পোস্ট শোকেস - সাহিত্যবাসর

কবিতা অন্ধপাখি ও কবির আত্মস্বীকৃতি : ফজলুুররহমান বাবুল

Reading time 9 minute
5
(22)

শব্দের অধিক দ্রুততম
পৌঁছে যাচ্ছি স্তব্ধ তারায়
পৌঁছে যাচ্ছি স্তব্ধ তারায়

কোন সে কবি
ভাঙা খঞ্জর হতে মূর্ছনা কুড়িয়েছো!
ধ্যানের ধরণীতে
কোন সে দরিয়া ভয়ার্ত…
শুধু পাড়ি দিতে জানে কবিতা ও অন্ধপাখি
কবিতা ও অন্ধপাখি।

—দেলোয়ার হোসেন মঞ্জু

Poetry Quote: Collage; Delower Hossain Monju; Image Source: Collected; @thirdlanespace.com

তাঁর ধারণা অনুযায়ী, আধুনিক কবিতা কেবল রূপক বা আবেগের খেলা নয়; এটি এক অভিজ্ঞতার এবং জ্ঞানের কেন্দ্র থেকে উদ্ভূত অলৌকিক ক্রিয়া, যা পাঠককে কেবল বুঝতে নয়, অনুভব করতে বাধ্য করে, এবং মানবঅস্তিত্বের সীমা, মৃত্যু ও আত্মার অসংগতি চিহ্নিত করে। কবি মহাশূন্যে নিজের প্রশ্নবিদ্ধ সত্তা উড়িয়ে দেন, প্রকৃতি, প্রাণমণ্ডল এবং নৈমিত্তিক জীবনের ঘটনাকে সমান্তরালভাবে কাজে লাগিয়ে নিজেকে এবং বিশ্বকে পুনর্নির্মাণ ও পরীক্ষা করেন। তিনি কবিকে রাষ্ট্র, ধর্ম, প্রথা, অর্থনীতি ও সমাজের সঙ্গে দ্বন্দ্বমুখী অবস্থানে দাঁড় করন—যা আধুনিক কাব্যের বিদ্রোহী, চিন্তাশীল ও আত্মচিন্তাশীল দিককে স্পষ্ট করে। তিনি রাত-গভীরে তাঁর কোনও কোনও বন্ধুদের টেলিফোনে নিজের কবিতা শোনাতেন। মৃত্যুর পরেও কবিতা লেখার অভীপ্সা ছিল তাঁর (‘আমি যেন কবিতা লিখি মৃত্যুর পরে’, দ্র. ‘কবিতা ও অন্ধপাখি’; সাপ ও সূর্যমুখী)। তিনি দেলোয়ার হোসেন মঞ্জু (১৯৭০-২০১৮)। ‘গেওর্গে আব্বাস’ ও আরও কী কী ছদ্মনামেও লিখতেন।

মঞ্জু তাঁর ‘ছায়াংশ’ কবিতায় উচ্চারণ করেছিলেন—‘আমি তো প্রেমিক/ প্রীত নই মনুষ্য জন্মে/ তাই কভু ভালবাসতে শিখিনি।’ তিনি (নিজের) জীবদ্দশায় প্রেমিক ছিলেন কি না, মনুষ্যজন্মে প্রীত ছিলেন কি না—এই প্রশ্নগুলোর কোনও সরল উত্তর তাঁর কবিতায় না-থাকলেও কবিতার প্রতি এক গভীর প্রেম-যে তাঁর ছিল, তা নিঃসন্দেহ। কবিতা বিষয়ে মঞ্জুকে বলতে দেখি—‘একজন্মে মানুষ কবিতা লিখতে পারে না, মানুষ কবিতা লেখে মৃত্যুর পরে। অন্তরাত্মার এই অসহায়ত্ব ধারণ করে মানুষ কবিতা লেখা আয়ত্ত করেছে—এ এক আশ্চর্য বিষয়। আর সবচেয়ে অত্যাশ্চর্য বিষয়—মানুষ নির্মাণ করছে আত্মবিধ্বংসী কবিতা আত্ম ও আত্ম-উন্মোচনের তীব্রতা থেকে…’ (দ্র. ‘আমি ও গেওর্গে আব্বাস’—নির্ঝর নৈঃশব্দ্য)। এমন বক্তব্য অস্বস্তিকর হলেও কবিতাচিন্তার কেন্দ্রে তাঁর সৎ অবস্থানকেই সামনে আনে।

