আছে
শেষ রাতের ওপারে।

দীর্ঘ শূন্যতার মাঝে তোমাকে
ছুঁতে না-পাওয়ার বেদনা তীব্রতর হচ্ছে।

শুনেছি, আমাকে ছেড়ে যাওয়ার পর
তুমিও ভালো নেই—
জেদি হৃদয়ে আজ শুধু মর্মক্রন্দন ঘিরে।

একঝাঁক মেঘ উড়ে যায়।
. . .

বসন্তে

আমি চেয়ে থাকি
তোমার চলে যাওয়ার পথে।

এই বসন্তে আমি একা।

এই বসন্তে কোনো নতুন ফুল বা পাতা ফুটছে না,
মিশে আছে শুধু উনুনের স্মৃতি।

সবখানে পাতাঝরা দিন,
সব করুণ বিষাদ।

এই বসন্তে সব পাখি একা।

ফুলগুলো সব ঝরে গেছে
এই বসন্তে—
মুষলসন্ধ্যা ঘিরে।

উড়ে উড়ে যাচ্ছে
সব পাখি দূরে দূরে,
অনুক্ত হাওয়া মেখে।

এই বসন্তে—আমি একা চেয়ে আছি
তোমার চলে যাওয়ার পথে।
. . .

Naked Tree waiting for new leaf: Conceptual Collage; Image Source: Collected; BD News 24.com

দগদগে

ক্ষতগুলো সারাতে পারছি না—কিছুতেই না।

জখমগুলো পোড়া;
প্রাচীন কুয়াশা লেগে আছে।

হৃদয় ছাইমাখা,
রক্তগোধূলি ঘিরে।

মন জানে—কার জন্য পুড়ছে হৃদয়,
কার জন্য পুড়ছে জীবন।

এই আগুনগুলো নিভাতে পারছি না,
কিছুতেই না।

ঝলসে যাচ্ছে সব,
বারবার পুড়ে যাচ্ছে পোড়া হাড়।
খুব দগদগে।
. . .

চিঠি, প্রিয় বকুল গাছ

সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার আগে প্রতিদিন আমি বসে থাকতাম
তোমার পাশে।

তুমি সব জানতে—
তবু কোনোদিন বলোনি,
আচমকা একদিন তুমি চলে যাবে
সবকিছু ছিন্ন করে আমাকে ফেলে।

তোমার দেখা পাব বলে
আজও আমি পথে পথে গৃহহারা বাউল।

একবার দেখব বলে
পাগলের মতো পথে পথে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতাম।

আমার সাক্ষী এখন শুধু পথ—
বিশ্বাস করো, পথ ছাড়া আমার কোনো সাক্ষী নেই।

আমার সাক্ষী এখন শুধু সেই বকুলগাছ।
বকুলের মালা ছাড়া আমার আর কোনো সম্বল নেই।

তোমার দেখা পাব বলে
এই নীলাভ আকাশের নিচে
হুরের মতো শুভ্র আভা নেমে আসে—
অথচ তুমি নেই।

আমার তৃষ্ণার ঘোর বেয়ে শুধু তুমি।

তোমার আলতা-পায়ের ছাপ,
কাজল-পড়া থরথর চোখ দুটি ভাসে।

শুধু একবার এসো—
আজ,
এখন,
এই মুহূর্তে।

শুধু একবার,
শুধু শেষবার
তুমি এসো।

তোমার দেখা পাব বলে
আজও গৃহহারা আমি—
গৃহহারা বাউল।
. . .

অস্পর্শ

বলেছিলাম, শরীরে নয়—
বুকের মধ্যে থাকো,
হৃদয়ের ভেতর
আষ্টেপৃষ্ঠে থরথর কাঁপনে থাকো।

তুমি থাকোনি।
আজ অস্পর্শে সব।

আমার গুনগুন গানে,
স্নায়ুভেজা গজলে
শুধু তোমার থাকার কথা।

অবশেষে—
তুমি কোথাও থাকোনি।
. . .

পাঠ অনুভবে “ব্লাইন্ড সাবমিশন : ‘প্রতিভা ও মোজার্ট’
[থার্ড লেন হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ থেকে সংকলিত]

দ্যাট ওয়াজ মোজার্ট

আহা কোনস্টানজে! আহা মোজার্ট! সংগীতের পাগল প্রতিভা! মোজার্টের মতো আউট অব বক্স একখান চরিত্রকে সামলানো যেনতেন ব্যাপার ছিল না। কোনস্টানজের অপুট কাঁধে চাপটি হয়ে উঠেছিল পীড়াদায়ক। মেয়ে তবু তা সামলানোর চেষ্টায় কমতি করেননি।

মোজার্ট তাঁর স্বল্পায়ু জীবনে ইনসেন রীতিমতো! মিউজিক পিসগুলো সারল্যের আরকে চোবানো উন্মাদতুল্য ভাঁড়ামি ছাড়া বেরিয়ে আসত কি-না কে জানে! এমন এক চরিত্র, যে কখন কী করে বসবে তা অনুমান করা যে-কারো পক্ষে কঠিন থেকেছে। একটা জায়গায় মোজার্ট সদা অবিচল থেকেছেন অবশ্য… আর সেটি হলো,—পিয়ানোর সামনে মিউজিক পিস বাজানো অথবা অপেরাগুলো লিখে উঠার ওইসব মুহূর্তে তাঁর মধ্যে ভর করেছে শয়তানতুল্য প্রতিভার স্থিরতা।

মানবধরায় মোজার্ট এক নিষ্পাপ পাপী! নিজ প্রতিভার গভীরতা পরিমাপে যে-কিনা অক্ষম! এটুকু অবশ্য জানা ছিল মনে,—তাঁকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে এমন বাপের বেটা জন্মায়নি ভবে। হেলায় জয় করেছেন সবচুকু, এবং পরক্ষণে নাম-খ্যাতি ছুঁড়ে ফেলে নেমে গেছেন খাদে। কনস্টানজেকে সুতরাং মোজার্টের এসব বালখিল্যতায় তাল মিলাতে হিমশিম খেতে হয়েছে সমানে। মোজার্টের মতো বেপরোয়া ও অনিশ্চিত হয়ে ওঠার নিয়তি তাঁকে তাড়া করেছে বটে,—যে-লোকটি তাঁর আস্তিনের ভাঁজে লুকিয়ে রাখছে সুরের জাদু।

Constanze Mozart; Image Sourec: Collected; 19th-century female portrait

আমার অন্যতম পছন্দের নির্মাতা মিলোস ফোরম্যানকে মনে পড়ছে এইবেলা। মোজোর্টের বায়োপিক আমেদিউস-এ কনস্টানজেকে চমৎকার ধরেছিলেন ফোরম্যান। ছবিতে কনস্টানজে মুখ্য নয় যদিও। মোজার্টের প্রতিভায় ঈর্ষান্বিত ও তাঁর অনিষ্টে তৎপর আরেক গুণী কম্পোজার আন্তোনিও সালিয়েরির মধ্যকার সংঘাতকে ছবিতে উপজীব্য করেছিলেন ফোরম্যান।

রাজ দরবার ও সংগীত পিপাসু শ্রোতামহলে মোজার্টের অশ্লীল প্রতিভার দ্যুতিঠাসা উত্থান নাকি সালিয়েরির সহ্য হয়নি। একদিকে তিনি মোজার্ট বিরচিত মিউজিকের শক্তিকে কোনোভাবে অস্বীকার করতে পারছেন না। মোজার্টের কম্পোজিশনের বড়ো গুণ সহজতা। এমন এক সহজতা,—যেটি কানে ঐশ্বরিক মহিমাজাল বিস্তার করে। শ্রোতাকে গ্রাস করে নিমিষে। নাটকীয়তা সেখানে ওই সহজতার মধ্য থেকে ছিটকে বেরিয়ে আসে।অন্যদিকে, নিজেকে এর পাশে সালিয়েরি দেখতে পাচ্ছেন অসহায় এক কম্পোজার রূপে! এরকম এক-একটি মিউজিক পিস সৃজন করতে পারলে যে-কিনা নিজেকে ধন্য ভেবে হতো বিগলিত।

জীবনীশক্তিকে অবলীলায় অপচয়ের খাতায় ফেলে দেওয়া লোকটি অনায়াসে পিয়ানোর সামনে বসে দানব হয়ে উঠছে! বলা হয়ে থাকে, সালিয়েরিকে ফোরম্যান তাঁর ছবিতে যতটা অতিরঞ্জিত করে দেখিয়েছেন, বাস্তবে তিনি ওই পরিমাণ ডেভিল মাইন্ড ছিলেন না। মোজার্টকে ঈর্ষা করেছেন যথেষ্ট। সুযোগ বুঝে অপদস্থ করার চেষ্টাও করেছেন হয়তো। রাজার অনুকুল্য যেন না পায়, তার সব চেষ্টা করেছেন আড়াল থেকে, কিন্তু তাকে ধ্বংস করে দেওয়ার কোনো অভিপ্রায় তাঁর ছিল না।

সালিয়েরি নিজেও মনে রাখার মতো কম্পোজিশন রেখে গেছেন! আজো তা আমরা শুনে চলেছি। তাঁর বিস্ময় এখানে ছিল,—ঈশ্বর কী কারণে এরকম একটা লোক, যাকে দেখে বিদূষক বলে ভ্রম হয় আগে, সেই লোকটির ভিতরে অপরিমেয় প্রতিভা ঠেসে দিলেন! প্রতিভার কী সীমাহীন অপচয়! সত্যমিথ্যা যাই থাকুক নেপথ্যে, ফোরম্যানের আমেদিউস বারবার দেখার মতো একখান ছবি।

That was Mozart; Amadeus (1984) by Miloš Forman Movie Scene; Source: Lucky Jack YTC

. . .
যুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছে পুনরায়। মারণাস্ত্রের খেলা দেখছি চোখের সামনে। বিষের পেয়ালায় মানুষকে চুমুক দিতে বাধ্য করা হয়েছে;—যখন মোজার্ট ধরায় বিচরণ করতেন। একই পেয়ালা এখনো পান করছে মানুষ। তার কীবা পুব… আর কীবা পশ্চিম! তার মধ্যে এসব ক্যারেক্টার… মোজার্ট, সালিয়েরি, কনস্টানজে… স্বপ্নের মতো লাগে! যেন তাঁরা ধরায় কোনোদিন জন্ম নেয়নি। যেন ধরায় কেউ কোনোদিন মোজার্টের ম্যাজিক ফ্লুট, পিয়ানো সোনাটা, আর শত সিম্ফনিগুলা বাজায়নি কখনো।

স্বল্পায়ু জীবনে ছয় শতাধিক কম্পোজিশন রেখে গেছে এই লোক! ভাব যায়! মোজার্টকে মাঝেমধ্যে বায়বীয় মনে হয়। যেন ধরায় জন্ম নেয়নি কখনো। গায়েব থেকে কেবল নিজের অবিশ্বাস্য পাগলামিভরা মিউজিক নোটগুলো মানুষের জন্য বাজাচ্ছে। আর, কনস্টানজে সেখানে চপলা রমণী। নিষ্পাপ আবেগে বোনা ‍কুহকী! গালে হাত দিয়ে যিনি হয়তো ভাবছেন… এই নারকীয় প্রতিভাকে তিনি কেন ভালোবাসতে গেলেন…! কী তার কারণ!
. . .

মিনহাজ ভাইয়ের মোজার্ট–প্রতিভা নিয়ে আলোচনার সূত্র ধরে একটি অন্যরকম অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হলাম। মোজার্টের প্রতিভা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করতে গিয়ে ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ক্রেগ রাইটের ব্যক্তিগত জীবন ও ভাবনার গতিপথ বদলে গিয়েছিল। সেই অনুসন্ধানের ধারাবাহিকতায় তিনি ইয়েলে ‘জিনিয়াস কোর্স’ চালু করেন। পাশাপাশি ২০২০ সালে লেখেন The Hidden Habits of Genius;—একটি বহুল আলোচিত বই, যা দ্রুতই পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করে (অ্যামাজনের ‘বছরের সেরা বই’-এর তালিকায় জায়গা করে নেয়) এবং ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি ভাষায় ভাষান্তরিতও হয়েছে।

রাইটের গল্প শুরু হয় স্বপ্নভঙ্গ দিয়ে। তিনি প্রথম জীবনে কনসার্ট পিয়ানোবাদক হতে চেয়েছিলেন। অনুশীলন করেছেন অগণিত ঘণ্টা। সুযোগ পেয়েছেন, শিক্ষক পেয়েছেন, শৃঙ্খলাও ছিল। লেখকের ভাষায় : ‘আমি পরিশ্রমী ছিলাম। ২১ বছর বয়সের মধ্যেই, আমার হিসাব অনুযায়ী, আমি ১৫,০০০ ঘণ্টা মনোযোগী অনুশীলন করেছি। (মোজার্টের মাত্র ৬০০০ ঘণ্টা লেগেছিল একজন মহাগুরু সুরকার ও পরিবেশক হয়ে উঠতে)’। কিন্তু একসময় এসে তিনি উপলব্ধি করেন শুধু শ্রম যথেষ্ট নয়। কিছু জন্মগত সংগীত-সংবেদন, অস্বাভাবিক স্মৃতি, মাথার ভেতরে সুর শুনে ফেলার ক্ষমতা… এসবও লাগে। আর সেই বিশেষ সংগীত-প্রতিভা তাঁর ছিল না।

এই স্বীকারোক্তি তাকে ভেঙে দেয়নি, বরং অন্য পথে নিয়ে গেছে। তিনি হার্ভার্ডে গিয়ে সংগীত-ইতিহাসে গবেষণা করেন, পরে ইয়েলে শিক্ষকতা শুরু করলেন। সেখানে এসে মোজার্ট তাঁর কাছে কেবল আবেগ না থেকে গবেষণার বিষয় হয়ে ওঠেন। এই গবেষণা তাঁকে একধরনের গভীর বিস্ময়ের মুখোমুখি দাঁড় করায়। লেখক বর্ণনা করছেন :

১৯৮৪ সালে অস্কারজয়ী চলচ্চিত্র Amadeus মুক্তি পাওয়ার পর আমার আগ্রহ যেন আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ল। কিছু সময়ের জন্য মনে হয়েছিল পুরো পৃথিবীই মজার, আবেগপ্রবণ, দুষ্টু এই চরিত্রটির প্রেমে পড়ে গেছে। একটি সিনেমাই আমার গবেষণার দিক বদলে দিল। আমি মনোযোগ দিলাম মোজার্টের দিকে। তবে হার্ভার্ডে শেখা একটি মূলনীতি সবসময় মনে রেখেছি : সত্য খুঁজতে চাইলে মূল উৎসে যাও। বাকিটা শুধু শোনা কথা।

Craig M. Wright Book: The Hidden Habits of Genius; Image Source: Collected; Google Image

পরবর্তী ২০ বছর ধরে তিনি লাইব্রেরি ঘুরে বেড়িয়েছেন—বার্লিন, সালৎসবুর্গ, ভিয়েনা, ক্রাকভ, প্যারিস, নিউ ইয়র্ক, ওয়াশিংটন। তিনি হাতে নিয়ে দেখেছেন মোজার্টের নিজের হাতে লেখা সুরের পাণ্ডুলিপি। দেখেছেন, মোজার্ট প্রায় কোনো সংশোধন ছাড়া মাথার ভেতর পুরো সুর কল্পনা করে ফেলতে পারতেন;—বিশাল বিশাল সংগীতখণ্ড যেন অনায়াসে জন্ম নিচ্ছে তাঁর চিন্তার মধ্যে! Amadeus ছবিতে সালিয়েরি যা বলেছিলেন : মোজার্টের সুর যেন ‘ঈশ্বরের কণ্ঠ’;—তা আর অতিরঞ্জিত মনে হলো না। রাইট বলছেন :

হাতে যখন আপনি মোজার্টের নিজের লেখা সেই সুরের পৃষ্ঠা ধরেন—সাদা দস্তানা পরে—তখন সেটা একসঙ্গে সম্মান আর উত্তেজনার অভিজ্ঞতা। কলমের কোণ বদলাচ্ছে, স্বরচিহ্নের আকার কখনো বড়, কখনো ছোট, কালির রঙে সূক্ষ্ম ভিন্নতা—সব মিলিয়ে যেন তাঁর মনের ভেতর কাজ করার ছন্দ আপনি দেখতে পাচ্ছেন। মনে হয় যেন আপনি মোজার্টের পড়ার ঘরে ঢুকে পড়েছেন। দেখছেন—এই অসাধারণ মানুষটি, জন্মগত প্রতিভার শক্তিতে ভর করে, এক সৃষ্টিশীল অঞ্চলে প্রবেশ করছেন, আর সুর ঝরে পড়ছে অবিরাম।

রাইট তখন ভাবেন : আর কোনো প্রতিভা কি এভাবে কাজ করতেন? এবারও তাকে টানল মূল পাণ্ডুলিপি। আমাদের মধ্যে লিওনার্দো দা ভিঞ্চির নকশা দেখে মুগ্ধ হয়নি এমন কেউ নেই? যুদ্ধযন্ত্রের স্কেচ, অভিনব যন্ত্রের নকশা, আবার একই সঙ্গে শান্তিবাদী চিত্রকর্ম,—সবকিছু একজন মানুষের মাথা থেকে বেরিয়ে এসেছে। লিওনার্দোর প্রায় ৬০০০ পৃষ্ঠার নোট ও অঙ্কন আজও টিকে আছে। সেগুলোর অনেকগুলো ছাপা সংস্করণে প্রকাশিতও হয়েছে, আর এখন এর অনেক কিছু অনলাইনেও পাওয়া যায়।

মোজার্ট যদি নিজের মাথার ভেতর শুনতে পেতেন সুরটি ঠিক কীভাবে এগোবে, তাহলে লিওনার্দো দা ভিঞ্চির অঙ্কন দেখে বোঝা যায় তিনি মনের চোখে দেখতে পেতেন যন্ত্রটি কীভাবে চলবে বা ছবিটি কেমন হয়ে উঠবে। লিওনার্দোর স্বাভাবিক কারিগরি দক্ষতা তাঁর আঁকায় স্পষ্ট। হাত ও চোখের নিখুঁত সমন্বয়ে অনুপাত ঠিক থাকে, আর সূক্ষ্ম ক্রস-হ্যাচিং রেখা ছবিতে ত্রিমাত্রিক গভীরতা এনে দেয়। মনে হয় যেন কাগজের উপর বস্তুটি শ্বাস নিচ্ছে।

কিন্তু শুধু দক্ষতা নয়, আরও বড়ো কিছু আছে সেখানে। আছে এক অদম্য কৌতূহল। তাঁর নোটবইয়ের পৃষ্ঠা উল্টালে মনে হয় আমরা এমন এক মনের ভেতর ঢুকে পড়েছি, যাঁর আগ্রহের কোনো শেষ নেই। একপাতায় মানুষের হৃৎপিণ্ডের গঠন, পরের মুহূর্তে সেই রেখা রূপ নিচ্ছে গাছের ডালে; তারপর সেই ডাল আবার বদলে যাচ্ছে যান্ত্রিক চক্রের তারের মতো জটিল গঠনে। এই বিচ্ছিন্ন জগতের জিনিসগুলো… হৃদয়, গাছ, যন্ত্র… আসলে কীভাবে একসূত্রে বাঁধা? পৃথিবীর সবকিছু কীভাবে একে অন্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে? লিওনার্দো জানতে চাইতেন। তিনি থামতেন না। এ-কারণে সাংস্কৃতিক ইতিহাসবিদ কেনেথ ক্লার্ক তাঁকে বলেছিলেন ‘ইতিহাসের সবচেয়ে নিরলস কৌতূহলী মানুষ।’ সংগীতে মোজার্ট, শিল্পে লিওনার্দো, তাহলে রাজনীতির জগতে? এখানেও এক অসাধারণ চরিত্র খুব কাছে ছিল,—ইংল্যান্ডের রানি এলিজাবেথ প্রথম। ইয়েলের বেইনেকে রেয়ার বুক অ্যান্ড ম্যানুস্ক্রিপ্ট লাইব্রেরিতে তাঁর শাসনকাল নিয়ে সমসাময়িকদের লেখা প্রায় সব ইতিহাসের কপি আছে।

Leonardo da Vinci’s notebook: The Codex Leicester; Source: Bill Gates YTC

তাঁর সাফল্যের রহস্য কী? এলিজাবেথ বই পড়তেন অদম্য আগ্রহে;—প্রতিদিন প্রায় তিন ঘণ্টা। কিন্তু শুধু বই নয়, মানুষও পড়তেন তিনি। তিনি পড়তেন, শিখতেন, লক্ষ করতেন, আর চুপ থাকতেন। তাঁর নীতিবাক্য ছিল : ‘Video et taceo’—‘আমি দেখি এবং চুপ থাকি।’ সব জানতেন, কম বলতেন। এভাবে প্রায় ৪৫ বছর শাসন করেছেন তিনি। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত গড়েছেন, নবীন পুঁজিবাদী কোম্পানির উত্থানের পথ খুলে দিয়েছেন, আর নিজের নামে একটি যুগের নাম রেখে গেছেন—এলিজাবেথীয় যুগ

রাইট মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছিলেন। কত কিছু শিখছেন! হঠাৎ ভাবলেন : আমি একা শিখব কেন? ছাত্রদের তো সঙ্গে নিয়ে শেখানো যায়। এই তরুণরা শুধু জায়গা ভরিয়ে রাখার জন্য তো নয়! এ-ভাবনা থেকে জন্ম নিল তাঁর কোর্স ‘জিনিয়াসের প্রকৃতি অনুসন্ধান।’ রাইট লেখেন : ‘হয়তো অসাধারণ কৃতিত্ব কীভাবে জন্ম নেয়, তা বিশ্লেষণ করতে একজন অ-প্রতিভারই দরকার হয়।’ হার্ভার্ড আর ইয়েলে দীর্ঘ সময় কাটাতে গিয়ে তিনি অসংখ্য মেধাবী মানুষের সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন। এর মধ্যে অর্ধডজন নোবেলজয়ী আছেন। তাঁর একটি পর্যবেক্ষণ ছিল :

যদি আপনি প্রকৃতির দেওয়া বিরল প্রতিভা নিয়ে জন্ম নেন, তাহলে আপনি কাজটি অনায়াসে করে ফেলতে পারেন; কিন্তু কেন এবং কীভাবে তা সম্ভব হচ্ছে… সে-প্রশ্নটি হয়তো আপনার মাথায় আসে না।

প্রতিভারা যেন এতটাই ব্যস্ত থাকেন নিজের সৃষ্টিশীল কাজ নিয়ে,—সৃষ্টির উৎস নিয়ে ভাবার অবসর পান না। কখনো কখনো বাইরে দাঁড়িয়ে তাঁদেরকে দেখতে থাকা মানুষ সমগ্র দৃশ্য স্পষ্টভাবে দেখতে পায়-যে, কীভাবে জাদুটি ঘটেছিল!

এই প্রশ্ন থেকে ইয়েলে ‘জিনিয়াস কোর্স’। সেখানে তিনি ছাত্রদের সামনে প্রথমে প্রশ্ন ছুড়ে দেন : ‘প্রতিভা কী?’ কোনো একক উত্তর নেই। কেউ বলে জন্মগত ক্ষমতা, কেউ বলে কঠোর পরিশ্রম, কেউ বলে ঈশ্বরপ্রদত্ত দান, কেউ বলে পরিবেশ। প্লেটো থেকে শেক্সপিয়ার, ডারউইন থেকে বেভোয়ার… সবাই প্রতিভার ভিন্ন ভিন্ন দিক দেখিয়েছেন, কিন্তু কেউ চূড়ান্ত সংজ্ঞা দেননি। তবু ছাত্রদের আলোচনার মধ্য দিয়ে একটি ধারণা পরিষ্কার হয় : প্রতিভা এমন একজন ব্যক্তি, যার মৌলিক কাজ বা অন্তর্দৃষ্টি সমাজকে উল্লেখযোগ্যভাবে বদলে দেয়;—ভালো বা মন্দ যেভাবেই হোক, সময় ও সংস্কৃতিকে তা অতিক্রম করে।

The Habits of Genius: Are You One?; Source: Yale Alumni Academy YTC

রাইট এটিকে সহজ করে কার্যকর কাঠামোয় আনেন : G = S × N × D. অর্থাৎ, প্রতিভা (G) = প্রভাবের গুরুত্ব (Significance) × যাদের উপর প্রভাব পড়েছে তাদের সংখ্যা (Number) × সেই প্রভাবের স্থায়িত্বকাল (Duration) উদাহরণ? অ্যালেকজান্ডার ফ্লেমিংয়ের পেনিসিলিন কোটি কোটি মানুষের জীবন বাঁচিয়েছে। জনস্বাস্থ্যে এর-যে-প্রভাব তার গুরুত্ব বিশাল। অন্যদিকে, কোনো জনপ্রিয় ফ্যাশন ব্র্যান্ডের নতুন জুতা হয়তো হাজার হাজার জোড়া বিক্রি হয়েছে, কিন্তু এর প্রভাব কতদিন স্থায়ী? এটি নিখুঁত সূত্র নয়, তবু আলোচনার জন্য একটি কার্যকর কাঠামো। এই সূত্র আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পেনিসিলিন আর সাময়িক ফ্যাশন এক নয়। এখানে আরেক প্রশ্ন ওঠে : যদি কেউ বড়ো কোনো কাজ করে, কিন্তু সমাজ তা গ্রহণ না করে, তখন কী ঘটে আসলে? আইনস্টাইন যদি নির্জন দ্বীপে থাকতেন, কী হতো তাহলে? এখানেই রাইটের গুরুত্বপূর্ণ উপলব্ধি : প্রতিভা একা ঘটে না। একজন মৌলিক চিন্তক ও একটি গ্রহণ-সক্ষম সমাজ… উভয়ে মিলনে সৃষ্টিশীলতা কার্যকর হয়।

রাইট এও দেখতে পেলেন প্রতিভা নামধারী ধারণার ভেতর পক্ষপাত রয়েছে। পশ্চিমে ‘মহান ব্যক্তি’র গল্পটি প্রবল; কিন্তু নেটিভ আমেরিকান শিক্ষার্থীরা তাঁকে শেখায় : ‘সম্প্রদায়ের প্রতিভা’ বলে কিছু আছে। এক অচেনা নারী গালিচার নকশা তৈরি করেছেন; প্রজন্ম ধরে তা টিকে আছে;—নাম নেই, তবু প্রতিভার ছাপ সেখানে মুদ্রিত। রাইট বলছেন : ‘একবার এক অলিম্পিক পদকজয়ী শিক্ষার্থী ক্লাসে ছিল। সে বলেছিল : তার সাফল্য জন্মগত ক্ষমতার ফলাফল। কিন্তু পরে জানায়, তার চীনা মা মনে করেন : সবটাই কঠোর পরিশ্রমের ফসল।’

চীনা শিক্ষার্থীদের কয়েকজন আলাদাভাবে তাঁকে বলেছিল, থমাস এডিসন আজও তাদের দেশে অত্যন্ত সম্মানিত। কারণ তাঁর সেই বিখ্যাত উক্তি : ‘প্রতিভা এক শতাংশ অনুপ্রেরণা, নিরানব্বই শতাংশ পরিশ্রম।’ অন্যদিকে নিকোলা টেসলা, যিনি এডিসনের অ-বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিকে তুচ্ছ জ্ঞান করতেন, চীনে অতটা পরিচিত ও সমাদৃত নন।

একজন জাপানি শিক্ষার্থী তাঁকে তার দেশের একটি প্রবাদ বলেছিল : ‘যে-পেরেক সবচেয়ে বেশি উঁচু হয়, তাকে সবচেয়ে জোরে পেটানো হয়।’ একধরনের ‘অ্যান্টি-জিনিয়াস’ বাণী। অনেক এশীয় শিক্ষার্থী পশ্চিমা প্রতিভা বিষয়ক ধারণা নিয়ে গভীর কৌতূহল প্রকাশ করত। তাদের কাছে একক কোনো ব্যক্তি পৃথিবী বদলে দেয় এই ধারণা ছিল নতুন। ধীরে ধীরে রাইট বুঝতে শুরু করলেন প্রতিভা আসলে সাংস্কৃতিক বিষয় বটে! অর্থাৎ, প্রতিভা নামক ধারণার ইতিহাস রয়েছে; একটি ভূগোল রয়েছে; ক্ষমতা-সম্পর্কও আছে সেখানে। সময়ের সাথে রাইটের চিন্তায় পরিবর্তন আসে। তিনি লেখেন :

প্রতিভা কোনো চিরস্থায়ী, আকাশে ঝুলে থাকা সত্য নয়। এটি মানুষের তৈরি একটি ধারণা, যা সময়, স্থান আর সংস্কৃতির ওপর নির্ভর করে। প্রতিভা আপেক্ষিকও বটে। কেউ কেউ অন্যদের চেয়ে পৃথিবীকে বেশি বদলে দেয়—এই-যা তফাত সেখানে।

প্রতিভা মানে তাই একধরনের অসমতা। একদিকে সৃষ্টির অসমতা : আইনস্টাইনের চিন্তা; বাখের সুর… দুটোই অসাধারণ ও বিরল। অন্যদিকে পুরস্কারের অসমতা : বাখের চিরস্থায়ী খ্যাতি, জেফ বেজোসের বিপুল সম্পদ। পৃথিবী এভোবে কাজ করে। আর, প্রায়ই দেখা যায়, প্রতিভা সৃষ্ট কাজের সঙ্গে ধ্বংস জড়িয়ে থাকে। আমরা তাকে বলছি ‘অগ্রগতি’। কোন জিনিসটি প্রতিভার পরিমাপক বা কোনটা নয়?

উচ্চ আইকিউ কি প্রতিভার পরিমাপক? উত্তর হলো : আইকিউয়ের মূল্য অতিরঞ্জিত। অন্যান্য মানক পরীক্ষা, নাম্বার, আইভি লিগ বিশ্ববিদ্যালয়, বিখ্যাত পরামর্শদাতা… এসবের একটিও প্রতিভার সংজ্ঞা নির্ধারণে চূড়ান্ত কোনো মানদণ্ড নয়। স্টিফেন হকিং আট বছর বয়স পর্যন্ত পড়তেই পারতেন না। পিকাসো আর বেথোভেন সাধারণ গণিতে কাঁচা ছিলেন। জ্যাক মা, জন লেনন, থমাস এডিসন, উইনস্টন চার্চিল, ওয়াল্ট ডিজনি, চার্লস ডারউইন, উইলিয়াম ফকনার, স্টিভ জবস… সবাই পড়াশোনায় পিছিয়ে থেকেছেন গোড়ায়।

The Genius of Dostoevsky: Why Foolishness is Key to Happiness; Source: Drawn Psyche YTC

রাইট আরও একটি অস্বস্তিকর সত্য সামনে আনেন, প্রতিভা মানেই নৈতিক মহত্ত্ব নয়। অনেক মহান মস্তিষ্ক ব্যক্তিগত জীবনে কঠিন, আত্মকেন্দ্রিক, সম্পর্কভঙ্গকারী। প্রতিভা অসমতা তৈরি করে সৃষ্টিতে, পুরস্কারে ও প্রভাবে। একজন শিক্ষার্থীর প্রসঙ্গ টানছেন রাইট তাঁর বয়ানে, সে তাঁকে বলেছিল :

শুরুতে ভেবেছিলাম প্রতিভাবান হতে চাই। এখন নিশ্চিত নই। এদের অনেকেই ভীষণ আবেগপ্রবণ, আত্মকেন্দ্রিক, খিটখিটে;—বন্ধু বা সহবাসী হিসেবে এদের সঙ্গ আমি চাইতাম বলে মনে হয় না।

বক্তব্যটি মনে ধরার মতো। আসক্ত, আত্মকেন্দ্রিক—হয়তো সত্য। চার্লস ডিকেন্সের মেয়ে কেটি স্মরণ করেছিলেন : ‘আমার বাবা যেন উন্মাদ ছিলেন! আমাদের কার কী হলো, তাতে তাঁর কিছু যায়-আসে না। আমাদের বাড়ির দুঃখ-দুর্দশার সীমা ছিল না।’ এরনেস্ট হেমিংওয়ের তৃতীয় স্ত্রী মার্থা গেলহর্ন বলেছিলেন : ‘একজন মানুষকে খুব বড়ো প্রতিভা হতে হয়, যদি সে এত অসহ্য মানুষ হয়।’ স্টিভ জবসের জীবনীকার ওয়াল্টার আইজ্যাকসন তাঁর আচরণের জন্য আলাদা সূচিপত্র বানিয়েছিলেন ‘অপমানজনক আচরণ’ শিরোনামে। মারি কুরির মেয়েও লিখছেন : ‘তাঁর মা প্রায়ই ল্যাবরেটরিতে ব্যস্ত থাকতেন; দাদাই ছিলেন তাদের সঙ্গী। শৈশব খুব সুখের ছিল না।’

এখানে তিনি প্রতিভাকে অলৌকিকতা থেকে নামিয়ে আনেন অভ্যাসে। আইকিউ নয়, কৌতূহল। হঠাৎ অনুপ্রেরণা নয়, দীর্ঘ প্রস্তুতি। শিশুসুলভ কল্পনা, মানসিক শিথিলতা, একাগ্রতা, আবেশ, নিয়মিত উৎপাদন… এসব হলো ‘গোপন অভ্যাস’। বাখের সাপ্তাহিক ক্যান্টাটা, মোজার্টের বিপুল রচনা, এডিসনের হাজার পেটেন্ট… প্রতিভা কেবল ঝলক নয়, ধারাবাহিক উৎপাদনশীলতা।

এই বিশ্লেষণের শেষে রাইট যে-উপলব্ধিতে পৌঁছান তা হলো : প্রতিভা কোনো স্থির, চিরন্তন, সর্বজনীন ধারণা নয়। এটি সময়, সংস্কৃতি ও সামাজিক স্বীকৃতির সঙ্গে বদলায়। তবু আধুনিক অর্থে প্রতিভা মানে মৌলিকতা, এমন অন্তর্দৃষ্টি যা সমাজে বাস্তব পরিবর্তন আনে।
. . .

প্রতিভা : মস্তিষ্কের জটিল ধাঁধা

প্রতিভা নিয়ে রাইটের গবেষণা ও পর্যবেক্ষণ বেশ চমকপ্রদ জাভেদ। এমন নয় উনি নতুন কিছু বলছেন। এমন কোনো থিয়োরি ধরিয়ে দিচ্ছেন, যেটি প্রতিভার ব্যাপারে যুগ-যুগ ধরে নানা মুনির বিচিত্র মতামত থেকে আলাদা কিছু। রাইটের কামিয়াবি এখানে,—ইতোমধ্যে প্রচলিত মতামত ও ধারণাগুলোকে তিনি চমৎকারভাবে সন্নিবেশিত করেছেন তাঁর পর্যবেক্ষণে। এর থেকে প্রতিভার সুফল ও বিড়ম্বনা উভয় দিক আমাদের ধরতে সহজ হয়।

কোনো প্রমাণ দিতে পারব না, তবে আমার কেন জানি মনে হয়, টমাস আলভা এডিসন ওই-যে এক শতাংশের উপমাটি ব্যবহার করেছিলেন, এটি আসলে পার্থক্য গড়ে দেয়। আইনস্টাইন মারা যাওয়ার পর তাঁর মস্তিষ্ক আলাদাভাবে সংরক্ষণের কাহিনি আমরা জানি। গবেষকরা বুঝে উঠতে চেয়েছিলেন, কী সেই রহস্য যার বরাতে আইনস্টাইন সাধারণ ও বিশেষ আপেক্ষিকতাবাদের মতো থিয়োরি হাজির করে আমাদের ভাবনার জগৎটি আমূল পালটে দিলেন।

গবেষণায় এটি জানা গেল, মানব মস্তিষ্কের যে-অংশগুলো কল্পনা ও বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষে অবদান রাখে, আইনস্টাইনের ক্ষেত্রে উক্ত অঞ্চলগুলোর মধ্যে সংযোগ ঘটানোর ক্ষমতা অত্যন্ত শক্তিশালীভাবে কার্যকর থেকেছে। যেমন, মস্তিষ্কের নিও কর্টেক্স অঞ্চলটি যৌক্তিক, বিশ্লেষণী ও উদ্ভাবনী কল্পনাশক্তি বৃদ্ধিতে জোরালো ভূমিকা রাখে। আইনস্টাইনের মস্তিষ্কে হিপ্পোক্যাম্পাসের ডান দিকের নিউরনগুলো তুলনামূলক বড়ো বলে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হয়েছিলেন। যেগুলো আবার নিওকর্টেক্সের তুলনামূলক ছোট নিউরনকোষের সঙ্গে সংযোগ ঘটাতে ভীষণ কামিয়াব থেকেছে।

আাইনস্টাইনের চিন্তা ও উদ্ভাবনা মানে কিন্তু শুরুতে আলো নিয়ে প্রচলিত থিয়োরিগুলোকে আমলে নিয়েছে। তারপর সেগুলোর ওপর নিজের কল্পনাশক্তি খাটিয়েছেন তিনি। সেখান থেকে পরে গিয়েছেন যুক্ত নির্মাণে। যা চূড়ান্ত পরিণতি পেয়েছিল গাণিতিক মডেলে। সুতরাং এডিসনের রূপকার্থে বলা এক শতাংশে এমন কিছু রসায়ন নিহিত, যেটি প্রতিভার নজির হয়ে দাঁড়ায়।

মোজার্টের ক্ষেত্রে যেমন এটি সুরের প্রতিভাকে বের করে এনেছিল। মিউজিক নোট রচনার আগে তাঁর মাথায় পুরো সুর এসে যাচ্ছে! তাও এমনসব কম্পোজিশন, যেগুলো লেন্থের দিক থেকে বড়ো। কোনো কাটাছেঁড়ায় না গিয়ে হয়তো এরকম অনেক সুর তৈরি করেছেন মোজার্ট! যেটি আবার ধরেন, বেচারা রাইট ১৫০০০ ঘণ্টা সুরের অনুশীলন করেও রপ্ত করতে পারেননি। তাঁর মস্তিষ্কের নিউরন ফায়ারিং মোজার্টের মতো সুর মাথায় আগে নিতে পারছে না। কেন পারছে না, এর উত্তর মস্তিষ্কবিজ্ঞান হয়তো দূর ভবিষ্যতে দিতে পারবে বলে ধারণা করি। যেখানে হয়তো নিউরন কণার রহস্যময় আচরণ কাজ করে, যেটি আমরা বুঝতে অক্ষম এখনো।

How Einstein’s Unique Brain Made Him Smarter; Source: Newsthink YTC

প্রশ্ন হলো, ওই এক শতাংশে ভর দিয়ে কি মোজার্ট সুর বসাতেন কেবল? তা কিন্তু নয়। প্রতিটি কম্পোজিশনকে বাস্তব করে তুলতে তাঁকে খাটতে হয়েছিল ম্যালা! এই খাটনিকে আমরা একাগ্রতা ও ধ্যান বলতে পারি। যে-মুহূর্তে কম্পোজিশনে বসছেন, নিজের ভিতরে ডুবে যাচ্ছেন মোজার্ট। তাঁর সত্তা সমাজে বিচরণ করছে ঠিকই, কিন্তু সুর সৃজনের বিশেষ সময়ে সমাজ থেকে তাঁকে বিচ্ছিন্নও করছে। প্রতিভার পয়লা নিয়তি হচ্ছে সমাজে বাস করেও সমাজ থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন বা এলিয়েনেটেড হওয়া তার ক্ষেত্রে অনিবার্য।

প্রতিভাবানের মধ্যে যেসব অসামঞ্জস্য আমরা অহরহ দেখি, তার কার্যকারণ মনে হচ্ছে মস্তিষ্কের নিউরনকোষের মধ্যকার আন্তঃসংযোগ ও আদান-প্রদানের ওপর বহুলভাবে নির্ভরশীল। এক-একজনের ক্ষেত্রে তা এক-একভাবে কাজ করে। উপরন্তু, সমাজ ও পরিপার্শ্ব ইত্যাদি তো আছেই।

প্রতিভা থাকলেই সুতরাং কাজ হচ্ছে না। একে শান দিতে হয়। একধরনের নিমজ্জন ছাড়া যা আসলে সফল হয় না। যে-কারণে প্রতিভাবান মাত্রই শোপেনহাওয়ারের শর্ত মেনে বিচ্ছিন্ন সত্তা। আমরা বলি বটে, প্রতিভা ঈশ্বরের দান;—এখন তা ঈশ্বর অথবা মা-প্রকৃতি… যার কারণে ব্যক্তির মধ্যে দেখা দিক, এর পেছনে লেগে থাকা ডুবে থাকা ধ্যানস্থ হওয়া ছাড়া এটি অনুশীলিত সোনা হয় না। শোপেনহাওয়ার অবশ্য প্রতিভা বলতে চিন্তা, মনন ও কল্পনাশক্তিতে প্রখর ব্যক্তির কথা বলছেন, যার তুলনায় বাকিরা পিছিয়ে, এবং যে-কারণে প্রতিভাবানের সঙ্গে তাদের সংযোগ ঠিক সুস্থির নয়।

অনামা সামাজিক প্রতিভার প্রসঙ্গ রাইট টেনেছেন। এটি আসলেও গুরুত্বপূর্ণ। যেমন ধরেন, পার্সিয়ান কার্পেটের নকশা কিংবা মহাভারত-এর মতো অতিকায় সাহিত্য কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিপ্রতিভার বিষয় নয়। এখানে সম্মিলিত সৃজনের আভাস আমরা পাচ্ছি, যেটি হয়তো কয়েক শতাব্দী ধরে চলমান ছিল, তারপর স্থিরতা লাভ করেছে। লোকসংস্কৃতি মূলত সম্মিলিত প্রতিভার ফসল। বহু লোকের মেধা, মনন ও কল্পনাশক্তি একটি রীতি তৈরি করেছে, যার ওপর চলেছে অবিরাম সংযোজন ও ঘষাঁমাজার কাজ।

যাইহোক, রাইটের আলোচনা উপভোগ্য। তিনি সিদ্ধান্ত না টেনে বরং প্রতিভার মতো জটিল ধাঁধার উৎসগুলোকে একত্রিত করেছেন। সবই মগজের খেলা! এবং খেলাটি এ-কারণে সম্মোহন ও মুগ্ধতা তৈরি করে,—একজন যেটি অবলীলায় করে ফেলছে, বাকিরা তা পারে না। তার নিউরন ফায়ারিং অতটা সুগঠিত যোগাযোগ গড়ে তুলতে বিফল সেখানে। আর সেটি পারতে হলে ছাড়তে হয় অনেকখানি।

সমাজে থেকেও সমাজে না থাকার মতো, কোলাহল ও সামাজিকতায় বিচরণে বাধ্য হয়েও মোক্ষম মুহূর্তে সেখান থেকে সটকে পড়া, এবং বিবিধ ক্লেশ সইতে পারা ছাড়া প্রতিভা চমকায় না। যেখানে, প্রতিভাবান নামে বিদিত ব্যক্তিটি নিজের সৃষ্টিকে কতটা উপভোগ করে শেষতক… এ-প্রশ্নটি থাকে বৈকি। সাফারিং ছাড়া প্রতিভার ষোলআনা সম্ভবত খাদহীন সোনা হয় না। এই জায়গায় শোপেনহাওয়ার সঠিক নিদান হেঁকে গেছেন বৈকি।
. . .

The Psychology of a GENIUS: Schopenhauer; Source: PhiloNautica YTC

. . .

লেখক পরিচয় : ওপরের ছবি অথবা এখানে চাপুন

. . .

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 16

No votes so far! Be the first to rate this post.

Contributor@thirdlanespace.com কর্তৃক স্বত্ব সংরক্ষিত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *