ব্রিজিত বার্দো বললেই সবার আগে অ্যান্ড গড ক্রিয়েটেড ওম্যান-এ শিরোনামবন্দি সিনেমাটি মনে ভাসে। ফরাসি পরিচালক রজার ভাদিমের ক্যামেরাবন্দি ছবিখানা বাদ দিলে ফরাসি সুন্দরীর সাকুল্যে দুই-তিনখান সিনেমা দেখেছি জীবনে। অ্যান্ড গড ক্রিয়েটেড ওম্যান দিয়ে সম্ভবত রঙিন পর্দায় প্রথম ভূকম্পন তুলেছিলেন যৌনদেবী। প্রণম্য সিনেমাকার জঁ-লুক গদারের মগজাস্ত্র থেকে ছিটকে বেরুনো লে মেপরিস (অবমাননা) তার মধ্যে বিশেষ। গদার কি পরে তাঁকে নিয়ে কাজ করেছিলেন? মনে পড়ছে না।
আনা কারিনাকে পেয়ে যাওয়ার পর সম্ভবত ব্রিজিত বার্দোকে আর অপরিহার্য ভাবেননি নবতরঙ্গের পুরোধা সেনাপতি। তাতে অবশ্য বার্দোর নামযশে একটুও আটকায়নি কিছু। সৌন্দর্য আর যৌন-আবেদনে এতটাই সম্মোহক ছিলেন,—বাংলাদেশের খবরের কাগজ ও সিনে ম্যাগাজিনে তাঁকে নিয়ে রঙিলা কেচ্ছা হামেশা চোখে পড়ত ছেলেবেলায়। কচিকাঁচা থেকে বালেগ হওয়ার দিনকালে যেসব সিনেতারকা সেনসেশন গণ্য হচ্ছিলেন, সেখানে বার্দোর নামখানা অকাট্য হয়ে উঠেছিল।
প্রেম-পরিণয়-বিচ্ছেদের গৎবাঁধা গল্পগাছা ছাপিয়ে পরিবেশ ও বন্যপ্রাণী সুরক্ষায় ব্রিজিত বার্দোর বিচিত্র কর্মকাণ্ডের খবর নিয়ম করে ছাপত কাগজগুলো। সঙ্গে জুড়ে দিতো সুন্দরের দেবীকে দেখে ফিদা হওয়ার মতো এক-একখান ছবি। ফার কোট পরিহিত অথবা স্বল্পবসনা… রকমারি ছবিতে বোঝাই কাগজে বার্দোর মুখশ্রী ও দেহের ভাঁজে সংগোপন ঝড় খবরের শিরোনাম ও ভিতরে বর্ণিত সিরিয়াস বিষয়কে লঘু করে দিতো! ট্রাজেডিই মানতে হবে একে!

গৃহপালিত ও বন্যপ্রাণীদের সুরক্ষায় তিনি এই-যে এতটা মরিয়া ও নিবেদিত আছেন, ঠোঁটকাটা হতে দ্বিধা নেই কোনো, এবং সেখানে তাঁর এই সক্রিয়তার অপরিসীম গুরুত্বকে পাত্তা দেওয়ার বদলে কাগজ ও ম্যাগাজিনের পাতা উলটে তাঁকে দেখা ও দেখতেই থাকার ঘটনা গুরুতর হয়ে দাঁড়াত। আমাদের মতো অকালপক্কদের জন্য ফরাসি সুন্দরী ছিলেন সাক্ষাৎ যৌনদেবী! ঈশ্বর তাঁকে যত্ন করে গড়েছেন, এবং কাগজওয়ালারা অতিশয় বেমানান হেডলাইনে এখন তাঁকে অপ্রাসঙ্গিক জুড়ছে হামেশা।
বার্দো হয়তো এরকম কিছু ঘটুক তা কখনো আশা করেননি। পশুপাখির বেঁচে থাকার মরণপণ অধিকার আদায়ের লড়াইয়ের খবর জানানোর বাহানায় তাঁকে এভাবে কাগজে জুড়ে দেওয়া তাঁকে হয়তো আহত করেছে ভিতরে। সমস্যা হলো, এখানে এর প্রতিবাদ করে লাভ হতো না কিছু। বিশ্বজুড়ে মানুষ খবরটি পড়ছে এই প্রলোভনে-যে,—বার্দোকে তারা দেখতে পাচ্ছে কাগজের পাতায়। চিরাচরিত সুন্দরের দেবী;—যাঁর আবেদনঘন আঁখি, ওষ্ঠ ও মুখশ্রী নবীন অরণ্যের মতো সতেজ।
এখন মনে হয়,—ব্রিজিত বার্দো ও জগতের ওইসব অবলা জীব… তাঁরা দুজনে কাগজওয়ালাদের পাল্লায় একযোগে অরক্ষিত ছিলেন। যেখানে, আমাদের মতো ইঁচড়েপাকাদের মাথাফাথা ঘুরিয়ে দিয়ে কাগজের কাটতি বাড়ানোর মতলবে দুজনকে গিনিপিগ বানিয়েছে হরহামেশা।
কী আশ্চর্য! রুপালি পর্দা থেকে বেশ দ্রুত সটকে পড়ার দিন যবে এলো, ব্রিজিত বার্দোকে নিয়ে তরতাজা আগ্রহ উবে গেল কাগজওয়ালাদের! তাঁকে নিয়ে খবর ছাপানোয় ভাটা নামল তাৎক্ষণিক। পরে আর খুব একটা খবরের শিরোনাম হতে তাঁকে দেখা যায়নি অনেকদিন! কাগজওয়ালারা ততদিনে নতুন দেবী খুঁজে নিয়েছে। কলম-টেপরেকর্ডার আর ক্যামেরা হাতে বেচারিকে তাড়া করছে রীতিমতো। অগত্যা… মার্চেলো মাস্ত্রোয়ানি, সোফিয়া লোরেন কিংবা অড্রে হেপবার্নের মতো ব্রিজিত বার্দোও ক্রমশ ঝাপসা হতে থাকলেন স্মৃতির রেখায়।

বার্দো সেই যুগপর্বের তারকা, যখন ফরাসি ও ইতালিতে বনতে থাকা সিনেমার সর্বগ্রাসী দাপট পঞ্চাশ থেকে আশির দশক পর্যন্ত বিশ্ব মাতিয়ে রেখেছিল। ফেদেরিকো ফেলিনি, মিকেলাঞ্জেলো আন্তোনিওনি, সার্জিও লিওন, ফ্রান্সিস ফোর্ড কপোলা, বেরনার্দো বেরতোলুচ্চিরা নাই তো কী হয়েছে, হলিউডে ইতালি সিনেমাকারদের দাপটের রেশ কিন্তু এখনো বইছেন প্রায় আশির কোঠা ছাড়িয়ে যাওয়া মার্টিন স্কোরসেজি, কোয়েন্টিন ট্যারান্টিনোর মতো জহুরি নির্মাতারা। সেখানে, ফরাসি নবতরঙ্গের পুরোহিতদের মধ্যে ফ্রঁসোয়া ত্রুফো, লুই মালে থেকে একালে মিশেল গন্ড্রিরা হলিউডে ছবি বানালেও, গদার ওদিকপানে বড়ো একটা হাঁটেননি। সিনেমা বানানোর কলাকৌশলে হলিউডকে ভীষণভাবে প্রভাবিত করলেও, তাঁর নীতিগত ও রাজনৈতিক অবস্থানের জায়গা থেকে এই পথ গদারের কাছে অমোঘ হয়ে ওঠেনি। হলিউডে তিনি স্রেফ যাননি বলা চলে। ত্রুফোর যাওয়াকে বরং বাণ হেনেছিলেন তখন।
নবতরঙ্গের যুগপর্বে ফরাসিরা এতটাই স্বনির্ভর ও স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিলেন, দরকার পড়েনি বিশেষ। যারপরনাই ফরাসি তারকরাও কম পাড়ি দিয়েছেন হলিউড। বার্দো অবশ্য শুরু থেকে গিয়েছেন। রজার ভাদিমের অ্যান্ড গড ক্রিয়েটেড ওম্যান-এর প্রথম সংস্করণে ফরাসি আবেদন বজায় থাকলেও, রিমেকটা আমেরিকান কালচারে বোঝাই বলা যায়;—যেখানে ফরাসি বার্দো যথাবিহিত ছড়িয়েছিলেন (অথবা ব্যবহৃত হয়েছিলেন) ফরাসি শ্যানেল ফাইভে মার্কিনি মাদকতা।
বার্দো ধরেই নিয়েছিলেন,—হলিউড তাঁকে আপনা করবে। খুব-যে সুবিধা করতে পেরেছেন তখন, তা কিন্তু বলা যাচ্ছে না। ছবি করেছেন অনেকগুলো, তবে হলিউডি নায়িকা-ছকে নিজেকে অপ্রতিরোধ্য করা সম্ভব হয়নি। বার্দো বরং ঘুরেফিরে ফরাসি সৌরভ আর ইতালিতে সক্রিয় বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আন্দোলনে আরো বেশি তৎপর হয়ে ওঠেন। নারীবাদী ও মুসলমান অভিবাসীদের ব্যাপারে মন্তব্যের জন্য বিতর্কের ঝড় তাঁকে সামলাতে হয়েছে পরে। প্রবীণা তারকা তথাপি ব্যক্তিত্বের স্বকীয় সৌরভ ও সৌন্দর্যে যথারীতি অটুট ছিলেন।

সব মিলিয়ে একটি লিগ্যাসি তিনি গড়েপিটে নিয়েছিলেন। বিশ্বমাতানো ক্রেজ এমনকি আশির দশকেও বেশ তরতাজা ছিল। গতকাল এর সবটা সাঙ্গ করে চোখ মুদলেন যৌনদেবী। একানব্বই বছর দীর্ঘ… অতিদীর্ঘ… ব্রিজিত বার্দোর জন্য অবশ্যই। যেহেতু, সুন্দরের দেবীকে ঈশ্বর সৃষ্টি করেন,—যেন তাঁর বিরুদ্ধে তারা বিদ্রোহ ঘোষণা করতে পারে ধরায়। গদার হয়তো সেটি ধরতেই বার্দোকে নিয়েছিলেন লে মেপরিসে । যেখানে তাঁকে আমরা বলতে শুনি : We must rebel when we are trapped by conventions.
ব্রিজিত বার্দোর অতুল সৌন্দর্য কি তবে ফাঁদ ছিল তাঁর জন্য? আর, এ-কারণে মানবধরায় তিনি ঈশ্বরের প্রতিপক্ষ? হতেও পারে। বার্দো কি তা টের পেয়ে সিনেমার রূপালি পর্দা থেকে নিজেকে দ্রুত গুটিয়ে নিতে শুরু করেছিলেন তখন? হয়তো…! আপাতত ওসব কথা থাক। তাঁকে বরং জানাই বিদায় :
বিদায় হে সৌন্দর্যের সুরভীতে অমলিন যৌনদেবী। আপনি স্মরণে থাকছেন স্মৃতিকাতর ঈশ্বরী হয়ে;—যাঁকে দেখে আমাদের বালকমনেও জেগে উঠত যৌন ভারাতুর বিষাদের বিস্ফার।
. . .

. . .