‘বিদ্যুতের বাগান’, ‘সাপ ও সূর্যমুখী’ ও অন্যান্য কবিতাবই পাঠউত্তর আমরা দেখতে পাই নানানভাবে আত্মস্বীকার আছে দেলোয়ার হোসেন মঞ্জুর কবিতায়। ‘মর্ফোলজি’ শিরোনামক কবিতার প্রথম অংশে যে-‘কবিতার কবরখানার জন্য/ আমি না হয় আরো কিছু লাশ রচনা করে যাই’ উচ্চারণের পর কবিতা আর সৌন্দর্য-উৎপাদনের ক্ষেত্র না-থেকে হয়ে ওঠে মৃত্যু-পরবর্তী এক দেহব্যবচ্ছেদ, মর্গ। এই পটভূমিতে—লেখা মানে তো বাঁচানো নয়, বরং মৃত্যুকেই নথিভুক্ত করা। এ এক অস্তিত্বগত দায় স্বীকার (আমি জানি, আমি লাশ-ই বানাচ্ছি, তবু লিখছি)। আর, ‘ছায়াংশ’ কবিতায় ‘আমি তো প্রেমিক/ প্রীত নই মনুষ্য জন্মে/ তাই কভু ভালবাসতে শিখিনি।’ এমন উচ্চারণ শুনে আমরা তাকে সোজাসাপটা কোনও প্রেমভঙ্গের হাহাকার বলতে পারি না। মানুষরূপে জন্ম নিয়ে কেউ যদি ভালোবাসার যোগ্যতা অর্জন করতে না-ও পারেন, তবে তা কি ব্যক্তিগত ব্যর্থতা, না কি মানুষ্যজন্মের এক প্রকার ট্র্যাজেডি?

একটি কবিতাকে তো ঘটনার নথি হিশেবে না-দেখে অভিজ্ঞতার রূপান্তর হিশেবেই দেখতে হয়। কবি যখন নিজের জীবনের ঘটনা, সীমা, অক্ষমতা কিংবা অন্তর্লীন দায়বোধের দিকে ফিরে তাকান, তখন তা কেবল স্বভাবের তাড়নায় বলা কথা নয়, আবার নিছক সৌন্দর্য নির্মাণের কৌশলও নয়। এই দুইয়ের টানাপোড়েনে যে চাপ জন্ম নেয়, সেই চাপটা ভাষাকে কবিতায় রূপান্তর করতে পারে।

কবিতায় একজন কবির আত্মস্বীকারকে তাঁর আত্মকথা (জীবনের কথা) বলে সরল করা যায় না। এই ব্যাপারটাকে জীবনের সঙ্গে ভাষার সংঘর্ষের ফল হিশেবেই বুঝতে হয়। কখনও কখনও, কোনও কোনও কবির মধ্যে না-বলা কথার চাপ সহনীয় থাকে না। এমন অবস্থায় আত্মস্বীকার তাঁদের কাছে হয়ে ওঠে দায়; নিজের সঙ্গে প্রতারণা না-করার একমাত্র পথ। মঞ্জুর মতো কবির ক্ষেত্রেও এমন তাড়না স্পষ্ট: তিনি হয়তো অনুভব করতেন, না-স্বীকার করলে ভাষা মিথ্যে হয়ে যাবে। ফলে নিজের সীমাবদ্ধতা, প্রেমে অক্ষমতা, মৃত্যুচিন্তা বা আত্মবিধ্বংসী প্রবণতাকে গোপন করেননি। এটি তাঁর মানসিক স্বচ্ছতারই দাবি; অস্তিত্বগত সততা।

আর, কোনও স্বীকারোক্তি কবিতা হয়ে ওঠে তখনই, যখন তা কেবল বলা নয়, রূপান্তরিত বলা। অর্থাৎ স্বভাবের তাড়না ভাষায় ঢুকে পড়লে কবি তাকে ছেড়ে দেন না; তাকে গড়েন, ভাঙেন, প্রতীকায়িত করেন। সৌন্দর্যের প্রশ্নটা এখানে অলংকার নয়—এটি গঠন, ছন্দ, চিত্রকল্প ও নীরবতার মাধ্যমে যন্ত্রণাকে এমনভাবে সাজানো, যাতে তা ব্যক্তিগত স্বীকারোক্তি হয়েও পাঠকের অনুভবে পৌঁছায়।

Poetry Quote: Collage; Delower Hossain Monju; Image Source: Collected; @thirdlanespace.com

মঞ্জু কবি হতে চেয়েছিলেন। বিদেশ-বিভুঁইয়ে নানান ব্যস্ততার মধ্যে (এমনকী মরণের আগে—ক্যান্সার-আক্রান্ত অবস্থায়ও) কাব্যচর্চায় রত ছিলেন। মঞ্জুকে আমরা অনুভবপ্রবণ, আকাঙ্ক্ষাশীল, কিন্তু নিঃশর্ততায় অক্ষম এক মানুষ হিশেবে চিহ্নিত করতে চাইলেও দেখব, ভালোবাসার মতো কবিতা লেখাও তাঁর কাছে কোনও স্বস্তির কাজ নয়। ‘বিদ্যুতের বাগান’ কবিতাবই-এ অন্তর্ভুক্ত ‘আর আমি কবিতা লিখবো না’ শিরোনামে একটি কবিতা তাঁর পাঠককে এমনই জানান দেয়—‘বন্ধু যারা, বজ্রমণ্ডিত/ তাহাদের মধ্যাহ্নভোজে/ আমিও রেখে যাই/ কিছু কিছু ক্ষতপুষ্প, পাখির কাবাব বেদিনীকুণ্ড অহ/ দেবীরাও পান করে অজস্র জীবের উড়াল/ একদিন আমি আর কবিতা লিখবো না’—এই প্রেক্ষিতে ‘আর আমি কবিতা লিখবো না’—উচ্চারণটিকে আমরা কবির কোনও আত্মবিরতি বা কবিতার পরিসমাপ্তির ঘোষণা হিশেবে না-ধরে বরং কবিতাচিন্তার পরিণতি হিশেবে ভাবতে চাই। যে-কবি বিশ্বাস করেন—মানুষ কবিতা লেখে মৃত্যুর পরে, যে কবিতা আত্ম ও আত্ম-উন্মোচনের তীব্রতায় আত্মবিধ্বংসী হয়ে ওঠে—তাঁর পক্ষে কবিতা লেখা নিশ্চয় কখনও নির্দোষ আনন্দ বা আবেগের খেলা হতে পারে না। ফলে এই কবিতা-ত্যাগের উচ্চারণটুকু আসলে কবিতার ভিতর দিয়েই কবিতার সীমা চিহ্নিত করা।

তিনি প্রেমিক হয়েও যেমন প্রীত হননি, তেমনই কবি হয়েও কবিতার আশ্রয়ে শান্তি পাননি। এইরকম দ্বন্দ্ব মঞ্জুর কাব্যসত্তার কেন্দ্রে এক জোরালো অবস্থান গ্রহণ করে। তাঁর কবিতা পাঠককে বোঝাতে নয়, অনুভবের এক অস্বস্তিকর অঞ্চলে ঠেলে দেয়—যেখানে ভাষা, মৃত্যু, ভালোবাসা ও আত্মপরিচয় একে-অন্যকে খণ্ডিত করে। সুতরাং এই কবির ‘আর আমি কবিতা লিখবো না’ উচ্চারণটি পরাজয়সূচক নয়; এটি তাঁর সময়ের কবিতারই এক আত্মসচেতন মুহূর্ত—যেখানে কবি কবিতার কাছেই প্রশ্ন রাখেন, এবং সেই প্রশ্নের ভার পাঠকের কাঁধে তুলে দেন।

মঞ্জু সত্যি সত্যি মনুষ্যজন্মে প্রীত না-হলেও এই প্রশ্ন ওঠে-যে—তাঁর মধ্যে কি মানুষের জন্মগত অবস্থান নিয়ে কোনও গভীর সংশয় ছিল? কিন্তু, এখানে এমন প্রশ্নের উত্তর খোঁজাটাও জরুরি নয় মনে করি। আমরা মনে করতেই পারি, কবি নিজের প্রেমহীনতাকে কোনও চরিত্রগত ত্রুটি হিশেবে না-দেখে মানুষ হয়ে জন্মানোর অনিবার্য ফল হিশেবে দেখছেন। আর এমন অনুভবের মধ্যে তো আধুনিক মানুষের ট্র্যাজেডিও লুকিয়ে আছে।

মঞ্জু (তাঁর উচ্চারণ অনুযায়ী) প্রেমিক হয়েও ভালোবাসতে শেখেননি কেন? কেনই-বা এই ধাঁধা, অন্তর্দ্বন্দ্ব? এখানে বুঝতে হবে, প্রেমিক হওয়া মানে ভালোবাসার নিঃশর্ত নিপুণতা অর্জন করা নয়। মানুষ জন্মগতভাবে নিঃশর্ত ভালোবাসার অধিকারীও নয়; ভালোবাসা শেখা যায়, অর্জন করা যায়, অনুভব করা যায়, কিন্তু তা স্বাভাবিকভাবে প্রদত্ত নয়। প্রেমিক চায়, আকাঙ্ক্ষা রাখে, অনুভব করে, কিন্তু তার ভালোবাসা অসম্পূর্ণও থেকে যায়। এ এক অদেখা বেদনা, একাকিত্ব ও আত্মবিধ্বংসী চেতনা।

মঞ্জু নিজেকে চিনতেন, সীমাবদ্ধতাকেও স্বীকার করেছেন অপকটে। মঞ্জুর কবিতায় প্রেমিকের অক্ষমতা বা শেখার অভাবটা জীবনেরই সীমা; মানবিক অস্তিত্বের জটিলতা এবং আত্মচিন্তার চিত্র। পাঠককে বোঝাতে নয়, অনুভব করানোই তাঁর উদ্দেশ্য।

যে-প্রেমিক, সে ভালোবাসবে বা ভালোবাসার কথা বলবে। কিন্তু ‘প্রীত’? প্রীত মানে তো হৃদয়ের সহজ প্রবাহ/অবস্থা, স্বতঃস্ফূর্ত স্নিগ্ধতা। মঞ্জু যেমন নিজেকে চিনতেন, তেমনই প্রেমের ভাষা জানতেন, প্রেমের আচরণও বুঝতেন, কিন্তু সেই অন্তঃস্থ উষ্ণতা হয়তো তাঁর ছিল না। কিন্তু ‘প্রেম তাঁর কাছে একটি অভ্যাস, একটি অনুশীলন—আত্মিক সত্য নয়’ এমন একটি সিদ্ধান্তে আমরা কি পৌঁছুতে পারি কেবল একটি উচ্চারণের সূত্র ধরে? না, মঞ্জুর কাব্যভাষা ও সামগ্রিক কাব্যচেতনা সেই সিদ্ধান্তকে সহজে গ্রহণ করবে না। মঞ্জু প্রেমিক, এটা নিজেই ঘোষণা করেছেন। অর্থাৎ আকাঙ্ক্ষা, টান, সংযোগের বাসনা, অন্যের দিকে ঝুঁকে পড়ার প্রবণতা—এইসব তাঁর মধ্যে আছে। প্রেমিক না-হলে এই যন্ত্রণাময়, আত্মবিধ্বংসী কবিতাভাষাই তৈরি হতো না। মঞ্জু বললেন, ‘প্রীত’ নন মনুষ্যজন্মে। কিন্তু, মানুষ হয়ে জন্মানোর মানেও স্বাভাবিকভাবে এই ‘প্রীত’ হওয়ার সম্ভাবনা নয়। মানুষ চাইলেও তো প্রেমকে আত্মিক সত্যে উত্তীর্ণ করতে পারে না।

Poetry Quote: Collage; Delower Hossain Monju; Image Source: Collected; @thirdlanespace.com

অবশ্য, কোনও কবির একটি কবিতাকে কেবল একই সরলরেখায় পড়লে, পঠিত কবিতাটার বড়ো দৃশ্য/ইঙ্গিতই অদৃশ্য থেকে যেতে পারে। এই ‘ছায়াংশ’ কবিতাও পড়তে পড়তে আমরা বুঝব যে-প্রেমিক কিন্তু প্রীত নই—উচ্চারণটি তার একমাত্র কেন্দ্র নয়; বরং একটি প্রবেশদ্বার। এর বাইরে কবিতাটি আরও কয়েকটি সূক্ষ্ম, কিন্তু গভীর ইঙ্গিত ছড়িয়ে রাখে, যেগুলো পাঠককে ভিন্ন ভিন্ন স্তরে নাড়া দিতে পারে; যেমন— জীবন ও মৃত্যুর বাজারি বিনিময়বোধ—‘বাজারে বাজারে পিতলের পানদান উঠেছিল/ পাখি সব উড়াল দিল মৃত্যুর পরে’—এই পঙক্তিগুলোয় জীবন যেন এক বেচাকেনার পরিসর, যেখানে মূল্যবান জিনিস শেষপর্যন্ত নিষ্প্রাণ ধাতুতে পরিণত হয়। পাখির উড়ে যাওয়া আছে, যা কেবলই মৃত্যু নয়; অর্থহীনতার মুক্তি। ভালোবাসা না-শেখার কথার পাশে এমন দৃশ্য বসিয়ে কবি যেন বলছেন—যে-জগৎ জীবিত আবেগকে বাজারে তোলে, সেখানে ‘প্রীত’ জন্মাবে কীভাবে? তাতে পাঠক হিশেবে আমরা সমাজের অর্থনৈতিক ও নৈতিক শুষ্কতার ইঙ্গিতটাও পাই। তাঁর কবিতায় পিতৃত্ব ও ঈশ্বরত্বের বিপরীত চিত্র একটি সংকেত বহন করে। ‘গণ-গোরস্থানে একা হেঁটে যাবো…/ পিতা আমি, অদৃশ্য ঈশ্বর হতে’—এই উচ্চারণে পিতা মানে রক্ষাকর্তা নয়, বরং নিঃসঙ্গ সাক্ষী। ঈশ্বরও এখানে দৃশ্যমান নন, দায়গ্রস্ত নন।

ভালোবাসার অনুপস্থিতি ব্যক্তিগত নয়; এটি উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত এক শূন্যতা, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলেছে। অনুভব করা যায়, ভালোবাসা শেখা না-হওয়া মানে ভবিষ্যতের কাছেও কিছু দিতে না-পারার যন্ত্রণা। আলাদা একটি ইঙ্গিত আছে ভূগোল ও নৈঃশব্দ্যের ব্যবহারে। ‘মাছ-রাঙা বাড়ি/ নৈঃশব্দ্যে ভেসে ভেসে ওঠে/ জানিয়ো পর্বত, দক্ষিণাত্যে’—তাতে স্থানগুলো বাস্তব মানচিত্রের বদলে স্মৃতি, নির্বাসন ও বিচ্ছিন্নতার মানচিত্র।

মানুষে মানুষে এই কবি দেখেন ‘ঘাসের প্রকাশ’—অর্থাৎ সম্পর্কের ভাষা উচ্চারিত নয়, বরং নিচু, পায়ের তলায়, অবহেলিত। অন্য ব্যাপার, কণ্ঠস্বরের একাকিত্ব। সংলাপ নেই, প্রতিউত্তর নেই। সব উচ্চারণ একমুখী। এতে অনুভব করা যায়, কবি কেবল ভালোবাসতে শেখেননি তা নয়, শোনার মতো কাউকে পাননি। এ-যেন আধুনিক মানুষের যোগাযোগহীনতার প্রতিচ্ছবি—যেখানে শব্দ আছে, কিন্তু সাড়া নেই।

Books: Delower Hossain Monju; Image Source: Collected; @thirdlanespace.com

কবিতা মূলত বোঝার ভাষা নয়, অনুভব করানোর শিল্প। বোঝানোর জন্য যুক্তিকে সাজাতে হয়, একটা অর্থকে নির্দিষ্ট করতে হয়, কোনও সিদ্ধান্তের দিকে এগিয়ে দিতে হয়। কিন্তু কবিতা এই পথে হাঁটতে নারাজ। মঞ্জুর কবিতাও আমাদেরেকে বোঝাতে নয়, অনুভব করাতে চায়। তিনি উত্তর দেন না, সিদ্ধান্ত দেন না। প্রশ্ন খোলা রাখেন পাঠকের জন্য। মঞ্জুর কবিতা এভাবে বলে না—কবি ‘প্রীত’ নন বলে মানুষ; বরং বলতে চায়—মানুষ বলে কবি ‘প্রীত’ নন। মানুষ হওয়াই যেন ভালোবাসা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার শর্ত।

সভ্যতা মানুষকে যুক্তি দিয়েছে, ভাষা দিয়েছে, ধর্ম দিয়েছে—কিন্তু ভালোবাসার সহজাত প্রবৃত্তিটুকু কেড়ে নিয়েছে। পশুপাখির প্রেমে কোনও দর্শন নেই, কোনও দায় নেই, কোনও হিসাব নেই। মানুষের প্রেমে স্মৃতি, প্রত্যাশা, মালিকানা, হারানোর ভয় আছে। প্রেম এখানে যেন ‘প্রীত’ থাকতে চায় না। আর, এ যেন এক গভীর আত্ম-অপরাধবোধ। কবি নিজেকে নির্দোষ ঘোষণা না-করে বরং স্বীকার করছেন—ভালোবাসতে না-শেখার দায়। দায় কি তাঁকে একা বইতে হবে? আরও প্রশ্ন ওঠে—কেন মানুষকে ভালোবাসতে শিখতে হয়? মনুষ্যজীবনে ভালোবাসা যদি সহজাত অনুভব হিশেবেই বিদ্যমান থাকে, তো সহজাত সামর্থ্য হিশেবে থাকবে না কেন?

ভালোবাসায় থাকতে হয় নিঃশর্ত গ্রহণ; অন্যকে নিজের মতো করে নয় বরং অন্যের মতো করে মেনে নেওয়া। আপন স্বার্থ ও অহংকে সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার ক্ষমতা সহজাত নয়, অর্জিত ব্যাপার। আর, মানুষের জন্ম স্বার্থ, ভয়, নিরাপত্তাহীনতা ও আত্মরক্ষার প্রবৃত্তি নিয়ে। এইসব ভালোবাসাকে জটিল করে তোলে। মানুষ ভালোবাসে ঠিকই, কিন্তু সেই ভালোবাসা প্রায়শই শর্তযুক্ত, প্রত্যাশাময়, অধিকারীসুলভ। আমরা চাই, বিনিময়ে কিছু চাই। আমরা ভালোবাসি, কিন্তু আঘাত পেলে ভালোবাসা ফিরিয়েও নিই। আমরা ভালোবাসি, কিন্তু পুরোপুরি নিজেকে ছাড়তে পারি না। এই সীমাবদ্ধতাই কি মঞ্জুর কাছে মানুষ্যজন্মের ট্র্যাজেডি?

ভালোবাসা শেখা গেলেও, শেখা ভালোবাসা আর সহজাত ‘প্রীত’ এক জিনিসও নয়। শেখা ভালোবাসায় প্রচেষ্টা, ক্লান্তি, ব্যর্থতা থাকতে পারে। মঞ্জু কি সেই ব্যর্থতার কথাই বললেন? তিনি প্রেমিক—অর্থাৎ অনুভব করেন, আকাঙ্ক্ষা রাখেন, তীব্রভাবে চান। কিন্তু তিনি ‘প্রীত’ নন। অর্থাৎ সেই চাওয়াটা অনায়াস, স্বচ্ছ, নিঃশর্ত হয়ে উঠতে পারে না?

আধুনিক মানুষ অতিরিক্ত সচেতন, অতিরিক্ত আত্মসচেতন। আধুনিক মানুষ ভালোবাসার মধ্যেও নিজেকে দেখে, নিজের লাভ-ক্ষতি মাপে। এই অতিসচেতন মানুষ ভালোবাসতে চায়, কিন্তু ভালোবাসার মধ্যে হারিয়ে যেতে পারে না। মঞ্জুর কবিতায় এই অক্ষমতাই আত্মস্বীকারে রূপ নিয়েছে কি না, ঠিক জানি না।
. . .

Delower Hossain Monju; Image Source: Collected; @thirdlanespace.com

আমার কবিতা : দেলওয়ার হোসেন মঞ্জু

মনুষ্য সমাজ আজন্ম অপরিষ্কার জানি।
বাজারে বাজারে মানুষ শুধু ছায়া ফেলে যায়। আমি চার চাকার ঠেলাগাড়িতে করে সারাদিন ছায়া পরিষ্কার করি। আমার কবিতা তাই কবিতা হয়ে উঠে নি। আমার কবিতায় বেশি থাকে ছায়ার ওজন…

কবিতার কুঁড়েঘরে হরিণ পোষার কথা ছিলো, পুষেছি আমার মতো এক আত্মঘাতী রাক্ষস। ক্ষিদে পেলে আপন জিহ্বা আহার করি যে-কোনো মধ্যরাতে। তাই হয়তো আমার কবিতা পড়তে পারে না বাঙলার রহিম-রূপবান, বাঙলার বেহুলা সুন্দরী।

আমার কবিতা ভীষণ একা এবং একাই। যে-ঘরে থাকি, পাঁচজন প্রাণী আমরা—একটা টিকটিকি, একটা মাকড়সা, একজোড়া প্রজাপতি আর একটা দুড়াসাপ (ঢোঁড়াসাপ)। তাদের সঙ্গে বাতাস ভাগাভাগি হয় আমার। রাত জাগি… নবী সুলেমানের মতো আয়ত্ত করি তাহাদের ভাষা।

আমার কবিতা তাই মানুষের ভাষায় রচিত, ঠিক বলা যাবে না…
আর তুমি তো জানোই দক্ষিণ—আমি জন্মভিখারী, সৌন্দর্যশিকারি…
নারী, মা, মৃত্যু এবং একটি জবাফুলের মালা পরিধান করে এই সৌরভূমে এসেছি আমি। নিজে নিজে ধরতে শিখেছি বাতাসের আঙুল…
বয়স কতো ছিলো তখন! একদিন সন্ধ্যেবেলা দেখলাম—দূর পাহাড়ের চূড়ায় একপাল ময়ূর পুচ্ছ মেলেছে…
কাছে যাই, কাছে যাই….
ঝাঁপ দিয়ে দেখি—এতো ময়ূরপুচ্ছ নয়, অগ্নিগিরি। পোড়া মানুষের বৈঠকখানায় আমি তো যাবোই! নরকের নবম কুঠুরি আমার অধিক কে আর ভালোবাসবে বলো!

ছেলেদেরে বলেছি(যাদের নাভির নিচে এখনো লোম ওঠে নি) মরার জন্য শিলিং ফ্যান ভালো নয়, মরার জন্য মহাসাগর ভালো… আর মহাসাগরের জল রান্নায় সর্বদা ব্যতিব্যস্ত থাকেন প্রাচীন প্রৌঢ়া (তিনি আমার বিগত জন্মের মা ছিলেন। আমার জ্বর হলে মাটির উনুনে আম্রকাষ্ঠ দিয়ে রান্না করে দিতেন ফণীমনসার হাড়৷) আমি চাই আমার মা এরকম রান্না করুক।

ফজরের নামাজ পড়ে একটা কাসার পাত্রে চায়ের পানি বসাক। আমার কবিতার বইগুলো পুড়িয়ে পুড়িয়ে আগুনের তেজ বাড়িয়ে দিক। বুদবুদ জলের মধ্যে চায়ের পাতা মিশ্রণের সামান্য আগে নিভৃতে রেখে আসবো আমার ছেঁড়া-হৃৎপিণ্ড।
চায়ের কষের মতো বের হবে এইসব জন্মলজ্জা…
ঠিক এরকমই লজ্জিত এবং পাপিষ্ঠ
আমার কবিতা…

তারপরও উর্বর অগ্নিকাণ্ডের ভেতর ছায়াহরিণীর গান শুনিয়ে শুনিয়ে বড়ো করেছি তাদের; বড়ো করেছি গ্রাম গড়রবন্দে নয়, উৎকৃষ্ট ইন্দ্রপুরীতে।
আমার যুবতী কবিতাগুলোর বিয়ে হয়নি কখনো, একদিন সকালবেলা ঘুম ভেঙে দেখিতারা সবাই বিধবা হয়ে গেছে… আমার মৃত পাণ্ডুলিপিতে ছাইচাপা থাকে মৃত এক বিধবার গ্রাম…

তারপরও সৌর সীমান্তে দাঁড়াই। রঙ-করা চাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকি। ঈশ্বর নিয়ে ক্লান্তি আসে, দেবী দক্ষিণ নিয়ে ক্লান্তি আসে না। অধৈর্য দক্ষিণ বলেনকত আর ধৈর্য ধরব হে… ধৈর্য
ধরে ধরে আমার নাম
ধৈর্যদেবী হয়ে গেছে…
ঋতু বদল হয়
গ্রীষ্ম, বর্ষা, হেমন্ত আসে…

এতোসব দৃশ্যবদলে আমার চোখের মণিতে লোম গজায়। দেবী দক্ষিণ এসে শেভ করে দিয়ে যান। আমার কবিতায় মাঝেমধ্যে তাই চোখের রক্ত পাওয়া যেতে পারে। আমায় ক্ষমা কর হে নর ও নারীমণ্ডলী। আমি দুঃখিত।

. . .

দেলওয়ার হোসেন মঞ্জুর কবিসত্তা ও পাঠ-আলোচনার জন্য পড়তে পারেন …

আমি ও গেওর্গে আব্বাস ১ : নির্ঝর নৈঃশব্দ্য 

আমি ও গেওর্গে আব্বাস ২ : নির্ঝর নৈঃশব্দ্য 

দেলোয়ার হোসেন মঞ্জু : মরণের অন্তহীন উপমানগুলো : আহমদ মিনহাজ 

মুনিরা চৌধুরী: দরজার ওপারে ॥ আঞ্জুমান রোজী

. . .

লেখক পরিচয় : উপরে ছবি অথবা এখানে চাপুন

. . .

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 22

No votes so far! Be the first to rate this post.

Contributor@thirdlanespace.com কর্তৃক স্বত্ব সংরক্ষিত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *